ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরিণীতা

৩১তম পর্ব

লেখক: তানজিনা ইসলাম স্রোতিস্বিনী

পরিণীতা

পর্ব:৩২

তানজিনা ইসলাম

প্রোজ্জ্বল উবু হয়ে শুয়ে আছে।ছোট্ট দেহ ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে।তক্ষুণি ঘরে ঢুকলো রওশা।প্রোজ্জ্বল কে ওভাবে শুয়ে থাকতে চোখ সরু করে চাইলো ওর দিকে।ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো ওর কাছে।বিছানার উপর বসে, পেটের নিচে হাত দিয়ে টেনে নিজের কাছে আনলো।প্রোজ্জ্বল মুখে হাত দিয়ে আড়াল করলো নিজেকে।রওশা হাত টেনে চাইলো ওর দিকে।প্রোজ্জ্বলের মুখের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলো রওশা।পুরো মুখ টকটকে লাল হয়ে আছে, গাল ভিজে চটচটে অবস্থা। ক্রমাগত হেঁচকি তুলছে ও।রওশা আকুল হয়ে শুধালো

-"কী হয়েছে তোমার প্রোজ্জ্বল? কেন কাঁদছো? কী হয়েছে বাবা বলো আমাকে।"

প্রোজ্জ্বল কাঁদার চোটে কথা বলতে পারলো না।রওশা হাত বুলিয়ে দিলো ওর মুখে।ফের জিজ্ঞেস কররো কাঁদার কারণ।পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো ওঁকে।ক্ষাণিক বাদে শান্ত হলো প্রোজ্জ্বল। কাঁপতে কাঁপতে ভেজা গলায় বললো

-"বাবা!"

-"কী হয়েছে তোমার বাবার?"

-"বকেচে আমাকে।"

রওশা হতবাক দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করলো

-"তোমার বাবা বকেছে তোমাকে?"

প্রোজ্জ্বল উপর-নিচ মাথা নাড়ায়।রওশা সন্দিহান গলায় বললো

-"কেন বকেছে? কী করেছো তুমি?"

-"কিচ্চু করিনি। বাবা খেতে নামিছিলো না, তাই দাদু ডাকতে বলেচিলো।আমি ডেকেচি,কিন্তু বাবাকে একটু বিরক্ত করিনি।তারপরও আমাকে বকেচে।"

রওশা পলক ঝাপটে তাকালো ওর দিকে।প্রোজ্জ্বল মিথ্যে বলবে না ও জানে। ছেলেটা যদি দুষ্টু হতো তাহলে হয়তো রওশা বিশ্বাস করতো না।কিন্তু দুষ্টুমি কী প্রোজ্জ্বল হয়তো জানেই না।ছোটোবেলা থেকেই ও প্রচুর শান্ত-শিষ্ট। এমনকি এটুকু বয়সেও কান্না পেলে লুকিয়ে লুকিয়ে নিশ্চুপ কাঁদে ও।টু শব্দ করে পর্যন্ত জানতে দেয় না কাওকে যে কষ্ট পেয়েছে।প্রোজ্জ্বল কে এমনিই বকেছে প্রত্যুষ।শুধু শুধুই কোনো কারণ ছাড়া বকেছে যা প্রোজ্জ্বলের কথায় স্পষ্ট। কিন্তু কেন বকেছে? প্রত্যুষ তো কোনোদিন ওঁকে ধমক দিয়ে পর্যন্ত কথা বলে না।আজ পর্যন্ত কোনোদিন ওঁকে চোখ রাঙানি পর্যন্ত দেয় নি।ছেলেটাও বকা খাওয়ার মতো কোনো স্কোপ রাখে না।তাহলে কী এমন হলো যে, প্রত্যুষের ধমকে কাঁদতে বসেছে ছেলেটা।কষ্ট না পেলে তো এমন ভাবে কাঁদার কথা নয় ওর।

রওশা মায়াময় দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে ।প্রোজ্জ্বলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো

-"বাবা হয়তো কিছু নিয়ে আপসেট।তুমি কষ্ট পেয়ো না সোনা!তুমি তো জানো, বাবা তোমাকে কতটা ভালোবাসে।"

নাক টেনে মাথা নাড়লো প্রত্যুষ। রওশা চোখের জল মুছিয়ে দেয় ওর।গাল টেনে দিয়ে বললো

-"বাইরে গিয়ে রাহাত ভাইয়ার সাথে খেলো কেমন?বাবার মুড ঠিক হলে এমনিতেই নিয়ে আসবে তোমাকে।"

বাধ্যের মতো বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ালো প্রোজ্জ্বল। ছোট ছেট পা ফেলে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে।

রওশা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।মালিহা বেগম তাকেও প্রত্যুষকে ডাকার জন্য পাঠিয়েছেন।অথচ একটু আগেই এই একই কারণে প্রত্যুষের কাছে ধমক খেয়েছে প্রোজ্জ্বল। রওশা ধীর পায়ে বেলকনির দরজার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে চাইলো বেলকনিতে।

বেলকনির ডিভানের উপর গোমড়া মুখে বসে আছে প্রত্যুষ।বাইরে থেকে যতটা শান্তশিষ্ট ভেতরখানা ঠিক ততটাই ছটফটে, উত্তাল। রওশা খরগোশ পা ফেলে এগিয়ে যায় ভেতরে।ক্ষণকাল দেনামোনা করে ডাকে প্রত্যুষকে।প্রত্যুষ মাথা তুলে চাইলো ওর দিকে।রওশার বুক ধ্বক করে উঠে ওর ব্যাথিত চাউনি দেখে।বুকের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করে প্রত্যুষের এই দৃষ্টি।রওশা উত্তেজিত হয়ে শুধালো

-"প্রত্যুষ, কী হয়েছে আপনার? এই অবস্থা কেন?প্রোজ্জ্বল কেই বা কেন বকেছেন?"

প্রত্যুষ দু'হাতে হাটু জড়িয়ে গাঁট হয়ে বসে থাকে।উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না।রওশা শান্ত হতে পারলোনা।কৌতুহল কন্ঠে ফের প্রশ্ন করলো

-"প্রত্যুষ,কিছু বলবেন?"

-"কিছু হয়নি রওশা।ঠিক আছি আমি। আপনি যান এখান থেকে।"

ভাঙা কন্ঠ প্রত্যুষের।যেন বহু কষ্টে ভেতরের কান্নাগুলো গিলে নিচ্ছে। রওশা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে।প্রত্যুষের অবস্থা সমীচীন না।মুখে মলিনতার ছাপ।অনুভূতিহীন দৃষ্টি যেন কোনো কিছু নিয়ে খুব বেশিই কষ্টরা বাসা বেঁধেছে মনের মধ্যে।প্রত্যুষ অক্লিষ্ট ঢোক গিললো।শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে বললো

-"জানেন রওশা,এই দুনিয়ায় আমরা রিপ্লেস জিনিসটা কোনোমতে মেনে নিতে পারি না।আমাদের জায়গা অন্য কেও নিয়ে নিক,আমাদের ভালোবাসার মানুষগুলোর সাথে অন্য কেও হাসুক তা আমরা সহ্য করতে পারি না।এই জিনিসটা খুব কষ্টের,এই অনুভূতি টা খুব বিশ্রী তাই না?অথচ যার বদলে যাওয়া আমার সহ্য হচ্ছে না,যার আমার সামনেই অন্যের সাথে চলে যাওয়া আমার বুক এফোঁড়ওফোঁড় করে দিচ্ছে সেও কিন্তু এই একই মরণ যন্ত্রণা সহ্য করেছিলো।অথচ সে দীর্ঘ সময় এসব যন্ত্রণা সহ্য করেছে, আমি তার এক পার্সেন্টও সহ্য করতে পারছি না।আমি কতটা স্বার্থপর তাই না!"

রওশার বোকা বোকা চাউনি। যেন প্রত্যুষের একটা বাক্যেরও যথার্থ কারণটা বুঝতে পারেনি।প্রত্যুষ রওশার সামনে থেকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়,ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে যায় কক্ষ ছেড়ে। রওশা তাজ্জব বনে দাঁড়িয়ে থাকলো।কিছুই মাথায় ঢোকেনি ওর।কী বলে গেলো, কেনো বলে গেলো গেলো,কার জন্য বলে গেলো তার আদ্যোঃপান্তও বুঝতে পারেনি রওশা।

.

অতি ভদ্র হয়ে চেয়ারের উপর বসে আছে উচ্ছ্বাস।আপাতত তার অবস্থান খাবার টেবিলে।ডাইনিং রুমে বিশাল গোল টেবিল।তোড়জোড়ের শেষ নেই ওঁদের।কত পদের খাবার যে রান্না করেছে উচ্ছ্বাস গুণে শেষ করতে পারলো না,বিরক্তই লাগলো বটে।ক্ষণকাল পরপর একজন একজন সার্ভেন্ট কিচেন থেকে একটা একটা ডিশ নিয়ে আসছে।উচ্ছ্বাস যে পাশে বসেছে সে পাশে আছে মুগ্ধ। অপর পাশে তাজিম, ইয়াসির আহমেদ,প্রিয়ম আর পিয়াস ভূইয়া।শুধু প্রাণেশা আর মানারা বেগম খেতে বসেনি।ওরা দুজনে মিলে সার্ভ করছিলো সকলকে।উচ্ছ্বাস একবার খাচ্ছে আরেকবার চঞ্চল চোখে সবকিছু স্ক্যান করছে।উচ্ছ্বাসের আইঢাই দেখে বোল হাতে এগিয়ে এলো প্রাণেশা।কন্ঠ খাদে নামিয়ে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো

-"হেই! কোনো প্রবলেম?"

-"নাহ।লজ্জা লাগছে একচুয়ালি।" খেতে খেতে কোমল স্বরে বললো উচ্ছ্বাস।

-"ওয়াও! আপনার লজ্জাও আছে, জেনে খুশি হলাম।"

খাওয়ার মাঝেই মুখ বাকালো উচ্ছ্বাস।প্রাণেশা শ্বাস ফেলে হাসলো।কোমল স্বরে বললো

-"চিকেন নিবেন?"

-"নাহ।"

-"মিট!"

-"নাহ।"

-"ফিশ!"

-"নাহ!"

-"বিফ!"

-"নাহ, বিফে এলার্জি।"

-"কিছুই তো খাচ্ছেন না!"

বলতে বলতেই প্রাণেশা গাটা মা*রলো ওর মাথায়।উচ্ছ্বাস চোখমুখ কুঁচকে তাকালো ওর দিকে।প্লেট ভর্তি তরকারি।একের পর এক ডিশ প্লেটে তুলে দেওয়া হচ্ছে। যে তরকারি আগে শেষ হয়ে যাচ্ছে সে তরকারি আবার রিপিট করে দেওয়া হচ্ছে প্লেটে।যার দরুন খাবার নড়ছে না একটুও।শেষ হওয়ার আগেই প্রাণেশা নয়তো মানারা বেগম বেড়ে দিচ্ছেন। তবুও মেয়েটা বলছে, কিছু খাচ্ছে না ও।

প্রাণেশা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো ওর দিকে। বললো

-"বেড়াতে আসলে খেতে হয়।কিন্তু আপনি তো মেয়েদের মতো ঢং করতে করতেই সব টাইম ওয়েস্ট করে ফেলছেন।ড্রামা কিং!"

উচ্ছ্বাস কথার প্রেক্ষিতে বাশ মে*রে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সামনে তাকিয়ে থেমে যায়।ভদ্র ছেলের মতো মাথা নুইয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দেয়।প্রাণেশা উচ্ছ্বাসের দেখাদেখি সামনে তাকালো। প্রিয়ম সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওঁদের দিকে।প্রাণেশার সাথে চোখাচোখি হতেই প্রাণেশা ভ্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করলো 'কী!' প্রিয়ম হাত দিয়ে গলা কাটার ভঙ্গি করে দেখালো।প্রাণেশা কপাল কুঁচকে তাকালো।প্রিয়মের ইশারা বুঝতে না পেরে জিহ্বা দেখালো প্রাণেশা ওঁকে।

খাওয়া শেষ সবার।ড্রইংরুমের সোফার উপর বসে আছে সকলে।কিন্তু খাওয়া শেষ বললেও ভুল হবে।কারণ ওদিকের খাবারের পাঠ চুকলেও এখনো ফ্রুটস আর কোল্ড ড্রিংক সার্ভ করা হচ্ছে সবাইকে।উচ্ছ্বাস কে সাধাসাধি করা হলে বারংবার মানা করছে ও।লিমিটের চেয়ে বেশি খাওয়া হয়ে গেছে।পেটে লোড হয়ে গেছে যার ফলে নড়তেও কষ্ট হচ্ছে। শেষেরদিকে অনেক কষ্টে খাবার গিলেছে ও।এখন আবার এসব খেতে বলছে।কিন্তু এসব খেতে গিয়ে ওর পেট ফেটে না যায়,এটা নিয়েই চিন্তিত ও।

প্রাণেশা ফের কোল্ড ড্রিংক সাধলো ওঁকে। উচ্ছ্বাস উদগ্রীব স্বরে বললো

-" আর খেতে পারবো না প্রাণেশা।প্লিজ জোর করো না।এমনিতেই ওভার লোড হয়ে গেছে।"

-"এটা খান।এটা খেলে হজম হয়ে যাবে।"

-"গিলতে কষ্ট হবে।" মুখ ছোট করে বললো উচ্ছ্বাস। প্রাণেশা ঠোঁট টিপে হেসে বললো

-"আমার জন্য না হয় কষ্ট করেই গিলুন।"

উচ্ছ্বাস কাঁদো কাঁদো ফেসে হাত বাড়িয়ে নিলো।ব্যকুল স্বরে বললো

-"মানে এমন একটা অবস্থা তোমার, আজকে খাইয়েই মে*রে ফেলবো।চেয়ে দাওয়াত নিলি কেন!"

ফিক করে হাসলো প্রাণেশা।উজ্জ্বলাদীপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো

-"এই তো কাহিনী ধরতে পেরেছেন।"

উচ্ছ্বাস হাসলো ওর কথায়।প্রাণেশার দিকে তাকিয়েই বাচ্চাদের মতো গ্লাসের কোল্ড ড্রিংক শেষ করলো।

সোফায় বসে গল্প করছে সকলে। মানারা বেগম কথার ঝুড়ি নিয়ে বসেছেন ভাইয়ের কাছে।অনেকদিন পর বোনের বাড়িতে এসেছেন তিনি।আগে ঘনঘন আসলেও এখন কাজের চাপে আসতে পারেন না।এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তো একটু জিরোবার জো নেই।

কথা বলতে বলতেই মানারা বেগমের চোখ পড়লো উচ্ছ্বাসের দিকে।শক্ত হয়ে বসে আছে ছেলেটা।কিন্তু মানারা বেগম বুঝতে পারছেন সমানে উশখুশ করছে ও। হয়তো আনকম্ফোর্টেবল ফিল করছে এখানে।মানারা বেগম চেনেন না ওঁকে, দেখেননি কোনোদিন।হঠাৎ প্রাণেশা দুপুরে সাথে করে নিয়ে আসলো।সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো, ছেলেটা ওর বন্ধু। মানারা বেগম ছাড়া সকলেই চেনে ওঁকে এমনকি পিয়াস ভূইয়া পর্যন্ত।মানারা বেগম ওঁকে সহজ করতে মোলায়েম স্বরে বললেন

-"তোমার নামটা যেন কী বললে?"

মানারা বেগমের কন্ঠে ভাবনার সুতো কাটলো ওর।আচমকা ডাকে হকচকিয়ে তাকালো উচ্ছ্বাস। মানারা বেগমের মিষ্টি হাসি দেখে চোখ পিটপিট করে বললো

-"উচ্ছ্বাস শাহরিয়ার।"

মানারা বেগম ঠোঁটে নামটা রিপিট করলেন একবার।আবার বললেন

-"আমি ছাড়া দেখি সবাই চেনে তোমাকে!কী করো তুমি বাবা?"

উচ্ছ্বাসের উত্তর দিতে হলো না।ইয়াসির আহমেদ নিজেই বললেন

-"ও সিআইডি অফিসার। গ্রামে এসেছে দেড় মাস হবে।কয়েকদিন ধরে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছিলো না, সেসব কেস সল্ভ করতেই এসেছিলো গ্রামে।"

-"বাহ!স্বাগতম তোমাকে গ্রামে।আমাদের গ্রাম টা কিন্তু অনেক সুন্দর।" হাসিহাসি মুখে বললেন মানারা বেগম।

উচ্ছ্বাস মাথা নুইয়ে হাসলো। নম্র কন্ঠে বললো

-"থ্যাঙ্কস আন্টি।ঘুরেছি আমি গ্রামের অনেক জায়গায়।মুগ্ধ আর তাজিম হেল্প করেছে আমাকে।"

-"তোমার কী সবার সাথে পার্লামেন্টে দেখা হয়েছে?ওখান থেকেই বন্ধুত্ব?"

-"হুম।"

উপর-নিচ মাথা নাড়লেন মানারা বেগম।ইয়াসির আহমেদ উচ্ছ্বাসের পাশেই বসে ছিলেন।ওর পিঠে হাত রেখে মানারা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন

-"অনেক ভালো একটা ছেলে উচ্ছ্বাস। ওদের টিম আসার পর থেকেই গ্রামের এসব কাহিনী অনেকটা কমেছে।এতো বড় প্রফেশনের সাথে যুক্ত থেকেও ছেলেটার কোনো অহংকার নেই।সবার সাথেই সুন্দর করে মিশে যায়।"

বলতে বলতে ইয়াসির আহমেদ আরো অনেক প্রশংসাই করলেন ওর।

এহেন প্রশংসায় উচ্ছ্বাসের ঠোঁট দুটো ফাঁকা হয়ে যায়।

নিজের প্রশংসা নিজের কাছেই বড় হাস্যকর মনে হলো।সাথে অস্বস্তি পাল্লা দিয়ে বাড়লো। এমনিতেই অচেনা জায়গায় কম্ফোর্ট হতে পারে না ও।তারউপর এসব অযাচিত প্রশংসা।

চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো প্রাণেশা উপহাস করে হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। ওর হাসি গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিলো উচ্ছ্বাসের।মুখ ফুটে ইয়াসির আহমেদকে এসব বলতে মানা করবেন তার আগেই মানারা বেগম হাসি মুখে বললেন

-"আসলেই তো অনেক ভালো ছেলে। এই বয়সেই এতো কিছু আসলে অনেকটা টাফ! কিন্তু তুমি করে দেখিয়েছো।এতোগুলো মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছো, ধন্যবাদ তোমাকে।"

উচ্ছ্বাসের মনটা ভালো হয়ে গেলো।মানারা বেগমের কথাগুলো বড়ই সুন্দর ঠেকলো তার কাছে।কিছু মানুষের মধ্যে মা মা একটা ফিলিংস থাকে।মানারা বেগমকে দেখে উচ্ছ্বাসের মনে হলো এই মানুষটা তেমনি।উচ্ছ্বাস মানা করলো না আর ইয়াসির আহমেদ কে।বলুক না যা বলার। যার মন চাই সে হাসুক।কিন্তু এই যে এতো সুন্দর একটা পারিবারিক পরিবেশ তা তো পায়নি উচ্ছ্বাস কোনোদিন।সবার এতো অমায়িক ব্যবহার,আপ্যায়ন যতক্ষণ আছে এই বাড়িতে ততক্ষণ নাহয় উপভোগ করুক।

মানারা বেগম হঠাৎই কৌতুহল হয়ে সুধালেন

-"আচ্ছা তুমি কী একা এসেছো এখানে?নাকি তোমার মা-বাবাও এসেছে তোমার সাথে?"

উচ্ছ্বাসের মুখের হাসি ধপ করে নিভে যায়।উজ্জ্বলাদীপ্ত মুখ ঢেকে যায় একরাশ কালো মেঘে। চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে তাকায় সবার দিকে।সবাই কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। উচ্ছ্বাস ঢোক গিললো।ভারাক্রান্ত কন্ঠে দুঃখ নিয়ে বললো

-"আমার মা-বাবা নেই আন্টি।ইভেন কেউই নেই আমার।আমি অনাথ। অনাথ আশ্রমেই বড় হয়েছি।"

মানারা বেগম আহত দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে।কন্ঠে মনস্তাপ ঢেলে বললেন

-"সরি, বাচ্চা।আমি বুঝতে পারিনি।"

-"ইট’স ওকে আন্টি।ওঁদের কথা উঠলে কষ্ট লাগে না আমার।কারণ ওদেরকে কোনোদিন দেখিনি আমি।জানিও না আমার মা-বাবা কে! ছোটোবেলা থেকেই অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি।জেনেছি আমার কেও নেই,আমি কারও না!"

ভাঙা গলায় বলে,বিষাদ হাসলো উচ্ছ্বাস। সে বললো এসব কথায় কষ্ট পায় না,অথচ মানারা বেগম স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন ছেলেটার চোখে জল টলটল করছে।থৈথৈ পানি যেকোনো সময় গড়িয়ে পড়ার অবস্থা।কিন্তু উচ্ছ্বাস সে জল গড়ানোর অনুমতি দিচ্ছে না।

অপরাধবোধে মানারা বেগমের বুকটা ভরে উঠে।মুখ ফুটে ফের কিছু বলতে যাবে তার আগেই প্রাণেশা বললো

-"আম্মু বাদ দাও না এই টপিক।সবার ছোটোবেলা সুখকর হয় না।আমাদের উচিত না কারো অতীত টেনে তাকে কষ্ট দেওয়া।"

মানারা বেগম মুখ কালো করে মাথা নাড়লেন।পরক্ষণেই উচ্ছ্বাসের দিকে তাকিয়ে সুক্ষ স্বরে বললো

-"তুমি নিজেকে একা ভেবো না বাবা।তোমার যখনই মন খারাপ হবে এখানে চলে এসো কেমন!আমরা দু'জন গল্প করবো।"

উচ্ছ্বাস ঠোঁট বিস্তৃত করে হাসলো।কৃতজ্ঞ হয়ে বললো

-"অবশ্যই আন্টি। কেন নয়?আপনার সাথে কথা বললে মনে হবে আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলছি, যদিও আমি কোনোদিন দেখিনি তাকে।"

মানারা বেগম আস্বস্ত করলেন ওঁকে।প্রায় অনেকটা সময় ধরেই চলমান রইলো সবার গল্প।দুপুর থেকে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করলো।সন্ধ্যার চা-নাস্তাও এখানে করলো সবাই।বাইরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসলে বসা থেকে উঠে দাড়ালো উচ্ছ্বাস। হড়বড়িয়ে বললো

-"আমাকে যেতে হবে।লেইট হয়ে যাচ্ছে।"

ইয়াসির আহমেদও বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন

-"আমারও যাওয়া উচিত। কাজ আছে।চলো একসাথে যায়।"

উচ্ছ্বাস সোফার উপর বসা মুগ্ধ আর তাজিমের দিকে তাকালো।দু'জনকেই উদ্দেশ্য করে বললো

-"তোমরা যাবে না?"

-"না,আমরা রাতের খাবার খেয়ে তারপর যাবো।বন্ধুর বাসায় এসেছি রাতের খাবার না খেয়ে গেলে হয়!"

দাঁত কেলিয়ে বললো তাজিম।উচ্ছ্বাস হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো।পরপর বেরিয়ে গেলিয়ে বাড়ি থেকে। সবাই বের হলো ওদেরকে এগিয়ে দিতে।ইয়াসির আহমেদ গাড়িতে উঠে চলে গেলেন।প্রাণেশা গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো উচ্ছ্বাস কে।নম্র স্বরে বললো

-"আবার আসবেন।"

-"হুম।তুমি না বললেও আসবো।তোমার আম্মুর সাথে কিন্তু অনেক ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে আমার।না বলেই চলে আসবো।"

প্রাণেশা মুচকি হেঁসে মাথা নাড়লো।সেকেন্ডেই গাড়ি ছেড়ে দিলো উচ্ছ্বাস। মুহুর্তের মধ্যেই প্রাণেশার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলো ওর গাড়ি।প্রাণেশা ধীর পা ফেলে আবার বাড়িরিকে এগিয়ে যায়।

বেলকনি থেকে এ টু ঝেড সবকিছুই দেখলো রওশা।রহস্যময় হাসলো সে।তাচ্ছিল্য করে বললো

-"বাহ! এই জন্যই বুঝি প্রত্যুষের হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে মন চাইছিলো।ধন্য প্রত্যুষের ভালোবাসার প্রাণেশা! শখের নারী অন্য পুরুষে মজেছে,সেটাই সইতে পারছে না তাহলে।অথচ সে কতটাই না গর্ব করে বলতো তার ভালোবাসা এখনো তার কাছেই আঁটকে আছে।একেবারে তার মতো।"

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন