#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৯
আশাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে একদিন হলো। আশা একটি বারও অহীনের সাথে কথা বলেনি। যদিও এতে অহীনের তেমন কিছু যায় আসে বলে মনে হয় না। টেবিলের ওপর পায়ে পা তুলে বসে বসে চা খাচ্ছে আশা, ঠোঁটগুলো শুকনো হয়ে ফ্যাকাশে দেখা যাচ্ছে। চোখগুলোতে হালকা ঘুম, এমনই সময় শিস দিয়ে সাদা শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে নিচে নামছে অহীন। আড়চোখে চেয়ে আবারও চোখ নামায় আশা তার থেকে। গম্ভীর মুখে আশার পাশে বসে অহীন বলল,
“আম্মু নাস্তা দাও।”
অহীনের ডাকে উত্তর আসে সিঁড়ির ধারের একটি কক্ষ থেকে,
“আশু, অহীনকে নাস্তা দে, আমি কাজ করছি।”
তাশার আদেশে গাল ফোলার আশা। যেই ছেলের জন্য হাসপাতালে গেল তাকে বেড়ে খাওয়াবে সে? সেই তাকে নাস্তা দেয়ার কথা কল্পনায়ও আসে না আশার। তবুও ক্ষোভ নিয়েই উঠে দাঁড়ায়, কিচেনে গিয়ে পরোটা আর তরকারি নিয়ে আসে। যাওয়ার সময় যেই রাগ ছিল, আসার সময় সেটা আর নেই। অহীন শীতল চোখে তাকিয়ে আছে আশার দিকে। ভেজা খোলা চুল, সকাল সকাল গোসল করেছে হয়তো। তবুও ঠোঁটগুলো ফ্যাকাশে। চোখের ঘন পাপড়িগুলো কাঁপছে। অহীনের সামনে এনে রুটির প্লেট আর একটা তরকারির বাটি রাখে। অহীন ওর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে তরকারিটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নেয়। নাহ, তরকারি তো ঠিক আছে। অতঃপর হাফ ছেড়ে জিজ্ঞেস করে,
“এখন তোর শরীর ভালো আছে?”
ভেজা চুলগুলো ঝাড়া দিয়ে বাতাসে দুলিয়ে আশা বলে ওঠে কটাক্ষ করে,
“জুতো মেরে গরু দান করতে হবে না। কারণ আমি জুতোর পরিবর্তে ঝাড়ু মারবো কনফার্ম।”
আশার দিকে সন্দিহান হয়ে তাকায় অহীন। আশা এমন করে দাঁড়িয়ে আছে যেন কিছুই তো হয়নি। অহীন সরাসরি জিজ্ঞেস করে,
“কিছু মিশিয়েছিস?”
“বিষ হতে পারে।”
কথাটা বলেই আশা ওর পাশে গিয়ে বসে ব্রেড আর জ্যাম নিয়ে খেতে থাকে। গলা খাঁকারি দিয়ে অহীন একটু রুটি ছিঁড়ে নিজের মুখে দেয়। না, তেমন কিছুই মনে হলো না। তাই তো আবারও মুখে তুলে নিল। এভাবে দুই-তিন বার মুখে তুলতেই মনে হলো গলায় কিছু একটা বাধছে। গলা ঝেড়ে পরিষ্কার করে নেয় অহীন, আবারও মুখে দিতে গেলে অনুভব করে গলা হালকা চুলকাচ্ছে। বাম হাত দিয়ে গলা ঘষে, পানি খায়; তবে না, চুলকানি বাড়ছে শুধু। অহীন হাত ধুয়ে দুই হাতে গলা ধরে ভাঙা স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“এটাতে কি মিশিয়েছিস পেঁচি?”
“বিষ কচু।”
আশা ব্রেড মুখে দিতে দিতে শীতল স্বরে বলল কথাটা। অহীন বড় বড় চোখে ওর দিকে তাকায়। অবিশ্বাস্য এই কাজ আশা করবে সেটা ভাবেনি অহীন। গলা ধরে ধমকে ওঠে,
“অসভ্য, মেরে ফেলবি নাকি? আমার গলাআআ!”
আশা প্রতিক্রিয়া দেখাল না একটুও। অহীন বিরক্তি নিয়ে তাশার কক্ষের দিকে যায়। বেচারার গলা ধীরে ধীরে ফুলে উঠছে। অহীনের ডাকে তাশা বেরিয়ে আসে। ভেতরে চুলকানিতে হাঁসফাঁস করতে থাকে অহীন। ওকে এমন করতে দেখে হতবুদ্ধি তাশা বাহু ধরে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“কি হয়েছে অহীন?”
“কি রেঁধেছ এগুলো? গলা চুলকাচ্ছে আমার, কিছু দাও তাড়াতাড়ি।”
অহীনের ভাঙা কণ্ঠের কথাটায় তাশা আতঙ্কিত হলো কিঞ্চিৎ। অহীনকে ধরে নিয়ে সোফায় বসিয়ে দেয় আর জিজ্ঞেস করে,
“কি খেয়েছিস? আশা কিছু করেছে? কচু তরকারিটা দিয়েছে তোকে? আমি ওটা ফেলে দেয়ার জন্য রেখেছিলাম। মেয়েটা!”
আশা বসা থেকে উঠে ফোঁস করে বলে,
“ওর কিছু হলেই আমার দোষ? বিয়েটা হতে দাও, তোমাদের বাড়িতে আর আসবো না। তখন ছেলে নিয়ে থেকো আরাম করে।”
অহীন তাশার হাত ধরে ভাঙা স্বরে বলে,
“ও কিছু করেনি, আমি ভুলে খেয়েছি। এবার প্লিজ কিছু করো। ইচ্ছে করছে গলা কেটে ফেলতে।”
তাশা তড়িঘড়ি করে আবার রান্নাঘরের দিকে ছুটল। বিষ কচু গলায় ধরলে যে কী যন্ত্রণা হয়, তা তার খুব ভালো করেই জানা আছে। এই তরকারিটা তো সে ফেলে দেওয়ার জন্যই আলাদা করে রেখেছিল। অথচ ছেলেটা না বুঝেই সেটা খেয়ে নিল! মুহূর্তের মধ্যেই তার গলাটা ফুলে যাচ্ছে আর যন্ত্রণায় ছটফট করছে অহীন। তাশা চলে যেতেই আশা অহীনের সামনে আসে। কাঁধে হাত রেখে বসে হিসহিস করে মেকি কান্নার ভান করে জিজ্ঞেস করে,
“কিরে? আমার নাম নিলি না কেন?”
অহীনের পুরুষালি শক্ত হাত দুটো আশার কবজি পিষে দেয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় তাকে সোফায় উল্টে ফেলল সে। হাতের হাড়গুলোতে চাপ পড়তেই যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে মেয়েটি। অহীন এবার হিংস্রভাবে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“শালি, তোকে ছেড়ে দেবো আমি? তোর স্বপ্নে! বিয়ের খুব শখ না? এমন বিয়ে করাবো পুরো জীবন মনে রাখবি। ওই স্যানিটাইজারকে তো আমি...”
শেষ করার আগেই তাশার আসার শব্দে আশাকে ছেড়ে দেয় অহীন। আগের জায়গায় গিয়ে বসে। ব্যথারত কবজিতে নিজের হাত ডলে আশা, তীক্ষ্ণ ক্ষোভ প্রকাশ করে তাকায় অহীনের দিকে। পরক্ষণেই তাশা হাতে একটি গ্লাস নিয়ে আসে, অহীনের সামনে ধরে বলে,
“নে এটা খা, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।”
অহীন গ্লাসটা নিয়ে আশার দিকে তাকিয়ে মুখে তুলে নেয়। গলা তো এখনো যন্ত্রণা করছে। তাশার দেওয়া তরলটা একটু মুখে দিতেই কেশে ওঠে,
“কি এটা? এত টক! আমার সুগার লো হয়ে যাবে তো।”
অহীনের পিঠে কয়েক ঘা থাপ্পড় দিয়ে ধমকায় তাশা,
“চুপ, এটা খেয়ে ১০ মিনিট পর একটা ট্যাবলেট খাবি।”
অহীন কাতর চোখে অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাশার দিকে,
“ছোট আম্মু।”
অহীনের নাটকে তাশা চোখ রাঙানি দিতেই শুকনো ঢোক গিলে পুরোটা টক পানি খেয়ে নেয় বেচারা। আশা মিটিমিটি হাসছে। সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে সুর তুলে আশা গায়,
“কে পোড়া বাঁশি বাজায় ও ও...
আগুন লাগাইলো রে টিংকু
আগুন লাগাইলো।
আগুন লাগাইলো রে টিংকু
আগুন লাগাইলো।”
ওর গানে তাশা বেশ বিরক্তি নিয়ে তাকায়। ততক্ষণে আশা নিজের ঘরের দিকে চলে গিয়েছে। অহীন তখনো অনেকটা সময় একই ভঙ্গিতে বসে রইল। অগত্যা তাশা নিজেই এগিয়ে এসে ওকে ওষুধ খাওয়ায়। কিছুক্ষণ পর অহীনের মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি আসতেই সে ঝটপট উঠে টেবিলের ওপর থেকে জ্যামের কাঁচের বয়ামটা তুলে নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দেয়। তাশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ওটা কেন নিচ্ছ?”
অহীন নরম স্বরে উত্তর দেয়,
“নাস্তা তো শেষ হলো না, তাই এটা নিয়েই যাচ্ছি। নাস্তা হিসেবে এটাই খাবো।”
কথাটা শেষ করে সিঁড়ির দিকে উঠে যায় সে। তাশা অবাক হয়ে চেয়ে আছে, এদের কাহিনি বুঝল না একটুও। পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল শুধু,
“শুধু জ্যাম খাবি?”
অহীন আর কোনো উত্তর দিল না। সিঁড়ি দিয়ে বড় বড় পা ফেলে ওপরে উঠে যায় সে। সরাসরি আশার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাতের উল্টো পিঠে আলতো করে নাক ঘষে দরজায় মৃদু একটা ধাক্কা দিতেই তা হাট হয়ে খুলে যায়। ভেতরের দৃশ্য দেখে অহীনের পা জোড়া থমকায় একটু। আশা গায়ের সাথে ধরে আছে টকটকে মেরুন রঙের একটা লেহেঙ্গা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছে সে। তার চোখেমুখে হাসির সাথে অস্থিরতা, ঠোঁটের কোণে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। অহীন কান পাততেই শুনতে পায় আশার অস্ফুট আক্ষেপ,
“অন্তুটা এখনো আসছে না কেন!”
অহীন শান্ত ভঙ্গিতে পা ফেলে ধীর পায়ে আশার দিকে আগায়। আয়নায় অহীনের প্রতিবিম্ব দেখে আশা পেছন ফিরে তাকায় তার দিকে। চোখে অবাক করা প্রশ্ন। অহীন আশার একদম কাছে যায়, পেছনে জ্যামের শিশিটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখে। আশা সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করে,
“এখানে কি তোমার?”
“ভাবলাম নাস্তা খাইনি দু'জন, এখন একসাথে খেয়ে নেই।”
“খাবো না, যাও এখান থেকে।”
“তোর প্রিয় জ্যাম খাবি না? তুই খাবি একটু, আমি খাবো একটু, মজা হবে অনেক।”
“তোমার সাথে এত মজা করতে চাই না। রুম থেকে বের হও বলছি।”
“আমি তো মজা না নিয়ে যাচ্ছি না।”
আশা বিরক্তি নিয়ে ফোঁস করে শ্বাস নেয়। হতাশ হয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
“আয়াশের মেরুন কালার পছন্দ। সুন্দর না লেহেঙ্গাটা?”
“এটা বিয়েতে পড়বি?”
“নাহ, এটা অন্তুকে পড়তে বলছি সেই কবে থেকে। মেয়েটা পড়তে রাজি হচ্ছে না। আমার জন্য তো আজকে কিনতে যাবো আয়াশের সাথে।”
অহীন ঠোঁট বাঁকিয়ে ভ্রু নাচায়। আশা আবারও নিজের প্রতি মনোযোগী হয়। অহীন তো এসেছিল দুষ্টুমি করতে, তবে কী হলো কে জানে, আশার রং-ঢংগুলো ভালো লাগছে তার। আশার বিছানায় বসে চেয়ে আছে সে। আশা নিজের সুন্দর ড্রেসগুলো গায়ে তুলে তুলে দেখছে। অহীনের উপস্থিতি তাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলছে। বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“সমস্যা কী? বসে আছো কেন? বললাম তো খাবো না, যাও আর অন্তুকে পাঠিয়ে দিও।”
অহীন গলা খাঁকারি দিয়ে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে আশার দিকে এগিয়ে বলে,
“তোর হুকুমের দাস আমি?”
আশা একটু পিছিয়ে যায়,
“অহীন প্লিজ যাও তো বাল, ভালো লাগছে না বলে দিলাম।”
অহীন আগাচ্ছে, আশা পিছোচ্ছে। এক পর্যায়ে ড্রেসিং টেবিলের সাথে ধাক্কা খায় আশা, কিঞ্চিৎ ব্যথায় ‘আহ’ করে ওঠে। অহীন ওর দুই পাশে দুই হাত রেখে হিসহিস করে বলে,
“বাহ পেঁচি, শ্যাম্পু করেছিস?”
আশা ধাক্কা দিল অহীনের প্রশস্ত বুকে। নড়ল না অহীন এক চুলও। ধীর হাত বাড়িয়ে খপ করে জ্যামের কাঁচের বয়ামটা তুলে নেয়। আশার পেছন দিক দিয়ে বয়ামের ঢাকনাটা খোলে। ফলে অহীনের বুকের সাথে প্রায় মিশে যাচ্ছে আশা। ইচ্ছে করছে লাথি দিয়ে ওর ইম্পর্ট্যান্ট পার্ট ড্যামেজ করে দিতে, কিন্তু এতটাও নির্দয় আশা না।
ভাবনার মাঝে নিজের সদ্য শ্যাম্পু করা চুলে ঠান্ডা ও ভারি কিছু অনুভব করে সে। একটু অবাক হয়ে তাকায় অহীনের দিকে। জ্যামের টক-মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে বাজতেই মস্তিষ্ক আবিষ্কার করে এটা তার মাথা থেকে আসছে। ‘আআআআহ’ বলে দুই হাত নিজের চুলে নিয়ে ধরে। অহীন সরে যাওয়ার আগেই আশা রাগে দিকবিদিক ভুলে অহীনের জায়গায় হাঁটু বসিয়ে দেয়। অহীনের জান গেল বোধহয়, একটু কুঁকড়ে ওঠে; তবে না, লাগেনি তেমন। রাগে আবারও এগিয়ে যায় আশার দিকে। দুই হাতে আশার চুলে জ্যাম মেখে দিতে থাকে অহীন। আশার হাতে লেগে থাকা জ্যামসহ অহীনের গাল ও বুকে নিজের সমস্ত আক্রোশ মিটিয়ে থাপ্পড়-কিল দিচ্ছে সে।
“কুত্তা, আমি এখন বের হবো। আয়াশ আসবে, ও এগুলো পছন্দ করে না। এবার গোসল করতে হবে।”
অহীন আশার চুলগুলো আরও এলোমেলো করে দিতে থাকে। দাঁত বের করে হাসছে অহীন। আশা প্রায় কেঁদে দেবে, এমন সময় দরজার কাছ থেকে গম্ভীর স্বরে ডাক আসে,
“কী হচ্ছে?”
অন্তিহার কণ্ঠ শুনে অহীন সরে যায়। ঠোঁটের কোণে এখন দুষ্টু হাসি বিদ্যমান। আশা ন্যাকামি কান্না জুড়ে অন্তিহার দিকে গিয়ে বলে,
“অন্তু দেখ না, তোর ভাই কুত্তা কী করল!”
অন্তিহা অহীনের শার্টের দিকে আর আশার পাগলাটে আঠালো চুলের দিকে তাকিয়ে আছে। আশা রাগ দেখিয়ে পাশেই পড়ে থাকা একটা ছোট কাঁচি তুলে অহীনের দিকে এগিয়ে যায়। অহীন তড়িঘড়ি করে জুতো নিয়েই বিছানায় উঠে পড়ে। আশা আবারও চেঁচিয়ে ওঠে,
“জাউরা, আমার বেডশিট কালকে ক্লিন করেছি আমি!”
“সো অন্তু তোকে ট্রেনিং দিচ্ছে ওসিডি রোগী হওয়ার?”
“তোর মতো খচ্চরের চেয়ে ওসিডি অনেক ভালো।”
অহীন আশাকে পাশ কাটিয়ে বিছানা থেকে নেমে ছুটে রুম থেকে বের হয়ে যায়। অন্তিহা আশার দিকে তাকিয়ে হতাশার শ্বাস নিয়ে বলে,
“আয়াশ নিচে আছে আশা। যা গোসল করে আয়, আমি ওনাকে ভেতরে নিয়ে আসি।”
“হ্যাঁ, অহীন আমার চুল নষ্ট করেছে বলিস না। নয়তো ওনাদের আবার আর এক তাণ্ডব হবে বাসায়।”
_________
গাড়ি নিজ গতিতে আগাচ্ছে। আয়াশ ড্রাইভ করছে, পাশেই আশা। কারো মুখে কথা নেই, কারণ অহীন; যে তাদের সাথে এসেছে যদিও আসার ইচ্ছে ছিল না। তবে তাশা ও কুহুর জোরাজুরিতে আসতে হয়েছে। অহীন বাইরে তাকিয়ে আছে, অন্তিহা হাতে ফোনে চেয়ে আছে। কিছু সময় পর চোখ তুলে বলে,
“উত্তরার দিকে গেলে একটা শোরুম আছে, অনেক ক্লিন আর ড্রেসও ভালো।”
অহীন নাক ফুলিয়ে রাগ নিক্ষেপ করে অন্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুই কি ওদের পিএ? সারাক্ষণ ওদের গাইড করিস কেন? আয়াশ কি চেনে না? হবু বউ নিয়ে কোথায় যাবে বোঝে না?”
অন্তিহা অহীনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“আপনার কী? আমার ভালো লাগে করতে।”
“বলদি।”
আয়াশের বা আশার থেকে কোনো উত্তর আসল না। আয়াশের হাতে সব সময়ের মতোই কালো গ্লাভস পরানো। আশাকে ইশারা করে সামনের দিকে দেখায় সে। স্যানিটাইজারের বোতল রাখা। আশা স্বল্প হেসে হাত স্যানিটাইজ করে নেয়। আয়াশ নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়। আশা চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করতেই 'কী?' আয়াশ স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে দেখিয়ে দেয় গ্লাভসের ভেতরে হাত দিতে। অহীনের কাছে এসব অতিরিক্ত ‘ক্রিঞ্জিং’ লাগছে। আশা দ্বিধা করল না, আয়াশের কথা মতোই হাতের গ্লাভসের ভেতর দিয়ে নিজের হাত প্রবেশ করায়। একে অপরের আঙুলের ভাঁজে নিজেদের অনুভব করে তারা। আশা যদিও একটু অবাক, এই গরমের মধ্যে এগুলো পরে থাকা সত্যিই কষ্টকর। হাত কত গরম আয়াশের। অন্তিহার চোখ বাইরে হলেও অহীনের যেন চোখ আটকে আছে ওদের নাটকের দিকে। সে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বিড়বিড় করে বলে,
“ছিঃ! মনে হচ্ছে টাকা দিয়ে ফ্লপ মুভি দেখতে এসেছি।”
একটা মুহূর্তের জন্য আয়াশের চোখ যায় অহীনের দিকে। হঠাৎই সজোরে ব্রেক চাপে সে। ফলে আশা আর অন্তু ঝুঁকে যায় সামনের দিকে। আয়াশ রাগ নিয়ে বলে ওঠে,
“হেই, হোয়াট দ্য ফাক ইজ গোয়িং অন?”
আশা ও অন্তিহা অহীনের দিকে তাকায়, যে এখনো সিগারেট ঠোঁটে চেপে আছে। আয়াশের মাথা খারাপ হচ্ছে এটা দেখে। অন্তিহা অবাক ও রাগ নিয়ে বলে,
“আপনি স্মোক করেন?”
“সো হোয়াট? এমন করে দেখার কী আছে? মানুষই স্মোক করে, এলিয়েনরা না!”
আশা ওর কথায় আরও খেপে যায়,
“অহীন, বাড়িতে এসব এলাউ না।”
“তাই তো গাড়িতে করছি।”
রাগে সবাই ফোঁস করে শ্বাস নেয়। আয়াশ হুমকির স্বরে বার্তা দেয়,
“লিসেন, ডোন্ট ডু দ্যাট ফাকিং থিং ইন মাই কার।”
অহীন কথা শুনল না। অন্তিহা অহীনের হাত থেকে টান দিয়ে নিয়ে নিল ওটা, অতঃপর বাইরে ফেলে দেয়। অহীন আবারও নেয় আরও একটা পকেট থেকে। এবার আশা সিটের ওপর দিয়ে ঝুঁকে ওর হাত থেকে পুরো প্যাকেটটাই নিয়ে হিসহিস করে হুমকি দেয়,
“বাড়িতে গিয়ে তোকে দেখাবো কুত্তা।”
“তুই কুত্তি, তোকে তো এমনি দেখি, বাড়ি যেতে হবে নাকি?”
আশা আবার সোজা হয়ে গাড়ির বাইরে পুরো প্যাকেট ফেলে দেয়। আয়াশকে অন্তিহা আর আশা সরি বলে। সে আবার গাড়ি স্টার্ট দেয়। অহীন জানালার বাইরে তাকায়, ঠোঁটে এবার একটু হাসি, যেন ওদের বিরক্ত করে ভালো লাগছে খুব। অন্তিহার সাথে এবার আশা কথা জুড়েছে,
“তুই আর আমি সেম কালারের ড্রেস নেবো, আর আয়াশের জন্য?”
অন্তিহা গাল বাঁকিয়ে বলে,
“তুই বউ, আমি কোন সুখে তোর মতো ড্রেস নেব? দেখা যাবে তোকে রেখে আমাকে বউ ভেবে তুলে নিয়ে যাবে তোর বর।”
আয়াশ হেসে দেয় ওদের কথা শুনে। আশার দিকে একটি হাত বাড়িয়ে গালে রেখে আস্তে করে চিবুক টেনে বলে,
“আমার পুতুলকে চিনতে আমার ভুল হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। কত দীর্ঘ সাধনার পর যে ওকে নিজের করে পাচ্ছি, তা কেবল আমার মন জানে। এতগুলো বছর যেখানে একচিলতে ভুল হয়নি, সেখানে আজ এই পাওয়ার সময় এসে ভুল করব? কক্ষনো না।”
“হো হো! জিজু তো সিরিয়াস হয়ে গেছেন।”
“নাটক।”
আয়াশের কথায় অন্তিহার সুন্দর উত্তর আসলেও পরপর অহীনের কটাক্ষটাও শুনল তারা। তবে অহীনের এমন গাল ফোলা মুখ দেখে আয়াশসহ সবাই হেসে দেয়। অহীন আরও বিরক্ত হয়ে বলে,
“গাইস প্লিজ, আমি বিরক্ত আর তোরা হাসছিস?”
“তোর মতো জাওরা দুটো আর নেই অহীন। সেই তো নিজেও চাস তোর বোনকে দিতে, অহেতুক নাটক করিস কেন?”
“বয়েই গেছে তোকে বোন দেবো। তুই পেঁচিকে নিয়ে যা, স্যানিটাইজার একটা!”
কিছু সময় চুপ থেকে অহীন আবার বলে,
“ওয়েট! তুই বাসর ঘরে গিয়ে ঠিক কী করবি? নিজেকে কন্ট্রোল করবি কী করে? তখন কি স্যানিটাইজার নিয়ে বউয়ের গা ঘষবি নাকি বাসর করবি? অতো সময় হাতে পাবি? তোর এসব কাণ্ড দেখতে দেখতে তোর ‘পাখি’ তো ততক্ষণে নির্ঘাত ঘুমিয়ে পড়বে!”
অহীন এমন খোলামেলা লাগাম ছাড়া কথায় সবাই ওর দিকে তাকায়, অন্তিহা ফোস করে বলে,
“ এখানে আশা আর আমি আপনার বোন।”
“তো? তোরা বিয়ের করবি না?বিয়ের পর সবাই করে, কিন্তু আয়াশ করবে না আশার কপাল টাই..."
আশা ওর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায় সাথে অন্তীহা, অহীন শুকনো ঢোক গিলে নেয়। এবার বোধহয় বেশি বেশি করছে। ঠোঁটে হাত দিয়ে চুপ হলো নিজ থেকেই।
কিছু সময় গাড়ি থামায় আয়াশ, আশাকে ইশারা করে গাড়ি থেকে নেমে যায়।
“এক্সকিউজ মি।”
অহীন বিরবির করে বলে,
“বমি করবে এখন,এটা বললেই বমি করে।ওর বিয়ে করার প্রয়োজন কি?”
বেশ অনেকটা সময় পর আয়াশ এসে আবার ড্রাইবিং সিটে বসে,হাত স্যানিটাইজ করে, গ্লাভস পরে গাড়ি স্টার্ট দেয়। আশা একটু ঝুকে জিগ্যেস করে অতি মায়ার স্বরে,
“এভরিথিং ইস ওকে?”
“হুম।”
চলবে...