ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

১৯তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ১৯

নিস্তব্ধ করিডোরে আয়াশের জুতো থেকে ছিটকে আসা 'খটখট' শব্দ হচ্ছে। হাতের গ্লাভস জোড়া টেনে ঠিক করতে করতে সে যখন অন্তিকের ফ্ল্যাটের ঠিক সামনে দাঁড়ায়, কলিং বেল বাজাতেই যাবে দেখল দরজাটা আধখোলা। ভেতরে পা রাখতেই কিছু একটা আছড়ে পড়ার শব্দে আয়াশ দ্রুত ভেতরে ঢুকে। কিন্তু ভেতরের দৃশ্যটা দেখে তার শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তের জন্য জমাট বাঁধে রাগে।

​সারা ঘর লণ্ডভণ্ড। মেঝেতে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে উচ্ছিষ্ট খাবার আর কাপড়চোপড়। আশার মুখ টেপ দিয়ে আটকানো, গায়ের ওড়নাটা সরে গিয়ে বুক অবিন্যস্ত হয়ে আছে। তার ওপর চড়ে বসে আছে অহীন, আশার হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা। অহীন তখন দাঁতে দাঁত চেপে বলছে,

“আমার সাথে লাগবি তুই? এই পেঁচি, আজ তোকে একদম মাথা পর্যন্ত পানিতে চুবিয়ে মারব!”

​অহীন আশাকে কোলে তুলতে উদ্যত হতেই, তার চোখ যায় দরজায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আয়াশের ওপর। আয়াশের চোখের দৃষ্টি পাথরের মতো শক্ত, রাগে তার চোয়াল ভেঙে আসছে। অহীন আশার শরীরে কাপড় না দেখে বেশ বিব্রত হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত আশার সামনে আড়াল হয়ে দাঁড়াল। আশার হাতের বাঁধন খুলে ওড়নাটা তুলে ওর গায়ের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে টেপটাও খুলে দেয়। অতঃপর আয়াশের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করে,

“আয়াশ কেমন আছিস?”

​“পুতুলের সাথে কথা বলতে চাই।”

​আশা আয়াশের দিকে তাকিয়ে আছে লোকটার মুখ এত নরম কেন? ওনার তো দাদু অসুস্থ ছিল, কেন মনে হচ্ছে উনিই অসুস্থ? কপালেও দাগ দেখা যাচ্ছে। মুখটা থেঁতলে গিয়েছে কিছু কিছু স্থানে। আশা বসা থেকে উঠে নিজের মাথায় কাপড় দিয়ে আয়াশের সামনে আসে, কাতর চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করে,

“আপনার মুখে কী হয়েছে?”

​আয়াশ আশার গাল ছুঁয়ে ধরা গলায় প্রশ্ন করে,

“এসব কী পুতুল? সবাই কেন আজেবাজে কথা বলছে? মম আসার সময় বলল তোমার বিয়ের কথা, অন্তু বলল তুমি এখানেই থাকো। সব কি সত্যি?”

​আশার গলা শুকিয়ে কাঠ, কেবল অস্ফুট স্বরে বলল,

“আয়াশ, আসলে সেদিন পরিস্থিতি এমন ছিল যে...”

​আয়াশ ওর কথায় কান না দিয়ে তাকায়। ওর চোখ সন্দেহে আর যন্ত্রণায় লাল। ও মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করে,

“জাস্ট বলো, তোমার বিয়ে হয়েছে কি না?”

​আশা আবার নিজেকে সামলে নিয়ে আকুতি করার চেষ্টা করে,

“আমি তো আপনাকে বলছি, আপনি আসেননি বলে সেদিন বুবু...”

​“বিয়ে হয়েছে কি না?”

​আয়াশের কণ্ঠস্বর এবার আরও ভরকাচ্ছে, যথারীতি আয়াশের প্রচণ্ড রাগ আশার সামনে যেটা অপ্রকাশিত। আশা আবারও আমতা আমতা করে বোঝাতে চায়,

“আয়াশ, একটু বোঝার চেষ্টা করুন...”

​ঠিক তখনি আয়াশ হুংকারে পুরো ঘর ওর গর্জনে কেঁপে ওঠে,

“ইউ জাস্ট সে, বিয়ে হয়েছে কি না? হ্যাঁ কি না?”

​“হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ।”

​এই প্রথম আয়াশের রুদ্ররূপ দেখল আশা। যে মানুষটা কোনোদিন ওর ওপর গলার স্বর উঁচিয়ে কথা বলেনি, যার কাছে সে ছিল কাঁচের পুতুলের মতো দামি, আজ সেই লোকটার হুংকার আশার কলিজা কাঁপিয়ে তুলেছে। “হ্যাঁ” শব্দটা যেন এক নিমিষেই আয়াশের সাজানো জগতটাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার পুতুলের দিকে, তারপর উন্মাদের মতো এক পা এগিয়ে এসে আশার বাহু দুটো শক্ত করে চেপে ধরে। ওর আঙুলের চাপে আশার নরম চামড়ায় দাগ বসে যাচ্ছে, কিন্তু আয়াশের সেদিকে খেয়াল নেই। ও অবিশ্বাসের স্বরে চিৎকার করে ওঠে,

“প্রাঙ্ক করছো আমার সাথে? বলো যে এটা একটা নাটক! পুতুল, এর চেয়ে বেশি জঘন্য আর নোংরা প্রাঙ্ক আর হতে পারে না। বলো যে তুমি মজা করছো!”

​আয়াশের এহেন কাণ্ডে অহীন না চাইতেও এগিয়ে এসে আয়াশের হাতের ওপর হাত রেখে বলতে যায়,

“আয়াশ আমি বলছি শোন আমার কথা।”

​আয়াশ ঝাড়া দিয়ে এক ধাক্কায় অহীনকে সরিয়ে দেয়, আবারও হুংকার ছাড়ে,

“ফাক অফ ব্লাডি পিগ! কথা বলছি আমি পুতুলের সাথে, এন্ড ডোন্ট, একদম আমাদের মাঝে আসবি না। আদারওয়াইজ ফাক ইউ!”

​দু পা পিছিয়ে গিয়েও শান্ত হয়ে দাঁড়ায় অহীন। আয়াশ কাতর চোখে আশার দিকে তাকায়, এবার রাগগুলো ধুয়ে গিয়েছে। গালে হাত দিয়ে নরমভাবে বলল,

“তুমি বললেই মেনে নেব এরা একটা প্রাঙ্ক। পুতুল হসপিটাল থেকে মাত্র ডিসচার্জ হয়েছি, কষ্ট হচ্ছে আমার, প্লিজ আর অভিমান করো না।”

​আশা মাথা দুলিয়ে না বুঝায়; সে তো একটুও অভিমান করে নেই আয়াশের সাথে। উল্টো নিজের ভুলের জন্য অনুশোচিত। আয়াশ ফের বলল,

“আমার কাছে তুমি প্রথম, কিন্তু বিয়ের মতো একটা দিনে মম-ড্যাডকে কাছে পাওয়ার এক্সাইটমেন্ট ছিল খুব। চলো আজকেই বিয়ে করে নেব কাউকে লাগবে না। আর অভিমান করে থেকো না।”

​আশা ওর হাতের ওপর হাত রেখে ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে নেয়, ঠোঁটগুলো শুকিয়ে কাঠ,

“আয়াশ, অভিমান আপনার সাথে? আমি কখনো করেছি? আর করবও না। কিন্তু পরিস্থিতি ভাগ্য তৈরি করে দিয়েছে।”

​আয়াশের একটা মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো কলিজায় কেউ হাতুড়ি পেটা করছে, এত কষ্ট তো কখনো হয়নি, আজ কেন হচ্ছে! রক্তিম চোখগুলো টলটল করছে, বোধহয় সহসা কান্না করতে চায়। কাতর গলায় আশাকে বলল,

“কেন করলে পুতুল? সবার মতো তুমিও আমাকে একা করে দিলে? মনে হয়নি আমি শুধু তুমি ছাড়া সবার সাথে দূরত্ব রেখে চলি? কী করে থাকব বাকিটা জীবন?”

​“কয়েকটা দিন সময় নিন আয়াশ, ঠিক হয়ে যাবে। ভাগ্য পাল্টানো যায় না।”

​আয়াশ বাঁধ ভেঙে আর্তনাদ করে কেঁদে ওঠে,

“ভাগ্য? সেটা আমার বেলায় কেন এমন? আমার টাকা আছে, আমার লুক আছে, সব আছে। ভাগ্য নেই। না কখনো মম-ড্যাড আর এখন না ভালোবাসা কোনোটাই তো পেলাম না আমি। কেন এই ভাগ্য আমার সাথে এত নিষ্ঠুর? নিজের সব চেয়ে বড় সুখের দিনটায় মম-ড্যাডকে চাইতে গিয়ে নিজের সুখ অন্যের হয়ে গেল আজ।”

​আয়াশ কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে, তার শরীর কাঁপছে, আজ প্রচণ্ড কাঁপছে। এসে আশার গালে আবার ছুঁতে চায়, তবে ছুঁয়ে দিল না। পর মুহূর্তে বলে ওঠে,

“সাতটি বছর স্রেফ কয়েকটা দিন নয়, আমি দূরত্বের আগুনে পুড়ছি না, আমি পুড়ছি এই ভেবে যে যার জন্য সাতটি বছর অপেক্ষা করলাম, সে আমার জন্য সামান্য কিছু মুহূর্তও জমা রাখতে পারল না? আমার এত বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা কি তোমার কাছে এতটাই মূল্যহীন ছিল? কারণ আমার OCD?”

​একটু থামে। আশা চেয়ে আছে, এই পাগলাটে আয়াশকে সে চেনে না। আয়াশ তাকে এতটা চায় হয়ত কখনো কল্পনায়ও ভাবেনি। রিয়েক্ট করবে কিন্তু এমন ভাবে? এত ভালোবাসে? আয়াশের মাথায় কী আসল কে জানে? টেনে নিজের গ্লাভসগুলো খুলে ফেলে দেয় ঘরের একটু কোণে। আশাকে খালি হাতে ছুঁতে যায়, হাতটা কাঁপছে তার। আবারও নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে এগিয়ে যায় আশার কাছে। গালসহ চুলের ভেতর হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেয়। কম্পনরত কণ্ঠে আকুতিভরা টলটলে স্বরে বলল,

“পুতুল তোমাকে কখনো আমার ওসিডি আছে বুঝতে দেব না। এই দেখো ছুঁয়ে দিলাম, প্রমিজ সাধারণ ভাবে থাকার চেষ্টা করব এখন থেকে। তোমাকে বলেছিলাম সেদিন সময় প্রয়োজন, তুমি বলতে একটি বার সময় চাইতাম না। আমি তোমাকে চাই শুধু। অনেক ভালোবাসব তোমাকে, সবার মতো হাত ধরব, ফুটপাতে হাঁটব। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।”

​গাল ছাড়িয়ে আশার হাতটা নিজের বুকের বাঁ-পাশটায় চেপে ধরে আকুতিভরা স্বরে বলল,

“এখানটায় যন্ত্রণা হচ্ছে খুব। ভাবতেই খারাপ লাগছে তুমি অন্য কারো অধিকার। তাও আমার ভুলের জন্য।”

​নিজ হাতটা ছাড়িয়ে পকেটে গুঁজে রাখা স্যানিটাইজারটা ফেলে দিল সে, ওটাও লাগবে না এখন থেকে। পাগলামি করছে খুব। আশা স্তব্ধ, সে এসব হবে ভাবেনি যে বেচারির কণ্ঠ আটকে গিয়েছে। সেও চায় আয়াশের কাছে ফিরতে। কিন্তু সেদিন অহীনের কান্না? অহীনও তো নিজেকে লেইম মনে করে প্রতিক্ষণ, যতবার আয়াশের কাছে যেতে চায় সে। আয়াশ অহীনের কাছে গিয়ে করুণ চোখে তাকায়, চোখগুলো লাল হয়ে আছে,

“ইউ নো না? আমি ওকে কতটা চাই? ফ্রান্সে আমার কেউ নেই কিন্তু পুতুল ওখানে থাকতে চায় পড়তে চায় বলে ওখানেই সেটল হয়েছি আমি। অনেক অপেক্ষা করেছি ওর জন্য আমি, তুই দেখেছিস তো অহীন? আমি জানি আমাদের মাঝে সম্পর্কটা ছোট থেকেই কেমন যেন, কিন্তু আশাকে আমি কতটা চাই তোর অজানা হতেই পারে না।”

​অহীন ওর দিকে একটু আগায়, কাতর হয়ে চেয়ে আছে সে। আশার চোখের জলবিন্দুগুলোর দিকে তাকিয়ে আবার আয়াশের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি জানি সব। পরিস্থিতির চাপ ছিল। আর ছেড়ে ওকে আমি বাট সময় লাগবে, বিয়েটা বললেই ছাড়া হয়ে যায় না।”

​“বললেই হয়, তালাক বলে দে!”

​“ডিভোর্সের অ্যাপ্রুভ লেটার না আসা পর্যন্ত আমি দেবো না ওকে তালাক।”

​আয়াশের রাগ হলো ভীষণ। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অহীনের মুখে সজোরে আঘাত করতেই ভরকায় অহীন। নিজেও কলার চেপে ধরে মারতেই যাবে, আশা অহীনের বুকে হালকা হাতে চাপ দিয়ে থামিয়ে দেয়,

“অহীন তুমি এমন করো না, আয়াশের দিকটা বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ।”

​“বাট তুই আমার লিগ্যাল ওয়াইফ, যতদিন আমি না ছাড়ব ততদিন আমার তুই, তাই না? আমার দিকটা তুই বোঝার চেষ্টা কর?!”

​আশা অহীনের বুক থেকে সরিয়ে আনে নিজের হাতটা। অহীন কথাটা এত জোর দিয়ে বলবে তা সে ভাবতেও পারেনি, তার চোখেমুখে বিস্ময়। আশার গলার কাছে সমস্ত কথা যেন গুলিয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে এখন মুখ খুললেই সে কান্নায় ভেঙে পড়বে। অহীনের তীক্ষ্ণ কথাগুলো আয়াশের গায়ে বিষাক্ত কাঁটার মতো বিঁধছে। সে পুনরায় আঘাত করতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে দুটো হাত তাকে থামিয়ে দেয়। আয়াশ ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,

“ফাক ইউ বাস্টার্ড! আই জাস্ট সেড ডিভোর্স হার!”

​তাকে ঘুরিয়ে দিয়ে একটি শক্ত হাত ঠাস করে তার গালে থাপ্পড় মারে। ধমকের সুরে গর্জে ওঠে,

“হ্যাভ ইউ লস্ট ইওর মাইন্ড?”

​তিতাশের ক্ষিপ্ত কথায় আয়াশ তাকে নিজের থেকে ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলল,

“ইয়েস, আই হ্যাভ!”

​লিজা আগাতে নিলে আয়াশ দুই পা পিছিয়ে যায়। চোখজোড়া জ্বলছে খুব, মাথাটাও ব্যথা করছে, সবে তো হসপিটাল থেকে ফিরল সে। কাতর স্বরে বলল,

“মম, ড্যাড! আমি পুতুলকে চাই। অহীন কীভাবে এমন জঘন্য কথা বলতে পারে? পুতুল ওর? পুতুল তো আমার সেই ছোটবেলা থেকে! যখন ও ভালোবাসা আর সম্পর্কের মানেও বুঝত না, তখন থেকেই তোমরা সবাই পুতুলকে আমার করে দিয়েছ।”

​সে একটু থামল। চোখেমুখে একরাশ আক্ষেপ নিয়ে আবার বলল,

“আজ যখন আমি সম্পূর্ণ হালালভাবে ওকে পেতে চাইছি, তখন তোমরা এমন কেন করছ? তোমরা কি ভাবছ আমি পুতুলকে একটা স্বাভাবিক জীবন দিতে পারব না? এত বড় ভুল ধারণা তোমাদের মাথায় কীভাবে আসল? আমার এই চার দেয়ালের ভেতর ওর জন্য সমস্ত সুখ এনে দেওয়ার ক্ষমতা আমি রাখি।”

​লিজা এগিয়ে যায়, আয়াশ পিছোয়। আশাকে ছুঁয়েছে তাই বলে সবাইকে নয়। একটু যেতেই লিজা বলতে নেয়,

“বিষয় এটা নয় যে তুমি তাকে ভালো রাখবে না।”

​“বিষয় হলো আমার ওসিডি? এমনি এমনি হয়েছে?ওসিডির মতো মানসিক ট্রমা সবার এমনি এমনি হয় না। আমি কী করব বের হতে পারি না আমি, পারি না কাউকে সহ্য করতে তোমাদের দোষে আমাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে? আমার সুখ কেন অন্যের হাতে সঁপে দেয়া হলো?”

​দরজা থেকে গম্ভীর স্বরে অন্তিক বলল,

“আয়াশ, ওসিডিটা বড় কথা নয়। ওদের বিয়ে হয়েছে আর ডিভোর্স কোনো ছেলেখেলা নয়। আমরা চাই না তোমরা বিয়েটাকে এত ছোট করে দেখো।”

​আয়াশ তাচ্ছিল্য করে হাসে। দরজার দিকে তাকিয়ে লক্ষ করল সবাই এসেছে, হয়ত অন্তু কল দিয়েছিল। চোখ দিয়ে নিজ থেকেই জলের ধারাগুলো পড়ছে, সে কাতর গলায় বলল,

“বিয়েটা ছোট করে দেখছি না। আমার কাছে আমার পুতুলকে দিয়ে দিন। আমার সাথে বিয়ে দিন, বিয়েটায় জোর আমি দেব।”

​আয়াশ অস্বাভাবিকভাবে কেমন কাঁপছে। সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও আশা ও অন্তুর চোখ এড়ালো না। অন্তিক ফের বলল,

“আমরা চাই না আমাদের বাড়ির মেয়ের তালাক হোক। তুমি জোর প্রয়োগ করবে?”

​“আমি মিনতি করছি, আমি চাইছি। আমার শূন্য ঘর চাচ্চু, মম-ড্যাড থেকেও নেই। আশুকে পাব ভেবে একা এতগুলো বছর কাটিয়েছি, অবশেষে এটাও কেড়ে নেবেন?”

​তার হাত বারবার নিজের মুখের কাছে গিয়ে থামে, যেন বমি আটকানোর চেষ্টা করছে। অন্তু আশাকে কিছু একটা ইশারা করতেই, আশা ওর দিকে অসহায় চোখে তাকায়। আয়াশ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না এত সময়। মুখ চেপে ধরে ড্রয়িং রুমের বেসিনে গিয়ে গলগল করে বমি করে দেয়। কাউকে ছুঁতে পর্যন্ত দিচ্ছে না। মাথায় স্বল্প আঘাতের পর বমি হওয়া আশঙ্কাজনক এই অবস্থায় আশা ও অন্তু ছুটে যায়। অহীন আশার হাতে ধরে টান দিতেই ভরকায় আশা,

“প্লিজ অহীন, কাউকে ধরতে দেবেন না উনি।”

​আশা আয়াশের কাছে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে পড়ে থাকা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে। আয়াশের মাথায় হাত দেয়, পিঠে হাত বুলাচ্ছে। লিজাকেও ছুঁতে দিল না আয়াশ। ঠোঁট কামড়ে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের বৃথা চেষ্টা করছে অহীন। এই পর্যায়ে অন্তিক আশাকে ধমক দিয়ে ওঠে,

“বেয়াদব মেয়ে, এখানে আয়াশের মা-বাবা আছে তোমার কেন যেতে হবে? ভুলে যেও না অহীন তোমার স্বামী।”

​দাঁতে দাঁত পিষে আশা প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে বলল,

“বড় বাবা, তোমাদের থেকে এমন ব্যবহার আমি কল্পনায়ও ভাবিনি। মানুষটা নিতে পারছে না কাউকে। মরে যেতে দেব? হ্যাঁ, আমার কষ্ট হচ্ছে, অনেক হচ্ছে ওনার কষ্টে। হবে নাই বা কেন? অহীনের মতো আমি পরিস্থিতি বুঝে নিজেকে গিরগিটি বানাতে পারি না তো। এই জেসিকে বিয়ে করবে বলেছে, আবার আমার সাথে বিয়ে হতেই আমার ওপর অধিকার নিয়ে হাজির। আগে ওর কনফিউশন দূর করতে বলো। আমি আয়াশকে চাই বলছি না। তিন মাস সময় আমিও বলেছি দেব। তার মানে এই নয় যে মানুষটাকে এই পরিস্থিতিতে ছেড়ে দেব।”

​আশা আয়াশের পকেট থেকে রুমাল বের করে ওর হাতে ধরিয়ে দেয়। হাতগুলো নিয়ে নিজেই স্যানিটাইজ করতে করতে নরম স্বরে বলল,

“আপনি পাগলামি করছেন আয়াশ, আপনার জন্য সবার কথা শুনতে হবে আমার। আপনি লড়বেন কার জন্য? আমি তো আপনার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে।”

​আয়াশের চোখের পানিগুলো মুছে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“আপনার ওসিডি নিয়ে আমার প্রবলেম নেই আয়াশ। কী বলব, বিয়েটা সত্যি খেলা নয়। আমিও অহীনকে সুযোগ ও সময় দিতে চাই।”

​“আমার কী হবে?”

​“আমি একটাবার খোঁজ নেইনি আপনি কোথায়। মনে হয় আমার মতো পাষণ্ড মেয়ে আপনি ডিজার্ভ করেন? ইউ ডিজার্ভ বেটার।”

​“বাট আই ওয়ান্ট ইউ।”

​“আমি আমার হলে সঁপে দিতাম। হসপিটাল গিয়ে টেস্ট করে নেবেন, মাথায় আঘাত পাওয়ার পর বমি করা ঠিক না।”

​মাথাটা হঠাৎ কেমন ঝিমিয়ে ওঠে আয়াশের। আশার একটি হাত খামচে ধরে নিজেকে স্থির দাঁড়িয়ে রাখার চেষ্টা করে সে। ঘোলা চোখে আশাকে দেখছে, সে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,

“আই লাভ ইউ। তিন মাস নয়, আরও তিন বছর অপেক্ষা করব। ফিরে আসবে তো?”

​আর বলার শক্তি পেল না। হেলে পড়ল আশার গায়ের ওপর। ভারী আয়াশকে সামাল দিতে না পেরে পিছিয়ে যায় আশা। কাছেই অহীন থাকায় আয়াশকে ধরে সামলে নিল। সেন্সলেস হয়ে পড়েছে বেচারা। মাথায় আঘাতের পর এত চাপ সহ্য করতে পারেনি। ওকে বাকিরা একসাথে মিলে ধরে নিয়ে গাড়িতে বসায়। আশা বসতে চাইলে ওর হাত ধরে টান দেয় অহীন। একটু ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই অহীন বলল,

“গাড়িতে জায়গা হবে না, আমার সাথে চল।”

​“হসপিটাল যাব।”

​“নিয়ে যাব।”

​অহীনের কথায় সন্তুষ্ট হয়ে আশা গিয়ে বসে তার পেছনে।

চলবে,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন