#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ ১৭
আকাশটা ভীষণ নরম শান্ত হয়ে আছে, বাদলের কোনো আনাগোনা নেই, তারাগুলো ঝলমল করছে। কী সুন্দর এই দৃশ্য, তবে ওই দূর আকাশের মতো সুন্দর কি সবার জীবন হয়? ঘোলাটে জীবনে ঝড়ের মতো কিছু মানুষ এসে এলোমেলো করে দেয়। এমনই শান্ত আকাশের নিচে পিচঢালা অন্ধকার রাস্তায় চলছে অহীনের বাইকটি। তার পেট জুড়ে আশার নরম লম্বা হাত, একটি আঙুলে আংটি আছে। কালো হয়ে আছে আংটিটা, হবে নাই বা কেন সেই অনেক আগে থেকে যে পড়ে থাকে এটা। স্বর্ণের হলেও হতো তবে এটা পিতলের সোনার জলে ভেজানো। মেয়েটা এটা খুলেই না, সময়ের সাথে আংটিটা আঙুল বদল করেছে। অহীনের মস্তিষ্ক তখন ভাবনায় মশগুল, কেমন করে পরিবারের সবাইকে ডিভোর্সের জন্য রাজি করানো যায়? আদৌ কি সবাই মানবে? আশা চোখ বুজে আছে, অহীন ওর হাতের ওপর হাত রেখে আনমনা হয়ে বলল,
“ঘুমাস না পেঁচি, এটা তোর আয়াশের মার্সিডিজ না, এটা আমার R15, টান দিলেই পড়ে নাক-মুখ ভচকে যাবে।”
আশা ওর পেটে জোরে চিমটি কেটে দিয়ে বলল,
“অহীন প্লিজ, চিন্তায় আছি আমি। আয়াশকে কী বলব? লোকটা অনেক আঘাত পাবে। ছোট থেকে একাই তো থেকেছেন তিনি, এখনো একাই করে দিলাম তাকে। তার মুখের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছি না।”
“এত আয়াশ আয়াশ করবি না পেঁচি, এতটাও ভালো না ও দেখতে। যে সারাক্ষণ নাম জপতে থাকিস।”
“জাস্ট শাট ইয়োর ফাকিং মাউথ কুত্তা, আয়াশের একটা জ লাইন ছুড়ে মারলে বাংলাদেশের অর্ধেক মেয়ে মরে যাবে। এত সুইট বেচারা।”
আশার কথায় আচানক বাইকের ব্রেক চাপে অহীন, আশা শক্ত করে চেপে ধরে তার পেট। অহীন তার দিকে তাকাতেই ঢোক গিলে মেয়েটা। অহীন নিজের পেট থেকে ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
“আজকের জন্য আয়াশের গীত শোনা শেষ, নামুন।”
“নামিয়ে দেবে মাঝপথে?”
“আয়াশের নেশায় এত অন্ধ হয়েছিস? যে চোখে পড়ছে না এত বড় বিল্ডিংটা?”
আশা পাশ ফিরে তাকায়, এটা তো অন্তিকের বাসা। জিভ দ্বারা ওষ্ঠ ভিজিয়ে লেহেঙ্গাটা মুঠো করে ধরে বলল,
“এখানে থাকব?”
“জি, কয়েক দিন ম্যানেজ করে নিন। কালকে আয়াশের কাছে নিয়ে যাব আপনাকে। বিয়ে করে পার্সোনাল সেক্রেটারি পেয়ে গেলেন ম্যাডাম।”
“ফুম্মি কিছু বলবে না?”
“ও হ্যালো, পালিয়ে বিয়ে করিনি তোকে, ওনার চাচি আমাদের জোর করে বিয়ে করিয়েছে। চাচির ভুলের পর এতটুকু তো মানতেই হবে। কিছু বললে জোর দিয়ে বলবি ডিভোর্স করিয়ে দাও।”
অহীন নিজের বাইকটা নিয়ে যেতে নিলেই আশা তার পিছু নেয়। বাইক রাখার সময় আশাকে দেখে অহীন ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“পেঁচি, পিছনে পিছনে ছুটছিস কেন? থাপ্পড় খাবি?”
আশা রাগ দেখাল তাকে,
“তুই খাবি থাপ্পড়, রাত ৩:৩০ আমি গিয়ে কী বলব বাসায়?”
“নাটক করবি না পেঁচি, একদম নাটক করবি না! বেশি বাড়াবাড়ি করলে একটা লাথি দিয়ে একদম ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেব। ভুলে যাস না, তুই এতক্ষণ আমার সাথে ছিলি, কোনো প্রেমিকের সাথে না। আমাকে রেহাই দে এবার, প্লিজ! তোর মন ভালো করার দরকার ছিল, সেটুকুই করেছি। এবার আম্মুর কাছে যা, তোকে আর সহ্য হচ্ছে না আমার। তুই স্রেফ একটা আপদ, আমার জীবনের সব থেকে বড় প্যারা!”
আশার আত্মসম্মানে এবার বেশ চোট লাগে। সে তার লেহেঙ্গার দু-পাশ দু-হাতে শক্ত করে মুঠো করে ধরে। চোখের কোণে পানি জমলেও গলাটা যতটা সম্ভব কঠিন করে উত্তর দেয়,
“তোমার জীবনে আপদ হয়ে কি আমি শখ করে এসেছি? একটু আগে জিজ্ঞাসা করছিলে না আমি আয়াশ আয়াশ কেন করি? কারণ সে অন্তত তোমার মতো আমাকে আপদ মনে করে না। আর শোনো, আমার মন ভালো করার ঠিকা তোমাকে দিয়ে রাখিনি আমি। খবরদার, আজ থেকে আর কখনো আমার মন ভালো করতে আসবে না!”
আশা জেদ দেখিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। জেদি মেয়েটা একটিবার লিফটের দিকে তাকাল না পর্যন্ত। আয়াশের কথা মনে পড়ছে খুব করে। এই তো সেদিনের কথা। আশার ফ্রান্স চলে যাবে বলে মন খারাপ ছিল পরিবার রেখে। আয়াশ হাত ভর্তি ফুল এনে দিল তাকে সাথে চিরকুট,
“পুতুলের মুখে কখনো দেখেছ বিষণ্ণতা? পুতুল হয় হাসার জন্য, হাসানোর জন্য।”
কই সে তো বলে না আপদ। সিঁড়ি দিয়ে তিনতলা পর্যন্ত উঠতেই হঠাৎ লিফটের ভেতর থেকে একটা হাত তাকে টেনে নিয়ে যায়। আচানক আক্রমণে আশা চেঁচিয়ে উঠতে নিলেই অহীন হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে বলল,
“চুপ, আরও চারতলা, হেঁটে গেলে কোমরসহ তুইও ভেঙে যাবি।”
“ভাবতে হবে না তোমার।”
অহীনের হাতে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল আশা। যন্ত্রণায় অহীন কঁকিয়ে উঠলেও আশা সেটা তোয়াক্কা না করে লিফট থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। ঠিক তখনই অহীন এক পা দিয়ে লিফটের দরজা আটকে ধরে ঠাণ্ডা গলায় একটা ভয়ংকর হাসি দিয়ে বলে,
“এই বিল্ডিং নিয়ে অনেক রিউমার আছে, জানিস? ঠিক কয়েক বছর আগে রাত দুটোর দিকে কাউকে চুলে ধরে ওপর থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত চারতলা থেকেই কাজটা করা হয়েছিল।”
আশা থমকে দাঁড়ায়। ওর চোখে হালকা ভয়ের আভাস থাকলেও জেদটা কমেনি একটুও। বরং ঠোঁট বেঁকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে ও পাল্টা বলে,
“ওই চুলে ধরে ফেলে দেওয়া ভূতটা আমিই ছিলাম। সেদিন যাকে ফেলেছি, সেও তোর মতোই বেশি চ্যাটাং চ্যাটাং করছিল। আজ তোর কপাল খারাপ যে তুইও কথা বলছিস। তোকে কেটে কুচি কুচি করে এই লিফটেই তোর মড়া ফেলে রেখে যাব, কেউ টেরও পাবে না!”
অহীনের পায়ে সজোরে মাড়িয়ে দিয়ে আশা যে জেদ নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েছে, সেই তেজ অন্ধকার সিঁড়িঘরে এসে নিভে যায়। প্রতি পদক্ষেপে ওর মনে হচ্ছে কেউ ঘাড়ের কাছে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। নিস্তব্ধ বিল্ডিংয়ে নিজের পায়ের শব্দের প্রতিধ্বনিই যেন ওকে তাড়া করে যাচ্ছে। ভয়ে হাত-পা কেমন শীতল লাগছে তার। লাইটগুলো এক এক করে জ্বালিয়ে ৬ তলা পর্যন্ত কোনোরকমে বুক দুরুদুরু অবস্থায় উঠে আসল। কিন্তু ঠিক তখনি চোখের সামনে দিয়ে কুচকুচে কালো একটা ছায়া তীরের মতো ছুটে যায় ডান থেকে বাম দিকে। আশা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দুই কানে হাত চেপে ধরে চোখ বুজে এক আকাশ ফাটানো চিৎকার দিয়ে তব্ধা খেয়ে আছে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটি হাত এসে তাকে টেনে নেয় নিজের কাছে। এতে ভয় বাড়ল বৈ কমল না। আশা মানবটাকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে ৭ তলায় উঠে কাঙ্ক্ষিত ফ্ল্যাটে গিয়ে চেঁচিয়ে ডেকে ওঠে,
“ফুম্মি খোলো দরজা।”
পেছন থেকে অহীন ডাকছে তাকে,
“এই শালী চুপ থাক, আমি এটা, মজা করেছি।”
তবে কানে কি যায়? ডাকের সাথে সাথেই দরজা খুলে গেল কুহুর, আশা ঝাঁপিয়ে পড়ল কুহুর বুকে। বাইরের লাইটগুলো জ্বলে উঠল নিমিষেই। পাশের দুটো ফ্ল্যাটের দরজা খুলে লোক বের হয়ে এসেছে। অহীন জিভ কেটে কুহুর দিকে তাকিয়ে ভেবলার মতো হাসে। কুহুর চোখে তীক্ষ্ণ রাগ ফুঁসছে। আশাকে আদর করে দিচ্ছে একটি হাত, প্রতিবেশীদের দেখে কুহু লজ্জায় কিঞ্চিৎ মাথা নত করল। একজন তো বললই,
“এত বড় হয়েছ এসব কেমন অসভ্যতা, রাত-বিরাতে?”
অহীন চুলগুলো চুলকে মাথা নত করে বলল,
“সরি আঙ্কেল।”
কুহু ওদের হয়ে বলল,
“ভাইয়া সরি, ওরা ছোট থেকে এমনই।”
“এত রাতে এসব বাচ্চাদের কাজ? আমরা ভেবেছি হয়ত চোর ডাকাত পড়েছে। এত বড় হয়েছে ম্যানার নেই?”
“সরি ভাইয়া।”
কুহু আশাকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করে, অহীনকে যেন চেনেই না। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। প্রতিবেশীদের কথাগুলো হজম করে সে মন দিয়ে। বেশ খানিকটা সময় পর দরজা খুলে যায়। অহীন আস্তে আস্তে পা টিপে ভেতরে প্রবেশ করে। আশা কাপড় পাল্টে নিয়েছে। অন্তুর একটা জামা পরে আছে। অহীন ওকে দেখেও দেখল না যেন। চলে যেতে নিলে কুহু পিছু ডাকে তাকে। পা থেমে মায়ের দিকে তাকায় সে। খুব রেগে আছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কুহু রাশভারী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“আমি বলেছিলাম কালকে তোমার বাবা আসলে আলোচনা করে তারপর আসতে।”
অহীন নরম স্বরে বলল,
“ছোট বাবা রাগারাগি করছিল তাই, আর আশাকে রেখে আসলে কান্না করত পুরো রাত।”
অহীনের দিকে চেয়ে আছে কুহু। জেসি কুহুর কক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে, মেয়েটা কাতর চোখে কেমন অপলক আশাকে দেখছে। ভেতরটায় কেমন হিংসে হচ্ছে তবুও মুখ ফুটে বলছে না একটি কথাও। একটু চোখ বুজতে পারেনি এই রাতটা। অহীন আশার দিকে তাকিয়ে কুহুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ছোট বাবা বলেছে যা হয়েছে তা তো হয়ে গিয়েছে। ওনার মুখের ওপর বলার সাহস নেই আমার। হয়ত ভাববেন ওনার মেয়েকে অসম্মান করছি। আমাদের কাগজে-কলমে বিয়ে হয়েছে, ডিভোর্সের জন্য অ্যাপ্লাই করলেও ৩ মাস সময় লাগবে। ততদিন আশু থাক আমাদের সাথে। আমি ম্যাট্রেসে শুয়ে নেব।”
কুহু ওর দিকে কিছুটা সময় শীতল চোখে তাকিয়ে আশাকে নিয়ে কক্ষে চলে যায়। অহীন ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় জেসিকে একটু দেখল। জেসি এগিয়ে এসে কথা না বলেই ওকে কেমন আলতো করে জড়িয়ে ধরে, অহীন নড়ল না একচুলও। জেসি ফুঁপিয়ে ওঠে,
“সব ঠিক হয়ে যাবে দেখবেন। আপনার পেঁচি নিজের সব কিছু ছেড়ে একদিন আপনার জন্য রয়ে যাবে। কিন্তু তাকে আমার মতো ঠকিয়ে দেবেন না। তার দুনিয়ায় আপনার অস্তিত্ব খুব কঠোর হবে। আপনার জন্য সবার সাথে দূরত্ব টেনে নেবে। সমাজের বিপক্ষে যাবে।”
“আমার পেঁচি? আগে আমার হোক।”
কথাটা বলে অহীন জেসিকে নিজ থেকে সরিয়ে দিল। জেসি মৃদুস্বরে বলল,
“আয়াশ ছেলেটার এক্সিডেন্ট হয়েছে।”
অবাক হয়ে চিন্তিত স্বরে তড়িৎ বেগে অস্ফুট স্বরে বলল,
“হোয়াট?”
“হুম আপনার ড্যাড ওখানেই, সুস্থ আছে আগে থেকে। কালকে আপনাদের যেতে বলেছে।”
অহীন কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নেয় ঠোঁট গোল করে। অনেক কষ্টে আশার রাগ আর ভয় সামলে নিয়ে এসেছে সে, এখন এই নতুন ঝামেলার কথা জানলে মেয়েটা হয়তো পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। কোনো কথা না বাড়িয়ে অহীন ওয়াশরুমে যায় ফ্রেশ হতে। জেসি ধীরপায়ে ঘরে ঢোকে। আশা তখন বিছানায় ঘাপটি মেরে বসে। জেসিকে দেখেও ও মুখ ফেরায়, কিন্তু ভেতরের অপরাধবোধটা ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, মেয়েটাকে হয়ত সেই ঠকাল। শেষমেশ খুব নিচু আর কাতর স্বরে আশা প্রশ্ন করে,
“জেসি, সরি। তোমার বোধহয় খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না?”
জেসি বিছানায় একপাশে কাত হয়ে ছিল। আশার কথা শুনে ও সটান হয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে একটা মেকি হাসির রেখা টেনে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
“না, কষ্ট কেন হবে? যা আমার কোনোদিন ছিলই না, তার জন্য আমি হাহাকার করি না। তবে হ্যাঁ, যা আমার পাওয়ার কথা, তা আমি ঠিক সময়ে নিজের করে নেবই। তোমার ভাবতে হবে না।”
আশা অসহায়ের মতো অনুরোধের সুরে বলে,
“নিয়ে নাও প্লিজ, আমি তো বাধা দিচ্ছি না।”
জেসি এবার সরাসরি আশার চোখের দিকে তাকায়। ওর দৃষ্টিতে তীব্র জেদ আর আত্মসম্মান। বলল,
“না চেয়ে পেয়েছ বলেই আজ এত দয়া দেখাচ্ছ, তাই তো? মনে রেখো আশা, আমি কিন্তু সুযোগ পেলে ছাড়ব না। একদিন আমায় দেখে তোমার নিজেরই জেলসি হবে। আর যেদিন আমি ওকে পেয়ে যাব, সেদিন কিন্তু মরে গেলেও আর ফেরত দেব না। সময়ে সমেটে নিও, এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকলে লোকে কুড়িয়ে নিয়ে যাবে, তখন তোমার অংশ ফুরিয়ে যাবে।”
আশার আর কোনো কথা বলার শক্তি নেই। বুক ফেটে কান্না আসলেও ও চুপচাপ বিছানার অন্য পাশে ফিরে চোখ বোজে। বাইরের বাতাসের চেয়েও ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে। একজন যে হারিয়ে শক্ত থাকার অভিনয়ের চেষ্টা করছে, অন্যজন পেয়ে আফসোসের পাল্লায় নিজের নাম লিখছে। নিজের সেই ছোট সাথিটাকেই যে বারবার মন চাইছে।
____
ম্যাট্রেসের ওপর বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে আছে অহীন। বিকেলে সব ওলট-পালট হয়ে যাওয়া জীবনের মানুষটার কি এত সহজেই ঘুম পায়? মস্তিষ্ক আয়াশ, আশা আর পরিবার খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে তাকে। চোখের সামনে প্রিয় নারীর শাড়ি পরা অবয়বটা দেখে সোজা হয়ে আসে অহীন। কুহু হাতে একটি গ্লাস শরবত নিয়ে ওর কাছে গিয়ে বসে ওর দিকে এগিয়ে দেয় গ্লাসটা। মমতায় আনা শরবতটুকু মৃদু হাসির সাথেই নিল অহীন। এক টানে পুরোটা শেষ করে হেসে বলল,
“মজা হয়েছে। এত রাতে করতে গেলে কেন?”
“বাসা থেকে বের হয়েছিস ১১ টায়, এখন ৩টা প্রায়। আরাম কর।”
কুহু গ্লাসটা হাতে নিয়ে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে শাড়ির আঁচলটা টেনে ধরে অহীন। কুহু ফিরে তাকায়। তার ছেলেটার দুচোখে রাজ্যের ক্লান্তি আর কাতরতা, এই মুহূর্তে সে যেন মায়ের একটু আশ্রয় চাইছে। সেই নীরব আকুতিতে সাড়া দিয়ে কুহু আবার পাশে বসে। অহীন একরাশ বিষাদ নিয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে শোয়। কুহু পরম মমতায় ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খুব মৃদু স্বরে জানতে চায়,
“অহীন, তুই কি ভালোবাসিস আশাকে?”
দুই হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে একটু ক্রন্দনরত স্বরে মায়ের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করল এবার সে,
“না বাসি না, ভালোবাসার মতো কিছু নেই।”
“তাহলে কেন এমন করছিস? ঘুমিয়ে পড়।”
“আম্মু ভালোবাসি না আমি আশাকে কিন্তু ওকে বোঝাও এমন না করতে। আমি সবার মতো শক্ত থাকতে পারি না। এখানে আসলে তোমাদের আর ফ্রান্স পাপির অনেক আদর পেয়েছি, লাইফে সিরিয়াস হইনি কখনো। এত চাপ নিতে পারছি না।”
“কী চাও তুমি?”
“আমাদের তো কাবিন হয়েছে, ডিভোর্সের জন্য অ্যাপ্লাই করলে কমপক্ষে ২-৩ মাস সময় প্রয়োজন তাই না? ওটাই সময়টা।”
অহীনের কথায় বাকরুদ্ধ কুহু। বাচ্চাগুলো ডিভোর্সকে এত সহজ করে নিচ্ছে ভাবতেই অদ্ভুত লাগছে। অহীন তাকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসে। ভেজা চোখ-মুখে বেকুব হয়ে বলল,
“বলো কিছু।”
কুহু ওর গালে হাত রাখে, কপালে আদর এঁকে দিয়ে বলল,
“তিন মাস অনেক অহীন, সময় নাও, তবে সব ঠিক করার জন্য। আশা বুঝবে, একটু বোঝাও। ভালোবাসবে তুমি ওকে। তুমি তো কাউকে ভালোবাসো না, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে রহমত থাকে, মোহাব্বত নিজ থেকে আসে।”
অহীন কুহুর গালে হাত দেয়, ভেজা কণ্ঠে বলে,
“হবে না, ভালোবাসি না আশাকে। কিন্তু তার অবহেলা বারবার আমাকে এক নগণ্য ও অযোগ্য ‘থার্ড পারসন’ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। তাকে শুধু বলো আর মাত্র তিনটি মাস যেন আমায় সহ্য করে, আমি কখনো তার কাছে ভালোবাসা চাইব না, আর না রাখব কোনো অধিকারের দাবি। আম্মু মাত্র কয়েক ঘণ্টা হয়েছে বিয়ের এখনই আমার সহ্য হচ্ছে না আয়াশকে নিয়ে ওর এত পাগলামি। আমিও মানুষ, আমার জীবনেও একটা মেয়ে ছিল। আমারও কষ্ট হচ্ছে। জেসি ভালো মেয়ে আমাকে বোঝে, আশা বোঝে না।”
“বুঝবে, সময় দাও।”
“সময়? ওকে নিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা বাইরে কাটিয়ে আসলাম, ওর মুখ থেকে আয়াশের নামই শুনেছি। আমাকে ফিল করাচ্ছে আমি না থাকলে ওরা ভালো থাকবে। আমরা না, ওদের মাঝে আমি।”
অহীন থামল একটু, শুকিয়ে যাওয়া গলাটা ঢোক গিলে ভিজিয়ে নিয়ে আবার বলল,
“মানে এমন, আমি আর আশা আমরা না! আশা আর আয়াশ মিলে ‘আমরা’, আমি—শুধুই ‘আমি’। ওদের মাঝে ‘আমি’। অন্তত তিনটা মাস আম্মু। নেই ফিলিংস ওর প্রতি তবুও ব্যথা লাগে। মনে হলে আমি ওদের মাঝে একজন। আমি থার্ড পারসন হতে চাই না।”
কুহু অহীনকে টেনে নিজের বুকে লুকিয়ে নিল। এমন কান্না সহ্য হচ্ছে না, সম্পর্কের ভার দুই পক্ষেরই হয়। পুরুষ হয়ত বলতে পারে না তাই বলে কি তাদের অশ্রু নেই?
—-----
আয়াশের পাশে নাক টেনে টেনে অনবরত কান্না করে চলেছে লিজা, তিতাস লিজার মাথায় হাত বোলাচ্ছে। প্রায় অনেকটা সময় আগেই এসেছে তারা। আয়াশকে একটি বার ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়ত মা হয়েও পেল না লিজা। ছেলের এমন অবস্থায়ও ললাটে চুমু আঁকতে পারছে না। আয়াশের ঘুমানোর সময়টা, নার্সগুলোর কথায় সবাই কক্ষ থেকে বের হয়েছে। কিন্তু মায়ের মন কি সরে? এতদিন পর একটি মাত্র ছেলেকে এমন অবস্থায় দেখছে তবুও ছুঁতে পারছে না। লিজা আয়াশকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,
“ক্লোজ ইয়োর আইস।”
আয়াশ নিভু নিভু স্বরে বলল,
“নো মম, তোমরা কান্না করলে ঘুম আসবে না। এতদিন পর পেলাম। I can’t get enough of looking at both of you.”
লিজা ওর একটু কাছে যায়, হাতটা ধরতে নিলে আয়াশ সরিয়ে নিল। আহত হলো মেয়েটা। কাতর গলায় বলল,
“বিয়ে ছিল তোমার, কেন বের হতে গেলে এয়ারপোর্টের জন্য?”
“তোমাদের প্রায় ৪ বছর দেখি না, এক্সাইটেড ছিলাম দেখার জন্য।”
ফিক করে হেসে দেয় লিজা, আয়াশের বাচ্চামো কথায়। নাক-মুখে ভেজা গলায় বলল,
“তার মানে বউয়ের থেকে আমরা বেশি ইম্পর্টেন্ট?”
আয়াশ একটু শীতল হাসে, কোনো রকম দ্বিধা না রেখেই বলল,
“পুতুল ইম্পর্টেন্ট বেশি, তবে ভেবেছিলাম তোমাদের ওই মুহূর্তে কাছে পাব। কখনো কোনো বিশেষ সময় পাইনি তো, একটু বেশি এক্সপেক্ট করেছিলাম।”
লিজা হতাশা ছেয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে তিতাস ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলল নরম স্বরে,
“মম-ড্যাড বিজি থাকি সান।”
“আই নো। আমি একটু ঘুমাবো, তোমরা যাও। সকালে আশাকে আনতে বলে দিও। সরি বলব।”
______
অহীনের কাছ থেকে এসে কুহু নিজের রুমে যায়। আশা চুপ করে বসে আছে, জেসি ঘুমের দেশে। কুহুকে দেখেই আশা গালগুলো ফুলিয়ে নিল। কুহুর হাতে ওর জন্যও শরবতের গ্লাস। আশার কাছে যেতেই আশা ভ্রু ক্রুর করে বলল,
“ফুম্মি তুমি তোমার শাশুড়ির মতো হয়ে গেলে একদিনেই?”
কুহু সন্দিহান চোখে চেয়ে বলল,
“মানে?”
আশা ওর হাত থেকে গ্লাসটা রেখে টেনে বসিয়ে দিল নিজের পাশে, অতঃপর অভিমানী স্বরে বলল,
“তোমার কুত্তা ছেলে আমাকে ভয় দেখাল তাকে বকলে না, উল্টো কোলে নিয়ে আদর করলে তো?”
“তোমাকেও আদর করে দেব সকালে, এখন ঘুমাও মেয়ে। আমার ছেলেটাকে তো বিয়ের দিন রাতে খুব জ্বালালে। কই একটু পতি সেবা করবে তা কই? উল্টো কাঁদিয়ে নিজেই রাগ করে বসে আছ?”
আশার কথার পরিপ্রেক্ষিতে হেসে মজার ছলে বলল কুহু কথাটা। আশা আরও ফুলে ওঠে,
“রোমানা বেগম লাইট ভার্সন।”
কুহু হেসে দিল সাথে আশা। রাত হওয়াতে অনেক হাসতে পারছে না। তবে হাসিটা আস্তে আস্তে বিষণ্ণতায় পরিণত হলো খুব জলদি। আশা মিইয়ে যাওয়া নত স্বরে বলল,
“ওর সামনে আর এমন করব না।”
কুহু আশার মাথায় হাত রেখে বলল,
“সামনের সপ্তাহে ফ্রান্সের ফ্লাইট তোমাদের। মাথা কাজ করছে না। ঘুমাও আজকে। কালকে ইনশাআল্লাহ তোমাদের নতুন সূচনা হবে।”
চলবে,,