ফন্ট সাইজ:
থিম:
The Cursed Abode

৩য় পর্ব

লেখক: মিহি সুলতানা

পর্ব ০৩

গাড়িটা ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। আমির ইচ্ছে করেই একটু গতি বাড়াল—কেন জানি মনে হচ্ছিল, বেশি সময় ওই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক হয়নি। স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করে ধরে কয়েকেক সেকেন্ড সোজা সামনে তাকিয়ে রইল। তারপর অভ্যাসবশত রিয়ারভিউ মিররে চোখ গেল।

খালি রাস্তা।

গেটের সামনে কেউ নেই।

হলদেটে লাইট জ্বলছে, গেট বন্ধ। “মায়া ভিলা” নামফলকটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটার কোনো চিহ্ন নেই। না গেট খোলার শব্দ শুনেছে, না ভেতরে ঢোকার আওয়াজ। সে কি এত তাড়াতাড়ি অদৃশ্য হয়ে গেল?

আমির কপাল কুঁচকে আবারও মিররে তাকালো।

কিছুই না।

গাড়ি আরও একটু দূরে নিয়ে গিয়ে সে হালকা করে ব্রেক চাপলো। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি। যুক্তি খুঁজে বের করার চেষ্টা করলো—হয়তো সে নামার পরই দ্রুত গেট খুলে ঢুকে গেছে। হয়তো ভেতরে কেউ অপেক্ষা করছিল। হয়তো আলো-ছায়ার কারণে ঠিকমতো দেখতে পারেনি।

“হয়তো,” সে নিজেকেই বললো।

তবুও ব্যাপারটা ঠিক মিলছে না। দরজা বন্ধ করার শব্দটা এত মৃদু কেন ছিল? আর সে তো স্পষ্ট দেখেছিল মেয়েটা গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল।

গাড়ি আবার স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের শব্দ এখন অস্বাভাবিক জোরে শোনা যাচ্ছে। যেন রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গাড়িটা একাই পুরো শহর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার দু'পাশের বাড়িগুলো দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছে। কিন্তু আমিরের মাথার ভেতর ঘুরছে একটাই প্রশ্ন—

এতো তাড়াতাড়ি মেয়েটা কোথায় গেল?

হঠাৎ গাড়ির ভেতর একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো। এসি বন্ধ, তবুও বাতাস যেন বরফের মতো ঠান্ডা। সে হাত বাড়িয়ে ড্যাশবোর্ডে চাপ দিল—এসি অফই আছে। জানালাগুলোও পুরোপুরি তোলা।

তার গলা শুকিয়ে এলো।

পাশের সিটের দিকে তাকালো।

সিট খালি।

তবুও মনে হলো যেন কেউ একটু আগেই বসেছিল।

কুশনের ওপর হালকা একটা চাপা ভাঁজ। সে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো। পরের মুহূর্তেই ভাঁজটা যেন স্বাভাবিক হয়ে গেল।

“অতিরিক্ত ভাবছি,” নিজেকে বোঝালো সে।

গাড়ি এগিয়ে চললো। শহরের ব্যস্ত অংশ পেরিয়ে আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়লো। এখানে আলো কিছুটা বেশি, কয়েকটা ফ্ল্যাটের বারান্দায় আলো জ্বলছে। এই স্বাভাবিক দৃশ্যগুলো দেখে বুকের ভেতরের অস্বস্তি কিছুটা কমলো।

তবুও—মায়ার মুখটা বারবার ভেসে উঠছে।

সেই ফ্যাকাসে আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মুখ। বড়, গভীর চোখ।সেই ফ্যাকাসে আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মুখ। বড়, গভীর চোখ। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।

“আমার নাম... মায়া।”

তার কণ্ঠটা যেন আবার কানে বাজলো।

আমির হঠাৎ মাথা ঝাঁকালো।

“স্টুপিড,” বিড়বিড় করলো সে। “একটা মেয়ে লিফট চেয়েছে, নামিয়েছে—এতেই এত নাটকীয় ভাবার কী আছে?”

তবুও যুক্তি মনকে পুরোপুরি শান্ত করতে পারলো না। বাড়ির সামনে গাড়ি থামাতে থামাতে প্রায় দু'হাত বেজে গেল। গেট খুলে গাড়ি ঢুকিয়ে দিলো। ইঞ্জিন বন্ধ করার পর হঠাৎ চারপাশের নীরবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

নিজের বাড়ির চেনা পরিবেশ—তবুও আজ কেমন যেন অপরিচিত লাগছে।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ কানে বাজলো।

টিক... টিক... টিক...

জুতো খুলে সোফায় বসে পড়লো সে। মাথার ভেতর এখনও সেই বাড়ির ছবি। সাদা-কালচে দোতলা। ঝকঝকে নামফলক। “মায়া ভিলা।”

হঠাৎ মনে হলো—সে কি আগে কখনো এই লেন দিয়ে গেছে? জায়গাটা চেনা লাগছিলো, আবার অচেনাও। এতদিন শহরে থেকেও এমন একটা বাড়ি তার চোখে পড়েনি কেন?

সে উঠে গিয়ে রান্নাঘর থেকে পানি নিয়ে এলো। গ্লাস ঠোঁটে তুলতেই বুঝলো হাত কাঁপছে। পানি খেয়ে নিজেকে সামলে নিলো।

“ওভাররিয়্যাক্ট করছি,” আবারও নিজেকে বোঝালো।

ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লো। লাইট বন্ধ। ঘর অন্ধকার। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের রাস্তার আলো এসে দেয়ালে হালকা ছায়া ফেলেছে।

চোখ বন্ধ করলো।

আর সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠলো—মায়ার মুখ।

অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে আলো। স্থির চোখ। সেই অদ্ভুত হাসি।

আমির চোখ খুলে ফেললো।

বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে।

সে পাশ ফিরলো। আবার চোখ বন্ধ করলো।

আবারও একই মুখ। এবার যেন একটু কাছে।

সে উঠে বসলো। ঘরের ভেতর তাকালো। কেউ নেই।

দেয়ালের ঘড়ির শব্দটা এখন যেন আরও জোরে—

টিক... টিক... টিক...

সে গভীর শ্বাস নিলো। “এটা শুধু মস্তিষ্কের খেলা,” নিজেকে বললো। “অচেনা, রহস্যময় কাউকে দেখলে এমন হয়। ব্রেইন রেজিস্টার করে।”

কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই গেল—

প্রথম দেখাতেই কেন এত তীব্রভাবে মুখটা মনে গেঁথে গেল?

তার জীবনে অনেক মানুষ এসেছে গেছে। অফিসে সহকর্মী, ক্লায়েন্ট, রাস্তার অচেনা মানুষ। কারো মুখ এভাবে চোখের সামনে ভেসে ওঠেনি কখনো।

তাহলে আজ কেন?

সে উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরালো। বাইরে নিস্তব্ধ রাস্তা। বাতাসে হালকা গাছের পাতা দুলছে। সব স্বাভাবিক।

তবুও মনে হচ্ছে—কোথাও যেন কিছু ঠিক নেই।

বিছানায় ফিরে আবার শোয়ার চেষ্টা করলো।

চোখ বন্ধ।

এইবার শুধু মুখ নয়—পুরো দৃশ্যটা ভেসে উঠলো।

ফাঁকা রাস্তা।

হেডলাইটের আলো।

মায়া দাঁড়িয়ে আছে মাঝরাস্তায়।

কিন্তু দৃশ্যটা বদলে গেল।

এবার সে দেখলো—রাস্তা ফাঁকা, কিন্তু হেডলাইটের আলোয় কোনো মানুষ নেই।

তবুও গাড়ির দরজা খুলে যাচ্ছে নিজে থেকেই।

আমির হঠাৎ চোখ খুলে উঠে বসলো। ঘাম জমেছে কপালে।

“না... এটা স্বপ্ন ছিল,” নিজেকে বোঝালো সে। কিন্তু সে তো এখনও ঘুমায়নি।

রাত তিনটা।

সে মোবাইল হাতে নিলো। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলো কিছুক্ষণ। মন অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু যতবার স্ক্রিন বন্ধ করছে, ততবারই অন্ধকারে সেই মুখ।

মায়া।

নামটা মাথার ভেতর ঘুরছে।

“মায়া...” শব্দটার মানেই তো ভ্রম। মিথ্যে দৃশ্য। চোখের ধোঁকা।

হঠাৎ তার শরীর শীতল হয়ে উঠলো।

সে কি কোনো ভ্রম দেখেছে?

না। সে স্পষ্ট কথা বলেছে মেয়েটার সঙ্গে। তাকে গাড়িতে বসিয়েছে। নামিয়েছে। সব বাস্তব।

তাহলে?

ঘরের কোণে রাখা আয়নার দিকে চোখ পড়লো।

অন্ধকারে আয়নায় নিজের অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। কয়েকেক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। মনে হলো—প্রতিবিম্বের পেছনে যেন আরেকটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।

সে দ্রুত লাইট জ্বালালো।

কিছুই নেই। খালি ঘর।

হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো। সে ক্লান্ত হয়ে ভাবলো—অতিরিক্ত স্ট্রেস। অফিসের চাপ। রাত জাগা।

অবশেষে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলো।

জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা নীলচে আলো ঢুকলো।

পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে দূরে।

সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুম আসেনি।

চোখ দুটো জ্বলছে। মাথা ভারী।

বিছানায় বসে সে বুঝলো—এই অস্বস্তি শুধু ভয় না। এর সঙ্গে মিশে আছে অদ্ভুত এক আকর্ষণও। যেন সে জানতে চায়—মায়া কে? কেন তার মুখ এভাবে মনে গেঁথে গেল?

সে কি আবার সেখানে যাবে?

ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতর ধক করে উঠলো।

নিজেকেই অবাক লাগছে—এক অচেনা মেয়ের বাড়ির সামনে আবার যাওয়ার কথা কেন ভাবছে সে?

তবুও প্রশ্নগুলো তাকে ছাড়ছে না।

মায়া এত দ্রুত কোথায় গেল?

দরজার শব্দ এত মৃদু কেন ছিল?

আর কেন তার নামটা এখনও কানে বাজছে?

ভোরের আলো পুরো ঘর ভরতে থাকলো। কিন্তু আমিরের মনে হলো—রাত এখনও শেষ হয়নি।

সারা রাত চোখে একফোঁটা ঘুম নামেনি আমিরের।

বিছানায় শুয়ে থেকেও সে যেন শুয়ে ছিল না—শরীরটা ছিল ঘরে, কিন্তু মন ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেই ফাঁকা রাস্তার মোড়ে, সেই সাদা-কালচে দোতলা বাড়ির সামনে, আর সেই মুখের চারপাশে।

চলবে,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন