গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা
লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া)
#পর্ব:১৫
ইরা দৌঁড়ে শপিং মলের নিচে নামলো। তাঁকে এইভাবে দৌঁড়াতে দেখে রুপা আর সিয়ামও ডাকতে ডাকতে দৌঁড়াতে লাগলো। ইরা দৌড়াচ্ছে আর মনে মনে ভাবছে,
ইরা:"আজকে যে করেই হোক আমাকে সত্যিটা জানতে হবে। আমার মা বাবার খুনিকে ধরতেই হবে হাতে নাতে। ওই রহিমা খালা সব জানে।"
ইরারা যখন নিচে এলো তখন আর কাউকেই দেখতে পেলো না। তার মানে ওরা চলে গেছে। রুপা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ইরা পাশে দাঁড়ায়, ইরাকে জিজ্ঞেস করে,
রুপা:"এভাবে দৌড়াচ্ছিলি কেনো ইরা?"
ইরা:"আমি একটু বাসায় যাবো আপু"
রুপা:"যাবোই তো, আগে কেনাকাটা শেষ করে নেয়।"
ইরা:"আমি আমাদের বাসায় যাওয়ার কথা বলছি। আমার রহিমা খালার সাথে কিছু কথা আছে। তোমরা কেনাকাটা করতে করতে আমি চলে আসবো।"
রুপা:"তোর একা যাওয়ার দরকার নেই। আমারও যাবো তোর সাথে।"
ইরা:"না না আমি একা যেতে পারব। তোমরা বরং মনোযোগ দিয়ে শপিং করো।"
রুপা:"চুপ, যেটা বলেছি সেটায় হবে। নয়তো তোর যাওয়া হবে না। তোকে আমি কিছুতেই একা ছাড়বো না।"
সিয়াম:"হ্যাঁ রুপা ঠিক বলেছে। তোমার জামাই যদি জানে তোমাকে একা কোথাও যেতে দিয়েছি তাহলে থাপড়ে আমার গাল কালো করে দিবে। তারপর আমার আবার টাকা খরচ করে লতা ক্রীম কিনে মাখতে হবে। এমনিতেই আমি কালো।"
সিয়ামের কোথায় ওরা দুজনেই হেঁসে দিলো। সিয়ামও হেঁসে দিলো। তারপর তারাগাড়ীতে উঠে ইরার নানার বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
--
চৌধুরী বাড়ীর কলিং বেল বাজতেই রোকেয়া বেগম দরজা খুলে দিলেন। উদয় হন্তদন্ত পায়ে ভেতরে ঢুকল। সোফায় আরাম করে বসে রোকেয়া বেগমের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
উদয়:"তোমার জামাই এর বউ এর একমাত্র ছেলের আদরের বউ কোথায় আম্মু।"
উদয় কি বললেন রোকেয়া বেগম কিছুই বুঝলো না। সব তার মাথার তিন হাত উপর দিয়ে গেলো।
রোকেয়া:"কি আবোল তাবোল বলছিস। সিলেট থেকে কি পাগল হয়ে এলি নাকি রে বাবু।"
উদয় আফসোসের স্বরে বলল,
উদয়:"পাগল হয়েছি আম্মু, তোমার ছেলের বউ এর জন্য। কই উনি? ডাকো তাঁকে, এতোদিন পর তার একমাত্র জামাই এসেছে।"
রোকেয়া:"ওরা কেনাকাটা করতে একটু বাইরে গেছে।"
উদয়:"ওরা মানে,"
রোকেয়া:"ইরা, রুপা আর সিয়াম "
উদয় দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নিল। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করলে সিয়াম এর নাম্বারে ডায়াল করলো।
কয়েক সেকেন্ড রিং হতে ওপাশ থেকে সিয়াম কল রিসিভ করল,
সিয়াম:"হ্যালো ব্রো। হোয়াটস আপ?"
উদয়:"কই তোরা?"
সিয়াম:"একটু বাইরে এসেছি। কেনো?"
উদয়:"বাইরে আছিস বলেই তো কল দিয়েছি। বাইরে কোথায় আছিস।"
সিয়াম:"ইরার নানার বাড়িতে।"
উদয়:"ওখানে কেনো?"
সিয়াম:"ইরার কি জানি দরকার আছে বলল।"
উদয়:"পৌঁছে গেছিস?"
সিয়াম:"হ্যাঁ, ভিতরে ঢুকছি।"
উদয়:"ওখানেই থাক আমি আসছি।"
বলেই উদয় কল কেটে দিয়ে বেরোতে যাবে ওইসময় রোকেয়া বেগম উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,
রোকেয়া:"এখনই তো এলি আবার কোথায় যাচ্ছিস। যেখানেই যা খেয়ে যা অন্তত।"
উদয় হাটতে হাঁটতেই বলল,
উদয়:"তোমার বউমা কে আনতে যাচ্ছি আম্মু। খাবার রেডি করো। তোমার বৌমাকে নিয়ে এসে খাবো।"
উদয় চলে গেলো। রোকেয়া বেগম মুচকি হাসলেন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন মনে মনে। এতো দিনে তার ছেলেটা সঠিক পথে এসেছে। সে তো এটায় চেয়েছিলো।
--
ইরা:"কোথায় গিয়েছিলে খালা?"
হঠাৎ পেছন থেকে ইরার গলা শুনে রহিমা কেমন যেনো হকচকিয়ে গেলেন। আমতা আমতা করে কোনরকমে বললেন,
রহিমা:"আরে ইরা মামণি, তুমি এহেনে? তোমরা আয়বা আমারে তো জানায়লানা। জানাইলে তো আমি রান্নাবান্না কইরা রাখতাম।"
ইরা শক্ত গলায় বলল,
ইরা:"বলে আসলে তো আর তোমার আসল রূপ দেখতে পেতাম না খালা।"
এবার রহিমার গলা শুকিয়ে গেলো। সে এই প্রথম ইরা এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। আজকে যেনো সে অন্য এক ইরাকে দেখছে। সে শুকনো একটা ঢুক গিলে বললো,
রহিমা:"আসল রূপ মানে,?কি কইতাছ মামণি? আমি তো কিছুই বুজবার পাইতাছি না।"
ইরা:"কথা ঘুরানোর চেষ্টা করো না।আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর এখনও পায়নি। কোথায় গিয়েছিলে?"
রহিমা:"কোনহানে যায় নাই তো আমি "
ইরা:", তাহলে নতুন শাড়ী পড়ছো কেনো? তুমি তো বাইরে না গেলে নতুন শাড়ী পর না।"
রহিমা:"আজকে মন চাইলো তাই পড়ছিলাম। এই শাড়ী পড়ার লাইগ্গা তুমি আমার সাথে এরম করে কথা কইতে পারলা মামণি?"
ইরার মন গলল না। সে আগের ন্যায় বলল,
ইরা:"শুঁকনো কথায় চিরে ভিজবে না। সরাসরি আসল কথায় আসো। তোমার হাতটা দেখাও তো।"
রহিমা ভয় পেয়ে গেলেন। ভয়ে তার হাত পা কাঁপতে লাগলো। ইরার পেছনে রুপা আর সিয়াম নীরব দর্শক এর মতো দাঁড়িয়ে আছে। তারাও এই প্রথম ইরার এমন রূপ দেখছে। রহিমা কোনো কথা বলছে না দেখে ইরাই এগিয়ে গিয়ে রহিমার হাত ধরে শক্ত হাতে টান দিলো।
ওমনি রহিমার হাত থেকে টাকার বান্ডিলটা ফসকে পড়ে গেলো মেঝেতে। উদয় আর নিশি ওই মূহুর্তেই ভেতরে প্রবেশ করলো। উদয় যখন বের হচ্ছিলো তখন নিশি এসেছিলো ইরার সাথে দেখা করতে। নিশি যখন জানতে পারে ইরা এই বাড়িতে তখন সেও উদয়ের সাথে চলে আসে।
কিন্তু এসে যে এই অবস্থা দেখবে ভাবতে পারেনি। নিশির আগে থেকেই এই মহিলার উপরে সন্দেহ ছিলো। আজকে সেটা বিশ্বাসে রুপ নিলো।
রহিমা বেগম ধরা পড়ে গেছে ভেবেই ভয়ে লজ্জায় কান্না করে ইরার পায়ে পড়ে যায়। কাদতে কাদতে বলতে শুরু করে,
রহিমা:"আমি কিছু করি নাই গো মামনি,, আমাকে তো ওই লুৎফা খান টাকা দিত যেনো আমি তোমাগর সব খবর তারে দেই। আর তোমার ছোটবেলায় জন্মদিনের দিন খালুজান রে ওই লুৎফা বেগমই লোক দিয়া আটকায় রাখছিল আর তার বড়ো পোলারে তোমার লগে বিয়া দিয়া তোমার সব সম্পত্তি তাগর নামে লেইক্ষা নিবার চাইছিল। আমার কোনো দোষ নাই, তোমরা আমার ক্ষমা কইরা দেও।আমি তো গরীব মানুষ তাই টাকার লোভে পইড়া এই কাজটা কইরা ফালাইছি। আমারে মাফ কইরা দেও মামণি।"
রহিমার কথা শুনে সিয়ামের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তার মা টাকার জন্য এতোটা নিচে নামতে পারে সে বিশ্বাস করতে পারলো না। তাদের তো কোনো কিছুর অভাব নেই তাহলে কেনো এতো লোভ। শাহেদ চৌধুরী তো তাদের কোনো কিছু দেওয়ার কমতি রাখেনি তাহলে কেনো এমন করলো তার মা। সে আর কিছু ভাবতে পারে না।
ইরার উপর এই কথা বেশি প্রভাব ফেলতে পারলো না। কারণ সে আগেই এই সন্দেহ করেছিল। ইরা কাঠ কাঠ গলায় বলল,
ইরা:"আর আমার বাবা মাকে কে মেরেছে।"
ইরার কথা শুনে ঐখানে উপস্থিত সবাই বেশ অবাক হলো। তার বাবা মা তো একসিডেন্ট এ মারা গেছে তাহলে এখানে খুনের কথা কোথা থেকে আসছে? রহিমা বলল,
রহিমা:"এই ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। কিন্তু লুৎফা বেগম সব জানেন। ওনারে জিজ্ঞেস করলেই তোমরা সব জানতে পারবে।"
সিয়াম যেনো পাথর হয়ে গেছে। সে কোনো কিছু না ভেবেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। রুপাও তার পেছন পেছন যায়। রুপা বুঝতে পারছে তার প্রিয় মানুষের মনের অবস্থা। তার ফুপ্পি একটু বেশি কথা বলে তাই বলে যে এই রকম একটা কাজ করতে পারে এটা সেও বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু এতোদিন ইরার প্রতি তার রাগ, উদয়ের ইরাকে বিয়ে করা নিয়ে এতো অমত, এবার যেনো সবার কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে গেলো।
উদয়:"ইরা বাড়িতে চলো। এখন যা কথা হওয়ার সবার সামনে হবে। আর কাল আব্বুও ফিরছেন নানুভাইকে নিয়ে। তাই যা হবে সবার মতামত নিয়েই হবে। আর আমার তো জানতে হবে কেনো ফুপ্পি সম্পত্তির জন্য সাত বছর তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখলো। এর জবাব তো তাকে দিতেই হবে।"
--
চলবে..?