গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা
লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত রাদিয়া)
#পর্ব:৯
উদয় ভিডিওটি প্লে করতেই মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো কামরুল হকের মুখ। সাদা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন তিনি। মাথায় পুরু ব্যান্ডেজ বাঁধা, গায়ে স্যালাইনের পাইপ, অক্সিজেন মাস্ক পাশে ঝুলছে। দুর্বল চোখ দুটি কেমন যেনো ফ্যাকাশে, কিন্তু সেই চোখেই মিশে আছে ইরার জন্য অশেষ ভালোবাসা আর মায়া।
উদয়ের বুক কেঁপে উঠলো। এ অবস্থায় কামরুল হককে সে কল্পনাও করতে পারেনি। বিদেশ থেকে ফেরার পর সে সিলেট চলে গিয়েছিলো ব্যবসার কাজে, তাই এই ঘটনাগুলো তার অজানাই থেকে গিয়েছিল। মোবাইলের স্ক্রিনে কম্পমান কণ্ঠে কামরুল হক বলতে শুরু করলেন—
কামরুল:" উদয় আমি শুনলাম তুমি নাকি দেশে ফিরেছো। ইরার ওপর তোমার অভিমানের কারণ আমি জানি। কিন্তু এতে ইরার কোন দোষ নেই। তুমি হয়তো জানো না যে এসিডেন্ট এ ইরার বাবা মা মারা গিয়েছিলো ওই রাতেই আর ইরাও আগের সব কিছু ভুলে গেছে। এই সাত বছর ইরা আমার কাছেই ছিলো। এতোদিন আমি তোমার এবং ইরার বাবা মার আমানত যত্ম করে রেখেছিলাম। এখন তোমার পালা। আমি জানি আমার হাতে বেশিদিন সময় নেয়। যেকোনো সময় আল্লাহ্ তায়ালার ডাক আসতে পারে। তাই আমি তোমার আমানত তোমার কাছে দিয়ে গেলাম। আমি মারা গেলে হয়তো এই দুনিয়াতে তুমি ছাড়া ইরার আপন কেউ থাকবে না। তাই তুমি এতিম মেয়েটার খেয়াল রেখো।
যাই হোক এখন আসল কথায় আসি, যেদিন আমার একসিডেন্ট হয় সেদিন বিকেলে আমি তোমাদের অফিসে যায় তোমার বাবার সাথে কথা বলতে। সেখান থেকে আমি জানতে পারি তুমি নাকি দেশে আসবে অফিসের কাজে আর এই খবর তোমার সেক্রেটারী লতিফা চৌধুরী কে দিয়েছেন। ওইদিন উনিও অফিসেই ছিলেন। তোমার আসার খবর পেয়ে আমি চিন্তা করি এবার ইরাকে সব জানিয়ে দেওয়া দরকার। আমি আগে ভেবেছিলাম ইরার যেদিন সব নিজে থেকে মনে পড়বে সেদিন যা হওয়ার হবে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই সাত বছরে ওর আগের কোনো কথায় মনে পড়েনি।"
কামরুল হক একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর আবার বলা শুরু করলেন,
কামরুল:
'ওইদিন সন্ধ্যায় ইরার বাবা ইকবাল সিকদার ড্রয়িং রুমে জন্মদিনের পার্টির আয়োজন করতে ব্যাস্ত। ওই সময় নাছিমা বেগম দৌঁড়ে এসে ফোনে একটা ভিডিও দেখিয়ে কাদতে কাদতে বললেন,
নাছিমা: "দেখো না ইরার বাবা এই লোকটা কি বলছে। আমি রান্না করতেছিলাম তখনই ভিডিওটা আসে। দেখো তুমি কি বলছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।"
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন লোক মিলে কামরুল হকের গলায় ছুরি ধরে আছে। সবার মুখে মাস্ক পড়া। ওদের মধ্যে একটি লোক এগিয়ে এসে ক্যামেরার সামনে বলছে,
"মিস্টার ইকবাল শিকদার, আপনি যদি আপনার শ্বশুরকে বাঁচাতে চান তাহলে আপনার মেয়ের বিয়ে চৌধুরী বাড়িতে দেওয়ার চিন্তা মাথা থেকে বের করে ফেলেন। আজকে সন্ধ্যার পার্টিতে ঘোষণা দিবেন যে আপনার মেয়ের বিয়ে হবে অন্য কারো সাথে, সেখানে আপনি যার ইচ্ছা তার নাম বলতে পারেন কিন্তু ভুলেও উদয় চৌধুরীর নাম মুখে আনা যাবে না"
লোকটা কিছুক্ষণ ভেবে আবার বলা শুরু করলো,
"আচ্ছা উদয় চৌধুরীর নামের জায়গায় আপনি কার নাম বলবেন? ওহ হ্যাঁ আপনি হাসান খানের নাম বলতে পারেন। হ্যাঁ হ্যাঁ ওইটায় ঠিক হবে। আর কেউ যেনো বুঝতে না পারে যে আপনারা অভিনয় করছেন। আর আপনার মেয়ের মুখটাও একটু বন্ধ রাখতে বলবেন নয়তো আপনার শ্বশুর শেষ।"
লোকটা বীভৎস একটা হাসি দিয়ে ক্যামেরাটা অফ করে দিলেন। ইকবাল সিকদার ভেবে পাচ্ছেন না এমন কাজ কে করবে। ইরাও ঐখানেই ছিলো। ইরা বললো,
ইরা: "আব্বু-আম্মুওই লোকটা যা বলছে তাই করো, আমি কাওকে কিচ্ছু বলবো না আর উদয় ভাই এবং ফুপ্পিদের না হয় পরে সব বুঝিয়ে বলবে।"
এইটুকু একটা মেয়ের মুখে এইরকম বুঝদারের মতো কথা শুনে নাছিমা বেগম ইরাকে জড়িয়ে ধরলেন।
কিডন্যাপাররা যা যা করতে বললেন উনারা তাই তাই করলেন। তারা পার্টি শেষে বেড়িয়ে পড়লেন কামরুল হকের উদ্দেশ্যে। কিন্তু তাঁদের গাড়ীর ব্রেক ফেইল হয়ে যায় তারপর মাঝ রাস্তায় গাড়িটার নির্মম ভাবে এক্সিডেন্ট হয়। তাঁরা জানতেও পারে না তাঁদের সাথে কে এবং কারা এইরকম করলো। কেনো তাদের একমাত্র ফুলটার জীবন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিলো।'
কামরুল হক অতীতের সব কাহিনী বলে শেষ করে শেষে আর একটা কথা বলেন,
কামরুল: "উদয় এখন তুমিই ঠিক করো ইরার সাথে কি করা উচিৎ । এতিম ফুলটাকে তুমি ছুড়ে ফেলে দিবে নাকি সযত্নে সাজিয়ে রাখবে। সবটা তোমার উপর নির্ভর করছে। আর তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে যে কে তোমার আর ইরার জীবন থেকে সাতটা বছর কেড়ে নিলো। আশা করছি তুমি আমাকে নিরাশ করবে না। ইকবাল আর নাছিমা খুব ভরসা করে তাদের প্রাণ ভুমরাকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছিল।
আমার আর কিছু বলার নেই উদয় শুধু আমার ইরাকে একটু দেখে রেখো আর আমি মারা গেলে ইরা যেনো ভেঙে না পরে সেই দিকে খেয়াল রেখো। আমার নাতনীটাকে আর কষ্ট দিও না।"
শেষের কথাটা বলে কামরুল হোক কান্না করে দিলো। ভিডিও টি শেষ হয়ে গেলো।
উদয় দুই হাত দিয়ে তার মাথা চেপে ধরলো আর গগন ফাটানো চিৎকার করলো। সে আফসোস করতে থাকলো কেনো এতোদিন সে তার মায়ের কথা শুনলো না । শুনলে অন্তত এতোদিন ইরাকে সে কষ্ট পেতে দিতো না।
উদয় কিছু একটা ভেবে ফোন স্ক্রল করে একটা ব্লক করা নাম্বার খুঁজে বের করলো। এইটা সেই নাম্বার যেটাতে উদয় ট্রুথ ডেয়ার খেলার সময় কল দিয়ে ছিল। ওই দিন সে কণ্ঠ শুনেই চিনতে পেরেছিল এটাই তার প্রিয়সী। কিন্তু সে রাগ ঝাড়তে ওইদিন অনেক উল্টা পাল্টা কথা বলে দেই। সে জানতো এই নাম্বারটা কামরুল হকের কিন্তু কলটা যে ইরা ধরবে সে বুঝতে পারেনি।
উদয় কিছু একটা ভেবে মুচকী হাসলো আর ফিসফিস করে বললো,
উদয়: "দেখ জানবাচ্ছা ভাগ্য আমাকে আর তোকে এক জায়গায় এনে দার করিয়েছে। আমি কখনো তোকে ঘৃণা করিনি আর না করতে পারবো। আমি যে তোকে বড্ড বেশি ভালোবাসিরে বেটারহাফ। আমি আসছি তোর কাছে বেটারহাফ আমি আসছি।"
উদয় বাইকে বসে স্পিড বাড়িয়ে বাইক চালাতে লাগলো। উদয় আজ খুব খুশি। এতো দিন পর আজকে সে তার জানবাচ্ছাকে জড়িয়ে ধরবে। এসব ভাবতে ভাবতে অন্ধকারে হরিয়ে গেলো বাইকটা ।
--
এখন সময় প্রায় রাত নয়টার কাছকাছি,
ইরা গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। ইরা এতো চাপ একসাথে নিতে না পেরে আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তারপর ডাক্তার এসে কিছু ওষুধ লিখে দেয় এবং ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে যায়।
উদয় তড়িঘড়ি করে বাড়িতে ঢুকলো। রোকেয়া চৌধুরী ছেলেকে এভাবে আসতে দেখে একটু অবাক হলেন। কিন্তু কিছু বলার আগেই উদয় ধবধব পা ফেলে উপরে চলে গেলো।
উদয় রূপার রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। যেই দরজায় ধাক্কা দিতে যাবে ওই সময়ই পেছন থেকে কারো গলার স্বর শুনা গেল।
--
চলবে..?