#পরিণীতা
#পর্ব:২৩
#তানজিনা ইসলাম
অপরাহ্নের প্রহর চলছে।আজ পুরোটা দিন লন্ডনবাসী এক প্রবল তুষার ঝড়ের ভূয়োদর্শন করেছে।মধ্যাহ্নের বিদায়ের মাধ্যমে প্রলয়ঙ্কারী তুষারপাতের অবসান ঘটেছে।তবুও বিস্তীর্ণ আকাশ মেঘে ঢাকা।গুড়িগুড়ি তুষার তুলার পতো বিছিয়ে পরছে প্রতিনিয়ত।দু-হাত ক্রস করে বুকের সাথে মিশিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রত্যুষ। নিষ্পলক তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।গুঁড়ি গুঁড়ি তুষারগুলো উপর থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে।জানালা দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে হাড় কাপানো ঠান্ডা বাতাস এসে কক্ষে হুড়মুড় করে ঢুকছে।চেম্বারে থাকা হিটারের উত্তপ্ত তাপ আর বাইরের ঠান্ডা বাতাসের মিশেলে মিশ্র পারিপার্শ্বিক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বাইরে সাদা তুলায় ঢাকা পরিবেশটা অসম্ভব সুন্দর, স্নিগ্ধ।যেন একটুকরো স্বর্গ! সামনের ম্যাপল ট্রিটা তে নাম না জানা দু'টো পাখি বসে আছে।সাদা আস্তরণে ঢাকা এক জোড়া বিদেশি পাখি।প্রত্যুষ ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো। এই সুন্দর পরিবেশে সবাই নিজের প্রিয়জনদের সাথে বসে টিভি দেখছে বা চায়ের আড্ডা জমিয়েছে।কিন্তু প্রত্যুষ!তার প্রিয় মানুষগুলো কোথায়!এই ভর সন্ধ্যায় ও একা কেন!কেনই বা সবকিছু ছেড়ে অসুস্হ মন নিয়ে কাজের জন্য ছুটে আসতে হয়েছে?উত্তর নেই?আসলেই নেই। ওর প্রিয় মানুষগুলো ওর থেকে যোজন যোজন দুরত্বে।ওর হাসিমাখা একটা প্রিয় মুখ ওর ধরা ছোয়ার বাইরে।সে কাছে থাকলে বোধহয় জীবনটাও এই পরিবেশটার মতো অসহ্য সুন্দর হতো।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো প্রত্যুষ।এসব ভাবনা খালি মনটা কে বিষিয়ে তোলে।জীবনটাকে দীর্ঘশ্বাসের নিচে পর্যবসিত করে।আর এই আফসোস, হাহাকার ভরা জীবনটা থেকে বেঁচে থাকার ইচ্ছে উঠিয়ে নেয়।
কট করে দরজা খোলার আওয়াজে পেছন ফিরে তাকালো প্রত্যুষ।লাবণ্যময়ী, আগুন সুন্দরী এক নারী প্রবেশ করে দরজা ঠেলে।ভেতরে ঢুকে পিঠ দিয়ে ঠেকিয়ে আটকে দেয় দরজা।প্রত্যুষ জানালার কাছ থেকে সরে আসে।গম্ভীর চোখে তাকিয়ে অত্যাধিক শীতল কন্ঠে বলে
-"চেম্বারে ঢোকার জন্য আগে যে পারমিশন নিতে হয়,সেই কমনসেন্স টুকুও ভুলে গেছেন ডক্টর বেলা।"
বাদামী চুলের রমনী গা দুলিয়ে হাসলো।ধীর পায়ে এগিয়ে আসলো প্রত্যুষের কাছে।কামুকে চোখে তাকিয়ে কাঠ কাঠ ইংরেজি তে বললো
-"আপনার ক্ষেত্রে কেনো যেন কমনসেন্স কাজ করে না ডক্টর!তবে অন্য কিছু কাজ করে অবশ্যই।"
প্রত্যুষ ভাবলেশহীন।শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে।গায়ের সাথে আটশাট জড়ানো একটা টিশার্ট পরেছে সে।ধপধপে সাদা স্লিম তলপেট উন্মুক্ত।পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা প্লাজো জিন্স।বাদামী চুলগুলো কাঁধের উপর ছড়িয়ে দিয়েছে সে।চোখেমুখে আবেদনময়ী ভাব।বিরক্তিকর শ্বাস ফেললো প্রত্যুষ। গম্ভীর স্বরে বললো
-"এটা হসপিটাল।আপনার এসব বেলেল্লাপনা করার জায়গা না।এসব ফালতুমি করতে হলে অন্য কোথাও গিয়ে করুন।"
ভাবাবেগ হলো না তার।সে পুণরায় মিষ্টি স্বরে বললো
-"সবসময় এভাবে গম্ভীর মুখে কথা বলা কী জরুরি?মাঝেমধ্যে একটা হাসিও দেওয়া যায়।আপনার হাসি কিন্তু অসহ্য সুন্দর।"
বলেই তর্জনী আঙ্গুল প্রত্যুষের বুকের সাথে ঠেকালো সে।তিতকুটে ঢোক গিললো প্রত্যুষ।একপা দুরে সরে দাড়িয়ে তেঁতো স্বরে বললো
-"আমি আপনার এক-বছরের জুনিয়র হই ডক্টর বেলা।এটুকু ভেবে অন্তত সামান্য রেস্পেক্ট আপনি আমাকে দেখাতে পারেন!"
মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকালো সে।কন্ঠে আকুলতা এনে বললো
-"হেই,আপনি জানেন কতটা রেস্পেক্ট করি আমি আপনাকে।এই হসপিটালে যত ডক্টর আছে সবচেয়ে বেশি রেস্পেক্ট করি।কিন্তু আপনি তো আমার সাথে একটু হেসে
কথাও বলেন না ইভেন কারো সাথেই।সবসময় এমন হয়ে থাকা কী জরুরি?"
দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সংবরন করলো প্রত্যুষ।এই মহিলাকে দেখলেই অসম্ভব বিরক্তি অনুভব হয় ওর।এই মহিলাকে দেখলেই চক্ষু জোড়ায় জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে যায়। সিনিয়র বলে মুখের উপর কিছু বলতে পারে না এমন না,তবে ফর্মালিটি মেইনটেইন করতে হয় সবসময়।সে আবার বললো
-"আপনি আপনার বিবাহিত জীবনে সুখী না তাই না ডক্টর প্রট্যুষ।এজন্য সবসময় মুখ গোমড়া করে থাকেন!"
মুখে চ-বর্গীয় শব্দ বের করলো প্রত্যুষ। না,বিবাহিত জীবন নিয়ে কথা বলায় ওর কোনো মাথা ব্যাথা নেই।কিন্তু এই ইংরেজরা সবসময় বাঙালিদের নামের পিন্ডি চটকায় দেই।ওর এতো সুন্দর নামটারও কেমন দফারফা করে দেয় সবাই।প্রত্যুষ দাঁতে দাঁত চেপে বললো
-"আমার বিবাহিত জীবন নিয়ে আপনাকে না ভাবলেও চলবে।আপনি নিজের জীবন নিয়ে ভাবুন।"
-"ভাবার জন্য আপনাকে দরকার।"
সহ্য শক্তি অতিক্রম হয়ে গেলো প্রত্যুষের।দ্রুত এই মহিলার সামনে থেকে চলে যাওয়ার গুরুত্ব অনুভব করলো।প্রত্যুষ গটগট পায়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।বেলা নিজের গালে হাত ঠেকিয়ে লাজুক দৃষ্টিতে তাকালো ওর যাওয়ার দিকে।বিড়বিড় করে বললো
-"সাচ এ কিউট বেঙ্গল ম্যান!"
.
প্রভাতের আগমন ঘটেছে সেই অনেক্ষণ হবে।তবুও রবির স্নিগ্ধ আলো তে তেজের রেশ মাত্র নেই।শীতের সকালে সূয্যিমামা ধরণীর বুকে অতটা প্রভাব খাটায় না।
শুধু নরম,উজ্জ্বল আলোয় পৃথিবী ঝলমলিয়ে উঠে।
প্রাণেশা ধীর পায়ে হাঁটছে।হালকা বাতাস বহমান আজ।বাতাসের তোপে খোলা চুলগুলো চোখে মুখে উপচে পড়ছে।প্রাণেশা এক হাতে নিজের চুল সামলে কানের পিছনে গুঁজে দিলো।একটা সাদা সালোয়ার ওর পরণে।চোখেমুখে ভাবনা স্পষ্ট। কিন্তু কী নিয়ে ভাবছে সেটা নিয়ে প্রাণেশা নিজেও সন্দিহান।হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পার্লামেন্টের গেইটের কাছে পৌঁছে গেলো ও।কিন্তু কিছুদূর গিয়ে থেমে যায় প্রাণেশা।সামনে জটলা বেঁধেছে।মুগ্ধ, তাজিম আর ওর মামার সাথে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন। প্রাণেশা ভালোভাবে খেয়াল করলো।উচ্ছ্বাস কে চোখে পড়তেই গোল গোল চোখে তাকালো ও।আশ্চর্য!ছেলেটা এখানে,ওদের পার্লামেন্টে আসবে কোত্থেকে? কালকে রাতে উলোটপালোট ভাবতে ভাবতে প্রানেশা স্বপ্নেও দেখেছে ওঁকে। এখন আবার হ্যালুসিনেশনে ভুগছে নাকি!প্রাণেশা চোখ কচলে তাকালো আবার।নাহ!ও ঠিকিই দেখছে,সে সত্যিসত্যিই এসেছে,হ্যালুসিনেশনে না।কিন্তু হঠাৎ এখানে কেন আসলো সে?প্রাণেশা এগিয়ে যায় সামনে।
গ্রামের রিসেন্ট সিচুয়েশন নিয়ে এমপির সাথে কথা বলতে এসেছিলো উচ্ছ্বাসের টিম। যেহেতু ওরা একটা রেস্পন্সিবলিটি নিয়ে গ্রামে এসেছে সেহেতু এমপির সাথে কথা বলাটা বা ওঁদের ডিসিশন জানানো টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
কথার এক পর্যায়ে ইয়াসির আহমেদ মুচকি হেঁসে বললো
-"আপনাদের কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই আমাকে ইনফর্ম করবেন।মুগ্ধ বা তাজিম কে বললেও হবে।আমরা আপনাদের সাহায্য করার সম্পূর্ণ চেষ্টা করবো।"
-"জ্বি অবশ্যই।"গম্ভীর মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বললো উচ্ছ্বাস।
ইয়াসির আহমেদ বিদায় জানিয়ে চলে আসে সেখান থেকে।
পরক্ষণে উচ্ছ্বাস তাকালো মুগ্ধর দিকে।চোখ ছোট ছোট করে বললো
-"গতকালকে যখন দেখা হলো, তুমি আমাকে বললা না কেন, তোমরা যে ইয়াসির আহমেদের দলের লোক।"
মুগ্ধ আমতা আমতা করে হাসলো।নিম্নস্বরে বললো
-"সরি অফিসার।আমরা আসলে,নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেই ওঁকে খুঁজতে চেয়েছিলাম।"
-"হুম।এজন্যই নতুন এমপি নিয়ে কথা বলায় তোমার বান্ধবী কালকে ছ্যাৎ করে উঠেছিলো তাই না!"
মাথা নুইয়ে হাসলো মুগ্ধ। নম্র কন্ঠে বললো
-"প্রাণেশার মামা হন তিনি।"
উচ্ছ্বাস অবাক হয়ে বললো
-"সত্যি।"
-"হুম।"বলেই মুগ্ধ উপর-নীচ মাথা নাড়ে।
-"তুমি বলছি বলে রাগ করছো নাতো!তুমি যেহেতু আমার ছোট সে হিসেবে তোমাকে তুমি বলায় যায়, কী বলো?"উচ্ছ্বাস কোমল স্বরে বললো।
-"অবশ্যই অফিসার।কেন নয়!"
-"ভাইয়া ডেকো।অফিসারটা কেমন যেন মুরব্বি মুরব্বি লাগে।আর আমাদের তো এখন প্রতিনিয়ত দেখা হতেই থাকবে।"
মুচকি হাসলো মুগ্ধ। ইশ!ক্রমশই মনের মধ্যে একটা বিশাল জায়গা দখল করে নিচ্ছে ছেলেটা।সবসময় গম্ভীর বদনে থাকলেও ছেলেটার মনটা কিউট,ভাবলো মুগ্ধ।
প্রাণেশা কে ইয়াসির আহমেদের সাথে কথা বলতে দেখে মুগ্ধ বললো
-"ঐ তো প্রাণেশা।"
উচ্ছ্বাস দৃষ্টি সরিয়ে তাকালো সেদিকে।প্রাণেশা কথা শেষ করে এগিয়ে আসছে।ওঁদের কাছে আসতেই মুগ্ধ উদ্বিগ্ন স্বরে বললো
-"কী রে! আজ এতো দেরি হলো যে?"
-"ঘুম ভাঙেনি।"নীরস উত্তর প্রাণেশার।
পরক্ষণেই কোণা চোখে একবার উচ্ছ্বাস কে পরোখ করলো প্রাণেশা।চটজলদি আবার দৃষ্টি সরিয়ে আনে।কিন্তু উচ্ছ্বাসের প্রখর দৃষ্টি দেখে নিলো ওঁকে। ঠোঁট কামড়ে হাসলো সে।মুগ্ধর উদ্দেশ্যে তীক্ষ্ণ স্বরে বললো
-"মুগ্ধ, তোমাদের দলে কী কোনো রুলস বা রেগুলেশন নেই।না মানে,যার যখন ইচ্ছা তখন আসতে পারে?"
প্রাণোশা ফুঁসে তাকালো তার দিকে।ভ্রু নাচিয়ে তাকালো সে।হঠাৎ তাজিম উত্তর করলো
-"রুলস সবার জন্য থাকলেও প্রাণেশার জন্য নেই!"
-"কেন?" ভ্রুকুটি গুটিয়ে প্রশ্ন করলো সে।
-"কারণ ও আমাদের দলের সভাপতি।"
দুই গালে দু-হাত ঠেকিয়ে অবাক হওয়ার ভং ধরলো উচ্ছ্বাস।ঠোঁট গোল করে বললো
-"মেয়েরাও সভাপতি হতে পারে?আর ওনাকে দেখতেই তো বেবি বেবি লাগে।মান্য করে কেও? দলের কাজ এগোই কী করে?"
-"সেটা নিয়ে আপনাকে না ভাবলেও চলবে।"
প্রাণেশা চিবিয়ে চিবিয়ে বললো।আগুন ঠিকরে পরছে যেন ওর দৃষ্টি দিয়ে!আবার হাসলো সে।হাসিমুখে দেখলো প্রাণেশাকে।প্রাণেশা বুকের সাথে হাত গুঁজে দাঁড়ালো। এটিটিউড নিয়ে বললো
-"আমি ভূইয়া বাড়ির মেয়ে ওঁকে! আদ্রিকা ভূইয়া প্রাণেশা।এখনও এমন কেও জন্ম হয়নি যে প্রাণেশা কে মান্য করবে না।"
-"ও আচ্ছা ভূইয়া বাড়ির মেয়ে আপনি! যদিও গ্রামে পা রাখার পর থেকেই ভূইয়া বাড়ি নিয়ে অনেক সুনাম শুনেছি আমি।কিন্তু আপনি আমাকে বলবেন না আপনার আরো একটা নাম আছে,ভুয়া!"
ফিক করে হেঁসে দিলো মুগ্ধ।হাসি কন্ট্রোল করে বললো
-"আমিও ওঁকে এই নামেই ডাকি ভাইয়া।বাহ!আপনার আর আমার মেন্টালিটি দেখি মিলে যায়।"
-"হুয়াট এ কোয়িন্সিডেন্স!" হাসিমুখে বললো উচ্ছ্বাস।
প্রাণেশা হতভম্ব হয়ে দেখলো ওদেরকে। ক্ষণকালের মধ্যেই যেন দুজনের গলায় গলায় ভাব হয়ে গেছে।প্রাণেশার সহ্য হলো না ওঁদের এই ভাব।প্রগাঢ় স্বরে বললো ও
-"অতি হাসি ভালো না।বেশি হাসলে পরে বেশি কাঁদতে হয়।"
উচ্ছ্বাস হাস্যজ্জ্বোল চোখে তাকালো ওর দিকে।শোভন কন্ঠে বললো
-"অনেক আগের জোক্স।হাসলে মন ভালো থাকে।যেমন আমি সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকার ভং ধরি,নিজের প্রফেসনের সাথে সখ্যতা রাখার জন্য।কিন্তু হাসি আটকে রাখতে পারি না বেশিক্ষণ।আমার হাসি উচ্ছ্বসিত হয়ে বেরিয়েই আসে।"
প্রাণেশা মুখ বাকালো।গটগট পায়ে যেতে যেতে বললো
-"আপনার হাসি দেখতে খুবই বিশ্রী!"
#চলবে