#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৭
আশার বিয়ের ডেট দেওয়া হয়েছে শুক্রবার, অহীন বা অন্তিহা আর বাড়ি ফিরল না। যথারীতি তাশা ফিরতে দিলই না তাঁদের, কয়েকটা দিন কুহু, অন্তিক ও শিকদার বাড়িতেই থাকবে। সাময়িক সময়ের জন্য নিজ বাড়ি গিয়েছে সবার প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে। অন্তিক-কুহুর কক্ষটাই অহীনের হয়েছে এখন। সন্ধ্যা প্রায় ৬টা, ক্লান্ত শরীর বালিশে এলিয়ে শুয়ে আছে। একটু আগেই সৃজনের সাথে কথা হলো। লোকটা অনেক বেশি বকাঝকা করে অহীনকে। না খেয়ে থাকাটা যে অহীনের জন্য ঠিক না, এটা অহীন বোঝে না। দরজায় কারো ঠকঠক শব্দে ভাবনা থেকে বের হয় অহীন, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে অনুমতি দেয় আসার,,
“দরজা খোলা, ভেতরে এসো।”
হাতে সাদা রঙের কফির মগ নিয়ে আশা প্রবেশ করে, পরনে সেই সকালের শাড়িটা এখনো জড়ানো। ধীরগতিতে অহীনের সামনে গিয়ে পাশেই কফির কাপটা রাখে। অহীনের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে বলে,
“তুমি জানো মাথা ঘুরে পড়ে যাবে, তবে কেন না খেয়ে থাকো? তোমার পকেটে না ছিল চকলেট, না ছিল ট্যাবলেট। আর চিরকুট কই?”
আশার চোখের দিকে চোখ রেখে তাকায় অহীন। ঠোঁটে এখন লিপস্টিক নেই, কাজলগুলো চোখের কার্নিশে একটু লেপ্টে আছে। সে আনমনেই উত্তর করে,
“সকালে গোসল করে তাড়াহুড়ো করে বের হয়েছিলাম। মনে ছিল না কিছু রাখতে।”
“মনে থাকবে তো তখন যখন কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য জেসিকে মন থেকে বের করবে!”
কথাটা বলে আশা অহীনের পাশে থাকা ড্রয়ার থেকে খাতা-কলম বের করে ওটায় কিছু লিখে অহীনের বুক পকেটে গুঁজে দিয়ে বলে,
“এটা যেন আর না হারায়। এই বয়সে ডায়াবেটিস রোগী হয়ে আছো। বুঝি না বিয়ের পর তোমার কী হবে।”
আশার হাতটা সরে যেতেই অহীন সোজা হয়ে বসে, জিভ দিয়ে গাল ঠেলে বলে,
“তোর মনে হয় না ডায়াবেটিস অন্ততপক্ষে ওসিডি থেকে ভালো? বেচারি হাত স্যানিটাইজ করতে করতে তোদের রাত শেষ হয়ে যাবে।”
আশার শান্ত কোমল মুখে সামান্য রাগ প্রকাশ পায়। কোমরে হাত দিয়ে বড় বড় চোখ করে তাকায় অহীনের দিকে। একটু ঝাড়ি দিয়ে বলে,
“লজ্জা কর কুত্তা, ছোট বোনের রোমান্সের দৃশ্য ট্যাংকের পেছনে দাঁড়িয়ে দেখিস।”
“ওই পেঁচি থাম। তোর এসব ননসেন্স মার্কা কথাবার্তা। আমি জেসির সাথে কলে ছিলাম। বের হওয়ার সময় তোদের ওসব ক্রিঞ্জ কথাবার্তা দেখে গা গুলিয়ে যাচ্ছিল। আর বড় ব্যাপার হলো আমি তোর বড় ভাই, লজ্জায় বের হতে পারছিলাম না।”
“এমন ভাবে বলছো যেন আমরা ওখানে আহামরি কিছু করছিলাম।”
“তো? তোদের বিয়ে হয়নি, যা করছিলি তাই অনেক। আর ওর সাহস হয় কী করে তোকে জড়িয়ে ধরার জন্য আহ্বান করে?”
থতমত খায় আশা। আয়াশ তো মুখেও বলেনি জড়িয়ে ধরার কথা, তার মানে অহীন দেখেছে সবটা। ক্রুদ্ধ হয়ে বলে আশা,
“এবার বেশি হচ্ছে অহীন, এসব আমাদের পার্সোনাল বিষয়, তুমি কিছু বলতে পারো না এমন ভাবে।”
“কী বললি তুই?”
“বলেছি... তুমি...”
শেষ করতে পারল না আশা কথাটা আর। অহীন নিজের পেছনের বালিশটা আশার মুখে ছুড়ে মারে। তেতে ওঠে আশা। বালিশ তুলে সেও অহীনের মুখে মারে। দৌড়ে বের হতে নেবে, তার আগেই অহীন নেমে আশার লম্বা খোলা চুল নিজের মুঠোয় নিয়ে খামচে ধরে। ব্যথায় ককিয়ে ওঠে পঞ্চবিংশতী মেয়েটি। চুল ধরে টেনে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে আশাকে অহীন, কানের কাছে গিয়ে হিসহিস করে বলে,
“আমি এই বংশের বড় ছেলে, সবার বিষয়ে কথা বলার সাহস আমি রাখি। আগে বিয়ে করে বিদায় হ, তারপর সব অধিকার তুলে নেব। পেঁচির বাচ্চি।”
কথাটা বলে আশাকে ছেড়ে দূরে সরে আসে অহীন। এদিকে ছাড়া পেয়ে নিজের চুল ঠিক করে আশা। অহীনকে কি ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে সে? অহীনের পেছন থেকে গিয়ে বাবরি চুলগুলো দুই হাতে খামচে ধরে। হঠাৎ আক্রমণে ভড়কায় অহীন। আশা এক হাতে ওর চুল, অন্য হাতে ঘুষি দিচ্ছে শরীরের রাগ ও আশ মিটিয়ে। নিজেকে ছাড়ানোর পায়তারা করছে অহীন, তবে আশা পেছনে হওয়াতে পারছে না। আশা চেঁচিয়ে বলে ওঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে,,
“বংশের বড় মেয়ে তো আমিও। তোর সাহস কত বড় তুই আমাকে মারিস? তুই পেঁচা, তোর চৌদ্দ গুষ্টি পেঁচা।”
“পেঁচি দেখলি তুই-ই স্বীকার করলি তুই আমাদের গোষ্ঠীর না। নয়তো তুইও পেঁচি হতি।”
“তুই তো কুত্তা।”
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মুখ থুবড়ে দুজন বিছানায় পড়ে, তবুও থামার নাম নেই দুজনের। একজন অপরজনের চুল ধরে টানছে। অহীন ধাক্কা দিয়ে আশাকে নিজের নিচে ফেলে দেয়, ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস নিচ্ছে বড় বড়,,
“তোর ওই ওসিডি রোগীর চেয়ে আমি তো ভালোই। অন্তত কথায় কথায় স্যানিটাইজার ধরিয়ে দিই না কারো হাতে।”
অহীনের শার্টসহ বুকে খামচি দিয়ে নখ গেঁথে দেয় আশা,,
“তোর চেয়ে অনেক ভালো আয়াশ ডায়াবেটিস রোগীদের হরমোনে বিশেষ সমস্যা থাকে। পুওর জেসি, বেচারি ছোট একটা মেয়ে। তোকে বিয়ে করে জীবনটা নষ্ট হবে মেয়েটার।”
অহীনের অপমান বোধ হলো খুব। থ মেরে গেল একটু সময়ের জন্য। সুযোগে ওকে ধাক্কা দিয়ে উঠে বসে আশা। বাইরে থেকে এবার তাশার ক্রুর স্বর ভেসে আসে,,
“আশা-অহীন আবার ঝগড়া করছিস তোরা? অন্তু কই?”
আশা অহীনের বিছানার পাশে পড়ে থাকা কফির মগটার দিকে গিয়ে এক দলা থুতু দিয়ে ছুটে দরজার দিকে যায়। তবে দরজা পার হতে পারল না মেয়েটা, আবারও টান পড়ে লম্বা খোলা চুলে। এক হাতে চুল ধরে, অপর হাতে মুখ চেপে ধরে রুমে নিয়ে আসে, পায়ের সাহায্যে দরজা ভিড়িয়ে দেয়। হিসহিস করে বলে,
“কত বড় সাহস পেঁচি তোর! এত বড় কথা তার ওপর আমার কফি নষ্ট করে দিলি? তোকে এত সহজে ছাড়ব ভাবলি কেমন করে?”
আশা গোঙাচ্ছে ছোটার জন্য, হাত-পা ঝাপটাচ্ছে। অহীনের এত সময়ের নরম আচরণটা আর নেই, শক্তি দিয়ে আশাকে আটকে নিয়েছে। আশার হাত দুটো এক হাতে শক্ত করে ধরে, অপর হাত দিয়ে ড্রয়ার থেকে সেলোটেপ বের করে। এই ফাঁকে আশা চেঁচিয়ে ওঠে,,
“ছাড় কুত্তা, আমি বড় আব্বু আর ফুম্মিকে সব বলব।”
আর বলতে পারল না, মুখটা বন্ধ করে দেয় অহীন টেপ দিয়ে। পেছনে লম্বা ঝুলে থাকা আঁচল দিয়ে আশার হাত বেঁধে দেয় শক্ত করে। আশা এবার পা দিয়ে প্রতিবাদ করছে অহীনের। হঠাৎ অহীন আশাকে কাঁধে তুলে নেয়। ফলে আশার লম্বা চুলগুলো অহীনের হাঁটুর কাছে বিছিয়ে আছে। অহীন তাকে নিয়ে ওয়াশরুমের ভেতরে প্রবেশ করে। বিশাল বাথটাবের মধ্যে একপ্রকার ছুড়ে ফেলে দেয় সে। ফলে ব্যথায় গুঙিয়ে ওঠে আশা। বাথটাবের ট্যাপ ছেড়ে অহীন কটাক্ষ করে বলে,
“চু চু চু, ওই স্যানিটাইজারকে বিয়ে করবি, ভালো করে পরিষ্কার হয়ে নে। আমার লক্ষ্মী বোনটি, উলে লে লে।”
বাথটাবের পানি আশার পেট অব্দি পৌঁছাতেই ট্যাপ বন্ধ করে অহীন। এগিয়ে গিয়ে পানিতে হাত দিয়ে আশার পাগুলো ধরে নিজের পরনের শার্ট খুলে বেঁধে দেয় যেন নড়তে না পারে। অতঃপর বাথটাবের ওপর ঝুঁকে কয়েক দলা থুতু দিয়ে হো হো করে দানবের মতো ভয়ংকর হাসি দেয়। আশার এবার ঘৃণা হয় প্রচুর, শরীর প্রচুর নাড়ছে, তবে বাঁধা অবস্থায় কিঞ্চিৎ নড়তে সক্ষম হলেও বাঁচতে না। অহীন আশার একদম নিকটে যায়। চোখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে হিসহিস করে বলে,
“পুওর আয়াশ, নিজে স্যানিটাইজার হয়েও তোকে আমার থুতুর পানি নিয়ে গোসল থেকে বাঁচাতে পারল না।”
আশার রাগ ও ঘৃণায় চোখ-মুখ উল্টে আসছে। অহীন তাকাল না আর ফিরে। কণ্ঠে দুষ্টু হাসি রেখেই গাইতে গাইতে বের হয়ে যায় অহীন,,
“পুত কইরা দিমু আমি, পুত কইরা দিমু
পুত কইরা দিমু আমি, পুত কইরা দিমু।।
পুত কইরা দিলে তোরা ধ্বংস হইয়া যাবি
কব্বরে গিয়া কোরমা-পোলাও রাইন্ধা খাবি।”
জ্বীব দেখিয়ে অহীন বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল অহীন। আলমারি থেকে নিজের অন্য একটা শার্ট বের করে গায়ে জড়িয়ে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। আশার গোঙানির শব্দ আসছে বাথরুম থেকে। অহীন কানে ইয়ারফোন গুঁজে ফোনে মন দেয়। আশা মস্তিষ্কের বাইরে কখন চলে গেল হয়ত তার আন্দাজ নেই। চোখ বুজে আসে তার।
চলবে..