গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা
লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া)
#পর্ব:২৪
সিয়াম আর রুপা হন্তদন্ত পায়ে বাড়িতে প্রবেশ করল।সিয়াম স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
সিয়াম:"কি হয়েছে ব্রো?এভাবে কল..."
বাকি কথা বলার পূর্বেই সিয়ামের নাকে সজোড়ে ঘুষি পড়লো। রুপা আর্তনাদ করে উঠলো,
রুপা:"ভাইয়া.."
এরপর একের পর এক মার পড়তে লাগলো সিয়ামের উপর। সিয়ামের সাথে কি হচ্ছে সেসব কিছু বুঝতে সিয়ামের কিছুটা সময় লেগে গেলো।উদয়কে দেখে মনে হচ্ছে সে উন্মাদ হয়ে গেছে। উদয়ের কান্ডে সবাই হতবাক। রুপা চিৎকার করে সিয়ামকে ছেড়ে দিতে বলছে এবং নিজে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু উদয়ের শক্তির কাছে রুপার শক্তি কিছুই না। সবাই উদয়কে থামানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউ পারছে না। উদয়ের এমন প্রহারে তাকে দেখতে ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মত লাগছে।
সিয়াম অনেকক্ষণ ধরে সহ্য করছে। সিয়ামের এমন করুন দশা দেখে রোকেয়া বেগম আর সহ্য করতে পারলো না। উদয়কে এক টানে তার দিকে ফিরিয়ে শরীরের যতো শক্তি আছে সব প্রয়োগ করে এক থাপ্পড় বসালো। অনেকক্ষণ ধরে মারার কারণে এবং ইরার চিন্তায় উদয়ের শরীরও কিছুটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। রোকেয়া বেগম এর রাগে উদয় কিছুটা শান্ত হয়ে যায়। রোকেয়া বেগম এর চোখ লাল হয়ে আছে। রুপা এবং লুৎফা বেগম কান্না করতে করতে সিয়ামকে ধরে সোফায় বসালো। লতিফা বেগম বাড়িতে নেই,তার বাবার বাড়িতে গেছে বিয়ের দাওয়াত দিতে।
উদয় মায়ের দিকে তাকিয়ে, নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে, মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা সবটুকু আবেগ অনুভূতি বের করে দিয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো হাঁটু গেড়ে বসে অঝোরে কাঁদতে লাগলো আর বলল,
উদয়:"আম্মু ওই শুয়োরের বাচ্চা আমার কলিজা, আমার জীবনকে কিডন্যাপ করিয়েছে। নিজের মায়ের মতো ওই ও আমার সাথে বেইমানি করেছে। আমার নিস্পাপ পাখীকে আমার কাছ থেকে দূরে সরাতে চাইছে।"
উদয়ের এমন আজহরি এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। সিয়ামের বিরূদ্ধে তোলা অভিযোগ শোনে সিয়াম যেনো পাথর হয়ে গেছে। রুপা অবাক চোখে একবার সিয়ামের দিকে তো আর একবার উদয়ের দিকে তাকাচ্ছে। একদিকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় এবং একমাত্র ভাইয়ের এমন আহাজারি আর অন্যদিকে নিজের জীবনসঙ্গী, চিরসখা কাউকেই সে অবিশ্বাস করতে পারছে না। সব কেমন যেনো গুলিয়ে ফেলছে।
লুৎফা বেগম ছেলের রক্তাক্ত দেহ দেখে কান্না করতে করতে বলল,
লুৎফা:"তুই আমার শাস্তি আমার এই নিষ্পাপ ছেলেকে কেনো দিলি উদয়। ও তোর কি ক্ষতি করেছে, তুই কেনো এভাবে ওকে রক্তাক্ত করলি?"
উদয় চিৎকার করে বললো,
উদয়:"চুপ, তোরা মা ছেলে মিলে আমার পরিবারকে ধ্বংস করতে চাইছিস। তোর ছেলেকে জিজ্ঞেস কর আমার ইরাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে?"
রোকেয়া:"কি ভাবে কথা বলছিস তোর ফুপ্পির সাথে? আর ইরাকে সিয়াম কোথায় লুকিয়ে রেখেছে? ইরা কোথায়?"
উদয়:"ওটা ওই কুলাঙ্গার কেই জিজ্ঞেস করো আম্মু।"
সিয়াম কাপকাপা কণ্ঠে বলল,
সিয়াম:"আমি কি করেছি একটু খুলে বলবি প্লীজ?"
উদয়:"ইরাকে কেনো কিডন্যাপ করলি ভাই?"
সিয়াম:"আমি ইরাকে কিডন্যাপ করেছি মানে "
উদয় সব ঘটনা খুলে বললো। কিডন্যাপার গুলো যেই গাড়িতে করে ইরাকে তুলে নিয়ে গেছিল সেই গাড়িটা সিয়ামের। এটা জানতে পেরেই উদয় সিয়াম এর সাথে এমন করলো। সিয়াম বললো,
সিয়াম:"আমি তো আমার গাড়ি বাড়িতেই রেখে গিয়েছিলাম। শপিং থেকে আসার পর থেকে তো আমি রুপার সাথেই ছিলাম। সত্যি বলছি। বিশ্বাস না হলে রুপা কে জিজ্ঞেস কর।"
উদয় রুপার দিকে তাকালো। রুপা উপর নিচ মাথা নাড়ায়। উদয় কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। ওইসময় শাহেদ চৌধুরী বাড়িতে এসে বাড়ির এই অবস্থা দেখে অবাক হয়।
শাহেদ:"কি হয়েছে? বাড়িতে কি সুনামি এসেছিল নাকি। সবকিছু এভাবে ভাঙলো কিভাবে?"
রোকেয়া বেগম কাদতে কাদতে সব খুলে বললো। শাহেদ চৌধুরীর কপালে চিন্তার রেখা দেখা দিলো। উদয় উনার কাছে এসে বিচলিত কণ্ঠে শুধাল,
উদয়:"প্লীজ আব্বু তুমি আমার ইরাকে খুঁজে দাও। আমি বাঁচবো না ইরাকে ছাড়া। ও যে আমার অক্সিজেন।"
শাহেদ:"শান্ত হও উদয়। আমি দেখছি কি করা যায়"
উদয়ের ফোন বেজে উঠলো। রিফাত কল করেছে।
উদয়:"বল রিফাত"
রিফাত:"গাড়ির খোজ পাওয়া গেছে উদয়। তোকে লোকেশন পাঠাচ্ছি।তাড়াতাড়ি আয়।গাড়িতে কেউ নেই,আশেপাশেও কেউ নেই।"
উদয়:"ওকে "
উদয় বেড়িয়ে গেলো। যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলো,' গাড়ীর খোজ পাওয়া গেছে '
--
ইরা মিটমিট করে চোখ খুললো।নিজেকে জঙ্গলের মধ্যে আবিষ্কার করে ভয়ে আতকে উঠলো। আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে করতে কিছুক্ষণ সময় লাগলো। এখন ড্রাগসের প্রভাব মোটামুটি কেটে গেছে এখন। ইরা নিজেকে অক্ষত অবস্থায় দেখে কিছুটা অবাক হলো। ওর বাবা মার খুনি ওকে হাতের কাছে পেয়েও কেনো মারলো না, কোনো আঘাত করা ছাড়াই কেনো এভাবে ছেড়ে দিলো, ইরা বুঝতে পারছে না।
ইরার বিয়েতে সরাসরি রাজি হওয়ার মেইন কারণ হচ্ছে তার বাবা মায়ের খুনিকে এক্সপোজ করা। ইরা সেটা প্রায় করেও ফেলেছিল। একটুর জন্য হলো না। ইরা যাকে সন্দেহ করছে যদি খুনি সে হয় তাহলে ইরা কি করবে সেটা ভেবে পাচ্ছে না।
ইরা যেই উঠে দাড়াতে যাবে ওমনি তাঁর চোখে একটা বাটন ফোন পড়লো। সে ফোনটা হাতে নিতেই কল লিস্টে উদয়ের নামে একটা নাম্বার সেভ করা দেখে ভীষণ অবাক হলো। তবে দেরি না করে ওই নাম্বারে কল লাগালো।
--
উদয় রিফাতের সাথে ইরাকে খুঁজে চলেছে, যেই এলাকায় গাড়িটি পাওয়া গেছে ওই এলাকা উদয় তন্ন তন্ন করে খুজে ফেলেছে পুলিশ দিয়ে। উদয় প্রায় পাগলের মতো বিহেভ করছে।
ফোন বাজছে কিন্তু উদয়ের সে দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে মনে মনে আল্লাহ্ কে ডাকছে।
বার বার ফোনের রিংটোন খুব বিরক্ত লাগছে তাঁর। তাই ফোন বের করে ধরতে যাবে দেখল অপরিচিত নাম্বার, ভাবলো কেটে দিবে কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলো ইরার বিষয়ে কোনো খবর ও হতে পারে বা কিডনাপারের ফোনও হতে পারে। তাই উদয় কল ধরলো।
ওপাশ থেকে ইরা হকচকিয়ে বললো,
ইরা:"কে... কে বলছেন? উদয় ভাই?"
ইরার কন্ঠ শুনে উদয় মুহুর্তের মধ্যেই তার চিনে ফেললো। উদয়ের মন কেমন যেনো শান্ত হয়ে গেলো। মনে হলো নিজের জীবন ফিরে পেয়েছে। উদয় কাপা কণ্ঠে বিচলিত হয়ে বলল,
উদয়:"কোথায় আছিস পাখি? ওরা তোকে কোথায় নিয়ে গেছে? কারা ওরা? শুধু একবার বল আমাকে। ওরা কি তোকে কিছু করেছে?"
ইরা ফোঁপাচ্ছে। ওর ফুপানোর শব্দে উদয় উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
উদয়:"কি হয়েছে জানপাখি? কথা বলছিস না কেন? আমার কিন্তু খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার দম আটকে আসছে।"
ইরা কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
ইরা:"আমি একটা জঙ্গলে আছি উদয় ভাই। প্লীজ আমাকে এসে নিয়ে জান। আমার খুব ভয় করছে। চারপাশ কেমন যেনো অন্ধকার হয়ে আসছে।"
উদয়:"তুই কিছুক্ষণ নিজেকে সেইফ রাখ বেটারহাফ।আমি আসছি। আর আমি কল বেক করছি,কল কাটবি না।"
ইরা:"আচ্ছা "
উদয় কল কেটে কল বেক করলে ইরা রিসিভ করে। উদয় নাম্বারের লোকেশন ট্রেস করে গাড়ি নিয়ে একাই বেরিয়ে পড়লো।
--
সন্ধ্যা পাঁচটার কাছাকাছি,
জঙ্গল হওয়ার দরুণ চারপাশ একটু বেশিই অন্ধকার দেখাচ্ছে। উদয় বার বার বলছে,
উদয়:"ভয় পাস না পাখি। আমি আসছি। আর কিছুক্ষণ আমার জন্য নিজেকে রক্ষা কর বউ। প্লীজ।"
ইরা:"আমার খুব ভয় করছে "
উদয়:"আমি আসছি বউ "
ইরা নিজের আশেপাশে কারো উপস্থিতি বুঝতে পারল। ভয়ে তার শরীরের লোম দাড়িয়ে গেছে।
জঙ্গলটা বেশি গভীর না, তাই এখানে ভয়ংকর কোনো জন্তু আসার চান্স ও নেই।
হঠাৎ ইরার সামনে এসে ওই অচেনা লোকটা এসে দাড়ালো। লোকটাকে দেখে ইরা চিনতে পারলো যে এই লোকটিই তাকে কিডন্যাপ করেছিল। আবার নিজেই ছেড়ে দিয়েছে। লোকটা তাচ্ছিল্য করে বললো,
"ভবিষ্যতে আবারও দেখা হবে, আজকের মতো বিদায় মিসেস চৌধুরী।"
উদয় ওপাশ থেকে স্পষ্ট শুনতে পেলো। মোবাইল ইরার কানেই ধরা ছিলো। উদয় বললো,
উদয়:"ওকে কিছুক্ষণের জন্য আটকে রাখার চেষ্টা কর বউ। আমি পৌঁছে গেছি।"
ইরা প্রতিত্তরে কিছু বললো না।সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে উদ্দ্যেশ্য করে বললো,
ইরা:"আপনি কে? সামনে আসতে এতো ভয় পাচ্ছেন কেনো? আমার বাবা মা আপনার কি ক্ষতি করেছিল যে তাদের সাথে এমন করলেন "
লোকটা মুখে হয়তো মুখোশের আড়ালে কাপড় গুঁজে রেখেছে তাই কন্ঠ চিনা যাচ্ছে না। লোকটা বিশ্রী ভাবে হেসে বললো,
"এতো চালাকি ভালো না মিসেস চৌধুরী। আপনার হাসবেন্ড পৌঁছে গেছে। উনার সাথে ভালোয় ভালোয় বাড়ি চলে যান। এটাতো কেবল ট্রেইলার ছিলো। এর পর বেশি উড়লে ডানা কাটতে দু সেকেন্ড ভাববো না।"
--
চলবে..?