#পরিণীতা
#পর্ব :০৭
#তানজিনা ইসলাম
প্রাণেশা তিনতলার বারান্দায় শাড়ির আঁচল ধরে মডেলিং করছিলো।শাড়ির আঁচল মেঝে ছুই ছুঁই। নিজেকে নাইকা নাইকা মনে হচ্ছে ওর। প্রত্যুষের ঘরের সামনে মালিহা বেগমকে মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসলো তার কাছে।চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো
-"বড় আম্মু এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন তুমি?"
মালিহা বেগম তাকালেন প্রাণেশার দিকে।ওর চিন্তিত মুখ দেখে মুচকি হাসলেন।মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন
-"আমার বাচ্চা টা কে কী সুন্দর লাগছে! মাশাআল্লাহ।
প্রাণেশা মাথা নুইয়ে হাসলো।মালিহা বেগম মোহময় দৃষ্টি তে তাকিয়ে হাত বুলিয়ে দিলেন ওর মাথায়।দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
-"জানিস,প্রত্যুষ কে কোনোমতেই রাজি করাতে পারলাম না।হলুদের অনুষ্ঠানে নাকি সে যাবে না! এসব কোনো কথা হলো বল?আত্মীয় স্বজন কে কি বলবো?আচ্ছা মানলাম যে সে কারো গসিপ পরোয়া করে না,কিন্তু রওশার মনের অবস্থা কী হবে?"
প্রাণেশা নিশ্চুপ থাকলো।ঐ গোমরা মুখো তো কোনো ইভেন্টেই যায় না,তাই বলে নিজের হলুদের ইভেন্টেও আসবে না!পরক্ষনে ভাবলো তাতে ওর কী?মানুষ টা তো ওর কথা চিন্তা করেনি?একবারো ভাবেনি ওর সেই বিশ্বাসঘাতকতা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে কতটা যন্ত্রণা হবে প্রাণেশার।তাহলে ও কেন চিন্তা করতে যাবে?আর চিন্তা করবে না তার কথা প্রাণেশা।মন-মস্তিষ্কে আর বিচরণ করতে দেবে না মানুষটাকে।নিজের সবটুকু দিয়ে শক্ত হতে চেষ্টা করবে ও।
প্রাণেশা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললো
-"আমি নিচে যাচ্ছি বড় আম্মু। তোমার ঐ গোমরা মুখো ছেলে যে এসব ইভেন্ট পছন্দ করে না তা জানতাম,কিন্তু নিজের হলুদেও যে আসবে না তা জানতাম না।তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চিন্তা করো,আমি বরং যায়।আমরা অনেক প্ল্যান করে রেখেছিলাম, হলুদ আর বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে।"
মালিহা বেগম প্রাণেশার কথা শুনে হাসলেন।বললেন
-"চল আমিও যায় তোর সাথে।"
প্রাণেশা আর মালিহা বেগম একসাথে নিচে নামে।মালিহা বেগম প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে বললেন
-"আনন্দে কোনো খাঁদ রাখিস না কেমন!"
-"আচ্ছা।"
বলেই প্রাণেশা দুইপাশে মাথা নাড়লো।কথা বলতে বলতে দুজনে নিচে নেমে যায়।প্রাণেশা এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসে, অপেক্ষা করে আরিশার জন্য।
.
প্রত্যুষ কে দেখতে দেখতে বিরক্তি ধরে গেলো আদনানের।ছেলেটা এখনো ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে। আদনান আর না পেরে কন্ঠে বিরক্তি ঝেড়ে বললো
-" ভাই তোর এই কাহিনী গুলা আমি জাস্ট নিতে পারছি না।এসব কী নাটক হ্যাঁ?নিজের হলুদে নিজেই যাচ্ছিস না!"
-"আমার মনের পিঁয়াজু। তুই জানিস আমার এসব পছন্দ না।"
-"ঐ বেডা,ঐদিকে ফিরে কথা বলস কেন?আর এসব পছন্দ না বলে যে নিজের হলুদেও মানুষ যায় না,এ তো বাপের জন্মে শুনিনি।"
আদনান রাগান্বিত স্বরে বললো।
-"নিজের জন্মে শোন।"
বলেই প্রত্যুষ উঠে বসলো।বালিশ ঠিক করে বালিশের সাথে হেলান দিয়ে বসে হাটুর উপর থুঁতনি রাখলো।
আদনান ছোট ছোট চোখ করে তাকালো।আফসোসের সুরে বললো
-"ভাই,মানছি আমি অন্যায় করা হয়েছে তোর সাথে। কিন্তু ভাবি তো দেখতে অনেক সুন্দরী। কথা-বার্তাও খুব কোমল।নম্র কন্ঠে কথা বলে।তাহলে তাকে গ্রহণ করতে সমস্যা কী!"
প্রত্যুষ বাঁকা চোখে তাকালো ওর দিকে।ওর তাকানো দেখে আদনান আমতা আমতা করে বললো
-"দেখ,এসব কাহিনী দু একটা সবার জীবনেই থাকে।তাই বলে সেটা মাথায় রেখে নিজের জীবন টাকে এভাবে থমকে দিবি তা তো হয় না বল!বিয়ে না হলে অন্য একটা কথা ছিলো।কিন্তু এখনতো বিয়ে হয়ে গেছে। তুই যদি এমন করিস মেয়েটার কী হবে?একটা মেয়ে কতটা স্বপ্ন নিয়ে জীবনসঙ্গীর হাত ধরে তার শ্বশুর বাড়ি আসে।এভাবে আরেকজনের স্বপ্ন ভেঙে দিস না দোস্ত।"
-"আমার স্বপ্ন গুলো যে ভেঙে গেলো তার বেলা!"প্রত্যুষ একই ভঙ্গিতে বসে থেকে বললো।
আদনান থমথম খেলো।মস্তিষ্কের মধ্যে একটি প্রশ্ন মাথাচারা দিয়ে উঠতেই জিজ্ঞেস করলো
-"সে কে?যার জন্য এভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছিস?"
-"জেনে কী করবি?"
প্রত্যুষ মলিন হেঁসে বললো।
-"বল না দোস্ত। প্লিজ বল।আচ্ছা যা,শুধু নামটা বল।তোর প্রেমিকার নামটা জানার খুব ইচ্ছে হচ্ছে।"
আদনান আকুলতা দেখিয়ে বললো।
প্রত্যুষ ঠোঁট বাঁকা করে হাসলো।মনোযোগ নিয়ে তাকিয়ে থাকা আদনান কে বললো
-"তার কোনো নাম নেই।শুধু এটুকুই জেনে রাখ সে আমার প্রাণ।"
-"ধুর! নামটা বলতেও তোর এতো সমস্যা!কোনো কথাই বের করা যায় না তোর পেট থেকে।যদি তোর পার্সোনাল কথাগুলোই শেয়ার করতে না পারিস আমার সাথে,তাহলে কেমন বন্ধু আমি তোর!আদনান রাগে গজগজ করতে করতে বললো।
প্রত্যুষ আবার হাসলো।নামটা ঠিকিই বলেছে ও,কিন্তু ছেলেটা বুঝতে পারেনি।
আদনান আবার বললো
-"তোর বিয়ের কথা বলে দিয়েছিস ওঁকে? সম্পর্ক ভেঙে গেছে তোদের?"
-"আমরা দুজন সম্পর্কে ছিলাম না কোনোদিনই।"
-"কী বলিস?তাহলে?"আদনান উৎকন্ঠা নিয়ে বললো।
-"ভালোবাসার জন্য তো সম্পর্কে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন পরে না।কিন্তু আমি যে বিশ্বাসঘাতকতা করলাম।আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম,তাকে বিয়ে করবো।কিন্তু রাখতে পারিনি নিজের কথা।
-"বেচারি মেয়েটা!"
আদনান দুঃখ প্রকাশ করে বললো।
.
স্টেজের সামনে একটা চেয়ারে বসে আছে প্রাণেশা।সাউন্ড বক্সে লাউড সিস্টেমে গান বেজে চলেছে।স্টেজের একপাশে কয়েকজন তরুণ -তরুণী গানের তালে তালে নেচে চলেছে।আরিশাও আছে তাদের সাথে।প্রাণেশার এসব গান-বাজনা অতিমাত্রায় পছন্দ হলেও আজ কেন যেন এসবে মন টানছে না।তাই সে বসে আছে বাড়ির মুরব্বিদের সাথে।প্রত্যুষের নানাবাড়ির মেয়েরা এবং তার নানাবাড়ির মেয়েরা একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে। প্রাণেশার নানি এবং নানুভাই কেউই বেঁচে নেই।তাই আজ শুধু তার দুই মামিমা এবং তার বড় মামা এসেছে।
স্টেজে একা বসে আছে রওশা।মলিন মুখে দেখছে সবকিছু। প্রাণেশার স্টেজের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ হলো।রওশার জন্য খারাপ লাগছে ওর।এ কেমন হলুদের অনুষ্ঠান যেখানে বর নিজেই উপস্থিত নেই!কনে কে একা একা স্টেজে বসে থাকতে হয়েছে।এর চেয়ে কষ্টের আর কী আছে?কি যে হচ্ছে প্রাণেশা কিছুই বুঝতে পারছে না।রিধিতাও নেই এখানে।রিধিতার জন্যও মন খারাপ হয় প্রাণেশার।বেচারা বকা খাওয়ার পর থেকে আর এ মুখো হয়নি।প্রাণেশা তার সাথে একটু মন খুলে কথা পর্যন্ত বলতে পারেনি।যদিও মালিহা বেগম অনেক জোর করেছিলেন এখানে আসার জন্য কিন্তু রিধিতা শোনেনি,সম্মানের সাথে নাকচ করেছে।
প্রাণেশার দুই মামির সাথে প্রত্যুষের নানি এবং মামি সাথে মানারা বেগম আর মালিহা বেগম বসে আছেন।
সবাই কথা বলছিলো নিজেদের মধ্যে, কথার এক পর্যায়ে প্রাণেশার বড় মামি মিতালি বেগম, মালিহা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলেন
-"প্রত্যুষ এলো না কেন আপা?কীভাবে মলিন মুখে বসে আছে মেয়েটা স্টেজে!হলুদের রাতে মেয়েটার স্বামী তার পাশে নেই এটা যে মেয়েটার জন্য বড়ই কষ্টের!"
মালিহা বেগম কিছু বলতে যাবেন তার আগেই সালিহা বানু পান চিবোতে চিবোতে বলেন
-"কেন আসবে বলো দেখিনি আমার প্রত্যুষ নানুভাই!কম অন্যায় করা হয়েছে তার প্রতি?ছেলেটা নাহয় বাপের সম্মানের দিকে তাকিয়ে মুখ বুঁজে বিয়েটা করে নিয়েছে।কিন্তু তার মা-বাবার তো ছেলের কথাটা ভাবা উচিত ছিলো।"
মিতালি বেগম থমথম খেলেন।বিয়েটা কীভাবে হয়েছে তার আদ্যেপান্ত কিছুই জানে না তারা।জানবেন কীভাবে,এটা তাদের কুটুমের বাড়ি,কুটুম দের বাড়ির ছেলের কীভাবে বিয়ে হয়েছে সেটা নিশ্চয়ই তাদের জানার কথা নয়।তাই তিনি আমতা আমতা করে বললেন
-"বুঝি নাই বেয়ান।"
মালিহা বেগম থামানোর চেষ্টা করলেন নিজের মা'কে। কিন্তু সালিহা বানু দমে গেলেন না।উল্টো চড়া কন্ঠে বললেন
-"আপনারা তো অনেক কিছুই জানেন না।এই বিয়াটা আমার নানুভাই নিজের ইচ্ছেতে করে নাই।যে মাইয়াডার সাথে বিয়া হয়ছে ওর সেই মাইয়াডার বাপ-মা নাই।মাইয়াডা অনেক ছোড থাকতেই মারা গেছিলো। অনাথ মাইয়াডা।চাঁচা-চাঁচির ঘরে মানুষ হয়ছে। চাঁচি নাকি একটা বয়ষ্ক মানুষের লগে বিয়ের পিড়িতে বসায় দিচ্ছিলো মাইয়াডারে।আমার জামাই বাবাজির বন্ধু ছিলো মাইয়াডার বাবা।কথা দিছিলো মাইয়াডারে নাকি আমার প্রত্যুষ নানুভাইয়ের সাথে বিয়া দিবে।শুধুমাত্র কথা রাখার জন্য আমার প্রত্যুষ নানুভাইয়ের কথা ভাবলো না ওরা।এভাবে অন্যায় করলো ওর লগে।এই যুগে আইসাও এভাবে জোর-জবরদস্তি কইরা বিয়া হয়?তাও যদি মাইয়াডার বাপ-থাকতো তাইলে একটা কথা ছিলো।চালচুলা হীন একটা মাইয়ারে আমার প্রত্যুষ নানা ভাইয়ের গলায় ঝুলায় দিলো।হে এসব কেমনে মানবো কও দেখি! আমি পুরান যুগের মানুষ হইয়াও হের কষ্ট বুঝতাছি,কিন্তু এরা বাপ-মা হইয়াও বুঝতাছে না।"
বলেই সালিহা বানু থামলেন।মালিহা বেগম রাগী দৃষ্টিতে তাকালেন মায়ের দিকে।যদি পারতেন চোখ দিয়েই ভষ্ম করে দিতেন তাঁকে।সালিহা বানু মেয়ের রাগী দৃষ্টি পরোয়া করলেন না।মনে মনে অসম্ভব শান্তি লাগছে তার।অনেক্ষণ ধরেই এসব পেটের মধ্যে আটকে রেখেছিলেন তিনি।মানুষকে মানুষের কথা না বোঝালে শান্তি হয়না তার।ঝামেলা লাগানোই ওনার সবচেয়ে পছন্দের কাজ।যখন থেকেই তিনি রওশার ব্যাপারে এসব শুনেছেন তখন থেকেই তার মনটা খচখচ করছিলো। একটা অনাথ,চালচুলোহীন মেয়ে তার নাতবউ হয়েছে এ যেন কোনোমতেই মানতে পারছিলেন না তিনি।তার ধারণা এই কারণেই প্রত্যুষ মেয়েটাকে মানতে পারছে না।এরকম একটা মেয়েকে কে-ই বা নিজের বউ বানাতে চাইবে!আসলে আমরা যেমন, আমরা আরেকজন মানুষকে তেমন রূপেই কল্পণা করি।ওনার হীন মনের কারণে ওনার মনে হচ্ছে প্রত্যুষও হয়তো একই কারণে মেয়েটাকে মানতে পারছে না।
প্রাণেশা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো প্রতিটি কথা।রওশার ব্যাপারে কিছুই জানতো না প্রাণেশা।এতোক্ষণে পুরোটা সত্যি জানতে পেরেছে সে।তার মানে প্রত্যুষ নিজের ইচ্ছেতে বিয়েটা করেনি,এজন্যই ছেলেটা সেদিন ওভাবে রেগে ছিলো।প্রত্যুষ অপারগ ছিলো সেটা জানার পরোও প্রাণেশা বিন্দু পরিমাণ খুশি হতে পারলো না।রওশা তার মা-বাবা কে হারিয়েছে ছোটবেলায়, চাচির অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছে এসব জানার পর প্রাণেশার ওর প্রতি সব রাগ চলে গেছে।রাগের বিপরীতে জমা হয়েছে এক রাশ বিহ্বলতা।মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে বারংবার।রওশার অসহায়ত্ব কষ্ট দিচ্ছে বুকের ভিতর।ওতো কোনোদিন কাউকে আঘাত করেনি।আরেকজনের কষ্ট দেখলেও কষ্ট লাগে ওর,সেখানে আরেকজনকে কষ্ট দেওয়ার কথা কীকরে ওর মন-মস্তিষ্কে আসে!
প্রাণেশা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায়।মানারা বেগম কে বলে নিজের কক্ষে চলে গেলো। একটু ঘুমের দরকার খুব করে।মস্তিষ্ক শান্ত রাখতে হবে। দু রাত ঘুমাইনি, তার উপর একটার পর একটা চিন্তা। এসব মাথায় নিতে গিয়ে পাগলই হয়ে যাবে ও।এবার একটু নিজের মন ও শরীরকে শান্তি দিতে হবে।নিজের উপর খুব বেশিই অত্যাচার করছে প্রাণেশা।
গভীর রাতে আচমকা ঘুম ভাঙায় ধরফরিয়ে উঠে বসে প্রাণেশা।বুকে হাত রেখে বড় বড় করে শ্বাস ফেলে শান্ত করে নিজেকে।সামনে প্রত্যুষকে বসে থাকতে দেখে আরো বেশি চমকায় ও।বিছানায় হাত রেখে একটু পিছিয়ে যায় প্রাণেশা।প্রত্যুষ টুলের উপর বসে ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।প্রাণেশা তুতলে বললো
-"প্র্ প্র্প্রত্যুষ ভাই তুমি এখানে?"
-"আমি বাঘ না ভাল্লুক যে এভাবে ভয় পেয়ে গেলি!"
প্রত্যুষের কন্ঠে রসিকতা।
প্রাণেশা চোখ খিচে শান্ত করলো নিজেকে।কক্ষে লাইট জ্বলছে এখনও।স্টেজের ওখান থেকে এসে এতটাই দুর্বল লাগছিলো যে ফ্রেশ হয়ে লাইট অফ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো ও।
সাইকোলজি বলে ঘুমন্ত অবস্থায় কেও যদি আমাদের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকে তবে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়।হয়তো প্রাণেশার ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটেছে।
প্রাণেশার অবস্থা দেখে বাঁকা হাসলো প্রত্যুষ। সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাস নিয়ে এগিয়ে দিলো প্রাণেশার দিকে।প্রাণেশার এক নিঃশ্বাসে পুরো গ্লাস শেষ করলো।প্রত্যুষ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো
-"ঠিক লাগছে এখন?"
প্রাণেশা উপর-নিচ মাথা নাড়ে।প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে বলে
-"তুমি এখানে? কয়টা বাজে?"
-"রাত তিনটা হবে হয়তো!তোর পায়ের ব্যাথা কমেছে?"
-"তুমি এতো রাতে এটা জানতে এসেছো।"প্রাণেশা চোখ ছোট ছোট করে জিজ্ঞেস করলো।
প্রত্যুষ কাঠ কাঠ কন্ঠে বললো
-"যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটার উত্তর দে।পাল্টা প্রশ্ন করিস কেন বেয়াদব! "
প্রাণেশা থমথম খেলো।মাথা নুইয়ে নম্র কন্ঠে বললো
-"হ্যাঁ কমেছে।অতটাও ব্যাথা পায়নি। "
প্রত্যুষ নিশ্চুপ থাকলো ক্ষণকাল।পিনপতন নিরবতা শুরু হয় দুজনের মাঝে।ঘড়ির কাটার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যায় না কক্ষে। নিরবতা ভেঙে প্রত্যুষ বললো
-"আমি তোকে ফেলে দিতে চায়নি প্রাণ।বিশ্বাস কর আমি তোকে ইচ্ছে করে ফেলিনি।তোকে ব্যাথা দেওয়ার কথা আমি ভাবতেও পারিনা।সরি। তোর প্রত্যুষ ভাইকে তুই কখনোই ক্ষমা করিস না।"
প্রাণেশা মাথা নিচু করে বসেছিলো।প্রত্যুষের কথায় অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে।বিহ্বল কন্ঠে আওড়ালো
-"কী বলছো এসব?"
-"আমি জানি আমি তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি,ঠকিয়েছি। যেটা কেন্দ্র করেই হোক না কেন, তোর কান্নার জন্য দায়ী আমি।কোনো কাপুরুষের জন্য কাঁদিস না প্রাণ।কখনই ক্ষমা করিস না আমাকে।এতো ভালোবাসা জমা না রেখে পারলে অভিশাপ দিস,যে তোকে এতো কষ্ট দিয়েছে তার যাতে কোনোদিন ভালো না হয়।"
বলতে বলতে প্রত্যুষের গলা ভেঙে আসে।প্রাণেশা কিছু বলতে যাবে তার আগেই টুল ঠেড়ে ওঠে দাঁড়ায় ও।প্রাণেশা ছলছল চোখে তাকালো ওর দিকে।প্রত্যুষ মলিন হেসে বললো
-"শক্ত কর নিজেকে। যদি পারিস একজন সুপুরুষকে ভালোবাসিস।যে তোর বিনিময়ে কোনোকিছু ভাবতে পারবে না।যে তোকে এক ফোটা কষ্ট পেতে দিবে না।যে তোর জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকবে।পারলে তাকে ভালোবাসিস।আমার মতো প্রতারক কে না।"
বলেই হনহনিয়ে চলে গেলো প্রত্যুষ।প্রাণেশা তাকিয়ে থাকে ওর যাওয়ার দিকে।এই প্রথম প্রত্যুষ কে এতটা নরম সুরে কথা বলতে দেখেছে প্রাণেশা,কাঁদতে দেখেছে।যদিও তার কান্না প্রাণেশাকে দেখাতে চায়নি প্রত্যুষ।
প্রাণেশা একইভাবে বসে থাকে।চোখের ঘুম উবে গেছে।আজ রাতে মনে হয় না আর ঘুম হবে।যখনই একটু শক্ত হতে যায় ও,তখনই প্রত্যুষ এসে ওর মনোবল গুঁড়িয়ে দেয়।ওঁকে আবার দুর্বল করে দেয়। সে বলেছে প্রাণেশা কে শক্ত হতে কিন্তু সে জানে না তার উপস্থিতিই প্রাণেশার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
.
সকাল হয়,সূর্যের আলো ফোঁটে।ভূইয়া বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়।মেহেমানদের আনাগোনা, বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি আর দুষ্টমিতে ভরপুর হয় বাড়িটি।সকাল থেকেই বাড়ির গৃহিণীরা রান্না-বান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।প্রাণেশা সিড়ি বেয়ে এলোমেলো পায়ে নিচে নামে।রাতে ঘুম না হওয়ার রেশ এখনো থেকে গেছে চোখে-মুখে। প্রাণেশা ধ্বপ করে এসে সোফায় বসলো। আরিশা সোফায় বসে মোবাইলে কথা বলছিলো কারো সাথে।প্রাণেশার ওভাবে বসায় চমকে গেলো। বুকে থুতু ছিটিয়ে বললো
-"এভাবে ভুতের মতো কোত্থেকে টপকে পড়লি?"
প্রাণেশা একবার কোণা চোখে সেদিকে তাকিয়ে আবার সামনে তাকালো।বিষাক্ত লাগছে ওর সবকিছু।
রিধিতা আজ মানারা বেগম আর মালিহা বেগমের হাতে হাতে কাজ করছে।দুজনে হাজার বারণ করা সত্বেও থামাতে পারছে না ওঁকে। সে আজ বাড়ির সব কাজ করেই ছাড়বে।রিধিতার দেখাদেখি রওশাও আছে কিচেনে।কিন্তু কেও তাকে কোনোকাজে হাত দিতে দিচ্ছে না।প্রাণেশা চুপচাপ বসে থাকলো সোফায়।আরিশা নিজের কথা শেষ করে, প্রাণেশাকে উদ্দেশ্য করে বললো
-"আজকেও শাড়ি পরবো,কেমন!আর একসাথে সাজবো।"
-"আচ্ছা।"
বলেই আবার চুপ হয়ে গেলো প্রাণেশা।মানারা বেগম নাস্তা নিয়ে আসলো ওর জন্য। আরিশা তাড়াতাড়ি খাওয়ার তাগাদা দিলো ওঁকে।
প্রাণেশা খাবার শেষ করে প্লেট রাখতে কিচেনে চলে গেলো।কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের মা'কে ডাকলো।মানারা বেগম নিজের কাজ দেখিয়ে অপেক্ষা করতে বললো ওঁকে। প্রাণেশা দাঁড়িয়ে থেকে কাজ দেখে সবার।মানারা বেগম নিজের হাতের কাজ শেষ করে কিচেনের বাইরে আসে।প্রানেশা নিজের মায়ের হাত টেনে দোতলায় নিয়ে আসে।মানারা বেগম ওর দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে
-"কীরে এভাবে নিয়ে আসলি যে এখানে?কিছু বলবি?"
-"একটা শাড়ি দাও তোমার।"
-"শাড়ি দিয়ে কী করবি?"কপাল কুঁচকে বললেন তিনি।
-"পড়বো।আজকে আরিশা আপুও শাড়ি পড়বে।"
-"আচ্ছা,আচ্ছা। তাই বলে এভাবে টেনে নিয়ে আসবি।ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"
মানারা বেগম আলমিরা খুলে কয়েকটা শাড়ি দেখালেন।প্রাণেশা দেখলো সবগুলোই খুব সুন্দর। তার মায়ের পছন্দ আছে বলতে হবে!সবগুলো শাড়ি দেখার পর প্রাণেশা আবদার করে বললো
-"তোমার বিয়ের শাড়িটা দাও।"
-"আমার বিয়ের শাড়ি পড়বি??"মানারা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো।
প্রাণেশা উপর নিচ-মাথা নাড়ালো।মানারা বেগম আলমিরা খুঁজে তার বিয়ের শাড়ি বের করে দিলো প্রাণেশাকে।মুচকি হেসে বললো
-"শাড়িটা পড়লে আমার বাচ্চাটাকে একদম বউ বউ লাগবে!"
-"কার বউ?"
প্রাণেশা মুখ ফুটে বললো।
মানারা বেগম হেঁসে দিলেন। তার মেয়েটা শুধু হাতে পায়েই বড় হয়েছে।নয়তো মন-মস্তিষ্কের দিক দিয়ে এখনো বাচ্চাটিই রয়ে গেছে।মানারা বেগম ভাবার অভিনয় করে বললেন
-"একটা রাজপুত্র।"
প্রাণেশা মাথা নুইয়ে হাসলো। মানারা বেগম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
প্রাণেশা গুটিগুটি পায়ে তিনতলায় উঠলো।সিড়ির একেবারে সামনের কক্ষটা প্রত্যুষের।প্রাণেশার কক্ষটা তিনতলার কর্ণারে।তাই ওর কক্ষে যেতে হলে আগে প্রত্যুষের কক্ষ পার করতে হয়।
প্রত্যুষের কক্ষের সামনে আসতেই প্রাণেশার পা থেমে যায়। ভেতর থেকে পলক ভূইয়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। চড়া আওয়াজে প্রত্যুষ কে কিছু বলছেন তিনি।প্রত্যুষও থেমে নেই,সেও তার বাবাকে পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে।
মানুষের দরজায় আড়ি পাতার স্বভাব নেই প্রাণেশার।কিন্তু আজ কেন যেন শুনতে মন চাইলো ভিতরে কী নিয়ে কথা হচ্ছে!
প্রাণেশা কান পাতলো দরজায়।পলক ভূইয়া উচ্চস্বরে বলছেন
-"কী শুরু করেছো তুমি?কালকেও হলুদের অনুষ্ঠানে যাওনি তুমি।বেচারা মেয়েটাকে একা একা বসে থাকতে হয়েছে স্টেজে!আজকেও যাবে না বলছো। কী চাওটা কী তুমি?"
-"শান্তি চাই বাবা।মুক্তি চায়।ক্লান্ত হয়ে গেছি তোমার কথা রাখতে রাখতে।"
-"এমন করো না প্রত্যুষ।বোঝার চেষ্টা করো এতোগুলো অতিথি। কী জবাব দিব সবাইকে!নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানে নিজেই দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে এটা কেমন দেখায়।প্লিজ শেষবার রাখো বাবার কথাটা।আর কোনোদিন কিচ্ছু চাইবো না তোমার কাছে।"
-"আমার কথা তো তুমি ভাবলেনা বাবা।আমি কেন তোমাদের কথা ভাবতে যাবো?তুমি তোমার আত্মীয় স্বজন কে কী জবাব দিবে সেটা আমার ভাবার বিষয় না!"
-"নিজের বাবার জন্য এটুকু করতে পারবে না তুমি।তােমার বাবার সম্মানের চেয়ে একটা মেয়ে বড় হয়ে গেলো তোমার কাছে।বিশ্বাস করো বাবা রওশা অনেক ভালো মেয়ে। একটু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো।"
-"তােমার ভালো মেয়ে লাগবে না আমার।আমার ভালোবাসায় কেড়ে নিয়েছো তুমি আমার কাছ থেকে।আর কী চাও!"
প্রাণেশা আর কিছু শোনার চেষ্টা করলো না।দ্রুত পায়ে সরে এলো সেখান থেকে।তখনও দুজনের কথা কাটাকাটি হচ্ছে। প্রাণেশা দৌড়ে এসে নিজের কক্ষে ঢুকলো।চটজলদি দরজা আঁটকে দরজা ঘেঁষে বসে পড়লো।আবার কষ্ট হচ্ছে বুকের মধ্যে।আশ্চর্য! এই যন্ত্রণা শেষ হয় না কেন।নিজেকে যতই বুঝাতে যাচ্ছে ততই হিতে বিপরীত হচ্ছে। সহ্য হচ্ছে না এসব।বিয়ে কোনো ঠুনকো সম্পর্ক না।প্রত্যুষ নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করুক আর না করুক।
কিন্তু প্রাণেশা কিভাবে থাকবে, কীভাবে বাঁচবে ওকে ছাড়া?ওঁকে ছাড়া তো এক কদমও চলতে জানে না ও।
প্রাণেশা উঠে দাড়ালো। শাড়ি পড়তে জানে না ও, কখনও পড়াও হয়নি তেমন।তাই ইউটিউব ঘেঁটে শাড়ি পড়ার টিউটোরিয়াল বের করলো।
প্রায় এক ঘন্টার চেষ্টার পর শাড়ি পড়তে সক্ষম হলো।আয়নার সামনে বসে চোখে মোটা করে কাজল পড়লো।ঠোঁট ডার্ক রেড লিপস্টিক দিয়ে রাঙালো ।গালে ব্লাশন লাগালো।হাতে এক গোছা লাল চুড়ি পড়লো।কানে বড় বড় ঝুমকা পড়লো।তারপর আয়নায় তাকালো নিজের দিকে।সোনালী পাড়ের ডার্ক রেড জামদানি শাড়িটা ফর্সা শরীরে মানিয়েছে ভীষণ। প্রাণেশা নিজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।এলোমেলো চুলগুলো সুন্দর করে খোঁপা করলো।
ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে পায়েল জোড়া হাতে নিলো প্রাণেশা। গুণগুণ করে গানের সুর তুলে পায়েল দুটো পড়লো পায়ে।এ পায়েল গুলো ওর মায়ের। অতিরিক্ত পছন্দ হওয়ার দরুন মানারা বেগমের কাছ থেকে এক প্রকার জোর জবরদস্তি করে নিয়েছিলো।পায়েলগুলো তার মা দিতে চায়নি তাকে কারণ পায়েল দু'টো তার বাবা দিয়েছিলো তার মা'কে। অনেক অনুরোধ করার পর পেয়েছিলো প্রাণেশা।
প্রাণেশা মিষ্টি হাসলো।ওর মা-বাবার এই অসম্ভব ভালোবাসা দেখতে ভালো লাগে ওর।আচ্ছা ওর মা-বাবার জীবনে যে ভালোবাসা এসেছে সেটা ওর জীবনে আসলো না কেন?
প্রাণেশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।হয়তো এসেছে,কিন্তু ওর ভাগ্যে যে ছিলো না।
প্রাণেশা তাকালো নিজের প্রতিবিম্বের দিকে।নিজের দিকে তাকাতেই কষ্ট হচ্ছে ওর।এ সময়ে এসে ওর মনে হচ্ছে ভালোবাসাহীন বেঁচে থাকার চাইতে হয়তো মৃত্যু কে গ্রহণ করায় শ্রেয়।কাটা তো নিজের জায়গায় ছিলো,ও নিজেই পা বাড়িয়ে সেই কাটায় নিজের পা রক্তাক্ত করেছে।তাহলে এখন কেন সহ্য করতে পারছে না।
প্রাণেশার কান্না উগলে আসে।মুখে হাত চেপে কান্না কমানোর চেষ্টা করে ও। বুকের মধ্যে কেও যেন খামছে ধরেছে।সব অভিমান, অভিযোগ গিয়ে পড়ে পলক ভূইয়ার উপর।কেন তার বড় বাবা নিজের হাতে ওর সব কিছু শেষ করে দিলো।কেন ওর কাছ থেকে ওর সব চেয়ে প্রিয় মানুষ টাকে কেড়ে নিলো।এই ব্যাথা যে ও সইতে পারছে না।সৃষ্টিকর্তা কেন এতো নিষ্ঠুর হলো।
সবাই বেঈমানি করলো ওর সাথে সবাই।ওর অঙ্গারের উপর উল্লাস ঘোষনা করছে সবাই মিলে।ওকে যন্ত্রণার সাগরে ভাসিয়ে সবাই আনন্দে মেতেছে।তাহলে তাই হোক,ভালো থাকুক সবাই।ও নিজেই নাহয় এই যন্ত্রণায় শেষ হয়ে যাবে।ও মরে গেলেও কারো কিছু যায় আসবেনা।
প্রাণেশা ড্রয়ার হাতড়ে ছুরি বের করলো।এই যন্ত্রণা থেকে একমাত্র মৃত্যুই ওঁকে মুক্তি দিতে পারে।এভাবে প্রতিনিয়ত তিলে তিলে মরার চাইতে একেবারে মরে যাওয়ায় শ্রেয়।প্রানেশা উঠে দাঁড়ালো।এলোমেলো পেয়ে এসে বিছানার সামনে ধপ করে বসলো। বিড়বিড় করে বললো
-"তোমরা সবাই স্বার্থপর,সবাই।কেও আমাকে ভালোবাসো না তোমরা।আমি আর থাকতে চায় না তোমাদের সাথে।এই যন্ত্রণা আমি আর সহ্য করতে পারছি না।আমি মরে যায়,তোমরা ভালো থাকো।মা-বাবা,ভাইয়া ক্ষমা করে দিও আমাকে।কেঁদো না আমার জন্য। কিন্তু আমি তোমাকে ক্ষমা করবো না বড় বাবা,তোমাদের কাউকে ক্ষমা করবো না।কখনো ক্ষমা করবো না।"
প্রাণেশা নিজের হাতের শিরার উপর ছুরি বসালো।মানস্পটে
ওর মা-বাবা,ওর বড় ভাই, বড় বাবা-বড় মা,প্রহর ভাইয়া,রিধিতা,ওর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার মুখাবয়ব ভাসছে।মনে পড়ছে ওদের সাথে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত।কিন্তু তাদের স্মৃতি থামাতে পারলো না ওঁকে। ওরা যখন ওর কথা ভাবেনি তাহলে ওঁদের কথা কেন ভাবতে যাবে প্রাণেশা!
প্রাণেশা চোখ খিঁচে শিরার উপর ছু*রি টানলো।একবার না কয়েকবার।কা*টা জায়গা থেকে তিরতির করে লা*ল তরল বেরিয়ে আসে।প্রানেশার হাত থেকে ছুরি পরে যায়। এক হাতে অন্য হাত চেপে ধরে ও।হাতের ব্যাথায় বুকের মধ্যে কাঁপন ধরে।প্রাণেশা দিশেহারা হয়।পরক্ষণে শান্ত করে নিজেকে।চোখের পানিতে কাজল লেপ্টে চোখের আশেপাশে ছড়িয়ে গেছে। যে কষ্ট ও ওর পরিবার থেকে পেয়েছে,সে কষ্টের তুলনায় এ কষ্ট কিছুই মনে হয় না ওর কাছে।
প্রাণেশা শান্ত ভঙ্গিতে নিজের পড়ার টেবিল থেকে খাতা নিয়ে মেঝেতে বসলো। খাটের উপর খাতা রেখে কাঁপা কাঁপা হাতে এলোমেলো অক্ষরে লিখলো
-"প্রত্যুষ ভাইয়ার মতো স্বার্থপর,কঠিন পুরুষ আমি আমার জীবনে দুটো দেখিনি।সে এতটাই স্বার্থপর যে আমাকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে, অন্য কারো সাথে সংসার বাঁধছে।কিন্তু আমি যে তা সইতে পারছি না।সে আমাকে বলেছে আমি যাতে শক্ত হয়।কিন্তু, সে আমার কখনই হবে না।আমি কীভাবে থাকবো তাকে ছাড়া?সে চাইলো আমি যাতে ভালো থাকি । সে আমার ভালো চাইলো আমারে চাইলো না।"
পরক্ষণেই আবার খাতার পাতাটা ছিড়ে ফেললো।মুঠো করে দুরে ছুড়ে মারলো।ও চায় না ওর কথাটা কেউ জানুক।এই দুঃখ ওর একান্ত, ব্যাক্তিগত।ওর জন্য পরিবারের ভাঙন ধরবে সেটা ও কখনই মেনে নিতে পারবে না।প্রত্যুষ কে কেও দোষারোপ করুক সেটাও কখনই চাইবে না প্রাণেশা।ওর যা হবে হোক কিন্তু ওর পরিবারের সবাই ভালো থাকুক, সুখে থাকুক।
#চলবে
(সেই যে মার্চের ১৫ তারিখ এক্সাম শেষ হলো,তারপর আমি আর কখনো পড়ার টেবিলে বসি নাই।ছয় টা মাস জাস্ট আজাইরা মোবাইল দেখে সময় নষ্ট করছি।কিন্তু এখন আমার কলেজ খুলছে।এইচএসসি এর সময়টা কত কম সেটা আপনারা জানেন।এখন যদি একটু পড়া আগাই না রাখি আমি নির্ঘাত সামনে গিয়ে অনেক বড় মারা খাবো।এ কয়েকদিন একটু না অনেক বেশিই ব্যস্ত ছিলাম।লেখালেখি আমার শখ।এসএসসি এক্সাম শেষে যখন বিরক্তিকর সময় পার করছিলাম তখন লেখালেখির প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি হয়েছিলো। এখন শখের জন্য আমি আমার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তো বাদ দিতে পারিনা।প্লিজ, আপনারা একটু বোঝার চেষ্টা করেন আর ধৈর্য ধরে পড়েন।আজ থেকে আমি চেষ্টা করবো প্রতিদিন গল্প দেওয়ার।")