গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা
লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া)
#পর্ব:২২
সামনে হাসানকে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, নিশির ভেতরে জমে থাকা রাগ যেন এক লহমায় আগুন হয়ে আকাশ ছুঁয়ে গেল। ওইদিন তাকে ফেলে দেওয়া থেকে শুরু করে তার সাথে ভালো ভাবে কথা না বলা, তাকে বেয়াদব বলা সব এক এক করে মনে পরে গেলো। নিশি হাসানকে শাসিয়ে কিছু বলতে নিবে ওমনি হাসান মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল,
হাসান:"ধুর, বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মুড টাই নষ্ট করে দিলো। এই বাড়িতে এতো পাগল ছাগল কবে থেকে হলো? যেখানে খুশি সেখানেই শুয়ে পড়ে আবার যাকে পায় তাকেই ধাক্কা মারে।"
নিশি হাসানের কথায় হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে করাক মেজাজে বলে,
নিশি:"এই যে হনুমান, আপনার এতো দেমাগ কোথা থেকে আসে শুনি। দেখতে একটু হ্যান্ডসাম বলে এতো ঢং করতে হবে নাকি, আজব। আপনার চাইতেও আরও অনেক হ্যান্ডসাম হনুমান আমার চেনা আছে। সো,বেশি ভাব নিতে আসবেন না বলে দিলাম। যান ফোটেন এখান থেকে, যতো সব আজাইরা।"
হাসানকে কিছু না বলতে দিয়ে নিশি দৌড়ে নিচে নেমে গেলো নিজের মোবাইল তুলতে। হাসান আহাম্মকের মতো তাঁকিয়ে আছে।সে নিজে নিজেই বলল,
হাসান :"হোয়াট,আমি হনুমান? বেয়াদব মেয়ে বলে কি"
হাসান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তার অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে মনে হতেই তাড়াতাড়ি পা বাড়ালো বাইরের দিকে।ও নিচে নেমে নিজের ফোন হাতে নিতেই ' আল্লাহ্ ' বলে চিৎকার করে উঠলো। হাসান নিশির চিৎকারে পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো ফোন চাপতে চাপতে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু সেটা একজনের সহ্য হলো না। নিশি এসে হাসানের হাত থেকে ফোনটা ছোঁ মেরে নিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ফ্লোরে আঘাত করলো। হাসান হতভম্ব।কি হচ্ছে তার সাথে। হাসান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
হাসান:"এই বেয়াদব, আমার ফোন ভাঙলে কেনো? তোমার কী কোনো কমনসেন্স নাই?"
নিশি:"নাহ্ নেই, আপনার কোনো সমস্যা?"
হাসান:"এই তোমার মাথায় কি সমস্যা আছে নাকি। আজব মেয়েতো তুমি। তোমার ভাগ্য ভালো যে এতক্ষণ যাবৎ তোমার সাথে ভালো ভাবে কথা বলছি।"
নিশি :" কি করবেন আপনি আমার?মারবেন আমাকে? এই ভুল করতে যাবেন না মিস্টার হনুমান। তাহলে ভালো হবে না বলে দিলাম।সামান্য ধাক্কা দেওয়ার জন্য যদি আপনার মোবাইল ভাঙতে পারি তাহলে চিন্তা করুন গায়ে হাত দিলে কি করবো।"
হাসান:"শাট আপ বেয়াদব। তুই যদি ছেলে হতি তাহলে তোর অবস্থা এখানেই খারাপ করে দিতাম।মেয়ে বলে বেঁচে গেলি।"
নিশি:"তুই তুকারি করছেন কেনো? আর তখন থেকে কি বেয়াদব বেয়াদব বলেছেন, আপনার সাথে তো এখনো বেয়াদবি শুরুই করিনি ।যদি শুরু করি তাহলে আপনার হাল বেহাল করতে আমার দু সেকেন্ড ও লাগবে না মিস্টার হনুমান প্রসাদ "
হাসান রাগে দুই হাত দিয়ে নিজের চুল টেনে ধরলো। যেকেনোভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু হচ্ছে না।এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে সে নিশ্চয়ই একটা ঝামেলা বাঁধিয়ে ফেলবে। মোবাইল গেছে যাক কিন্তু কোনো ঝামেলা তাঁর সহ্য হবে না। তাই কথা না বাড়িয়ে সে বাইরের দিকে হাটা ধরলো।
হাসানের চলে যাওয়া দেখে নিশির গা পিত্তি জ্বলে উঠলো। কটমট করতে করতে বললো,
নিশি:"এই যে শুনুন,আমি আপনার মতো এতো বড়লোক নই । অনেক কষ্ট করে আব্বুর কাছ থেকে পরীক্ষার ভালো ফলাফল দেখিয়ে এই আইফোনটা নিয়েছিলাম। কিন্তু আপনার জন্যে আজকে সেটাও হারালাম। আপনাদের মতো কয়েকটা বড়লোকের তো গরিবের কষ্ট গায়ে লাগে না। তাই আপনার কাছে আমার ফোনের হয়তো কোনো মূল্য নেই, সে জন্যই সরি না বলে চলে যাচ্ছিলেন। আর এ কারণেই আপনার ফোন আমি আছার মেরেছি। এখন বুঝুন নিজের জিনিস হারালে কেমন লাগে।"
হাসানের পা থেমে গেল। সে পিছন ফিরে দেখলো নিশি কান্না করতে করতে নিজের ফোন হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। হাসান কিছু না বলে বড় বড় পা ফেলে বাইরে চলে গেলো।
--
সিয়াম একটা নির্জন রাস্তায় এসে গাড়ি থামালো। রুপা সিয়ামের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
রুপা:"আমরা এখানে এসেছি কেনো?"
সিয়াম:"প্রেম করতে "
রুপা নির্দ্বিধায় উত্তর করলো,
রুপা:"বিয়ের আগে প্রেম করা হারাম।"
সিয়াম:"আমি তো আর বিয়ের আগে প্রেম করতে আসিনি ময়নাপাখি "
সিয়ামের কথায় রুপার মনে পরে গেলো সেই সাত বছর আগে সিয়ামের বিদেশ যাওয়ার আগের দিন রাতের কথা।
অতীত,
' সিয়াম রুপাকে কাজী অফিসের সামনে এসে বলছে,
সিয়াম:"আমি চলে যাওয়ার আগে তোমাকে আমার নামে করে যেতে চাই। প্লীজ না করো না।"
রুপা:"কিন্তু বাসায় না জানিয়ে কেমনে বিয়ে করবো বলো। পরে যদি ভাইয়া বা আব্বু জানতে পারে তাহলে অনেক কষ্ট পাবে আর তার চেয়েও বড় কথা যদি তোমাকে মেনে না নেয়।"
সিয়াম:"তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি যেভাবেই হোক আমি বিদেশ থেকে ফিরে বাসার সবাইকে রাজি করাবো। আমাদের এই বিয়ের কথা বাড়ির কেউ জানবে না, প্রমিস। তুমি প্লীজ না করোনা।"
সিয়ামের চোখে পানি টলমল করছে। সিয়ামের এমন অবস্থা দেখে আর সিয়ামের প্রতি তার ভালোবাসা থেকে রুপাও আর না করলো না।
রুপা:"আচ্ছা ঠিক আছে।"
খুশিতে সিয়ামের চোখ চকচক করে উঠে। কিন্তু পরমুহুর্তেই রুপা বলে,
রুপা:"তুমি তো সাবালক, কিন্তু আমি তো এখনও নাবালিকা।তাহলে আমাদের রেজিস্ট্রি হবে কি করে?"
সিয়াম মুচকি হেসে বললো,
সিয়াম:"ধুর পাগলি,আমি কি বলেছি যে আমাদের রেজিস্ট্রি হবে। আমরা আজকে শুধু কালিমা পড়ে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হবো।আমি যখন বিদেশ থেকে ফিরে সবাইকে রাজি করিয়ে বিয়ে করবো তখন বাকি সব হবে।"
রুপা আর অমত করলো না। তারা কাজী অফিসে ঢুকে গেলো।'
বর্তমান,
সিয়াম রুপার মুখের সামনে তুরি বাজিয়ে বললো,
সিয়াম:"কি হলো, কিসের ভাবনায় আবার ডুব দিলে?"
সিয়ামের কথায় রুপা অতীতের চিন্তা থেকে ফিরে এলো।রুপা বললো,
রুপা:"কিছু না এমনি"
সিয়াম:"আজকে আর কোনো ভাবনায় না। এখন শুধু আমাকে নিয়ে ভাবো ময়নাপাখি"
দুজনেই মুচকি হাসলো। সিয়াম ধীরে ধীরে রুপার ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট চেপে ধরলো। ঠিক ওই মুহূর্তেই পেছন থেকে গাড়ির হর্ন শুনা গেলো। রুপা দূরে সরে গেলো সাথে সাথে। তাঁর খুব লজ্জা লাগছে। গাল দুটো কেমন লাল লাল হয়ে গেছে।
সিয়াম বিরক্তি প্রকাশ করে বললো,
সিয়াম:"আগের জন্মে কার বারা ভাতে ছাই দিয়ে ছিলাম আল্লাহ্ জানে। এখন সেই অপরাধের শাস্তি পাচ্ছি। একটু শান্তিতে বউ এর সাথে রোমান্স ও করতে দিচ্ছে না মা*ঙ্গীর নাতিরা।
বলেই সিয়াম গাড়ি সার্ট দিলো।সিয়ামের কথায় রুপা জোরে হেসে দিলো।
--
উদয় আর ইরা একটা রেস্টুরেন্টে এসেছে। উদয় সকালে নাস্তা করে বাসা থেকে বের হয়নি তাই ইরাকে নিয়ে আগে খেতে এসেছে। ইরা উদয়ের সামনে চুপ করে বসে আছে। উদয় নিজের মতো অর্ডার করে গম্ভীর মুখে ফোন স্ক্রল করছে,যেনো তার সামেন কেউ নেই। ইরা ভেঙছি কেটে মনে মনে বিড়বিড় করলো,
ইরা:"যত্তসব ঢং। ভয় দেখিয়ে নিয়ে এসে আমাকে এভাবে বসিয়ে রেখেছে। নিজের মন মতো ঘাসপাতা অর্ডার করেছে, আমাকে একটা বার জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না যে, ইরা তুই কি খাবি? শুধু শুধু তো আর আমি একে খবিশ বলি না।এখন যদি কিছু বলি আবার রাক্ষসের মতো আমার দিকে তেড়ে আসবে।"
এর মধ্যেই ওয়েটার খাবার নিয়ে আসলো। খাবার দেখে ইরা নাকমুখ কুঁচকে নিলো। ওয়েটার খাবার সার্ব করে দিতে যাবে ওইসময় উদয় থমথমে গলায় বলে,
উদয়:"থ্যাঙ্কস, আপনি যেতে পারেন।"
ওয়েটার চলে গেলো। উদয় প্লেটে খাবার বেড়ে ইরার দিকে এগিয়ে দিলো। ইরা মনে সাহস নিয়ে বলল,
ইরা:"আমি এসব খাইনা ভাইয়া"
উদয় ধমকের সুরে বলল,
উদয়:"চুপ, এই পাবলিক প্লেসে কি তুই আমার হাতে এখন থাপ্পড় খেতে চাচ্ছিস?আর একবার যদি ওই মুখ দিয়ে ভাইয়া ডাক বের করেছিস তাহলে ওই মুখ আমি সেলায় করে দিবো "
ভয়ে ইরার মুখ চুপসে গেল। কাচুমাচু করে বললো,
ইরা:"আমি এগুলো খাবো না "
উদয় এবার শান্ত কন্ঠে বলল,
উদয়:"এটা হাইজেনিক। শরীরের জন্যে ভালো, খেয়ে নে।"
ইরা:"খাবো না আমি "
উদয় কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
উদয়:"কি খাবি তাহলে?"
ইরা:"বি.. বিরিয়ানি "
উদয়:"যত্তসব অস্বাস্থ্যকর খাবার তোর পছন্দ।"
ইরা কিছু বললো না। মাথা নিচু করে বসে রইলো। উদয় কিছুক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সার্ভেন্ট কে ডেকে একটা বিরিয়ানি অর্ডার করলো।খুশিতে 5ইরার চোখ চকচক করে উঠলো। উদয় নিজ মনে খাচ্ছে, আর ইরা বার বার দরজার দিকে তাকাচ্ছে, কখন তার বিরিয়ানি নিয়ে আসবে।
প্রায় দশ মিনিট পরে বিরিয়ানি আসলো। এতক্ষণে উদয়ের খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। ইরা নিজ মনে খেতে শুরু করলো। উদয় খাওয়া শেষ করে বললো,
উদয়:"তুই বস আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি।"
ইরা খেতে খেতে মাথা নাড়ালো। উদয় চলে গেলো।
প্রায় দশ মিনিট পরে উদয় টেবিলের কাছে এসে দেখলো ইরা নেই। বিরিয়ানি উল্টে পড়ে আছে, ইরার বেগও নিচে পড়ে আছে। উদয় কিছু একটা আন্তাজ করে চিৎকার করে ম্যানেজারকে ডাকলো। ম্যানেজার আসতেই উদয় শক্ত কন্ঠে বলল,
উদয়:"আমি ইমিডিয়েট সিসি ক্যামেরা চেক করতে চাই। আমার ওয়াইফ এখান থেকে মিসিং"
ম্যানেজার:"ইয়েস স্যার, আসুন আমরা সাথে।"
ক্যামেরা চেক করে উদয়ের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেলো। বুকের ভেতর কেমন যেনো ব্যথা অনুভব হতে শুরু করলো ।
--
চলবে..?