ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমায় না চিনেও চেনা

১৪তম পর্ব

লেখক: এইশাত রাদিয়া

গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা

লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া)

#পর্ব :১৪

রোকেয়া বেগম দরজা ধাক্কাতে লাগলেন আর ডাকতে লাগলেন। এইদিকে তো ভয়ে তাদের ঘাম ছুটে যাওয়ার অবস্থা। রুপা সিয়াম এর দিকে তাঁকিয়ে রাগী গলায় বলল,

রুপা:"তুমি এতো রাতে কি আমাকে কেস খাওয়াতে এসেছো? এইখানে এভাবে হাবলার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে কিছু একটা ভাবো।"

সিয়াম:"আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তুমি গিয়ে দরজা খুলবে আর আমি দরজার পেছনে লুকিয়ে থাকবো, মামনি যেই রুমে ঢুকবে আমি ওমনি বেরিয়ে যাবো রুম থেকে।"

সিয়ামের কথা শুনে রুপা রাগে তার বাহুতে চর মেরে দিলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

রুপা:"আরে ছাগল, আম্মু কি তোমার মতো গাধা নাকি যে তার পেছন দিয়ে কেউ বেরিয়ে যাবে আর সে টের পাবে না।"

সিয়াম:"তাহলে কি করবো।"

এদিকে রোকেয়া বেগমের দরজা ধাক্কানোর বেগ বাড়তে লাগলো। এইভাবে আর কিছুক্ষন ডাকাডাকি করলে বাড়ির সবাই চলে আসবে। রুপা ভয়ে কাঁপতে লাগলো। সে অসহায় মুখ করে ইরার দিকে তাকালো। বুঝালো এখন শেষ ভরসা ইরা। ইরা কিছু একটা ভেবে বলল,

ইরা:"আমি যা বলছি তাই করো, এতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বাকিটা আমি সামলে নিচ্ছি।"

রুপা:"কি করবি তুই?'

ইরা:"ভাইয়া আপনি গিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ুন, বাকিটা আমি দেখেছি। আর কোনো কথা না বলে তাড়াতাড়ি যান।"

রুপা তাড়াতাড়ি করে সিয়ামকে খাটের নিচে ঢুকিয়ে দিলো। সিয়াম রাগে দুঃখে গজগজ করতে করতে বিড়বিড় করল,

সিয়াম:"বালের প্রেম করি আমি। এক বাড়িতে থাকি,কই একটু বেশি রোম্যান্স করবো তা না । যখনই কিছু করতে যায় আল্লাহর গজব এসে পড়ে আমার উপর। এই জীবনের কোনো মানে হয়।"

ইরা গিয়ে দরজা খুলে দিলো। দরজা খোলার সাথে সাথে রোকেয়া বেগম হন্তদন্ত পায়ে ভেতরে ঢুকলেন। পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তারপর ঘুরে ইরার দিকে তাকালেন। ইরা রোকেয়া বেগমের এরকম দৃষ্টি দেখে বোকা বোকা হাসলো। রোকেয়া বেগম ধমকের সুরে বললেন,

রোকেয়া:"কিরে রুমে বসে কি করছিলি? দরজা খুলতে এতো দেরি হলো কেনো? আর এতো রাতে এভাবে চিৎকার করলি কেনো?"

ইরা:"আসলে হয়েছে কি ফুপ্পি, আমরা না কানে ইয়ারফোন দিয়ে হরর মুভি দেখছিলাম। সেটা দেখে ভয় পেয়েই রুপা আপু চিৎকার দিয়েছে। জানো কি ভয়ঙ্কর ছিলো আত্মাটা। দাঁড়াও তোমাকে দেখায়।"

রোকেয়া:"থাক থাক ওইরকম সাঁজানো জোকার আমাকে দেখাতে হবে না। তোদের চিৎকারে আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।"

ইরা :"ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, এখন তুমি যাও ফুপ্পি, আমরা ঘুমাবো।"

রোকেয়া:"আচ্ছা ঠিক আছে। আর ওইসব আজেবাজে জিনিস দেখিস না, ঘুমা।"

রোকেয়া বেগম যাওয়ার জন্যে পা বাড়াতেই কি ভেবে যেনো থেমে গেলেন। নাক উঁচু করে কিসের যেনো গন্ধ নিলেন। তারপর সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করলেন,

রোকেয়া:"এটা কিসের গন্ধ। মনে হচ্ছে ছেলেদের পারফিউম এর। তোরা তো কেউ পারফিউম ব্যবহার করিস না, তাহলে?"

এবার ইরা একটু থতমত খেয়ে যায়। কি বলবে সব গুলিয়ে ফেলবে। ওইদিকে সিয়াম এর অবস্থা খুব খারাপ। একে তো এই গরমের মধ্যে খাটের নিচে শুয়ে আছে, নড়তেও পারছে না তার উপর আবার মশার কামড়। বেচারা নড়তেও পারছে না আবার সহ্যও করতে পারছে না। এবার মনে হয় কান্না করে দিবে এই মশার কামড়ের জ্বালায়।

রোকেয়া:"কিরে কথা বলছিস না কেন। আর রুপা তুই এভাবে কাপছিস কেনো। ঘরে কি কেউ এসেছিলো।"

রোকেয়া বেগম উত্তরের আশা না করে বারন্দায় গিয়ে উঁকিঝুঁকি মারে। নাহ্ সেখানে তো কেঁউ নেই। তারপর পর্দা তুলে দেখে। এখানেও কেউ নেই। আলমারির পেছনেও চেক করে। এখানেও খালি। রুপার আত্মার পানি শুকিয়ে গেছে মনে হচ্ছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আর মনে মনে বিড়বিড় করছে,

রুপা:"ওই সিয়াম এর বাচ্চার জন্য আজকে আমার কুরবানি ঈদ ছাড়ায় কুরবানি হয়ে যাবে। হে আল্লাহ, আমার যদি কোরবানি হয় তাহলে আমার ওই সিয়াম এর উপর দাবি থাকবে। আমি হাশরের ময়দানে ওর নেকি নিয়ে জান্নাতে যেতে চাই। এটায় আমার শেষ ইচ্ছা।"

রুপা সব আশা ছেড়ে দিয়েছে। সিয়াম এর ও আর কোনো আশা নেই। সে ঠিক করেছে এবার নিজে থেকেই বেরিয়ে আসবে। যা হবে পরে দেখা যাবে।

রোকেয়া বেগম যেই খাটের তলায় দেখতে যাবেন ওমনি পেছন থেকে ইরা চিৎকার করে ওঠে। কান্নার ভান করে বলতে থাকে,

ইরা:"ছিহ্ শাশুড়ি আম্মা ছিহ্। আপনি আমাকে এতো বড়ো অপবাদ দিতে পারলেন। গতকাল আমার বিয়ে হলো আর আজকেই আপনি ফুপ্পির খুলোস ছেড়ে শাশুড়ির খুলোস পড়ে নিলেন। এই দুঃখ আমি কোথায় রাখবো।"

ইরা সিনেমার নায়িকাদের মতো কপাল চাপড়াতে লাগলো। ইরার অভিনয় দেখে রুপার চোখ কপালে উঠে গেছে, তার ভয় উড়ে পালিয়ে গেছে। এই মেয়ে যে এইরকম অভিনয় করতে পারে সে ভাবতেই পারছে না।

রোকেয়া বেগম ইরার কাছে এসে অধৈর্য গলায় বললেন,

রোকেয়া:"আরে আমি আবার কি করলাম, আমি তো শুধু..."

তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ইরা বলল,

ইরা:"থাক আর কিছু বলতে হবে না। শখ করে একটু উদয় ভাই এর পারফিউম মেখে এসেছিলাম। তাতেই তুমি আমাকে এতো বড়ো অববাদ দিয়ে দিলে ফুপ্পি প্লাস শ্বাশুড়ি আম্মা।"

রোকেয়া:"এটা উদয়ের পারফিউম। আচ্ছা থাক থাক আর কান্না করতে হবে না। আমার ভুল হয়েছে আর এসব উল্টাপাল্টা ডাক ডাকতে হবে না। নে এবার ঘুমিয়ে পড়।"

ইরা:"হ্যাঁ হ্যাঁ যাও। আমি এখন তোমার ছেলের সাথে ভিডিও কলে কথা বলবো। আর ছেলের কণ্ঠ শুনে যদি আমাকে আবার ডিস্টার্ব করো তাহলে আমি কিন্তু তোমার ছেলেকে বলে দিবো। তখন কি হবে বুঝতে পারছ।"

রোকেয়া:"আচ্ছা যাচ্ছি। কিন্তু রুপা এভাবে ভয় পেয়ে আছে কেনো?"

