গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা
লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া)
#পর্ব:১৩
ইরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে লুৎফা বেগমের ঘরের সামনে
দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে মোবাইলের ওপারে লুৎফার কণ্ঠ যেন ক্রমশ ধারালো হয়ে উঠছে।
লুৎফা বেগম:
"তোমাকে বলেছিলাম না, মেয়েটাকে এই বাড়িতে ফিরতে দেওয়া যাবে না। সাত বছর আগে যেমন সব শেষ করেছিলাম, তেমনিভাবেই এবারও ওকে তাড়াতে হবে। কিন্তু ওই উদয়ের একগুয়েমি আর শাহেদের সমর্থন সব গণ্ডগোল পাকিয়ে দিল। সব সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে…এতোদিন ধরে করে আসা পরিকল্পনা এখন এক ধাক্কায় এভাবে কষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। যা করার আমাদের খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে।"
ইরা ভয়ে-চমকে যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। সাত বছর আগে যা ঘটেছিল— তার বাবা-মা’র এক্সিডেন্ট, কামরুল হককে কিডন্যাপ, সবকিছুর পেছনে কি লুৎফা বেগমের হাত?
মুহূর্তেই দরজার কপাটে হালকা শব্দ হলো। ইরা ভয় পেয়ে সরে গেল, কিন্তু লুৎফা বেগমের চোখে পড়ে গেল তার ছায়া।
লুৎফা:
"কে ওখানে?"
ইরা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল। বুক ধড়ফড় করছে, মুখ শুকিয়ে কাঠ।
---
নিচে এসে দেখলো রোকেয়া বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত, রুপা বসে ফোন ঘাঁটছে। কাউকেই কিছু বলতে পারল না।রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চেয়ারে বসে পড়লো। মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। চেয়ারে হেলান দিয়ে ইরা ভাবতে লাগলো,
ইরা:"আমি তাহলে ভুল ভেবেছিলাম? তার মানে এই ঘটনার পেছনে আমার বাবার শত্রুর কোনো হাত নেই। সব কিছু করেছে লুৎফা আন্টি। এক্সিডেন্ট হওয়া, নানুভাই এর কিডন্যাপ হওয়া, সবকিছু করিয়েছে এই মহিলা কিন্তু এতকিছু করার কারণটা কি? কি চাই এ মহিলা?"
সে আর কিছু ভাবতে পারলো না।
তার বুকের ভেতর ঝড় বইতে লাগল। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো ছোট ছোট কিছু স্মৃতি— যেগুলো এতদিন ঝাপসা ছিল। বাবার কণ্ঠ, মায়ের চোখের জল, আর একটা গাড়ির ভয়ঙ্কর হর্নের শব্দ…
--
উদয় কেবল অফিসের কাজ সেরে হোটেলের রুমে আসলো। এসেই শাওয়ার নিতে চলে গেল, লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বের হল। বউটার কথা খুব মনে পড়ছে। এখন একটা কল না দিলেই নয়। সারাদিন কথা হয়নি, সকালে আসার সময় দেখাও হয়নি। তাই ফোনটা বের করে সেই নাম্বারটা খুঁজে বের করল। তারপর সেটাতে কল লাগালো।
ইরা চেয়ারে বসে ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে বুঝতে পারেনি। ফোনের শব্দে তার ঘুম ভাঙলো। ঘুম ঘুম চোখে নাম্বার না দেখেই কল রিসিভ করে ফোন কানে ধরলো। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
ইরা:"হ্যালো..কে বলছেন?"
উদয়:" উফফ, কি শান্তি। সারাদিনের ক্লান্তি এখানেই শেষ।"(বুকে হাত দিয়ে)
ইরার ভ্রু কুঁচকে এলো। সে কান থেকে ফোন নামিয়ে নাম্বার চেক করলো। নাম্বার দেখে তার চোখ কপালে। এটা সেই বেয়াদব ছেলেটা না, যে তাকে উল্টাপাল্টা কথা শুনিয়েছিল অকারনে। সে এই নাম্বারটা সেভ করে রেখেছে বেয়াদব ছেলে দিয়ে। সে ভেবেছিল পরে কোন সময়, সময় করে ফোন দিয়ে উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে। কিন্তু তার মনেই ছিলো না। আজকে আবার বেয়াদবি শুরু করেছে। এখন কিছু বললে উল্টো রাগ দেখাবে, পাগল লোক। ইরা রাগান্বিত স্বরে বলল,
ইরা: "আপনি আবার কল দিয়েছেন? আপনার কি লজ্জা সরম নেই? আপনি এতো বেয়াদব কেনো? অসভ্য লোক কোথাকার।"
উদয় বুঝতে পারলো ইরা তাকে চিনতে পারেনি। ওই দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এসব বলছে। উদয়ের ঠোঁটে কেমন দুষ্ট হাসির ঝলক দেখা দিলো। ঠোঁট কামড়ে উদয় বলল,
উদয়:"তোমাকে কল দিবো না তো কাকে কল দিবো। তুমিহীন আমি যে অচল।"
ইরা:"আপনার আবোল তাবোল কথা রাখুন তো। কে আপনি? পরিচয় দেন। ওহ ওইদিন তো বড়ো মুখ করে বললেন আপনি ওয়াসিফ চৌধুরী। তা আপনার বাসা কোথায় বলেন তো। আমার হাসব্যান্ড ও কিন্তু চৌধুরী।"
শেষের কথাটা ইরা একটু ভাব নিয়ে বলল। উদয় তো ইরার কথা শুনে পুরাই টাস্কি খেয়ে গেলো। এই মেয়ে বলে কি, তাকে হাসব্যান্ড বলছে, আবার সামনে আসতে চাই না। মনে মনে ঠিকই দিল্লীকা লাড্ডু খেয়ে বসে আছে। আর উদয়ই যে ওয়াসিফ এইটা মনে হয় ইরা জানে না, তাই এইটা বলছে।উদয় যেনো এবার আরও মজা পেলো । সে গলা খাকরি দিয়ে একটু দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে বলল,
উদয়:"তোমার বিয়ে হয়ে গেছে? আর ইউ ম্যারিড?"
ইরা:"ইয়েস, আই অ্যাম ম্যারিড। আপনি আমাকে আর ডিস্টার্ব করবে না, নাহলে আমার জামাই কে বলে আপনাকে উত্তম মধ্যম দেওয়াবো। আমার জামাই কিন্তু পুরাই তামিল মুভির হিরো।"
ইরার কথা শুনে উদয়ের এবার কাশি উঠে গেলো। উদয়ের কাশি শুনে ইরা বলল,
ইরা:"কি হলো আমার জামাই এর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলেন নাকি?"
উদয় নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
উদয়:"এই ওয়াসিফ চৌধুরী কাউকে ভয় পায় না মিসেস চৌধুরী।"
ইরা:"আপনি কি করে জানলেন আমি মিসেস চৌধুরী?"
উদয়:"আপনিই তো বললেন আপনার জামাই নাকি চৌধুরী। আমাদের পদবি যখন এক তাহলে আপনি কিন্তু আমাকেও আপনার জামাই মনে করে কথা বলতে পারেন। আমি অবশ্য কিছু মনে করবো না।"
ইরা:"আমি কিন্তু এবার সত্যি সত্যি আমার হাসব্যান্ডকে জানিয়ে দিবো। আর আপনাকে আমি কেনই বা আমার জামাই মনে করতে যাব। আমার জামাই তো পুরাই চকলেট বয়। আপনি তো তার ধারের কাছেও না।"
উদয় মনে মনে বেশ খুশী হলো। খুশিতে তার নাচতে ইচ্ছে করছে। ইরা আবার বলল,
ইরা:"দেখেন ভাই, আপনি আর আমাকে কল দিবেন না। গতকালই আমার বিয়ে হয়েছে, আর আমি বিয়ের পরদিন থেকেই পরকীয়া করতে চায় না। আমি আমার হাজবেন্ডের প্রতি লয়াল। তাই দয়া করে আমাকে ডিস্টার্ব করা বন্ধ করুন,বাই।"
বলেই ইরা কল কেটে দিলো। উদয় খুশীতে সাউন্ড বক্সে ' মনটা করে আর উড়ু উড়ু ' গান ছেড়ে উড়াধুরা নাচতে লাগলো। ওই সময় হোটেলের স্টাফ খাবার নিয়ে আসলো। উদয়কে এভাবে পাগলের মতো নাচতে দেখে আহাম্মকের মতো হা করে তাকিয়ে রইল। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না । তিনি যতো বার উদয়কে দেখেছেন ততোবার গম্ভীর মুখে দেখেছেন। অবশ্য বাইরের কেউ উদয়কে এই রুপে দেখলে বিশ্বাসই করবে না। তাদের মতে উদয় খুব গুরু গম্ভীর একজন ব্যাক্তি, যিনি কাজ ছাড়া কিছুই বুঝে না। নাচতে নাচতে উদয়ের চোখ যখন স্টাফ এর উপরে পরে, তখনই উদয় তাড়াতাড়ি করে নিজেকে স্বাভাবিক করে গান বন্ধ করে দেয়। স্টাফকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
উদয়:"খাবারটা টেবিলে রেখে যান।"
স্টাফ খাবার রেখে চলে যায়।
--
এখন রাত ১১:০০ টা,
ইরা শুয়ে শুয়ে লুৎফা বেগম এর কথা ভাবছে। আর পাশে রুপা ফোন স্ক্রল করছে। হঠাৎ রুমের দরজায় কেউ যেনো নক্ করছে। তারা দুজনে দুজনের মুখের দিকে তাকায়, এতো রাতে কে আসবে? সবাই তো শুয়ে পড়েছে।
রুপা উঠে দরজা খুলে। দরজার দিকে তাকিয়ে এক চিৎকার দিয়ে দৌঁড়ে বিছানায় উঠে ইরাকে জড়িয়ে ধরে। দরজার বাইরে সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে কালো চাদর, চাদর সারা শরীর ঢাকা। যে কেউ অন্ধকারে দেখে ভূত মনে করবে। সে তাড়াতাড়ি করে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। গা থেকে চাদর সরিয়ে রুমের লাইট অন করে। সিয়াম বলে,
সিয়াম:" আমাকে ভূত মনে করে শেষে কিনা ভূতরানীর পেছনে গিয়ে লুকালে ময়নাপাখি।"
রুপা স্বাভাবিক হয়ে, রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
রুপা:"তুমি এতো রাতে এখানে কি করছো।"
সিয়াম কিছু বলতে যাবে ওই সময়ই বাইরে থেকে রোকেয়া বেগম এর কণ্ঠস্বর শোনা যায়,
রোকেয়া:"কি হয়েছে, এভাবে চিৎকার করলি কেনো রুপা? দরজা খোল।"
সিয়াম, রুপা, ইরা, তিনজনই তিনজনের মূখ চাওয়া চাওয়ি করে। এবার কি হবে। সিয়ামকে যদি তাদের রুমে দেখে নেয় তাহলে তো সব শেষ। তারা ভাবতে ভাবতে আবার বাইরে থেকে রোকেয়া বেগম এর গলা ভেসে এলো,
রোকেয়া:"কিরে, দরজা খোল।"
এবার মনে হয় সব শেষ।
--
চলবে..?