ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

১৫তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

কপি করা নিষিদ্ধ

পর্বঃ১৫

কক্ষ থেকে বের হয়েই অহীনের হঠাৎ মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে, দেয়ালে হাত রেখে বসে পড়ে নিচে। সবাই সামনে থাকায় এগিয়ে আসে, সৃজন ওর পাশে বসে তড়িঘড়ি করে ধরে নিজ পকেট থেকে ট্যাবলেট বের করে দেয়, যেন সে জানে এমন হতে পারে যে কোনো সময়। অন্তিক সৃজনকে ধরে অহীনকে নিয়ে যায় তার কক্ষে। বিছানায় বসিয়ে শোয়াতে চাইলে সে শুলো না, সৃজনের কোমর জড়িয়ে ধরে বসে আছে। জেসিকে নিয়ে জেইন কুহু অন্য রুমে, তাশার সাথে কথা বলল না কুহু একটি বারের জন্য। সৃজন অহীনের মাথায় হাত বুলোচ্ছে, সৃজন নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,

“কী চাও অহীন তুমি?”

​“ছেড়ে দেব পাপি, আর ভাবতে পারছি না আমি। আইনি কোনো প্রমাণ নেই, মৌখিক তালাক সাক্ষী রেখে, তাহলেই হবে।”

​“চুপ করো অহীন, বিয়েটা খেলা নয়। যে চাপে পড়ে করে নিলাম আর তালাক দিয়ে দেব।”

​অন্তিকের কথায় অহীন ওর দিকে তাকিয়ে বলে,

“তো কী করব আব্বু? সংসার? ওর প্রতি আমার এক বিন্দু অনুভূতি নেই। না ওর আছে আমার প্রতি। কিসের ভিত্তিতে রাখব এই সম্পর্ক?”

​“ভেবেচিন্তে কথা বলো অহীন, সামান্য কারণে যে পরিবারকে পাশে পাওনি তোমরা, ডিভোর্স হলে আশাকে কতটা শুনতে হবে ভেবেছো?”

​“চলে যাব ফ্রান্স, লোকের কথা শোনে কে? আমি তালাক দেব, আশা সুস্থ হলেই দেব।”

​“তোমার মুখে লাগাম দাও, বিয়ে কোনো খেলা নয়। তুমি আশা বাচ্চা নও যে বলল কবুল বলো চকলেট দেব আর তোমরা বলে দিলে। বিয়ের একটা মর্যাদা ও যথেষ্ট ভার আছে। বললেই ভাঙা যায় না। রেস্ট করো, কাল সকালে এই বিষয়ে আলোচনা হবে। আশা করি আশা ততক্ষণে ট্রমা থেকে বের হয়ে আসবে। এন্ড ফার্দার তোমার মুখ দিয়ে তালাক শব্দটা বের হলে থাপড়ে গাল লাল করে দেব বেয়াদব।”

​অন্তিক রাগ নিয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। তার ভাবনাও ভুল নয়, তারা দুজন এতটাও ছোট নয় যে সিদ্ধান্ত ছাড়াই তালাক দিয়ে দিল! সৃজন অহীনের পাশে বসে,

“বিয়েটা ছেলেখেলা নয় অহীন, পরিস্থিতি সবাই বুঝতে পারছে। আজ যে সমাজের কটূক্তি থেকে বাঁচাতে তুমি বিয়ে করলে, তালাক দিলে সেই সমাজ আবার আশার দিকে আঙুল তুলবে। তবে ফায়দা কী হলো বিয়ে করে? কিছুদিন একসাথে থাকলে অনুভূতি কাজ করবে, ভালোবাসাও কাজ করবে। তুমি তো জেসিকে ভালোবাসতে না, তাই আশাকে ভালোবাসা খুব সহজ হবে। কেননা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে রহমত আসে।”

​“তুমি পেরেছো মামামকে ভালোবাসতে?”

​“কখনো মনে হয় আমি জেইনকে ভালোবাসি না?”

​“মনে করা আর সত্যির মধ্যে পার্থক্য নিশ্চয়ই তুমি বোঝো?”

​“আমি দীর্ঘ ২১ বছর জেইনের সাথে আছি, ওর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল আমার মন থেকে কুহেলিকা নামটা মুছে দেওয়া। ওর মতো করে কখনো কুহেলিকা আমাকে রাখত না। জেইনের যত্নে অন্য রকম মায়া আমি রোজ আবিষ্কার করেছি। হয়তো ভালো না বেসেও কুহেলিকার চেয়ে বেশি ভালোবাসি আমি জেইনকে।”

​অহীন সৃজনের কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত করে গুঙিয়ে ওঠে, থেমে থেমে অস্ফুট স্বরে বলছে,

“চাই না পাপি, একটুও না! একদম মামামের মতো না। আমি কি অনেক খারাপ পাপি? ও এমন করে কান্না করছে কেন? ছেড়ে দেব বলার পরেও ও কেন কান্না করছে? পাপি, আমি তোমার মতো হব, সব কিছুতে ওকে গুরুত্ব দেব। এই বিয়ে আমিও রাখব না।”

​অহীনের অস্ফুট কথাগুলো সৃজনকে প্রথম বারের মতো এলোমেলো করছে, ভাবতে বাধ্য করছে অহীন আশাকে ভালোবাসে অনেক আগে থেকে। কিন্তু কই, কখনো তো বুঝল না এমন কিছু। সৃজনের কাছে অহীন সব কথা উগলে দেয় খোলা ডায়েরির পাতার মতো। আজ মনে হচ্ছে সেই অহীন কতটা অচেনা। চঞ্চলতা নেই, বিষণ্ণতাগুলো তার ছোট অহীনকে ঘিরে আছে চারপাশ দিয়ে। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অহীনের মাথায় হাত বুলাতে থাকে সৃজন।

_______

​অন্তিক ক্রমাগত আকাশকে কল করেই যাচ্ছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন ফোনটা বেজে উঠতেই, অন্তিক যেন হাতে প্রাণ ফিরে পেল। হন্তদন্ত হয়ে কলটা রিসিভ করে সে। কিন্তু বাড়ির অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কথা আকাশকে বলার জন্য সে মাত্র মুখটা খুলেছে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে আসা অন্য এক কথায় সে চরম ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। আকাশের কণ্ঠের সেই অপ্রত্যাশিত কথাটি যেন মুহূর্তেই অন্তিকের সব কথা কেড়ে নিয়েছে,

“লিজা তিতাস আসবে শুনে এয়ারপোর্ট আসার সময় আয়াশের গাড়ি উল্টে গিয়েছে ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেয়ে। আমি এই মুহূর্তে হসপিটাল।”

​“ওর কন্ডিশন কেমন?”

​অন্তিকের মুখে এমন কথা শুনে বসা থেকে কুহু উৎসুক হয়ে কাছে আসে। আকাশ আবার বলে,

“একা অপারেশন থিয়েটারে আছে, তবে নার্সদের থেকে যা বুঝলাম আলহামদুলিল্লাহ তেমন কিছু হয়নি। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে দুই দিন সময় লাগবে।”

​“হসপিটালের লোকেশন দে, আসছি আমি। আর তিতু লিজা এসেছে?”

​“না, ওকে মিথ্যা বলা হয়েছিল।”

​“আসছি আমি।”

​কথা আর বিনিময় হলো না। বাড়িতে জানাল না কাউকেই আয়াশের এক্সিডেন্টের কথা, আশা জানলে হয়তো আরও বেশি কান্নাকাটি করবে! সেই তো মেয়েটা মাত্র রুমে গিয়ে চোখ বুজেছে খুব কষ্টে। অন্তিক বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কিছু সময় পার করেই কুহু সৃজন ও জেইনকে নিয়ে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। রোমানা বেগমের কাছে থাকার প্রশ্নই ওঠে না, ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনের উল্কিতে ফুঁ দিয়ে আরও ভরকে দিয়েছেন তিনি নিজেই। কুহু ভোলেনি ওনার করা একটি কাজ, আজও মনির মৃত্যুর জন্য সবাইকে দায়ী করে সে। আজও অন্তিকের সাথে ক্ষীণ মনমালিন্য হয়ে থাকে এসব নিয়ে। অহীনের কক্ষে গিয়ে সৃজনকে ডাকতেই সৃজন ওকে থামিয়ে দেয় হাতের ইশারায়। কুহু অল্প এগিয়ে গিয়ে ওকে ফিসফিস করে বলে,

“অহীন থাকুক, আমাদের বাড়ি যেতে হবে সৃজন। জেইন আর জেসি কোথায়? চলুন।”

​অহীন হয়তো ঘুমায়নি, তাই তো কুহুর অল্প স্বরের কথাটা শুনেই উঠে বসে,

“আমি থাকব না এখানে আর, বাড়ি যাব।”

​কুহু ওর কাছে গিয়ে বসে প্রবোধ দেওয়ার স্বরে বলে,

“অহীন তোর আব্বু আর চাচ্চু আসুক। আশার বিষয়টা ক্লিয়ার হোক। এখন আশাকে একা রেখে গেলে তোর বুবু যা ইচ্ছে বলবে মেয়েটাকে।”

​“অন্তু আছে তো ওর সামনে কিছু বলার সাহস নেই ওনার।”

​কুহুদের কথার মাঝেই জেইন ও জেসি আসে কক্ষে, জেসির মুখে অসহায়ত্ব। অহীন ওকে দেখে চোখ নামিয়ে নিল নিচের দিকে। পরিস্থিতি শীতল হলেও ওর দিকে চোখ মেলানোটা কঠিন মনে হচ্ছে খুব। জেসি অহীনের কাছে গিয়ে বিছানায় তার পাশে বসে, তখন থাপ্পড় দেওয়া স্থানে হাত রেখে বলে,

“সরি, অন্য মেয়ের সাথে প্রথম বার দেখেছি তো, তাই সহ্য হয়নি আমার। তবে আমি এত দুর্বল না যে আপনি ছেড়ে দেবেন তাই ভেঙে যাব। আফসোস হয় জানেন? আমার ড্যাডকে আপনারা সব সময় ব্যবহার করেছেন, ঠকিয়েছেন। আমাকেও ঠকালেন। আমি অভিশাপ দিচ্ছি না, তবে আমার কথা একটা মাথায় রাখবেন, সবার দূরত্ব প্রণয় আনে না। কিছু ক্ষেত্রে প্রণয় আমাদের দূরত্ব টেনে দেয়।”

​একটু থেমে তাচ্ছিল্য করে বলে,

“আমি জেসি আপনাকে ছেড়ে দিয়েছি ওই মুহূর্তে যখন আপনি বলেছেন বিয়ে করেছেন আশাকে। আমার জীবনে ভাগ বলতে নেই। মম ড্যাডের একমাত্র মেয়ে আমি। আমার ড্রেস থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিস একান্তই আমার। আমি ভাগ করতে পারি না, শেখায়নি এটা মম ড্যাডের দোষ। আমার থেকে চোখ লুকাতে হবে না আপনার। কেননা আজকের পর আমি কখনোই আপনাকে পাওয়ার ইচ্ছে রাখব না। এমনকি নিজে এসে আমার পায়ে পড়ে থাকলেও না।”

​অহীন কেবল শুনল, শেষে একটু হেসে উঠে দাঁড়ায়। জেসির গালে হাত দিয়ে শীতল স্বরে বলল,

“হালকা অনুভব করছি, আমার কাঁধ পাতলা হতো। ডেস্টিনি বাজে জিনিস, এত বুঝদার একজনকে পেলাম না। তবে তুমি পাবে এমন একজনকে যে আমার মতো হবে না। দুনিয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে তোমাকে নিজের করবে।”

​অহীনকে বুঝিয়ে তারা বাসা থেকে বের হয়ে যায়। নিজের কক্ষের দরজা লক করে অহীন চোখ বুজেছে সবে। অন্তিককে কল করেছিল দেখতে না পেয়ে, তবে লোকটা রিসিভ করল কই?

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন