ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক অবেলায় তুমি এলে

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: কলমে তাসনিম তালুকদার বুশরা

#এক_অবেলায়_তুমি_এলে

#পর্ব_৬

#কলমে_তাসনিম_তালুকদার_বুশরা

হ্যাশট্যাগ ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ🚫

রাত নেমে এসেছে অনেক আগেই। নিজের রুমের বেডে আরাম করে বসে আছে তিতলি। জানালার পর্দা দুলিয়ে হালকা বাতাস ভেতরে প্রবেশ করছে। রুমের এক কোণে জ্বলতে থাকা নরম আলো পুরো পরিবেশটাকে আরও প্রশান্ত করে তুলেছে। আজ সারাদিনের প্রতিটি মুহূর্ত বারবার ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। ঝিলপাড়ের শান্ত বিকেল..নৌকায় কাটানো নিরিবিলি সময়...আহিয়ানের নিঃশব্দ যত্ন...আর সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো, যেগুলো দিনের শেষে অদ্ভুত এক সুখানুভূতি হয়ে তার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। আজ মনটা অসম্ভব ভালো। কারণ, জীবনে প্রথমবার আহিয়ানের সঙ্গে এতটা সময় একান্তে কাটিয়েছে সে। কঠোর, গম্ভীর মানুষটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা যত্নশীল মানুষটা কেও যেন আজ নতুন করে আবিষ্কার করেছে।মুখে অজান্তেই এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল।হাতে থাকা মোবাইল ফোনটা অন্যমনস্ক ভাবে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটি পরিচিত প্রোফাইল তার সামনে এসে থামল।

—“আহিয়ান খান আর্য।”

কৌতূহলী হয়ে প্রোফাইল ছবিটিতে আলতো করে চাপ দিল তিতলি। ছবিটা বড় হতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে নির্বাক হয়ে রইল। হালকা আকাশি রঙের একটি শার্ট, সাদা প্যান্ট, কব্জিতে কালো রঙের ঘড়ি, চোখে গাঢ় কালো সানগ্লাস আর নিজের কালো বাইকের ওপর অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বসে আছে আহিয়ান। মুখে কোনো হাসি নেই। তবুও তার ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা আর সংযত উপস্থিতি ছবিটাকে আলাদা এক আকর্ষণীয় আবহ দিয়েছে।

তিতলি একদৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে, বিড়বিড় করে বলল,

— “আপনি সত্যিই ভীষণ হ্যান্ডসাম...। তবে মেজাজটা একদম খিটখিটে, ভীষণ গম্ভীর আর খারুশ টাইপের!”

কথাটা বলেই সে নিজেই মুচকি হেসে ফেলল।আবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,

— “তবে নো প্রবলেম... ও বি চলে গা।”

লজ্জায় নিজেরই গাল দুটো রাঙা হয়ে উঠল।

পরক্ষণেই মোবাইলটা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বালিশের ওপর মাথা রাখল সে। ঠোঁটের কোণে তখনও লেগে আছে একরাশ মিষ্টি হাসি। মনে মনে শুধু একটাই কথা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে কঠোর মানুষগুলো হয়তো ভালোবাসাটা মুখে প্রকাশ করতে পারে না কিন্তু যত্ন নিতে তারা কখনো কার্পণ্য করে না।

~~

সকাল দশটা...!”

কলেজের টিফিন বিরতি।প্রতিদিনের মতো আজও কলেজ প্রাঙ্গণের সেই বিশাল বটগাছের নিচে বসে আছে তিতলি আর সাথী। চারপাশে শিক্ষার্থীদের কোলাহল, হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডায় মুখর পুরো ক্যাম্পাস। অথচ সেই ভিড়ের মাঝেও দুজনের মধ্যে অদ্ভুত এক নীরবতা। বরং নীরব রয়েছে শুধু তিতলি। সকালের প্রথম ক্লাস থেকেই সে সাথীর সঙ্গে একটি কথাও বলেনি। অন্যদিকে সাথী প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছে গেছে। সকালের পর থেকে কতবার যে ক্ষমা চেয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। কখনো কান ধরে, কখনো নাটকীয় মুখভঙ্গি করে, আবার কখনো কাকুতি- মিনতি করে তিতলির রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু তিতলি? সে যেন নিজের অভিমানকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে।মুখটা গম্ভীর করে দূরের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন পাশে কেউ বসেই নেই।অবশেষে সাথী দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় কণ্ঠে বলল,

— “আচ্ছা জান, আর কখনো তোকে একা ফেলে কোথাও যাব না। কথা দিলাম। এবার তো আমাকে ক্ষমা করে দে, প্লিজ!”

তিতলির মুখের কঠোরতা সামান্য নরম হলো।

অভিমান পুরোপুরি না গললেও বন্ধুর অসহায় চেহারা দেখে মনটা আর শক্ত রাখতে পারল না।

তবুও ভাব বজায় রেখে গম্ভীর স্বরে বলল,

— “আচ্ছা, মাফ করে দিলাম। যদিও তোকে আমি ভালো করেই চিনি। তুই সুযোগ পেলেই আবার আমাকে বিপদে ফেলে পালাবি।”

সাথী প্রতিবাদ করার জন্য মুখ খুলতেই একটি ছায়া এসে পড়ল তাদের সামনে। দুজনেই মুখ তুলে তাকাল। অপরিচিত এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে।

মুখে অস্বস্তিকর আত্মবিশ্বাসের হাসি। তিতলি ভ্রু কুঁচকে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

— “জি, কোনো সমস্যা?”

ছেলেটি এক মুহূর্ত ইতস্তত করে হেসে বলল,

— “আসলে... আপনাকে আমার অনেক ভালো লাগে। আপনি কি... আমার গার্লফ্রেন্ড হবেন?”

কথাটা শুনেই সাথীর বুক ধক করে উঠল। সে একবার তিতলির দিকে, আরেকবার ছেলেটির দিকে তাকাল। মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খেতে লাগল,

—“হায় আল্লাহ! আজ তো ছেলেটার কপালে দুঃখ আছে। তিতলির মাথা এমনিতেই গরম, তার ওপর এই সময় এসে প্রপোজ!”

পরের মুহূর্তেই তিতলি ধীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল।

তার মুখে কোনো হাসি নেই। বরং চোখে ফুটে উঠেছে তীব্র বিরক্তির ছাপ। সে চারপাশে একবার দৃষ্টি বুলাতেই বটগাছের পাশে পড়ে থাকা একটি বাঁশের লাঠি চোখে পড়ল। এক মুহূর্তও দেরি করল না। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে লাঠিটা হাতে তুলে নিল।তারপর সেটি হাতে নিয়ে ছেলেটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

রাগে জ্বলতে থাকা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— “তোমার সাহস তো কম না! আমাকে এসে প্রেমের প্রস্তাব দাও?”

ছেলেটির মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

আর সাথী?

সে দুহাতে নিজের কপাল চাপড়ে মনে মনে বলতে লাগল,

—“এবার যা হওয়ার, তা-ই হবে!”

ছেলেটি ইতস্তত ভঙ্গিতে আবারও বলল,

— “আসলে... তোমাকে আমার সত্যিই খুব ভালো লাগে।”

কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিতলি কঠোর স্বরে ধমক দিয়ে উঠল,

— “চুপ!”

তার বজ্রকঠিন কণ্ঠে ছেলেটি মুহূর্তেই থেমে গেল।

চারপাশে বসে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীও কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তিতলি হাতে থাকা লাঠিটা মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে বলল,

— “এসো, আমার সঙ্গে।”

ছেলেটি হতভম্ব হয়ে নাক টেনে আমতা আমতা করে বলল,

— “কো... কোথায়?”

তিতলি ভ্রু কুঁচকে আবার বলল,

— “যা বলছি, তাই করো।”

তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে ছেলেটি আর প্রতিবাদ করার সাহস পেল না। ধীর পায়ে কলেজ মাঠের মাঝখানে এগিয়ে গেল। তিতলিও তার পিছু পিছু হাঁটল। পেছন থেকে সাথী অসহায় কণ্ঠে বলে উঠল,

— “দোস্ত, প্লিজ! বেশি কিছু করে বসিস না!”

কিন্তু তখন তিতলিকে থামানোর সাধ্য কারও ছিল না। মাঠের মাঝখানে গিয়ে তিতলি ছেলেটির সামনে দাঁড়াল। চারপাশে ইতিমধ্যেই ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে।সবাই আগ্রহ নিয়ে দেখছে, এবার কী হয়! তিতলি কয়েক মুহূর্ত ছেলেটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,

— “কানে ধরে ওঠবস করো। আর বলতে থাকবে আমি আর কোনো মেয়েকে বিরক্ত করব না। কাউকে অস্বস্তিতে ফেলে প্রেমের প্রস্তাব দেব না। আগে সম্মান করতে শিখব।”

ছেলেটির মুখ মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।

সে বুঝতে পারছিল, মুহূর্তের আবেগে যা করেছে, তার ফল এখন পুরো কলেজের সামনে ভোগ করতে হচ্ছে। আর কোনো উপায় না দেখে সে কানে ধরে ওঠবস শুরু করল। কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগল,

— “আমি আর কোনো মেয়েকে বিরক্ত করব না... কাউকে অস্বস্তিতে ফেলে প্রেমের প্রস্তাব দেব না... আগে সম্মান করতে শিখব...!”

চারপাশে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বিস্ময়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। কেউ চাপা হাসছে, কেউ আবার নিঃশব্দে পুরো দৃশ্যটা দেখছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই শিক্ষার্থীদের ভিড়ের পেছন থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর,

— “এখানে কী হচ্ছে?”

কণ্ঠটা শুনেই আশপাশের পরিবেশ মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যারা ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল, তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরে দাঁড়াতে শুরু করল। আর তিতলি...সে কণ্ঠটা চিনতে এক মুহূর্তও সময় লাগল না।

—“আহিয়ান খান আর্য।”

গম্ভীর কণ্ঠস্বরটি ভেসে আসতেই চারপাশে জমে থাকা শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দু'পাশে সরে দাঁড়াল। ভিড় ঠেলে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে এল আহিয়ান। প্রথমে একবার ছেলেটির দিকে তাকাল, তারপর দৃষ্টি স্থির হলো তিতলির মুখে। তার চোখে কোনো আবেগের প্রকাশ নেই শুধু কঠোরতা।কয়েক মুহূর্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সে সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,

— “তুমি যাও।”

কথাটি ছেলেটির উদ্দেশেই বলা। মুক্তির সুযোগ পেয়ে ছেলেটি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। প্রায় দৌড়ে সেখান থেকে সরে গেল। চারপাশে তখনও অসংখ্য শিক্ষার্থী নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। আহিয়ান ধীরে ধীরে তিতলির সামনে এসে দাঁড়াল।তার কণ্ঠে শিক্ষকের কঠোরতা স্পষ্ট,

— “কলেজে কী করতে আসো তুমি? পড়াশোনা করতে, নাকি প্রতিদিন নতুন নতুন নাটক তৈরি করতে?”

তিতলি নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।আহিয়ান থামল না,

— “একদিন পুরো ক্লাসের সামনে শিক্ষককে প্রেমের প্রস্তাব দাও, আর আজ কলেজের মাঠে আরেকজন ছাত্রকে শাস্তি দিচ্ছ! তুমি কি বুঝতে পারছ, তোমার এই আচরণ কলেজের পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?”

প্রতিটি শব্দ যেন তিতলির বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করছিল। তার গলা শুকিয়ে এলো। সে আস্তে করে বলল,

— “আমি আসলে কেন.....!”

কিন্তু বাক্যটি শেষ করার সুযোগও পেল না।আহিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে, এমন নিচু স্বরে বলল যাতে আশপাশের কেউ শুনতে না পায়,

— “তোমার মতো এত ঝামেলাপ্রিয় একটা মেয়ের সঙ্গে আমার মা কেন সম্পর্ক ঠিক করলেন, সত্যিই বুঝি না। অবাধ্য মেয়ে একটা! আমি যতোই তোমাকে মানিয়ে নিতে চাই ততোটাই তুমি আমার অবাধ্য হও!”

কথাগুলো ছিল ব্যক্তিগত, শুধু তিতলির জন্য।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে স্বাভাবিক গলায়, সবার উদ্দেশে শোনানোর মতো করে বলল,

— “এখন আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে না। সবাই নিজ নিজ ক্লাসে যাও। তিতলি, তুমিও ক্লাসে যাও। ভবিষ্যতে আর কোনো বিশৃঙ্খলায় তোমাকে দেখলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তার দৃঢ় কণ্ঠে আশপাশের শিক্ষার্থীরাও চমকে উঠল। কেউ আর দাঁড়িয়ে রইল না। ধীরে ধীরে সবাই নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষের দিকে চলে যেতে লাগল। তিতলি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর কেউ যেন নিঃশব্দে একটা ভারী পাথর চাপিয়ে দিয়েছে। সে তো নিজের দিকটা বলার সুযোগই পেল না। অপমান, অভিমান আর কষ্ট মিলেমিশে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। অজান্তেই দু'ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে নেমে পড়ল। তবুও সে একবারের জন্যও মুখ তুলে আহিয়ানের দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করেই ধীর পায়ে শ্রেণিকক্ষের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার চলে যাওয়া অবয়বের দিকে অনেকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আহিয়ান।

চারপাশের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেও তার বুকের ভেতরের অস্থিরতা মিলিয়ে গেল না।

সে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল,

“আমি কি... প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কঠোর হয়ে গেলাম?”

চলবে....??

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন