গল্প: #তোমায়_না_চিনেও_চেনা
লেখিকা: #সুহাসিনী(এইশাত_রাদিয়া)
#পর্ব:৩৫
উদয়:"তোমাকে কথাটা কীভাবে বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না। আজকে এই খুশির দিনেই কথাটা বলতে হবে আমাকে। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।"
রোকেয়া:"বল কি বলবি, যাহ বলবি সেটা সহ্য করার ক্ষমতা নিশ্চয় আমার আছে।"
রোকেয়া বেগম হয়তো কিছুটা আন্তাজ করতে পারছে উদয় কি বলবে। উনার বুকটা কেমন যেনো মোচড় দিচ্ছে।
উদয়:"মামা মামী কে যে মেরেছে সে এই বাড়িরই একজন এবং আমাদের খুব কাছের, তোমার খুব কাছের.."
উদয়কে থামিয়ে দিলেন রোকেয়া বেগম। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। কাপা কাপা কণ্ঠে বললেন,
রোকেয়া:"প্লীজ বাপ ওই কথাটা বলিস না। মিথ্যা বলবি না আমাকে। আমি শুনবো না তোর কথা।"
রোকেয়া বেগম রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ায়। উদয় গিয়ে মাকে জরিয়ে ধরে। খুব শান্ত কণ্ঠে বলে,
উদয়:"আব্বু করেছে আম্মু..."
রোকেয়া বেগম উদয়কে ছাড়িয়ে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় ছেলের গালে। উদয় যেনো এটার জন্য প্রস্তুত ছিলো।
ইরা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে মা ছেলের কাণ্ড দেখছে। এর মধ্যে সিয়াম, রুপা, নিশিও এসে দাঁড়িয়েছে। মায়ের এমন রুপ দেখে রুপা একদম থমকে গেছে। এর আগে কখনো রোকেয়া বেগম উদয়ের গায়ে তুলেনি, রুপাকে যদিও মাঝে মাঝে দুষ্টামির জন্য মারতো কিন্তু উদয়ের সময়ে তার প্রয়োজনই পড়েনি। তার কারণ উদয় ছোট থেকেই শান্ত এবং বোঝদার।
রুপা দৌঁড়ে গিয়ে রোকেয়া বেগমকে ধরলো। রোকেয়া বেগম রাগে কাপতে কাপতে বললেন,
রোকেয়া:"আমি কি শুনতে চেয়েছি যে কে খুনি? তোকে বলেছি তুই মিথ্যা বলবি না। তবুও তুই মিথ্যা বললি। যাহ আমার সামনে থেকে তুই।"
উদয় আবার এগিয়ে এসে মাকে অধিক স্নেহের সহিত জড়িয়ে ধরে বলল,
উদয়:"কেনো নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ আম্মু, তুমি তো অন্যায়কে প্রশ্রয় দাওনি কখনো, তবে আজকে কেনো আসামির জায়গায় নিজের স্বামীকে দাড় করাতে পারছো না? কেনো এতো বড়ো অন্যায়কে মেনে নিচ্ছ।"
রোকেয়া বেগম বাকহারা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। উদয় রোকেয়া বেগমকে ছেড়ে ইরাকে দেখিয়ে বলে,
উদয়:"এই মেয়েটার দিকে একবার তাঁকিয়ে দেখো আম্মু, ও তো তোমারও রক্ত। এই মেয়েটা ধরতে গেলে ছোটো থেকেই মা বাবা ছাড়া বড়ো হয়েছে। তুমি তো দেখেছ ওর কষ্টটা।নানা নানী মারা যাওয়ার পর মামায় তোমাকে বড়ো করেছে শুনেছি, তাহলে তুমি তার খুনি কে সেটা জেনেও কিভাবে চুপ করে আছো। তোমার কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না আম্মু। এক বার ভেবে দেখো এই মেয়েটার মনে কি চলছে?"
এবার রোকেয়া বেগম হাউমাউ করে কেঁদে দেয়। দৌঁড়ে গিয়ে ইরাকে জরিয়ে ধরে কাদতেঁ থাকে আর বলেন,
রোকেয়া:"আমাকে ক্ষমা করে দিস মা,আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি। তোর পাশে আমি দাঁড়াতে পারিনি। এতো বছরের মায়া ত্যাগ করতে না পেরে তোর প্রতি আমি অন্যায় করেছি মা।"
ইরা:"তুমি কেনো অন্যায় করোনি ফুপ্পি। তুমি তো মেহেন্দির দিন সবকিছু জেনেছো। কোনকিছু প্রকাশ করার চেয়ে লুকিয়ে রাখা যে আরও বেশি কঠিন।"
তাদের কথায় মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে শাহেদ চৌধুরী। এতক্ষণে ড্রয়িংরুমে সবাই এসে উপস্থিত হয়েছে। লিয়ানা এবং লাইসুও এসেছে। তারা নিজে থেকে এসেছে বললে ভুল হবে উদয়ই তাঁদের আসতে বলেছে। শাহেদ চৌধুরী এসব দেখে কিছুটা ঘাবড়ে যান। নিজেকে কন্ট্রোল করে নামতে নামতে কর্কশ গলায় বলেন,
শাহেদ চৌধুরী:"কি হচ্ছে এখানে? সবাই কাজ ফেলে এখানে ভিড় জমিয়েছ কেনো?নাকি বিয়ে করার ইচ্ছে নেই কারো?"
সবার দৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু এখন শাহেদ চৌধুরী। তিনি নেমে আরাম করে সোফায় বসলেন। উদয় বলল,
উদয়:"আব্বু আমি কি জানতে পারি এসব কেনো করছো তুমি?"
শাহেদ এর বুঝতে বাকি নেই যে সবাই সব জেনে গেছে। তিনি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন এই দিনটার জন্য। কিন্তু ভাবতে পারেননি এই দিনটার সম্মুখীন এতো তাড়াতাড়ি হবে তাকে। তিনি স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
শাহেদ চৌধুরী:"কি বলতে চাচ্ছো তুমি?"
উদয়:"তুমি যা বুঝেছো তাই"
শাহেদ চৌধুরী:"তুমি যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছো তোমার কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে?"
এবার উদয় চুপ। ড্রয়িংরুম কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে গেলো। সবার দৃষ্টি উদয়ের দিকে আর উদয়ের দৃষ্টি ইরার দিকে।
শাহেদ চৌধুরী খুব বিশ্রী ভাবে হাসলেন। ইরার মনে হয়ে গেলো সেই দিনের কথা, যেই দিন ইরাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল।
সবাইকে চুপ থাকতে দেখে শাহেদ চৌধুরী ভাবলেশহীন ভাবে বললো,
শাহেদ চৌধুরী:"যাও, সবাই সবার কাজে যাও। দুপুরের আগে ভেন্যুতে পৌঁছাতে হবে। বিয়ে টা আগে শেষ করো তারপর না হয় এসব নিয়ে ভাবা যাবে। আর যদি বিয়ে করতে না চাও বলে দাও"
শাহেদ চৌধুরী কথাটা বলেই চলে যেতে পা বাড়ালেন। হঠাৎ পেছন থেকে উদয়ের হাসির শব্দ শোনা যায়। উদয় হাসতে হাসতে সোফায় বসে পড়ে একদম শাহেদ চৌধুরীর স্ট্যাইলে। হাঁটু নাচাতে নাচাতে বলে,
উদয়:"আমাকে কি মনে করেছিলেন মিস্টার চৌধুরী? এতো কাঁচা খেলোয়াড় আমি নয়। আমার বাপ যদি এতো হারামী হয় তাহলে ভেবে দেখুন আমি কোন লেভেলের হারামী।"
উদয়ের কথায় শাহেদ চৌধুরী কিছুটা থতমত খেয়ে যায়। উদয় আবার বলতে শুরু করে,
উদয়:"আপনার যাওয়ার তো দেখি খুব তাড়া। যাবেন তো কিন্তু বাড়ির ভেতরে না সোজা জেলে।"
শাহেদ চৌধুরী:"কিভাবে কথা বলছ তুমি বাবার সাথে? কোনো ভদ্রতা বজায় নেই তোমার মধ্যে।"
উদয়:"ভদ্রতা বলতে কেনো ওয়ার্ড আমার ডিকশনারিতে নেই মায় ডেয়ার আব্বা। বাবাই যেহেতু একজন খুনী তাহলে ছেলের মধ্যে ভদ্রতা খোজা বিলাসিতা।"
শাহেদ:"তোমার জিব্বাহ সামলাও এখনো সময় আছে।"
উদয়:"জিব্বা কি মেয়েদের ওড়না নাকি যে সামলে রাখবো।আমার জিব্বা আমি যা খুশি বলবো বলবো। পারলে আটকে দেখান মিস্টার চৌধুরী।"
উদয়ের কথায় নিশি হাসি আটকে রাখতে না পেরে ফিক করে হেঁসে দিলো। শাহেদ চৌধুরী রাগী দৃষ্টিতে তাকাতেই নিজেকে সামলে নিলো। শাহেদ চৌধুরীর দৃষ্টি দেখে বুঝা যাচ্ছে তিনি শুধু পারছেন না নিশিকে চিবিয়ে খেতে। ইরা যখন নিশিকে হালকা ধাক্কা দিলো তখন সে বুঝতে পারলো ভুল জায়গায় ভুল কাজ করে ফেলেছে। অবশ্য এটায় ওর কাজ।সে নিজেই মনে মনে বলল,
নিশি:"নিশিরে নিজের হাসিটাকে একটু সামলা।নয়তো যেকোনো সময় এই হাসির জন্য গণধোলাই খেতে হবে।"
কিছু একটা ভেবে আবার মনে মনে বলল,
নিশি:"হাসি কি শাড়ির আঁচল নাকি যে সামলাবো।"
বলেই আবার হাসতে নিলো কিন্তু একটু আগের কাহিনী মনে হতেই নিজের হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো।
একটু থেমে উদয় আবার বলতে শুরু করলো..
চলবে..?