ইরা:"ঐযে ভূতের মুভি দেখেছিল। সেই ভয়ই এখনও কাটেনি।"

রোকেয়া:"আচ্ছা দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পর। আর ওইসব দেখে চিৎকার চেঁচামেচি করিস না।"

রোকেয়া বেগম চলে গেলেন। ইরা তাড়াতাড়ি দরজা লাগিয়ে দিল। রুপা সিয়ামকে খাটের নিচ থেকে বের করলো। বেচারার সারা শরীর লাল লাল হয়ে গেছে মশার কামড়ে। রুপা আবেগে সিয়ামকে জড়িয়ে ধরতে গেল কিন্তু পরমুহূর্তেই তার ইরার কথা মাথায় এলো। তাই আর এগোলো না। সিয়াম ঠিকই রুপার হাবভাব ধরে ফেললো। ইরাও একটু অস্বস্থি বোধ করছিল তাদের মধ্যে থেকে। সিয়াম ইরাকে বলল,

সিয়াম:"ইরা তুমি কিন্তু একটা কাজ করতে পারো।"

ইরা:"কি কাজ ভাইয়া"

সিয়াম :"উদয় কিন্তু বাড়িতে নেই। এই সুযোগে তুমি কিন্তু ওর রুমটা ঘুরে আসতে পারো।"

ইরা:"কিন্তু উনার রুমে তো পাসওয়ার্ড দেওয়া"

সিয়াম:"তার মানে তুমি যাবে। ওয়েট আমি তোমাকে পাসওয়ার্ড দিচ্ছি।"

সিয়াম ইরাকে পাসওয়ার্ড দিয়ে উদয়ের রুমে পাঠিয়ে দিলো। ইরাও এই সুযোগ হাত ছাড়া করলো না। সিয়াম কিছু একটা ভেবে উদয়কে টেক্সট দিলো,

' ব্রো, তুই তোর রুমের ক্যামেরাটা একবার চেক কর। তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। আর সারপ্রাইজ দেখে খুশি হয়ে আমাকে থ্যাঙ্ক ইউ বলতে হবে না। এখন আমি একটা জরুরী কাজ করছি। '

--

এতো রাতে সিয়ামের টেক্সট দেখে উদয়ের ভ্রু কুঁচকে গেলো। সে সিয়ামের কথা মতো ক্যামেরা চেক করলো। তার রুমে যে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে সেটা সিয়াম ছাড়া আর কেউ জানে না। ক্যামেরাতে ইরাকে দেখেই উদয়ের বুকের মধ্যে যেনো কেমন চিন চিন ব্যথা শুরু হলো। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না। তার মনের কোথাও একটা গান বাজছে,

' জীবনে প্রথম তুমি, শেষ ভালোবাসা__

তোমাকে নিয়ে আমার কতো শত আশা_'

ইরা রুমে ঢুকেই প্রাণ ভরে ঘ্রাণ নিলো। যেনো খুব পরিচিত একটা ঘ্রাণ। সেই ঘ্রানেই সে উদয়কে খুঁজে নিলো। কিছু একটা ভেবে সে কাভার্ড এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কাভার্ড খুলে একটা ব্ল্যাক কালার এর ট্রাউজার আর টিশার্ট নিয়ে নাচতে নাচতে ওয়াসরুমে চলে গেলো।

উদয় তো টাস্কি খেয়ে বসে আছে ইরার এই কান্ড দেখে। তার বউ কিনা তার অগচরে টিশার্ট আর ট্রাউজার চুরি করছে। যাক ভালোই হয়েছে, এতে করে বউ কে তো একটু খুলা মেলা দেখা যাবে।

ইরা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বিছানায় হাত পা ছুড়ে দিয়ে আরাম করে শুয়ে পড়লো। টিশার্টটা ইরার ওভার সাইজ হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে এর মধ্যে দিয়ে তার মতো আর একটা ইরা ঢুকে যাবে অনায়াসে। ট্রাউজার টা তার পা থেকে আরও এক হাত লম্বা। ইরাকে এই অবস্থায় দেখে উদয় শুনকো একটা ঢোক গিললো। তারপর টেবিলে রাখা জগ থেকে ঢক ঢক করে আধা জগ পানি খেলো। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নিলো।

ইরা এর মধ্যে ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। উদয় ইরাকে দেখতে দেখতে সাউন্ড বক্সে গান ছাড়লো,

« পাগল হয়ে আছি,

তোরই কারণ,

সাথে করে এনেছি ,

নে এই মন ,

তোর হাসির ছল,

তোর চুলের দল ,

আমাকে কেড়ে নেয়,

তোর চোখের ঝিল,জানি,

পেরোনো মুশকিল, মানি,

তাও পারিনা যে এগিয়ে গিয়েছে ,

আমারই দুটো পা,

তোকে একার দেখার লুকিয়ে কি মজা

সে তো আমি ছাড়া কেউ জানে না,

তোকে চাওয়ারা পাওয়ারা নয় রে সোজা,

সে তো আমি ছাড়া কেউ জানে না »

উদয় গান শুনছে আর ইরাকে মনে ভরে দেখছে। মনে হচ্ছে কতদিনের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে সে। এইভাবে থাকতে থাকতে উদয় শেষ রাতের দিকে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়।

সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন আর ইরাকে সে দেখতে পায় না। তারপর আবার সেই কাজের চাপ। এইদিকে ইরাও কলেজে যাচ্ছে। এখন ইরা হিজাব পড়ে কলেজে যায়। এভাবেই চলছে দিন।

--

দেখতে দেখতে পাঁচ দিন কেটে গেছে। আজকে শুক্রবার, রুপা ইরাকে নিয়ে আজ শপিংমলে যাবে। সাথে অবশ্য সিয়াম থাকবে। তারা শপিং মলে গিয়ে একটা দোকানে ঢুকলো। সেখান থেকে রুপা জামা পছন্দ করছে। সে ইরাকেও বলেছে নিতে কিন্তু ইরা জানিয়েছে তার এখন এসবের দরকার নেই, যখন প্রয়োজন হবে তখন কিনে নিবে।

ইরা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বোর হচ্ছিলো তাই দোকানের থাই গ্লাসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। রাস্তায় ঢাকা শহরের খুব পরিচিত জ্যাম বেঁধে আছে। ইরা সেদিকে আনমনে তাকিয়ে ছিলো। কিন্তু হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় একটি মহিলার দিকে। মহিলাটিকে খুব চেনা চেনা লাগছে। হ্যাঁ, এটাতো লুৎফা বেগম, এখানে কি করছে। ইরা খুব ভালো করে লক্ষ্য করতে থাকে।

লুৎফা বেগম আর একটি মহিলার সাথে কথা বলছিলো। কিন্তু ইরার দিক থেকে সেই মহিলার মুখ দেখা যাচ্ছিলো না। তাদের কথা বলার ভাব দেখে বুঝা যাচ্ছে খুব জরুরি কিছু নিয়ে আলোচনা করছেন।

মহিলাটি কথা শেষ করে যেই ইরার দিকে ফিরলো ওমনি ইরা চমকে উঠলো। সে যা দেখছে তা কি সত্যি? ইনি লুৎফা বেগমের সাথে কি এতো জরুরি কথা বলছিলেন। মহিলাটি চলে যাওয়ার আগে লুৎফা বেগম তার হাতে টাকার একটি বান্ডিল ধরিয়ে দিলেন। ইরা অস্পষ্ট স্বরের উচ্চারণ করলো,

ইরা:"রহিমা খালা"

--

চলবে..?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন