ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরিণীতা

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: তানজিনা ইসলাম স্রোতিস্বিনী

#পরিণীতা

#পর্ব :০৬

#তানজিনা ইসলাম

প্রাণেশা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।প্রত্যুষ নিজের মোবাইল মুষ্টিবদ্ধ করে, গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রাণেশার দিকে।কিছুসময় নিরবতায় কাটার পর প্রত্যুষ নিজের কন্ঠে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললো

-"এমন কাজ করিস কেন যার জন্য মাথা নিচু করে রাখতে হয়?"

প্রাণেশা উত্তর দেয় না।ভয়ে কন্ঠ রোধ হচ্ছে ওর।প্রত্যুষ যদি এখন সত্যি সত্যিই মেরে দেয় তাহলে!তাই এখন নিজের মুখ না চালানোই বেটার।প্রত্যুষ প্রাণেশার উত্তরের অপেক্ষা করে না।নিজ থেকেই আবার শুধায়

-"চুপ করে আছিস কেন?উত্তর নেই!আর তোকে বলেছিলাম না আমার রুমে না ঢুকতে, ঢুকলি কেন?কী দেখছিলি আমার মোবাইলে? "

প্রত্যুষের এত এত প্রশ্নের একটারও উত্তর দিলো না প্রাণেশা।মুখ তুলে তাকালো প্রত্যুষের দিকে।প্রত্যুষের দিকে তাকাতেই চোখে পানি টাই-টম্বুর হয়ে যায়।মানুষটার মায়াবী মুখের দিকে তাকালেই ওর কান্না পাচ্ছে খালি!প্রাণেশা ভাঙা গলায় বললো

-"প্রত্যুষ ভাই,দেখার সময় তো পায়নি।শুধু লক স্ক্রিনে দেখলাম তোমার আর আমার ছোটবেলার ছবি।"

-"ভুল দেখেছিস।"

প্রত্যুষ কাঠ কাঠ কন্ঠে বললো। প্রাণেশার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়ায়।নাক টেনে বলে

-"আমার সবকিছুই তো ভুল প্রমানিত হয়ে গেলো। আমার বিশ্বাস, আমার ভালোবাসা সব।সেখানে চোখের দেখা ভুল হলেও বা কী!আমাকে কেন ভালোবাসলে না প্রত্যুষ ভাই?"

প্রত্যুষের ভাবমূর্তি বোঝা দায়!সেই যে রোবট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,কোনো অনুভূতি হচ্ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।প্রাণেশা ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।চোখ দিয়ে অবিকল ধারায় পানি পরছে।প্রত্যুষ বড় করে শ্বাস ফেললো।প্রত্যুষ প্রাণেশার চোখে চোখ রেখে বললো

-"আমাকে ভালোবাসিস তুই?"

প্রাণেশা ভড়কালো।নিজের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্ন আশা করেনি ও।তারপরও নিজেকে সামলে বললো

-"হ্যাঁ,ভালোবাসি।"

-"একটা কথা রাখবি আমার?"

-"তুমি যদি বলো আমার জীবনটা দিয়ে দিতে, আমি সেটাও দিয়ে দিব!"প্রাণেশা ম্লান হেঁসে বললো।

প্রত্যুষ চোখ বন্ধ করে বড় বড় করে শ্বাস ফেলে।প্রাণেশার দিকে একটু এগিয়ে বললো

-"একজন ঠক,প্রতারকের জন্য কেন তুই নিজের জীবন দিতে যাবি!জীবন দিতে হবে না প্রাণ, শুধু তুই তোর পাগলামি ছেড়ে দে।একটা স্বাভাবিক লাইফ লিড কর।"

-"আমার জীবনতো অস্বাভাবিক হয়ে যায়নি প্রত্যুষ ভাই।তুমি শুধু আমাকে একবার বলো কেন তুমি এভাবে আরেকজনকে বিয়ে করে নিলে!আমার মধ্যে কী খুব বেশিই কমতি ছিলো?"

-"আমি তোকে কোনোকিছুর কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।কারও জন্য কারও জীবন থেমে থাকে না। চলে যা এখান থেকে।"

প্রত্যুষ মুখ ঘুরিয়ে বললো।সহ্য হচ্ছে না ওর সামনের মানুষটার কষ্ট।ওর কাপুরুষতার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রাণেশাকে, এই যন্ত্রণা কোথায় রাখবে ও! কেন মেয়েটা এমন করছে? কেন এভাবে কষ্ট পাচ্ছে? ওর মতো প্রতারকের জন্য দুঃখ পাচ্ছে কেন ও?কেন ভুল বুঝে দুরে সরে যাচ্ছে না।কেন এমন হচ্ছে? কেন সৃষ্টিকর্তা সবকিছু কোড়ে নিলো ওর থেকে?

প্রাণেশার কান্না বাড়লো।ভাঙা গলায় বললো

-"বললেই হলো কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে না!যদি কথা রাখতে নাই পারবে এতো এতো কথা দিলে কেন!কেন এভাবে ঠকালে আমাকে?আমিতো কোনো ক্ষতি করিনি তোমার।তাহলে আমি এতো যন্ত্রণা কেন পাচ্ছি?উত্তর দাও। আমি আমার প্রশ্নের উত্তর না নিয়ে যাবো না।"

-"চলে যেতে বলেছি, কথা অমান্য করিস না।"

প্রত্যুষ দাঁতে দাঁত চেপে বললো।প্রাণেশা নাছোড়বান্দা,সে কোনোভাবেই উত্তর না জেনে যাবে না।প্রত্যুষ ক্রমাগত বলে যায় চলে যাওয়ার কথা।প্রাণেশার কানে ঢোকে না সেসব কথা।কান্নার চোটে সে কিছু শুনতে পায় না ও।কথার এক পর্যায়ে প্রাণেশা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে প্রত্যুষ কে।প্রত্যুষ গাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে। শক্ত করার চেষ্টা করে নিজেকে।কোনোভাবেই যে দুর্বল হয়ে পড়লে চলবে না।ও যে ওর প্রাণের ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারবে না।ওর নিজের লাইফেরই তো ঠিক নেই, সেখানে প্রাণেশার জীবনটাকে কীভাবে ওর সাথে জুড়বে!প্রত্যুষ নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে ওঁকে। কিন্তু ব্যর্থ হয় নিজের থেকে ছাড়াতে,প্রাণেশা যত্রতত্র আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখে ওঁকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে

-"প্রত্যুষ ভাই,প্লিজ।এমন করো না।আমি যে বাঁচতে পারবো না।বিশ্বাস করো আমি মরে যাবো।এই যন্ত্রণা যে আমি সহ্য করতে পারছি না।আমাকে মেরে ফেলো তুমি। তোমাকে আরেকজনের সাথে সংসার করতে দেখার যন্ত্রণা যে আমি সহ্য করতে পারবো না।এর চেয়ে মেরে ফেলো আমাকে।"

প্রত্যুষ নিজের গাম্ভীর্যতা ধরে রাখতে পারে না।প্রাণেশার এই যন্ত্রণা ওর বুক ভেদ করে দেয়। নিজেকে সামলাতে না পেরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে

-প্রাণ, প্লিজ চলে যা।কেও আমাদেরকে এভাবে দেখলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে!"

প্রত্যুষের কথা ও শুনলো কি-না বোঝা গেলো না।প্রাণেশা প্রত্যুষের বুকের কাছের টিশার্ট আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি বিসর্জন দিতে ব্যস্ত। চোখের পানিতে ভিজিয়ে ফেলেছে বুকের কাছের টিশার্ট। প্রত্যুষের বুকে কাঁপন ধরে,ভয় হয়।দরজা হাট করে খোলা।পুরো বাড়ি ভর্তি মেহমান।কেও যদি বাই চান্স এখানে চলে আসে,নিশ্চয়ই ওঁদের ভালো চোখে দেখবে না।

প্রাণেশা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে ওঁকে। প্রত্যুষ এবার একটু জোর করেই ছাড়ানোর চেষ্টা করলো ওঁকে। প্রাণেশা হাতের বাঁধন আলগা করেছিলো,ঠিক তখনই প্রত্যুষ ওকে নিজের থেকে জোড়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করে।ফলস্বরূপ প্রাণেশা ব্যালেন্স রাখতে না পেরে নিচে পরে যায়।প্রত্যুষ হতভম্ব হয়ে তাকালো।দ্রুত অগ্রসর হয়ে ধরতে যাবে তার আগেই ওর পা থেমে যায় কারো আগমনে।

পিয়াস ভূইয়া পড়ে যাওয়া প্রাণেশা কে এসে ধরলেন।প্রাণেশা দাঁতে দাঁত চেপে হাঁটুর ব্যথা সহ্য করছে ,রীতিমতো কাঁপছে মেয়েটা।চোখ দিয়ে অবিকল ধারায় পানি বর্ষিত হচ্ছে। জোর করে ছাড়ানোই কেও কিছু ভেবে ওঠার আগেই পড়ে যায় প্রাণেশা, হাঁটু মচকে।

প্রত্যুষ আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে এসে ধরতে এলো প্রাণেশা।পিয়াস ভূইয়া হাত দিয়ে থামিয়ে দিলেন ওঁকে। টু শব্দ না করে তোলার চেষ্টা করলেন প্রাণেশাকে।পেছন থেকে আদনান দৌড়ে এসে কক্ষে ঢুকলো।প্রাণেশাকে নিচে পড়ে থাকতে দেখে কাছে এলো।পিয়াস ভূইয়া প্রাণেশা কে তুললেন মেঝে থেকে।আদনান এসে ধরলো ওঁকে। প্রাণেশা দাঁড়াতে পারছিলো না। কোনো মতে এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালো।প্রত্যুষ টলমল চোখে তাকালো ওদের দিকে।পিয়াস ভূইয়া ওর দিকে না তাকিয়েই প্রাণেশাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।প্রত্যুষের পা টলে উঠে।ও তো প্রাণেশাকে ফেলে দিতে চায়নি।কিন্তু কীভাবে যেন কী হয়ে গেলো!

পিয়াস ভূইয়া আর আদনান মিলে প্রাণেশাকে তার কক্ষে নিয়ে আসে।আদনান কিছু বুঝতে না পেরে পিয়াস ভূইয়া কে বললো

-"কী হয়েছে মামা?প্রাণেশা পড়ে গেলো কী করে?"

-"তুমি গিয়ে তোমার মামিমা কে নিয়ে আসো।আই থিংক ডক্টর ডাকতে হবে।"

পিয়াস ভূইয়া আদনানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন। আদনান কালক্ষেপণ না করে মালিহা বেগম কে ডাকতে চলে গেলো।পিয়াস ভূইয়া প্রাণেশার পা ধরে পরীক্ষা করলেন।প্রাণেশা ব্যাথাতুর শব্দ করে বললো

-"ব্যাথা করছে বাবা।"

পিয়াস ভূইয়া উত্তর দিলেন না।মেঝের দিকে তাকিয়ে বললেন

-"আমিতো আমার মেয়েকে মূল্যহীনভাবে গড়ে তুলিনি! নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কেন প্রত্যুষের ঘরে গেলে আম্মা?"

প্রাণেশা মাথা নিচু করে থাকে।তার বাবাকে উত্তর দেওয়ার মতো যে কোনো শব্দ তার কাছে জমা নেই।সে নিজেই তো গিয়েছিলো প্রত্যুষের ঘরে।

আদনান মালিহা বেগম কে ডেকে নিয়ে আসে।প্রাষেশা ব্যাথা পেয়েছে শুনে, তার পিছুপিছু মানারা বেগমও চলে আসেন।একে একে পুরো বাড়ির মানুষের কাছে খবর পৌঁছে যায়, প্রাণেশা পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে।কিন্তু কীভাবে পড়ে গিয়েছে সেটা জানতে পারে না।

প্রাণেশার হাজার মানা সত্বেও ডাক্তার ডাকা হলো।পলক ভূইয়া প্রাণেশার পড়ে যাওয়ার খবর শোনার পর সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার নিয়ে আসেন।

ডাক্তার এসে দেখে যান প্রাণেশাকে,আস্বস্ত করেন পায়ে তেমন কোনো ব্যাথা পায়নি প্রাণেশা।আকস্মিক পড়ে যাওয়ার ফলে একটু সমস্যা হয়েছিলো হাঁটতে, নয়তো ঠিক আছে সব।সবাই সস্তির নিশ্বাস ফেলে।

সবাই কক্ষে থেকে চলে গেলে আরিশা আর রিধিতা এসে বসলো ওর পাশে।আরিশা বললো

-"কীরে এভাবে পড়ে গেলি কী করে?"

-"হাঁটছিলাম। তারপর পা মচকে পড়ে গেছি।"

-"কেন রে,বাচ্চা নাকি তুই!ওলে আমার বাচ্চারে!"

রিধিতা ঠোঁট গেল করে পিঞ্চ মেরে বললো।আরিশা আর রিধিতা মিলে অনেক মজা নিলো ওর।প্রাণেশা সব চুপচাপ শুনলো। বাইরে যায় দেখাক,ভেতরে ভেতরে যে দহনে শেষ হয়ে যাচ্ছে ও। ও জানে প্রত্যুষ ওকে ফেলেনি, ব্যালেন্স রাখতে না পেরে ও নিজেই পরে গেছে।কিন্তু ওর বাবা যে অন্য কিছু ভেবে নিয়েছে।হয়তো প্রাণেশার উপর রাগও করেছে প্রত্যুষের কক্ষে যাওয়া নিয়ে।একটা সমস্যা শেষ হতে না হতেই আরেকটা টেনশন শুরু হলো।

.

দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।একে একে অতিথিরা আসতে শুরু করে।প্রাণেশা ঠোঁট উল্টে বসে থাকে তার কক্ষে।পাশে রিধিতা আর আরিশা। আরিশা আর না পেরে বিরক্ত হয়ে বললো

-"ধুরু! বসে থাকতে থাকতে কোমড় ব্যাথা হয়ে গেলো আমার।আমি আর বসতে পারবো না।এই প্রাণেশা উঠ। নিচে চল আমার সাথে।"

আরিশার কথার প্রেক্ষিতে রিধিতা বললো

-"হাঁটুতে ব্যাথা পেয়েছে ও।কীভাবে উঠবে বলো!"

-"উঠতে পারবো ভাবীপু। এতোটাও ব্যাথা পায়নি যতটা সবাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বলে গেলো।দৌড়ানোর মতো শক্তি আছে আমার পায়ে।"

প্রাণেশা রিধিতাকে উদ্দেশ্য করে বললো।

আরিশা গদগদ হয়ে বললো

-"সেটাই তো বলছি বনু।বিয়ে বাড়িতে কী বসে থাকার জন্য এসেছি নাকি!আমরা কতো কিছু প্ল্যান করে রেখেছিলাম হলুদের জন্য। তোকে ছাড়া যে কোনো কিছুই মজা হবে না।"

প্রাণেশা মুচকি হেঁসে বিছানা ছেড়ে নামলো।হাঁটায় একটু জড়তা হলেও খুড়িয়ে হাটতে পারছে ও।তিনজন মিলে বের হয় কক্ষের বাইরে।পুরো বাড়ি মানুষে গিজগিজ করছে।প্রতিনিয়ত রফায় রফায় অতিথি রা আসছে। চারিদিকে তাকিয়ে মন খারাপ হয়ে গেলো প্রাণেশার।অনেকদিন পর বাড়িতে একটা বিয়ে হচ্ছে। কিন্তু সেটা তার প্রিয় মানুষের সাথে অন্য একটি নারীর।যদি অন্য কারো হতো প্রাণেশা তার পায়ের ব্যাথা নিয়েও পুরো বাড়ি ননস্টপ দৌড়ে বেড়াতো।কিন্তু এখন যে বাঁচার আশ্বাস টুকুও পায় না প্রাণেশা।

নিচতলায় নামতে প্রাণেশা কিছু পরিচিত মুখের দেখা

পায়।প্রত্যুষের নানি আর মামি এসেছে,বসে আছে সোফায়।তাদের পাশেয় মাথা নিচু করে বসে আছে রওশা।

প্রাণেশা এগিয়ে গেলো তাদের দিকে।সালাম দিলো দুজনকে।প্রত্যুষের নানি সালিহা বানু সালাম নিয়ে বললো

-"তুমি বলে পইড়া গেছিলা?এখন ঠিক আছো?"

প্রাণেশা লজ্জা পেলো।মাথা নুইয়ে বললো

-"জ্বি নানু।ঠিক আছি।"

-"আমাদের পাশে বসো।"প্রত্যুষের মামি রাফিয়া বেগম নিজের পাশে দেখিয়ে বললো।

প্রাণেশা কথা অমান্য না করে তার পাশে বসলো।আরিশা গিয়ে সোফার এক কোণায় বসলো।

রিধিতা হাসিমুখে এগিয়ে এসে সালাম দিলো দুজনকে।রাফিয়া বেগম হাসিমুখে কথা বিনিময় করলো তার সাথে।সালিহা বানু রিধিতাকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কন্ঠে বললেন

-"কোথায় ছিলে তুমি এতোক্ষণ?"

-"আমিতো আরিশা আর প্রাণেশার সাথে ছিলাম।"

রিধিতা নম্র কন্ঠে বললো।

সালিহা বানু খেঁকিয়ে উঠলেন।রাগত স্বরে বড় আওয়াজে বললেন

-"ক্যান?ওঁদের সাথে বইসা ছিলা ক্যান তুমি?বাড়ির বউ তুমি।এতোগুলা মেহমান আছে, কোথায় শাশুড়িদের কামে হাত লাগাবা তা না! পটের বিবি হইয়া রুমে বইসা আছো!"

রিধিতা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মেঝেতে। মালিহা বেগম মায়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে আসে।রিধিতাকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাকে উদ্দেশ্য করে বললো

-"কী হয়েছে মা?ওর সাথে চিৎকার করছো কেন তুমি?"

সালিহা বানু মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে খ্যাক খ্যাক করে বলেন

-"চিৎকার না কইরা কী করমু?নিজে তো ছেলের বউরে কিচ্ছু কইতে পারছ না!শাশুড়ী রা কাম করতাছে, আর সে পটের বিবি হইয়া বইসা আছে বাড়ির মাইয়াদের সাথে?"

মানারা বেগম এতোক্ষণে বুঝতে পারলেন মায়ের এই হঠাৎ চিৎকারের কারণ।আশেপাশে তাকিয়ে দেখলেন অনেকেই ইতিমধ্যে এদিকে তাকিয়ে আছে।

মালিহা বেগম মা'কে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন

-"আম্মা,এতোগুলা কাজের মানুষ আছে এই বাড়িতে আমাদের সাহায্য করার জন্য। সেখানে রিধিতাকে কাজ করতে হবে কেন?আর তুমি যে বললে বাড়ির মেয়েদের সাথে বসে আছে,রিধিতা তো এই বাড়ির মেয়েই।ওকে তো আমি কোনোদিন নিজের বউমার চোখে দেখিনি।ও তো আমার মেয়েই।তাহলে বাড়ির একটা অনুষ্ঠানের দিনে ওকে দিয়ে কেন কাজ করাবো আমি?

সালিহা বানু শান্ত তো হলেন না,উল্টো আরো বেশি রেগে বললেন

-"তোর এতো নাটকীয় কথা কইস না আমারে।বাড়ির বউ,বাড়ির বউই হয় মেয়ে হয় না।এতো মাথায় তুলিস না বুঝছস!তোরে নরম পাইয়া পরে দেখবি তোরে দিয়াই বাড়ির সব কাজ করাইতাছে।সময় থাকতে টাইট দিতে শেখ।বাড়ির বউরে এতো মাথায় তুলান ভালানা।সে বাড়ির বউ কোথায় কোথায় তারে দিয়া এটা ওটা কাম করাবি তা না কইরা,বাড়ির মাইয়াগো লগে বসাই রাখছোস।"

মালিহা বেগম ধৈর্যহারা হলেন।একে তো বিয়ে বাড়ি, ড্রইংরুমে মানুষে ভরপুর সেখানে এক এক কথা বলে রিধিতা কে অপমান করছে সে।রিধিতা এই অপমান সহ্য করতে না পেরে কেঁদে দেয়।মালিহা বেগম এক প্রকার চিৎকার করেই বলেন

-"আম্মা,প্লিজ চুপ করবে তুমি।আমার কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে কী না হচ্ছে না সেটা আমি বুঝবো।খবরদার! তুমি রিধিতা কে কিছু বলবে না।ও আমার মেয়ে।আমি তোমার মতো জল্লাদ শাশুড়ী হতে চায় না।আর না ছেলের বউ কে উঠতে বসতে খোঁটা দিতে চায়।আল্লাহর ওয়াস্তে চুপ কর তুমি।নয়তো আমি এমন কিছু বলে ফেলবো যাতে খারাপ লেগে যাবে তোমার।"

সালিহা বানু তাতেও দমে গেলেন না।মেয়ের রাগ রিধিতার উপর ঝেড়ে বললেন

-"বেয়াদব মাইয়া।এখনো দাঁড়ায়া আছো তুমি। দাড়ায়া নিজের দাদি শাশুড়ি আর শাশুড়ীর ঝগড়া দেখতাছো। যাও রান্নাঘরে যাও।বউ মাইনষের এভাবে টো টো করে ঘুরে বেড়ানো মানায় না।"

রিধিতা কাঁদত কাঁদতে দৌড়ে চলে গেলো রান্নাঘরের দিকে।রান্নাঘরের দরজায় মানারা বেগমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো তাকে।চিৎকার শুনে মানারা বেগম বের হয়ে এসেছিলেন।যদিও রিধিতার অপমান দেখে ঐ মহিলাকে কিছু কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিলো ওনার।কিন্তু মালিহা বেগম যাওয়ায় তার সামনে তার মা'কে আর কিছু বলার ইচ্ছে জাগেনি। মানারা বেগম রিধিতার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। সান্ত্বনা দিয়ে পরম মমতায় বলেন

-"কাঁদে না বাচ্চা আমার।দুনিয়ার সবার কথা যদি কানে নিতে যাও,তাহলে কান্না ছাড়া যে কিছুই কপালে জুটবে না।বিশ্বাস করো ঐ মহিলার মতো কুটনি মহিলা আমি আমার জীবনে আর দুটো দেখিনি।সবসময় খালি খ্যাক খ্যাক করে।নিজের ছেলের বউকে জালিয়ে মেরেছেন তিনি।এই বয়সে এসেও এখনো জালান।কষ্ট পেয়ো না তুমি।

মালিহা বেগম ফুঁসে তাকালেন সালিহা বানুর দিকে।আবার কিছু বলতে যাবেন তার আগেই রাফিয়া বেগম গিয়ে থামালেন তাকে।হম্বিতম্বি করে বললেন

-"আপা আর কিছু বলিয়েন না।সামলান নিজেকে।"

মালিহা বেগম রাগে গজগজ করতে করতে চলে যান সেখান থেকে।প্রাণেশা আর আরিশাও উঠে চলে যায় সেখান থেকে।

রওশা মাথা নিচু করে থাকে।মনটা ভালো লাগায় ছেয়ে যায়।তার শাশুড়ী নামক মানুষটা কত ভালো!নিজের ছেলের বউকে কেও এভাবে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতে পারে সেটাতে জানা ছিলো না!ওকেও এভাবে ভালোবাসবে নিশ্চয়ই। কিন্তু প্রত্যুষ?সে কী ভালোবাসবে কোনোদিন।আদোও কী তাদের এই বিয়েটা মেনে নিবে?সে যে আরেকজনকে ভালোবাসে!আদোও কী বিয়ের এতো সাজসজ্জার কোনো মূল্য আছে?কিন্তু প্রত্যুষ যদি তাকে মেনে না নেয় সে যাবে কোথায়? তার যে যাওয়ার কোথাও জায়গা নেই।

.

প্রাণেশা আর আরিশা পা ঝুলিয়ে বসে আছে বিছানার উপর।পাশের কক্ষেই পার্লারের মেয়েরা রওশা কে সাজাচ্ছে।রওশার সাথে ওদের দুজনের আর রিধিতারও পার্লারে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু রিধিতা না যাওয়ায় আর ওরাও যায় নি।শুধুমাত্র রওশাকে সাজানোর জন্য পার্লারের মেয়েদের ডেকে নেওয়া হয়।

আরিশা মুখ কালো করে বললো

-"ধুর!কতকিছু প্ল্যান করে রেখেছিলাম কিছুই হলো না।"

-"বাদ দাও আপু।ভাবীপু কে ছাড়া কী করে কিছু করতাম বলো।সে তো রান্নাঘরের বাইরে পা-ই রাখছে না।"

-"ঠিক বলেছিস রে।ঐ কুটনি বুড়ির জন্য সব হলো।কীভাবে বকলো ভাবীপু কে!"

আরিশা রেগে বললো।

-"ঠিক বলেছো।কীভাবে কথা শোনালো আমার ভাবীপু কে!আমি সেখানে থেকেও কিছু করতে পারলাম না।কিন্তু আমার খুব করে মন চাচ্ছিল ঐ বুড়ি থেকে আমার ভাবীপু কে বাঁচাতে। "

-"কী আর করার! চল নিজে নিজেই সাজি।"

-"হুম।"

প্রাণেশা কাঁচা হলুদের শাড়িতে সাজালো নিজেকে।লেয়ার কাট চুলগুলো খুলে দিলো।লাল,হলুদ মিশেলের চুরি পরলো হাতে। কানে কাচা হলুদ ফুলের ঝুমকা পরলো।ঠোঁটে ডার্ক রেড লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট রাঙালো।

আয়না থেকে পেছনে ঘুরে আরিশাকে উদ্দেশ্য করে বললো

-"আপুনি দেখতো আমাকে কেমন লাগছে!"

আরিশা মুখে পাউডার মাখছিলো।প্রাণেশার কথায় ওর দিকে তাকালো।উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো

-"ওয়াও বেবি, কী কিউট লাগছে তোকে!"

প্রাণেশা ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো।আরিশা গাল টেনে দেয় ওর।আসলেই প্রাণেশাকে কিউটের ডিব্বা লাগছে।

আরিশা প্রাণেশাকর হাত ধরে বিছানায় বসালো ওঁকে। চোখে সুন্দর করে কাজল টেনে দিলো ওর।মুখ পর্যবেক্ষণ করে আরিশা ন্যাকা বললো

-"ওয়াও!কী কিউট লাগছে রে তোকে। আমি এতো সাজার পরও তোকেই বেশি সুন্দর লাগছে। মেয়ে হয়েই তো ক্রাশ খেয়ে গেলাম তোর উপর।ছেলেদের যে কী অবস্থা হবে!

প্রাণেশা জোরে হেঁসে দেয়।আরিশাকে ভেতরে রেখেই কক্ষের বাইরে বেরিয়ে আসে প্রাণেশা।

.

প্রত্যুষ পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে বিছানার উপর।পাশেই মালিহা বেগম আচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছেন। প্রত্যুষের এসবে খেয়াল নেই।সে নিজের মতো করে নিজের ভাবনায় আছে।বিছানার এক পাশে আদনান বসে আছে,মনোযোগ নিয়ে দেখছে মা ছেলের কাহিনী।মালিহা বেগম কোণা চোখে প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে, অনেক কষ্টে চোখ টিপে পানি বের করার চেষ্টা করলেন।কিন্তু প্রত্যুষ তাতেও কোনো ভ্রুক্ষেপ দেখালো না।নিজের কান্নার উপর নিজেই বিরক্ত হলেন মালিহা বেগম।আশ্চর্য! আর কতক্ষণ এভাবে চোখ টিপে টিপে পানি বের করবেন তিনি?তার কান্নায় তো প্রত্যুষের উপর কোনো প্রভাবই ফেলছেন না।এবার তিনি নিজের নাটকীয় কান্না বন্ধ করে বিরক্তি নিয়েই বললেন

-"তুই কী আসলেই তৈরি হবি না?"

-"একবার তো বলেই দিলাম।আর কতবার বলবো!"প্রত্যুষ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো।

-"আজকে তোরই গায়ে হলুদ।আর তুই যদি না যাস,তাহলে কী করে হবে?এতো আত্মীয় কেন আসলো?কেন অনুষ্ঠান করার জন্য তোর বাপ-চাচা এতো কিছু এরেঞ্জমেন্ট করলো?"

-"আমিতো বলিনি তোমাদেরকে এরেঞ্জ করতে।জোর করে বিয়ে করাতে পেরেছো বলে, জোর করে যায় ইচ্ছে তাই করাতে পারবে বলে মনে করো না।সব কিছু মগের মুল্লুক না। বাবার ওয়াদা রাখার জন্য আমি আমার সবকিছু শেষ করেছি।তারপরও তোমাদের শান্তি হচ্ছে না!"

-"বাবু,প্লিজ চল।এতো আত্মীয়- স্বজন কে কী জবাব দিব?"

-"সেটা আমার ভাবার বিষয় না।আমি যাবো না মানে যাবো না।"

বলেই প্রত্যুষ ওপাশ ফিরে শুয়ে পরলো।

মালিহা বেগম আদনানের দিকে তাকালেন।অনুরোধ করে বললেন

-"তোমার তো বন্ধু হয়।একবার বলে দেখো না।আমার কোনো কথায় যে মানছে না ও।"

-"তোমার মনে হয় আন্টি এই গোমড়া মুখো আমার কথা শুনবে।শুনলে তোমার কথাই শোনে আজ তো তোমার কথাও মানছে না।"

মালিহা বেগম চিন্তায় পরে গেলেন।ছেলেটা যে কোনোমতেই তার কথা মানছে না।বাড়িতে এতো আত্মীয় স্বজন সবাইকে কী বলবেন তিনি?রওশা কী ভাববে? হলুদের অনুষ্ঠানে যদি বর নিজেই উপস্থিত না থাকে তাহলে কেমন হলুদের অনুষ্ঠান হলো সেটা!

মালিহা বেগম আর ডাকলেন না প্রত্যূষ কে,উঠে পরলেন বিছানা ছেড়ে। প্রত্যুষ ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে,যেন এই দুনিয়ার কোনো ধ্যান ধারণা নেই তার।মালিহা বেগম সেদিকে একবার তাকিয়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

প্রত্যুষ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।কষ্টের প্রহরগুলো এতো দীর্ঘ কেন হচ্ছে।প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এতো যন্ত্রণার কেন? ওর কষ্টগুলো কেন কেও দেখতে পাচ্ছে না।বিয়ের এই জমজমাট অনুষ্ঠান যে ওর কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো।সবাই কেন এমন শত্রুর মতো ব্যবহার করছে! ও যে ভালো নেই, একটু ভালো নেই।ওর ভালো থাকার সব কারণই তো কেড়ে নিয়েছে ওরা।ওর প্রিয় জিনিসটায় কেড়ে নেওয়ার পর ওরা কীভাবে ওর সুখের আশা করে!

#চলবে

(গত পরশু আপলোড দিতাম।কিন্তু পর্ব ছয় লিখার পর কপি তো করছি কিন্তু পিন করিনাই। যার ফলে পুরো পর্বটাই ডিলিট হয়ে গেছে।পর্বটা আবার কষ্ট করে লিখেছি। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন