#পরিণীতা
#পর্ব :০৪
#তানজিনা ইসলাম
প্রাণেশা চুপচাপ বসে আছে ক্লাস রুমে।ক্লাসে খুবই কম সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী উপস্হিত।এখনো ক্লাস শুরু হতে ঢের বাকি।আজ প্রাণেশা একটু তাড়াতাড়িই কলেজে চলে এসেছে।বাড়িতে থাকলে প্রতিনিয়ত রওশা কে চোখের সামনে দেখতে হচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর।বাইরের এই খোলা বাতাসটুকু শ্বাস নেওয়ার জন্য খুব বেশিই প্রয়োজন ছিলো ওর।ক্লাসে যে কয়েক শিক্ষার্থী উপস্থিত আছে সবাই হরদম গল্প আর হৈ-হুল্লোড়ে মেতে আছে।ক্লাসের সব বন্ধুমহল খোশগল্পে বুদ।সবাই তাদের জমানো কথা উগ্লে দিচ্ছে তাদের প্রিয় বন্ধু-বান্ধবের কাছে।তবে আজকে প্রাণেশার এসবের কিছুই ভালো লাগছে না।যেখানে মন বিক্ষিপ্ত, সেখানে কারো হাসি-খুশিও সহ্য হয় না।এদের এতো আহ্লাদীপণা মাথা ব্যাথা ধরিয়ে দিচ্ছে প্রাণেশার।সহ্য হচ্ছে না কিছুই। বুকের ব্যাথার সাথে এখন মাথা ব্যাথাটাও চাঁড়া দিয়ে উঠছে।মাথা ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে টেবিলে মাথা রাখলো প্রাণেশা। পেছন থেকে কেও একজন চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো ওর।চুলে টান পরতেই প্রাণেশা চোখমুখ কুচকে মাথা উঠালো। সামনেই মুগ্ধর হাসি হাসি মুখ দেখে কপাল কুঁচকালো।মুগ্ধ হাসি হাসি মুখে বললো
-"কী রে ভুয়া,আজ তুই এতো তাড়াতাড়ি? আর এভাবে চুপ করে বসে আছিস কেন?"
প্রাণেশা বিরক্তিসুচক শব্দ করে মাথা নাড়ে।হাত দিয়ে দুপাশের বিনুনি দুটো ঠিক করার চেষ্টা করে।বন্ধুর প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না।মুগ্ধ ওর ছোটোবেলার বন্ধু। দুজনের গলায় গলায় বন্ধুত্ব। সেই প্লে থেকে একসাথে পড়াশোনা করেছে দুজনে। এখনো একসাথেই আছে।
প্রাণেশা কে চুপ থাকতে দেখে মুগ্ধর কপালে ভাজ পরে।হাসি হাসি মুখ মিইয়ে যায়। ভূইয়া কে দুষ্টামি করে ভুয়া ডাকে ও,
ছোটোবেলা থেকেই। অন্যসময় ভুয়া ডাকলে প্রাণেশা তেড়ে আসে মারার জন্য। আর আজকে যেন এসবের কোনো প্রভাবই পরলো না ওর উপর।প্রাণেশার মলিন মুখ দেখে মুগ্ধ চিন্তিত মুখশ্রীতে এসে বসলো প্রাণেশার পাশে।নিজের ব্যাগটা রাখলো টেবিলে প্রাণেশার ব্যাগের পাশে।চিন্তিত স্বরে বললো
-"কী হয়েছে তোর?মন খারাপ মনে হচ্ছে!"
-"না,কিছু হয়নি।"
প্রাণেশা কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো।
-"বললেই হলো কিছু হয়নি।তোর মুখের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু হয়েছে।কী হয়েছে বলতো?প্রত্যুষ ভাইয়া আবার কিছু বলেছে?"
প্রাণেশার বুকের যন্ত্রণা আরো বেড়ে যায় প্রত্যুষের নাম শুনে। অক্লিষ্ট ঢোক গিলে বলে
-"নাম নিস না তার!"
