ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোমায় না চিনেও চেনা

১৬তম পর্ব

লেখক: এইশাত রাদিয়া

গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা

লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া)

#পর্ব:১৬

ড্রয়িংরুমে চলছে পিনপিন নীরবতা। লতিফা বেগম, উদয়, সিয়াম, হাসান এক সোফায় বসে আছে, তার মুখোমুখি সোফায় বসে আছে রোকেয়া বেগম আর লুৎফা বেগম । লুৎফা বেগম মাথা নিচু করে বসে আছে, লজ্জা ভয় দুটোই কাজ করছে। রহিমা তার পাশেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লুৎফা বেগম চাননি সকলের সামনে তার সত্যিটা প্রকাশ পাক, বিশেষ করে তার ছেলেদের সামনে। তার মতে, তিনি যা করেছেন সব তো তার ছেলেদের জন্যই।

নিশি, ইরা আর রুপা একসাথে দাঁড়িয়ে আছে । ইরার চোখে আগুন জ্বলছে। উদয়ের দৃষ্টি লুৎফা বেগম এর দিকে । তার চোখ দেখে বুঝার উপায় নেই মনে কি চলছে। সিয়াম আর হাসান মাথা নিচু করে আছে লজ্জায়। হাসান অফিসে ছিল, লতিফা বেগমের জরুরি কলে বাড়িতে এসেছে। সে এসেই সিয়ামের কাছে সব শুনেছে।

নীরবতা ভেঙে লতিফা বেগম লুৎফা বেগম এর দিকে তাঁকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

লতিফা :"রহিমা যা বলছে তা কি সত্যি লুৎফা?"

লুৎফা বেগম আমতা আমতা করে জবাব দিলো,

লুৎফা:"ক..কি বলেছে রহিমা ?"

লতিফা:"এখন এমন ভান ধরবি না যে তুই কিছু জানিস না। তোর সকল কুকর্মের কথা কিন্তু ফাঁস হয়ে গেছে। অন্তত ছেলেদের সামনে আর মিথ্যা বলিস না।"

এবার লুৎফা বেগম কেঁদে দিলেন। কান্না করতে বললেন,

লুৎফা:"আমাকে মাফ করে দাও আম্মা, আমি বুঝতে পারিনি। আমি উদয় আর ইরার সাথে অনেক অন্যায় করেছি, এটা আমি শিকার করছি।

কিন্তু ইরার বাবা মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। বিশ্বাস করো তোমরা "

লতিফা:"বিশ্বাস এর মর্যাদা কি তুই ঠিক রেখেছিস।"

সিয়াম:"ছিঃ আম্মু, তুমি এতো টা নিচে কেনো নামলে বলবে আমাকে? মামা আর বাবা তোমাকে কিসের অভাবে রেখেছিল বলোতো। আমার জানামতে আজ পর্যন্ত মামা আর বাবা তোমাকে এবং আমাদের কোনো অভাব বুঝতে দেয়নি। তাহলে কেনো করলে এমন।"

লুৎফা বেগম নিরুত্তর। তার কাছে কিছু বলার মতো নেই। লোভ যে মানুষকে এতোটা নিচে নামাতে পারে আজকে সে বুঝতে পারছে আর আফসোস করছে। কিন্তু এখন আফসোস করে কোনো লাভ নেই, যেভাবেই হক সবটা সামাল দিতে হবে।

লতিফা:"এখন চুপ করে আছিস কেনো। ছেলের প্রশ্নের জবাব দে। যখন এই জঘণ্য কাজ টা করলি তখন কি একবারও মনে আসেনি যে যদি তোর ছেলেরা সব জেনে যায় তাহলে তাদের কী বলবি।"

লুৎফা বেগম বাকহারা। কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। তিনি এবার সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বললো,

লুৎফা:"আমাকে ক্ষমা করে দে রে বাবা।আমি খুব বড়ো ভুল করে ফেলেছি। তোরা আমায় দয়া করে মাফ করে দে।"

সিয়াম ঘৃণার চোখে তাঁকিয়ে বললো,

সিয়াম:"যাদের সাথে অন্যায় করেছো তাদের কাছে ক্ষমা চাও আম্মু। ওরা ক্ষমা না করলে তুমি পরকালেও শান্তি পাবে না।"

বলেই সিয়াম সিঁড়ি বেয়ে চলে যায়। পেছন পেছন রুপাও যায়।লুৎফা বেগম অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন ছেলের চলে যাওয়া।

উদয় গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,

উদয়:"এখন এই বিষয় নিয়ে আলোচনা বন্ধ করো সবাই। আর যেনো এই বিষয়ে কথা না হয়।যা কথা হওয়ার কাল হবে,বাবা আর নানুভাই আসলে।এখন সবাই সবার কাজে যাও। আর ইরা তুই আমার রুমে আয়।"

ইরা যেনো এবার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। সে কাঠ কাঠ গলায় বলল,

ইরা:"কি বললেন আপনি। এখন এসব বাদ দিবো। কেনো বাদ দিবো, এই একটা কারণে আমি আমার জীবনের সাতটা বছর হারিয়েছি। আমার বাবা- মাকে হারিয়েছি। আপনাকে হারি..."

উদয় ইরার দিকে তাঁকালো কেমন যেনো নেশালো দৃষ্টিতে। ইরা থেমে আবার বলতে শুরু করল,

ইরা:"আমি তো এতো সহজে ছেড়ে দিবো না। আমি এতটাও দুর্বল নই যে নিজের ন্যায় বিচার চাইতে ভয় পাবো। আমাকে যদি দূর্বল ভেবে থাকেন তাহলে এখনি সেই চিনতা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। আমি এই অন্যায়ের বিচার চাই এক্ষুণি।"

উদয় মুচকি হাসলো, কিন্তু কেউ দেখার আগেই সেই হাসি বিলীন হয়ে গেলো। সে মনে মনে কুটিল হাসলো। তার বউ এর যে এতো তেজ সে আগে জানতো না। এই তেজ তাঁকে নতুন করে প্রেমে ফেললো। উদয় স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

উদয়:"বুঝেছি, কিন্তু তোর বিচার তুই এখন পাবি না। বললাম তো আগে সবাই আসুক। আমার মনে হয় তুই এতটাও বোকা না যে সব খুলে বলতে হবে। আর আমার রুমে আয় খাবার নিয়ে। সিলেট থেকে ফিরে এখনও তো খেতেই পারলাম না কিছু মানুষের নাটকের জন্য।"

শেষের কথাটা উদয় লুৎফা বেগম এর দিকে তাঁকিয়ে বলে চলে গেলেন।লুৎফা বেগম কান্না করতে করতে ইরার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ইরার হাত ধরতে যাবে ঐমুহূর্তে ইরা হাত সরিয়ে নেয়।লুৎফা বেগম কান্না করতে করতে বলল,

লুৎফা:"আমাকে মাফ করে দাও ইরা। আমি খুব বড় ভুল করে ফেলেছি। প্লীজ ক্ষমা করে দাও। আমি যানি তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিবে।"

ইরা কোনো কথা না বলে রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে উদয়ে রুমের দিকে চলে যায়।

--

সিয়াম ছাদে দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে তাঁকিয়ে। পাশে দাঁড়িয়ে রুপা সিয়ামের দিকে তাকিয়ে আছে। এই মানুষটাকে যে সে বড্ড বেশিই ভালোবাসে। সে তার সরলতার প্রেমে পড়েছে সেই সাত বছর আগেই। রুপা সিয়ামকে বলল,

রুপা:"তুমি কষ্ট পেয়ো না, ফুপ্পি না হয় একটা ভুল করেই ফেলেছে। তার জন্য তো সে ক্ষমাও চেয়েছে। নিজের ভুল যে বুঝতে পেরেছে এটায় বেশি। তুমিও আর রাগ করে থেকো না।"

সিয়াম:"আমি রাগ করিনি। কিন্তু আজকে আম্মু আমার বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে। তিনি যে শিক্ষায় আমাদের বড়ো করেছেন আজকে সেই শিক্ষা তার মধ্যেই নেই।"

রুপা:"সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। কাল তো আব্বু আসছে। প্লীজ আর মন খারাপ করে থেকো না। তুমি তো জানো তুমি মন খারাপ করে থাকলে আমার ভালো লাগে না।"

সিয়াম এবার রুপার দিকে তাকালো।

সিয়াম:"কেনো এতো ভালোবাসো আমাকে ময়নাপাখি?"

রুপা:"জানি না।"

দুজন দুজনকে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরলো,যেনো ছাড়লেই তারা আলাদা হয়ে যাবে। তাদের এই ভালবাসার সাক্ষী হয়ে থাকলো এই বিশাল আকাশ।"

--

ইরা:"আসবো?"

ভিতর থেকে কোনো উত্তর এলো না। দরজা চাপানো ছিলো তাই ইরা ঝুঁকে হালকা উঁকি দিলো। দেখলো রুমে কেউ নেই। তাই ঢুকে পড়লো। ওয়াসরুমে পানির শব্দ হচ্ছে, তারমানে উদয় ওয়াশরুমে। ইরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। সে টেবিলে খাবার রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। নিজে নিজেই বিড়বিড় করলো,

ইরা:"আচ্ছা আমাকে কি উনার সাথে মানাবে?"

