ফন্ট সাইজ:
থিম:
The Cursed Abode

৫ম পর্ব

লেখক: মিহি সুলতানা

পর্ব ০৫

ভোরের আলো ধীরে শহর জুড়ে ছড়ালো।আমির এখনো গাড়ির ভেতর স্থির বসে।হাত দুটো কাঁপছে থামছে না একদম।ঘাড়ে ঠাণ্ডা স্পর্শ রয়ে গেছে এখনো।জানালার কাঁচে কুয়াশা জমেছে ভারী।সে গভীর শ্বাস নিলো ধীরে আবার।সবকিছু স্বাভাবিক দেখাচ্ছে বাইরে এখন।তবুও ভেতরের ভয় কমেনি একটুও।সে ধীরে ইঞ্জিন চালু করলো আবার।গাড়ি কেঁপে উঠলো নিঃশব্দ অদ্ভুতভাবে।গেটের দিকে তাকালো স্থির দৃষ্টিতে।মায়া ভিলা শান্ত দাঁড়িয়ে আছে সামনে।কোনো আলো টিমটিম করছে না আজ।সব যেন স্বাভাবিক দেখাচ্ছে আবার।সে দ্রুত লেন ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।পেছনে তাকাতে সাহস হলো না তার।রাস্তা এখন প্রায় ফাঁকা সম্পূর্ণ।আকাশে ফ্যাকাসে ভোরের আলো ছড়ানো।তার মাথা ভারী লাগছে অস্বাভাবিকভাবে।

হঠাৎ ফোনে কম্পন শুরু হলো আবার।সে চমকে ফোনের স্ক্রিনে তাকালো।স্ক্রিনে কোনো নাম দেখাচ্ছে না কিছু।শুধু লেখা অজানা নম্বর স্পষ্টভাবে।হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে গেলো হঠাৎ।সে কাঁপা হাতে কল রিসিভ করলো।

কিছুক্ষণ নীরবতা ভেসে এলো ধীরে।তারপর সেই পরিচিত ফিসফিস কণ্ঠ।

“ফিরে যাচ্ছেন এত তাড়াতাড়ি আমির?”

তার নিঃশ্বাস আটকে গেলো মুহূর্তে।সে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো।গলা শুকিয়ে গেছে সম্পূর্ণ ভয়েতে।ফোনের ওপাশে হালকা হাসি ভেসে।

“সব দেখা হয়নি এখনো আমির।”

লাইন কেটে গেলো হঠাৎ নিঃশব্দে।স্ক্রিনে কল হিস্ট্রি নেই কোথাও।যেন কিছু ঘটেনি এইমাত্র একদম।সে গাড়ি থামালো রাস্তার পাশে।মাথা দুই হাতে চেপে ধরলো শক্ত।এই ঘটনা নিছক কাকতাল নয়।কেউ তাকে অনুসরণ করছে নিশ্চিতভাবে।

নাকি সত্যিই অন্য কিছু আছে?মায়ার চোখ ভেসে উঠলো মনে।সে সিদ্ধান্ত নিলো সত্য খুঁজবে।এভাবে ভয় নিয়ে বাঁচবে না আর।গাড়ি ঘুরিয়ে শহরের দিকে গেলো।সকালের ভিড় ধীরে বাড়ছে চারদিকে।মানুষজন ব্যস্ত নিজেদের কাজে সবাই।সবকিছু স্বাভাবিক দৃশ্যের মতোই।শুধু আমিরের ভেতর ঝড় বয়ে।সে সরাসরি লাইব্রেরির দিকে গেলো।

পুরোনো নথি দেখতে চায় এখন।মায়া ভিলার ইতিহাস জানতে হবে।লাইব্রেরি প্রায় ফাঁকা ছিলো তখন।

ধুলো জমা তাক সারি সারি।বৃদ্ধ কর্মচারী তাকালো কৌতুহলী দৃষ্টিতে।আমির ঠিকানা লিখে দিলো কাগজে।লোকটি ভ্রু কুঁচকালো হালকা বিস্ময়ে।

“ওই বাড়ি এখনো আছে নাকি?”

প্রশ্ন শুনে তার শরীর কেঁপে।

“মানে কী বলছেন আপনি এখন?”

লোকটি চুপ করে তাকিয়ে রইলো।তারপর নিচু স্বরে বললো ধীরে,

“ওটা বহু বছর আগেই পুড়েছে।”

আমিরের বুক ধক করে উঠলো।

“সেখানে কেউ থাকে না এখন?”

লোকটি মাথা নেড়ে না বললো।

“দশ বছর আগে আগুন লেগেছিলো।”

তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে।সে গত রাতের দৃশ্য ভাবলো।

বাড়ি তো ছিলো অক্ষত সম্পূর্ণ।লোকটি পুরোনো ফাইল বের করলো।হলুদ কাগজে পোড়া দাগ স্পষ্ট।ছবিতে ভাঙা জীর্ণ বাড়ি দেখা।নাম লেখা মায়া ভিলা স্পষ্টভাবে।আমিরের শ্বাস ভারী হয়ে উঠলো।

ছবির বাড়ি তার দেখা বাড়ি।কিন্তু সেখানে ধ্বংসস্তূপ স্পষ্ট দেখা।

“একজন মেয়ে মারা গিয়েছিলো।”

লোকটির কণ্ঠ আরো নিচু হলো।

“নাম ছিলো মায়া রহমান।”

আমিরের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো।সে চেয়ারে বসে পড়লো ধীরে।

ছবিতে মেয়েটির মুখ স্পষ্ট দেখা।চোখ দুটি অস্বাভাবিক স্থির চাহনি।ঠিক গত রাতের মতোই একদম।হঠাৎ লাইব্রেরির আলো টিমটিম করলো।বাতাসে ভেজা ফুলের গন্ধ ভাসলো।তার শরীর শক্ত হয়ে গেলো।ফাইলের পাতায় নতুন দাগ ফুটলো।কালো কালিতে লেখা চারটি শব্দ।

“ফিরে এসো আজ রাতেই আমির।”

আমির কাগজ ছেড়ে দিলো তাড়াতাড়ি।হৃদস্পন্দন কানে বাজছে তীব্রভাবে।চারদিকে কেউ নেই আশেপাশে এখন।ঘড়ির শব্দ আবার ভেসে এলো।টিক টিক ভারী প্রতিধ্বনি উঠলো।আমির বুঝলো খেলা গভীর হয়েছে।এটা শুধু ভয় দেখানো নয়।কেউ তাকে টেনে নিচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে।তার ফোন আবার কেঁপে উঠলো।

একটি বার্তা ভেসে উঠলো স্ক্রিনে।

“সত্য জানতে চাইলে ফিরো।”

বার্তার নিচে একটি ছবি যুক্ত।তার নিজের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।সময় লেখা আজ রাত বারোটা।আমির জানে সময় খুব কম।সে কি আবার যাবে সেখানে?নাকি পালিয়ে বাঁচবে এবার চিরতরে?ভয় আর কৌতূহল লড়ছে ভেতরে।মায়ার চোখ মনে ভেসে উঠছে।হঠাৎ সে সিদ্ধান্ত নিলো দৃঢ়ভাবে।আজ রাতেই শেষ করবে সবকিছু।বাইরে আকাশে মেঘ জমছে ধীরে।এক অদ্ভুত ঝড় আসছে সামনে।রাত আবার নেমে আসবে শিগগির।

আর সেই রাত দেবে সিদ্ধান্ত। রাত গভীর হলে শহরঅদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঢেকে গেল।আমির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকেতাকিয়ে রইলো।তার চোখে ঘুম নেই, আছে কেবল অনির্বচনীয় আতঙ্ক।ঘড়ির টিকটিক শব্দ অস্বাভাবিক ভারী শোনাতে লাগলোআজ।মনে হচ্ছিল সময় ইচ্ছে করে ধীরে এগোচ্ছে এখন।হঠাৎ ঘরের বাতি দপদপ করে নিভে জ্বলে উঠলো।

বাতাসে ভেজা ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো নিঃশব্দে।আমির ধীরে ঘুরে তাকালো, অথচ কাউকে দেখলো না।তবুও উপস্থিতির ভারে ঘর অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা লাগলো।দেয়ালে তার ছায়া কাঁপছিল অন্য কারও মতো।ফোনের স্ক্রিন হঠাৎ নিজে থেকেই জ্বলে উঠলো।সাদা পর্দায় ধীরে ধীরে অক্ষর ভেসে উঠলো স্পষ্ট।

“সময় হয়েছে ফিরে আসার, আমির।” লেখা ফুটে

উঠলো।

তার বুকের ভেতর ধক করে উঠে অজানা শঙ্কায়।সে ফোন বন্ধ করতে চাইলো, পারলো না একদম।ঘড়িতে ঠিক তখন রাত বারোটা বাজলো ধীরে।টিকটিক শব্দ যেন চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো তাকে।আমির বুঝলো আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয় এখন।সে নিঃশব্দে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।সিঁড়িঘর অস্বাভাবিক অন্ধকারে ঢেকে ছিল সম্পূর্ণ।বাইরে আকাশে চাঁদ নেই, মেঘ জমেছে ঘন।রাস্তা প্রায় ফাঁকা, বাতাসে কাঁপা শীতল স্রোত।সে গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন চালু করলো ধীরে।হেডলাইটের আলো কুয়াশার দেয়ালে ধাক্কা খেলো।মনে হচ্ছিল পথ নিজেই তাকে টেনে নিচ্ছে।শাহবাগ পেরিয়ে সে ঢুকলো পুরোনো সেই লেনে।

চারপাশের শব্দ যেন একে একে নিঃশেষ হলো।দূরে কুকুরের ডাকে শীতলতা বাড়লো আরও বেশি।হঠাৎ সামনে সাদা বাড়িটি স্পষ্ট দেখা গেলো।মায়া ভিলা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে যেন।

আজ গেট খোলা, অথচ আলো জ্বলছে না।বাড়িটা যেন অপেক্ষায় আছে নির্বস্ত্র ধৈর্যে।আমির গাড়ি থামাতেই ইঞ্জিন নিজে নিভে গেলো।চারপাশে নিস্তব্ধতা ঘন কুয়াশার মতো জমলো।সে ধীরে দরজা খুলে বাইরে নামলো।পায়ের নিচে নুড়ির শব্দ অস্বাভাবিক জোরালোশোনালো।বাতাসে এবার ফুলের গন্ধ নয়, পচা গন্ধ।গেট তার পেছনে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলো।সে ঘুরে তাকিয়ে দেখলো তালা ঝুলছে গেটে।সে তো ছোঁয়েও দেখেনি গেটের লোহার অংশ।হঠাৎ উপরের জানালায় ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠলো।সেই আলোয় এক লম্বা ছায়া নড়লো ধীরে।চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে অস্পষ্ট আকারে।চোখ দুটি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, স্থির, নিঃস্পন্দ।আমিরের শ্বাস গলায় আটকে রইলো মুহূর্তে।দরজাটি এবার সম্পূর্ণ খোলা দেখা গেলো সামনে।

ভেতর থেকে অন্ধকার যেন তাকে আমন্ত্রণ জানালো।সে সাহস জোগাড় করে ভেতরে পা রাখলো ধীরে।মেঝে ঠাণ্ডা, ভেজা, অস্বাভাবিকভাবে স্যাঁতস্যাঁতেলাগলো।দেয়ালের রং খসে পড়ে কালচে দাগ ফুটে উঠছে।হঠাৎ পেছনের দরজা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হলো।আমির ছুটে গিয়ে হাতল ধরলো মরিয়া হয়ে।দরজা নড়লো না, যেন পাথরে গড়া প্রাচীর।

তার হৃদস্পন্দন কানে তীব্র ঢাকের মতো বাজলো।উপরে সিঁড়ির দিক থেকে উপস্থিতি নেমে এলো।পদচারণার শব্দ নেই, তবুও কেউ নামছে ধীরে।আমির মাথা তুলে তাকাতেই তাকে দেখলো স্পষ্ট।মায়া সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে।তার সাদা পোশাক ছেঁড়া, প্রান্তে কালো ছাই।চোখে গভীর ছায়া, অথচ অদ্ভুত ঝিলিকও আছে।সে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলো।প্রতিটি ধাপ যেন সময়ের ভেতর দীর্ঘতর হচ্ছিল।আমির পিছোতে চাইলেও পা নড়লো না একটুও।মনে হচ্ছিল মেঝে তাকে আটকে রেখেছে ইচ্ছায়।মায়া সামনে এসে কয়েক হাত দূরে থামলো।তার ঠোঁটে বিকৃত এক অনির্বচনীয় হাসি ফুটলো।

“এবার সত্যি শুরু হবে,” কণ্ঠ ভেসে এলো।

কণ্ঠস্বর দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো।হঠাৎ ঘরের রং দ্রুত বদলাতে শুরু করলো।ঝকঝকে দেয়াল কালচে হয়ে ফেটে উঠলো।জানালার কাঁচে ফাটল ধরলো শব্দহীন নিস্তব্ধতায়।ছাদ থেকে চুন খসে পড়লো ধীরে ধুলো হয়ে।বাতাসে পোড়া কাঠের গন্ধ ছড়িয়ে গেলো চারদিকে।মেঝেতে অদ্ভুত হাতের ছাপ ফুটে উঠলো হঠাৎ।কেউ যেন সাহায্য চাইছে অদৃশ্য যন্ত্রণায়।আমিরের চোখের সামনে দৃশ্য বদলাতে লাগলো।ঘরের ভেতর আগুনের আভা ঝলসে উঠলো ক্ষীণ।কিন্তু আগুন তাকে স্পর্শ করলো না এখনো।

মায়ার চোখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।অস্বাভাবিকভাবে।সে হাত বাড়ালো, বাতাস বরফের মতো ঠাণ্ডা।

“সব দেখবে তুমি,” কণ্ঠ ফিসফিস করে উঠলো।

মেঝে হঠাৎ দেবে গিয়ে অন্ধকার খুলে গেলো।আমির ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যেতে লাগলো।চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে গেলো ভারী নিঃশ্বাসে।দূরে অস্পষ্ট চিৎকার কানে ভেসে এলো।হঠাৎ সব নিস্তব্ধ হয়ে অন্ধকার স্থির হলো।

সে আবার নিজেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো ঘরে।মায়া সামনে নেই, তবুও উপস্থিতি অটুট।দেয়ালে কালো অক্ষরে লেখা ভেসে উঠলো।

“এখনো শেষ হয়নি কিছুই,” স্পষ্ট জ্বলছে।

ঘরের কোণে কাঠের মেঝে কেঁপে উঠলো হঠাৎ।ফাঁক দিয়ে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসতে লাগলো।ধোঁয়ার ভেতর দুটি জ্বলন্ত চোখ স্থির হয়ে।আমির দেয়ালে ঠেকে গেলো নিঃশ্বাসহীনআতঙ্কে। ফিসফিস কণ্ঠ চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো।

“তুমি এখন ভেতরে,” শব্দ কানে বাজলো।

হঠাৎ আলো নিভে সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে এলো।তার পায়ের নিচে শূন্যতার অনুভূতি তৈরি হলো।সে অন্ধকারে তলিয়ে যেতে লাগলো নিঃশব্দে।শেষ মুহূর্তে সেই চোখ আবার জ্বলে উঠলো।হঠাৎ সে চোখ খুলে নিজেকে গাড়িতে পেলো।গেটের সামনে সব স্বাভাবিক নিস্তব্ধ স্থির।

কিন্তু গেটের উপর নতুন লেখা জ্বলছে।

“স্বাগতম আবার, আমির,” অক্ষরগুলো স্পষ্ট।

তার পাশের সিটে চাপা দাগ গভীর হয়েছে।বাতাসে আবার পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।কানে শেষবার সেই ফিসফিস ভেসে এলো।

“রহস্য এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।”

হেডলাইট নিজে নিজেই নিভে গেলো সম্পূর্ণ।রাত আবার তাকে গ্রাস করলো নিঃশব্দে।

চলবে,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন