#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ২০
হাসপাতালের চকচক করতে থাকা করিডোর, দেয়ালগুলো কেমন গুমগুম। সকালে আয়াশকে নিয়ে আসার পর এখন বিকেল। আকাশ মেয়ের এমন অদ্ভুত কাজে না এসে পারল না। একটি কোণায় চিবুকে দুই আঙুল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অহীন। আশার হদিশ নেই ক্যাবিনের ভেতরে লিজার সাথে। অন্তিহা নিচু স্বরে একবার অহীনকে দেখছে তো কখনো আকাশকে দেখছে। আকাশের রাগী মুখটার দিকে তাকিয়ে অহীন একটু এগিয়ে আসে। আকাশ অহীনকে দেখে ভড়কায় আরও একটু। রাগ তার ওপরও হচ্ছে কেন হচ্ছে তা সে জানে না। অহীন নিচু স্বরে বলল,
“ছোট বাবা থাক না, কয়েকটা দিন গেলে আমরা সব ঠিক করে নেব।”
“আয়াশের আশেপাশে ও যত থাকবে আয়াশ ততই আশা পাবে। কী প্রয়োজন ভাঙা মানুষটার মন নিয়ে এমন হেলাফেলা করার?”
“ওর মন নিয়ে খেলা হচ্ছে না ছোট বাবা, আমাদের মাত্র বিয়ে হলো, পরিস্থিতি কতটা খারাপ ছিল। এখন আমরা সময় চাই। আমার জন্য বিষয়টা সহজ লাগছে, কারণ আমি জেসিকে কখনো ভালোবাসিনি। আশা তো আয়াশকে ভালোবাসে তাই পারছে না আয়াশের দুর্বল মুখটা সহ্য করতে।”
আকাশ মাথা দুলায়, সারাজীবন সবার খেয়াল রেখে এসে এই সময়টাতে কেমন সিদ্ধান্তগুলো ওলটপালট হয়ে গেল তার। এতটা কঠিন নিজের মেয়ের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া? কার সাথে সুখে থাকবে আশা? এতদিন তো ভাবায়নি এত, তবে আজ কেন এত ভাবাচ্ছে। আকাশ আস্তে করে ক্যাবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে যেতেই অহীন দীর্ঘশ্বাস নেয়। পাশ ফিরে তাকাতেই চোখ বুজে নেয় সে। তীক্ষ্ণ চোখে তাচ্ছিল্য নিয়ে তাকিয়ে আছে জেসি। অন্তিহার সাথে জেসি এসেছিল হসপিটালে, মাথায় ছিল না। ছলছল চোখে তাকিয়ে বলল,
“যদি ভালোবাসেন না আমাকে বিয়ে করতে চাইলেন কেন? আমার মম ড্যাড আপনাকে বলেছিল?”
অহীন এক পা আগায়, জেসির কাছে গিয়ে,
“লিসেন জেসি।”
হাত বাড়িয়ে অহীনকে থামিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে জেসি,
“দূরে থাকুন। আমি কেন রিয়েক্ট করিনি জানেন? কারণ আমি ভাবতাম আমাকে ভালোবেসে হয়তো আপনিও কষ্ট পাচ্ছেন। বাট আই অ্যাম রং, আপনি তো বুক ফুলিয়ে বলছেন ভালোবাসেন না।”
“বিয়ে আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়।”
“ফাক.. রিয়েলি? আমি আমার মম-এর মতো পুরো জীবন আপনার সাথে কাটাতাম?এটা চেয়েছেন? ইউ আর জাস্ট ব্লাডি ফাকিং পিগ। তু এ ভ্রেম এগোইস্ত।"
অহীন হতবাক। জেসিকে কষ্ট দেওয়া যে তার উদ্দেশ্য ছিল না। জীবনে কিছু জিনিসের থেকে পিছু ছাড়াতে সে সৃজনকে পাশে চেয়েছে। আর সারাজীবন সৃজনের কাছে থাকার পথ হিসেবেই জেসিকে বেছে ছিল নিজের জন্য। জেসির চোখ দিয়ে টপ করে দু-ফোঁটা পানি পড়ে, এবং তাচ্ছিল্য করে ভেজা স্বরে বলল,
“থ্যাংক টু আশা, সে আমার জীবনে আসা আপনার মতো থার্ড ক্লাস মানুষকে থামিয়ে দিয়েছে। আফসোস, না জানি ফুলের মতো মেয়েটাকে আপনি কেমন করে ধ্বংস করেন।”
জেসি অহীনকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় মাঝপথে আচমকা ওর পা দুটো থামে। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছন ফিরে অহীনের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল,
“আমি শুধু আপনাকে চিন্তামুক্ত রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একবারও ভাবিনি, আপনার চিন্তাজগতে কোনোদিন 'জেসি' নামের কারো অস্তিত্বই ছিল না।”
জেসি একটি হাতে চোখের কার্নিশে লেগে থাকা জলবিন্দু মুছতে মুছতে যাচ্ছে, আচানক কারো শক্ত বুকের সাথে কপালে ধাক্কা খায় সে। লাল হয়ে থাকা চোখ তুলে মানুষটার দিকে তাকিয়ে অহীনের প্রতি রাগগুলো ইচ্ছেমতো ঝেড়ে দিল সে,
“চোখে দেখেন না? কানা নাকি? আপনাদের পরিবারের লোকগুলো এমন কেন? একজন মন ভেঙেছে, আপনি কি আমাকেই ভেঙে দিতে চান?”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি অবাক নেত্রে চেয়ে আছে জেসির দিকে। খাটো মেয়েরা ছেলেদের বুক অব্দি পড়ে। পরনে ধূসর সবুজ শার্টে কত মোহনীয় লাগছে। তাইয়ান নরম স্বরে বলল,
“লেগেছে তোমার?”
জেসির রাগ যেন আজ আগুনের ফুলকির মতো, তাইয়ানের কথায় আরও বেশি শিখা জ্বলে উঠল। বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“এই বেয়াদব, আমাকে তুমি বলছেন কোন সাহসে? আপনার থেকে দুই-তিন বছর বড় আমি।”
হতবাক তাইয়ান চেয়েই আছে বয়সের তুলনায় সে যথেষ্ট লম্বা আর সামনে থাকা মেয়েটা এত খাটো, বাচ্চাই তো মনে হয়। গালগুলো ফোলা ফোলা যেন একটা চকলেট দিলেই বাচ্চা মেয়ে থেমে যাবে। আগে তো দেখলে বড়ই লাগত। তুমি বললে সমস্যা কী টনক নড়ল না এই বিষয়ে।
“আসলে তুমি দেখতে..."
বলার আগেই জেসি এক আকাশ রাগ নিয়ে গায় কাঁধ ধাক্কা দিয়ে চলে যায় হাসপাতাল থেকে বের হয়ে। তার দিকে আর ফিরে না তাকিয়ে সোজা অহীনের কাছে যায় সে। কাঁধে দুইবার থাপ্পড় দিয়ে আবারও দরজার কাছে যায়। আকাশের দুটো হাত নিজের কপালে ঠেকিয়ে গুমরে কান্না করছে আশা, বর্ষাকালের বাদলগুলো মৃদু গর্জনের সাথে যেমন অশ্রু ঝরায় ঠিক তেমন। তার প্রতিটি আর্তনাদে একটাই আবদার আকাশের কাছে,
“আমার সহ্য হচ্ছে না আব্বু, ওনার কষ্ট একদম সহ্য হচ্ছে না। তোমরা শুধু ওনাকে না, আমাকেও ঠকিয়েছ। আমাকে তুমি অহীনের থেকে মুক্তি নিয়ে দাও। মনে একজনকে রেখে অপর জনের সাথে আগানোটাই ভুল।”
চুপ করে বসে আছে আকাশ, একটা শব্দ বলছে না। নীরব এই কক্ষে আয়াশ চোখ বুজে আছে; ঘুমিয়ে আছে নাকি জেগে বোঝা মুশকিল। চোখ মেলে তাকাচ্ছে না। ক্যানুলার চিকন পাইপটা বাতাসে হালকা নড়ছে। পুরোটা জীবন সে সিদ্ধান্তই নিয়েছে তাশার হয়ে, ছেলে-মেয়েদের হয়ে। আজ আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বুঝ আসছে না। সে শুধুই ভাবছে কী করা যায়? তাইয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আস্তে করে আশার পাশে বসে আশার পিঠে হাত রাখে। চোখ তুলে তাইয়ানকে দেখে আরও কান্নায় যেন জোর পেল সে। আকাশের হাত ছেড়ে তাইয়ানের বুকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি দিয়ে ফুঁপিয়ে বলছে,
“তুই কেন বড় হলি না আমার? অবুঝের মতো থাকিস কেন? সেদিন তুইও থামাতে পারতি সবটা। আমি বড় বোন বলে নিজেকে দায়মুক্ত করিস? তাই আমাকে একটা দিনের জন্য ছোট ভেবে নে। আব্বুকে বোঝা আমার হয়ে।”
আশার হাত থামিয়ে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে তাইয়ান। আশা ছটফট করছে। সহ্য হচ্ছে না এই মানুষটার কষ্টগুলো। আশার পিঠে হাত বুলোচ্ছে তাইয়ান সেও ছোট, বোঝানোর মতো কিছুই পাচ্ছে না সে। তবুও প্রথমবারের মতো চেষ্টা করল একটু শান্ত করার,
“আশু থেমে যা আপু, এটা হাসপাতাল। তুই আয়াশের সামনে যতটা কান্না করবি তিনি দুর্বল হবেন। আর তোর তো অহীনের দিকটাও ভাবতে হবে তাই না? সে তো তোর জন্যই করেছে এতটা।”
“আমি বলিনি আমার জন্য কিছু করতে, ও শুধু ধ্বংস করেছে আমাকে আর এখন তোরা ধ্বংস করছিস আমাকে।”
ক্রন্দনরত কণ্ঠে কেমন অভিমানের ছোঁয়া, হয়তো একটু আগলে রাখলেই থেমে যাবে। তাই আর ভাবল না তাইয়ান, বুকের মাঝে নিয়ে আকাশকে ইশারায় চলে যেতে বলল। আকাশের ও বসতে বেশ দম বন্ধ লাগছে এখানে। উঠে বের হয় এই ভ্যাপসা দম বন্ধ করা রুম থেকে। অহীন তখনো দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ ধীর পায়ে তার কাছে যায়। অহীনের হাত দুটো ধরে বিনয়ের সাথে কাতর গলায় বলল,
“কষ্ট নিস না, সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মাথা দুলিয়ে অহীন সায় দেয়, আকাশ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে নেয়। তাইয়ান আশাকে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে বোঝাচ্ছে,
“আশু তুই যে কান্না করছিস, এতে কি কেউ একবারও বলেছে ডিভোর্স নিতে দেবে? কেউ পক্ষে নয়, সবাই বিপক্ষে। এই সময় কান্না করে কী লাভ হবে? আয়াশের এই অবস্থায় ভেঙে দিচ্ছিস। সে ভাবছে এখনো তুই তার। ভেবে দেখ আয়াশের জন্য এসব ঠিক না। তুই তো বললি সুযোগ দিবি অহীনকে। আর বিয়ের পর তো অনুভূতি নিজ থেকেই চলে আসে, তাই না? অহীনের প্রতিও আসবে। আয়াশকেও মুভ অন করার সুযোগ দে। তিন-চার মাসে সে যদি তোর থেকে বেটার কাউকে পায় তাহলে ছেড়ে দে তাকে।”
আশা চোখ তুলে তাকায় তাইয়ানের পানে,
“আমার থেকে বেটার খুঁজতেই যাবে না কখনো।”
“খুঁজতে হবে না, তাকে ঠিকই পেয়ে যাবে। একটা সুন্দর জীবন তুই আটকে রেখেছিস দীর্ঘ সাতটা বছর তাকে থামিয়ে রেখেছিস শুধু নিজের অপেক্ষায়। সে একবারও পাশ ফিরে তাকায়নি, তাকালে হয়তো অনেক আগেই অন্য কাউকে পেয়ে যেত। তাই তাকে আর নতুন করে অপেক্ষা করাস না।”
একটু থামে তাইয়ান, আবার বলে,
“মন বড্ড নিষ্ঠুর আশু, বড্ড নিষ্ঠুর! হঠাৎ একদিন দেখবি আয়াশের জায়গাটা অন্য কেউ দখল করে নিয়েছে। তখন আর আয়াশকে কোনো কৈফিয়ত দিতে পারবি না।”
তাইয়ানকে জড়িয়ে ধরে এবার আরও কান্না করল আশা। লিজাকে চোখে ইশারা করে তাইয়ান আশাকে নিয়ে বের হয় ক্যাবিন থেকে। অহীনের কাছে গিয়ে আশাকে ছেড়ে দিয়ে তাইয়ান বলল,
“দেখ অহীনও কিছু বলে না এসব নিয়ে, অহেতুক কান্না করে নিজেকে ছিঁচকাঁদুনে বানাচ্ছিস সবার কাছে।”
অহীন চেয়ে আছে আশার ফুলে লাল হয়ে যাওয়া গালগুলোর দিকে। তার দৃষ্টি কেমন অদ্ভুত। আশার কান্নাগুলো প্রতিবার আয়াশের জন্যই হয়। ঠিক কতটা ভালোবাসে আশা আয়াশকে? ওর এমন ক্রন্দন দেখে নিজেকে পাপি মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“পেঁচি কান্না কেন করছিস? বলেছিলাম তো ভার্জিন থাকব তবুও তোকে টাচ করব না।”
আশা লাল লাল চোখগুলো গরম করে তাকায় অহীনের দিকে, রাগ হলো হয়তো এত কথায়। সারাক্ষণ এই ছেলের দুষ্টুমি শুধু। অহীন দুই হাত দিয়ে ইশারা করে বলল,
“না না, করব করব টাচ করব, বারবার করব তবুও এমন করে তাকাশ না পেঁচি থেকে ডাইনি হয়ে যাবি।”
অহীনের এহেন কথায় খেপল আশা আরও একটু। এগিয়ে গিয়ে চড় মারতে গেলে অহীন লুকায় তাইয়ানের পেছনে,
“এখন টাচ না করলেও চোখ রাঙাস, আবার টাচ করলে মারতে আসিস। সবাই স্বার্থপর, আমি আর খেলবই না।”
“তুই কুত্তা, তোর জন্য কেঁদেও শান্তি পেলাম না।”
তাইয়ানের থেকে সরে অহীন দূরে যায়। আশা ওর পিছু নিল না আজ। তাইয়ানের কাছে গিয়ে থেমে গিয়েছে চুপ করে। মন-মেজাজ ভালো না, আয়াশের শরীর এতটা খারাপ যে। ওকে থেমে যেতে দেখে অহীন এগিয়ে আসে। হাসপাতালের করিডোর দিয়ে দু-একজন মানুষ হাঁটাচলা করছে, তবুও কতটা নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে। আশা আড়চোখে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে নেয়। অহীনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমরা তো কাজিন ফ্রেন্ড, তাই না?”
অহীনের চোখ শীতল হয়, ভেতরে একবার হয়তো দ্রিম করে শব্দ হলো। সে বুঝল, মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। আশা ফের বলল,
“বাকি দিনগুলো তাই থাকব।”
অহীন নিস্তব্ধ করিডোরের দিকে তাকিয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে, গলা ভিজিয়ে বলল,
“হুম, সারাজীবন।”
এরই মাঝে ক্যাবিনের ভেতর থেকে লিজা আশার নাম ধরে ডাকে,
“আশা এদিকে এসো।”
আশা এক মুহূর্তে তাইয়ানকে রেখে লিজার কাছে চলে যায়। আয়াশ তাকিয়ে আছে তার দিকে। আশা ওর তাকিয়ে থাকার দিকে তাকিয়ে হাসে। সে এগিয়ে গিয়ে আয়াশের পাশে বসতেই আয়াশ বলল,
“কান্না পায় আমার জন্য?”
আশা কী বলবে? কী উত্তর আছে আয়াশকে বলার মতো? তবুও সে পালটা প্রশ্ন করে,
“কী মনে হয় আপনার?”
“আমার মনে হয়, তোমার জীবনে সব চাইতে অবহেলিত আমি। সব সময় রয়ে যাব অবহেলায়।”
আশা মৃদুস্বরে উত্তর করে,
“ঠিক যেই মুহূর্তে আমি ‘কবুল’ বলেছিলাম, তারপর থেকেই আমার জীবনের সবচেয়ে অবহেলিত নাম অহীন। যে এক অতল সমুদ্রে ভেসে আছে, সে না পাচ্ছে ভেসে থাকার জন্য কোনো অবলম্বন, আর না খুঁজে পাচ্ছে কোনো কুল-কিনারা।”
কাতর আয়াশের গলা কাঁপছে। এটা ভেবেই যে আশা অহীনের জন্য কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু তার যে ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা বোঝে না কেন? এ কেমন অসুস্থতা তার জীবনে, তার কী দোষ এই ওসিডিতে? সে কাতর গলায় বলল,
"তোমার জন্য আমি দীর্ঘ সাতটি বছর অপেক্ষায় কাটিয়ে দিলাম, আর তুমি সামান্য দুটো দিনও আমার জন্য সবুর করতে পারলে না? একটু ধৈর্য ধরতে! আমি তো ফিরেই আসতাম। তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার সাধ্য কি আমার আছে? দেখো না, শেষমেশ তোমার কাছেই তো ফিরে আসলাম।"
আশা চোখের পানি মুছে আয়াশের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নরম স্বরে বলল,
“মুভ অন করুন, অনেক অপেক্ষা করেছেন, আর করতে হবে না। দেখা যাক অহীনের সাথে আমার শেষটা কী হয়, আদৌও কি প্রণয় হবে?”
আয়াশ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সব কিছু কেমন ঘোলাটে, হাসপাতালের ভ্যাপসা একটা গন্ধ নেওয়া কঠিন হচ্ছে আয়াশের জন্য। আশার নাকের ডগা লাল হয়ে আছে। সে দেখে আবার সিলিংয়ের দিকে তাকায়। ভাঙা স্বরে বলল,
“এবারে তোমাদের প্রণয় হবে না। তুমি মানুষটা থেকে যাও অহীনের কাছে, তোমার মন আমার। শুধু আমার।”
“মনটাও দিয়ে দেব একদিন।”
“যেদিন তুমি নিজ মুখে বলবে যে তুমি অহীনকে ভালোবাসো, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি তোমাকে মুক্তি দেব। আমি আয়াশ তোমার জীবন থেকে চিরতরে সরে যাব। আমার এই অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে হৃদয়ে নতুন কাউকে আসার অনুমতিও আমি দিয়ে দেব।”
ঈর্ষা হচ্ছে মনটায় আশার, আয়াশ যখন বলল অন্য জনকে মনে স্থান দেবে। আয়াশের কি বুক কাঁপল না? আশাকে দেওয়া জায়গাটা অন্যকে দেওয়ার কথা বলাতে? কিন্তু আশা নিজেও তো বলল মাত্র। আয়াশেরও কি এমনই অনুভব হয়েছে কথাটায়? আয়াশ বলল,
“লাগছে তো? খুব লাগছে? আমারও লাগে বারবার একই কথা শুনতে ‘প্রণয় হবে’। ফাক ইউ।”
“আমাকে গালি দিলেন আপনি?”
“হুম।”
আশা ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে। আয়াশ কখনো তাকে ধমকও দেয় না, আর আজ কী অশ্লীল গালিটা দিল! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আয়াশ আড়চোখে তাকিয়ে চোখ ফেরায় আশার থেকে। ওই মুখটা যে বড্ড টানে তাকে, ফোলাফোলা গালগুলোতে যে তাকে অনুভব করাতে বাধ্য করে। সে আনমনেই বুক চিরে গেয়ে ওঠে,,
গুমনামী ইচ্ছের মতো
বাসালি ভালো না কত,
ভালোবাসা দিচ্ছে দোহাই
আমাকে রোজ অবিরত।
বরবাদ হয়েছি আমি তোর অপেক্ষায়
চুরমার করে দে আরও কিছু ইশারায়,
আমাকে থাকতে দে ডুবে ডাকতে দে
তোর নাম ধরে,
আমাকে রাস্তা বল কোনো আস্তানা
কোন বন্দরে,
বলে দে, বল আমায়,
বলে দে, বল আমায়।
চলবে.....