ফন্ট সাইজ:
থিম:
বসন্ত বিলাসিনী

৫ম পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

#বসন্ত_বিলাসিনী

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_৫

নয়ন মাথা নিচু করে বসে আছে।সে আর কি বলবে?বলার মতো ইজ্জত কিছু রাখতে পেরেছে?তবে বন্ধুর কাছে এভাবে ধরা না খেলেও চলত।

'কিরে কথা বলছিস না কেন? ডাইরিয়া, আমাশয় নিয়ে ঝোপের আড়ালে চুমু-টুমু খেতে কোন সমস্যা হয় নি তো আবার?'

'আরে শুন....স্নিগ্ধ। মানে হয়েছে ম..মানে সব বল..বলছি তোকে।'

'থতমত খাচ্ছিস কেন?'

'আরে আপনি উনাকে এত প্রশ্ন করছেন কেন?সে নিজের ভালোবাসার মানুষকে চুমু খেলে কি আপনাদের জানিয়ে খেতে হবে নাকি?'

চাঁদনীর কথায় এবার নয়ন একটু সাহস পায়।সেও চাঁদনীকে অনুসরণ করে বলে,

'ভাবী আপনি একেবারে ঠিক বলেছেন।আর আমি চুমু কই খাচ্ছিলাম?ওইটা তো লাভ থ্যারাপি।'

'তুই চুপ থাক।আর চাঁদনী তুমি ওর হয়ে সাফাই গাইতে এসো না।শালা একটা বাটপার। আমাদের এতদিন বলেছে ওর নাকি পেছন লিক হয়ে গেছে আর এখন দেখ এখানে লুকিয়ে লুকিয়ে রঙ্গলীলা করা হচ্ছে।'

'আপনার মন চাইলে আপনিও করুন না।নিষেধ করেছে কেউ?খালি খালি অন্যকে বিরক্ত করা।আর আপনাদের বললে নিশ্চিত কিছু না কিছু তো একটা করতেনই তাই হয়তো বলে নি।আসলে আপনারা তো আবার সুবিধার লোক না।পরে যদি ছেলেটার প্রেমিকা নিয়ে লম্ফঝম্প করতেন?'

'আমাকে দেখে কি লম্পট মনে হয় নাকি?যে আমি লম্ফঝম্ফ করবো?আরেকটা কি বললে?আসলেই মন চাইলে করবো?কেউ আবার নিষেধ করবে না তো?তাহলে দেরী কিসের? এই নয়ন একটা রুম বুক করতো ভাই।তোর ভাবী আর আমি আজ লাভ থ্যারাপি প্যাকটিস করবো।'

-

আদিপের ছাদে দেশী-বিদেশী হরেক রকম কবুতর আছে।কবুতর পালা তার এক প্রকার শখ।শুরুতে তার শখ হলেও এখন তার বন্ধমহলও এই শখের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।বিকেলে তার ছাদে প্রায় সব বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেয়।প্রায় রাতে বারবিকিউ পার্টি,গান গাওয়া,আবার কখনো বা কোনো কারন ছাড়াই ছাদে সময় কাটায় সকলে।

আদিপ ছাদে বসে বসে কবুতরকে খাবার খাওয়াচ্ছে।হঠাৎ তার ছোট বোন আদিবা ছাদে আসে।আদিপকে ইশারায় নিজের কাছে ঢেকে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

'ভাই অধোরা এসেছে।দেখা করবি না?'

অধোরার নামটা শুনতেই আদিপের ভেতরটা কেমন যেন হল্লা করে উঠে।আদিপ জিজ্ঞাসু কন্ঠে আদিবাকে জিজ্ঞেস করে,

'হ্যারে সত্যি অধোরা এসেছে?একা এসেছে নাকি সঙ্গে কেউ এসেছে?'

'স্নিগ্ধ ভাইয়ের আম্মুর সঙ্গে এসেছে।উনি এদিকে একটা কাজে এসেছিলেন।পরে সেখান থেকে আমাদের বাড়ি এলেন।জলদি গিয়ে তোর রাতের ঘুম হারাম করা মেয়েটাকে দেখে আয় ভাই।'

কথাটা বলেই আদিপা মিটমিটিয়ে হেসে উঠে।আদিপ তাতে অবশ্য একটু লজ্জা পায়।তবে তাকে লজ্জা সোভা পায় না।তাই সে আদিবার মাথায় একটা চড় মেরে বলে,

'হয়েছে বেশি পেকেছিস দেখছি।যা ঘরে গিয়ে পড়তে বস গাধী।'

আদিপা মুখ ভেংচি কেটে ভাইকে বলে,

'গাধী বলেছিস না ভাই? দেখিস অধোরার মামলায় তোকে আর একটু সাহায্য করবো না।আর মাকেও বলে দিবো তুই যে আমাকে গাধী বলেছিস।যাচ্ছি আমি।'

'যা মন চায় কর গিয়ে।'

-

চাঁদনীদের এলাকার কাছাকাছি চলে এসেছে স্নিগ্ধ। বাইকের পেছনে মুখ কালো করে বসে আছে চাঁদনী। যেন চাঁদ তার গা স্বইচ্ছায় কলঙ্কে লেপ্টে রেখেছে।নিজেদের মাঝে দৃশ্যমান এক দেয়াল তুলে দিয়েছে চাঁদনী। কলেজ ব্যাগটি আলতোভাবে তাদের দুজনের মাঝখানে রেখে।স্নিগ্ধ প্রথমে এসব দেখে খানিক মজা নিয়েছিল, মনে মনে ভেবেছিল চাঁদনীকে আর একটু খেপানো যায় কি না। কিন্তু চাঁদনীর অভিমানী চাহনি আর অগ্নিময় নীরবতা তার আনন্দকে মুহূর্তেই ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। অতঃপর নিজেই চুপসে যায়।

'আমাকে এখানেই নামিয়ে দিলে খুশী হবো।'বলল চাঁদনী।

'তোমার বাড়ি তো এখান থেকে বেশ ভালোই দূরে।'

'বলেছি না নামিয়ে দিতে?তা না হলে কিন্তু লাফ দিয়ে দিবো।'

'না বউ না, এসব বলে না।তোমার হবু স্বামীর যে কলিজায় লাগে এসব কথা।এটা তো তোমার স্বামীর কোল থেকে গাড়ি হতে নামার বয়স।আর তুমি কিনা হবু স্বামীর সামনেই বলছো গাড়ি থেকে থেকে লাফ দিবে?'

স্নিগ্ধ চাঁদনীকে বাইক থেকে নামিয়ে দেয়।চাঁদনী কিছু না বলেই যাওয়ার জন্য হাঁটা শুরু করে।তাতে স্নিগ্ধ শিস বাজিয়ে চাঁদনীকে পেছন ফেরার ইঙ্গিত দিয়ে বলে,

'এই যে বউ!হবু স্বামীকে চুমু না দিয়েই কিন্তু চলে যাচ্ছো।চুমু না দাও একটু জড়িয়ে ধরে কলিজায় লাগানো আগুনটা তো নিভালেও পারো?বউ তোমার পাপ লাগবে পাপ।'

চাঁদনী পেছন ফিরে মুখ উল্টে জবাব দেয়,

'প্রয়োজনে রাস্তার কুকুরকে চুমু খাবো শেখ সাহেব তবুও আপনাকে না।'

'হায় খোদা! আমি থাকতে আমার বন্ধুদেরই তোমার চুমু খেতে মন চাইলো?পোড়া কপাল!'

-

বিকেলের নরম আলোয় প্রকৃতি যেন এক অদ্ভুত মায়াবী সাজে সজ্জিত। ঘরের বাইরে হালকা শীতের পরশে গাছের পাতা নড়ে ওঠে মৃদু হাওয়ার সঙ্গে। দূরে কোথাও কেউ হয়তো আগুন জ্বালিয়েছে—সেই গন্ধ হালকা ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে বাতাসে ভাসছে। আকাশের সূর্য অস্ত যাওয়ার আগ মুহূর্তে একরাশ কমলা রঙ মেখে গায়ে মেখেছে।যা জানালার কাচ গলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করছে।ড্রয়িং রুমের ছোট্ট উষ্ণতার ভেতরে সবাই মিলে আড্ডায় মশগুল। হাসি আর কফির কাপের ধোঁয়া মিলেমিশে এক স্নিগ্ধ পরিবেশ তৈরি করেছে। সকলের মাঝে বসে থাকা অধোরার চেহারায় যেন বিকেলের আলোটা বেশ উজ্জ্বল করেই ফুটে উঠেছে।মেয়েটার মুখে এক অদ্ভুত শান্ত মাধুর্য, ডাগর নয়নে গভীর প্রশান্তি।

ঘরে প্রবেশ করতেই আদিপের দৃষ্টি পড়ল অধোরার ওপর। অধোরাকে দেখে তার বুকের গভীরে যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ে।মুহুর্তেই কোনো এক আশা নিয়ে তা আবার জোড়া লাগে। মনের ভেতর দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অদ্ভুত তৃষ্ণা এক নিমেষে উধাও হয়ে যায়। এই তৃষ্ণা দৈহিক নয়, যে সহজেই মিটে যাবে এ যে মনের, অন্তরের তৃষ্ণা।অকস্মাৎ অধোরা চোখ তুলে আদিপের দিকে তাকায়।ঠোঁটে তার বিনয়ের হাসি।শ্যামাঙ্গিনীর এই এক পলকের চাহনি যেন আদিপের ভেতরকার জ্বলে উঠা সেই অতলান্তিক শূন্যতাকে নিমিষেই প্রশমিত করে দিল।আদিপের মা আয়েশা বানু তাকে দেখতেই বলে উঠেন,

'কিরে বাবা কাজ শেষ হয়েছে তোর?দেখ আমাদের বাড়িতে কে এসেছে।'

আদিপ অধোরার দিকে তাকাতেই অধোরা তাকে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে,

'কেমন আছেন ভাইয়া।'

'হ্যা আছি তো বেশ।তুমি?'

'ভালো।'

ব্যাস আদিপের মনে জমে থাকা কথারা কেন জানি আঁটকে গেল।ভেতর থেকে বের হওয়ার ব্যাপক ইচ্ছে থাকলেও তার কোনো এক দ্বিধায় বের হতে পারছে না।

'বাবা আদিপ, তোমার কাছে একটা দরকারি কাজে এসেছিলাম।বলি কি তুমি তো ভালো আইসিটি পড়াও।যদি আমার অধোরাটাকে পড়াতে।স্নিগ্ধই চাইলে পড়াতে পাড়ত কিন্তু সে ছেলের কথা আর কি বলব?তার কি বাড়িতে কাউকে দেওয়ার মতো সময় আছে?তুমি একটু দেখো না।চাইলে তোমার বাসাতেও পড়াতে পারো আবার আমাদের বাড়িতেও।নিজেদের মধ্যে ভালো মাস্টার থাকতে মেয়েটাকে বাহিরে কারো হাতে দিতে ইচ্ছে হলো না।'

আদিপের তো খুশীর অন্ত রইলো না।অধোরাকে প্রাইভেট পড়ানো মানে আরো কাছ থেকে দেখা,ওর সঙ্গে সময় কাটানো ওকে আরো ভালো করে বুঝার সুযোগ। এই সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়?আদিপ বিনা দ্বিধায় সম্মতি জানালো।এটাই সুযোগ অধোরার কাছে যাওয়ার, তার বিশ্বাসী সহচর হয়ে উঠার।

-

সূর্য ডুবে গিয়ে আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ম্লান লালচে আলো, ঠিক যেন আগুনের শেষ ধোঁয়া।চাঁদনী গোসল শেষে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।তার ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। হালকা ভেজা কামিজ তার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গিয়ে তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে, যেন গোটা অস্তগামী আলো তাকে এক অনন্য আভায় মোড়ানো জীবন্ত প্রতিমা বানিয়ে দিয়েছে।

বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ায় সে। প্রধান সড়কের দিকে তাকিয়ে দূরদৃষ্টি মেলে। দূর থেকে ভেসে আসা গাড়ির হেডলাইটের আলো কখনও ম্লান, কখনও বা তীব্র হয়ে ছায়াপথ সৃষ্টি করছে। সেদিকেই নজর চাঁদনীর। হঠাৎ বাতাসে সিগারেটের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তেই চাঁদনী চমকে উঠে। চারপাশের নীরবতা ভেঙে দেয় তার কৌতূহল। ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছন ফিরতেই দেখতে পায়,বারান্দার দরজার কাছে অলিভ রঙের শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরে, শ্যামবর্ণের এক পুরুষ দাঁড়িয়ে। হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা তার আরামি ভঙ্গি যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে তার চোখ-মুখে জেগে উঠা কামুকতার কথা।

চাঁদনী বিস্ময়ের স্বরে বলে উঠল, 'জারিফ ভাই, তুমি? ঢাকা থেকে কখন এলে?'

জারিফ ত্রুর হেসে উত্তর দেয়, 'হ্যাঁ, আমি। কেমন সারপ্রাইজ দিলাম?'

আসলে জারিফ চাঁদনীর খালাতো ভাই।এ বাড়ির বড় ছেলে।এই তো এই বছরেই চাঁদনী গ্রাম থেকে গাজীপুর এসেছে। গ্রামে ভালো কোন কলেজ নেই বলে চাঁদনীর বাবা-মা তাকে খালার বাড়ি গাজীপুর পাঠিয়ে দেয়।সেই থেকে এখানেই থাকছে।চাঁদনীর খালার দুই ছেলে,জারিফ আর জিহাদ।জারিফ ঢাকায় পড়াশোনা করত।এই তো কিছুদিন হলো সে পড়ালেখা কমপ্লিট করেছে।ছোট থেকেই চাঁদনী জারিফের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছে।জারিফকে দেখলেই তার ভয় লাগে। জারিফের ভারী কন্ঠে সে কেমন যেন ভয় অনুভব করে।তাই আচমকা আজ বাড়িতে জারিফকে দেখে সে একটু ভয় তো পাচ্ছেই।

'কিরে কোন দুনিয়ায় হারিয়ে গেলি তুই?'

'কই না তো।ঠিক আছি আমি।'

'আজ না হয় ঠিক আছিস তবে এখন থেকে যে এই বাড়িতে আমিও আছিরে চাঁদ। দেখি তুই কেমন করে ঠিক থাকিস। '

জারিফ একবার চাঁদনীর আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে। তারপর আবারো বাঁকা হেসে বলে,

'কয়েক বছরের ব্যবধানে বেশ হয়েছিস কিন্তু চাঁদ তুই।আমার যে এখনোই নেশা ধরে যাচ্ছে।'

চাঁদনীকে ঘাবড়াতে দেখে জারিফ মজা নেয়।

'ভয় পেও না সোনা, এখনো যে তোমার থেকে আমার অনেক কিছু উসুল করা বাকি।'

কথাটা বলেই জারিফ সেখান থেকে চলে যায়।চাঁদনীর ভেতরেও যেন প্রান চলে আসে।না জানি এখন এই বাড়িতে চাঁদনী কি করে থাকবে?দমটা তো কয়েক মুহুর্তের জন্যই চলে যাচ্ছিলো।জারিফ এখানে থাকা মানে অনেক লুকায়িত সত্যের সম্মুখীন হওয়া।যে করেই হোক ভালোয় ভালোয় জারিফকে ঢাকায় পাঠাতে হবে তা না হলে সবকিছু বরবাদ হবে।হঠাৎ চাঁদনীর স্নিগ্ধর কথা মনে পড়ে যায়।সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণে জেগে উঠে মুচকি হাসি।কিন্তু পরমুহূর্তেই চাঁদনী নিজের মাথায় নিজেই গাঁট্টা মেরে বলে উঠে,

'উঁহুম উঁহুম কন্ট্রোল।'

চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন