#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৮
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে ঘড়ির কাঁটায় ১০টা, পুরো বাড়ি অন্ধকার শুধু ড্রয়িং রুম আর কিচেনের লাইট টিমটিমে আলো জ্বলছে। কুহু অন্তিক সবে মাত্র বাসায় প্রবেশ করল। কুহু ক্লান্তি নিয়ে সোফায় বসেই হাঁক ছাড়ে,
“আশু, অন্তু, পানি দাও।”
রান্নাঘর থেকে তাশা হাত মুছতে মুছতে বের হয়, টেবিলের ওপর থেকে পানি নিয়ে কুহুর দিকে এগিয়ে যায়, মেয়েদের পরিবর্তে তাশাকে দেখে একটু অদ্ভুত অনুভূতি হয় মনে। তবুও পানিটা খেয়ে নিল। তাশার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছোড়ে,
“আশা আর অন্তু কই? তাইয়ানের পরীক্ষা কেমন হলো?”
সিঁড়ি দিয়ে নামছিল তাইয়ান, কুহুর প্রশ্নের উত্তরটাই দেয় সে,
“ফুম্মি অনেক ভালো ছিল। আমি বলি কি আমাকেও ফ্রান্সের টিকিট কেটে দাও।”
অন্তিক হাসে, তাইয়ান কাছে আসতেই হাতের গাল বেচিয়ে ধরে বগলের নিচ দিয়ে, বিড়বিড় করে মজার ছলে বলে,
“সব চলে যা তোরা আর আমরা তো বানের জলে ভেসে যাই এক দিকে।”
তাইয়ান মুখ ভেঙিয়ে বলে,
“বড় আব্বু নাটক করো না, তোমরা একাই থাকো, আব্বু আম্মু আর তোমার ফুম্মির একাই ভালো কাটে দিন। আমরা এতটাও ছোট না যে বুঝি না।”
কুহু তাইয়ানের বাহুতে হাত মেরে বলে,
“পেকে তালের বিচি হয়ে গেছে, পাঠিয়ে দাও একেও।”
আকাশ একটি কক্ষ থেকে বের হতে হতে বলে,
“পরের বছর পাঠিয়ে দেবো। ফিন্যান্সিয়াল অবস্থাটাও দেখতে হবে।”
অন্তিকের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে তাইয়ান সোজা হয়ে বসে, অনেকটা সময় অন্তু বা আশাকে আসতে না দেখে অন্তিক বলে,
“মেয়েগুলো কোথায়?”
তাশা বলল,
“উপরে সেই সন্ধ্যায় গিয়েছে, নামলো না আর।”
অন্তিক এবার জোর গলায় ডাকে,
“অন্তু, আশু এখানে আসো।”
অন্তিকের ডাকে অন্তিহা তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে, আশা আসলো না, সে নামতেই অন্তিকের কাছে গিয়ে বসে, ওকে আশার সম্পর্কে বলার আগেই সে বলে,
“ছোট আম্মু আশা কি তোমার রুমে ঘুমিয়েছে? সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছি আমি উঠে দেখি নেই কোথায় আশা?”
অন্তিহার এহেন প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খায় উপস্থিত সকলে, তাশা চিন্তিত স্বরে মেকি হেসে বলে,
“আশা তো নিচেই নামেনি সন্ধ্যার পর।”
“মনে হয় দাদুর রুমে আছে আমি দেখে আসছি ওয়েট।”
অন্তিহা উঠে যায় রোমানা বেগমের কক্ষের দিকে, লাইট অফ করে রেখেছে, রোমানা বেগমের খাওয়ার সময় প্রায় ৮টার মধ্যেই, তিনি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন ৯টার মধ্যে। অন্তিহা লাইট অন করে। রোমানা বেগম নাক মুখ কোঁচকান আর বিরক্তি নিয়ে বলেন,
“মেয়েটা হয়েছে মায়ের মতো ধিঙ্গি, ঘুমাতে দে।”
“বুবু আশা এসেছে তোমার কাছে?”
“আশা থাকলে তো দেখতি, নাকি কাঁথার নিচে তোর দাদার বদলে ওকে লুকিয়েছি?”
“ধুর বুড়ি।”
অন্তিহা একরাশ বিরক্তি ও হতাশা নিয়ে বের হয় কক্ষ থেকে, ড্রয়িং রুমে এসে সবাইকে আশার কথা বলতেই সবার ভাবভঙ্গি পাল্টে যায়, তাশা একটু জোরে ডেকে বলে,
“আকাশ আশা আপনার সাথে?”
আকাশের থেকেও হতাশাজনক উত্তর পেল তারা, সবার মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে, অন্তিক বলে,
“দেখো ওয়াশরুমে হবে হয়তো। এত চিন্তার কিছু নেই, বাড়িতেই থাকবে।”
কুহু ফোঁস করে বলে,
“দেখো কোথায়।”
সে নিজেও উঠে দাঁড়ায় আশাকে খুঁজতে। বাড়ির ছাদ থেকে শুরু করে রান্নাঘর, এমনকি শোবার ঘরের কোণগুলোও বাদ রাখল না কেউ। বিরামহীনভাবে আশার নাম ধরে ডেকে চলেছে সবাই, কিন্তু কোনো দিক থেকেই কোনো সাড়াশব্দ আসছে না। হট্টগোল শুনে আকাশও কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসেছে সেই কখন। মেয়েটির জন্য সবার চোখেমুখে এখন দিশেহারা চিন্তা।
“অহীনের সাথে হতে পারে?”
অন্তিকের কথায় সবাই একটু ভাবান্তর হয়, অহীনের সাথে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ওরা একসাথে হলে অহেতুক তর্ক করে। অন্তু বলে ওঠে,
“ওখানে ন..”
“দেখতে সমস্যা কী? হতে পারে অহীনকে বলে বের হয়েছে!”
অন্তিহার আগেই তাশা কথাটা বলল। তাশার কথায় সবাই স্বল্প সম্মতি দেয়। অন্তিক অহীনের কক্ষের দিকে যায় আর বাকিরা বাইরে ও ছাদে। অহীনের দরজার সামনে গিয়ে প্রথমে আস্তে করে ডাকে,
“অহীন দরজা খোলো, আশা আছে এখানে?”
ভেতর থেকে শব্দ এলো না, অন্তিক এবার একটু জোরে ডাক দেয়,
“অহীন দরজা খোলো।”
দরজায় শক্ত হাতের বাড়ি পড়ছে বারবার। তবে ভেতর থেকে শব্দ আসছে না। আসবেই বা কেমন করে কানে এয়ারফোন গুঁজে রেখেছে যে অহীন। ওপাশ থেকে শব্দ না পেয়ে অন্তিকের মেজাজ বিগড়ায়, চোয়াল শক্ত করে কপালে রাগ দৃশ্যমান হয় তার। দরজায় আরো জোরে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে ডাকে,
“অহীন তুমি কি বেঁচে আছো আদৌ?”
অন্তিকের রুক্ষ কথাগুলো কুহুর কানে যেতে সময় নিল না। দূর থেকেই ধমকের স্বরে বলে,
“কী বলছো এগুলো অন্তিক? হয়তো ঘুমাচ্ছে। তুমি যাও আমি ডাকছি ওকে।”
অন্তিকের কাছে এসে ওকে সাইড করে দরজায় হাত দিতেই খট করে দরজা খুলে যায় অহীনের, চোখ মুখপানে ঘুম স্পষ্ট, সে অস্পষ্ট স্বরে জিগ্যেস করে,
“কী হয়েছে?”
রাগে ফেটে পড়া অন্তিক দাঁতে দাঁত চেপে চরম আক্রোশে ফেটে যাচ্ছে,
“দুনিয়ায় আছো তুমি? সন্ধ্যা থেকে আশার কোনো খোঁজ নেই, আর তোমার কোনো হুঁশই নেই?”
অহীন যেন আকাশ থেকে পড়ল। কিছুটা তাচ্ছিল্য আর বিরক্ত মেশানো কণ্ঠে সে উত্তর দিল,
“আমার তাতে কী? আয়াশের সাথে দে...”
কিন্তু বাক্যটি শেষ করার আগেই বিদ্যুৎবেগে তার মস্তিষ্কে আশার কথা খেলে। মস্তিষ্কে সন্ধ্যার কথা আসতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে অহীনের। আতঙ্কে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে নিজের কপালে সজোরে এক চড় বসিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
“ও শিট!”
সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। কোনো কিছু না ভেবেই পাগলের মতো নিজের বাথরুমের দিকে ছুটে যায়। তার এমন অদ্ভুত কাণ্ড দেখে অন্তিকও হতভম্ব হয়ে পিছু নেয়।
বাথরুমের দরজাটা হ্যাঁচকা টানে খুলতেই অহীন পাথর বনে গেল। সামনের দৃশ্য দেখে তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমশীতল স্রোত বইছে। ভেতরে আশা তার পুরো মুখটা ফ্যাকাশে, রক্তের সবটুকু আভা শুকিয়ে গিয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পাতাগুলো ফুলে বীভৎস হয়ে আছে। মেয়েটি চোখ বুজে নিথর হয়ে পড়ে আছে। সে কি আদৌ বেঁচে আছে নাকি নেই, তা বোঝার উপায় নেই। অহীন তড়িঘড়ি করে আশার কাছে গিয়ে বরফশীতল পানির ভেতর থেকে তাকে পাঁজাকোলে তুলে নেয়। ভয়ে এবং অনুশোচনায় অহীনের কণ্ঠস্বর বুজে আসছে। সে অস্ফুট স্বরে বারবার বিড়বিড় করতে থাকে,
“আই এম সরি।”
অহীনের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তিক আতঙ্কে পাথর হয়ে গেছে, মুখ দিয়ে কোনো শব্দ সরছে না। কুহুর যেন কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছে সে অহীনের কাছে এসেই হাজারো প্রশ্নে তাকে জর্জরিত করে তোলে কেন এখানে আশা? কী হয়েছে? অন্তিক আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, এক ঝটকায় অহীনের কোল থেকে নিথর আশাকে ছিনিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
তার চিৎকারে আকাশসহ বাড়ির সবাই তটস্থ হয়ে ছুটে আসে। নিজের প্রাণের টুকরো মেয়ের এমন ফ্যাকাশে আর বীভৎস মুখ দেখে তাশা নিজেকে সামলাতে পারল না। বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে সে অন্তিকের সাথে পা মিলিয়ে। আশার কপালে আলতো হাত রেখে হাহাকার করে তাশা,
“কী হয়েছে ওর? ভাইয়া, ও কোথায় ছিল এতক্ষণ?”
অহীন আর কুহুও তাদের পিছু পিছু ছুটে আসছে। আকাশ কোনো প্রশ্ন করল না কারণ এখন আশাকে হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন। সে দ্রুত বাইরে গিয়ে গাড়ি বের করে। অন্তিহাকে বাড়িতে তাশার কাছে রেখে কুহুও সাথে যায়। কিন্তু মেয়ের ওই নিস্প্রাণ মুখচ্ছবি তাশার সহ্যশক্তির সীমা ছাড়াল। মাথা ঘুরে সে মেঝেতে ঢলে পড়ে। অহীন তড়িঘড়ি করে তাশাকে জাপটে ধরে তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরে যায়।
অহীন অন্তিহাকে বলে নিজেও বাইক নিয়ে বের হয় বাড়ি থেকে।
_____
হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে আশা, আকাশ ও অন্তিক অপেক্ষা করছে করিডোরে। কুহু ভেতরেই আছে। আকাশের সাথে কথা বলার মুখ কি আর রয়েছে অন্তিকের। ডাক্তার বলেছে তেমন সমস্যা নেই, অনেকটা সময় পানিতে থাকায় ভয় ও আতঙ্কে জ্ঞান হারিয়েছে। পানি ঠান্ডা হওয়াতে রক্তচাপ কমে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। কপালে হাত দিয়ে আকাশ বসে আছে দেয়ালে হেলান দিয়ে। অন্তিকের উদ্দেশ্যে বলে সে,
“ছেলেমেয়েগুলো এমন বিপদ বাঁধায়!”
অহীনের কাজে অনুশোচনায় ভুগছে অন্তিক। আকাশের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে বলে,
“আকাশ, ক্ষমা কর ভাই। এটা বাড়াবাড়ি হয়েছে অহীনের দিকটা আমি দেখবো।”
“বাদ দে, বাচ্চা মানুষ, এই বয়সে এমন করবেই। আশার বিয়ে হয়ে গেলে ওরই কষ্ট বেশি হবে।”
এরই মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করে অহীন, আকাশ অন্তিককে করিডোরে বসে থাকতে দেখে ওদের কাছে যায়,
“ছোট বাবা।”
অহীনের চোখে স্পষ্ট কাতরতা দেখা যাচ্ছে। অন্তিক তাকালো না উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত হাতে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় অহীনের সাদা তুষারের মতো গালে। থাপ্পড় হঠাৎ পড়াতে টাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে যায় অহীন, দুই কদম পিছিয়ে যায়। আকাশ উঠে অহীনকে শক্ত হাতে জাপটে ধরে অন্তিককে শাসায়,
“অন্তিক এটা হাসপাতাল।”
অন্তিক বরাবরই রগচটা স্বভাবের, এতগুলো বছরে রাগ কমেছে বলে মনে হয় না একটুও। অন্তিক রক্তিম চোখে চেয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে,
“কমনসেন্স আছে? দুষ্টুমি বুঝিস না করিস কেন? সুস্থ মেয়েটা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে।”
“আব্বু তখন তো ও-ই আমা..”
অন্তিক এর আগে এবার অন্য হাত তোলে অহীনের গালে, কুহুর হুট করে আগমন খেয়াল করেনি তারা। তাইতো এবারও বাঁচাতে সক্ষম হলো না আকাশ। কুহু রাগ দেখিয়ে ধমকের স্বরে বলে,
“ও যা-ই করুক। তার জন্য এমন ৪ ঘণ্টা তুমি পানিতে ফেলে রেখে ঘুমাবে? মরে যেত একটু পরে গেলে। রক্তচাপ কমে একদম সাদা হয়ে গিয়েছিল। দিন নয় রাতে পানি ঠান্ডা থাকে অহীন।”
অহীন চুপ করে আছে, মুখে চাপা রাগ, আকাশ কুহুকেও ধমক দেয়,
“হয়তো আশাও তেমন কিছুই করেছে। থাম তোরা প্লিজ, এটা বাড়ি নয়, হাসপাতালে কোনো রকম সিন ক্রিয়েট করিস না।”
আকাশের কথায় অহীন মাথা দুলিয়ে বোঝায়, আশাও কম নয়। মনে হাজারো দ্বিধা রেখে অহীন প্রশ্ন করে,
“আশু এখন কেমন আছে?”
অন্তিকের রাগে যেন ঘি ঢালছে অহীনের কণ্ঠ। তেড়ে আসতে নিতেই আকাশ থামিয়ে দেয়, অহীনের দিকে তাকিয়ে নিচু ও গম্ভীর স্বরে বলে,
“এখন ভালো আছে।”
“জ্ঞান ফিরেছে।”
_____
ঘণ্টা প্রায় পেরিয়ে গেছে, অহীনকে একটি বারের জন্যও আশার সাথে দেখা করতে দেয়নি অন্তিক। আকাশ যতই তার পক্ষে থাকুক আশাতো তার মেয়ে। অহীনকে যেতে না দেওয়ায় তেমন প্রতিবাদ করল না। করিডোরে চুপচাপ বসে আছে অন্তিক, তাশা অসুস্থ হওয়াতে আকাশের যেতে হয়েছে বাড়িতে। কুহু আর অন্তিক থাকায় তেমন চিন্তা নেই। কুহু আশার সাথেই আছে ইতোমধ্যে চিন্তিত মুখে হাসপাতালে আসে আয়াশ। মুখে একরাশ চিন্তা ও কাতরতা। অহীনের দিকে তাকালো না সে। অন্তিকের সামনে যেতেই শীতল হাসে অন্তিক, উঠে হালকা কুশল বিনিময় করে আয়াশকে আশার কেবিন দেখিয়ে দেয়, এতে যেন অহীনের রাগ বাড়ল বই কমলো না। অন্তিক আয়াশকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“তোমাকে কে বলল?”
“চাচু সন্ধ্যা থেকে পুতুলকে কল করছি, রিসিভ করছে না। অন্তুকেও করেছি রিসিভ করেনি। লাস্ট বার অন্তু বলল।”
“আচ্ছা দেখা করে আসো।”
আয়াশ কেবিনে প্রবেশ করতেই কুহু বের হয়ে আসে, অহীন বেশ অসন্তুষ্ট হয় এতে। বিড়বিড় করে বলে,
“বিয়ে হয়নি একা ছেড়ে দিয়েছি। ওনারা মনে হয় ২০৭০ এ বসবাস করছেন। মডার্ন প্যারেন্টস।”
ধীর পায়ে আশার কেবিনে প্রবেশ করে আয়াশ, পিটপিট করে চেয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে আশা। আয়াশের দিকে চোখ নামিয়ে একটু হাসে, আয়াশের হাতে আজ গ্লাভস, আশার মাথায় আলতো করে আদর বুলিয়ে দেয়, একটু ঝুঁকে জিগ্যেস করে,
“তোমরা দুই কাজিন কি পাগল? দুষ্টুমির একটা লিমিট রাখতে হয় পুতুল।”
আশা চোখ ফিরিয়ে নেয়। আশার হাতে ক্যানুলা সেট করা, আয়াশ বসলো না, হাতটা স্পর্শ করে বলে,
“আশু, এমন কারো সাথে মজা করতে নেই, যার সাথে আমাদের বিপদ হয়। অহীন খারাপ তা বলছি না। কিন্তু আজকেরটা বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে গেল না?”
আস্তে করে উত্তর দেয় আশা,
“ও তো অসুস্থ, হয়তো ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। নয়তো আমাকে এমন করে পানিতে রেখে এসে থাকতো না।”
“স্বাভাবিক তুমি তোমার ভাইয়ের পক্ষেই থাকবে। যদিও বিপক্ষ দল তুমি নিজেই।”
আশা একটু হাসে, সাথে আয়াশ। আয়াশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে,
“আপনি চলে যান এবার, সকালে আমরাও চলে যাব বাসায়। এমনিতেও আপনার বাড়িতে কেউ নেই। আমাকে নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে। আপনার একটু ঘুম প্রয়োজন।”
হাতের সাথে হাত ঘষে আয়াশ একটু ভাব নিয়ে বলল,
“তা ঠিক ঘুমানো প্রয়োজন, বিয়ের পর তো আর রাতে ঘুম হবে না।”
“কেন?”
আয়াশের কথার গভীর মানে না বুঝেই প্রশ্নটা করে, আয়াশ ঠোঁট টিপে হাসে, সাময়িক সময় পর আশা বুঝতেই কিঞ্চিৎ লজ্জায় চোখ বুজে হাসে। আশার ওপরে একটু ঝুঁকে দুষ্টু স্বরে হিসহিস করে বলে,
“বুঝ না? তখন তো রাতভর আমরা..”
“বিয়ের পর রাত হলে রাতের কথা শোনাবি, এখন সর ওখান থেকে।”
অহীনের কণ্ঠে রাগ প্রকাশ পাচ্ছে, কেবিনের দরজার সামনে থেকে বলে উঠল আয়াশ শেষ করার আগেই। বিরক্তিতে চোখ মুখ শক্ত করে ফেলে আয়াশ, আশা অভিমানে অন্যদিকে চোখ ঘোরায়। আয়াশ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অহীনের নিকট যায়। দু'জন একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। আয়াশ আশার অবস্থার কারণ অহীন ভেবেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। আর অহীন? তার অসহ্য লাগছে আয়াশের আশার সাথে এত গা ঘেঁষাঘেঁষি। আয়াশ ঢোক গিলে ফোঁস করে বলে,
“লিসেন অহীন, আই নো তোরা কাজিন। বাট দিস? একটু বেশি মনে হচ্ছে না? ওর অবস্থা..”
“এটা আমাদের ফ্যামিলি ম্যাটার।”
“আশা আমার হবু বউ।”
অহীনের ঠোঁটে কটাক্ষ,
“হবু বউ, হয়নি! সো কিপ ইয়োর ফাকিং মাউথ শাট।”
“প্লিজ অহীন, আয়াশ স্টপ দিস।”
ওরা তর্ক থামায়, আয়াশ আশার কাছে গিয়ে আবারও অহীনকে দেখিয়ে আশার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“আর কয়েকটা দিন একে সহ্য করো। প্রমিজ সুইটহার্ট, আর এসব লোকের মুখও দেখাব না।”
অহীন আশার দিকে রক্তিম চোখে চেয়ে আছে, চোখে রাগের আভাসটা স্পষ্ট। আশার থেকে বিদায় নিয়ে অহীনকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় আয়াশ। অহীন আশার দিকে তাকিয়ে হাঁসফাঁস করে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। সন্ধ্যায় এগুলো নিয়েই কি তাদের ঝামেলা হলো না? তবুও কিসের বিয়ের আগে এত ঘনিষ্ঠতা।
চলবে....