#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৬
দিন কয়েক কেটে গিয়েছে। অন্তিহা বর্তমানে কুহুর ছায়াসঙ্গী হয়েই আছে। অহীনের পেছনে কুহুর ব্যস্ততা যেন আকাশচুম্বী, কাজের চাপে দম ফেলার ফুরসত নেই তার। এই মুহূর্তে অন্তিহার উপস্থিতি কুহুর জন্য বড় স্বস্তির। মায়ের কাজের ভার কিছুটা কম করতেই সে এখানে রয়ে গিয়েছে।
তবে নীল রাহাত যেন তাকে ছাড়া একেবারেই একা। দীর্ঘ কয়েক বছর তারা সন্তানের আকাঙ্ক্ষা মনে ঠাঁই দেয়নি, কিন্তু পরবর্তীতে যখন সেই ইচ্ছে জেগেছিল, ততদিনে ভাগ্য তাদের বিমুখ করেছে। আরশাদ শিকদার রাতে ঘুমের মাঝেই মারা যান। আর সেই শোক সইতে না পেরে কয়েক বছরের ব্যবধানে শাকিলা বেগমও ইন্তেকাল করেন।
তাদের সেই জীবনে অন্তিহাই ছিল এক চিলতে প্রাপ্তির আলো। তাই তো অন্তিহাকে নিয়ে কুহুর তেমন জোর নেই, অন্তিহাও নীলের সাথে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। রান্না ঘরে আজ কাজ নেই নীলের, আকাশের তরফ থেকে দাওয়াত, আশার বিয়ের ডেট দেওয়া হবে, উপস্থিত থাকতে হবে তাদেরও। গায়ে হালকা কাজের পাতলা সিল্কের একটা শাড়ি জড়িয়েছে নীল, আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিচ্ছে। ডান হাত পেটে চেপে ধরে মেকি হাসে নিজে নিজেই। খেয়াল যখন সম্পূর্ণ পেটে, সে অনুভব করে কারো শীতল স্পর্শ হাতের ওপর দিয়ে পেটে নামছে, ঘাড়ে রাহাতের গরম শ্বাস অনুভব করে এবার সত্যি এক চিলতে হাসি ফোটে।
“নীল এত সাজার কী আছে? আমার যে এখন বের হওয়ার ইচ্ছেটাই নষ্ট হয়ে গেল।”
“বলছেন আমি সাজলে সুন্দর লাগে না?”
ঘাড়ে নাক দিয়ে আলতো ঘষে কানের কাছে হিসহিস করে বলে রাহাত,
“এতটাই সুন্দর লাগে যে ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে এই সাজ নষ্ট করার ইচ্ছে জাগে মনে।”
রাগান্বিত চোখে রাহাতের দিকে তাকায় নীল, নিজের থেকে রাহাতকে দূরে সরিয়ে জুতো পরতে পরতে বলে,
“বুড়ো হয়েছেন, আপনার বডি পার্টসগুলোই নষ্ট হয়ে আছে। আমার সাজ নষ্ট করার প্রসঙ্গ আসে কোথা থেকে?”
রাহাত ওর সামনে গিয়ে সটান হয়ে দাঁড়ায়,
“ভুলে যেও না এখনো আমার সামান্য আলিঙ্গন তোমাকে কাঁদাতে সক্ষম। চলো প্রমাণ দিই।”
“রাখেন আপনার প্রমাণ আপনার পকেটে। ভাবিরা হয়তো অপেক্ষা করছে। আশুর বিয়ে হয়ে যাবে ভাবতেই কেমন কষ্ট হয়। তারপর ফ্রান্স চলে যাবে।”
“বিয়ে তো সবার করতে হবে নীল, কষ্টের কী আছে। মেয়েলোক পরের জন্যই হয়, তাই না?”
নীল মাথা দুলিয়ে হাসে, দীর্ঘশ্বাস নিয়ে রাহাতের হাত ধরে বের হয় বাসা থেকে।
______
সকাল থেকেই কুহু আর তাশার ওপর দিয়ে প্রচণ্ড কাজের ধকল যাচ্ছে। ওদিকে অন্তিহা ব্যস্ত আশাকে সাজাতে। আয়াশের সাজসজ্জা বরাবরই অপছন্দ করে, তার ধারণা, এসব মেকআপে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া থাকে। তাই অন্তিহা তাকে খুব হালকা সাজে সাজিয়েছে। আশার পরনে শাড়ি, যার লম্বা ঝুলন্ত আঁচল ফ্লোর ছুঁয়ে যাচ্ছে। আশাকে তার কক্ষে রেখে অন্তিহা ধুপধাপ পায়ে নিচে নেমে এল এবং মা-চাচিদের কাজে হাত লাগায়। ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির প্রধান ফটক পেরিয়ে প্রবেশ করে অহীন। নীল রঙের শার্ট ইন করা, কবজিতে দামি ঘড়ি, তাকে বেশ পরিপাটি দেখাচ্ছে। এসেই ডাইনিং টেবিলে বসে বেশ হাঁক ছেড়ে সে বলে,
“তোমাদের মেয়ের বিয়ের ডেট হবে অহেতুক আমাকে কেন ডাকা হলো?”
হাতে একটা বাটিতে মাংসের কয়েকটা টুকরো এনে অহীনের সামনে ধরে তাশা,
“কারণ আপনি আমাদের মেয়ের বড় ভাই।”
নাক মুখ কুঁচকে নেয় অহীন, তাশার হাতের বাটি থেকে মাংস তুলে মুখের সামনে নিয়ে বলে,
“কাম অন ছোট আম্মু, অন্তুকে বোন বলি না আর তোমার মেয়ে তো পেঁচি একটা।”
মাংসের টুকরোটা মুখে দিয়ে তৃপ্তিতে চোখ বুজে নিল অহীন, যেন কয়েক বছর পর এটা তার মুখে স্বাদ বাড়িয়ে দিল। তাশার হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অসাধারণ মজা হয়েছে, একটু লবণ লাগবে।”
তাশা রান্না ঘরের দিকে চলে যায়, কুহুকে লবণের কথা বলতেই কুহু জোরে শব্দ করে বলে,
“জেইন তোমাকে দিয়ে খাবার চাখিয়ে এই একটা কাজ ভালো করেছে। বউয়ের রান্নায় খুঁত বের করবে আর ঝগড়া করবে।”
“জেসি তো রান্নাই পারে না, আমারই রান্না করতে হবে ম্যাডামের জন্য।”
“তবে তাকে বিয়ে করতে হবে কেন? আমাকে করে নিন, অহীন ভাই? আমি সব রান্না পারি।”
দরজার কাছ থেকে মেয়েলি কণ্ঠ আসতেই তাকায়, মিষ্টি শ্যামবর্ণের মেয়েটি হাসিটাও মিষ্টি। অহীন হো হো করে হেসে দেয়,
“নাজু তুইও পেঁচির মতো পেত্নী, রান্না না জানলেও চলবে বউ হতে হবে সুন্দরী।”
নুজাইফা গালগুলো একদিকে নিয়ে ভেংচি কাটে,
“নিজেরটা জানি না তবে জেসির থেকে আশু অনেক গুণ বেশি সুন্দর, খালামণির মতো।”
নুজাইফার কণ্ঠ দরজা থেকে শুনে অন্তিহা এক দৌড়ে এসেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর গায়ের ওপর আর চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“তোকে কত বললাম তাড়াতাড়ি আসার কথা? আশুর বিয়ে হয়ে যাবে। আমরা ফ্রান্স চলে যাব।”
নুজাইফা ওকে জড়িয়ে ধরে, সবার সাথে টুকটাক কথা বলে, কুহু এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“নুসাইবা আর সায়র ভাইয়া আসবে না?”
“না পাপার কাজ অনেক, আর মাম তো জানোই সারাক্ষণ ঘুমায়।”
“যা ওপরে আশা বসে আছে হয়তো।”
সবাই চলে যেতেই অহীন ফোস করে শ্বাস নেয়। বিড়বিড় করে বলে,
“জেসিকে নিয়ে সবার এত সমস্যা কেন বুঝি না।”
কুহু বলল,
“সবারটা বাদ দে, আমাদের সমস্যা নেই খুশি থাক অহীন।”
চারপাশে সবাই কাজ আর গল্পে মশগুল। অহীনও কিছুক্ষণ তাশা আর কুহুর সাথে আড্ডায় মেতে রইল। কিন্তু যেই দেখল রোমানা বেগম নিজের ঘর থেকে বের হচ্ছেন, অমনি সে আড়ষ্ট হয়ে তড়িঘড়ি সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে চলে যায়। সে জানে, এই মহিলা সামনে বসলেই আশা আর আয়াশের বিয়ে নিয়ে কথা তুলবেন এবং শেষে বলবেন ‘অহীন, তুই-ই তো আশাকে বিয়ে করতে পারতি।’ এই একঘেয়ে বিয়ের আলাপগুলো শুনতে অহীনের বিন্দুমাত্র ভালো লাগে না, তাই সে সুকৌশলে আড়াল হওয়ার পথটাই নিল।
________
মিষ্টি এক বধূর সাজে চুপচাপ বসে আছে আশা। আয়াশের বাসা থেকে তার দাদু ছাড়া আর কেউ আসার নেই। এ দেশে তার আত্মীয়-স্বজনও নেই বললেই চলে। লিজা আর তিতাসও এখন দেশের বাইরে। নিজের কক্ষের দিকে যাওয়ার সময় অহীন আশার ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দে থমকে দাঁড়ায়। কয়েক পা এগিয়ে গিয়েও সে আবার ফিরে এল। আয়নার সামনে বসে থাকা আশার দিকে তার চোখ যায়। নাজু আর অন্তিহা তাকে নানান কথায় লজ্জায় ফেলছে, আর লজ্জায় লাল-নীল হয়ে যাচ্ছে আশা। অহীন দরজায় দাঁড়িয়ে কিছু সময় ওদের এই নির্মল হাসি মাখা মুখগুলো দেখে নিল। কখন যে তার নিজের ঠোঁটেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে, সে নিজেও জানে না। কক্ষে প্রবেশ করবে ঠিক এমন সময় তার হাতের ফোনটা বেজে ওঠে। ঘরের সবাই অহীনের দিকে ফিরে অবাক চোখে তাকায়, আর অহীন নিজের ফোনের স্ক্রিনে। জেসির কল দেখে তার সেই স্বল্প হাসিটা মুহূর্তেই বিশাল তৃপ্তিতে রূপ নিয়েছে। আশার ঘরে আর ঢোকা হলো না তার, ফোন কানে দিয়ে তড়িঘড়ি করে ছাদের দিকে চলে যায় সে। ঘরের ভেতরে যারা ছিল, তারা বিষয়টাকে বিশেষ গুরুত্ব না নিয়ে আবার ও কথায় মজে।
_____
বেশ কিছু সময় পর নিচ থেকে কিঞ্চিৎ হৈ-হুল্লোড় এর শব্দ আসে। বোঝা যাচ্ছে আয়াশ এসেছে, নাজু অপেক্ষা করল না, ছুটে নিচে যায়। আর অন্তিহা আশার সাথেই বসে রইল। অল্প সময়ের পরই আশার ডাক আসে, নীল আশার কক্ষে প্রবেশ করে, আশার থুতনি ধরে আদর করে দুটো চুমু খায়, নীল বরাবরই অনেক মায়া করে ওদের, ঠিক যেমনটা সবাই ওকে আপন করেছে তেমন-ই ও সবাইকে আপন করে রেখেছে। যদিও সবার মধ্যে অন্তিহার স্থান ভিন্ন।
আশাকে নিয়ে নিচে নামে তারা। সিঁড়ি দিয়ে নিচে প্রতিটি ধাপ ফেলছে আশার বুকে ধুকপুক বাড়ছে। একটু চোখ তুলে তাকাতেই দেখে আয়াশ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে তাকে। আয়াশের পাশে অফ হোয়াইট রঙের শাড়িতে একজন বৃদ্ধা। বয়স বোঝা মুশকিল চোখে মুখে অহংকারের আভিজাত্য। তাদের সামনে এনে আশা বসানো হয়। ভদ্রমহিলার তীক্ষ্ণ চোখের চাহনি বলে দিচ্ছে আশাকে ভালো লাগে না। কিন্তু আয়াশের কারণে হয়তো কিছু বলতেও পারছেন না। কেবলমাত্র আশার সালামের উত্তর দিলেন আর কথা বললেন না। রোমানা বেগম ওনার ভাবসাব তেমন হজম করতে পারলেন না তবুও বিনয়ী আচরণ করে বললেন,
“মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করলে করতে পারেন।”
ভদ্রমহিলা মেকি হেসে আশার দিকে তাকিয়ে, একটু ঝুঁকে আশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন,
“জিজ্ঞেস করার কিছু নেই। আয়াশের পছন্দের বিপক্ষে তো আর যাওয়া যাবে না। যা আছে তাই বহুত, আমার নাতি নিশ্চয়ই ভেবেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
আয়াশ নিচু হয়ে তার দাদুর কানের কাছে ঝুঁকে কিছু একটা বলতেই ভদ্রমহিলা শান্ত হলেন। এরপর লিজা ও তিতাশকে ভিডিও কল দেওয়া হয়। বাড়ির বড়দের উপস্থিতিতে সবাই মিলে আলোচনায় শামিল হয়। সবার মতামতের ভিত্তিতেই বিয়ের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
-------
ছাদের রেলিঙের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ভিডিও কলে কথা বলছে অহীন, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি কিন্তু কপালে কেমন চিন্তার ভাঁজ, জেসি ওপাশ থেকে হেসে হেসে কথা বলছে,
“অহীন জানেন, মম আজ একটা নতুন রেসিপি ট্রাই করেছে। আর ডেডকে সকাল থেকে ওটাই খাওয়াচ্ছে।”
“পাপি ঠিক আছে তো জেসি? তোমার উচিত হেল্প করা আর তুমি গসিপ করছো? মেয়েদের এই স্বভাব বুঝি?”
“ডেড পারেও বটে, বললেই হয় মজা হয়নি, কেন খেতে যায়? আমি খেয়েছিলাম ইয়ু মজা না।”
“তুমি বুঝবে না, বউয়ের হাতে সব অমৃত।”
দুজন-ই খিলখিল করে হেসে দেয়, ফোনের ওপাশে থাকা মেয়েটার জন্য আজ কেমন মায়া হচ্ছে অদ্ভুত রকম দয়া। অহীন জানে না কেন কিন্তু এই হাসিমুখটা মিইয়ে না যায় ভাবতেই কেমন লাগছে। অপর দিকে ভেতরে এক অদ্ভুত চিন্তা! চিন্তার কারণটা এতটাই অদৃশ্য যে ভাবনায়ও আসছে না।
ছাদে কারো উপস্থিতি উপলব্ধি করে পেছন ফিরে তাকায় অহীন। লাজুক ভঙ্গিতে ছাদের দরজা টপকে ভেতরে প্রবেশ করে আশা। তারই পেছনে আয়াশ। তারা হয়তো দেখেনি তাকে। আরও একটু পানির ট্যাংক এর আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায় সে।
ছাদের একটি কোণায় গিয়ে দাঁড়ায় আয়াশ আশা, আয়াশের পকেট থেকে একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলে অনুরোধ করে,
“লিপস্টিকটা মুছে নাও।”
আশা বাক্য ব্যয় করল না একটাও, আয়াশের দিকে তাকিয়ে ওটা মুছতে মুছতে বলে,
“অন্তু জোর করে পরিয়েছে।”
“ইটস ওকে শখ হয়েছে পরেছো। খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে। কিন্তু এই রূপ ভোগ করার কপাল আমার নেই। পুতুল সত্যি আফসোস হচ্ছে।”
হাতের ময়লা টিস্যুটা পাশে ফেলে দিতেই আয়াশ চোখ বুজে বলে,
“ওখানে কেন?”
“আম আসলে।”
ছাদের ফটক পেরিয়ে অন্তিহা তড়িঘড়ি করে ওদের কাছে এগিয়ে আসে। তার হাতে একটা ছোট ঝুড়ি। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে নিজেই ময়লা টিস্যুটা তুলে ঝুড়িতে রাখে এবং সেটা ওদের পাশেই রেখে দেয়। তারপর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে হেসে বলল,
“সরি, মনে ছিল না আমাদের কারো। আম্মু বলল মাত্রই ডাস্টবিনের কথা।”
“ইটস ওকে, কোথাও গেলে আমার এই প্রবলেমগুলো ফেস করতে হয়, অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।”
অন্তিহা আর কথা বাড়ালো না, ওদের একান্তে কথা বলার সুযোগ দিয়ে দ্রুত ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল। আয়াশ পকেট থেকে স্যানিটাইজারের ছোট শিশিটা বের করে আশার দিকে এগিয়ে দিতেই আশা বাধ্য মেয়ের মতো হাতটা স্যানিটাইজ করে। অতঃপর আয়াশের চোখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দেয়। তার ঠোঁটে এক চিলতে ক্ষীণ হাসি। শান্ত স্বরে সে শুধাল,,
“এবার হয়েছে তো?”
“হুম”
আয়াশ এবার এক গাল হেসে আশার দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দেয়। এই প্রথম সে হয়তো তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আশাকে স্পর্শ করতে চাইছে। হাত বাড়িয়ে আঙুলের ইশারায় সে আশাকে নিজের আরও কাছে আসার ইঙ্গিত করে। আয়াশের এমন সরাসরি আহ্বানে আশার লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। নত মস্তকে অতি সংকোচের সাথে সে ঠোঁট নেড়ে বিড়বিড় করে বলে,,
“কাপড়?”
আয়াশ এক ধাপ আগায় আর উত্তর করে,
“বাসায় গিয়ে এমনিতেও শাওয়ার নেব।”
“আপনার কাপড় নষ্ট হবে তো।”
“অন্তু স্যানিটাইজ করে দিয়েছে তোমার ড্রেস আমি জানি। শালিকা আমার বিষয়টা ভালো বোঝে।”
আয়াশ আরও এক ধাপ কাছে এগিয়ে আসে, এবার আর আশা পিছিয়ে গেল না। আয়াশ খুব সাবলীলভাবে আশার হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নেয়। সেই শীতল ছোঁয়ায় আশার শরীর দিয়ে যেন এক প্রশান্তির স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আয়াশ যখন আশার হাত দুটো টেনে নিজের গলার কাছে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই কোনো কিছু পড়ার শব্দে ভয়ে আর চমকে গিয়ে আশা ছিটকে দূরে সরে আসে। আয়াশের শান্ত মুখ বিরক্ত আর কিঞ্চিৎ অবাক হয়। ওদিকে কী হয়েছে দেখার জন্য আশা দ্রুত পানির ট্যাংকের দিকে ছুটে যায়। দেখে তার চোখ ছানাবড়া! পরক্ষণেই সে আতঙ্কিত স্বরে চিৎকার করে,
“অহীন!”
অহীনের হাতের ফোনটা পড়ে আছে, পকেটে কিছু একটা খুঁজে চলেছে অহীন খুবই তড়িঘড়ি করে। কপাল দিয়ে ঘাম পড়ছে টপটপ করে, আশা ছুটে ওকে দুই হাতে আগলে ধরে,
“কী হয়েছে অহীন?”
কাঁপা গলায় অহীন বলে,
“সুগার লেভেল লো।"
অবাক না হয়ে পারল না আশা! বড় বড় চোখে তাকিয়ে অহীনকে ট্যাংকের সাথে বসিয়ে দেয়। অহীন সরিয়ে দিচ্ছে তাকে বারংবার, আয়াশ এগিয়ে আসতে চাইলে আশা দিল না আগাতে, সে জানে আয়াশ অহীনকে ধরলে আর এক বিপদ হবে। অহীনকে বসিয়ে অহীনের প্যান্টের পকেটগুলো খুঁজে রুষ্ট কণ্ঠে বলছে,
“পাগল তুমি? কে বলেছে এই রোদে ছাদে আসতে? আর যখন খারাপ লাগল তখন কেন নামলে না? নাস্তা করোনি নাকি? টেবলেট কই?"
অহীন মাথা নেড়ে না বুঝায়, পকেট থেকে খুঁজেও কিছু পেল না আশা। উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে সিঁড়ির দিকে যায়। নিচে নেমে সোজা রান্না ঘরে প্রবেশ করে। মেহমান যে এত ঘর ভর্তি তাতে খেয়াল নেই। মা ও ফুপিকে উদ্দেশ্য করে রুক্ষভাবে বলে,
“অহীনকে নাস্তা দাওনি তোমরা? জানো তো ওর লো সুগারের প্রবলেম।”
নিজের হাতেই এক বাটি পায়েস নিয়ে আবারও সিঁড়ির দিকে আগায়, কুহু অন্তিহা চিন্তিত হয়ে ওর পিছু যায়। অহীনের ঠিক সামনে গিয়ে দেখে হাতে চকলেট। আশা আয়াশের দিকে তাকায় গম্ভীর স্বরে বলে,,
“তোমার জন্য এনেছিলাম।”
আশা মুচকি হাসে, অহীনের হাতের চকলেটটা নিয়ে, চামচ দিয়ে মুখের সামনে পায়েস ধরে, এবার প্রচণ্ড ক্রুর স্বরে বলে,
“তুই কুত্তা, খেতে পারিস না? ও তোর জেসির সাথে প্রেম করতে এসেই খাওয়া-দাওয়া ভুলে গিয়েছিলি?”
শরীর একটু ভালো লাগতেই অহীন বিরক্তি নিয়ে বলে,
“পাকামি করবি না, সকাল থেকে তোর মেহমান আসবে বলে আব্বু আর ছোট আব্বুর সাথে বাজারে ছিলাম। তোর মতো প্রেমিকা নিয়ে,,"
সবাই ওখানে উপস্থিত হয়, অহীন চুপ হলো তাদের দেখে। আয়াশ চুপ করে দেখেই যাচ্ছে। অহীনের এত নিকট আশাকে মানতে একটু কষ্ট হচ্ছে, তবে অহীন অসুস্থ এটাও বুঝতে হবে। অহীনকে অন্তিক আকাশ ধরে তুলে রুমে নিয়ে আসে। কুহুর কথার শেষ নেই অন্তিকের উদ্দেশ্যে। একই সাথে নিচে চলে যায় কুহুও। অহীনকে খাবার দিতে হবে এখন। আয়াশ আর আশা আবার একা হয়, আশা অনুশোচনার স্বরে বলে,
“সরি, প্রতিবার আপনি আসলেই কিছু না কিছু একটা হয়ে যায়।”
আয়াশ মৃদু হাসে, অল্প স্বরে বলে,
“নিচে চলো, এই বাধা আর সহ্যের মতো নয়। শুক্রবারেই তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব। রাজি নাকি আরো সময় চাই?”
আশা একটু হাসে, যাতে আয়াশ সম্মতি পেয়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আয়াশ নিচে নামে। এই সব দেখে আশা একটা বিষয় বেশ বুঝল তাকে নিয়ে অনেক ধৈর্যশীল আয়াশ।
চলবে....💖