পর্ব ০৪
রাত গভীর হতে শুরু করলো,গাড়ি ধীরে অচেনা লেনের দিকে মোড় নিলো স্টিয়ারিংয়ে তার আঙুল শক্ত হয়ে আছে।হৃদস্পন্দন কানে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।রাস্তার আলো আজ আরও ফ্যাকাসে।বাতাসে অদ্ভুত ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব শহরের শব্দ যেন পিছনে ফেলে এসেছে।এখানে নেমেছে চাপা নিস্তব্ধ অন্ধকার।তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে ধীরে।সামনে পরিচিত মোড় দেখা গেলো আবার শাহবাগ পেরিয়ে ডানদিকে পুরোনো লেন।গত রাতের স্মৃতি ঝুবুঝু জেগে উঠলো।হেডলাইটের আলো দীর্ঘ ছায়া ফেলছে।রাস্তার দুপাশে গাছ নীরব দাঁড়িয়ে কোনো মানুষ নেই আশেপাশে কোথাও।কুকুরের ডাকে শীতলতা বাড়ছে আরও।সে গতি কমালো অজান্তেই।দূরে সাদা রঙের বাড়ি দেখা গেলো।
দোতলা গঠন, গেট সামনে স্পষ্ট।হেডলাইট পড়তেই নামফলক ঝলসে উঠলো।
“মায়া ভিলা” লেখা পরিষ্কার দেখা গেলো।
বাড়িটা ঠিক গত রাতের মতোই ঝকঝকে, পরিপাটি, স্বাভাবিক চেহারা।তবুও আজ কেমন ভিন্ন লাগছে।আলোয় এক অদ্ভুত ম্লানতা মিশে আছে।
সে গাড়ি গেটের সামনে থামালো।ইঞ্জিন বন্ধ করতেই নিস্তব্ধতা ঘন হলো।বুকের ভেতর ধুকপুকানি দ্রুত বাড়ছে।আজ গেটের আলো টিমটিম করছে ধীরে।বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে নেই নিশ্চুপ।জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব ভাসছে।সে গভীর শ্বাস নিলো সাহস জোগাতে।তারপর দরজা খুলে বাইরে নামলো।পা মাটিতে পড়তেই শীতলতা ছড়ালো বাতাসে ভেজা ফুলের গন্ধ তীব্র।
চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখলো না।গেট ছুঁতেই ধাতব শব্দ হলো ক্ষীণ।গেট আস্তে খুলে গেলো নিজে থেকেই।সে তো ধাক্কাই দেয়নি এখনো।
তার হাত মাঝআকাশে স্থির রইলো।শরীর জুড়ে কাঁটা দিলো হালকা।ভেতরে পা রাখতেই নুড়ি কড়মড় করলো।বাগানের ঘাস অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ।বাড়ির দেয়াল ছুঁয়ে দেখলো ঠাণ্ডা।এই ঠাণ্ডা যেন স্বাভাবিক নয় বারান্দার আলো একবার নিভে গেলো।আবার জ্বলে উঠলো কাঁপা কাঁপা।দরজা আধখোলা দেখা গেলো সামনে।ভেতর থেকে অন্ধকার তাকিয়ে আছে।
সে এক পা এগিয়ে থেমে গেলো।
মনে হলো কেউ ফিসফিস করছে ধীরে।শব্দটা বাতাসে ভাসছে অদৃশ্যভাবে।
“এসেছেন... আমির...” স্পষ্ট উচ্চারণ।
তার বুকের ভেতর বরফ জমলো।সে তো নাম বলেনি গত রাতে।তাহলে কিভাবে জানে তার নাম?মাথার ভেতর আতঙ্ক ঘুরপাক খাচ্ছে।দরজাটা ধীরে পুরো খুলে গেলো।ভেতরে আলো নেই, শুধু ছায়া।মেঝেতে লম্বা অন্ধকার রেখা পড়েছে।
সে সাহস করে ভেতরে পা রাখলো।ভেতরের বাতাস ভারী, স্যাঁতস্যাঁতে।দেয়ালে ঝোলানো ছবি কাঁপছে হালকা।কোনো জানালা খোলা নেই তবুও,ঘরের ভেতর চাপা নিস্তব্ধতা জমাট হঠাৎ পেছনে দরজা বন্ধ হলো জোরে।সে ঘুরে তাকালো আতঙ্কে ভরা চোখে।দরজা শক্তভাবে আটকে গেছে এখন।সে হাতল টানলো বারবার ব্যর্থভাবে।পেছন থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ছুঁলো ঘাড়।তার শরীর জমে গেলো মুহূর্তে।ধীরে ধীরে সামনে তাকালো সে।সিঁড়ির মাথায় একটি অবয়ব দাঁড়িয়ে।ফ্যাকাসে আলোয় মুখ স্পষ্ট হলো।লম্বা চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে।
চোখ দুটি গভীর অস্বাভাবিক স্থির।ঠোঁটে সেই অদ্ভুত হালকা হাসি।গত রাতের মতোই চেহারা অপরিবর্তিত।কিন্তু চোখে আজ ভিন্ন ঝিলিক।মায়া ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে।তার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে না।
প্রতিটি ধাপ নীরবে পেরিয়ে আসছে।তার সাদা পোশাক মেঝে ছুঁয়ে।চোখ একবারও সরাচ্ছে না আমিরের।সে পিছিয়ে যেতে চাইলেও পারলো না।পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে স্পষ্ট।মায়া সামনে এসে থেমে দাঁড়ালো।তাদের মাঝে কয়েক হাত দূরত্ব।সে মৃদু স্বরে বললো শান্তভাবে,
“ফিরে আসবেন জানতাম আমি।”
কণ্ঠে না আছে রাগ না উষ্ণতা শুধু এক অদ্ভুত নিশ্চয়তার ছাপ।আমির কষ্টে গলা খোলার চেষ্টা করলো।কিন্তু শব্দ বের হলো না।
তার চোখে ভয় স্পষ্ট প্রতিফলিত।মায়ার ঠোঁটে হাসি একটু বাড়লো।হঠাৎ চারপাশের দেয়াল বদলাতে শুরু করলো ঝকঝকে রং ফিকে হয়ে যাচ্ছে দ্রুত।দেয়ালে কালচে দাগ ফুটে উঠছে।
দেয়ালে কালচে দাগ ফুটে উঠছে। ছাদ থেকে চুন খসে পড়ছে ধীরে।জানালার কাঁচ ফেটে যাচ্ছে শব্দহীন।
বাড়িটা মুহূর্তে জীর্ণ হয়ে উঠছে।যেন বহু বছরের পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ।মেঝেতে ধুলো জমে আছে ঘন।আমির আতঙ্কে চোখ বন্ধ করলো।আবার খুলতেই দৃশ্য অপরিবর্তিত রইলো।এটা স্বপ্ন নয় সে বুঝতে পারলো।মায়া আরও এক ধাপ এগিয়ে এলো।তার চোখে অদ্ভুত গভীর ছায়া।সে হাত তুললো ধীরে আমিরের দিকে।ঠাণ্ডা বাতাস আঙুল ছুঁয়ে গেলো তার শরীর শীতল পাথর হয়ে গেলো।
মায়া ফিসফিস করে বললো ধীরে,
“সবাই আসে না এখানে সহজে।আপনি এসেছেন নিজের ইচ্ছায়।”
তার কণ্ঠ দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুললো।আমিরের মাথা ঝিমঝিম করছে তীব্রভাবে।সে বুঝতে পারছে না বাস্তব কোথায়।বাইরের পৃথিবী কি এখনও আছে?নাকি সে আটকা পড়েছে চিরতরে?হঠাৎ দূরে ঘড়ির শব্দ ভেসে এলো।
টিক... টিক... টিক... ভারী প্রতিধ্বনি।
এই শব্দ তার ঘরের ঘড়ির মতো.. মুহূর্তে সব আলো নিভে গেলো।
চারদিকে অন্ধকার নেমে এলো সম্পূর্ণ।শুধু মায়ার চোখ জ্বলছে ক্ষীণ আলোয়।সে এক পা পিছিয়ে যেতে চাইল।কিন্তু পিছনে আর কোনো দরজা নেই।
অন্ধকারের ভেতর মায়ার কণ্ঠ শোনা গেলো,
“এখন আর ফেরা সম্ভব নয়।”
তার বুকের ভেতর চিৎকার জমলো।কিন্তু কণ্ঠ বের হলো না বাইরে।হঠাৎ সবকিছু ঘুরতে শুরু করলো দ্রুত।মেঝে সরে যাচ্ছে পায়ের নিচে।অন্ধকার তাকে গ্রাস করছে ধীরে।তার চেতনা ঝাপসা হয়ে এলো।পরের মুহূর্তে সে চোখ খুললো হঠাৎ।নিজেকে গাড়ির ভেতর বসে পেলো।গাড়ি দাঁড়িয়ে সেই গেটের সামনে।ইঞ্জিন বন্ধ, চারপাশ নিস্তব্ধ।বাড়ি আগের মতো স্বাভাবিক আবার।গেট বন্ধ, আলো স্থির জ্বলছে।
সে কাঁপতে থাকা হাতে স্টিয়ারিং ধরলো।
সবকিছু কি কল্পনা ছিলো তাহলে?হঠাৎ পাশে সিটে শব্দ হলো ক্ষীণ।সে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো।সিটে কেউ বসে নেই স্পষ্টভাবে।তবুও কুশনে চাপা দাগ তৈরি হচ্ছে।তার নাকে ভেজা ফুলের গন্ধ এলো।কানে ভেসে এলো মৃদু ফিসফিস শব্দ।
“এখনো শুরু... শেষ হয়নি।”
তার শরীর জুড়ে ঠাণ্ডা স্রোত বইলো।আমির কণ্ঠ চেপে বসে রইলো।দ্রুত ধমনীতে রক্ত চলমান।তার চোখ বারবার চারপাশে ঘুরছে।কোথাও মানুষ নেই, তবুও কণ্ঠ শুনছে।গাড়ির সিট যেন চাপা ছায়ায় ভরা।হঠাৎ হালকা আলো এক কোণে ঝলকালো।আড়াল থেকে কোনা অদ্ভুত ছায়া নেমে এলো।আমিরের হৃৎপিণ্ড যেন বন্ধ হয়ে গেলো।এক ফিসফিস শব্দ ভেসে এলো কাছাকাছি।
“দেখো... আমি সব জানি...” কণ্ঠে তীব্রতা।আমির ফিরে তাকালো, কিন্তু কিছু দেখা যাচ্ছে না।
বাতাস হঠাৎ ঘন হয়ে চলতে লাগলো।
স্টিয়ারিং হাতে কাঁপছে ভয়ে ভয়ে।
দূরের হেডলাইট নিভে গিয়ে অন্ধকার।
গাড়ির ভিতর শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছে।
মুহূর্তে সে বুঝলো, এবার কোনো পালানোর পথ নেই।একটা চিলতে হালকা স্পর্শ ঘাড়ে লাগলো।আমির চমকে উঠে, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে যায়।কোনো দৃষ্টিশক্তি নেই, তবুও অনুভব স্পষ্ট।ফিসফিস কণ্ঠে বললো, “তুমি ফিরে আসবে,
জানতাম।”
আমির ধীরে পিছিয়ে যেতে চাইল,কিন্তু পা স্থির।গাড়ির দরজা নিজে খুলতে চাইলেও হাত কাজ করে না।চূড়ান্ত আতঙ্ক ভেতর থেকে চেপে রাখছে। মায়ার চোখ আভাস দিচ্ছে অদ্ভুত আলোয়।হঠাৎ গাড়ি কম্পন করতে লাগলো।শরীর জুড়ে ঝড়ের মতো কম্পন ছড়িয়ে গেলো।মুহূর্তে সব চূড়ান্ত অচেনা হয়ে উঠলো।
ফিসফিস শব্দ আরও কাছে, “এখান থেকে পালানো
যাবে না।”
আমিরের ভেতর সব সাহস মিলিয়ে গলে যাচ্ছে।হঠাৎ গেটের বাইরে হালকা আলো ঝলকাতে লাগলো।
একটি অজানা ছায়া গেটের পাশে দাঁড়ালো।মায়া ধীরে গাড়ির পাশে চলে এলো।তার হাত ছুঁলে বাতাস হিমেল হয়ে গেলো।আমির কিছুতেই বুঝতে পারলো না, বাস্তব কোথায়।
মায়া ধীরে বললো, “সব শুরু হয়েছে, শেষ হয়নি।”
তার চোখে অদ্ভুত অমোঘ নিশ্চয়তা।গাড়ির চারপাশ হঠাৎ ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেলো।স্টিয়ারিং এখনও হাতে। কিন্তু কিছুই নিয়ন্ত্রণ নেই।
মুহূর্তে সব দৃশ্য ছায়ার মধ্যে মিললো।আমির অনুভব করলো,এবার সে সম্পূর্ণ ভেতরে।
মায়া ধীরে একটি ধাপ এগিয়ে এলো।তার সাদা পোশাক বাতাসে ভেসে উঠছে।
কণ্ঠ আবার ফিসফিস, “তুমি এখানে থাকলে... নিরাপদ
না।”
আমির চোখ বন্ধ করলো, হৃদয় রুদ্ধ।ধীরে ধীরে সে বুঝলো, নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।বাতাস, ছায়া, কুয়াশা সব মিলিত হয়ে ঘিরে রেখেছে।এক মুহূর্তের জন্য সব স্থির, তারপর কেবল নিস্তব্ধতা।হঠাৎ গাড়ি যেন স্বেচ্ছায় নড়ে উঠলো।হালকা চিলতে বাতাস মুখে লাগলো।মায়া ধীরে পেছনে সরে গেলো, চোখের ঝিলিকঅদ্ভুত।
ফিসফিস কণ্ঠ আবার বললো, “এখনও তুমি জানো না...
সব রহস্য।”
আমিরের ভেতর কষ্টের ছায়া ছড়িয়ে গেলো।তার মনে হলো, বাস্তব আর স্বপ্নের মধ্যে সীমানা নেই।গাড়ি ধীরে ধীরে হালকা আলোয় ভেসে এলো।মায়া ধীরে ছায়ার মধ্যে মিললো অদৃশ্য হয়ে।আমির এখনও কাঁপছে, শরীর জমে গেছে।সে বুঝতে পারলো, এক রাতের ঘটনা শেষ নয়।সবকিছু স্বাভাবিক হলেও, ভেতরের ভয়ের চিহ্ন অদৃশ্য
নয়।গাড়ি ধীরে হেঁটে চলে যাবে লেন ধরে।
তার চেতনা এখনও অস্থির, হৃদয় টুকরো হয়ে যাচ্ছে।মায়ার কণ্ঠ এখনও কানে বাজছে, “শেষ হয়নি... শুরু
মাত্র।”
চলবে,,,,,