গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা
লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া)
#পর্ব:১২
উদয়:"ভেতরে আসুন কাজী সাহেব। আর উকিল কোথায় সিয়াম?"
সিয়াম:"রাস্তায় আছে, পাঁচ মিনিট এর মধ্যে চলে আসবে।"
ইরা:"কি হচ্ছে এখানে? আপনার এখানে এসেছেন কেনো কাজী সাহেব"
উদয়:"আর একটু সবুর করো জান। জানো তো, সবুরে মেওয়া ফলে।"
রোকেয়া:"তুই ঠিক কি করতে চাইছিস উদয়?"
উদয়:"বিয়ে"
এতক্ষণে রুপা আর নিশিও উপরে চলে এসেছে। তারা গিয়ে ইরার পাশে দাঁড়ালো।
রোকেয়া:"তুই কার অনুমতি নিয়ে বিয়ে করবি। আর যাকে বিয়ে করবি সে কি তোকে মানতে রাজি।"
শেষ কথাটা রোকেয়া চৌধুরী ইরার দিকে তাঁকিয়ে বললেন।
উদয়:"এখানে রাজি না হওয়ায় কি আছে আম্মু। যে সাত বছর ধরে ইসলামিক শরীয়ত মতে আমার বউ, তাহলে দ্বিতীয় বার বিয়ে করতে সমস্যা কি? আর আমার নানুভাই এর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়ে গেছে।"
আওয়াজ শুনে লতিফা চৌধুরী ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন। লুৎফা বেগম ও উদয়ের রুমে উপস্থিত হলেন।
লতিফা:"দুই দিন পর পর কি শুরু করেছ তুমি উদয়। কাল মেয়েটাকে এমন ভাবে কথা শুনালে আর আজ এসবের মানে কি।"
উদয়:"মানে কিছুই না দাদু। আমাদের বিয়ের বিষয়টা শুধু সবাইকে জানাবো আর কাগজে কলমে আমার বউ কে আমার করে নিবো।"
লুৎফা বেগম কেমন যেনো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো।
লুৎফা:"কি বলছিস কি উদয়, তোর কি মাথা ঠিক আছে? এই মেয়েটা তোকে সাত বছর আগে কত অপমান করেছে ভুলে গেছিস তুই। শুধু তো তোকে নয় আমাদের সবাইকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিল ওই বাড়ি থেকে। তবুও তুই এই মেয়েকে.."
গর্জে উঠে লতিফা বেগম,
লতিফা:"চুপ কর লুৎফা। সবসময় এক লাইন বেশি বুঝিস কেনো? তোর কি আগুনে ঘি ঢালা ছাড়া আর কোন কাজ নেই। এখন আমার মনে হচ্ছে আমি দুধ কলা দিয়ে এতোদিন কাল সাপ পুষেছি।"
লুৎফা:"আম্মা তুমি আমাকে এইভাবে বলতে পারলে বাইরের এত্তো লোকের সামনে। তুমি এই বাইরের মেয়ের জন্য আমাকে...."
কথা শেষ করার আগেই উদয় রাগী গলায় বলল,
উদয়:"ও বাইরের লোক নয় ফুপু। ও হচ্ছে এই চৌধুরী বাড়ির একমাত্র বউ। এই উদয়ের বউ। এর পর থেকে ভেবে চিন্তে কথা বলবে ওর সাথে, সম্মান দিয়ে কথা বলবে। নয়তো আমার চাইতে খারাপ কেউ হবে না।"
লুৎফা:"এই মেয়ে এই বাড়িতে অশান্তি সৃষ্টি করবে, আমাদের কাউকে ভালো থাকতে দিবে না। আমার কথা তোরা সবাই মিলিয়ে নিস।"
লুৎফা বেগম কাদতে কাদতে বেড়িয়ে গেলেন। এর মধ্যে উকিল ও এসে গেছে। লতিফা চৌধুরী ইরার কাছে গিয়ে নরম গলায় শুধালো,
লতিফা:"এই বিয়েতে তোমার কোনো অমত নেই তো ইরা? তুমি না চাইলে কিন্তু এই বিয়ে আমি হতে দিবো না। তুমি নির্ভয়ে তোমার মতামত জানাতে পারো।
ইরা:"এইখানে আমার মত থাকার বা না থাকার কিছু নেই দাদু। আমার বাবা মা যখন উদয় ভাইকে পছন্দ করে তার হাতে আমাকে তুলে দিয়েছিল, তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।"
উদয় বাদে সবাই সবাই উচ্চস্বরে বলে উঠলো,
"আলহামদুলিল্লাহ"
কাজী সাহেব বিয়ে পড়ানো শেষ করলেন। উকিল রেজিস্টার পেপারে সাইন নিয়ে চলে গেলেন। তার নাকি আর একটা বিয়ে আছে। রোকেয়া বেগম মিষ্টি এনে সবাইকে দিলেন।
বিয়ে পড়ানোর সময় শাহেদ চৌধুরী আর কামরুল হক ভিডিও কলে ছিলেন। শাহেদ চৌধুরী জানিয়ে দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরেই বড়ো অনুষ্ঠান করবেন।
রুপা এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলো, যে যার মতো কথা বলছিলো। সিয়াম এই ফাঁকে রুপার পাশে এসে দাঁড়ায়। কনুই দিয়ে রূপাকে আলতো করে একটা ধাক্কা দেয়।
সিয়াম: "কি ময়নাপাখি, চলোনা আমারও এইবার বিয়েটা করে ফেলি। আমার তো আর তোর সইছে না।"
রুপা:"যাও তো এখান থেকে। কেউ দেখে নিলে সমস্যা হবে।"
সিয়াম:"কেউ কিছু বললে বলব আমাদেরও বিয়ে করিয়ে দিতে। তারপর আমাদের আর ভাইয়াদের বিয়ের অনুষ্ঠান একসাথে করতে। ভেবে দেখেছো, যদি একসাথে অনুষ্ঠান করি তাহলে কতো টাকা বেঁচে যাবে।"
রুপা:"কিপ্টে একটা, আমি এইরকম কিপটে ছেলেকে বিয়ে করবো না।"
সিয়াম:"বললেই হলো নাকি। দরকার পড়লে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করব। তবুও তোমাকেই করবো।"
রুপা এবার লজ্জা পেয়ে, একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে ইরার পাশে এসে বসলো। রুপা ইরাকে বলল,
রুপা:" কিরে, তোকে এখন থেকে কি ডাকবো। তুই করে তো এখন থেকে আর ডাকা যাবে না। আফটারল তুই আমার বড়ো ভাইয়ার বউ "
ইরা:"তো কি হয়েছে। আমাকে আগে যেভাবে ডাকতে ওইভাবেই ডাকবে।"
রুপা:"ঠিক আছে ঠিক আছে।"
রোকেয়া বেগম সবাইকে খেতে ডাকলেন। সবাই খাওয়া শেষ করে ঘুমোতে চলে গেলো কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো ইরাকে নিয়ে। সে উদয়ের রুমে ঘুমোবে না। আর উদয় ইরাকে ছাড়া রুমে যাবে না। তার এক কথা "বিয়ে করেছি কি বউ কে বোনের ঘরে ঘুমানোর জন্য"
রোকেয়া বেগম উদয়কে বুঝানোর সুরে বললেন,
রোকেয়া: "দেখ বাবা, মেয়েটার তো আগের কিছুই মনে নেই। তবুও তোকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে এই বেশি। এখন এতো জেদ করিস না তুই। ওকে একটু মানিয়ে নিতে দে। দেখবি আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর বউ তো আর পালিয়ে যাচ্ছে নাহ্।"
উদয়:"কিন্তু আম্মু.."
ঠাস করে দরজায় লাগানোর শব্দে কথা শেষ করার আগেই উদয় পেছনে ঘুরে তাকালো। দেখলো এর মধ্যে ইরা ভেতর থেকে দরজা আটকিয়ে দিয়েছে। উদয় রাগে,
উদয়:"দেখেছো আম্মু দেখেছো। তোমার অবুঝ, অবলা মেয়ের কাজ। কি সুন্দর বুদ্ধি খাটিয়ে আমার হাত থেকে বেঁচে গেলো। যাবেই বা কোথায়, সকালে ওর হচ্ছে "
এই বলেই উদয় বড়ো বড়ো পা ফেলে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো। রোকেয়া বেগম কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে মুচকি হাসলো, তারপর তিনিও রুমে চলে গেলেন।
--
সকাল আটটা,
ইরা ছাদে রাখা চেয়ারে বসে আছে, সাথে নিশিও আছে। কাল নিশিকে যেতে দেয়নি ইরা। নীরবতা ভেঙে নিশি বলল,
নিশি: "আচ্ছা একটা কথা বলত ইরা। তুই কি শুধু আন্টি আংকেলের কথা রাখতেই উদয় ভাইকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিস।"
ইরা:"হুম, তবে আর একটা কারণ আছে।"
নিশি:"আমি জানতাম,কি কারণ বলতো "
ইরা:"আমি তো প্রথম দেখায়েই উদয় ভাই এর উপরে ক্রাশ খেয়ে গেছিলাম "
নিশি:"বলিস কি"
ইরা:"হুম, এখনো মনে পড়লে শরীরে কেমন একটা ঝাকুনি দিয়ে। কি হ্যান্ডসাম, কি হেয়ার স্টাইল উফফ।"
নিশি:"যাই বলিস ইরা, এই বাড়ির মানুষগুলো কেমন যেনো অদ্ভুত আর কিছু মানুষ তো রোবট।"
ইরা:"কার কথা বলছিস তুই "
নিশি:"আমি চিনি নাকি, কাল নিজে ধাক্কা দিলো কিন্তু কিছু না বলেই রোবটের মতো চলে গেলো।"
ইরা:"এই বাড়িতে এইরকম মানুষ একটায় আছে, হাসান ভাইয়া "
নিশি:"সে যেই হোক, মালটা কিন্তু হেব্বি।"
পেছন থেকে গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
হাসান:"এই মেয়ে কিসে পড় তুমি? তোমার মুখের ভাষা এমন কেনো? মনে হচ্ছে রাস্তার গুণ্ডা।"
নিশি মনে মনে বিড়বিড় করলো,
নিশি:"এই রে, শুনে ফেললো নাকি লোকটা, যে তাকে নিয়েই কথা হচ্ছিলো।"
ইরা:"আসলে ভাইয়া ও আমার ফ্রেন্ড। একটু মজা করছিল আর কি, এমনিতে অনেক ভালো "
হাসান:"ওকে বলে দিও, এমনিতে ভালো থাকার চেয়ে সবার কাছে ভালো থাকাটা জরুরি।"
নিশি এবার জোড়ালো কণ্ঠে বললো,
নিশি:"আপনাকে এতো জ্ঞান দিতে হবে না মিস্টার রোবোট।"
হাসান:"রোবোট মানে... এই মেয়ে ভদ্র হয়ে চলতে পারো না, খালি বেয়াবদি। ইরা তোমাকে দেখে তো বুঝা যায় না এই অভদ্র মেয়েটা তোমার বান্ধবী।"
নিশি:"থাক তুই তোর শ্বশুর বাড়ি নিয়ে, আমি গেলাম। যত্তসব অদ্ভুত লোকজন।"
ইরা:"আরে নিশি শোন।"
ইরা নিশিকে মানাতে তার পেছন পেছন ছুটলো। হাসান ফোনে মনোযোগ দিলো।
আজকে সকালে উদয়ের কাছে সিলেট থেকে ফোন এসেছে। আজকেই নাকি তাকে সিলেট যেতে হবে।
উদয়:"ধুর, কালকেই বিয়ে করলাম মাত্র, এখনো পর্যন্ত বউকে ছুঁতেই পারলাম না আর এখনি বউ ছেড়ে চলে যেতে হবে। ভালো লাগে না আর। মনে হচ্ছে এই ব্যবসা এবার ছেড়েই দিতে হবে নয়তো বউ আমার হাত ছাড়া হয়ে যাবে।"
বলতে বলতে উদয় রেডি হচ্ছে।
সকালে নাস্তা করেই উদয় বেরিয়ে পড়েছে সিলেটের উদ্দেশ্যে। নাস্তার টেবিলে ইরাকে দেখেনি। ডাকারও সুযোগ হয়নি, ফোনের উপর ফোন আসছে। তাই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়তে হলো। গাড়ি চলছে নিজ গতিতে।
--
ইরা লুৎফা বেগমের ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেলো লুৎফা বেগম ফোনে কারো সাথে বলছে,
লুৎফা:"ওই মেয়ে তো শেষমেশ এই বাড়ির বউ হয়েই গেলো। সব সম্পত্তি আমাদের হাত ছাড়া হয়ে গেলো। এতো কিছু করেও কোনো লাভ হলো না।"
ইরার বুক কেঁপে উঠলো। এতো কিছু করেছে মানে। তাহলে কি সব কিছু লুৎফা বেগমই করেছে সম্পত্তির লোভে?
--
চলবে..?