-"ওমা কেন!কী হয়েছে আবার?এমনিতে তো তার নাম নিলে লাল,নীল,বেগুনি সব হয়ে যাস।এখন নাম নিতে মানা করছিস কেন?বকা খেয়েছিস নাকি আবার?"
প্রাণেশা চোখ দিয়ে অবিকল ধারায় পানি গড়ায়।প্রাণেশা হাজার চেষ্টা করেও আটাতে পারে না তা। মুগ্ধ অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে।কান্নার কারণ বুঝতে পারলো না।বান্ধবীর কান্নার কারণ বুঝতে না পারলেও মুগ্ধ ওর পাশ ঘেঁষে বসলো।বিভ্রান্ত হয়ে বললো
-"দোস্ত,কী হয়েছে বল না!প্লিজ,টেনশন হচ্ছে এবার কিন্তু। বেশি বকা খেয়েছিস প্রত্যুষ ভাইয়া থেকে।"
প্রাণেশা কান্নার মাঝে দু-পাশে মাথা নাড়ালো।হাত দিয়ে মুখ চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো।মুগ্ধ বিহ্বলিত হলো।স্বান্তনা দিবে কী নিয়ে যেখানে ওর কান্নার কারণটাই জানা নেয় ওর!
প্রাণেশা সময় নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো নিজেকে।হৃৎপিণ্ড ছলাৎ ছলাৎ করে লাফাচ্ছে।দুদিনের জমানো সব কান্না সব কষ্ট চোখের পানি হয়ে বের হতে চাইছে।ওর মা-বাবার পরে একমাত্র মুগ্ধর কাছেই ও ওর সব যন্ত্রণা,সুখ,দুঃখ-কষ্ট শেয়ার করতে পারে।মুগ্ধর কাছে প্রাণেশা যেন একটা খোলা ডাইরি।যার কোনো কিছুই ওর কাছে লুকানো থাকে না।যাকে সহজেই পড়তে পারে মুগ্ধ।
মুগ্ধ মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো প্রাণেশার।নম্র কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
-"দোস্ত,আমাকে বলনা কী হয়েছে। প্লিজ কাঁদিস না।কেন কাঁদছিস এভাবে?"
প্রাণেশা হিচকি তুলে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
-"জানিস,প্রত্যুষ ভাইয়া বিয়ে করেছে আরেকটা মেয়েকে।"
মুগ্ধ হতভম্ব হয়ে তাকালো প্রাণেশার দিকে।মনে করলো সে যেন ভুল শুনেছে।নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে বিহ্বলিত কন্ঠে আবার বললো
-"আমি শুনলাম,প্রত্যুষ ভাই বিয়ে করেছে।ভুল শুনলাম হয়তো,তাই না?"
-"না,ভুল শুনিসনি। এটাই সত্যি। বিয়ে করেছে প্রত্যুষ ভাই আরেকটা মেয়েকে।কালকে তার বিয়ে করা বউকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে।"
প্রাণেশা নাক টেনে বললো।
মুগ্ধর বিশ্বাস হচ্ছে না যেন কথাটা।প্রত্যুষ আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করেছে এ যেন তার ভাবনার বাইরে।কিন্তু প্রাণেশার কান্না দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, ঠিক কতটা কষ্ট নিয়ে কাঁদছে মেয়েটা।
মুগ্ধ চেষ্টা করলো না আর প্রাণেশার কান্না থামানোর।প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্ট যে কোনো স্বান্তনায় নিরূপণ হবে না তা মুগ্ধর জানা।ও জানে প্রানেশা ক্ষণকাল বাচ্চাদের মতো কাঁদবে,তারপর নিজে নিজেই শান্ত হবে।
প্রাণেশা শান্ত হলো।কান্না থামিয়ে ভেজা চোখে তাকালো মুগ্ধর দিকে।মুগ্ধ নম্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো প্রাণেশার দিকে।বললো
-"এবার আমাকে খুলে বল কী হয়েছে? তোর কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।আমার জাস্ট বিশ্বাস হচ্ছে না,প্রত্যুষ ভাইয়ার বিয়ে করার ব্যাপারটা!"
-"কী আর হবে?প্রত্যুষ ভাইয়া বিয়ে করেছে।তুই বিশ্বাস না করলে আমার কিছু করার নেই।কিন্তু এটাই সত্যি! একটা অনেক সুন্দর মেয়েকে বিয়ে করেছে প্রত্যুষ ভাই।"
প্রাণেশা নেতানো কন্ঠে বললো।
মুগ্ধ চিন্তিত কন্ঠে বললো
-"কিন্তু প্রত্যুষ ভাইয়া এমন কেনো করেছে!সে না বলেছিলো তোকে বিয়ে করবে, তাহলে?তুই জিজ্ঞেস করিসনি কিছু?"
-"করেছি।খবরটা শোনার পরই ছুটে গিয়েছিলাম তার কাছে জিজ্ঞেস করতে।কিন্তু তার একরাশ অপমান পেয়ে ফিরে এসেছি!"
মুগ্ধর যেন আজ চমকের পর চমক শেষই হচ্ছে না।প্রত্যুষ অপমান করেছে তাও প্রাণেশাকে!মুগ্ধ নড়েচড়ে বসলো।কাঠকাঠ কন্ঠে বললো
-"খোলাসা করে বলতো কী বলেছে?একটা শব্দও বাদ দিবি না।"
-"প্রত্যুষ ভাই প্রচন্ড রেগে ছিলো। বলেছে সে আমাকে কোনোদিন ভালোই বাসেনি।আমি পাগলামো করতাম তাকে নিয়ে তাই আমার থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য আমার সাথে নাটক করেছে।আমার কোনো যোগ্যতা নেই তাকে পাওয়ার।আমি যাতে তাকে আর বিরক্ত না করি।"
মুগ্ধ ভাবলো কিছু একটা।চিন্তিত কন্ঠে বললো
-"দোস্ত, আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে।প্রত্যুষ ভাইয়া এসব মন থেকে বলছে না।"
-"সব মন থেকেই বলেছে রে,আসলেই আমার কী যোগ্যতা আছে তাকে পাওয়ার?আমি সবসময় তাকে নিয়ে পাগলামো করতাম তাই নাটক করেছে আমার সাথে।খেলেছে আমার ফিলিংস নিয়ে।"
-"আমার মনে হয় না প্রত্যুষ ভাই এমনকিছু করতে পারে। তুই একটু ভেবে দেখ হঠাৎ করেই কেনো বিয়ে করলো ভাইয়া।আবার বলছিস বাড়ির কেও জানতোই না।বাড়ির কাওকে না জানিয়ে বিয়ে করার কারণ?"
-"বড় আব্বু আর বাবা জানতো তো।"
প্রাণেশা মুগ্ধর কথার মাঝেই বললো।মুগ্ধর কপালে ভাজ পরে।বেঞ্চের উপর হাত ঠেকিয়ে চিন্তিত স্বরে বলে
-"কিছু তো গড়বড় আছেই দোস্ত।বড়রা এটা নিয়ে কিছু বলেনি?"
-"জানি না আমি।সারাক্ষণই তো দরজা বন্ধ করে বসেছিলাম।
প্রাণেশা চোখমুখ কুচকে বললো।
মুগ্ধ বড় করে শ্বাস ফেললো। প্রাণেশা কে বোঝানোর চেষ্টা করে বললো
-"শোন, আমি বলি তোকে সেদিন মুগ্ধ ভাই রেগে ছিলো। কিন্তু যদি নিজের ইচ্ছায়, নিজের পছন্দে বিয়ে করে তাহলে রেগে থাকবে কেনো।কেনোই বা রাগ তোর উপর ঝারবে।আবার বলছিস তোর মতো সেও দরজা বন্ধ করে বসেছিলো,যদি সদ্য বিয়ে করা বউকে এতই পছন্দ হয় তাহলে তাকে এতো অবহেলা করলো কেন?ব্যাপারটা চিন্তার না?"
প্রাণেশা ভাবলো।মাথা চুলকে বললো
-"আসলেই তো। আমি তো ব্যাপারটা চিন্তা করিনি।"
-"চিন্তা করবি কেমনে,মাথায় তো সব গোবরে ভরা।"
প্রাণেশা চোখ ছোট ছোট করে চাইলো মুগ্ধর দিকে।মুগ্ধ নিজের শার্টের কলার টেনে ভাব নিয়ে বললো
-"সবার তো আর আমার মতো এতো ভালো ব্রেইন থাকে না।"
প্রাণেশা তখনো ওর দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে ছিলো।মুগ্ধ আবার সিরিয়াস হয়ে বসলো।বললো
-"সেদিন ভাইয়া রেগে ছিলো তাই তোকে এতো কিছু বলেছে।কিন্তু রাগতো আর সবসময় থাকবে না।আজকে তুই আবার ভাইয়ার কাছে যাবি।জিজ্ঞেস করবি কেন এমন করলো।সময় নিয়ে কথা বলবি।ভাইয়া তোকে যায় বলুক না কেন, যতই বকা দিক না কেন তুই রুম ছেড়ে বেরোবি না।পুরো ঘটনা শুনে তারপরই সিদ্ধান্ত নিবি।ভালোবাসা পাওয়ার জন্য এটুকু তো করতেই হবে।নয়তো একদিনেই নিজের যে অবস্থা করেছিস,পরে তো তোকে খুজেই পাওয়া যাবে না।বুঝেছিস?"
প্রাণেশা বাচ্চাদের মতো উপর-নিচ মাথা নাড়ালো।মুগ্ধ মুচকি হেসে বললো
-"মনে হচ্ছে তোর প্রত্যুষ ভাই এখনো হারিয়ে যায়নি তোর থেকে।বিয়েটার পেছনে হয়তো কোনো না কোনো কারণ ছিলো।কারণটা উদ্ঘাটন করতে পারলেই প্রত্যুষ ভাই তোর ।এবার একটা সুন্দর হাসি দে।তোর গোমড়ামুখ দেখতে ভালো লাগছে না।"
প্রাণেশা ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো।জ্বলজ্বল চোখে তাকালো মুগ্ধর দিকে।উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো
-"সত্যিই প্রত্যুষ ভাই আমার হবে?"
-"আমার প্ল্যান ফোলো করলেই হবে।প্রতিটা প্ল্যান আমি তোকে স্টেপ বাই স্টেপ জানিয়ে দেবো।আমার কথামতো কাজ করলেই হবে।"
মুগ্ধ প্রাণেশার গাল টেনে দিয়ে বললো।কিছু একটা ভেবেই প্রাণেশার হাসি মিইয়ে যায়।মুখ কালো করে মুগ্ধর উদ্দেশ্যে বলে
-"ধরে নে সব ঠিক হলো।প্রত্যুষ ভাই আমার হলো।তারপর তার বউয়ের কী হবে?একটা মেয়ে থেকে তার স্বামী কে কেড়ে নিব?"
-"প্রত্যুষ ভাইয়া যদি তোকে ভালোবাসে তাহলে তুই আরেকজনের কথা কেন ভাবতে যাবি!ভালোবাসায় কোনো সেক্রিফাইজ নেই, না আছে কোনো কম্প্রোমাইজ।তুই বল যদি প্রত্যুষ প্রত্যুষ ভাইকে পাওয়ার কোনো চান্স আসে,সেটা তুই হাতছাড়া করবি?"
প্রাণেশা দুই পাশে মাথা নাড়লো।মুগ্ধ আবার বললো
-"তাহলে তুই আরেকজনের কথা চিন্তা করলে তো প্রিয় মানুষ কে হারায় ফেলতে হবে।এই বিষয়ে একটু স্বার্থপর যে হতেই হবে দোস্ত। হয়তো সৃষ্টিকর্তা সে মানুষটার জন্যও কাউকে না কাউকে মিলিয়ে দিবে!"
প্রাণেশা নিরব থাকলো কিছুক্ষণ। মুগ্ধও নিরবতা পালন করলো প্রাণেশার সাথে।কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর প্রাণেশা বললো
-"ঠিক বলেছিস।একটু স্বার্থপর হতেই হয়।যারা ভালোবাসা সেক্রিফাইজ করে তারা কখনো ভালো থাকতে পারে না।কিন্তু আমি ভালো থাকতে চাই।আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে ভালো থাকতে চাই। "
প্রাণেশা নিজের হাসি চওড়া করলো।এতোক্ষণে মনে হচ্ছে, বুক থেকে ভারী কোনো পাথর নেমেছে।কষ্টগুলো কোথায় যেন ভ্যানিশ হয়ে গেছে। মুগ্ধ আসলেই জাদুকরের মতো সব দুঃখ ভ্যানিশ করার ক্ষমতা রাখে।ইশ!আগে কেনো ওঁকে জানালো না এসব।কালকে যখন পুরোটা রাত ও কেঁদেছে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে তখনই তো কল করে হলেও জানাতে পরতো মুগ্ধকে।প্রাণেশা জানে না সে বুকে যে আশা বেঁধেছে তা আদোও সত্যি হবে কিনা! মুগ্ধর প্ল্যান আসলেই কাজ করবে কিনা তাও জানা নেই।শুধু এটুকু জানা আছে প্রাণেশা চিন্তা মুক্ত হয়েছে।মুগ্ধর আশ্বাস ওকে চিন্তা মুক্ত করেছে।এবার ও একটু ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারছে।সব চিন্তা কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে।আর তা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র জাদুকর মুগ্ধর জন্য।
প্রাণেশা আবার কিছু বলতে যাবে তার আগেই ক্লাসরুমে টিচার প্রবেশ করলেন।প্রাণেশা থেমে গেলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো ইতোমধ্যেই পুরো ক্লাস স্টুডেন্টে ভর্তি হয়ে গেছে। দুজনের কথার মাঝে কখন ওরা সবাই উপস্থিত হলো,কখন সময় কেটে গেলো টেরই পায়নি দুজনে।তারউপর আবার দুজন বসেছে একেবারে লাস্ট বেঞ্চে।সবাই দাড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলো স্যারকে।ম্যাথ টিচার হারুন রশীদ। মাথায় ইয়া বড় টাক,চোখে গোল ফ্রেমের চশমা।চোখে-মুখে সবসময় জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব রাখার চেষ্টা করেন।
সব স্টুডেন্টদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিজ্ঞের মতো পুরো ক্লাসে চোখ বোলালেন তিনি।সবাইকে বসার নির্দেশ না দিয়ে নিজে গিয়ে চেয়ার টেনে বসলেন।সামনের বেঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে ইশারা করে ডাকলেন।আদেশ দিলেন অফিসে গিয়ে তার ড্রায়ার থেকে যাতে ক্যারাত বেতটা নিয়ে আসে।ছেলেটি দৌড়ে কক্ষের বাইরে বেরিয়ে গেলো।হারুণ স্যার দেরি পছন্দ করেন না।নয়তো এতো বড় ছাত্র-ছাত্রীদের
ও তিনি পিটিয়ে পিঠের চামড়া তুলে ফেলেন এদিক থেকে ওদিক হলে।তার মার থেকে রেহাই পায় না মেয়েরাও। সবার দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যাথা হয়ে গেলেও তিনি বসার আদেশ দিলেন না।এটা তার প্রতিদিনের নিত্য অভ্যাস।শুধু শুধুই ক্লাসে এসে আগে ছেলেমেয়েদের কে দশ-পনেরো মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখবেন।
প্রাণেশার পা ঝিম ধরে উঠলো দাড়াতে দাড়াতে।মনে মনে কয়েকটা গালি ছুড়লো বোর্ডের সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকা ব্যাক্তিটির উদ্দেশ্যে। মুগ্ধ একটু বাঁকা হয়ে এগিয়ে আসলো প্রাণেশার কাছে।ফিসফিসিয়ে বললো
-"আরেকটা কথা বলার আছে তোকে।"
-"বল।"
-"ক্লাসের শেষে বলবো।"
-"আচ্ছা। "
ক্লাসরুমে একটু ফিসফিসানি আওয়াজ হতেই সঙ্গে সঙ্গে খেঁকিয়ে উঠলো হারুণ রশিদ।নিজের বাজখাঁই গলায় বললো
-"কে কথা বলছে?দেখি কার এতো বড় বুকের পাটা যে আমার ক্লাসে কথা বলে।সামনে আয় দেখি।সামনে আয়।"
আবারো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা শুরু হলো।সবাই যমের মতো ভয় পায় তাকে।কে কথা বলেছে ধরতে পারলেই হয় তিনি পিঠের উপর বেত ভাঙবেন, নয়তো পুরো ক্লাস আপ্পার বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবেন।দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে!
কারো উত্তর না পেয়ে আবার ধমক দিলেন পুরো ক্লাসের ছাত্র -ছাত্রীদের।চিৎকার করে বললেন
-"কথা বলিস না কেন তোরা! এতোক্ষণ তো খুব সাহস দেখাচ্ছিলি।ক্লাসরুমটাকে মাছের বাজার বানিয়ে রেখেছে।কখন যে কলেজ টা ছেড়ে বের হবি কে জানে!আর সহ্য করতে পারছি না তোদের।ক্লাসের বাইরে দাড়িয়ে থেকেই তোদের চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।তোদের মতো এমন অভদ্র স্টুডেন্ট আমি আমার জীবনে পাইনি।"
কেও টু শব্দ ও করলো না।অনেকে নিজেদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটুকুও লুকানোর চেষ্টা করলো।ছেলটি বেত নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করলো।হারুন স্যার সবাইকে বসার অনুমতি দিলেন।কিছুক্ষণ নিজে নিজেই বিরবির করার পর,হোয়াইট বোর্ডের কাছে গিয়ে অঙ্ক করা শুরু করলেন।সবাই কালবিলম্ব না করে খাতা কলম বের করে অঙ্ক তোলা শুরু করলো।কারণ সবাই জানে উনি আলোর গতিতে অঙ্ক লিখে আলোর গতিতে মুছে দিবেন।ওরা তুলতে পারলো কিনা সেটা দেখবেন না!কিন্তু পরে যদি খাতায় অঙ্ক নোট না দেখে সেদিনই হয়তো হবে ছাত্র বা ছাত্রীটির শেষ দিন।
.
দুপুর দুটোই কলেজ ছুটির বেল বাজলো।শিক্ষার্থীরা সবাই দলে দলে বের হলো ক্লাস থেকে।প্রাণেশা আর মুগ্ধ দুজনে হেঁটে মাঠের একপাশে গাছের ছায়ায় এসে দাড়ালো। সূর্য একেবারে মাথার উপর অবস্থান করছে।তীর্যকভাবে আলো ছড়াচ্ছে চারিদিকে। এই রোদ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুষ্কর। তাই দু'জনে গাছের ছায়ায় এসে দাড়ালো।প্রাণেশা এপ্রোনের পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলো।ঘেমে একাকার অবস্থা ওর।মুগ্ধ নিজের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এগিয়ে দিলো ওর দিকে।প্রাণেশা ঢক ঢক করে পানি খেয়ে নিজের গলা ভেজালো।মুগ্ধকে উদ্দেশ্য করে বললো
-"কী যেন বলবি বলেছিলি।"
-"হ্যাঁ।বলবো তো।"
-"বল।"
-"আমাদের এমপি মহদয় আসবে কিছুদিন পর।শুনেছি অনেক বড় মিছিল হবে।যাবি মিছিলে?"
-"কী বলিস?কেমন মিছিল রে?"
-"নির্বাচন আছে নাকি সামনে!মেয়র নির্বাচন হবে।তাই দলের সব বড় বড় নেতাকর্মীরা মিছিল মিটিং বের করবে।যাবি নাকি?"
-"যাবো না মানে!অবশ্যই যাবো।এটা আমাদের প্যাশন মুগ্ধ। রাজনীতি আমাদের প্যাশন।তোর মনে হয় আমি যাবো না?
এই প্রথম আমরা কোনো মিছিলে যোগ দিবো।আমার তো ভাবতেই পেটের মধ্যে প্রজাপতি উড়ছে।"
প্রাণেশা হই হই করে বললো।মুগ্ধ নিজের হাসি বিস্তৃত করলো। বললো
-"আমরা আমাদের প্রিয় নেতার দেখা পাবো দোস্ত।কী কিউট না ব্যাপারটা।"
-"হুম কিউট তো অবশ্যই। "
পরক্ষণেই আবার চিন্তিত স্বরে বললো
-"কিন্তু আমার না একটা বিষয়ে চিন্তা হচ্ছে?"
-"কী?"
মুগ্ধ নিজের ভ্রু গুটিয়ে বললো।
-"আমার মনে হয় সেদিন মিছিলে আমার ছোট মামাও থাকবে।ইউ নো না সেও একজন রাজনীতিবিদ। আমাকে যদি কলেজ বাঙ্ক দিয়ে মিছিলে যেতে দেখে তবে নির্ঘাত আমি শেষ।তারউপর সামনে আরো এইচএসসি। ভয় লাগছে রে বন্ধু।"
মুগ্ধ বড় করে শ্বাস ফেললো। ভ্রুকুটি গুটিয়ে বললো
-"ধুরো!এতো ভয় পাস না তো।এতো ভীতু হলে কিন্তু চলবে না বন্ধু। যারা রাজনীতি করে তাদের মনে কিন্তু ভয়-ডর থাকে না।আর যারা ভয় পায় তারা রাজনীতি করতে পারে না।এই ফিল্ডে ঢুকতে হলে কিন্তু তোকে সব ভয় ডর মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।"
-"তুই অনেক বুঝদার রে দোস্ত।"
প্রাণেশা বিমোহিত কন্ঠে বললো।মুগ্ধ মুখ লটকে তাকালো ওর দিকে।সন্দেহিন কন্ঠে শুধালো
-"তুই আমার প্রশংসা করছিস!সত্যি, বিশ্বাস হচ্ছে না আমার।"
-"না,সত্যিই।আজ প্রশংসা না করে পারলাম না।যে সব জিনিস নিয়ে আমি চিন্তা করতে করতে শেষ হয়ে যায়,সেসব তুই তুড়ি মেরে সল্ভ করে ফেলিস।সবসময় আমাকে সাহস দিস।আমাকে আগলে রাখিস। এভাবে সবসময় থাকিস কেমন!আমাকে ছেড়ে কখনো যাস না।"
মুগ্ধ ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো।কন্ঠে আশ্বাস ঢেলে দিয়ে বললো
-"চিন্তা করিস না বন্ধু।তোকে ছেড়ে কোথায় যাবো! প্যারা নাই আছি সবসময়।"
প্রাণেশা হাসিমুখে তাকালো ওর দিকে।মুগ্ধ তাড়া দিয়ে বললো
-কীরে বাড়ি যাবি না?কথা বলতে বলতে কিন্তু পুরো কলেজ খালি হয়ে গেছে। "
-"হ্যাঁ হ্যাঁ যাবো তো।"
-"তাহলে চল,যাওয়া যাক।"
দুজনে কলেজের গেইট পেরিয়ে বাইরে বেরোলো।গেইটের বাইরে ড্রাইভার অপেক্ষা করছে গাড়ি নিয়ে।প্রাণেশা মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে বললো
-"গাড়ি চলে এসেছে।আমি তাহলে বাড়ি যায়।"
-"হুম যা।আর শোন, যেভাবে বলেছি সেভাবে গিয়ে প্রত্যুষ ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করবি!মনে হয় না প্রত্যুষ ভাইয়া আজকে আর সত্যিটা লুকিয়ে রাখতে পারবে।"
-"ওঁকে। আমার ভয় লাগলে আমি কিন্তু কল দিবো তোকে।"
-"আচ্ছা।"
-"বাই।"
বলেই প্রাণেশা গিয়ে গাড়িতে উঠলো।গাড়ির জানালা দিয়ে গেইটের সামনে দাড়িয়ে থাকা মুগ্ধ কে হাত দিয়ে বিদায় জানালো। মুগ্ধ মুচকি হেসে হাত নাড়ায়।ইশারায় মনে করিয়ে দেয় আজকের প্রাণেশার করণীয়।ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মুগ্ধ একপলক সেদিকে তাকিয়ে রাস্তার অন্য দিকে হাঁটা ধরে।
#চলবে