#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ১২
অসম্ভব রূপসী বউ সেজে বসে আছে আশা, চোখের নিচে গাঢ় কাজল আর মুখে হালকা সজ্জার প্রলেপ, আশার রূপ বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েক গুণ। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ও তাশা, মেয়ের এমন অসম্ভব সুন্দর মুখ দেখে নীরবে চোখ ভরছে তাশার। অন্তিহা হালকা কাজ করা লেহেঙ্গা পরে আশার কাছে আসে, মেয়েটার সাজ বরাবরই হালকা তবে অল্পতেই কুহুর মতো সুন্দর লাগে তাকে। আশার কাছে এসে ওর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ হাসে সে। অতঃপর অল্প হেসে বলে,
“আশু আমার ট্রান্সফার লেটারটা নিতে হবে আজকেই। ইমেইল না করলে ফ্রান্স অ্যাডমিশন নেবে না। তোকে তো বলেছিলাম যেতে হবে আমার।”
এত সুন্দর একটা দিন পার করে দেবে আশা অন্তিহাকে ছাড়া? তবে প্রয়োজনীয় দিকটাও একটু দেখতে হয়। মন খারাপটাকে লুকিয়ে মেকি হেসে বলে আশা,
“ঠিক আছে, তবে বিয়ের আগে চলে আসবি কিন্তু।”
“তাকে তাড়াতাড়ি আনার দায়িত্বটা না হয় আমিই নিলাম আশু?”
প্রদীপের হাস্যোজ্জ্বল কথাটায় সবাই দরজার দিকে তাকায়, ছেলেটার সাথে গাড়ি আছে তাড়াতাড়ি করে ফেরার চান্স বেশি। আর কুহু-অন্তিক গিয়েছে সৃজনদের এয়ারপোর্ট থেকে আনতে। অন্তিহা নিষেধ করতে গেলে আশা ফোঁস করে বলে,
“কলেজ অনেক দূর অন্তু, আর একটু পর আয়াশ চলে আসবে। প্রদীপের সাথে যা। তাড়াতাড়ি আসবি তুই ছাড়া অসহায় কতটা জানিস তো?”
মুহূর্তেই আশার সাজানো চোখগুলো টলটল করে ওঠে, আশার এমন বাচ্চামোতে গলে গেল অন্তুর পাথর মনটা, আশাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলে,
“ওরে আমার বড় বোনটা, তোকে একা ছাড়ব বিয়েতে অসম্ভব। ওনার সাথেই যাব। থাক তাড়াতাড়ি এসে পড়ব। দেখবি তোর মুখ থেকে কবুল হওয়ার আগে আমি আসব।”
দু'জন কিছুটা সময় একে অপরের মাঝে মিশে রইল নীরবে। প্রদীপ তাড়া দিতেই আশার থেকে বিদায় নিয়ে অন্তিহা বের হয় বাসা থেকে। তাশা-আকাশও কক্ষ থেকে বের হয়। বিয়েটা যেহেতু নিচে ড্রয়িং রুমে হবে আশা নিজের কক্ষেই আছে। আশা কৌতূহলবশত রুম থেকে একটু বের হয়ে তাকায় সিঁড়ি দিয়ে নিচে, নাজু ও ফ্রেন্ডরা মিলে ছবি তুলছে। গায়ে ধূসর বাদামি একটা পাঞ্জাবি পরনে অহীন, কাজ করছে। কখনো বাসার এই কোণে তো কখনো ওই কোণে।
এই সময়টা অহীনের জন্য মায়া হলো একটু, ছেলেটা এত কিছু করেও কত সুন্দর দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে। আশার চোখের দিকে আচানক অহীনের চোখ মিলতেই দুজন থমকায়, লাল রঙের আলগা প্রলেপ যুক্ত ঠোঁট জোড়ার দিকে তাকায় অহীন। আজ আর দুষ্টুমি করল না। আলতো হেসে আশাকে মন ভরেই দেখল সে। পাশ থেকেই হঠাৎ রোমানা বেগমের ডাকে অহীন হকচকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। তিনি এসে অহীনের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“ছেলে কখন আসবে? দুপুর যে পার হলো?”
অহীন ক্ষীণ হেসে ওনার চিবুক টেনে বলে,
“ওরে বুড়ি তোমার দেখছি আশার চেয়ে বেশি তাড়া, বিয়েটা তোমাকেই দিয়ে দেব নাকি?”
“খাট হোক তোর মুখে, ওমন ছেলেকে আমার শত্রুও বিয়ে না করুক। খাওয়ায় বাছে, বসায় ভাবে, সব কিছুতেই ন্যাকামামো। বলেছিলাম তোকে।”
বলতে দিল না অহীন ওনাকে কথাটা, রোমানা বেগমের কাঁধ জড়িয়ে ধরে আলতো হেসে বলে,
“এসব আর নয় বুবু, যে যাকে নিয়ে ভালো তার সাথেই থাকা উচিত। আর এমনিতেও।”।
অহীন আশার দিকে তাকায়, আনমনেই বলতে থাকে,
“দেখেছ আমার পেঁচিকে? কত সুন্দর ও! ওর চুল, ওর গাল সবকিছুতেই যেন এক মায়াবী রূপ। মাশাআল্লাহ! সত্যি বলতে, ওর সাথে আয়াশের মতো কাউকে একদম মানিয়ে যায়। লম্বা-চওড়া, সুদর্শন ওরাই মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জুটি। সেখানে আমি কোথায় ওর সমান হব? ওর পাশে দাঁড়ালে তো আমাকে সামান্য একটা কীট মনে হবে। সাদা রং টা ছাড়া আছেই বা কি আমার?"
গাল বাঁকালেন রোমানা বেগম লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই দিলেন কুরুচিপূর্ণ কথাটি,
“এত সুদর্শন হয়ে ফায়দা কী সেই তো আদরের সময় মুখ ফেরাবে। আর ও অসুস্থ হলেও ছুঁয়ে দেখবে না।”
অহীন আর ওনার সাথে অহেতুক তর্কে জড়াল না। কেন জড়াল না, তা হয়তো তার নিজেরও অজানা। মনের এক কোণে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা দানা বাঁধছে। কিছুক্ষণ পরেই তার সেই প্রিয় 'মিষ্টি শত্রু' চিরতরে অন্যের ঘরে চলে যাবে। এখন থেকে আর আগের মতো অকারণ মারামারি করবে না কেউ। কথায় কথায় তার খাবারগুলো নষ্ট করে দেবে না। আর কাউকে চুলে ধরে মারবে না, কিংবা কেউ হুটহাট 'কুত্তা' বলে গালিও দেবে না। এই খুনসুটিগুলোর অভাব যে এতটা পোড়াবে, সেটা অহীন আগে বুঝতে পারেনি।
সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরে সে, অহীনকে আসতে দেখে আশা অবাক হয়ে তাকায়, গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের কক্ষের দিকে আগায়। ওর পিছু নিয়ে যায় অহীন। আশা আয়নায় দাঁড়িয়ে দেখছে নিজেকে। দরজায় ঢক ঢক করে শব্দ হতেই পেছন ফিরে তাকায়। নড়তেই পরনের মেরুন কালার লেহেঙ্গাটা ঝিলমিল করে ওঠে আকর্ষিত হয় অহীন। আশা ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে দেয়, অহীন আর অসুন্দর বলে ক্ষেপালো না বরং বলল,
“পেঁচি তোকে আজ মানুষের মতো লাগছে ভালোই হলো, এই দেখে যদি আয়াশের মনটা থামে।”
আশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমাকে পেঁচার মতোই লাগছে।”
অহীন হাসি সমেত আশার কাছে যায়, আশার গালগুলো নিজ হাতে তুলে চিবুক টেনে আনে। আশা একটি ধাক্কা খেল ভেতরটায়, অহীন ওকে ওমন করেই ধরে আদুরে স্বরে বলে,
“আশু বিয়ের পর আয়াশের হয়ে যাবি? আমাদের সম্পর্ক পাল্টে যাবে। ভুলে যাবি আমার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো? আয়াশ জেলাস হয়ে যখন বলবে অহীনের থেকে দূরে থাক। তুই দূরে থাকবি? আর আমার সাথে ঝগড়া করবি না?”
থম মেরে চেয়ে আছে আশা, সকাল পর্যন্ত যেই ছেলের সাথে ঝগড়া করল সে এসব বলছে? এই তো সকালেও মারামারি করল দুজন সামান্য বিষয় নিয়ে। এখন এত বদল কেমন অস্থির লাগছে। আশা তবুও অহীনের হাতের ওপর হাত রেখে বলে,
“পাগল নাকি? আয়াশ বললেই হলো? আমি তোমার বোন না? ভাই বোনের সম্পর্ক কি এমন হয়? এতে জেলাস হবে কেন আয়াশ? তার মেন্টালিটি যথেষ্ট ম্যাচিউর।”
অহীন মেকি হেসে এবার ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের সব সময়ের খোলসে এসে বলে,
“থাপ্পড় খাবি পেঁচি, তুই অন্তুকে দেখেছিস? তোর কি গুণ আছে ওর মত হওয়ার? ওর কথার ধার, ওর ব্যবহার সব দিক দিয়ে আমি বোন বলতে পারব। তুই একটা ন্যাকা মেয়ে তুই পেঁচি থেকে মানুষ হয়েছিস একদিনের জন্য তাই অনেক।”
“ইস সরো তো। আজকে অন্তত ঝগড়া করো না আমার সাথে, চলেই যাব আর পাবে না।”
অহীনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে কথাটা বলল আশা। অহীন একটু সরে গিয়েও সরল না। আশাকে টেনে নিয়ে আসে নিজের বুকে, অল্প স্বরে বলে,
“এর পরের বার ফ্রান্স থেকে আসতে ইচ্ছে হবে না, কার সাথে ঝগড়া করব আমি?”
আশার মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে থামল অহীন, আশা একটি হাত দিয়ে অহীনের বুকের ডান পাশে আলতো করে থাপ্পড় দিয়ে বোঝানোর মতো বলে,
“আসব তো, আমরা সব সময় এক সাথে আসব। আর তুমি জেসিকে বিয়ে করে নিলে দেখবে এ বাড়িতে সবাই অন্য রকম হয়ে যাবে। তোমারও ভালো লাগবে।”
অহীন আর উত্তর দিল না, ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ছেড়ে দেয় আশাকে, নাক টেনে দিয়ে বলে,
“বোস তোর বর মশাই আসল কত দূর খোঁজ নিয়ে আসি।”
অহীন কথাটা বলে রুম থেকে বের হওয়ার সময় নিচ থেকে আকাশের ডাক আসে। আশার দিকে আর তাকানোর সময় পেল না। তবে আশা স্তব্ধ মস্তিষ্কে চেয়ে আছে অহীনকে অচেনা মনে হলো আজ। কথায় মায়া ছিল খুব। অহীন নিচে নেমে আসতেই আকাশ একটু চিন্তিত স্বরে বলে,
“আয়াশ নাকি আরো কয়েক ঘণ্টা আগে বের হয়েছে। ওদের বাসা থেকে তো ওর দাদু ছাড়া কেউ আসবে না। আর আয়াশও পৌঁছায়নি ওর দাদু চিন্তা করছে।”
অহীন আকাশকে আশ্বাস দিয়ে ফোন বের করে আয়াশের নাম্বার ডায়াল করে। তবে পরপর কয়েকবার ফোন সুইচড অফ। অন্তিক কুহু নেই বাসায় মেহমান ভরপুর। বাহির থেকে হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ আসছে ভেসে চারপাশে গুঞ্জন ছড়াল,
“পালকি এসেছে।”
অহীন হেসে দেয়,
“এসেছে অহেতুক তোমাদের টেনশন।”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বের হয় বাসা থেকে। বাড়ির বড় লোহার ফটক পেরিয়ে একটা ফুলে সাজানো পালকি প্রবেশ করে, কিন্তু গাড়ি বা আয়াশের দেখা নেই। আকাশ গিয়ে একজন বেহারার থেকে জিজ্ঞেস করতেই মুখশ্রী আরো গম্ভীর হয়। আকাশ অহীনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যায়,
“আয়াশের ওখান থেকে তো গাড়িতে আসতে ঘণ্টা খানেক লাগার কথা। পালকি এসেছে ও আসেনি?”
আকাশ আয়াশের বাড়িতে কল দেয়, তবে এইবার যেন আয়াশের দাদুর নাম্বারটাও বন্ধ। লোকের স্বল্প কানাঘুষা চলছে, পালকি এসেছে বর কই? আকাশ চিন্তিত মস্তিষ্কে একটু ঘুরে আসে। বিকেল হলো প্রায়। অহীন তাকে নিয়ে ভেতরে যায় একটি কক্ষে গিয়ে বসে। স্বল্প সময় আরাম করে অহীন অনবরত আয়াশের ফোনে কল করেই যাচ্ছে প্রতিবার হতাশ ফোন বন্ধ। এমনি কিছু সময় কাটে। আকাশ বসা থেকে উঠে হতাশ হয়ে বলে,
“অপেক্ষা কর অহীন, আমি গিয়ে খোঁজ করে আসি নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে ওই দিকে।"
আকাশ কক্ষ থেকে বের হতেই তাশার সাথে দেখা হয় তার, নিজ ফোনে চার্জ না থাকায় আশার ফোনটা নিয়ে বের হয় বাসা থেকে। লোকের কানাঘুষা বাড়ছে।
চলবে,,