ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমায় না চিনেও চেনা

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: এইশাত রাদিয়া

গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা

লেখিকা: #এইশাত_রাদিয়া

পর্ব:৬

দরজা খুলতেই ইরার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। হঠাৎ সামনে উদয়কে দেখে তার শরীর জমে গেলো, কাল রাতের কথা মনে পড়তেই দৃষ্টি নিচে নামিয়ে নিলো। ইরার মনে কেমন এক অস্থিরতা কাজ করছে। এইরকম অনুভূতি এর আগে আর কখনো হয়নি।

উদয়ের দৃষ্টি স্থির, মুখে একরাশ গম্ভীরতা। ওর মনেও অন্যরকম এক অনুভূতিরা উঁকি দিচ্ছে, যেনো চিরোচেনা অথচ অচেনা কারো সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

রুপা এগিয়ে এসে বলল,

রুপা: "কি ভাইয়া, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে আয়। আমি আম্মুকে ডেকে নিয়ে আসছি "

উদয় ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো। তার চোখ এড়িয়ে যেতে চাইলেও বারবার ইরার দিকে ফিরে আসছে। ইরা দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। বুকের ভিতরে কেমন অস্থির লাগছে।

উদয় এসে লতিফা চৌধুরীর সামনাসামনি রাখা সোফায় বসলো।

উদয়: "দাদু কোন ডাক্তার বলেছে তোমাকে যে তোমার ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে?? আমার তো মনে হচ্ছে ওই ডাক্তার পড়াশুনা করে নয় বরং নকল করে পাশ করেছে।"

লতিফা:"অন্যের ব্যাপারে না জেনে এসব কথা বলতে নেই উদয়।"

উদয়:"আচ্ছা তাহলে এখন আমরা মেইন পয়েন্টে আসি। আমাকে মিথ্যা বলে বাংলাদেশে আনার কারণ কি?"

লতিফা:"আমিও জানি তুমিও জানো তুমি আমার বা আমাদের কারো ইচ্ছাতে দেশে আসোনি, তুমি নিজের ইচ্ছেতেই এসেছো। আমি কি কিছু ভুল বললাম?"

উদয় কুনো কথা বলল না। পেছন থেকে রোকেয়া চৌধুরির কণ্ঠ ভেসে এলো,

রোকেয়া:" নিজের ইচ্ছেতে মানে.."

লতিফা:"তোমার ছেলে আলাদা ভাবে নিজের কোম্পানি খুলেছে বিদেশে, তারই প্রোজেক্ট এর কাজে বাংলাদেশে এসেছে।"

রোকেয়া:"আলাদা কোম্পানি?? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না উদয়, প্লীজ কেউ আমাকে বলবে হচ্ছেটা কি?"

সিয়াম:"আমি বলছি মামনি "

সিয়াম শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বলল,

সিয়াম: "আসলে হয়েছে কি মামণি, আমি আর ব্রো নিইউয়ার্ককে একটা কোম্পানির শেয়ার কিনেছিলাম। সেটা সেল দিয়ে আমাদের মুটামুটি ভালোই প্রফিট হয় আর সেই প্রফিটের টাকা দিয়েই আমরা একটা নতুন বিজনেস স্টার্ট করি। সেই বিজনেসে আমি, ব্রো আর রিফাত পার্টনার হিসেবে আছি। রিফাতকে তো নিশ্চয় চিনো। আশা করি সব বুঝতে পেরেছো।"

রোকেয়া:"তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু আমাদের নিজেদের এতো বড় বিজনেস থাকতে তোরা আবার নতুন করে শুরু করতে গেলি কেনো , আমাদের এই বিজনেসেই তো জয়েন করতে পারতি।"

এবারের উত্তরটা উদয় দিলো,

উদয়:"তুমি খুব ভালো করেই জানো আম্মু, আমি অন্যের উপর ডিপেন্ডেন্ট থাকতে পছন্দ করি না। আর আমি অন্যের নাম নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ করতে চায় না, আমি নিজের যোগ্যতায় এই পর্যন্ত এসেছি এবং নিজের যোগ্যতাই এগিয়ে যাব"

এতক্ষণ ইরা দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে তাদের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। এবার উদয়ের কথা শুনে ইরা নিজের অজান্তেই মনে মনে বিড়বিড় করে উঠলো,

ইরা:"কি অ্যাটিটিউড, উফ,কথা বলার স্টাইল দেখে মনে হচ্ছে কোন মুভির হিরো। বাস্তবেও যে কারো এরকম অ্যাটিটিউড থাকতে পারে সেটা উদয় ভাইকে না দেখলে বুঝতামই না।"

তখনই রুপাতার পাশে এসে দাঁড়িয়ে, আলতো করে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

রুপা: "কিরে,,পাগলের মত একা একা কি বিড়বিড় করছিস? আমাকেও বল আমিও একটু শুনি।"

ইরা মুখ ফসকে বলে ফেলল,

ইরা: "আচ্ছা আপু, এটা কি সত্যিই তোমার ভাই উদয় ?নাকি কোন তামিল মুভির হিরো?"

হুস ফিরতেই ইরা তাড়াতাড়ি করে নিজের মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরল। কিন্তু এখন মুখ চেপে ধরেই কি লাভ যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে। ইরার কথা শুনে রুপার মুখে দুষ্ট হাসির রেখা দেখা দিল।

ইরা তখনই সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল। ইরার দৃষ্টি নিচের দিকে থাকায় সে খেয়াল করেনি উদয় সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। কয়েক সিঁড়ি উঠতেই ইরা হঠাৎ উদয়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়তে নেই ঐ মুহূর্তেই উদয় ইরার কোমর চেপে ধরে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচায়। উদয়ের দৃষ্টি ইরার দিকে স্থির, ইরার লজ্জা এবার দেখে কে। লজ্জায় তার ইচ্ছে করছে মাটি দুই দিক ফাঁক করে তার ভেতরে ঢুকে যেতে।

সিয়াম:" আরে ভূতরানি দেখা যায় দৌড়াতেও পারে। তো এখন ভূতরানি কে আবার কোন ভূতে ধাক্কা মারলো যে একবারে আমার ভাই এর কোলে গিয়ে পড়লে।"

সিয়ামের কথা শুনে দুজন দুদিকে সরে গেলো।

উদয়: "ভূতরানি মানে?? এই তোমার কি আর ভালো নাম নেই?? আর কে তুমি আসার পর থেকে তোমাকে দেখছি কিন্তু এখন পর্যন্ত জানতেই পারলাম না তোমার পরিচয়"

তখনই লুৎফা বেগম রান্না ঘর থেকে ছুটে আসেন আর সাথে সাথে উদয়ের কথার উত্তর করেন,

লুৎফা: "আরে বাপ এই মেয়েকে তুই এখনও চিনতে পারিসনি এই তো তোর সেই সাত বছর আগে বিয়ে করা বউ, যাকে রেখে তুই বিদেশ চলে গেছিলি, যার জন্যে এতটা দিন তুই তোর পরিবার থেকে দূরে ছিলি।"

লুৎফা বেগমের কথাটা যেনো উদয়ের কানে বজ্রপাতের মতো আঘাত করলো। ইরা তো কিছুই বুঝতে পারছে না , এই মহিলা তাকে উদয় ভাই এর বউ বলছে কেনো। ইরা জানে লুৎফা বেগম তাকে সহ্য করতে পারে না কিন্তু কি কারণে পারে না সেটা সে বুঝতে পারে না। ইরা সচারচর এই বাড়িতে আসে না, মাঝে মধ্যে ফুপ্পি আর রুপা আপুর জোরাজুরি তে আসলেও এক দিনের বেশি থাকে না এইবারই তার নানুর অসুস্থতার জন্যে এতোদিন যাবৎ আছে।

উদয়ের চোখ লাল হয়ে গেছে। উদয়ের দিকে ইরার চোখ যেতেই সে ভয় পেয়ে গেলো। সে মনে মনে বিড়বিড় করলো,

ইরা :"এই লোকের চোখ এই রকম দেখাচ্ছে কেনো? কিছুক্ষন আগেও তো ঠিক ছিল। তাহলে কি তাকে তার বউ বলার জন্যে এতো রেগে গেলো।"

উদয় হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে ইরাকে চেপে ধরে বলল,

উদয়: "তোকে এই বাড়িতে কে আসতে বলেছে? ওহ আমি এসেছি বলে আমাকে জ্বালাতে এসেছিস? আমাকে শান্তিতে তো তুই দেখতে পারিস না।"

লতিফা চৌধুরী রাগী গলায় বলল,

লতিফা:"কি হচ্ছে কি উদয়, ও ব্যথা পাচ্ছে ওকে ছাড়ো। আর লুৎফা তোর কি আগুনে ঘি ঢালা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই, তুই কি ভালো হবি না।"

লুৎফা:" আমি যা বলেছি সব সত্যি বলেছি আম্মা। এতে খারাপের কি আছে।"

উদয়ের সে দিকে খেয়াল নেই, সে রক্ত লাল চোখে এক দৃষ্টিতে ইরার দিকে তাকিয়ে আছে। এখানে কি হচ্ছে সে কিছুই বুঝতে পারছেনা। আর কিসের সত্যির কথা বলল লুৎফা আন্টি।

উদয় দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

উদয়:"যতো দিন এই বাড়িতে আছিস ততোদিন আমার সামনে যেনো তোকে না দেখি, মাইন্ড ইট"

বলেই উদয় আবার বেরিয়ে যেতো নিলো তখন রোকেয়া বেগম সামনে দাঁড়িয়ে মিনতির সুরে বলল,

রোকেয়া: "কোথায় যাচ্ছিস তুই, কেবলই তো ফিরলি। প্লীজ বাবা আমাকে তোরা আর কষ্ট দিস না, তোর কাছে আমি হাত জোড় করে বলছি তুই সব মেনেনে ।"

উদয়: "সরি আম্মু, তুমি আর যাই করতে বলো প্লীজ এই কাজটা করতে বলো না, আমি পারবো না। আর হ্যাঁ আমি এখন আর বাইরের কারো জন্যে তোমাকে কষ্ট দিবো না। চলে আসবো, চিন্তা করো না"

রোকেয়া:"অন্তত বলে তো যাহ কোথায় যাচ্ছিস"

উদয়:"বাইক রাইডে, একটু হাওয়া দরকার। নাহলে এখানে স্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাবো আমি।"

উদয় বাইকের হেলমেটটা মাথায় চাপিয়ে বেরিয়ে গেল। এখানে আর কিছুক্ষন থাকলে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে, যেটা সে চাই না। সে ইরাকে যতোই না মানুক কিন্তু সে তাকে কষ্ট দিবে না, এটা তার দ্বারা সম্ভব না।।

--

বাইরে অন্ধকার নেমেছে, হালকা হাওয়া বইছে। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগেই ভেতরে ভেতরে এক অদৃশ্য ঝড় বইতে শুরু করলো তার মধ্যে।

"কেন আবার চোখের সামনে এলো ও? সাত বছর… ঠিক সাত বছর ধরে আমি ভুলে যেতে চেয়েছি সবকিছু। আজ আবার কেন মনে করিয়ে দিলো ভাগ্য? ওকে দেখলেই বুকের ভেতর আগুনের সঙ্গে অদ্ভুত এক শূন্যতা জেগে ওঠে। আমি রাগ করি, ঝড় তুলি—কিন্তু আসলে কাকে দোষ দিচ্ছি? ওকে… নাকি নিজেকেই?

আজও যখন ওর চোখের ভয় দেখলাম, আমার হাত কেঁপে উঠেছিল। তবুও ছেড়ে দিতে পারিনি। কেনো? কেন আমি বারবার ওর কাছেই থেমে যাই? কিন্তু… আমি কি সত্যিই ওকে ঘৃণা করি? যদি ঘৃণাই করি, তবে কেন এতটা কষ্ট পাই যখন ও কাঁদে? কেন বুক ফেটে যায় যখন মনে হয় আমি ওকে আঘাত করেছি?

না, আমাকে ভাঙা যাবে না। আমি দুর্বল হবো না। ও যদি সামনে আসে, আমি দূরে সরে যাবো… কারণ আমি জানি, আবার একবার ভেঙে গেলে আমি আর দাঁড়াতে পারবো না।"

হঠাৎ বাইকের হর্ন বাজলো, চমকে উঠলো উদয়। মনোলগ থেমে গেলো। হেলমেট পরে বাইক চালিয়ে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো সে—যেনো নিজের ভেতরের অস্থিরতা থেকে পালাচ্ছে।

উদয় বেরিয়ে যেতেই ইরার ফোনে লন্ডন থেকে কল আসলো। শাহেদ চৌধুরী জানালেন কামরুল হকের অবস্থা আবার শোচনীয় পর্যায়ে চলে গেছে, ডাক্তাররা বলছেন এখন সব কিছু আল্লাহর হাতে, আল্লাহ্ যদি চাই তাহলে তিনি সুস্থ হবেন না হলে তাদের আর কিছু করার নেই। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বললেন।

এই কথা শুনতেই ইরার হাত থেকে ফোনটি পড়ে গেল এবং ইরা জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল।

--

চলবে..???

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন