পরিণীতা
পর্ব:৩৩
তানজিনা ইসলাম
রাস্তার ধার ঘেষে হাঁটছে প্রাণেশা।সন্ধ্যা নামছে প্রকৃতিতে।
আধারের চাদরে মুড়িয়ে নিচ্ছে চারপাশ।পার্লামেন্ট থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো ওর।আজ গাড়ি আনেনি ও।ইদানীং গাড়িতে চড়তে মন চাইনা।মন চাই ছোট ছোট কদম ফেলে হেঁটে বেড়াতে।আশেপাশের সবকিছু চক্ষু জুড়িয়ে দেখতে।শীত ঋতু টা বরাবরের মতোই পছন্দ প্রাণেশার।শীতের সময়ে প্রকৃতি যে নতুন রূপে নতুন আমেজে সেজে উঠে তাতে চোখ জুড়িয়ে যায় ওর।কুয়াশার চাদর মাড়িয়ে হাঁটতে ভালো লাগে।মাঝে মাঝে খালি পায়ে সিক্ত ঘাসের উপর হাঁটতে মন চাই।
সামনেই টঙের দোকানে দু'জন কপোত-কপোতী বসে আছে।শাড়ি পড়া রমণী নিজের হাতে থাকা চায়ের কাপে একচুমুক দিয়ে এগিয়ে দিচ্ছে পাশের জনকে। সেও একদৃষ্টিতে তার প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে চুমুক দিচ্ছে। এভাবেই চলছে তাদের চা পান।দু'জনে একটা জেকেটেই আবৃত করেছে নিজেদেরকে।চা খাওয়ার সময় নারীটির খুলে রাখা চুলগুলো মুখের উপর এসে পরছে।আর তার প্রেমিক পুরুষ প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে, ঝুঁকে কানের পিছনে চুল গুঁজে দিচ্ছে।মুখে কোনো কথা নেই দুজনের। অথচ দৃষ্টি দিয়েই যেনো জগৎ এর সব কথা বলে ফেলছে।মুচকি হাসলো প্রাণেশা।মানুষের ভালোবাসা দেখতেও ভালো লাগে।অনেকটা সময় ওঁদের দিকে তাকিয়ে থাকলো প্রানেশা। পরক্ষণেই বুক ফুঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো ওর।এসব দেখলে বুকের মধ্যে আনচান করে ওর,কষ্ট হয়।কত মানুষের কত ভালোবাসা দেখলো ও।অথচ শুধু দেখেই গেলো এটা জেনেও, এসব কপালে নেই ওর।এসব কোনোদিন ঘটবে না ওর সাথে।কেও ওঁকে এভাবে ভালোবাসবে না।কারো হাত ধরে, এভাবে কাঁধে মাথা রেখে প্রেম নিবেদন করা হবে না ওর। একজন স্বার্থপর পুরুষ ওর সব ইচ্ছা ঘুচিয়ে দিয়েছে।ওর সব আকাঙ্খা, ভালোবাসাকে নিজ হাতে খুন করেছে। প্রাণেশার কোনো অভিযোগ নেই তার প্রতি।সে ভালো থাকুক,সংসার করুক।তার সুখের সংসার হোক।কিন্তু এই জনমে প্রাণেশার সংসার করাটা বোধহয় হলো না আর।সে নাহয় তার একজনম ঐ মানুষটার অপেক্ষায় কাটিয়ে দিলো।মানুষটার জায়গায় যে অন্য কাওকে বিয়ে করার কথা,ভালোবাসার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেণা প্রানেশা।পারবেও না কোনোদিন।
প্রাণেশা জানে সে ফিরবে না,ফেরার কোনো রাস্তা অবশিষ্ট নেই।প্রাণেশা চাইও না সে ফিরুক,কারো সংসার ভাঙার কারণ হতে চায় না প্রাণেশা।কিন্তু প্রাণেশা তো সে মানুষটার জায়গাটা অন্য কাওকে দিতে পারলো না!কিন্তু কেন দিতো পারলে না?সে মানুষটা তো দিব্যি অন্যের সাথে সংসার করছে।তার একটা ভরা সংসার আছে,বউ আছে,বাচ্চা আছে।
প্রাণেশার তো কিছু নেই।কেন নেই? নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তরও পেলো প্রাণেশা।কারণ ও বেইমান না।এই দুনিয়ায় বেইমানরাই ভালো থাকে,সুখে থাকে।কিন্তু যারা সত্যিকারের ভালোবাসে তাঁদেরকে প্রাণেশার মতোই প্রতিনিয়ম ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়।তবুও তারা এটুকু গর্ব করে বলতে পারে 'তারা বেইমান না।তারা সত্যিকারের ভালোবেসে ঠকেছে।'
গাড়ির হর্ণে ভাবনার ছেদ ঘটলো প্রাণেশার।পাশে তাকাতেই দেখলো উচ্ছ্বাস ড্রাইভিং সিটে বসে ওর দিকে তাকিয়ে কন্টিনিউয়াসলি হর্ণ বাজিয়ে যাচ্ছে। প্রাণেশা ভ্র কুঁচকে তাকালো ওর দিকে।ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো গাড়ির কাছে।ও যেতেই উচ্ছ্বাস প্রখর স্বরে বললো
-"কতক্ষণ ধরে ডাকছিলাম তোমাকে।"
-"শুনতে পাইনি।"
-"কই যাও?"
-"বাড়িতে ফিরছি।"
-"হেঁটে যাচ্ছো যে?"
-"এমনিই।"
-"গাড়িতে উঠো।পৌছে দিচ্ছি।"
দু'পাশে মাথা নাড়লো প্রাণেশা। নাকোচ করে বললো
-"আজকে হেঁটে যায়।গাড়িতে চড়তে ভালো লাগছে না।"
-"ঠান্ডা পড়ছে তো অনেক।তোমার গায়ে তো সোয়েটারও নেই। ঠান্ডা লেগে যাবে তো।"
-"সমস্যা নেই।আরেকটু রাস্তায় তো।আপনি যান,আমি একা চলে যেতে পারবো।"
-"না,গাড়িতে উঠো তুমি।একদিন অন্তত কথা শুনো।"
ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো প্রাণেশা।ধীর পায়ে গিয়ে বসলো উচ্ছ্বাসের পাশের সিটে।গাড়ি চালানোই মনোযোগ দিলো উচ্ছ্বাস। পরক্ষণেই পাশ ফিরে প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে বললো
-"হেই তোমার ঠান্ডা লাগছে না? আমার কাছে একটা এক্সট্রা জ্যাকেট আছে পরবা?"
-"নাহ।আমার তেমন ঠান্ডা লাগছে না।বাড়িতে গিয়ে কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে থাকবো।"
-"আচ্ছা।"
ব্যাস আর কোনো কথা হলো না দু'জনের মধ্যে। পিচঢালা রাস্তায় কুয়াশার আবরণ ছেদ করে এগিয়ে গেলো উচ্ছ্বাসের গাড়ি।
.
বেলকনিতে তোয়ালে মেলতে এসেছিলো প্রত্যুষ।একটু আগেই হসপিটাল থেকে ফিরেছে ও।সন্ধ্যায় এই শীতের ঠান্ডার মধ্যেই গোসল করতে হয়েছে ওঁকে।বাইরে থেকে এসে একটা লম্বা হট শাওয়ার না নিলে খাটাশ খাটাশ মনে হয় নিজেকে।
আজকাল এতো কাজের চাপ যাচ্ছে ওর উপর,মাঝেমধ্যে ওভার টাইম ডিউটি করতে হয়!পুরো রাত পেশেন্টদের ফাইল ঘাটাঘাটি করার পর সকালে আবার হসপিটালের উদ্দেশ্যে দৌড় দাও।দুদন্ড জিরোবার ফুসরত নেই।বড্ড বেশি খাটুনি যাচ্ছে কয়দিন ধরে।অথচ প্রত্যুষের মন চাই এই কনকনে ঠান্ডায় রুমে হিটার ছেড়ে নরম তোষকের নিচে প্রোজ্জ্বল কে বুকে নিয়ে বিছানার সাথে মিশে থাকতে।মন চাই সব কাজ-কর্ম, মানবধর্ম ছেড়ে দিয়ে গোটা একদিন ঘুমিয়ে কাটাতে।তবে ব্যস্ততার একটা ভালো দিকও আছে ওর মতে।ব্যস্ততার কারণে রওশার সাথে আজকাল খুব কমই দেখা হয় ওর।রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে ও তখন রওশা কক্ষে আসে না।আবার সকালে রওশা ঘুম থাকা অবস্থায়ই হসপিটালে চলে যায় ও।প্রোজ্জ্বলের সাথেও খুব কম দেখা হয় ওর। সে এখন দাদা-দাদির পছন্দের ভীষণ। মানারা বেগম তো ওঁকে নিজের থেকে ছাড়েই না।সারাক্ষণ ওঁদের কক্ষেই থাকে প্রোজ্জ্বল, রাহাতের সাথে।
তবে একটা প্লাস পয়েন্ট হলো রওশা এখন প্রায়শই কথা বলে না প্রত্যুষের সাথে।কেমন যেনো ইগনোর করে ওঁকে।
এটা অবশ্য ওর জন্য ভালোই,অন্তত রওশার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে হয় না ওঁকে। এখন রওশা কিছু বলার আগে প্রাণেশার বদনাম দিয়েই কথার সূচনা করে। যা খুবই অসহ্য লাগে প্রত্যুষের।
আগে অবশ্য এমন করতো না প্রত্যুষের পেছনেই ছোটাছুটি করতো ও, কী লাগবে,কোন জিনিসটা প্রয়োজন সারাক্ষণ জিজ্ঞেস করতো। আবার চুপচাপ মেয়েটাকে দেখে খারাপও লাগে প্রত্যুষের।মেয়েটা কেমন যেন গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে।সারাক্ষণ একা একা থাকে।পরিবারের মানুষগুলোও তো তেমন একটা মিশেনা ওর সাথে।রিধিতা তো টোটালি কথায় বলে না,মানারা বেগম যেই একটু বলেন।ওর কাছেও তো কম অপরাধী না প্রত্যুষ।মেয়েটা তো এমন লাইফ ডিজার্ভ করে না।একটু ভালোবাসা প্রাপ্য ওর।কিন্তু প্রত্যুষ আর প্রত্যুষের পরিবার তা দিতে ব্যর্থ।
মেয়েটাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিচ্ছে প্রত্যুষ।কিন্তু ওরই বা কী করার! ছেড়ে যেতে বললেও তো ছেড়ে যায় না মেয়েটা।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো প্রত্যুষ।বেলকনির রেলিঙের সাথে হাত ঠেস দিয়ে দাড়ালো।গাড়ির গড়গড় শব্দে নিচে তাকালো ও।প্রাণেশা নামছে গাড়ি থেকে।প্রত্যুষ উঁকিঝুঁকি মেরে দেখলো।প্রাণেশা নামার পরপরই গাড়ির ডোর খুলে আরেকজন বের হলো।প্রত্যুষের ভ্রু কুঁচকে আসে উচ্ছ্বাস কে দেখে।প্রায়ই সময় এভাবে প্রাণেশা কে ড্রপ করে দেওয়ার কারণটা বুঝতে পারে না ও।এইবার সহ নয়বার প্রাণেশাকে নামিয়ে দিয়ে গেলো ও।প্রত্যুষ গুণে রেখেছে,খাতা কলমে হিসাবও করে রেখেছে।অথচ প্রাণেশা নিজেদের গাড়িতেই আসতে পারে, কিন্তু না উচ্ছ্বাস ই বেশিরভাগ সময় নামিয়ে দিয়ে যায় ওঁকে। প্রাণেশা মুচকি হেঁসে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো ওঁকে। এই প্রথম,প্রথমবার প্রাণেশার হাসি বিষাদ ঠেকলো ওর কাছে।পারলে ও এই তিনতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নেমে ওঁদের এই সুন্দর মুহুর্তে ব্যাগড়া দিয়ে আসে।
প্রাণেশা চলে গেছে গেটের ভেতরে। উচ্ছ্বাসও গাড়ি চালিয়ে নিজের গন্তব্যে রওনা দিয়েছে।তবুও প্রত্যুষ এক দৃষ্টে চেয়ে থাকলো সেই জায়গাটায় যেখানে ওরা নেমেছে।হাসিহাসি করে বিদায় দিয়েছে দু'জন দু'জনকে।প্রত্যুষের চোখ জ্বলছে।এভাবে এই বিশ্রী দৃশ্য টা দেখা সম্ভব না ওর পক্ষে। বাহ! এতো সুপ্রসন্ন কপাল ওর।যতবারই ও ব্যালকনিতে আসে ততবারই এই দৃশ্য না চাইতেও চোখে পরে যায়।প্রত্যুষ ভেবে নিলো আর এই ব্যালকনিতে আসবে না ও,আসলেও কালো পট্টি বেঁধে আসবে যাতে আশেপাশের কিছু চোখে না পরে।
-"কান্না পাচ্ছে প্রত্যুষ?"
রওশার কন্ঠ কানে আসতেই চমকে তাকালো প্রত্যুষ।পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখলো রওশা বাঁকা হেসে তাকিয়ে আছে নিচের দিকে।শার্টের হাতা দিয়ে চটজলদি মুখ মুছলো ও।নিজেকে সামলে নিষ্প্রভ কন্ঠে বললো
-"আপনি কখন এলেন?"
-"যখন আপনি দুঃখে বিভোর ছিলেন।"
-"আমার কোনো দুঃখ নেই রওশা।আমার মতো সুখী এই দুনিয়ায় আর কেউ নেই।"
-"অথচ আপনার চোখমুখ অন্য কিছু বলছে।এতটা ছিচকাদুনে কেন আপনি?"
উত্তর দিলো না প্রত্যুষ। ধারালো দৃষ্টিতে তাকালো রওশা। প্রত্যুষের দুঃখী দুঃখী মুখ।যেনো দুনিয়ার সমস্ত বিষাদ এই মুহূর্তে ওর মাঝে ঢেলে দেওয়া হয়েছে।রওশা তীক্ষ্ণ স্বরে বললো
-"প্রাণেশার জন্য..
আর বলতে পারলো না রওশা।থামিয়ে দিলো প্রত্যুষ। প্রখর স্বরে বললো
-"আল্লাহর ওয়াস্তে রওশা! প্রাণেশার নাম আপনি নিজের মুখে নিবেন না।ওঁকে নিয়ে আর একটা খারাপ কথাও আপনার মুখে বরদাস্ত করবো না আমি।"
রওশা আক্রোশে চাইলো।প্রাণেশাকে নিয়ে এহেন কমপ্লিমেন্ট সহ্য হলো না ওর।মেয়েটার নামও এখন অসহ্য লাগে ওর কাছে।রওশা ক্ষিপ্ত হয়ে বললো
-"দরদ উতলে উঠছে দেখি।না,সবসময়ই তো উতলে পরে এটা আলাদা কী! কিন্তু যার জন্য আমার সাথে এতো লড়ছেন, আপনার আদরের প্রাণেশা মনে রেখেছে তো আপনাকে?আমিতো দেখলাম সে আপনার অস্তিত্ব মন থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে নতুন প্রেমিক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ভর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছে।"
-"সেটা আপনার জানার বিষয় নয়।এটা ওর জীবন, ও যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে লিড করবে।আর ও আমাকে মনে রাখেনি বলছেন,তাহলে এতো কষ্ট কার জন্য পেলো ও।শুধুতো নিজেই কষ্ট পেলো না নিজের পরিবারকেও কষ্ট দিলো।এবার অন্তত ভালো থাকুক ও।যার সাথেই থাকুক ভালো থাকুক।আমিতো দিব্যি বিয়ে করে বসে আছি।আর কতো একা থাকবে মেয়েটা,আর কত কষ্ট পাবে!"
শক্ত গলায় বললো প্রত্যুষ। ক্রমাগত ফুঁসছে প্রত্যুষ।রাগ সংবরণের চেষ্টা করছে নিজের।কিন্তু সে ধৈর্য হয়তো সহ্য হলো না রওশার।আগুনে ঘি ঢেলে সে ফের বললো
-"আরেকজনের সংসারে আগুণ ধরিয়ে সে আরেকটা লা*ঙ (প্রেমিককে চট্টগ্রামের ভাষায় লা*ঙ বলে) নিয়ে ঘুরে বেড়াবে সেটাতো মানতে পারছি না।এতো সতীসাবিত্রী হলে নিশ্চয়ই পরপুরুষ নিয়ে ভর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতো না।আর না বাড়িতে দাওয়াত করে নিয়ে আসতো।দেখিতো,একটা মেয়ে বন্ধু নেই ওর।তিন তিনটা ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ায়,কী মনে করেন কিছু দেখি না!আমাদের দেশে রাজনীতির প্রাঙ্গন কেমন সেটা ভালোভাবেই জানা আছে আমার।সৃষ্টিকর্তা জানে কী কী করে বেড়ায় এগুলার সাথে!আপনার প্রাণেশার চরিত্র তো একেবারে সোনা দিয়ে মোড়ানো।"
রওশার কন্ঠে বিদ্রুপ,উপহাস।প্রাণেশাকে নিয়ে এলোমেলো,নেতিবাচক চিন্তাভাবনা।
প্রত্যুষের মেজাজ তুঙ্গে উঠলো সহসা।পুরো দেহ আগুণের ন্যায় জ্বলে উঠলো।আগুণসম দৃষ্টিতে তাকিয়ে, বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বেলকনির দেওয়ালের সাথে ঠাস করে মেশালো।রওশা চিৎকার দেওয়ার, বা নিজের ব্যাথাটুকু প্রকাশ করার সময় বা সুযোগ কোনোটাই পেলো না।অথচ ওর মনে হচ্ছে ওর পিঠের হাড় ভেঙে গেছে এতটাই জোড়ে দেওয়ালের সাথে মিশিয়েছে প্রত্যুষ।এতেই ক্ষান্ত হলো না ও।রওশার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে আক্রোশে চেঁচিয়ে বললো
-" খবরদার রওশা!আমার প্রাণ কে নিয়ে আরেকটা বাজে কথা বলবেন না আপনি।আমার প্রাণ পবিত্র। ওর পবিত্রতা মাপার মতো যোগ্যতা বা মানসিকতা একটাও হয়নি আপনার।আপনি কাকে নিয়ে কী বলছেন রওশা! যার সবকিছুই কেড়ে নিয়েছেন আপনি তার কথা।আপনার লজ্জা করছে না এসব বলতে?একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের ব্যাপারে এতো নিম্ন ধারণা আপনার! অথচ আপনি কতবার আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করেছেন সেটা বলুন।এখন হয়তো বলবেন আপনার স্বামী তাই!তবুও এটা জানার পরও আপনার প্রতি আমার কোনো ফিলিংস নেই ,তবুও আপনি আমাকে কতভাবে ফাসানোর ট্রাই করেছেন।আপনি আগে নিজের দিকে তাকান রওশা।প্রাণেশার ছোটোবেলা থেকে ঐ দু'জন বন্ধুই ছিলো।একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ককে এতোটা নিচে নামাতে বাধলো না আপনার।অথচ শুরু থেকে কিন্তু থার্ড পার্সন আপনিই ছিলেন।"
রওশা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো।কপোল বেয়ে গড়ালো অশ্রু।প্রত্যুষের দৃষ্টিতে আগুণ ঝরছে, যেন চোখ দিয়েই ঝলসে দিবে ওকে।ক্রমাগত ফুঁসছে, ঠোঁট দু'টো তিরতির করে কাপছে প্রত্যুষের।যেনো আরো কঠোর কিছু কথা শুনাতে চাইছে।প্রত্যুষ নিজের হাতের চাপ বৃদ্ধি করলো।রওশার মনে হলো ওর চোয়াল হয়তো এক্ষুণি মড়মড় করে ভেঙে যাবে।দু'হাত দিয়ে প্রত্যুষের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো ও।তবে বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হলো না ওর। প্রত্যুষ নিজেই ছেড়ে দিলো।গটগট পা ফেলে বেরিয়ে গেলো বেলকনি থেকে।
শরীরের ব্যালেন্স রাখতে না পেরে নিচে বসে পরলো রওশা।
চোয়ালের টনটনে ব্যাথা পুরো মুখে ছড়িয়েছে।মনে হচ্ছে প্রত্যুষের শক্তপোক্ত পুরুষালি হাতে ওর চোয়াল ভেঙে গেছে।রওশা মুখে কাঁপা কাঁপা হাত বোলালো।পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে ওর।প্রত্যুষ ওর সাথে এমন করেছে! প্রত্যুষ!এ যেন কোনোমতেই মেনে নিতে পারলো না রওশা।ছেলেটা ওঁকে ভালো না বাসুক কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনোদিন ওর সাথে উঁচু গলায় কথা বলেনি।একটু অসম্মান করেনি ওঁকে, এই দুনিয়ায় হয়তো প্রত্যুষই সবচেয়ে বেশি সম্মান করেছিলো ওঁকে, মর্যাদা দিয়েছিলো।রওশা এখনও অবাকের রেশ কাটাতে পারছে না।প্রাণেশা ওর জন্য এতটা দামী! এতটা। রওশার কান্না পেলো।কান্না আটকাতে না পেরে ঝরঝর করে কেঁদেও দিলো।
শরীরের ব্যাথার চেয়েও মনের ব্যাথা বেশি।অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে বুকের ভিতর।শেষ সময়ে এসে এটাই বুঝি প্রাপ্য ছিলো ওর!
রাত কয়টা বাজে তা অনুমান করা যায় না।কুয়াশা ঘেরা পরিবেশ আর অমাবশ্যার কালো আধারে বোঝার জো নেই রাতের কতটুকু সময় কেটেছে। রওশা থম মেরে বসে আছে মেঝেতে।তীব্র শীতে জমে যাওয়ার মতো অবস্থা ওর। গায়ে উষ্ণ কাপড় নেই।ফিনফিনে পাতলা শাড়ি পরণে।অথচ ও অনুভূতিহীন, নির্বাক।কাঁদতে কাঁদতে অশ্রু শুকিয়ে গালের মধ্যে দাগ বসে গেছে।চোখ ফুলে গেছে।
রওশা আশেপাশে তাকালো।ঝিঁঝিপোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। কেমন যেন একটা ভুতুড়ে পরিবেশ।কিন্তু রওশার তো কোনো ভয় অনুভূত হচ্ছে না।ওর বুকে এক পাহাড় সম পীড়া।নিজের অবস্থান আরো একবার অনুভব করার যন্ত্রণা। সবার কাছে বোঝা হয়েই থাকলো ও।সবাই বারে বারে ওঁকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়,কেউ চায় না ওঁকে। কেও না।
রওশা হাতে ঠেস দিয়ে উঠে দাড়ালো।এলোমেলো পা ফেলে বেরিয়ে এলো বেলকনি থেকে।কক্ষে অন্ধকার বিরাজ করছে,রওশা এসে লাইট জ্বালালো।অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো চারপাশে।ধীর পায়ে এসে ধপ করে বসলো বিছানার উপর।যদৃচ্ছভাবে বিছানা হাতড়ে ফোন বের করলো।কারো নাম্বারে ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হয়।অপর পাশের মানুষ টাকে কথা বলতে না দিয়েই রওশা উদ্বিগ্ন স্বরে বললো
-"দেখা করতে পারবা আজ রাতে?"
ওপাশ থেকে কী বললো বোঝা গেলো না।রওশা ফের বললো
-"হ্যাঁ।এখনই দেখা করা প্রয়োজন। আমি অপেক্ষা করবো।আজ কে রাতে না এলে আর কোনোদিন আমাকে ফোন দেওয়ার দরকার নেই।"
চলবে