#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৩
"আয়াশ, অহীন আসবে বাড়িতে, আনন্দ কি শেষ আছে?"
কানে ফোন চেপে রেখে কথাগুলো বলছে তাশা, মুখের বাচ্চামো ভাবটা কমেছে বলে মনে হয় না। মায়ায় অপরিসীম মুখশ্রী, ঠোঁটে সব সময়ের মতো হাসি লেপ্টে থাকে, আকাশের কড়া করে আদেশ, সব উল্টে যাক, তার তাশুকে যেন কেউ গলা উঁচিয়ে ধমক না দেয়। অহেতুক রোমানা বেগম ধমকালেও আকাশের থেকে আড়ালই করেছে তাশা, সে জানে আকাশ জানলেই কুরুক্ষেত্র করে তুলবে বাসায়। তাই রোমানা বেগমের কটুক্তিগুলো হজম করে, ঝামেলা এড়িয়ে চলে। শাশুড়ী ওই দুটো কথা বলবেই। ওপাশ থেকে খিলখিল করে হাসার শব্দ আসে,,
"তাশা ছেলেটা একা থাকে, এবার আসলে আশাকে দিয়ে দিও। আমরা চেষ্টা করবো আসার।"
লিজার কথায় স্বল্প উত্তর করে তাশা,
"হ্যাঁ সেটাই ভাবছিলাম আপু, আশা আর অন্তুকে এমনিতেও ফ্রান্স পাঠাবো, যদিও অহীন আছে ওদের ভাই, তবুও আশার একটা শক্ত হাত প্রয়োজন।"
"আয়াশের কাছে গেলে ওর চিন্তা করতে হবে না, পুতুলের মতো যত্নে রাখবে তাকে।"
"সে জন্যই তো দিতে চাই।"
তাদের কথার মাঝে, সিঁড়ি দিয়ে নামছে আশা, সাদা লং থ্রি-পিস, এক দিকে চুলগুলো ছাড়ালো, অন্য দিকে পড়না ঝুলানো। ব্যাগের ভেতর কিছু দেখছে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে ঠিক তাশার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
"আমাকে কিছু টাকা দাও, অন্তুর সাথে মার্কেটে যাবো, ওর নাকি কেনাকাটা বাকি, অহীন আসবে ব্লা ব্লা ব্লা বলল।"
হাতের ফোনটা তাশা তার হাত দিয়ে তুলে যায়, লিজা যেন চাঁদ পেল এত সময় পর। আশা সালাম দিতেই বলে ওঠে লিজা,
"আশা এ কী হাল মুখের? আমার ছেলের বউ এমন করে থাকে? একটু সাজলে না?"
"আন্টি এমনিতেই ভালো লাগবে না আপনার ছেলের আমাকে?"
কপাল চাপড়ে ভ্রুকুটি করে বলে ওঠে লিজা,
"কী বলো তুমি, তুমি পাগলের মতো বসে আছো এমন ছবি দেখেও ওই পাগলকে হাসতে দেখি। আয়াশ কখনো ময়লা ধরত না, কিন্তু তুমি মাটিতে খেললে তোমাকে ঠিক ধরত, আর তুমি যে কী বলো।"
আশা মৃদুস্বরে হেসে বলে,
"তাহলে তো হলোই আন্টি।"
"হলো কী? শোনো এমন করে থাকলে তেমন মুড আসে না, একটু সাজলে সৌন্দর্য বাড়ে তিতু বলে। তার ছেলে তো তার মতোই হবে। তুমি হালকা সাজবে যেন আয়াশ বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে যায়।"
এটা কি ছেলের মা? লজ্জা বলতে আছে আদৌ, আয়াশের মুড আনার ট্রিকস বলে আশাকে, খুক খুক করে কেশে দেয় আশা, মিনমিন করে বলে,
"সে এমনি পাগল বিয়ের জন্য, নির্লজ্জ যে।"
"বউ নিয়ে এত লজ্জা করলে, আর দাদি হতে হবে না, তার চেয়ে বরং তুমিও লজ্জা-শরম ধুয়ে তাশার কাছে দিয়ে যেও।"
এর মধ্যে তাশা চলে এসেছে, হাতে কিছু টাকা নিয়ে, আশার হাতে দিয়ে ফোনটা নিয়ে নিল, ব্যাগে টাকাটা রেখে লিজাকে আর তাশাকে বিদায় দিয়ে বের হয় সে। গভীরভাবে মনের মাঝে মেয়ের সুখ দেখার আশায় দীর্ঘশ্বাস নেয়। লিজার সাথে কথার ঝুড়ি তোলে আবার।
"লিজা আপু আয়াশ আসলে, তোমরা আসবে না?"
"চেষ্টা করবো আসার, সময় কোথায়? তিতুর ঘোরার শেষ নেই জানোই তো। তোমার শাশুড়ী কোথায়?"
"তা ঠিক ভাইয়া তো সখ আর তুমি ছাড়া দিশেহারা। খালামনি কুহুর বাসায়, অহীন আসবে তো তাই।"
______
দীর্ঘ কয়েক বছর পর নিজ দেশের শান্ত বাতাস নাকে এসে লাগছে, যদিও দেশে আসা-যাওয়া লেগেই থাকে। এয়ারপোর্টের বিছানো ঢালাই করা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। চোখে কালো চশমা, হাতে লাগেজ, ঠোঁটে প্রফুল্লতার হাসি। পার্কিং লটে এসে চোখ ঘুরিয়ে চারপাশ দেখেই অহীনের চোখ থামে খুবই আপন পরিচিত মুখের ওপর। ঠোঁটে এক চিলতে হাসি রেখে এগিয়ে যায়। প্রায় কাছে এসেই চেঁচিয়ে ওঠে,
"আব্বুউউউউ।"
অহীনের উৎসুক স্বরে চিৎকার করে আব্বু ডাকটা সামান্য কান এড়িয়ে গেল না অন্তিকের। অহীনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যায়। দু'জন একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে, নিজ সন্তানের পিঠে থাপ্পড় দিয়ে বলে,
"তোমার কি মনে আছে আমি তোমার আব্বু হই?"
অহীন অন্তিকের পেটে হালকা পাঞ্চ করে বলে,
"নো, একটা ভার্জিন ছেলে কখনো আব্বু হয়?"
অন্তিক চোখ রাঙিয়ে দিল একটু, ছেলের মুখে কখনোই কথা আটকায় না। হয়তো কখনো ভুল করে শুনে নিয়েছিল অন্তিকের মুখ থেকে কথাটা, অন্তিক বলে বিরবির করে,
"চুপ করো, তোমার চাচু আছে এখানেই।"
"সো হোয়াট, তোমরা ভাই-ই তো।"
"বেশি কথা না বলে গাড়িতে ওঠো, তোমার মা অপেক্ষা করছে সাথে অন্তু।"
অহীন আকাশকে জড়িয়ে ধরে, কুশল বিনিময় করে নিল, গাড়িতে উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে। অন্তুকে অত একটা পছন্দ নয় অহীনের। নিজের বোন তো কী হয়েছে? ওর জন্যই তো যে বয়সে মায়ের বুকে থাকার কথা, সেই বয়সে মায়ের থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তার। অহীন বলে ওঠে,
"চাচু, তোমরা কি খাও, আমাদের বিয়ের বয়সে তোমাদের পাত্র মনে হয়।"
ড্রাইভিং সিটে আকাশ হো হো করে হেসে দেয়, কী বলবে এই ছেলেকে? তবুও বলে,
"তুমি কি তোমার বিয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছ?"
মাথা চুলকে অন্তিকের দিকে তাকিয়ে, আবার আকাশকে বলে,
"বোঝোই তো সবটা।"
অহীনের মাথায় আস্তে করে থাপ্পড় দিয়ে অন্তিক বলে,
"তোমার বাবারও লজ্জা ছিল। কিন্তু তোমার নেই, এসেই বিয়ে?"
আকাশ ফোঁস করে হেসে দেয়, কয়েকবার অহেতুক হর্ন বাজিয়ে হাসল। তারপর বলে,
"তোমার বাবার এত লজ্জা ছিল যে রাস্তা-ঘাটে বাবা-মায়ের সামনে তোমার আম্মুকে কোলে নিয়ে ঘুরত।"
"ছিঃ চাচু, কী বলো এগুলো, আব্বু এখনো স্টিল ভার্জিন।"
অন্তিক চুপসে গেল, ছেলের মুখে লাগাম নেই বুঝতে বাকি রইল না। সৃজনের মতো লোকের সাথে থেকে এমনও হয়, এটা মিরাকেলের চেয়ে কম নয়। অহীনের মধ্যে নিজেকে কখনোই পায় না সে। অহীন ভীষণ হাসিখুশি একটা ছেলে। সৃজনের মতো কষ্ট কাটিয়ে উঠতে সময় নেয় না। অন্তিক এবার বলল,
"জেসি কবে আসবে? তোমাদের মধ্যে সব ঠিক আছে?"
"হ্যাঁ ঠিক আছে, আশার বিয়ে ঠিক হলে টিকিট কাটবে। আয়াশ কবে আসবে?"
আকাশ উত্তর করে,
"কালকেই এসেছে, আজকে তোমাদের ফ্ল্যাটে আসবে।"
ভ্রু কুঁচকে নেয় অহীন, ফ্রান্স তার সাথেই থেকেছে আয়াশ, তবে জানে না তার সম্পর্কে কিছুই, তাদের ফ্ল্যাটে আসবে কেন বুঝল না। আশার সাথে বিয়ে, ওদের বাড়িতে যাওয়া দরকার,
"আমাদের বাসায়?"
অন্তিক ছেলের ভাব বুঝে বলে ওঠে,
"ভুলে যেও না, সে আমার তোমার তিতাশ আঙ্কেলের ছেলে। তারপর আশার হবু বর।"
বিরক্তি নিয়ে বাইরে তাকায় অহীন, দেশের শীতল বাতাস, নিশ্বাসের সাথে পুরো শরীরকে সতেজ করে তুলছে, কুহুকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। ভাবলেই অবাক লাগে, তাদের মা-বাবা নাকি কোনো এক সময় প্রচুর ঝগড়া করত, কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন।
চলবে...