গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা
লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া )
পর্ব:৮
ইরা: "আমার হাত ছাড়ুন উদয় ভাই।"
ইরার কথা শুনে চৌধুরী বাড়ির সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সবার পরিবর্তন মানলেও কেউ যেনো ইরার পরিবর্তন মানতে পারছে না। উদয় কিছু একটা ভেবে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো, বলল,
উদয়: "তোকে শেষবারের মতো একটা কথা বলি বেবি, I love you জানবাচ্ছা। তুই আমার জন্য হালাল এবং সারাজীবন হালালই থাকবি। এইটা তুইও জানিস আমিও জানি। তোকে আমি কখনো ছাড়বো না। তুই আমার ছিলি, আমার আছিস, আমারই থাকবি। তুই আমার থেকে মুক্তি চাইলেও আমার মৃত্যুর আগে তা পাবি না। আর আজকের পর থেকে তুই আমাকে কোথাও খুঁজে পাবি না আর আমার মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটা তোর জন্য হারাম হয়ে গেলো বেটারহাফ ।"
কথা শেষ করেই হ্যাঁচকা টান দিয়ে ইরাকে তার কাছে নিয়ে কপালে ভালোবাসার পরশ ছুঁইয়ে দিলো। তারপর আচমকা ধাক্কা দিয়ে ইরাকে ফ্লোরে ফেলে দিলো।
চলে যেতে যেতে বলল,
উদয়:" বায় বেটারহাফ।"
রোকেয়া চৌধরী দৌঁড়ে গেলেন ছেলেকে আটকাতে কিন্তু তার আগেই উদয় বেড়িয়ে যায়। শাহেদ চৌধুরী ক্ষিপ্ত মেজাজে ইকবাল শিকদার এর সামনে গিয়ে বললেন,
শাহেদ: "ছিঃ ইকবাল ছিঃ। তুমি আমার সম্মান নিয়ে এইভাবে খেলা করতে পারলে। আজ থেকে তোমার সাথে আমি সকল সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।"
ইকবাল শিকদার বাকহারা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
রোকেয়া: "ভাইজান আপনি আমার ছেলেকে এইভাবে কষ্ট দিলেন কেন? আপনি তো বলতেন আপনার ছেলে নেই উদয়ই আপনার ছেলে, তাহলে কেনো এত কষ্ট দিলেন।"
কাদতে কাদতে বললেন রোকেয়া চৌধুরী।
রোকেয়া: "ইরা তুইও তোর উদয় ভাইকে কষ্ট দিলি। তোর একটুও বুক কাপলো না? ভালো থাকতে পারবি তো আমার ছেলেকে কষ্ট দিয়ে।"
শাহেদ: "আর কোনো কথা নয় রোকেয়া। চলো এই বাড়ি থেকে। এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও না।"
এই বলেই শাহেদ চৌধুরী বেরিয়ে গেলেন। তার পেছন পেছন চৌধুরী বাড়ির সবাই বেরিয়ে গেলেন। রোকেয়া চৌধুরী ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মনে হচ্ছে কিছু তো গণ্ডগোল আছে। সে তার ভাই ভাবিকে ভালো করেই চিনে। তারা অকারণে এইরকম একটা সিদ্ধান্ত নিবে না। উনি যেই প্রশ্ন করতে নিবেন ওই সময়ই পেছন থেকে লুৎফা বেগম বলে উঠে,
লুৎফা: "কি গো ভাবী, ভাইজান কি বলল শুনতে পেলেন না। এখনও এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন?"
না চাইতেও রোকেয়া চৌধুরীকে চলে যেতে হলো। বাইরে আসতেই শাহেদ চৌধুরী বলল,
শাহেদ :"তোমরা সবাই চলে যাও আমার একটু কাজ আছে,আমি একটু পর ফিরছি।"
সবাই গাড়িতে উঠে চলে গেল।
--
ওইদিন রাতেই খবর এলো ইরার নানার বাড়ির যাওয়ার পথেই ইরাদের গাড়ির একসিডেন্ট হয়েছে। সামনে ছিলো বিধায় ইকবাল শিকদার ঐখানেই প্রাণ হারায় আর নাছিমা বেগমকে হাসপাতালে নিতে নিতে মারা যায়। মুহুর্তের মধ্যেই ফুলের মতো মেয়েটা এতিম হয়ে গেলো। ওই গাড়ীতে ইরাও ছিলো। সে পিছনে থাকার কারণে শরীরে বেশি আঘাত পায়নি কিন্তু মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে। আল্লাহ্ যেনো ইরাকে নিজ হাতে বাঁচিয়েছেন।
কিন্তু আফসোস জ্ঞান ফিরার পর থেকে মেয়েটা কাউকেই চিনতে পারছে না। তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় ইরাকে চৌধুরী বাড়িতে রাখবেন, ইরার যেহেতু কিছু মনে নেই তাই তার আপত্তিও থাকার কথা না। ইসলামিক শরীয়ত মতে এখনও ইরা চৌধুরী বাড়ির পুত্রবধূ। কিন্তু ইরার নানা কামরুল হক বাঁধা দেয়। তিনি বলেন যতো দিন না তার নাতনীর সব মনে পড়ছে ততোদিন সে তার কাছেই থাকবে এবং ইরাকে এই বিষয়ে কিছুই জানাবে না।
--
উদয় ইরার জন্মদিনের দিন থেকে নেটওয়ার্কের বাইরে। সে শিকদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা তার গ্রামের এক বন্ধুর বাড়িতে চলে এসেছে। তাই এই এক্সিডেন্ট এর বিষয়ে সে অজ্ঞাত। তার আগে থেকেই ভিসার জন্যে অ্যাপ্লাই করা ছিলো। কিছু দিনের মধ্যেই সে বিদেশে পারি জমায়। এই দিকে না জেনে রেখে যাই এক বাবা মা হারা এতিম অসুস্থ বউকে।
বিদেশে গিয়ে সে এক বছরের মতো কারো সাথে যোগাযোগ করেনি। শাহেদ চৌধুরী পাগলের মতো তাঁকে খুঁজেছে। তারপর সেই বন্ধুর কাছে জেনেছে উদয় বিদেশ চলে গেছে। প্রায় এক বছর পর সে যখন বাড়িতে যোগাযোগ করলো তখন ইরার কথা উঠতেই সে ফোন কেটে দিয়ে আরও এক মাস ফোন বন্ধ করে রাখল। এই ভাবেই যখন ইরার কথা উঠতো তখনই এক মাসের জন্য ফোন বন্ধ করে রাখতো। তাই কেউ আর ইরার কথা বলতো না। কিন্তু একদিন রোকেয়া চৌধুরী বললেন তুই যদি আরেকদিন ইরার কথা শোনা মাত্রই কল কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে দিস তাহলে আমি আর তোর সাথে কথা বলবো না।
কিন্তু উদয় তখনই কল কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে দিল। এরপর থেকে রোকেয়া চৌধুরী উদয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল। কোন কিছু দরকার হলে সিয়ামের মাধ্যমে বলে দিত আর খোঁজ খবর নিতো । উদয় বাড়িতে যোগাযোগ করার ৬ মাস পরেই সিয়াম কেও উদয়ের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।'
--
বর্তমান,
রোকেয়া চৌধুরী অতীতের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এলেন। সব কথা শুনে ইরার মাথাটা কেমন যেন ভনভন করে ঘুরতে লাগলো। সে বিশ্বাস করতে পারছে না তার সাথে এমন কিছু ঘটেছে। সে তো জানতো তার বাবা-মা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে, কিন্তু উদয়ের ব্যাপারে সে অজ্ঞাত ছিল। চার দিক থেকে এত চাপ কি করে সামলাবে ইরা। কি কারণে সে আর তার বাবা মা উদয় এর সাথে বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও ওই দিন এমন করলো। কি হয়েছিল তাদের সাথে? আর ওইদিনই কেনো তাদের নানু বাড়িতে যেতে হলো।
ইরা আর কিছু ভাবতে পারছে না তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে লাগলো।
উদয় বাইক হেলান দিয়ে তার আর ইরার সুন্দর মুহূর্ত গুলো মনে করছিল তখনই উদয়ের ফোন একটা ভিডিও আসে কামরুল হক এর নাম্বার থেকে। উদয় ভিডিওটি ওপেন করতেই ওর মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে। এক মুহুর্তে তার সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়।
চলবে..?