#পরিণীতা
#পর্ব :০৫
#তানজিনা ইসলাম
গাড়ি এসে সাজানো গেইটের ভেতরে প্রবেশ করলো।প্রাণেশা জানালা দিয়েই অবাক হয়ে দেখলো সব কিছু। বাড়ির চারপাশে ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে। অনেকে আবার লাইটিংয়ে কাজ করছে।বাড়ির সামনে ইতোমধ্যেই কিছু মানুষের সমাবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। প্রাণেশা গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরোলো।।আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কী হচ্ছে! বিশাল এরিয়া জুড়ে ভূইয়া বাড়ি।মাঝখানে সরু রাস্তা বাড়ির সদরদরজা পর্যন্ত। দুইপাশে আঙিনায় সবুজ ঘাসের সমাহার।দেখতে পুরোনো আমলের জমিদারদের বাড়ির মতো। তিনতলা প্রাচীন বাড়িটি পূর্ব-পুরুষদের স্মৃতি বহন করে। বাড়ির ভেতরে ঝা-চকচকে করা হলেও, বাইরে কোনোরকম পরিবর্তনে কাজ করা হয়নি।পলক ভূইয়া আর পিয়াস ভূইয়া চায়নি তাদের পূর্ব-পুরুষদের স্মৃতি মুছে যাক।তাই,এখনো প্রচীন কালের আচড় আছে বাড়িটির বাইরের দিকের বেশ-ভূষায়। প্রাণেশার দাদা সেই যুগের জমিদার ছিলেন।প্রচুর পরিমাণ সহায়-সম্পত্তিও ছিল তার।যা তিনি মৃত্যুর আগে তার ছেলে-মেয়েদের জন্য রেখে গেছেন সবকিছু।তাই এলাকায় ভূইয়াদের বেশ নামডাক অনেক আগে থেকেই।এলাকার অনেকেই এসেছে হাতে হাতে সাহায্য করতে।ভূইয়া বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান হলে পুরো এলাকার মানুষদের দাওয়াত থাকে।তাই অনেকে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পূর্বেই চলে আসে হাতে হাতে সাহায্য করে দিতে। আঙিনার একটু কোণার দিকে করে তেরপাল টাঙানো সেখানে রান্নার জন্য বড় বড় ডেক আর লাকড়ি রাখা।প্রাণেশা ভ্রু কুঁচকে তাকালো সেদিকে।
আঙিনার একপাশে পলক ভূইয়া আর পিয়াস ভূইয়া দাঁড়িয়ে আছেন।তারা নিজেদের মধ্যে কিছু নিয়ে কথা বলছেন,সাথে কয়েকজন ছেলেকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। প্রাণেশা দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো তাদের দিকে।পলক ভূইয়া প্রাণেশাকে দেখেতেই ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলেন। প্রাণেশা দুজনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
পলক ভূইয়া প্রাণেশাকে উদ্দেশ্য করে বললেন
-"এতো দেরি হলো যে আম্মা,মেহমানরা তো সবাই অর্ধেক চলে এসেছে।"
প্রাণেশা প্রতিউত্তর করলো না তার কথার। নিজ থেকেই বললো
-"এসব কেনো হচ্ছে বড় বাবা?"
পিয়াস ভূইয়া আঁড়চোখে তাকালেন প্রাণেশার দিকে। মনে মনে ভাবলেন 'কেন বাড়ি সাজানো হচ্ছে সেটা জানলে তার নরম মনের মেয়েটা আবার কষ্ট পাবে।কালকে রাতেই কেঁদে কেটে নিজের মনের রক্তক্ষরণের কথা বাবাকে বলেছিলো সে।আর আজই তার বাবা তার প্রিয় পুরুষের বিয়ের তোড়জোড়ে সাহায্য করছে এটা কীভাবে সইবে প্রাণেশা!'
-"তোমার প্রত্যুষ ভাইয়ার বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে। আজকে হলুদের অনুষ্ঠান। "
প্রাণেশা থমকালো। ছলছল চোখে তাকালো তার বাবা দিকের।বড় বাবা নাহয় জানে না কিছু কিন্তু কালকে রাতেই তো তার বাবাকে সবকিছু বলেছে সে।তারপরও কেন তাহলে এই অবিচার তার প্রতি!পিয়াস ভূইয়া মাথা নিচু করে ফেলেন।নিজের মেয়ের চোখে চোখ রাখতে পারেন না।পলক ভূইয়া প্রাণেশা কে উদ্দেশ্য করে বললেন
-"তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও আম্মা।কিছু খেয়ে রেস্ট নাও। সন্ধ্যায় তৈরি হতে হবে তো।"
প্রাণেশা মাথা নিচু করে নিজের চোখের পানি আটকায়।বাবা-জেঠার সাথে আর এক শব্দ বিনিময় না করে গুটিগুটি পায়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়।
ড্রইং রুমে আসতেই অবাক হয় প্রাণেশা।ইতোমধ্যেই অনেক অতিথি চলে এসেছে তাঁদের বাড়িতে।এলাকার অনেক প্রতিবেশী মহিলারাও এসেছে। প্রাণেশা আসে-পাশে তাকিয়ে নিজের মা আর বড় মা কে খোঁজার চেষ্টা করলো।কিন্তু না,কাউকে দেখা যাচ্ছে না আশেপাশে।তার ভাবীপুও নেই কোথাও। কয়েকটি অচেনা মুখের ভীড়ে প্রাণেশার নিজের বাড়িকে নিজেরই অচেনা মনে হচ্ছে।সবার মধ্যে একজনকে দেখে প্রাণেশার মুখে হাসি ফোটে।দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে।মানুষটা পরতে পরতে সামলালো নিজেকে।প্রাণেশা তার বুকে মুখ গুঁজে বলে
-"ফুফিমা, কতোদিন পর।অনেক মিস করেছি তোমাকে।"
প্রানেশার ফুফি প্রিয়াশা ভূইয়া।ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসেন তিনি।হাতে ফুলের ঝুপড়ি থাকায় প্রাণেশা কে উল্টো জড়িয়ে ধরতে পারেন না তিনি।
প্রাণেশা তাকে ছাড়লো।হাসিমাখা মুখে বললো
-"কখন এলে?"
-"এসেছি তো সেই সকালে।কিন্তু তোর কী আর আমার খবর আছে!তোর কাছে তোর কলেজ বড়,তাই ফুফিমা আসার খবরটাও হয়তো জানতে পারিসনি!"
প্রাণেশা ঠোঁট উল্টে তাকালো। বললো
-"সামনে এক্সাম তো তাই।তুমি আসবে বললে আমি জীবনেও যেতাম না।"
-"আচ্ছা, আচ্ছা। সমস্যা নেই বাচ্চা আমার।অবশ্যই পড়াশোনা কে সবার আগে প্রাইয়্যােরিটি দিতে হবে।এ-প্লাস চাই কিন্তু। "
প্রাণেশা হেসে মাথা হেলায়।জিজ্ঞেস করে
-"আরিশা আপু আসেনি?আর আদনান ভাইয়া।"
-"দুজনেই এসেছে।উপরে আছে দু'জনে।"
-"আচ্ছা।"
প্রাণেশা দৌড়ে দোতলায় উঠলো।সোজা হেটে রিধিতার ঘরে ঢুকে গেলো।কক্ষে রিধিতা আর আরিশা বসে গল্প করছিলো।আরিশা প্রাণেশা কে দেখেই জোড়ে চিৎকার দিলো।দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলে ফেললো ওঁকে। প্রাণেশাও শক্ত তরে জড়িয়ে ধরে ওঁকে।দুজনের মাখোমাখো প্রেম দেখে রিধিতা ঠোঁট উল্টে বলে
-"আমাকে দেখি দুজনে ভুলেই গেছে!"
প্রাণেশা আর আরিশা ছেড়ে দিলো দুজন দুজনকে।রিধিতার কথায় শব্দ করে হেসে দিলো।আরিশা চারুকলা বিভাগের ফার্স্ট ইয়ারের একজন স্টুডেন্ট। প্রাণেশার থেকে দুই বছরের বড় হলেও প্রাণেশার জানে জিগার।দুজনের একেবারে দেখে রাখার মতো প্রেমকাহিনী।
প্রাণেশা আর আরিশা গিয়ে রিধিতার পাশে বিছানায় বসলো।
তিনজনে তুমুল গল্প জুড়ে দিলো।আরিশা কথা বলার মাঝে প্রাণেশাকে উদ্দেশ্য করে বললো
-"কীরে,তুই আজ বাড়ির এতো বড় অনুষ্ঠান ফেলে কলেজে চলে গেলি যে?"
প্রাণেশার হাসি নিভে আসে।এতোক্ষণ গল্প করার মাঝে ও বেমালুম ভুলে বসেছিলো যে আজ ওর প্রাণপ্রিয়র সাথে অন্য একটি মেয়ের বিয়ে।তারপরও নিজের মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলে
-"আপুনি সামনে এক্সাম তো তাই।ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস মিস দিতে চাই নি।এখনো তো সবাই এসে পৌছায়নি তার আগেই চলে এসেছি।আর অনুষ্ঠান তো অনেক দেরিতে শুরু হবে।"
আরিশা ছোট ছোট চোখ করে চাইলো ওর দিকে।সন্দেহীন কন্ঠে বললো
-"সিরিয়াসলি! পরীক্ষার জন্য টেনশন করছে তাও প্রাণেশা এটা বিশ্বাস করতে হবে আমাকে।তারউপর আবার সে বাড়িতে আসার খবর শুনেও ক্লাস করতে চলে গেছে।ট্রাস্ট হচ্ছে না রে।"
প্রাণেশা ঠোঁট উল্টে চাইলো ওর দিকে।আরিশা রিধিতার দিকে তাকিয়ে বললো
-"ভাবীপু, কাহিণি কী বলো তো তোমার ননদের।আমার তো কাহিনী সুবিধার মনে হচ্ছে না।তুমি কী কিছু জানো।"
রিধিতা মাথা নাড়ালো দু-পাশে। গালে হাত দিয়ে বললো
-"জানি না রে আরু।ননদিনী এখন আমাকে আর কিছু বলে না।বলবে কী করে দুদিন ধরে তো গল্প করতে বসছেই না আমার সাথে।তখন একটা পিঁপড়ে মরলেও এসে খবর দিতো আমাকে।সকালে যখন ওভাবে চলে গেলো আমার তখনই সন্দেহ হয়েছিলো কিছু একটা হয়েছে। তুমি জিজ্ঞেস করতো কী হয়েছে! "
আরিশা ভ্রু কুঁচকে চাইলো প্রাণেশার দিকে।বললো
-"কী হয়েছে বলতো? কাহিনী কী।কারো প্রেমে পরেছিস?যাকে দেখা দেওয়ার জন্য অনুষ্ঠান বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে?"
দু'জনে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো প্রাণেশার দিকে।চোখে স্পষ্ট প্রশ্ন
-"কার সাথে দেখা করতে গেছিস?ঐ সোনামুখো টা কে?"
প্রাণেশা ভয়ার্ত চোখে তাকালো দুজনের দিকে।একপাশে গুটিশুটি মেরে বসে বললো
-"তোমরা এসব কী বলছো?যদি সত্যিই এমন কেও থাকতো অবশ্যই জানতে পারতে তোমরা।তােমাদের থেকে কিছু লুকাই নাকি আমি!"
দুজনে তারপরও তাদের সন্দেহের দৃষ্টি সরালো না।প্রাণেশা জিহ্বা দিয়ে নিজের শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বললো
-"সত্যি বলছি ইয়ার।বিশ্বাস করো আমাকে।কেও নেই এমন।"
আরিশা ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো।কন্ঠ অসম্ভব গম্ভীরতা ঢেলে বললো
-"ঠিক আছে বিশ্বাস করলাম।কিন্তু সাবধান,কেও থাকার পরও যদি আমরা জানতে না পারি তবে কিন্তু তোর কপালে দুঃখ আছে।"
-"কেও নেই আপুনি।"
প্রাণেশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।মনে মনে বললো 'সরি রে আপু,ভাবীপু।আমি তোমাদেরকে যে তার কথা বলতে পারবো না।তাকে না পাওয়ার দুঃখ একান্তই আমার।শুধুই আমার।"
তিনজন কথা বলছিলো নিজেদের মধ্যে তখনই রওশা ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরোলো।তিনজনের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।প্রাণেশা অবাক চোখে তাকালো সদ্য গোসল করে বের হওয়া রওশার দিকে।একটা গোলাপি, আসমানী রঙের মিশ্রণে কাঞ্চিবরণ শাড়ি পরেছে ও।টাওয়েল দিয়ে চুলগুলো আলতো করে মুচছে।মোছা শেষে এসে বসলো ওদের পাশে।আরিশা রওশার উদ্দেশ্যে মুচকি হেসে বললো
-"ভাবিপু এখন ভালো লাগছে?"
-"হুম।শান্তি লাগছে এখন।এতোক্ষণ মনে হচ্ছিলো দমবন্ধ হয়ে আসবে!"
রওশা মিহি কন্ঠে বললো।
রিধিতা বললো
-"খারাপ লাগবে না তো!যেভাবে সবাই ঘিরে রেখেছিলো। বউ দেখতে এসেছে ভালো কথা,তাই বলে এভাবে সামনে বসায় রাখতে হবে,এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে।তোমার উপর কিন্তু আমার খুব মায়া হচ্ছিল। অনেক্ষণ ধরেই দেখছিলাম গরমে হাসফাস করছিলে।"
রওশা মাথা নামিয়ে মুচকি হাসলো।রিধিতা প্রাণেশাকে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে রওশাকে বললো
-"এটা আমার কিউট ননদিনী। আর তোমারও।কালকে থেকে এটা ওটাই তো দুজনের পরিচয় হলো না।রওশা কেমন লেগেছে বলো?"
রওশা প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো।কিছু বলতে যাবে তার আগে প্রাণেশা রিধিতার হাত ছাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো। তিনজনে অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে।প্রাণেশা কাঠ কাঠ কন্ঠে রিধিতাকে উদ্দেশ্য করে বললো
-"ভাবিপু আমি বরং যায়।পরে পরিচিত হবো।এসেছি সেই কতক্ষণ হলো,এখনো কলেজের ড্রেসটা পরে আছি।আমি ড্রেস বদলে আসি।খিদে পেয়েছে অনেক।"
বলেই তিনজনের চাহনি উপেক্ষা করেই গটগট পায়ে চলে গেলো।কিছু বলার সুযোগও দিলো না ওদেরকে।রওশা থমথম খায়। মনের মধ্যে খারাপ লাগা কাজ করে।কয় এতোক্ষণ তো রিধিতা আর আরিশার সাথে বসে গল্প করছিলো।যেই ওর সাথে পরিচিত হওয়ার কথা বললো তখনই চলে গেলো।আচ্ছা ওকি মেয়েটার শত্রু যে মেয়েটা আসার পর থেকেই এভাবে ইগনোর করছে ওকে?রওশা উত্তর পেলো না,কেন প্রাণেশা শত্রু হতে যাবে ওর?এখনো তো দুজনের পরিচয় পর্বই শেষ হলো না।হয়তো ওর পছন্দ না রওশাকে।রওশা মুখ কালো করে বসে থাকে।রওশাকে দেখে রিধিতা আমতা আমতা করে বললো
-"রওশা, মন খারাপ করো না তুমি।ও বললো না ফ্রেশ হতে হবে।হয়তো ছোট ভাবীপুর সাথে ধীরে স্বস্তে পরিচিত হতে চেয়েছে। বেচারি সেই সকালে একটা পরোটা খেয়ে কলেজে চলে গেছে।এখন নিশ্চয়ই অনেক খিদে পেয়েছে তাই উঠে গেছে। ও না,খিদে সহ্য করতে পারে না।নয়তো আমার ননদিনী কিন্তু অনেক ভালো।তার আশেপাশের সব মানুষ কে সে অনেক ভালোবাসে,অনেক।"
রিধিতার সাথে তাল মিলালো আরিশা।বললো
-"হ্যাঁ ভাবীপু।প্রাণেশা একবারেই সবার সাথে মিশে যায়।দেখবে তার সাথে একবার কথা হলেই ও তোমাকে বন্ধু বানিয়ে ফেলবে।ওর সাথে কথা বললেও মানুষের মন ভালো হয়ে যায়।প্রাণেশা এ বাড়ির প্রাণ।এ বাড়ির প্রতিটা মানুষের প্রাণের সাথে জুড়ে আছে ও।"
রওশা মাথা নিচু করে ভাবলো ওর কথা। প্রাণেশার প্রতি ইন্টারেস্ট বাড়ছে ওর।ছোটোবেলা থেকেই ওর কোনে বন্ধু নেই।কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না ওর।সেখানে কারো কথা ভাবা তো দুরের কথা।কিন্তু প্রাণেশার কথা এতো কেন ভাবনায় আসছে কে জানে! ওর এসব উদ্ভট ব্যবহারের জন্য। একবার মেয়েটার সাথে কথা বলতেই হবে।
রিধিতা রওশাকে বুঝ দিলে-ও নিজেকে দিতে পারলো না।প্রাণেশা তো এমন না।ও তো সবাইকেই ভীষণ ভালোভাসে।ওর এখনো মনে আছে যেদিন ও বউ হয়ে এসেছিলো সেদিন প্রাণেশা পুরোটা দিন ওর পাশে বসেছিলো।গল্প করেছিলো নিজ থেকেই। প্রতিদিন কলেজ থেকে আসার সময় চকলেট আনতো ওর জন্য যেন ওর এটা দায়িত্ব। সবসময় সবকিছু ভাগ করে ওর সাথে।এমনকি একটা নতুন ড্রেস পর্যন্ত ওঁকে দেখে পরে।প্রথম বন্ধুত্বের হাতটা ও নিজেই বাড়িয়ে ছিলো রিধিতার দিকে।তাহলে রওশার প্রতি এমন ব্যবহার কেন! রিধিতা নিজের ভাবনার কুল কিনারা খুঁজে পায় না।
.
প্রাণেশা এক ঘন্টা গোসলের পর বাইরে বেরোলো।
এলোমেলো পা ফেলে এসে বিছানার উপর টানটান হয়ে শুয়ে পরলো।চুলগুলো মুছেনি,টপটপ করে পানি পরছে চুল বেয়ে।বিছানা ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর চুলের পানি।ক্লান্ত লাগছে নিজেকে ভীষণ। একতো কলেজ থেকে এসে টায়ার্ড হয়ে গিয়েছিলো।একটু রেস্টও নিতে পারেনি,তারপর অতিরিক্ত কান্নার ফলে মাথা ধরে গেছে।চোখমুখ লাল হয়ে গেছে ওর।কতক্ষন ঝর্ণার নিচে বসে বসে কান্না করেছে ও তার হিসাব নেই।লোকসমাগম থেকে দুরে আসলেই কান্না পাচ্ছে ওর। তারউপর রওশার উপস্থিতি আগুনে ঘি ঢালছে।এই দুনিয়া বিষন্ন লাগছে।চারিপাশের এতো রঙ,সবার এতো আনন্দ দেখলে নিজের উপর কষ্ট অনুভব হয়।সবাই কত রঙিন হয়ে আছে।কিন্তু ওর জীবনের রঙগুলো হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। প্রাণেশা ক্ষণকাল শুয়ে থাকার পর উঠে বসলো।বিছানার পাশ থেকে টাওয়াল নিয়ে চুলে পেঁচালো। একটা সাদা রঙের টপস পরণে ওর। সাথে স্কিন জিন্স। প্রাণেশা বিছানা থেকে নেমে হাটুতে চিবুক ঠেকিয়ে বসলো।এতো লোকসমাগম অসহ্য লাগছে ওর।সবাই ওর মনটাকে জ্বালিয়ে উল্লাসে মেতেছে।প্রাণেশা সেভাবেই বসে থাকলো কিছুক্ষণ।
রিধিতা খাবারের প্লেট নিয়ে ওর কক্ষে ঢুকলো।প্রাণেশা চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে।রিধিতার পেছন পেছন রওশা আর আরিশাও আসে।প্রাণেশা দাঁড়িয়ে পরে ওদের দেখে।রিধিতা বেডসাইড টেবিলে খাবারের প্লেট রাখলো।প্রাণেশাকে উদ্দেশ্য করে বললো
-ছোটমা খাবার পাঠিয়েছে তোর জন্য। খেয়ে নে,খিদে পেয়েছিলো না অনেক!"
-"আম্মু কোথায়?"
-"বাড়িতে অনেক কাজ রে।তাই আমাকে দিয়েই পাঠিয়েছে।"
-"ওহ!"
আরিশা আর রওশা গিয়ে বিছানায় উঠে বসলো।প্রাণেশা নিজেও বসলো ওদের সাথে।আরিশা প্রাণেশার উদ্দেশ্যে মুচকি হেসে বললো
-"জানিস,ভাবীপু কতক্ষণ ধরে তোর সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছে।এই নিয়ে মনে হয় বিশ বারের উপর জিজ্ঞেস করে ফেলেছে তোর কথা।"
প্রাণেশা হাসার চেষ্টা করলো।রিধিতা প্রাণেশা কে বললো
-"খেয়ে নে।"
-"খেতে ইচ্ছে করছে না ভাবীপু।ঘুমাতে ইচ্ছে করছে।ঘুম আসছে অনেক।"প্রাণেশা হামি তুলে বললো।
-"খেয়ে নে আগে।তারপর ঘুমা।"
প্রাণেশা ঠোঁট উল্টে তাকালো।রিধিতা জিজ্ঞেস করলো
-"আমি খাইয়ে দেই?"
প্রাণেশা বাক্যবিনিময় না করে মিষ্টি হেসে সম্মতি জানালো।রিধিতা হাত ধুয়ে প্লেট হাতে নেয়।ভাতের এক লোকমা নিয়ে প্রাণেশার মুখের সামনে ধরে।প্রাণেশা সময় ব্যয় না করে মুখে পুরলো।আসলেই অনেক খিদে পেয়েছিলো ওর।শুধু হাতগুলোকে খাটাতে মন চাচ্ছিলো না।
রওশা, আরিশাকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিলো।আরিশা বাহু ডলতে ডলতে তাকালো ওর দিকে।রওশা চোখ দিয়ে ইশারা করে প্রাণেশার সাথে কথা বলিয়ে দিতে।আরিশা গলা খাঁকারি দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করলো সবার। প্রাণেশাকে উদ্দেশ্য করে বললো
-"তুই কিন্তু এখনো ছোট ভাবীপুর সাথে কথা বলিসনি।"
প্রাণেশা চিবানো বন্ধ করে তাকালো ওর দিকে।মুখের খাবার কোনোমতে গিললো।পানি খেয়ে গলা ভেজালো।রওশার দিকে তাকিয়ে নম্র কন্ঠে বললো
-"ভালো আছেন?"
প্রশ্ন টা করে নিজেই থমথম খেলো প্রাণেশা।এ আবার কেমন প্রশ্ন! ও নিজের চোখের সামনেই তো দেখতে পারছে রওশা ভালো আছে, মুখে হাসি তার।
রওশা ঠোঁট টিপে হাসলো সাথে আরিশাও।রওশা প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে বললো
-"প্রাণেশা,আমাকে কী তোমার পছন্দ না?"
প্রাণেশা মনে মনে বললো,'নাহ!একটুও পছন্দ না।আপনি আমার প্রত্যুষ ভাইয়াকে কেড়ে নিয়েছেন আমার থেকে।আমি কখনো ক্ষমা করবো না আপনাকে।'
কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারলো না।মিনমিন করে বললো
-"না,পছন্দ কেন হবে না!"
-"এই যে কথা বলনি একবারো আমার সাথে।কীভাবে ইগনোর করছো আমাকে!"
প্রাণেশা উত্তর দিলো না।মনে মনে ভাবলো 'মেয়েটা সুন্দরী। মিষ্টি কন্ঠে কথা বলে।নিঃসন্দেহে কোনো পুরুষ ওর প্রেমে পরতে বাধ্য। আচ্ছা প্রত্যুষ ভাইয়াও কী ওর প্রেমে পরে যাবে!' প্রাণেশার মন উত্তর দিলো,পরলেও কী!সে তো মেয়েটার স্বামী। তার প্রেমে না পরে নিশ্চয়ই তোর প্রেমে পরবে না।'
প্রাাণেশার বুকে তীব্রে ব্যাথা শুরু হয়।মুখ বুজে মাথা নিচু করে থাকে।
রওশা আবার তার রিনরিনে কন্ঠে বললো
-"প্রাণেশা, অনেক মিষ্টি একটা মেয়ে তুমি!"
-"থ্যাংস।"
প্রাণেশা মাথা নিচু করে বললো।
-"কোন ক্লাসে পড় তুমি?"
-"সামনে এইচএসসি দিব।"
রওশা প্রশ্ন করে একেরপর এক।প্রাণেশা হু-হা করে উত্তর দিলো শুধু।অসম্ভব অস্বস্তি হচ্ছে ওর রওশার সামনে।
প্রাণেশা বিছানার এক কোণে গুটিয়ে বসে।খাওয়া শেষ হয়েছে ওর অনেক্ষণ আগেই।রওশা,রিধিতা আর আরিশা কথা বলছে নিজেদের মধ্যে।
প্রাণেশার হুট করে মুগ্ধর কথা মাথায় আসলো।ও তো বলেছিলো প্রত্যুষের সাথে কথা বলে সবকিছু ক্লিয়ার করতে। কিন্তু আবার পরক্ষণেই ভাবলো এখন আর কথা বলে লাভটাই বা কী!বিয়ে তো হয়ে গেছে তার।একটা সুন্দরী বউ আছে।এখন তো আর কিছু বদলানো সম্ভব না।তারপরও জানতে ক্ষতি কী,তাকে ঠকানোর কারণ!তার এই অসীম ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলার কারণ।প্রাণেশা বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ালো। শেষ চেষ্টা ওকে করতেই হবে।রিধিতা প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো
-"আবার কয় যাস তুই?"
-"আমি একটু নিচে থেকে ঘুরে আসি।তোমরা কথা বলো।"
বলেই কক্ষের বাইরে বেরিয়ে গেলো।
রিধিতা কপাল চাপড়ে বললো
-"কোথাও যদি একটু শান্তিতে বসে মেয়েটা!"
.
প্রাণেশা প্রত্যুষের কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজা সামান্য বন্ধ।প্রাণেশা বুকে ফু দিলো। দরজা খুলে পা টিপে টিপে কক্ষের ভিতরে ঢুকলো।এতোক্ষণের ধরে রাখা সাহসটা হারিয়ে গিয়ে এখন বুকের মধ্যে ভয় বাসা বেঁধেছে।এখনো মনে আছে ওর কীভাবে গতকালকে রুম থেকে বের করে দিয়েছিলো ওঁকে!কিন্তু এখন এতো মানসম্মানের কথা ভাবলে চলবে না।ও পারবে না ওর প্রত্যুষ ভাইকে হারাতে।যদি অপমানের বিনিময়ে,কষ্টের বিনিময়ে প্রত্যুষ ভাইকে পাওয়া যায়,তাহলে ও হাজার অপমান হাজার কষ্ট গ্রহণ করতে রাজি আছে।প্রাণেশা চোখ ঘুরিয়ে তাকালো আশেপাশে। ঘর খালি প্রত্যুষ নেই ঘরে।বিছানার উপর মোবাইল ফোন পরে থাকতে দেখে প্রাণেশা এগিয়ে গেলো বিছানার কাছে।মোবাইল হাতে নিয়ে ভাবলো প্রত্যুষ হয়তো ভুলে ফেলে গেছে।প্রাণেশা চটজলদি মোবাইল অন করলো,যদি এখান থেকে কোনো ক্লু পাওয়া যায়।মোবাইল অন করতেই থমকে গেলো প্রাণেশা।লক স্ক্রিনে একটা বাচ্চার ছবি।বাচ্চাটিকে চেনে প্রাণেশা। বাচ্চাটি ও নিজেই।বয়স তখন হয়তো ছয় এর কোঠায়। একটা হাটু সমান প্রিন্সেস ফ্রক পড়া ওর।মাথার দুপাশে দুটো ছোটো ঝুঁটি করে রাখা।মুখে লেপ্টানো সুন্দর হাসি।হাতে চকলেট। একটা বাচ্চা ছেলে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওকে।বাচ্চাটিকে চিনতেও কষ্ট হয়না প্রাণেশার।তেরো বছরের প্রত্যুষ কোলে নিয়ে বসে আছে ছয় বছরের প্রাণেশাকে,মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে সুন্দর হাসি দিয়ে।প্রাণেশা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিটা দেখছিলো, তখনই কেও একজন ফোনটা টান মারলো ওর হাত থেকে।প্রাণেশা আঁতকে উঠে তাকালো সেদিকে।প্রত্যুষ চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে আছে ওর দিকে।প্রাণেশা শুকনো ঢোক গিললো। প্রত্যুষের অভিব্যাক্তি বোঝা দায়।রেগে আছে নাকি বোঝা যাচ্ছে না।প্রত্যুষ প্রাণেশার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে।দুজনের মধ্যে এক আঙ্গুল ফাঁক নেই। প্রাণেশা ছিটকে দুরে সরে গেলো।আতঙ্কিত কন্ঠে আমতা আমতা করে বললো
-"প্রত্যুষ ভাই আমি..
-"অনুমতি বিহীন কারও রুমে ঢুকে তার পার্সোনাল জিনিসে হাত দিতে নেই,সেটা জানিস না তুই?"
#চলবে