ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমায় না চিনেও চেনা

৪র্থ পর্ব

লেখক: এইশাত রাদিয়া

গল্পঃ #তোমায়_না_চিনেও_চেনা

লেখিকা: #এইশাত_রাদিয়া

পর্ব:৪

রাত ৮টার কাছাকাছি,,

একটা কালো রঙের গাড়ি এসে থামলো হাসপাতালের সামনে। গাড়ি থামতে দেরি হয় কিন্তু ইরাদের গাড়ি থেকে বেরোতে দেরি হয় না। তারা তাড়াতাড়ি করে ভিতরে ঢুকে রিসিপশন থেকে খুজ নিয়ে একটা কেবিনে ঢুকলো। কেবিনের ভিতরে ঢুকে দেখলো কামরুল হকের হাতে এবং মাথায় ব্যান্ডেজ করা। ইরা কামরুল হককে দেখেই কান্না শুরু করে দিলো।

কামরুল হক চৌধুরীদের অফিস থেকে বেরোতেই কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা গাড়ি এসে কামরুল হককে ধাক্কা মারলো। তখনি রাস্তার কিছু লোক এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে আর চৌধুরী বাড়িতে খবর দেয়। চৌধুরী অফ ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানিটা ইরার ফুপাতো বোন রুপাদেরই। রূপায় নিশিকে কল করে ইরাকে নিয়ে হাসপাতালে আসতে বলে। রুপা জানে ইরাকে আগেই জানালে এখানে আসতে আসতে নিজের অবস্থা খারাপ করে ফেলবে। গাড়িতে আসার সময় নিশিকে একটার পর একটা প্রশ্ন করেই গেছে কিন্তু নিশি কিছু বলেনি। কেবিনে ঢুকেই তার নানুভাই এর এই অবস্থা দেখে সে নিজেকে সামলাতে না পেরে কাদতে থাকে। কিন্তু কামরুল হকের কোনো রেসপন্স নেই। ইরার কান্নার শব্দ পেয়ে ডাক্তার এসে কান্না থামাতে বলে এবং কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। রোগীর সামনে এভাবে কাদলে রুগীর অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। নিশি ও রুপা ইরাকে কোনোভাবে বাইরে নিয়ে গেলো। রুপা ইরাকে সব বললো। ইরা কি করবে বুঝতে পারছে না। তার সবকিছু যেনো উলটপালট হয়ে যাচ্ছে। তার সাথে আজকে কি হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না।

তখনি ডাক্তার এসে শাহেদ চৌধুরীকে জানায়,,

" মাথায় আঘাত পাওয়ার ফলে এবং অনেক রক্ত ক্ষরণের জন্যে রোগীর অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে, তাই দেরি না করে আজকে রাতের মধ্যেই ইমারজেন্সি ফ্লাইটে লন্ডন পাঠাতে হবে। যত দেরি হবে রোগির বাঁচার সম্ভবনা তত কমবে।"

এই কথা শুনে ইরার কান্নার বেগ দ্বিগুণ হয়ে যায়। সে দৌঁড়ে গিয়ে ডাক্তার এর কাছে রিকোয়েস্ট করে,

"প্লীজ ডাক্তার আমার নানুভাই কে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। নানুভাই ছাড়া এই দুনিয়াতে আর কেউ নেই। দয়া করে যা করার তাড়াতাড়ি করুন, তবুও আমার নানুভাই কে আমার চাই।"

ইরার অবস্থা দেখে শাহেদ চৌধুরী বললো,

"দেখো ইরা মামনি এইভাবে কান্না করে তো আর কিছু হবে না, আমি চাচাকে লন্ডন পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। তুমি এখন রূপার সাথে নিশিকে নিয়ে চৌধুরী বাড়িতে যাও। ঐ বাড়িতে এখন একা একা থাকার দরকার নেই। চাচাকে নিয়ে আমি লন্ডন যাচ্ছি, যতোদিন না চাচা সুস্থ হচ্ছে ততোদিন তুমি চৌধুরী বাড়িতেই থাকবে। আশা করি আমার কথা তুমি বুঝতে পেরেছো, এখন আর কথা না বাড়িয়ে যাও।"

ইরাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে শাহেদ চৌধুরী ফোনে কাউকে ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে বলে চলে যাই। ইরা কেবিনে ঢুকে কামরুল হককে দেখে নিশ্চুপে কাদতে থাকে। প্রায় 30 মিনিট পর কয়েকজন লোক এসে কামরুল হককে নিয়ে যাই। কামরুল হককে নিয়ে যাওয়ার পর পরই রুপা ইরাদের নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরে।

ইরা না খেয়েই শুয়ে পরে। সবাই অনেক ডাকাডাকি করেও ইরাকে বিছানা থেকে তুলতে পারে না। ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে কেউ আর বেশী জোর করলো না। ওই রাতটা ইরা নির্ঘুমই কাটিয়ে দিলো।

--

পরদিন সকালে ইরার কাছে কল আসলো লন্ডন থেকে, তাকে জানানো হলো কামরুল হকের অবস্থা এখন কিছুটা ভালো,, পুরোপুরি সুস্থ হতে বেশ কিছু দিন লাগবে আরও।

এই খবর পেয়ে ইরার বুক থেকে যেনো পাথর সরে গেলো। সে দুই রাকাআত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো।

কামরুল হকের খবর শুনে সবার মন কিছুটা ভালো হলো।

আজকে চৌধুরী বাড়িতে সবচেয়ে খুশীর দিন। চৌধুরী বাড়ির রত্নরা আজ নিজ বাড়িতে ফিরে আসছে। যদিও অনেক কাঠখর পুড়িয়ে প্রায় সাত বছর পরে তাদের দেশে আনার ব্যবস্থা করতে পেরেছে।

চৌধুরী বাড়িতে যৌথ পরিবারের বসবাস। চৌধুরী বাড়ির কর্তা শাহেদ চৌধুরীর এক ছেলে এক মেয়ে। রূপার বাবাই হলো শাহেদ চৌধুরী, সম্পর্কে ইরার ফুপা। আর ইরার ফুপ্পি রোকেয়া চৌধুরী হলেন চৌধুরী বাড়ির একমাত্র বউ, যিনি নিজের সবটুকু দিয়ে এই পরিবারটাকে আগলে রেখেছেন। এই বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য হলো লতিফা চৌধুরী। লতিফার এক ছেলে এক মেয়ে, শাহেদ চৌধুরী এবং লুৎফা খান। লুৎফা খানের প্রেমের বিয়ে, তাদেরই কোম্পানির ম্যানেজার এর সাথে। বিয়ের পর তাকে তার স্বামী সহ লতিফা তাদের চৌধুরী বাড়িতেই রেখে দেন। লুৎফা খানের দুই ছেলে, সাজ্জাদুল খান হাসান আর শাহারিয়া খান সিয়াম। শাহেদ চৌধুরীর অবর্তমানে হাসান ও তার বাবাই ব্যবসার সকল দায়িত্বে থাকেন। আর সিয়াম পড়াশুনার সুবাদে উদয়ের সাথে নিউইয়র্ক থেকে।

--

ইরার মন কিছুটা ভালো থাকায় সে রুপা কে নিয়ে বিকেলে বাগানে ঘুরতে যায়। নিশি সকালেই চলে গেছে। ইরা রাতে সরাসরি চলে আসায় কোনো জামাকাপড় আনতে পারেনি তাই রূপার একটা কুর্তি পড়েছে, এই কুর্তিটা উদয় রূপার জন্যে পাঠিয়ে ছিল যেটা ইরা জানে না। ইরা বড়ো হওয়ার পর উদয় কে দেখেনি, শুধু কয়েকবার রুপা আর তাঁর ফুপ্পির থেকে নাম শুনেছে । সে জানে তার একটা ফুপাতো ভাই আছে যার নাম উদয়।

ইরা বাগানে ঘুরতে ঘুরতে একেবারে শেষ মাথায় চলে আসে,, রুপা এসে ইরাকে বলে তার কিছু পিক তুলে দিতে, ইরা ও রাজি হয়ে যাই। রুপা পেছন দিকে ঘুরে দাঁড়ায় আর ইরা ফটো তুলতে থাকে, এই সময় একটা গাড়ি গেট দিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে, ইরার সেদিকে খেয়াল নেই সেই ফটো তুলায় বেস্ত। যদি ইরা একটু খেয়াল করত তাহলে দেখতে পেতো দুটি চোখ তার দিকে কিভাবে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে।

--

উদয়রা বাড়িতে ঢুকতেই হইচই পড়ে গেলো,, বাড়ির সার্ভেন্ট এসে রূপাদের ডেকে নিয়ে গেলো কিন্তু ইরা গেলো না, সে বললো তার ভালো লাগছে না সে আর একটু হেঁটে তার পর যাবে, রূপাও আর জোর করলো না।

রুপা এসেই উদয়কে জড়িয়ে ধরলো, কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো,

"ভাইয়া এতোদিন পর আমাদেরকে মনে পড়লো?? তুমি পাল্টে গেছো ভাইয়া, আগে তো এমন ছিলে না। আগে আমাদের কতো ভালবাসতে আর এখন..."

"এখন তো চলে এসেছি, আর আমাকেও এখন অনেকে আগের মতো ভালোবাসে না, কিছু বাইরের লোকের জন্য এখন আমি অনেকের কাছে পর হয়ে গেছি ।"কিছুটা অভিমানী সুরে কথাটা বললো উদয়

উদয়ের এহেন কথায় রোকেয়ার চোখের জলেরা আর বাঁধ মানলো না, তিনি কাদতে কাদতে দৌঁড়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন। কাদতে কাদতে বললেন,

"তুই এতো পাষাণ কি করি হলি রে বাবা,, তোর এই মায়ের কথা একবারও মনে হতো না।"

উদয়ও মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

"আমার কথা কি তোমার মনে ছিলো আম্মু, মনে থাকলে তো রাগ নিয়ে বসে না থেকে কল করতে। আজ প্রায় দুই বছর ধরে তুমি আমার সাথে কথা বলো না, কিছু দরকার হলে সবসময় সিয়ামকে ফোন করতে।"

রোকেয়া এবার অভিমানী সুরে বলল,

"তাই বলে তুইও জেদ ধরে কথা বলা বন্ধ করে দিবি।"

"তোমার জেদ থাকতে পারে আর আমর পারে না, আমার তো তোমার চেয়ে বেশী জেদ থাকার কথা কারণ আমি তোমার ছেলে।"

এবার সিয়ামও অভিমান করে বলে উঠলো,

"বাহ,, সবাই দেখছি চৌধুরী সাহেবকে পেয়ে এই খান সাহেবকে ভুলেই গেছে। ভালো মামনি ভালো, আমি তো তোমার ছেলে নয় ওই একায় তোমার ছেলে। থাক আমি না হয় চলেই গেলাম, বিদায় চৌধুরী বাড়ি "

সিয়াম কান্নার ভান ধরে শেষের কথাটা বললো । যখনই পেছনে ঘুরে চলে যেতে নিবে তখনই লুৎফা বেগমের কান্না কে দেখে।

সবার চিৎকার চেঁচামেচি শুনে লতিফা চৌধুরী লাঠিতে ভর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামে, পরনে তার সাদা রঙের শাড়ি, যার উপর সাদা সুতা দিয়ে কাজ করা। কুচি দিয়ে শাড়ি পরেছেন, তিনি সবসময় কুচি দিয়েই শাড়ি পড়েন, বিয়ের পরে তাকে শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পড়তে দেখা গেছে কিনা সন্দেহ। তার চলা ফেরাতেই আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।

লতিফা চৌধুরী নীচে এসে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,

"কি হয়েছে বাড়িতে এতো চিৎকার চেঁচামেচি কিসের?? কেউ মারা গেছে নাকি"

উনার এমন প্রশ্নে সবাই কিছুটা ভরকে গেলো। তিনি আবার আগের ন্যায় বলে উঠলেন,

"উদয় আর সিয়াম তোমরা যাও ফ্রেশ হয়ে আসো, বাকি কথা পরে হবে।"

এই বলে তিনি চলে যেতে নিলেন ওই সময়ে উদয় অবাক চোখে তাকিয়ে বললো,

"দাদু তোমার না শরীর খারাপ, তাহলে তোমাকে এতো স্ট্রং লাগছে কীভাবে আর তুমি সবাইকে চিনতে পারছো???"

লতিফা চৌধুরী পিছনে না ঘুরেই আবার গম্ভীর কন্ঠে বললেন,

"বললাম তো বাকি কথা পরে হবে। তোমরা জানো আমি এক কথা দুই বার বলি না, ড্রয়িং রুমে যেনো আর একটা শব্দও না হয়"

এই বলে তিনি ঠক ঠক শব্দ করে উপরে উঠে গেলেন।

রোকেয়া ইশারায় সবাই কে এখন যার যার কাজে যেতে বললেন। তিনিও রান্না ঘরে উদয়দের জন্যে খাবার রেডি করতে চলে গেলেন।

সবাই যার যার কাজে গেলো, উদয় আর সিয়াম ফ্রেশ হতে গেলো আর রুপা সবার জন্যে আনা গিফট আনবক্সিং করতে লাগলো ড্রয়িং রুমে বসেই ।

--

এখন সন্ধ্যা ৭টা,

ইরা বিকালের পর সেই যে রুম এ এসে ঘুমিয়ে ছিলো এখনও উঠেনি। ইরা এ বাড়িতে বেড়াতে আসলেও সে রূপার রুম এই ঘুমায়, আজকেও তাই। ইরা একপাশ হয়ে ঘুমাচ্ছিল, তার পরনে বিকালের কুর্তিটাই।

উদয়ও খাওয়া দাওয়া করে রেস্ট নিচ্ছিল রুমে।তখনি তার ফোন এ একটা কল আসে আর সে রেডি হয় বের হওয়ার জন্য। তার পরনে হোয়াইট কালার এর শার্ট এবং ব্ল্যাক কালার এর প্যান্ট, চুল গুলো হাত দিয়ে ব্রাশ করে নিলো, যেমন লম্বা তেমনি বডিফিটনেস । গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা হলেও দেখতে একেবারে রাজপুত্রের মতো , চাপ দাড়ি আর চুলের স্টাইল দেখে যে কেউ এক দেখাতেই ফিদা হয়ে যাবে । উদয় ঘড়ি পড়ে বিছানা থেকে ফোন নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

রূপার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় উদয় থামে,কি মনে করে যেন রুমের ভিতরে ঢুকে। সে ঢুকে আশে পাশে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। সে মনে মনে আওড়ায়,

"কে এটা, রুপার বিছানায় শুয়ে আছে?? দেখে তো রুপা মনে হচ্ছে না!!"

উদয়ের পাশ থেকে ইরার মুখটা ঠিক করে দেখা যাচ্ছে না,, উদয় একটু সামনে এগিয়ে দেখতে চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। উদয় আস্তে আস্তে বিছানার কাছে গিয়ে ইরার উপর ঝুঁকে মুখ থেকে চুল গুলো সরাতেই তার পিলে চমকে উঠে। ঠিক ওই মুহুর্তেই ইরার ঘুম ভেঙে যায় আর চোখ খুলে উদয় কে দেখেই দেই এক চিৎকার। উদয় তাড়াতাড়ি ইরার মুখ চেপে ধরে আর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

"চুপ একদম চুপ। আমি বাঘ না ভাল্লুক যে এইভাবে চিৎকার করতে হবে। যত্তসব এক্টিং.."

--

চলবে...??

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন