ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমায় না চিনেও চেনা

৭ম পর্ব

লেখক: এইশাত রাদিয়া

গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা

লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত রাদিয়া)

পর্ব:৭

মিটমিট করে চোখ খুললো ইরা। সে নিজেকে আবিষ্কার করল রূপার ঘরে। আস্তে আস্তে মনে করতে থাকলো ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। তার মনে পড়ে গেল তার প্রতি উদয়ের ঘৃণা। কি কারণে উদয় তাকে এতটা ঘৃণা করছে সে বুঝতে পারছে না, এবং লুৎফা বেগম কেন তাকে উদয় ভাইয়ের বউ বলছে। তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। এইসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সে ছুটে গেল রোকেয়া চৌধুরীর ঘরে। সেখানে গিয়ে দেখল রোকেয়া চৌধুরী নেই। তারপর সে রান্নাঘরে গেল। এখনো মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে।

রান্নাঘরে রোকেয়া বেগম রাতের রান্নার জন্য সবকিছু জোগাড় করছিল। তিনি ইরাকে দেখে বললেন ,

রোকেয়া: "কিরে মা, তুই এতো কষ্ট করে উঠে এলি কেনো, আমাকে ডাকলে আমিই যেতাম। এখন শরীর কেমন লাগছে??"

ইরা: "তখন লুৎফা আন্টি আমাকে উদয় ভাইয়ের বউ বলছিলো কেনো ফুপ্পি? আর উদয় ভাইই কেনো আমার সাথে এমন ব্যবহার করলো? কেনো আমাকে তার সামনে যেতে মানা করলো? প্লীজ বলো ফুপ্পি।"

রোকেয়া বেগম কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে গেলো। চেহারায় আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে রোকেয়া বেগম বললেন,

রোকেয়া: "লুৎফা তখন কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলেছে, ওর কথায় তুই কিছু মনে করিস না মা। আর উদয় তো এমনিতেই একটু বদমেজাজি। কখন কি করে কিছুই জানে না। তাই তখন কার না কার রাগ তর উপর ঝেরেছে। তুই ওসব নিয়ে এত চিন্তা করিস না। তুই টেবিলে গিয়ে বস আমি তোর খাবার নিয়ে আসছি।"

রোকেয়া বেগম খাবার বাড়ার জন্য পা বাড়াতেই ইরা তার হাত টেনে ধরলো আর কান্না করতে করতে বলল,

ইরা: "আমার থেকে কি লুকাচ্ছো ফুপ্পি? প্লীজ আমাকে সত্যিটা বলো, দোহাই লাগে প্লীজ সত্যিটা বলো।"

রোকেয়া বেগম আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি এবার ইরার হাত টানতে টানতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকলেন। তখনই রুপা নিচে নামছিল। রোকেয়া বেগম আর ইরাকে এইভাবে যেতে দেখে প্রশ্ন করলো,

রুপা: কি হয়েছে আম্মু? ইরাকে এইভাবে টানতে টানতে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?

কিন্তু কেউই তার প্রশ্নের উত্তর করলো না, তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। রুপা কিছু বুঝতে না পেরে সেও তাদের পিছু পিছু ছুটলো।

--

উদয়ের বাইক এসে থামলো একটা বড়ো দুতলা বাড়ির সামনে। দোতলার বাড়িটা রাস্তার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সময়ের কাছে হেরে যাওয়া এক স্মৃতি। বাইরের দেয়ালের সাদা রং মলিন হয়ে ধূসর হয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা জমে সবুজ দাগ তৈরি করেছে। লোহার গেটটা মরিচা ধরে লালচে হয়ে গেছে, দেখেই বুঝা যাচ্ছে খোলা বা বন্ধের সময় কড়মড় শব্দ করবে। বাড়ির চারপাশে বনো গাছপালা আর আগাছা জমে উঠেছে। জানালার কাচ কিছু কিছু জায়গায় ভেঙে গেছে আবার কিছু জানালা আধাঁ খোলা।পুরো বাড়িটা এক অদ্ভুত নীরবতায় ভরা—যেনো বহু বছর ধরে কারো ফেরার অপেক্ষায় বসে আছে, অথচ কেউ আর ফেরেনি।

উদয় বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বাইকে হেলান দিয়ে এক এক করে অতীতের ঘটনা গুলো মনে করতে লাগলো।

--

রোকেয়া বেগম ইরাকে টানতে টানতে ছাদে নিয়ে আসলো। রুপাও এসে ইরার পাশে দাঁড়ালো।

রোকেয়া:" শুনতে চাস কি হয়েছিল? কেন তোকে উদয় এতটা ঘৃণা করে? কেন লুৎফা তোকে উদয়ের বউ বললো তখন?"

ইরা: "হ্যাঁ শুনতে চাই, আমি এবার এই জাল থেকে বেরোতে চাই।"

রোকেয়া: "তাহলে শোন.."

রোকেয়া বেগম বলতে শুরু করলেন ইরার অজানা অতীত,

' ঘটনা শুরু হয় শিকদার বাড়ি থেকে। তখন বাড়ির দেওয়াল গুলো ছিল উজ্জ্বল ।জানালার কাচ ঝকঝক করতো, বারান্দায় ঝোলানো ফুলের টবগুলোতে রঙিন ফুল ফুটে থাকতো। আর তার মাঝেই ছোট্ট ইরা যেনো বাড়িটার প্রাণ ছিল—তার খিলখিল হাসি, ছোট ছোট পায়ের শব্দ পুরো বাড়িটাকে জীবন্ত করে রাখতো। বাড়ির প্রতিটি ঘর যেন ইরার হাসিতে মুখর ছিল।ছোট্ট ইরা, বয়স তখন মাত্র এগারো, আগামী দশ দিন পর বারোতে পা রাখবে। সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করে বেড়াতো। ইরার বাবা ইকবাল শিকদার ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী আর ইরার মা নাছিমা শিকদার ছিলেন একজন দক্ষ আইনজীবী। শিকদার বাড়িতে চৌধুরী বাড়ির সবার ভালোই যাতায়াত ছিলো। শাহেদ চৌধুরী ইকবাল শিকদার এর বোন জামাই এর পাশাপাশি বিজনেস পার্টনারও ছিলেন।

তখন উদয়ের বসয় ছিলো ঊনিশ বছর।উদয় সময় পেলে প্রায় সকালেই শিকদার বাড়িতে চলে আসতো শুধু তার জানপাখিকে একটা নজর দেখার জন্য। ইরাকে স্কুলে দিয়ে আসতে আবার নিয়ে আসতে তার খুব ভালো লাগতো। উদয়ের অবস্থা এমন ছিলো যে সে সারাদিন না খেয়ে থাকতে পারবে কিন্তু ইরাকে একদিন না দেখে থাকতে পারবে না। ইরার অবস্থা প্রায় একই রকম। ছুটির দিনে সে চৌধুরী বাড়িতে চলে আসতো। অসুস্থ হলে তার উদয় ভাইকে চাই, কোথাও ঘুরতে যাওয়ার হলে তার উদয় ভাইকে চাই। সে সুযোগ পেলেই নাছিমা বেগমের মোবাইল দিয়ে উদয় কে কল দিয়ে আসতে বলতো, উদয়ও তখন শত ব্যস্ততার মাঝে ছুটে আসতো। তাদের এইরকম অবস্থা দেখে শাহেদ চৌধুরীই ইকবাল শিকদার এর কাছে তাদের বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন। ইকবাল সাহেবও রাজি হয়ে গেলেন। রাজি না হওয়ায় কোনো কারণও ছিল না, উদয় প্রখর মেধাবী সম্পন্ন ছেলে ছিলো আর তিনি উদয়ের চোখে ইরার জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা দেখেছেন আর সবচেয়ে বড় কথা হলো ইরারও উদয়কে পছন্দ। দুই পরিবার মিলে ঠিক করলেন দুজনের ইসলামিক শরীয়তে বিয়ে সম্পন্ন করে রাখবেন যেনো তাদের দেখা করা, কথা বলা, সবটায় হালাল হয়। ইরা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হবে তখন না হয় ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করে রেজিস্ট্রি করবে।

এই প্রস্তাবে সবাই রাজি হয়ে গেলো।

এই খবর শুনে উদয়ের তো রীতিমত নাচতে ইচ্ছে করছে। তার জানপাখি একেবারে তার হয়ে যাবে। উদয় এর মধ্যে ঠিকও করে ফেলল বিয়ের পর ইরা কে সে কি নামে ডাকবে (বেটারহাফ)। কিন্তু তার আগে তার জানপাখির মতামত নেওয়া দরকার। সে যদিও জানে এই খবর শুনলে তার জানপাখি খুশিতে পাগল হয়ে যাবে। তবুও একবার জিজ্ঞেস করা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ, সে তখনই বেড়িয়ে পরলো শিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে।

উদয় যা ভেবেছিলো তাই হলো। ইরা খুশিতে কি করবে বুঝতে পারছে না, সে একপর্যায়ে উদয়কে জড়িয়ে ধরলো। উদয়ের সমস্ত শরীর কেমন যেন কেঁপে উঠল, তার মনে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেলো। কিন্তু এইসব ইরার বোধগম্য হলো না। আর হবেই বা কেমন করে, ইরার তো এখনো ওই বয়স হয়নি, সবকিছু পুরোপুরি বুঝতে শিখেনি। উদয় আর সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে ইরাকে ছাড়িয়ে ' আসছি ' বলো চলে গেলো। আগামী দুই দিন পর তাদের বিয়ে দিন ঠিক করা হলো।

--

বহু অপেক্ষিত দিন আজকে, এই দিনটির জন্য উদয় অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছে। অবশেষে কাজী সাহেব পবিত্র কালিমার মাধ্যমে তাদের দুজনকে এক করে দিলেন। এই মুহূর্ত থেকে শুরু হলো তাদের জীবনের এক নতুম অধ্যায়।

এক সপ্তাহ পরে ইরার বারো তম জন্মদিন। সবাই মিলে ঠিক করলেন ওই দিনেই সবার সামনে ইরা আর উদয়ের সম্পর্কটা জানিয়ে দেওয়া হবে যেচৌধুরী বংশের উত্তরাধিকারী আর শিকদার বংশের উত্তরাধিকারিনী এখন থেকে এক সূত্রে গাঁথা।

--

আজকে ইরার জন্মদিন। আজ পুরো শিকদার বাড়ি রঙিন আলোয় ঝলমল করছে। এক এক করে সকল অথিতি আসতে শুরু করলো। এক পর্যায়ে চৌধুরী বাড়ির সবাই চলে এলো, লুৎফা খান সহ তার স্বামী, হাসান, সিয়াম সবাই উপস্থিত ছিলো কিন্তু উদয়ের এখনও কোনো খবর নেই। এইদিকে কেক কাটারও সময় হয়ে গেছে কিন্তু ইরা উদয়কে ছাড়া কেক কাটছিল না। তখনই উদয় সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো। সে কালো একটা শার্ট ইন করে কালো পেন্টের সাথে পড়েছে। দেখেতে পুরাই চকলেট বয় লাগছে। ইরাও কালো গাউন পরেছে। উদয় ইরাকে দেখে চোখে সরাতে পারছে না, ঠিক যেনো সদ্য ফোটা কালো গোলাপের মতো লাগছে। উদয়ের হাতে একটা আংটির বক্স। এটার জন্যই এত দেরি হলো আসতে। এই আংটিটি সে তাঁর টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে কিনেছে। সে চাই না অন্যের টাকা দিয়ে কিনা গিফট তার জানপাখিকে দিতে, তাই তো এত পরিশ্রম।

কেক কাটা শেষে অনুষ্ঠান যখন শেষ পর্যায়ে তখন ইকবাল খান ঘোষণা দিলেন ইরা প্রাপ্তবয়স্ক হলে ইরার বিয়ে দিবেন খান বংশের বড়ো ছেলে সাজ্জাদুল খান হাসান এর সাথে ।

উদয় এর মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। চৌধুরী বাড়ির সবাই হতবাক, কারও মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। ইরার জন্য এত কষ্ট করে আনা আংটির বক্সটি হাত থেকে নিচে পরে গেলো। উদয়ের চোখ লাল হয়ে গেছে, পানি টলমল করেছে। সে ভাঙা গলায় ইকবাল খানকে বলল,

উদয়:" মামা.. তোমার মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে"

ইকবাল:"আমার কোনো ভুল হচ্ছে না উদয় যা সঠিক আমি তাই বলছি "

উদয় এর চোখ কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে,

উদয়: "মামি দেখো না মামা কি বলছে। আমার আর ইরার তো বিয়ে হয়ে গেছে বলো।"

নাছিমা:" কিসের বিয়ের কথা বলছো? কোনো প্রমাণ আছে বিয়ের আর যেই বিয়েই হয়নি তার প্রমাণ আসবে কোথা থেকে "

উদয় উন্মাদের মত ইরার কাছে গিয়ে দুহাত দিয়ে ইরা কে চেপে ধরে শক্ত গলায় প্রশ্ন করল,

উদয়: "তোর মা বাবা পাগল হয়ে গেছে ইরা, তোকে আর আমি এই বাড়িতে রাখবো না, চল আমার সাথে.."

উদয় ইরার হাত ধরে সামনের দিকে যাওয়ার জন্য টান দিল কিন্তু ইরাকে নড়তে না দেখে সে পেছন ঘুরে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। দেখলো ইরা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।

এইবার যেনো উদয়ের সবকিছু উলট-পালট হয়ে গেলো।

সে মিনতির সুরে বলল,

উদয়: "কিরে যাবি না তুই তোর উদয় ভাইয়ের সাথে? তুই তো বলেছিলো কোনোদিন আমার কথার অবাধ্য হবি না, তাহলে আজ কেনো হচ্ছিস জানপাখি?"

--

চলবে..??

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন