#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ১১
আশা তার শাড়ির কুঁচি সামলে নিয়ে অন্তিহার দেখানো কক্ষের ভেজানো দরজায় ধাক্কা দিতেই চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায়। সম্ভবত লোডশেডিং। সাথে ফোনটাও নেই। আশা ধীরপায়ে দেয়াল হাতড়ে ভেতরে ঢুকছে এবং ভেতর থেকে দরজাটা হালকা ভিড়িয়ে অন্ধকারেই বিছানাটা আন্দাজ করতে পেরে ও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে নিল। আলোর আর প্রয়োজন নেই ভেবেই সে হাতের বাড়তি কাপড়টা রেখে শাড়ির আঁচলটা নিচে নামায়। কিন্তু ব্লাউজের হুকগুলো পেছনে হওয়ায় খুলতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। চোখ বুজে মনোযোগ দিয়ে হুক খোলার চেষ্টা করতেই হঠাৎ চোখের পাতায় আলোর ঝিলিক লাগে। চোখ মেলে ফোনের লাইট দেখে আশা থতমত খেয়ে জোরে চিৎকার করে ওঠে। সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে তা না দেখেই সে পাগলের মতো নিজেকে ঢাকার চেষ্টা শুরু করে দেয়। অন্যদিকে আগন্তুকও হকচকিয়ে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে লাইট বন্ধ করার চেষ্টা করছে।
সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে দুজনেরই হন্তদন্ত অবস্থা। নিজের আলুথালু শাড়ির আঁচল ঠিক করার আগেই আশার উঁচু হিল জোড়া ফ্লোরে পিছলে ভারসাম্য হারিয়ে সে সজোরে লোকটির ওপর গিয়ে ধপ করে পড়ে। ঠিক তখনই কানে খুব কাছ থেকে একটি অস্ফুট স্বরে বিরক্তির কণ্ঠের কথা ভেসে আসে,
“বাল সর পেঁচি দিলি তো আমার চোখের ভার্জিনিটি নষ্ট করে।”
অহীনের এমন কথায় অস্বস্তি বাড়ছে আশার, উন্মুক্ত কোমরে অহীনের শক্ত হাত সে অনুভব করছে, অহীনের গরম নিশ্বাস আশার বুকের ওপর পড়ছে বারংবার। আশা সরতে সরতে বলে,
“তু... তুমি এখানে কী করছ?”
উঠে দাঁড়াতে পারল না, অহীনের হাতের সাথে আবারও টান খেয়ে পড়ে। এবার আর দূরত্ব নেই, একে অপরের শরীর মিশে আছে। আশা আবার উঠতে যাবে হঠাৎ সব জায়গায় আলো জ্বলে ওঠে, আর এক মহিলার জোরে চিৎকারের শব্দে দুজন এলোমেলো ভাবে দূরে সরে আসে। অহীন নিজের দিকটা কী দেখবে? তাড়াহুড়ো করে আশার পড়ে থাকা জামাটা ওর বুকে জড়িয়ে দেয়। দরজার সামনে তাকিয়ে রোমানা বেগমকে দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে দু’জন। আশা তাড়াতাড়ি করে সরে নিজেকে পরিপাটি করার কাজে লেগে পড়ে। তবে রোমানা বেগমের চিৎকারে ঘর জুড়ে লোক জড়ো হয়েছে বেশ কয়েকজন অপ্রত্যাশিতভাবে।
নাটকীয় ভঙ্গিতে কপালে হাত দিয়ে বসে পড়েন রোমানা বেগম,
“আল্লাহ, লজ্জা বলতে এই যুগের ছেলেমেয়েগুলোর দেও নি তুমি। ছিঃ এত বললাম এদের বিয়ে দিতে, দিবে না। তাই আমার আজ এই দিন দেখতে হচ্ছে।”
অহীন বিরক্তি নিয়ে কপালে হাত দেয়, আশা ফোঁস করে বলে,
“কী বলছ এগুলো? বুবু আমরা কিছু করছিলাম না। অন্ধকার ছিল কোইনসিডেন্স হয়ে গেছে।”
“দেখলাম তো আমি গায়ের অর্ধেক কাপড় খুলে, আমাকে শেখাস?”
“নাউজুবিল্লাহ, বুবু মাথা ঠিক আছে? আশার দিকে অমন করে তাকানোর কথা স্বপ্নেও ভাবি না। তুমি এসব কী বলছ?”
রোমানা বেগমের আহাজারিতে কুহু, অন্তিক, আকাশ সবাই আসে কক্ষে। কুহু রোমানা বেগমের কাছে গিয়ে কাঁধ ধরে বলে,
“কী হয়েছে চাচি? কান্না করছেন কেন?”
কুহুকে ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিলেন রোমানা বেগম, চেঁচিয়ে বললেন,
“সর বেয়াদব মেয়ে, বলেছিলাম ওদের বিয়েটা দিতে রাজি হলি না। আজ দেখ নোংরামি করছে ঘরে।”
কুহু আশা ও অহীনের দিকে তাকায়, আশেপাশে তাকিয়ে দেখে অনেক লোক, পেছনে একটি কোণায় আয়াশ দাঁড়িয়ে আছে, লোক ঠেলে ভেতরে আসার পরিস্থিতি নেই। কুহু গলা ঝেড়ে কয়েকজনকে রেখে বাকিদের বাইরে বের করে দেয় কক্ষের। আশা ও অহীন স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছে রোমানা বেগমের দিকে। ওনাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে হচ্ছে এখন তাদের। আশার চোখগুলো ছলছল করছে। অহীনের ভ্রুক্ষেপ নেই। আয়াশ দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। আশা মুখ খুলতেই যাবে কুহু বলে ওঠে,
“চাচি আপনার সমস্যা কী? কী দেখেছেন? লোডশেডিং হয়েছিল হয়তো ভুল করে এক রুমে চলে এসেছে। ওরা একা থাকে না? কথা বলে না?”
কান্নায় আরও নাটক করলেন মহিলা,
“এই জন্য অর্ধনগ্ন হতে হয়? তুই দেখিস নি আমি দেখেছি।”
অন্তিক মায়ের সামনে গিয়ে দাঁত পিষে নিজেকে সংযত করে বলে,
“যাই হোক এভাবে কান্না করে লোক জড়ো করার মানে কী?”
আশা ফোঁস করে বলে ওঠে,
“শাড়ি নষ্ট হয়েছিল আমার, অন্তু এখানে দিয়ে গেল আমাকে। কেউ ছিল না ভেবে চেঞ্জ করছিলাম। আমি কেমন করে জানব অহীন থাকবে?”
অহীন কপাল কুঁচকে বলে,
“তুই ন্যাকামি কেন করছিস? ভুল করেছিস? কান্নার কী আছে? আর এমনিতেও ওনার কথা ধরে কে? ফালতু মহিলা একটা।”
রোমানা বেগম আরও কান্না করে দিলেন,
“তোরা করবি আমি বললে ফালতু?”
আশা অহীনকে ধমক দিয়ে কান্না করে দিল ফুঁফিয়ে। আয়াশের সামনে গিয়ে বলে,
“আয়াশ ভুল বুঝবেন না প্লিজ।”
আয়াশের মুখে বিরক্তি স্পষ্ট, তবে আশার কান্না দেখে গলে গেল। বুঝল আশার কান্নার কারণটা ঠিক। আশা হয়তো ভাবছে আয়াশ তাকে খারাপ ভাববে। আয়াশ মৃদু হেসে আশার গালে হাত রেখে আদর করে বলে,
“পাগল তুমি? আমি বিরক্ত হচ্ছি এসবে। ওনার কথা ধরব কেন? তোমাকে বললাম আমি কথা বলব তোমার সাথে আর তুমি এখানে কান্নাকাটি করছ?”
আশা ঘর ভর্তি সবাইকে অদেখা করে আয়াশকে জড়িয়ে ধরে আরও কান্না করে দেয়,
“আয়াশ, অন্ধকার ছিল, আমার রুমে মেহমান অনেক। তাই বড় আম্মুর রুমে এসেছি। আমি জানতাম না অহীন এখানে।”
আশার এতটা কাছে এসে নিজেকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা, আয়াশের শরীর কাঁপছে। কাঁপা হাতটাই চোখ বন্ধ করে আশার চুলে রাখে। অন্তিক ও কুহু অন্যথায় মুখ করে গলা খাঁকারি দেয়। আয়াশ অল্প স্বরে বলে,
“এক্সপ্লেইন করতে হবে না। আমি জানি তো আমার পুতুল কেমন? আর এটাও জানি তার ফ্যামিলির কিছু মানুষ কেমন। কান্না করো না। অহীন আর তোমাকে অবিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না।”
বিছানায় বসে থেকে অহীন হাই তুলে বালিশে শুতে শুতে বলে,
“এমনিতেও আমি প্রয়োজনে সারাজীবন ভার্জিন থাকব তবুও এই পেঁচিকে স্পর্শ করব না।”
অহীনের কথায় অন্তিকের গলায় কিছু একটা আটকায় আর খুক খুক করে কেশে দেয় আর কুহু অহীনের দিকে তাকিয়ে আছে। অহীন ওদের দিকে পিঠ রেখেই বলে ওঠে,
“কেশে লাভ নেই তোমার ডায়ালগই এটা, কিন্তু তুমি তোমার পেঁচিকে পেয়ে কথা অনড় করেছ। আমি অনড় করব না।”
কুহু রোমানা বেগমের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে, ওনাকে তুলে বিছানায় বসিয়ে দেয়, দরজাটা খুলে দেয়। কুহু ওনাকে বোঝাচ্ছে এসব না করার জন্য, তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন,
“ইয়া মাবুদ ওর চাচার সাথে আমাকে কেন তুমি নিয়ে গেলে না। আল্লাহ তুমি আমাকেও তুলে নাও।”
“ঠিক, আল্লাহ এই বুড়িকে তাড়াতাড়ি তুলে নাও।”
দরজার সামনে থেকে রুক্ষ স্বরে কথাটা বলে অন্তিহা, রাগে মেয়েটার ফর্সা মুখ লাল হয়ে আছে। আশা ও আয়াশের কাছে গিয়ে ওদেরকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে আর বলতে ভুলল না,
“ওনাকে বুঝিয়ে দাও আম্মু এসব নাটকে ওনার ছেলেরা গলবে আমরা না। বুড়ি এক পা কবরে তবুও প্যাঁচ কমে না।”
কুহু চোখ রাঙায় অন্তিহাকে। অন্তিহা কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেল। কুহু গম্ভীর স্বরে বলে,
“অন্তিক, অহীন ক্লান্ত ওকে ডাকতে হবে না, তুমি ওর সাথে থেকে যাও আমি বরং চাচির কাছে চলে যাই।”
অন্তিকের মুখটা মিইয়ে গেল এক নিমিষেই, করুণ চোখে কুহুর দিকে তাকিয়ে আছে। রোমানা বেগম তখনও কান্না করছেন। কুহু ওনাকে নিয়ে যেতে নিলে অহীন ঘুমু ঘুমু পায়ে একটা বালিশ হাতে নিয়ে দাঁড়ায়। বড় করে হাই দিয়ে রোমানা বেগমের কাছে এসে বলে অন্তিককে উদ্দেশ্য করে,
“মুখ দেখ একদিন বউ ছাড়া থাকার কথা শুনে মুখটা পেঁচার পাছার মতো করে রেখেছে। রাখো তোমার বউ, আমি বুবুকে নিয়ে যাই।”
অন্তিক ঝাড়ি দিয়ে বলে,
“বেয়াদব হয়েছ অহীন।”
অহীন রোমানা বেগমের চোখের পানি মুছে দিয়ে হালকা হাতে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আমার মা তোমার, তোমার মা আমার হিসেবে বরাবর? বিয়ে করি নি তো কী হয়েছে আজকে বুড়ির সাথে বাসর করেই নেব।”
অহীন রোমানা বেগমকে নিয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। তারা বের হতেই অন্তিক গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় খট করে। কুহু নিজের পরনের ভারী শাড়ি খুলতে খুলতে অন্তিককে বলছে,
“সৃজনের সাথে থেকে তোমার সব গুণ পেয়েছে অহীন। অসভ্য একটা, সৃজন কত ভালো একটা লোক।”
আয়নার সামনে গিয়ে কুহুকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে অন্তিক, ঘাড়ে থুতনি রেখে গালে চুমু খায় পরম আবেশে। কুহুর কথাটার উত্তর করে বলে,
“শোন পেঁচি। আম্মুর কথা ধরিস না, সংসার এখন তোদের। উনি তো বলবেন শুধু। আর রইল অহীন? যতই বল আমার ছেলে আমার মতোই হবে। যেমন অন্তু তোর মতো গুমড়ো মুখো।”
“আমি গুমড়ো মুখো?”
কুহুকে নিজের দিকে ঘুরায় অন্তিক, ঝুঁকে আবারও চুমু দিতে নিলে বিরক্ত হলো কুহু, হাত দিয়ে সরিয়ে দেয় আলতো করে,
“নিজেকে কী ২৭ বছরের কচি মনে করো? বুড়ো হয়েছ এখনো গায়ে পড়া স্বভাব যায় না তোমার?”
কুহুর শাড়ির আঁচল ধরে টান দিয়ে নামিয়ে বিছানায় ফেলে দেয় অন্তিক কুহুকে, ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে ওঠে,
"তুই বুড়ি, আমি এখনো ফুল এনার্জিতে আছি। আমার রক্তে এখনো ৪২০ ভোল্টের তেজ। চাইলে বাচ্চা দিয়ে প্রমাণ করে দিতে পারি। নিবি বউ?”
"ঘষা খেলে নড়বড়ে মেশিন থেকেও দু ফোঁটা তেল পড়ে, তার জন্য ৪২০ হওয়ার দরকার নেই। সস্তা ঘর্ষণ আর আসল শক্তির তফাতটা আগে বুঝে আসো স্বামী।”
“আস্তাগফিরুল্লাহ বউ, আমার পুরুষত্বে প্রশ্ন তুলছিস? তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস আমি ছুঁয়ে দিলে বিছানা থেকে উঠতে কষ্ট হতো তোর।”
“মনে নেই এমন দিনের কথা, আমি তো সব সময় সকাল সকাল কাজ করা মানুষ। এত এনার্জি থাকলে উঠতে পারতাম না।”
“আয় তোকে দেখাই।”
“তোমার মাথায় সারাক্ষণ এগুলোই ঘোরে, ছেলেমেয়েগুলোর চিন্তা আছে তোমার? আশুর জন্য চিন্তা হয় আয়াশের সাথে পারবে তো মানিয়ে নিতে?”
“ওরা ছোট থেকে একে-অপরকে চেনে, আয়াশকে পাশে থেকে একটু সময় দিলেই ঠিক হয়ে যাবে এসব নিয়ে ভাবিস না।”
—-
ছাদের রেলিং এর পাশে দুটো চেয়ার পাতা তাতেই বসে আছে আয়াশ আর আশা, একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কারণে মেয়েটা লজ্জায় মাথা গুটিয়ে রেখেছে নিচে। আয়াশ বুঝতে পেরে ক্ষীণ হাসে। চেয়ার নিয়ে এগিয়ে যায় তার কাছে, পেছন দিয়ে হাত দিয়ে বাহুতে স্পর্শ করে নিজের একটু কাছে আনে,
“মন খারাপ পুতুল?”
আয়াশের হাত নিজ থেকে তাকে ছুঁয়ে দিল। কোনো দ্বিধা করল না আয়াশ? মুখ তুলে আয়াশের দিকে তাকায় সে। শ্যামলা মুখে হালকা চাপ দাড়িগুলো, চোখগুলো কেমন ফোলা ফোলা, আশাকে কিছু বলার জন্য ছটফট করছে বুঝতে কষ্ট হলো না। আশা দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“আমি সত্যি বলছি আয়াশ, অহীন আর আমি সারাক্ষণ এমন ঝগড়া করলেও আমাদের সম্পর্ক খুনসুটি পর্যন্ত। একে অপরের প্রতি অনুভূতি রাখি না। আর অহীন যদি এমন হতো তবে কী আমার বিয়েতে দায়িত্ব নিয়ে এত কিছু করত?”
আশার কপালে দুটো পড়ে থাকা চুল আয়াশ নিজ হাতে কানের পেছনে গুঁজে দেয়, আর বলে,
“অহীনের সাথে ফ্রান্সে আমি অনেক বছর থেকেছি, জেসির প্রতি ওর ফিলিংস আছে, ওর বিষয় বলতে হবে না আমাকে। আমরা হয়তো একে অপরের মুখও সহ্য করতে পারি না। কিন্তু অহীন যেমন নিজ ভরসায় তোমাকে দিয়ে দিচ্ছে আমার হাতে, আমিও বিশ্বাস করি সে আমার এমন কোনো ক্ষতি করবে না। আর রইল আমার বউয়ের কথা? সে এত বছর নিজেকে গুছিয়ে নিল এক দিনে নিশ্চয়ই কারো কান্নার জন্য তার গোছানো জীবনকে আমি দোষ দেব না।”
ওই মুহূর্তে আয়াশের হাতের কম্পন বলছে আয়াশের তাকে ছোঁয়াটায় কতটা অস্থির হচ্ছে। আয়াশ যে পারে না কাউকে এভাবে ধরতে যদিও হাতে গ্লাভস আছে। আশা সরে আসতে চাইলে আয়াশ আরও একটু চেপে ধরে নিজের সাথে,
“সরে যেও না পুতুল, অভ্যাস করতে হবে আমার।”
“কিছু করতে হবে না, ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে, হঠাৎ করে এত ঘনিষ্ঠতা আপনি নিতে পারবেন না।”
কথাটা বলে আশা সরে আসে, তখনো আয়াশ অপ্রস্তুত হয়ে আছে। আয়াশ পকেট থেকে স্যানিটাইজার বের করে দু’জনের হাতে মেখে নেয়। আশা ফিক করে হেসে দিয়ে বলে,
“বেশি নায়কগিরি করেছেন, এবার বাসায় গিয়ে গোসল করতে হবে এত রাতে।”
“সারাদিন এত কিছুর পর এমনিতেও গোসল করতে হবে। আমি বাইরে থেকে গেলেই গোসল করি।”
“কষ্ট হয় না?”
“হয় তো, অনেক সময় রাত একটাও বাজে, অনেক সময় সন্ধ্যা, বিকেল সময়ের ঠিক নেই। আমি খাবারও খেতে পারি না কারো হাতে। সেই তো তোমার মন রাখার জন্য এ বাড়িতে এসে খাই। আমার কাপড়ে একটু ভাঁজ পড়লে আমি পড়তে পারি না। নিজ হাতে আয়রন করে আলমারিতে রাখি, আমার ঘরে একটা বালুকণা আমার সহ্য হয় না। পানি খাওয়ার পর ওই গ্লাসটাও টিস্যু দিয়ে মুছে রাখি। আবার গোসল করে এসেও নিজেকে বিশ্বাস করতে পারি না মনে হয় হাতে ময়লা অনেক। বারবার স্যানিটাইজ করতে থাকি। এমন আরও অনেক কিছু আছে আমার জীবন কঠিন করে তোলার জন্য পুতুল।”
আয়াশ কথাগুলো এক মনে বলে গেল। আর আশা শুনল মন দিয়ে, ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে বলল,
“এগুলো সমস্যা হলো? আমিও এমন কিন্তু আপনার চেয়ে একটু কম। আমি আপনার কোনো কিছু ধরব না কখনো। রুমে একটু ময়লা দেখলে ক্লিন করে ফেলব। খাওয়ার পর প্লেট গ্লাস ধুয়ে টিস্যু দিয়ে মুছে রাখব। গোসলের পর ওয়াশরুম শুকিয়ে আসব। আপনার সাথে থাকলে অভ্যাস হয়ে যাবে।”
আয়াশ এই পর্যায়ে চেয়ার টেনে আশার মুখোমুখি হয়ে বসে, মুখে স্পষ্ট কাতরতা, আশার হাত দুটো শক্ত করে ধরে নিজ হাতে। আর একটি হাত আশার গালে রেখে বলে,
“পুতুল অত সহজ না। কীভাবে বলি তোমায়?”
আয়াশ হতাশ হয়ে পিছু হটে। আশা নিজ থেকেই আয়াশের হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে ইশারায়। আয়াশ শুকনো ঢোক গিলে নেয় আর কাতর ও অস্ফুটস্বরে বলে,
“অন্য সবার মতো আমি না, আমি তোমাকে চাই অনেক চাই। কিন্তু অন্য দম্পতিদের মতো থাকতে পারব না। এমন নয় যে আমার অনুভূতি নেই। কিন্তু আমার ব্রেইনে ফোবিয়া কাজ করে। মনে হয় অতটা ঘনিষ্ঠতা, কী নোংরা।”
আয়াশ মুখে হাত দেয় যেন অনেক কষ্টে বমি আটকাচ্ছে। তবুও বলছে,
“লিসেন আমাকে সময় দিতে হবে তোমার। নরমাল কাপলদের মতো তোমাকে নিয়ে ফুটপাতে ঘোরা, বাইরে গিয়ে খাওয়া এসবের জন্য আমার নিজেকে প্রিপেয়ার্ড করতে হবে।”
“ওকে আমি জানি এগুলো।”
“শাট আপ, কিছু জানো না তুমি। এক মাস দুই মাস থাকা যায় কয়েক বছর না, তবে আমি চেষ্টা করব এটা থেকে বের হওয়ার। প্লিজ বিয়ের পর অধৈর্য বা বিরক্ত হয়ে আমাকে ছেড়ে যেও না। তুমি পাশের ঘরে থাকলেও আমি আমার ঘরে শান্তিতে ঘুমাতে পারব। হুট করে নিজের মধ্যে এত বড় পরিবর্তন আমি আনতে পারব না। হতে পারে কয়েক মাস কয়েক বছর কেটে যাবে। সোজা কথায় আমি ** ঘৃণা করি, আমার মনে হয় একে অপরের সাথে মিশে থাকলে এতটা সময় আমরা অসুস্থ হয়ে যাব। আর এতে অনেক মানুষ মারাও যায়।”
আয়াশ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বসা থেকে উঠে ছাদের একটি কোণায় ছোট ওয়াশরুমে গিয়ে বমি করে দিল। আশা ওর পেছনে গিয়ে পিঠে থাপ্পড় দিচ্ছে হালকা করে। আয়াশের হয়ে যেতেই আশা টিস্যু এগিয়ে দেয় পানি এগিয়ে দেয়। নিল না ছেলেটা নিজেই নিজের পকেট থেকে নিয়ে ব্যবহার করল। আশা ওর হাত ধরে টেনে এনে চেয়ারে আবার বসিয়ে দেয়,
“এবার হয়েছে আপনার?”
আয়াশ ওর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ হাসে। আশা আয়াশের বাহু পেঁচিয়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলে,
“ছোট থেকে আপনাকে দেখে আসছি, বোঝার পর থেকে আপনার পুতুলের মতো বউ হব আমি জেনে এসেছি। আপনার মনে হয় আমি এখনো এসব বিষয় কিছুই জানি না? অন্তু আমি এগুলোর প্রতি বিশেষ জ্ঞান রাখি বুঝলেন। তাই বাড়িতে গিয়ে গোসল করে ঘুমিয়ে পড়ুন আরাম করে। কালকে সকাল সকাল আমাকে এসে নিয়ে যাবেন। আর কত বাবার বাড়ি রাখার ইচ্ছে হয়?”
“একটুও না। বিয়েটা হতে দাও বাবার বাড়ির পথ ভুলিয়ে দেব তোমার।”
“ভালোবাসতে হয় আয়াশ, ভালোবাসার মতো ভালোবাসা পেলে কোনো নারীর সাধ্য নেই নিজ পুরুষকে এতটুকু কারণে ছেড়ে যাওয়ার।”
“ভালোবাসি আশু, আমার পুতুলকে অনেক ভালোবাসি। তার জন্য পুরো দুনিয়া ছেড়ে দেব এটা তো বলব না, তবে নিজেকে পাল্টে নেব।”
“এটাই আপনার কাছে দুনিয়া ছাড়ার চেয়ে কম কই?”
অন্ধকার আকাশে কয়েকটা তারার ঝিলিকের দিকে তাঁদের চোখ, সামান্য মুহূর্ত পর আয়াশ চলে যাবে। কারো সাথে হাত না মেলানো ছেলেটা নিজের বুক পাঁজরে একটি মেয়েকে আগলে রেখেছে। কেউ দেখলে অবাক না হয়ে বোধহয় পারবে না। কিন্তু সেই মানুষটা কি জানবে? এই পুতুলটার জন্য ছোট থেকে পাগল সে। আশার দিকে তাকায় সে। আশার ঠোঁটে একটু হাসি তবে কথা নেই আর। শেষে একটা কথাই আশা বলল,
“এতটুকু তেই আমি তুষ্ট আপনার সাথে, নিজেকে এতটুকু পাল্টে রাখবেন যেন মন খারাপের সময় আপনার কাঁধে মাথা রেখে বসতে পারি। আমরা স্বামী স্ত্রী কম বন্ধু বেশি হবো।”
এসে গেছি কাছাকাছি,
আরও কাছে টেনে নাও,
আজ তুমি ঢালো আরও আলো
আর কিছু না জানতে চাও
আমায় সাজাও
তুমি বন্ধু দুচোখে আমাকে জড়াও
তুমি হাত বাড়ালে বন্ধু হয়ে যাও
চলবে..