#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ১৬ [স্পেশাল পার্ট]
হাসপাতালে হন্তদন্ত হয়ে পৌঁছায় অন্তিক, আয়াশের এখনো জ্ঞান ফেরেনি। লিজা-তিতাস ফ্লাইটে আছে, আসতে সকাল বা পরের দিন বিকেল হতে পারে। আয়াশের দাদু একটা কোণায় বসে আছেন চুপ করে। আকাশ ওকে দেখে একটু স্বস্তির শ্বাস নিয়ে কাছে যায় আয়াশের অবস্থার কথা জেনে। অন্তিক আরাম পায় ভেতরের অস্থিরতা থেকে, পরপর প্রশ্ন করে,
“আয়াশকে কে বলেছে লিজা-তিতু আসবে? ওদের তো আসার প্ল্যান ছিল না।”
আকাশ উত্তর দিল না, আয়াশের দাদুর দিকে ইশারায় দেখালো শুধু আয়াশের স্বল্প জ্ঞান থাকতে আকাশকে বলেছিল। অন্তিক ফোঁস করে শ্বাস নেয়। আকাশকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“তুই বাড়ি যা, তাশা আর আশার অবস্থা ভালো না। আমি আছি এখানে।”
“ছেলেটাকে এই সময় কেমন করে একা রেখে যাই, ওর কেউ নেই অন্তিক।”
“তাশারও কেউ নেই, বাড়িতে ঝড় হয়ে গিয়েছে আমরা না থাকায়। তিতু আসলেই আমি বাসায় চলে আসবো।”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস নেয়। বাড়িতে তার যাওয়া প্রয়োজন খুব। অন্তিকের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে বের হয়ে যায় হাসপাতাল থেকে। অন্তিক গিয়ে আয়াশের দাদুর পাশে বসলো, সামনে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“আন্টি, আমাদের সময়টা যখন ছিল তখন ই আমরা নিজেদের সঙ্গী নিজেরা বেছে নিয়েছি। বাচ্চারা কি তার অধিকার রাখে না? আয়াশকে মিথ্যা বলে কি হলো? হাসপাতালের বেডে পড়ে আছে। বিয়ে করতো সে, বউ নিয়ে ক্লান্তিহীন ঘুম দিতো। কিন্তু তা আর হলো কই? হাসপাতালের বেডে নিস্তেজ পড়ে আছে।”
তিনি উত্তর করলেন,
“ও অসুস্থ এসেছো ধন্যবাদ, কিন্তু আর একটা কথাও বলবে না। যা হয় ভালোর জন্য হয়। তোমাদের মেয়ের সাথে যায় আমার নাতির? তিতু লিজাকে বিয়ে করে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। আশাকে বিয়ে করে সে ফ্রান্স চলে যাবে!”
“করতে পারবে না আর। আমি কি ভাবছি জানেন আন্টি? আমি ভাবছি আয়াশ উঠেই খোঁজ করবে তার পুতুলের। আমি উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। কোন মুখে আমি তাকে বলব তার পুতুল এখন অন্য কারো!”
“মানে?”
“মানে আপনারা যা চেয়েছেন তাই তো হয়েছে। আশার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আয়াশকে কৈফিয়ৎ দেওয়ার প্রস্তুতি নিন। কেননা আপনি আমি আমরা ভালো করে জানি আয়াশের হুঁশ আসতেই আশার খোঁজ আগে নেবে।”
ভদ্রমহিলা ঢোক গিলে নিলেন,
“আশার বিয়ে?”
“হুম, বিয়ে।”
_____
দীর্ঘক্ষণ পর বাড়িতে পা রেখেছে আকাশ, দরজাটা আজ খোলা, তাশা অপেক্ষা করছে হয়ত। লাইটগুলো বন্ধ, শুধু তাশার কক্ষের একটি লাইট জ্বলছে। এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে সকলে মাত্র রাত ১১:৩০। সে দৃঢ় পায়ে কক্ষের দিকে যায়। তাশা চুপ করে বসে কিছু একটা ভাবছে। আকাশ মৃদু হাসে। তাশার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দৃষ্টি নিক্ষেপ না করেই জড়িয়ে ধরে আলতো করে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাশার বুকে। এত চিন্তার অবসান হলো তার এই স্থানটায় এসে। জড়িয়ে রেখেই ফিসফিস করে বলল,
“খুব খিদে পাচ্ছে আমার তাশু জান। খাবার দাও, ঘুমাবো।”
আকাশের চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে উত্তর করে তাশা,
“আয়াশ এখন কেমন আছে?”
কথাটা শুনে কেমন অপ্রস্তুত হয় আকাশ, ভাঙা গলা। বুক থেকে মুখ তুলে তাকিয়ে বলল,
“গলা ভাঙা..”
গাল দুটো ফোলা, আঙুলের ছাপ দেখা যাচ্ছে। চিবুক ধরে নিজের দিকে ফেরায় সে তাশাকে। গালগুলো দেখে চোয়াল শক্ত করে,
“কি হয়েছে বাসায়?”
তাশা আটকে রাখা কান্নার বাঁধ ভেঙে আছড়ে পড়ে আকাশের বুকে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকে,
“আশাকে খালামণি অহীনের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল।”
আকাশের মাথায় যেন বাজ পড়ল। অন্তিক বলেছিল বাসার পরিস্থিতি ভালো না। কিন্তু এমন কিছু আশা করেনি সে। তবে তার চেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে তাশার দিকে তাকিয়ে।
“তোমাকে থাপ্পড় কে দিয়েছে? কোন শুয়োরের..”
বলতে দিল না তাশা, মুখে হাত দিয়ে বলল,
“এমন গালি দেবেন না।”
তাশার চিবুক তুলে পরপর ইচ্ছে মতো চুমু খায় আকাশ, গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“চুপ থাকবে আমি যা করব শুধু দেখবে। আর আমাকে থামালে খোদার কসম তাশু তোমার গালের চামড়া উপড়ে নেব।”
তাশার হাত ধরে রুম থেকে বের হয় সে। ড্রয়িং রুমের লাইট অন করে দেয়। এবং চেঁচিয়ে ডাকতে থাকে,
“আম্মু, আশু, অহীন নিচে নামো।”
পরপর সে চেঁচাচ্ছে, এত রাতে তার গর্জনের শব্দ যেন প্রতিটি দেয়াল স্পর্শ করে বাজছে। সিঁড়িতে এসে অন্তিহা আর অহীন দাঁড়ায়। রোমানা বেগম বেঘোর ঘুম থেকে উঠে এসেছেন হয়তো। কাউকে কিছু বলার সুযোগটুকু না দিয়ে টি-টেবিলে থাকা কাঁচের প্লেটগুলো ফেলে দিয়ে গর্জে ওঠে,
“আপনাকে সাহস কে দিয়েছে আমার বউ-বাচ্চার গায়ে হাত দেওয়ার? আপনার অধিকার আমার ওপর, তাদের ওপর নয়।”
রোমানা বেগম হতভম্ব হয়ে বললেন,
“কি বলছিস আকাশ, হঠাৎ বাড়ি এসেই কি হলো?”
তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল আকাশ,
“কি বলছি? আপনি মনে করেন বয়স হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে বলে ওর প্রতি খেয়াল কমে গিয়েছে আমার? ওকে থাপ্পড় দিয়েছেন কেন? আপনি মা তার মানে এই নয় যা ইচ্ছে হবে করবেন। আমাকে দেখেছেন ওকে ধমক দিতে? আপনি ওর গায়ে হাত তুলেছেন কেন?”
দাঁতে দাঁত পিষে কথাগুলো বলছে আকাশ। সিঁড়ির ধারে চেঁচামেচিতে আশা বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। আকাশকে দেখে ছুটে নেমে আসে, ধপ করে জড়িয়ে ধরে। মেয়ের মাথায় হাত দেয় সে। আশার সব রাগ, অভিমান, অভিযোগের সাথে বেরিয়ে এলো এবার,
“তুমি নেই, এই মহিলা বাড়িভর্তি লোকের সামনে যা নয় তাই বলেছে আমাদের। ফুন্নিকেও বাদ দেয়নি। অহীনের সাথে আমাকে নোংরা কথা বলেছে। আব্বু, এই মহিলার সাথে থাকতে চাই না আমি। অন্য বাসা নাও।”
“কেঁদো না তুমি, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“আয়াশ কোথায় আব্বু?”
“সে ভালো আছে চিন্তা করো না, রুমে যাও।”
“নিয়ে যাবে আমাকে?”
আকাশ শীতল চোখে আশার দিকে তাকায়, পরমুহূর্তে উপরে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা অহীনের দিকে তাকায়। বিষয়গুলো কেমন ভাঙনের মতো লাগছে। অন্তিকের সাথে কখনোই কোনো বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়নি তার। এবার কি তবে হবে? অহীনের কাতর দৃষ্টি দেখে আকাশ আশাকে উত্তর না দিয়ে নিজের মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি আজকের পর আপনার সমস্ত সিদ্ধান্ত এই বাড়ি থেকে নিষিদ্ধ করলাম। কারো জীবনে আপনার কোনো কথার গুরুত্ব রবে না। আমার বউ-সন্তান থেকে দূরে থাকবেন। আমার মা, চাইলেই পারছি না বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে। তবে তাশুর গায়ে হাত তোলা আপনার উচিত হয়নি। আপনার ভাবা দরকার ছিল আপনার কাছে যে মেয়েটার কেউ নেই, এতিম, তুচ্ছ আমার কাছে সেই মেয়েটাই অমূল্য যার গায়ে আঘাত আমি নিতে পারি না। আপনি কিছুদিনের জন্য মামাবাড়ি গিয়ে আসুন। পরিস্থিতি ঠিক হলে নিয়ে আসবো।”
অতঃপর হাঁক ছাড়ে চেঁচিয়ে,
“তাইয়ান, কালকে তুমি তোমার বুবুকে দিয়ে আসবে।”
হতভম্ব সকলে। আকাশের কড়া কথাটা যেকোনো মায়ের মনে কঠিন আঘাত হানার জন্য যথেষ্ট। তিনি ভাঙা স্বরে বললেন,
“আকাশ আমি তোর মা হই।”
“তাশা আমার বউ, আশা আমার মেয়ে। আম্মু, আমি শান্ত থেকেছি অন্তিক হতে পারিনি আর না তাশা কুহু হতে পেরেছে। আমি তাশার পাশে থেকেও তাকে তোমার ভরসায় রেখেছি। প্রতিক্ষণ তোমার কটূক্তিগুলো আড়াল করে তাশা। আমি অন্তিক হয়ে গেলে তুমি কোথায় থাকতে? আমার বউ-বাচ্চা কি তোমার থেকে সামান্য সম্মান ডিজার্ভ করে না?”
“অহীন খারাপ ছেলে না যে তুই এমন ভাবে বলছিস, আমি আশার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছি!”
“অহীন আমাদের হাতের সন্তান, কোলেপিঠে করে বড় করেছি, আমিও জানি আমার মেয়েকে সে কখনোই কষ্ট দেবে না। এমনকি তার ভেতরটা পড়ার মতো দক্ষতা আমি রাখি। কিন্তু মনের মিল দুই দিক থেকে হতে হয়। অহীন আশাকে ভালো রাখবে বললেই হয়ে যায়? আশারও তো অহীনকে ভালো রাখতে হবে! আশা এমন পরিস্থিতিতে আয়াশকে চায়। বিয়ে হয়ে গেছে ওর, তবুও অন্য একটা পুরুষের জন্য কান্না করছে। বুঝতে পারছ সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার ঠিক কেমন লাগছে?”
সত্যি তো, অসহায়ের মতো আশার দিকেই তাকিয়ে আছে অহীন, বাকরুদ্ধ সে। অন্য সময় হলে হয়ত আশাকে খুব ক্ষ্যাপাতো সে। কিন্তু এখন নড়তে পারছে না। রোমানা বেগম তবুও গলা তুলে বললেন,
“ভালোবাসার কথা বলছো? অন্তিক-কুহুর মাঝেও ছিল না। তারা এত বছর একসাথে থাকছে না? আমার সিদ্ধান্ত তুমি গুরুত্বহীন করে দাও। তবে একটা কথা শুনে রাখো, তাদের তালাক হলে আমি গলায় দড়ি দেব। তোমার মামার বাসায় আমি কালকেই যাব। তবুও ওদের বিচ্ছেদ তুমি করাবে না।”
শেষ করে হনহনিয়ে চলে গেলেন তিনি রুমে, দরজা বন্ধ করে দিলেন ঠাস করে। আকাশ অহীনকে নিচে ডাকে। অহীন নিচে এসে তার সামনে দাঁড়ায় মাথা নুইয়ে। আকাশ কড়া কণ্ঠে বলল,
“তুমি বাচ্চা? বিয়ে করে নেওয়ার আগে পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন ছিল না?”
মাথা নুইয়েই কৈফিয়ত দিল অহীন,
“ছোট বাবা, হঠাৎ পরিস্থিতি এমন হওয়াতে মাথা কাজ করছিল না। না ভেবে ভুল করে ফেলেছি। বাট আই প্রমিজ, আমি সবকিছু আগের মতো ঠিক করে দেব।”
“কি ঠিক করবে?”
অহীনের উত্তরের আগেই আশা বলল,
“ডিভোর্স দেবে।”
“তোমাকে জিজ্ঞেস করি নি আমি আশু। অহীনকে জবাবদিহি করছি মানে এই নয় তার দোষ, সে ঠিক করেছে। আয়াশ চায় তোমাকে, তার পরিবার না। এন্ড আই সাজেস্ট ইউ টু। দু’জন নিজেদের মানিয়ে নাও। ডিভোর্স হচ্ছে না।”
আশা দুই পা পিছিয়ে গেল আকাশের কাছ থেকে। অবিশ্বাস্য কথাটা তার ভাবনা চুরমার করে দিচ্ছে। একটা দিনে কত কিছু পাল্টে গেল তাদের মধ্যে। আকাশ যে আশার সবকিছুতে পাশে থেকেছে, সে মানিয়ে নিতে বলছে? কেন? আশা পাগলের মতো ক্ষীণ হেসে বলল,
“ভয়, ভয় দেখাচ্ছ আমাকে আব্বু? অহীন কিভাবে? আয়াশের সাথে অ্যাডজাস্ট করার কথা তাই না? অহীনকে ভাবতে পারব না আব্বু।”
“বিয়েটা খেলা নয়, আর আজকে সমস্ত পরিস্থিতি দেখে বুঝলাম তোমার উপস্থিতি আয়াশের জন্য ঠিক নয়। অহীন ভালো ছেলে, আশা করি অহীন আমার মেয়েকে আমার থেকে বেশি ভালো রাখবে।”
“ছোট বাবা কি বলছ এসব? সম্ভব না। আমি বাড়ি যাচ্ছি।”
“আশুকে নিয়ে যাও।”
“আব্বু আসুক আলোচনা হোক।”
“আমি চাই না কেউ আমার মেয়েকে বলুক, এক পুরুষের সাথে থেকে অন্য পুরুষের গলায় ঝুলেছে।”
“আমাদের সম্পর্কটা দীর্ঘদিনের হবে না।”
আশার কথায় আকাশ ওর দিকে গম্ভীর চোখে তাকায়, একটু থতমত খায় সে। অহীনের পানে তাকাতেই অহীন বাসা থেকে হনহন করে বেরিয়ে যায়। আশা আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
“আমি লোকের কথা ধরি না আব্বু। আর না অহীন আমাকে ভালোবাসে। ওকে জিজ্ঞেস করলে সে বলবে। সে প্রয়োজনে বিয়ে করবে না তবুও আমাকে বিয়ে করতে রাজি না। কিন্তু আয়াশ এতদিন অপেক্ষা করেছে আমার জন্য, আমাকে ভালোবেসে।”
আকাশ ওর দিকে এগিয়ে যায় রুক্ষ স্বরে বলল,
“বিয়েটা খেলা নয় এটা আমি তোমাকে বারবার বলে দিচ্ছি আশা। যা হয়েছে তোমাদের ডেসটিনি। সুযোগ দাও। অহীন তোমার বড় বাবার মতো নয়। সে ভালো রাখবে তোমাকে।”
অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে আছে আশা আকাশের দিকে। পরক্ষণেই বাহির থেকে বাইকের হর্নের শব্দ আসে। অহীন বাসার ভেতরে এসে আশার হাত ধরে বলল গম্ভীর স্বরে,
“খেয়াল রাখব তোমার মেয়ের।”
আশা ওর দিকে তাকাতেই সজোরে বলে,
“সম্পর্ক চাপাবো না পেঁচি, আমার সাথে চল নয়ত পাগল হয়ে যাবি এনাদের কথায়।”
আকাশ দেখছে তাদের। অহীনের কথায় হয়ত একটু টনক নড়ল আশার। অহীনের হাতের টানের সাথে সেও যাচ্ছে বাহিরে বাইকে বসে। কারো সাথে কথা না বলে এত রাতে বের হয়ে গেল তারা। তাশা আকাশকে বলল চিন্তিত স্বরে,
“এত রাতে চলে যেতে দিলেন?”
“ওদের একা কথা বলে ঠিক করতে দাও, পরে না হয় আমরা বলব।”
_____
_____
বাইকের শাঁ শাঁ শব্দে চারপাশে কেমন নীরব শীতলতা ছড়াচ্ছে। অহীনের চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। আকাশের তারাগুলো চিকচিক করছে। বড় গোল চাঁদটা আজ অপূর্ব সুন্দর লাগছে। আশার এলোমেলো লেহেঙ্গাটা এখনো গায়ে, সাজ ধুয়ে নিয়েছে। চুলগুলো আউলে আছে। অহীনের কাঁধে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“এই, কই যাচ্ছি আমরা?”
অহীন বিরক্ত হলো তবুও উত্তর দিল না। আশা পরপর জিজ্ঞেস করছে তাই রাগ দেখিয়ে বলল অহীন,
“বিয়ে করেছি, এবার জাহান্নামে নিয়ে যাব।”
আশার বিগড়ে থাকা মস্তিষ্ক এবার যেন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারায়। রাস্তার জনমানবহীন নিস্তব্ধতা আর পাশের বিশাল মাঠটা সেই উন্মাদনা রাগ আরও বাড়িয়েছে তার। রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আশা হুট করে পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে অহীনের দু-চোখ চেপে ধরে। মুহূর্তেই অহীনের চোখ ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে যায়। চলন্ত বাইকের হ্যান্ডেলটা ও মরণপণে চেপে ধরে সে, চাকার ঘর্ষণে রাস্তার নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যাচ্ছে। আতঙ্ক আর বিস্ময় মেশানো এক তীব্র চিৎকারে অহীন বলে,
“পেঁচি চোখ ছাড় নয়ত মরব দু’জন।”
“না ছাড়ব না, জাহান্নামে যাব তোকে নিয়ে কুত্তা।”
“ইয়া আল্লাহ ওর মুখে ঠাডা ফেলো, বিয়ে করা স্বামীকে মারার পায়তারা করছে পরকীয়া বাঁচানোর জন্য।”
“জাওরা, তোর ওপর গজব পড়ুক! আমাকে বলিস পরকীয়া করি? থাকব না আমি তোর সাথে, মরণ শ্রেয় তোর চেয়ে।”
বাইকটা স্লিপ কেটে মাঠের এক কোণে আছাড় খেয়ে পড়ে। ধুলোর ঝাপটায় চারপাশ ঝাপসা, কিন্তু সেই মুহূর্তেও অহীন আশার হাতটা টেনে ধরে। ওকে নিজের বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, ‘মরলে একসাথেই মরব, আলাদা হব কেন?’ অহীনের শরীরটা তখনো আতঙ্কে তিরতির করে কাঁপছে, আর তার বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে আশা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। দূরে দু-তিনজন লোক ওদের দিকে দৌড়ে আসছে দেখে অহীন তড়িঘড়ি করে আশার মুখটা নিজের বুক থেকে তোলে। অত্যন্ত করুণ আর ভেজা স্বরে বলল…
“এসব কি আশু?ঠিক আছিস তুই? আমি বলেছি তো আমিও তোর সাথে থাকতে চাই না। সময় দে আমাকে প্লিজ। বিশ্বাস কর তোর থেকে অনেক কষ্ট বেশি হচ্ছে আমার। গুলিয়ে ফেলছি নিজেকে। একটু সময় দে আমি সব ঠিক করে দেব।”
আশা ওর বুকেই চুপ করে মুখ গুঁজে আরও কেঁদে ওঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ওদের এহেন কাণ্ড লোক দুটো দেখে এগিয়ে আসতেই দুজন উঠে দাঁড়ায়, লোকগুলোকে ধন্যবাদ দিয়ে বুঝিয়ে দিল পরিস্থিতি, যার ফলে কথা বাড়ালো না কেউ। ঘাসের ওপর পড়াতে চোট পায়নি তেমন কেউ। বাইকে বসে আবার দুজন পাড়ি জমায় অজানায়।
______
আয়াশের জ্ঞান হয়ত ফিরেছে আরও ঘণ্টা ত্রিশ আগে। অন্তিক আর আয়াশের দাদি বসে আছে তার পাশে। একজন নার্স একটি ইনজেকশন টিস্যুর সাহায্যে পরিষ্কার করে ওর হাতে ফোটাতে যাবে ঠিক যেই মুহূর্তে অল্প ও অস্পষ্ট স্বরে বলল আয়াশ,
“এটা ক্লিন হয়নি, শুধু টিস্যু ইউজ করলে ব্যাকটেরিয়া কাটে না।”
মেয়েটি অন্তিকের দিকে তাকায়, ইশারায় আয়াশের ইচ্ছে মতো করতে বলা হয় তাকে। রুমটা ভিআইপি হওয়াতে যথেষ্ট ক্লিন তবুও আয়াশের প্রেশার কমছে না। নার্স চলে যেতেই আয়াশ অন্তিকের দিকে তাকায়। যেই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই ঠিক সেই প্রশ্নটাই আগে করল আয়াশ,
“চাচ্চু, পুতুল কান্না করছে?”
অন্তিক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ওর দিকে তাকায়, ওষ্ঠদ্বারা অধর ভিজিয়ে বলল,
“হুম খুব কান্না করছে।”
“কেন ওকে বললেন এক্সিডেন্টের কথা? এই তো দুটো দিন পর ঠিক হয়ে যাবো।”
“বলি নি তো, তুমি যাও নি তাই কান্না করছে।”
“কষ্ট পেয়েছে, অবিশ্বাস করছে?”
শীতল হাসে অন্তিক। ছেলেটা বলতে পারছে না, তবুও কেমন আশার প্রতিটা কথা জিজ্ঞেস করছে। অন্তিক নরম স্বরে উত্তর দেয়,
“সে অবিশ্বাস করতেই পারে না তোমাকে।”
আয়াশ চুপ করে গেল, আর শক্তি নেই কথা বলার। চোখ জোড়া বুজে নিল নীরবে। বন্ধ চোখে আর একবার বলল,
“আশাকে একটু নিয়ে আসবেন চাচ্চু, সরি না বললে প্রেশার কমবে না।”
“কালকে আনব।”
আয়াশ তার দাদুর সাথে কথা বলল না, চোখ জোড়া বুজে আছে। লিজা-তিতাস হয়ত এয়ারপোর্টে আছে। অন্তিক দেয়ালে হেলান দিল। আয়াশ চোখ বুজে রেখেই বলল তার দাদুকে উদ্দেশ্য করে,
“আমাদের ক্লাস ওনাদের থেকে উপরে দাদু, কিন্তু যখন আমি অসুস্থ তখন তারাই সঙ্গ দিয়ে আছে। মম ড্যাড কই? আমার অসুস্থতাটা কেমন জানো? যে কাউকে বিয়ে করলে টাকা দেখে করে নেবে। তার ৬ মাস পর আমার সাথে কোনো মেয়ে থাকবে না। আশা তেমন না, সে আমার ফোবিয়াকে ছোট করে দেখে না। আমি আশাকে নিয়ে ফ্রান্স চলে যাবো। আর বাংলাদেশ ফিরব না।”
_____
একটা পিনপতন নীরব নদীর পাড়। একটি চায়ের টং দোকানের হলুদ আলো ছড়িয়ে আছে চারপাশ। হাতে দুই কাপ চা নিয়ে দ্রুত পায়ে অহীন ঘাটের দিকে আগাচ্ছে। লেহেঙ্গা ছড়িয়ে বসে থাকা রমণীর নিকট গিয়ে একটি কাপ সে এগিয়ে দেয়। চোখের সামনে ধোঁয়া ওঠা কাপটা দেখে অহীনের চোখের দিকে তাকায় আশা। ভেজা চোখের পলক ফেলে কাপটা নিয়ে নেয় সে। ভেজা ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা চুমুক দিয়ে পাশে রেখে দিল। অহীন পেছনে ঘাটের সিঁড়িতে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“পরিবারের সবাই আপাতত বিয়েটাকে বড় করে দেখছে আশু। চল না সম্পর্কটাকে ছোট একটা সুযোগ দেই। অনেক আদর করব তোকে। কখনো পেঁচি বলে ক্ষ্যাপাবো না।”
আশা ওর দিকে তাকায় অবাক চোখে। কি শান্ত এই চাহনি! অহীন আশার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিয়ে ওর মাথায় থাপ্পড় দিয়ে বলল,
“মজা করলাম, তোর সাথে থাকার চেয়ে ভালো সারাজীবন ভার্জিন থাকব পেঁচি।”
আশা পাশ থেকে চায়ের কাপটা তুলে দেয়। এখনো ধোঁয়াগুলো পেঁচালো ভঙ্গিতে মিশে যাচ্ছে নদীর শীতল বাতাসের সাথে। ঠোঁটে রেখে চুমুক দিতেই থতমত হয়ে ফিরিয়ে নেয় ঠোঁট থেকে। গরমটা হয়ত লাগল ঠোঁটে। ভেতরের কষ্টের সাথে মিশে এখন বাহ্যিক কষ্টটা এবার কান্নার সাথে আবার বেরিয়ে আসে। আচানক নিজের চায়ের কাপটা রেখে আশার ঠোঁটে হাত দেয় অহীন। গালসহ ঠোঁটে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছে,
“সাবধানে খাবি তো পাগল। সারাক্ষণ কান্নাই করছিস, এবার শান্ত হ। আমি বলেছি সব ঠিক করে দেব, কালকে আয়াশের কাছে নিয়ে যাবো।”
আশা একটু শব্দ করে কেঁদে দিল আবার। অহীন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ছিঁচকাঁদুনি হয়েছিস একটা পেঁচি, চুপ!”
ধমকে আরও কেঁদে দিল মেয়েটা। অহীন হালকা হেসে ওর নাক ধরে টেনে দেয় আলতো করে। অতঃপর কান্না থামানোর জন্য জীবনের প্রথম আশার জন্য গাইল,
“শোনো না রূপসী,
তুমি যে শ্রেয়সী,
এ ভীষণ উদাসী প্রেয়সী,
না না না না না…
জীবনের গলিতে,
এ গানের কলিতে,
চাইছি বলিতে…”
থেমে গেল অহীন। পরের শব্দটা মনে হলো তার জন্য নয়, গলায় কেমন কাঁটা বাঁধছে যতবার বলার চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে এই শব্দটা কখনোই তার জন্য নয়। শুকনো ঢোক গিলে পিছিয়ে আসতে নিতেই আশা নিজ থেকে আছড়ে পড়ে অহীনের প্রশস্ত বুকে। দুই হাতে পেঁচিয়ে ধরে তার পিঠ। হঠাৎ এমন হওয়াতে হিতাহিত না ভেবে আশাকে পাল্টা হাতে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে অহীন। তার গলায় মুখ লুকিয়ে রেখেছে তার পেঁচি। ঘাড়ে গরম নিশ্বাস ও চোখের পানি পড়ছে। আশার কান্না খুব পোড়াচ্ছে তাকে ভেতর থেকে। লম্বা চুলের ফাঁকে নিজের হাত গুঁজে দিয়ে আদর করে থামাচ্ছে সে মেয়েটিকে। বাইক থেকে পড়ে গিয়ে পিঠে সামান্য ব্যথা পেয়েছিল, আশার হাত লাগতেই মনে হলো একটু আরাম লাগছে ব্যথাতুর স্থানে। কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এখানে আস্তে করে চেপে ধর বউ, আরাম লাগে।”
আশার কর্ণে গোচর হতেই ব্যথাতুর স্থানে সজোরে কিল বসিয়ে দিল সে।
“অশ্লীল কুত্তা!”
আশাকে ছেড়ে নিজ পৃষ্ঠদেশে হাত দেওয়ার অহেতুক চেষ্টা করে সে।
“পেঁচি তোর জন্য এত কিছু করছি আর আমার ব্যথার স্থানে ব্যথা বাড়িয়ে দিলি নিমকহারাম শালী!”
আশা ওর পায়ে লাথি দিয়ে বলে,
“কুত্তা, বউ ডাকলি কেন আমাকে?”
“বউ তুই আমার, কট ম্যারেজ হোক বা যেমন করেই হোক বউ তো বউ-ই বলব। বউ, বউ, বউ!”
“অহীন মার খাবি কুত্তা!”
“আমাকে মারবি বউ? স্বামীর গায়ে হাত তুললে জাহান্নামে যাবি।”
আশার মনটা হয়ত ভালো হচ্ছে, হালকা হাসি দিয়ে তর্ক করছে অহীনের সাথে। এটাই যেন চাচ্ছিল অহীন, তার পেঁচি ঝগড়ায় সুন্দর, এমন ছিঁচকাঁদুনে হবে কেন?
চলবে,,