পেছন থেকে উদয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

উদয়:"ঠিক বলেছিস, আমিও এটায় ভাবছি।"

উদয়ের কথা শুনে ইরার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। পেছন ফিরে দেখলো উদয় শুধু তোয়ালে পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই ইরার গাল দুটো লাল বর্ণ ধারণ করলো। সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিলো। কোনো রকমে বলল,

ইরা:"আপনি এভাবে নির্লজ্জের মতো বেরিয়ে এসেছেন কেনো। কাপড় পড়ুন তাড়াতাড়ি।"

উদয়:"কাপড় তো পড়ায় আছে। আর নির্লজ্জের তো এখনও কিছুই দেখলি না এখনি এতো লাল নীল হয়ে যাচ্ছিস কেনো।"

ইরা:"প্লীজ আপনি কিছু পড়ে আসেন। নয়তো আমি কিন্তু চলে যাবো"

উদয়:"আর একটা কথা বললে শরীরে যা আছে তাও কিন্তু থাকবে না।"

ইরা:"ছিঃহ্, আপনার মুখে কি কিছুই আটকায় না।"

উদয়:"কিছু তো বললাম ই না, আটকাবে কেমনে। তুই কি এখন মুখ থেকে হাত সরাবি নাকি আমি আমার শরীর থেকে কাপড় সরাবো।"

উদয়ের কথা শুনে ইরা মুখ থেকে হাত নামিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো।

ইরা:"নাহ্। আপনার কি লজ্জা সরম কিছু নেই। এতো অসভ্য হলেন কবে থেকে।"

উদয় ইরার কাছে এসে, কানের লতিতে হালকা কামড় দিয়ে ফিসফিস করে মাতাল করা কণ্ঠে বলল,

উদয়:"যবে থেকে তোর প্রেমে আমি উন্মাদ হয়েছি তবে থেকে।"

ইরার সারা শরীর অদ্ভুত ভাবে কাপছে। শরীরে, মনে কেমন যেন অন্যরকম অনুভুতি হচ্ছে, যা এর আগে কখনো হয়নি। এর আগে কেউ এতো কাছে আসেনি আর এমন অযাচিত স্পর্শ পায়নি। এই প্রথম উদয় তার এতো কাছাকাছি এসেছে। উদয়ের এরূপ স্পর্শে ইরার প্রাণ যায় যায় অবস্থা। ওইমুহূর্তে সটাং করে রুমের দরজাটা কেউ ধাক্কা দিয়ে খুলে দিলো।

নিশি ওদের এতো কাছাকাছি দেখে হা করে তাঁকিয়ে রইলো। দরজা খোলার শব্দে ইরার ধ্যান ভাঙলেও উদয়ের সে দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে ইরাকে চেপে ধরে গলায় নাক ডুবালো। ইরা লজ্জায় বার বার বলছে,

ইরা:"ছাড়ুন প্লীজ উদয় ভাই, নিশি দেখছে।"

উদয় ওই অবস্থাতেই নেশা জড়ানো গলায় বলল,

উদয়:"দেখুক তাতে আমার কি, আমি কি অন্য কারো সম্পদে হাত দিয়েছি নাকি।"

ওদের এই অবস্থা দেখে নিশী হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে, এক নিঃশ্বাসে বলল,

নিশী:"ইরা আমি চলে যাচ্ছি, এই কথা বলার জন্যই এসেছিলাম। আর দরজা খোলা ছিলো বলে না বলেই ঢুকে পড়েছিলাম,এখন বুঝতে পারছি কতো বড়ো ভূল করেছি। যা করার দরজা লাগিয়ে কর প্লীজ।"

নিশী এক দমে কথা গুলি বলেই দরজা চাপিয়ে চোখ ধরেই এক দৌড় দেয়। হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা লাগতেই ফ্লোরে পড়ে যায়। সামনে হাসানকে দেখেই রাগী কণ্ঠে বলে উঠে,

নিশী:"আপনি?"

হাসান নিশির কথা না শোনার মতো ভান করে চলে যেতে যেতে বলে,

হাসান:"জীবনে যে আর কতো রকম কানা দেখতে হবে, উফফ সরি, কানা না কানি।"

বলেই চলে যায়, এদিকে ফ্লোরে বসে বসে নিশী রাগে ফুঁসছে।

--

ইরা আর সহ্য করতে না পেরে উদয়কে সজোরে ধাক্কা মারে। উদয় ইরাতে মগ্ন থাকার কারণে সামলাতে না পেরে কয়েক পা পিছিয়ে যায়। এই ফাঁকে ইরা ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।

--

চলবে..?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন