#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
#পর্বঃ২১
রাত নেমেছে আকাশে। সন্ধ্যা পার হতেই অহীন কঠিন গলায় তাইয়ানকে বলেছে জেসির খোঁজ নেয়ার জন্য। জেসিকা এই শহরে নতুন, বাইরের মানুষ সহজে বিশ্বাস করার নয় তারা। অন্ধকার আর এলোমেলো রাস্তা দিয়ে হিল জুতোয় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে জেসি। পাশ দিয়ে বিশাল বাস আর ট্রাকগুলো বাতাসের গতিতে শোঁ শোঁ শব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে। পেছন থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে তাইয়ান ডাকছে,
“জেসি প্লিজ স্টপ! এত রাতে এই জায়গাটা সেফ নয়।”
জেসি শুনছে না। তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। অহীন কীভাবে পারল তাকে চিট করতে? অহীন কি তাদের কাছে ভালোবাসার কোনো কমতি পেয়েছে? সেদিনও সৃজন অহীনের পক্ষেই কথা বলল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ উঁচু হিলটা মচকায় জেসি সামলাতে না পেরে হাঁটু গেড়ে হাত দিয়ে বসে পড়ে মাটিতে। এবার আর কান্না বাঁধ মানল না, ডুকরে কেঁদে উঠে সে। তাইয়ান দ্রুত ছুটে এসে জেসির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে বাহুটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
“ঠিক আছো তুমি? বললাম না আস্তে হাঁটো, বোকা মেয়ে!”
জেসি অনবরত কেঁদে যাচ্ছে। তাইয়ান বিরক্ত হয়ে আবার বলল,
“এই মেয়ে, সমস্যা কী? একজন গেলে মেয়েদের জীবনে আরও পাঁচজন আসে। এ জন্য কেউ এভাবে কাঁদে?”
জেসি এক ঝটকায় তাইয়ানের হাত সরিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,
“এই বেয়াদব! আমি আপনার বড়, নাম ধরে ডাকেন কেন? আর আপনার ভাইয়ের জন্য আমি কাঁদছি না। কাঁদছি আমার ড্যাডের বোকামির জন্য। কত সূক্ষ্মভাবে আপনার ভাই আমার ড্যাডকে ধোকা দিল!”
তাইয়ান একটু থমকায়। জেসি তার থেকে বেশ খাটো, তাকে 'আপনি' করে বলাটা তাইয়ানের কাছে কেমন অদ্ভুত লাগে। তবে এবার একটু ধমক দিয়ে সে বলল,
“পাগল নাকি আপনি? বিয়ে সে আপনাকেই করতে চেয়েছিল, পরিস্থিতির চাপে পড়ে তাকে অন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”
“পরিস্থিতির চাপে? তাকে কে জোর করেছিল? তাহলে এতদিন আমাকে মিথ্যা আশা দিল কেন যে সে আমাকে পছন্দ করে? আমার কাছে ফিরবে? আমার ড্যাডকেও তো সে এসবই বলেছে। আজ কেমন করে বলতে পারল সে কোনোদিন আমাকে ভালোবাসেনি? তাহলে বিয়ে করতে চেয়েছিল কেন?”
তাইয়ান শান্ত হয়ে জেসির সামনে বসে। হাতের আঙুল দিয়ে জেসির চোখের জল মুছে দিতে দিতে বলে,
“লিসেন, আমাদের পরিবারটা এমনই। আমরা বিয়ের পর ভালোবাসায় বিশ্বাস করি। আমাদের এখানে সবাই বিয়ের পরেই একে অপরের প্রতি দুর্বল হয়েছে। অহীনও হয়তো ভেবেছিল বিয়ে করলে তোমাকে ভালোবেসে ফেলবে।”
জেসি ওর দিকে তাকায়। বয়সে ছোট ছেলেটা এত লম্বা কেন? ঘাড় উঁচু করে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলাও জেসির জন্য কঠিন। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“চিপ মেন্টালিটির ফ্যামিলি!”
তাইয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে জেসির দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় ওঠার জন্য। জেসি ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। পায়ের ব্যথাটা অসহ্য লাগছে, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও যেন নেই। জেসি জিজ্ঞেস করে,
“বাইক বা গাড়ি নেই আপনার?”
“না, আমার কাছে কিছু নেই। চলো, সামনে রিকশা পাব।”
জেসি কয়েকবার ওর হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, কিন্তু পারছে না। যতবার ওঠার চেষ্টা করছে, মনে হচ্ছে কেউ পায়ের রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। ব্যথায় চোখে জল চলে আসছে জেসির। তাইয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেসির দিকে ঝুঁকে ওর মুখের একদম কাছে এসে গভীর স্বরে বলল,
“আমি হাঁটাতে সাহায্য করছি, সাবধানে ওঠো।”
“হুম।”
তাইয়ান জেসির কোমরে হাত দিতেি জেসি একটু কেঁপে উঠে। উঠে দাঁড়াতেই পায়ের ব্যথায় মুখ কুঁচকে অস্ফুট স্বরে ‘উফ’ বলে আবার বসে পড়তে চায় মেয়েটি। তাইয়ান ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,
“এই জন্যই বলে গুরুজনের কথা, অমৃতের লতা।”
জেসি রাগী চোখে তাকা,,
“হাঁটু বয়সের ছেলে এখন আমার গুরুজন?”
“আমার হাঁটু অব্দি তো তুমি পৌঁছাতে পারো না, আবার আসছে কথা বলতে!”
কথাটা বলেই তাইয়ান এবার শক্ত করে জেসিকে টেনে তোলে । ব্যথায় জেসির মুখটা ছোট হয়ে গেলেও তাইয়ান তাকে আলতো করে ধরে হাঁটতে শুরু করে। কিছু দূর যাওয়ার পর তাইয়ান নরম গলায় বলল,
“তুমি খুব তাড়াতাড়ি এই কষ্ট থেকে বেরিয়ে আসতে পারো।”
জেসি একটা তিক্ত হাসি হেসে বলল,
“সবাই তো তাই ভাবে, তাই তো আমাকে কষ্টই দিয়ে যায়। কেউ বুঝতেও চায় না আমি কতটা কষ্টে আছি।”
তাইয়ান ওর মলিন মুখটার দিকে তাকায়। লম্বা চোখের তিরতির করে কাঁপতে থাকা পাপড়িগুলোতে নোনা জল শিশিরের মতো লেপ্টে আছে। একটা রিকশা পেয়ে দুজনে উঠে বসে। তাইয়ান পরিবেশটা হালকা করতে মজার ছলে বলল,
“এসব বাদ দাও। অহীন এখন ইউজড মাল, তুমি বেটার কিছু ডিজার্ভ করো।”
জেসি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“মাল মানে কী?”
তাইয়ান চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে হেসে ফেলল, “ওহ, তুমি তো এসব অশালীন ভাষা বুঝবে না। মাল মানে প্রোডাক্ট। অহীন এখন সেকেন্ড হ্যান্ড হয়ে গেল। তুমি ইনটেক প্রোডাক্ট ডিজার্ভ করো।”
জেসি এবার রেগে গিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকায় তার দিকে,ধমকে বলে ওঠে,,
“বেয়াদব! আমি আপনার বড়, সম্মান দিতে শিখুন নয়তো জ্বীব কেটে দেব!”
অন্য দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে তাইয়ান,
“জিব পর্যন্ত পৌঁছানোরও হ্যাডাম নেই লিলিপুট।”
জেসি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
“হ্যাডাম কী? আর লিলিপুট কাকে বলেন আপনি?”
তাইয়ান জিভ কাটে সে তো বিড়বিড় করেছে, কিন্তু এই মেয়েটা যে শুনে নেবে তা ভাবেনি। সে মেকি হেসে চোখ জোড়া অন্য দিকে লুকায় । জেসি আর কথা না বাড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলে,
“তোমাদের বাসায় নেবে আমায়? অহীনের বাসায় তো মম-ড্যাড নেই, ওখানে হয়তো ওরা আছে। এখন এই অবস্থায় আমার বাসাও অনেক দূর, অতদূর যেতে পারব না।”
তাইয়ান মাথা নেড়ে ছোট করে উত্তর দিল,
“হুম।”
রিকশা এগিয়ে চলছে।জেসির মচকানো পা আর অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে তার মায়া লাগছে খুব।
______
রাতের মাঝ প্রহর। অহীনের বাইকটা এসে থামে বাড়ির সামনে, লিফটের কাছে যায় তারা। আশার মলিন মুখটা আয়াশের কাছ থেকে আসার পর থেকেই কেমন গুমরো হয়ে আছে। বড্ড ভালোবাসে কি না আয়াশকে! লিফটের কাছে দাঁড়িয়ে অহীন ওর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় একবার। মেয়েটা সকালেও ভালো ছিল। লিফটের ভেতর ও দুজন কথা বলল না একটিবার। কে জানে আশার মনে কী চলছে?
ঠিক নিজেদের ফ্ল্যাটের সামনে আসতেই নাকে দুর্দান্ত গোলাপ ও রজনীর গন্ধ এসে লাগে। দরজার সামনেও কিছু পাতাডাল পড়ে আছে। হয়তো কারো বাসায় কোনো কিছুর আয়োজন হচ্ছে। দরজার সামনেই একটি লাল গোলাপ পড়ে আছে একদম মুষড়ে যাওয়া। অহীন আশার দিকে তাকায়, তার মুখটাও এই মুষড়ে যাওয়া গোলাপের মতোই লাগছে। এগিয়ে গিয়ে গোলাপটা তুলে আশার ঠিক সামনে হাঁটু মুড়ে বসে অহীন, ঠোঁটে একটু মুচকি হাসি। অহীনের এহেন কাণ্ডে ভ্রু কুঁচকে নেয় আশা। সে বলার আগেই অহীন ওর দিকে ফুল এগিয়ে দিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে বলে,,
“তোর মুখটা ঠিক এই ফুলটার মতো, মুষড়ে গিয়েও যার আভিজাত্য কমেনি। আমাকে ছয় মাসের জন্য তোর বাগানের মালি করবি? শুধু যত্ন করব, মাঝেমধ্যে ঝগড়া করব, কিন্তু কথা দিচ্ছি, তোকে ছিঁড়ব না আর না সুধাটুকুও শুষে নেওয়ার চেষ্টা করব না।”
নির্বাক চোখে অহীনের দিকে তাকিয়ে আছে সে। ছেলেটার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করছে মনে হচ্ছে তার। সারাক্ষণ একটা মানুষের সামনে এমন করলে তারও কষ্ট হয়। যতই হোক আশা তো সত্যি অহীনের বউ। সে একচিলতে হেসে উত্তর করে,,
"টোকাই বিয়ে করে বুঝি কুড়িয়ে পাওয়া ফুল দিয়ে বউকে প্রপোজ করে লোকে? এজন্যই বলি নিজে কিছু করে খাও। অন্তত পঞ্চাশ টাকার একটা ফুল দেওয়ার যোগ্যতা তো অর্জন করতে হবে!”
অহীন ঢোক গেলে। আশার বাম হাতটা টেনে নিজের একটি হাতে নিয়ে উল্টো পিঠে হালকা মালিশ করে দিয়ে মলিন স্বরে বলল এবার,
"নিজের কামাই করা টাকায় যদি পঞ্চাশ টাকার একটা ফুল এনে দিই, তবে কি এই ছয় মাসের মালির চাকরিটা সারাজীবনে কনভার্ট হবে? আর তার বদলে প্রাপ্য হিসেবে সামান্য একটু 'সুধা' না হয় আমি পান করব ফুল থেকে।”
গলা খাঁকারি দেয় আশা, হাত ছাড়িয়ে ফুলটা নিয়ে দরজায় কলিং বেলে চাপ দিয়ে বলল,
“এত রোমান্টিক হতে হবে না বলদ।”
অহীন উঠতেই যাবে ওমনি খট করে দরজা খুলে যায়। যেন তারা জানতো এখানে আছে আশা আর অহীন। কুহু অহীনকে বসে থাকতে দেখে ভারি গলায় বলল,
“ওখানে বসে আছো কেন?”
অহীন শরীর ঝাড়া দিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল,
“কিছু না।”
বলেই দুজনকে পাশ কাটিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। আশা ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করে, এবার ফুলের সুবাস যেন ভারি হচ্ছে খুব। ড্রয়িং রুমের সোফায় চোখ যেতেই থ মেরে যায় আশা। অহীন ও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আকাশ আর তাশা বসে আছে হাসিমুখে। ডাইনিং টেবিলের ওপর ফল মিষ্টির অভাব নেই। একে অপরের দিকে চাওয়া চওয়ি করে নেয় তারা দুজন। অহীন ভেবলার মতো মেকি হেসে নিজের কক্ষে প্রবেশ করতে চায়। তবে দরজার ভেতরে গিয়েও চোখে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে আবার বের হয়ে আসে,,
“আস্তাগফিরুল্লাহ, এরা আমাদের গুরুজন? লজ্জা বলতে এদের নেই। আমরা বিয়ে মানি না এরা আমাদের বাসর করায়।”
বের হয়ে আকাশ আর অন্তিকের দিকে তাকায় সে। অহীনের এমন ভাব দেখে আশা একটু উঁকি দেয় ভেতরে, পুরোটা রুম ফুল দিয়ে সাজানো। পা স্থির করে কুহুর দিকে বড় বড় চোখ করে তাকায়। দুই হাত দুই দিকে ইশারায় ‘নিজে কিছু করে নি’ বুঝিয়ে দিয়ে অন্তিক আর আকাশের দিকে দেখিয়ে দিল কুহু। আশা লজ্জায় কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। ধীর পায়ে মুখ লুকিয়ে যেতে নিলেই ডাক পড়ে পেছন থেকে আকাশের,,
“যাচ্ছ কোথায়? দেখতে পাচ্ছ না আমরা এসেছি? তোমাদের বাড়িতে গেস্ট আসলে বুঝি চোখ লুকিয়ে পালানোর রীতি?”
আশা থামে। শুকনো ঢোক গিলে মাথা নিচু করে আকাশের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য ছিল কুহুর রুমে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ার। সে নিচু গলায় বলল,,
“আব্বু, আমার বা তোমার কী? আমাদেরই তো। এখানে তো তোমরা বা আমি নতুন নই।”
“আমাদের সম্পর্কে পরিবর্তন হয়েছে আশু। আমি আজকে আমার ভাইয়ের বাসায় আসিনি। এসেছি তোমার শ্বশুরবাড়িতে। হাসপাতালে তোমার এমন উদ্ভট আচরণ আমার একদম ভালো লাগেনি আশু। তুমি বিবাহিত। অহীনের সামনে নিজেকে কতটা শেম অনুভব করেছি আমি তুমি কী ধারণা রাখো? আয়াশের চোখের দিকে তাকাও তুমি তাই ওর অনুভূতি বুঝতে পারো। অহীনের চোখের দিকেও তাকাতে শেখো।”
আশা একটু তাচ্ছিল্য হাসে, অতঃপর দৃঢ়তার সঙ্গে বলে,
“শেম? আব্বু, তুমি কি আয়াশের চোখের দিকে তাকিয়েছিলে? তাকে উত্তর দিতে হয়নি? দীর্ঘ সাতটা বছর যে ছেলেটা তোমার আর বড় বাবার পেছনে পাগলের মতো ঘুরেছে শুধু ভালোবাসার জন্য, তার কষ্টগুলো তোমার কাছে এত তুচ্ছ? আমাদের বিয়ের এত দিন পর আজ আমি জানলাম সে কেন আসেনি! সেদিন বললে হয়তো আজ সব ঠিক থাকত। অহীন আমার কাজিন, আমি বিয়েটা ভেঙে দিচ্ছি না কিন্তু অনুভূতি তো আর কথার দাস নয়। সব দাবিয়ে রেখে আমি সংসার করতে পারব না। যদি চাও, তবে আমাকে একটু সময় দাও।”
আকাশ উঠে দাঁড়ায়, একদম আশার কাছে আসে। চোখে রাগ দেখে অহীন আশাকে আড়াল করতে চায় তবে আকাশ তাকে সরিয়ে দিয়ে আশার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায় এবং রুক্ষ স্বরে বলে,,
“বিয়ের সময় তোমার মনে হয়নি? যে আয়াশ এমনটা করতেই পারে না। যেখানে আমি বিশ্বাস করি আয়াশ তোমাকে চিট করবে না, তুমি করতে পারোনি? তুমি বাচ্চা? অবুঝ? কবুল বলার আগে মনে পড়েছিল আয়াশকে?”
“বুবু তখন..।”
“শাট ইওর মাউথ! তুমি চাইলেই পারতে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লক করে বসে থাকতে। অহীন চাইলেই পারত বিয়ে করব না বলে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে। ভুল তোমরা করেছো আমরা না। বিয়ে ভেঙে দিতে চাও?”
“আমি বিয়ে ভাঙার কথা বলছি না, কিন্তু…।”
“কিন্তু আয়াশকেও ছাড়তে পারছ না তাই তো?”
আশা চেঁচিয়ে ওঠে আকাশের প্রশ্নের উত্তরে,,
“না পারছি না, কারণ আমার অনুভূতিগুলো মিথ্যা নয়। আমি ভালোবাসি তাকে। আমাকে সময় দিতে হবে সবকিছু থেকে বের হওয়ার জন্য। এভাবে ঘর সাজিয়ে অহীনের রুমে পাঠানোর মানে কী?”
“অহীনের সাথে থাকলে ওকে বুঝলেই মন তার দিকে আসবে, তাই আমার সাথে তর্ক একদম করবে না।”
আশা স্তব্ধ হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের পাপড়িগুলো তিরতির করে কাঁপছে, ভিজে টলটল করছে যেন এখনই জলধারা গড়িয়ে পড়বে। অহীন ওর দিকে এগিয়ে ঝুঁকে হিসহিস করে বলল,,
“রুমে যা, এত তর্ক করতে হয় না।”
আকাশ অহীনের দিকে তাকায়। অহীন মলিন চোখে তাকিয়ে আছে। আশা চলে যেতে চাইলেই আকাশ তাকে ফের ডাকে এবং অহীনকে উদ্দেশ্য করে বলল,,
“তুমি কি আমার কথাটাকে মূল্যহীন ভেবে উড়িয়ে দিচ্ছ?”
“না ছোট বাবা, আমার মতে..।”
অহীনের নত মস্তিষ্কের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আকাশ বলে ওঠে,
“তোমার মত যেমন বিয়ের সময় প্রয়োজন হয়নি এখনো প্রয়োজন নেই, রুমে যাও। আমরা চাই তোমরা ভালো থাকো।”
অন্তিক বসে বসে ফোন স্ক্রোল করছে, আজও তার বেপরোয়া ভাবটা আছে। ছেলে মেয়ের সংসার নিয়েও মাথা ঘামানোর প্রয়োজন তেমন বোধ নেই তার। আকাশ ওই দিকে ক্রুর চোখে তাকিয়ে বলল,
“অন্তিক, আমিই বলব?”
অহীন ফের বিরক্তির রেশ টেনে বলল,,
“আমরা ফ্রান্স যাচ্ছি তো। তখন না হয় একসাথেই থাকব। আশুর দিকটা একটু ভাবুন।”
আকাশ ওর কথায় তেমন পাত্তাই দিল না। অন্তিকের দিকে তাকিয়ে ধমকে ওঠে,
“অন্তিক!”
ধড়ফড়িয়ে ফোন পাশে রেখে উঠে দাঁড়ায় অন্তিক। কী কথা হচ্ছিল খানিকটা সময় নিয়ে আঁচ করে বলল,
“অহীন চাচুর কথা বুঝতে পারছ না? রুমে যাও।”
“আব্বু!”
অন্তিকের দৃষ্টি কঠোর। অহীন বিরক্তি নিয়ে গিয়ে বসে। আশাকে নিয়ে কুহু আর তাশা চলে গেল তাদের কক্ষে। অহীন অন্য দিকে তাকিয়ে হাঁসফাস করছে, কপাল ঘামে ভেজা তার বোঝা মুশকিল কী ভাবছে। তার এমন হাবভাবে আশা ছাড়া সবাই অগোচরে মুচকি হাসে। অহীন ফের বলল,
“প্লিজ তোমরা এমন করছ কেন? যেন বাসর ঘরে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে বা আমরা এক হয়ে যাব।”
অহীনের কথায় অন্তিক গালে হাত দেয়। কুহুর কক্ষের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গভীর গলায় বলল,
“রাইট, রুমে গেলেই যে সব ঠিক হয়ে যাবে এটা কীভাবে মানব?”
আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকায় তার দিকে। অন্তিক কী বলতে চায় জানার জন্য তাকাতেই অন্তিক ফোঁস করে বলল,,
“তোকে বলেছিলাম এত ফুল দিয়ে ঘর সাজাতে না। কিন্তু তোর মাথায় আমার কথা গেল তো? এবার রুম, ফুল ও শ্রম সব বরবাদ।”
অহীন বলল,
“এক্সাক্টলি সেটাই তো। বাসরের জন্য ফুল প্রয়োজন হয় নাকি? সময় হলে সব হবে। আশু রুমে গিয়ে শুয়ে পড়, আমি ম্যাট্রেসের ওপর থেকে যাব আজ।”
বলেই এগোতে নিলে অন্তিক ভারি স্বরে বলে ওঠে,
“বললেই হলো? এত টাকার ফুল এত শ্রম, তার চেয়ে বরং আমি ব্যবহার করতে পারি তোর রুম আজ।”
বড় বড় চোখ করে আকাশ আর অহীন তার দিকে তাকায়। কত সহজে বলে দিল সে কথাটা! অহীন তার সন্তান নাকি বন্ধু? লজ্জা কি হচ্ছে না তার? অহীন চুপ করল কিঞ্চিৎ লজ্জায়। আকাশ তো আছেই বলার জন্য এই বেহায়া লোককে। তবে তার মনের ভাব ভুল করে আকাশ বলল,,
“আসছে উড়ে! প্ল্যান আমার ছিল। এমনকি রুম নিজের শ্রমে সাজিয়েছি আমি। অনেক দিন কঠোর ব্যায়াম হয় না, আজ হবে। রুম আমার।”
খুক খুক করে কেশে ওঠে অহীন। এরা বাপ-চাচা? চোখ কোটর থেকে বের হওয়ার উপক্রম তার। অন্তিক জেদ করে ওঠে,
“সো হোয়াট? সারাক্ষণ তো বউয়ের লেজ ধরে বাদরের মতো ঘুরিস। ভাব এমন যেন এখনো কিছু করিস নি, বাচ্চা গুলা তাল গাছ থেকে পড়েছে।”
আকাশ তেড়ে এগিয়ে যায় দুই পা,,
“লিসেন, আমার রক্ত গরম এখনো। তোর মতো নয়, বাচ্চা পয়দা করতে পারব এখনো, তাল গাছের ওপর ভরসা করার প্রয়োজন হবে না। তোর সমস্যা থাকতে পারে, যতই হোক ইউ আর স্টিল ভার্জিন বলে কথা।”
আত্মসম্মানে লাগল বোধহয় অন্তিকের। দুই পা এগিয়ে আকাশের কলার চেপে ধরতেই যাবে ওমনি মাঝ থেকে অহীন এসে থামায়,,
“যার যার বউ নিয়ে যার যার রুমে যান আপনারা। আমার রুম আমার বউ নিয়ে আমিই ব্যবহার করব।”
দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে দুই দিক থেকে তাদের থামায় অহীন, বুকটা কেমন ধুকপুক করছে। আকাশ আর অন্তিক অগোচরে হাসে। আকাশ বলল,
“নো, অসম্ভব। অহীন, তাশুর শখ ছিল বউ সাজার। আজকে পূরণ হয়ে যাবে।”
অন্তিক ভরকে চেঁচিয়ে ওঠে,
“বললেই হলো? বিয়ে করে বউ পেলামই বা কতদিন? বেনিফিট আমার সব।”
“স্টপ! হোয়াট দ্য ফাও কথা ইয়ার। আমি আপনাদের ছেলে! আশু আপনাদের মেয়ে। একটু তো লাজ লজ্জা লেহাজ করুন।”
অহীন মাঝখান থেকে চেঁচিয়ে উঠল তাদের এমন অহেতুক তর্কে অসহ্য হয়ে। এরই মাঝে আশাকে একদম পুতুলের মতো করে সাজিয়ে কুহুর কক্ষ থেকে বের হয় তারা। কুহুর লাল টকটকে একটা শাড়ি আশার গায়ে। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। চোখে মোটা করে কাজল লেপ্টানো। অহীন তাকিয়ে আছে গভীর স্তব্ধ চোখে। আজ শরীর কাঁপবে তার। ঢোক গিলে চোখ ফেরায়। অন্তিক আর আকাশ ফের বলতে চায় কিছু একটা,,
“রুম আমা...।”
দুই হাত দিয়ে দুজনের মুখ চেপে ধরে অহীন, ভেবলার মতো মেকি হেসে দেয়। কৌতূহলী হয়ে কুহু আর তাশা তাকাতেই অহীন বলল,,
“তোমরা তোমাদের কাজ করো। এরা দু'জন পাগল হয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে আছে।”
আশা তাকাল না তাদের দিকে একটিবার। বাধ্য মেয়ের মতো মায়েদের সাথে যায়। আশার যাওয়ার দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে আছে অহীন। কী অস্বাভাবিক আজকের পরিবেশ! বাতাসরাও বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তার সাথে এক প্রকার ধস্তাধস্তি করে ছুটে আকাশ আর অন্তিক। অন্তিকের ধবধবে সাদা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে নিমিষেই। ক্রুর চোখে দুজন অহীনের দিকে তাকাতেই নিজের কক্ষের দিকে যেতে যেতে গভীর গলায় সে বলে সে,,
“বলদের বংশ! এই রূপ আগে দেখালে এত তেল দিতে হতো না আমাকে আপনাদের। দোয়া করুন সকাল সকাল সুখবর নিয়ে আসব।”
চলবে,,,,