#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম ki
রাতের আকাশে তারারা ঝিকমিক করছে, বাঁকা চাঁদটা আকাশে এক কোণে ঝুলে আছে। শহরের বিশালতায় তখনও আলো জ্বলছে একটি ফ্ল্যাটে। অহীন সবে নিজের ঘরে প্রবেশ করল। সেখানে কুহু আর আশা নিজেদের মধ্যে জরুরি কিছু কথা বলছিল অহীনকে দেখে আশা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে দেয় কুহুর বাধ্য মেয়ের মতো। আশার টলটলে চোখে তখন রাজ্যের অভিমান আর ক্ষোভ জমাট বেঁধে আছে। তবে অহীনের চোখে আজ কোনো তর্কের আভাস নেই, বরং এক অদ্ভুত শান্ত ভাব। সে ধীর পায়ে কুহুর দিকে এগোতেই কুহু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধরা গলায় বলল,
“চোখ কখনো মিথ্যা বলে না। আর চাওয়ার জন্য তোলা হাত আল্লাহ ফেরান না। যা পেয়েছ তা তোমার নিজের প্রাপ্য, কেন তাকে হাতছাড়া হতে দেবে?”
পাশ থেকে তাশা এগিয়ে এসে অনুশোচনার সুরে অহীনের হাত দুটো ধরে। আদুরে গলায় সে আবদার করে,
“আমি কোনোদিন নিজের জন্য প্রতিবাদ করতে শিখিনি। কুহু আর তোমার চাচুই আমার হয়ে সব বলে। মা নেই তো, তাই খালামণিকে কিছু বলতে পারি না। কষ্ট হয়, কারণ তিনিই তো আমার মায়ের মতো। ভুল আমারই ছিল, তোমাদের আগলে রাখা উচিত ছিল। অহীন, বিয়ে মানে তো সম্মান, তাই না? আশাকে দেবে না? জানি সব হঠাৎ করে হয়ে গেছে, কিন্তু আশু তো এখন তোমার। কেন বারবার তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবো? নিজেদের একটু সময় দাও, দেখবে মন নিজেই সঠিক পথ দেখাবে।”
কথা শেষ করতেই অহীনকে হুট করে বেহায়া গলায় বলল,
“তার জন্য তোমাদের বের হতে হবে।এবার তাহলে রুম থেকে যাও। পারলে খাওয়ার জন্য কিছু ফ্রুটস আর দুধ দিও।”
আশা পেছন থেকে অবাক হয়ে তাকায় অহীনের দিকে। কুহুও কম বিস্মিত হয়নি। বাবার মতো অহীনও যেন এক নম্বরের বেয়াদব! সে তাশাকে নিয়ে অহীনকে চোখ রাঙিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। রুম খালি হতেই অহীন সশব্দে দরজা বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আশার দিকে ফিরে তাকায়। আশা তখন রাগে ফুঁসছে, তপ্ত শ্বাস ফেলে সে জিজ্ঞেস করে,
“কী হলো, তুমি হঠাৎ এত বিনয়ী হয়ে গেলে কেন?”
অহীন এক চিলতে বাঁকা হাসে। তার নেশালো চোখজোড়া আশাকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখছে ভালো করে। খোলা জানালা দিয়ে আসা হালকা বাতাসে আশার ছোট চুলগুলো উড়ছে একদিকে। অহীন ধীরে ধীরে তার দিকে এগোয়। চোখ বুজে ঘরের মিষ্টি গোলাপের সুবাস নিয়ে নেশাতুর স্বরে বলল,
“বিয়ে করেছি, গুরুজনেরা এত কষ্ট করে রুম সাজাল, বাসর তো করতে হবে বেইবি!”
আশা পিছিয়ে গিয়ে কাঁপানো গলায় বলল,
“ফাজলামো করবে না অহীন, এটা মজা করার সময় নয়।”
অহীনের দৃষ্টি তখন আশার লাল লিপস্টিক মাখা ঠোঁটের দিকে। বিছানায় ছড়ানো গোলাপের পাপড়ির চেয়েও ওই ঠোঁট জোড়া আজ তার কাছে বেশি সুন্দর লাগছে। পিছু হটতে হটতে আশার পিঠ ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় যে কখন ঠেকল জানে না। পিছনে যাওয়ার পথ ফুরোতেই ঢোক গিলে সে। অহীন এক হাত আয়নায় রেখে অন্য হাতে আশার চিবুক স্পর্শ করে। তার তপ্ত নিঃশ্বাস আশার মুখে আছড়ে পড়ছে। সে ফিসফিস করে বলে,
“তোকে দেখলেই ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে। পুরো রাত তোকে আমার দহনে পোড়ানোর আকাঙ্ক্ষা জাগে। এ যেন এক নিষিদ্ধ বাসনা। আজ যদি তোর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে তোকে কাছে টেনে নিই, তবে কি খুব বড় অন্যায় হবে আশু?”
আশা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে অহীনের প্রশস্ত বুকে ধাক্কা দেয়। শরীর থরথর করে কাঁপছে তার। মুখ ঘুরিয়ে সে বলল,
“তোমাকে আমার ভয় করছে, আমি জানি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ তুমি। দয়া করে এই রসিকতা বন্ধ করো।”
অহীন আরও ঝুঁকে আসে তার দিকে, অধৈর্য হয়ে ও ভয়ে আশা হাত শক্ত করে নেয় থাপ্পড় দেওয়ার জন্য, তবে অহীন আরও কাছে আসতে যাবে ঠিক তখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ আসে কানে। বিরক্তির ‘চ’ জাতীয় এক শব্দ করে অহীন সরে এল তার কাছ থেকে। আশা নরম হয়ে আশে, হয়ত সত্যি থাপ্পড় টা এবার দিতো অহীনের গালে। মুহূর্তেই তার গম্ভীর নেশালো ভাবটা কেটে গিয়ে সেখানে দুষ্টুমি আর খুনসুটি ফিরে এসেছে। দরজা খুলতেই দেখে কুহু প্লেট ভর্তি খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খাবার নিয়ে অহীন দরজা বন্ধ করে দিয়ে দেখে আশা ঘরে নেই। বাথরুম থেকে পানির শব্দ আসায় সে বুঝতে পারে আশা ভেতরে। আশার ভয়ার্ত মুখটা মনে পড়তেই খিলখিল করে হেসে দেয় সে।
খাবার নিয়ে অনেকটা অপেক্ষার পরেও আশার হদিস নেই। খানিকটা সময় পর অহীন ক্ষুধার্ত অবস্থায় না পেরে আশাকে ডাকে,
“ও চাচাতো বউ, এবার বের হ না ! নাকি আজ বাথরুমে ঘুমাবি? বালিশ দেব?”
কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অহীন একাই খেতে শুরু করে এবার। বেশ কিছুক্ষণ পর আশা সাদামাটা একটা জামা পরে ভেজা পায়ে বেরিয়ে আসে, ভেজা পা জোড়ার দিকে অহীনের চোখ। এগিয়ে প্লেটে অর্ধেক খাবার দেখে সে মুখ কুঁচকে বলল আশা,
“আমাকে রেখে একাই খেয়ে নিলে?”
অহীন নির্বিকার উত্তর করে,
“তুই আমার কোন জনমের আপন বউ যে তোকে কোলে নিয়ে খাওয়াব?”
আশা ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোমার আপন বউ হতে হবে না, আমি ফুম্মিকে গিয়ে বলছি সব।”
“কেন বলতে হবে কেন? স্বামীর এঁটো খেলে সওয়াব হয় জানিস না? খেয়ে নে।”
আশা কোমরে হাত দিয়ে কটাক্ষ করে,
“তা তুমি আমার কোন জনমের আপন স্বামী? ওই তো চাচাতো স্বামী!”
অহীন হেসে বলে,
“চাচাতোই সই, স্বামী তো মানলি? এবার খেয়ে নে। এখন বাইরে বের হলে সবাই তোর ভেজা চুল দেখে ভাববে আমার এনার্জি কম, তাই দ্রুত প্রসেসিং শেষ হয়েছে। আমার মান-ইজ্জত রক্ষা কর, যা আছে খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর।”
অহীনের কথায় বারবার ফুটে উঠছে আশার জীবনে তার অধিকারের কথা। অহীন যেন বোঝাতে চায় আশার জীবনে তার ভূমিকা। আশা অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে বলে,
“তুমি জানো আমি কারো এঁটো খাই না, আমার এতে মারাত্মক ফোবিয়া কাজ করে।”
অহীন বিড়বিড় করে বলল,
“ স্যানিটাইজারের প্রভাব, সমস্যা নেই আমার বউ হয়েছিস, কত কী যে খাওয়াব! না খেলে মুখ চেপে ধরে খাওয়াব।”
আশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কী বললে?”
অহীন গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “আয়াশের জন্য তো সব করতে পারিস, আজ এত নাটক কেন?”
মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশ থমথমে হয়ে যায়। আশা মলিন মুখে বলে,
“আমাদের মাঝে আয়াশকে কেন টানছ?”
অহীন যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করে,
“কী বললি?”
আশা কোনো দ্বিধা ছাড়াই স্পষ্ট করে বলে,
“আমাদের মাঝে অহেতুক আয়াশকে টানবে না।”
অহীনের ঠোঁটে এক টুকরো শান্ত হাসি। সে মাখানো হাত ঝেড়ে আশার হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসায়। প্লেট থেকে এক লোকমা ভাত আশার মুখের সামনে ধরে উৎফুল্ল মনে বলল,
“আর বলব না কোনোদিন। সত্যি বলছি, হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়েছি। এবার হা কর তো!”
অহীনের এই হুটহাট স্বভাব পরিবর্তন দেখে আশা কিছুটা সন্দিহান হয়ে পিছিয়ে যায়। অহীন আবার আবদার করে বলল,
“আরে সত্যি বলছি, হাত ভালো করে পরিষ্কার করেছি। খেয়ে নে!”
সঙ্কোচ কাটিয়ে আশা শেষমেশ অহীনের হাতের লোকমাটা মুখে তুলে নেয় এবার। অহীন আলতো করে হাসে, ওর চোখেমুখে একটা তৃপ্তির আভা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অহীন কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভেবে আবার আশার দিকে তাকায়। খাওয়ার চোটে মেয়েটার গাল দুটো ফুলে আছে, দেখতে বড্ড মায়াবী লাগছে। আশা অস্পষ্ট স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“অহীন, সবাই এমন করছে... এখন কী করব?”
অহীন আশ্বস্ত করে বলে,
“তোর কিছু করতে হবে না। আমি থাকতে এত ভাবিস কেন পেঁচি?”
“ফ্রান্স যাওয়ার পর কোথায় থাকব আমরা?”
“আমার সাথে থাকবি। অন্তু যদি সবদিক দিয়ে ঠিকঠাক ম্যানেজ করতে পারে, তবে থাকা নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না।”
খাওয়া শেষ করে অহীন হাত ধুয়ে রুমে ফিরে দেখে আশা পায়চারি করছে। অহীনকে দেখেই সে হাতের ইশারায় সোফাটা দেখিয়ে কিছু একটা বলতে চায়,
“তুমি সোফায় ঘুমাবে, আর আমি..”
আশার কথা শেষ হওয়ার আগেই অহীন কটাক্ষ করে বলে ওঠে,
“ও হ্যালো! এটা আমার রুম। কোনো বাংলা সিনেমার শুটিং সেট না যে আপনি সোফায় আর আমি খাটে ঘুমানোর ডায়লগ মারবি।”
আশা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ঝাড়ি দিয়ে ওঠে,
“একটু আগে কী করেছ যে তা, ভুলে গেছ? তোমাকে একদম বিশ্বাস করি না আমি।”
“তাহলে টয়লেটে গিয়ে ঘুমা, বালিশ নিয়ে যা। থাকলে আমার পাশেই থাকতে হবে, নয়তো রুম থেকে বের হ।”
আশা কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে অহীনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বাঁকা হেসে বিছানার ওপর ছড়ানো ফুলের পাপড়িগুলো এক ঝটকায় ফেলে দেয় মেঝেতে। আলতো করে গা এলিয়ে দেয় বিছানায়। অহীনও ধীর পায়ে আশার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে চোখ বুজে। বাতাসের সাথে ফুলের ঘ্রাণ মিশে এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করেছে।
চোখ দুটো বুজে আসতেই হঠাৎ অহীনের কোমরে সজোরে এক লাথি পড়ে! বেচারা একদম কিনারায় থাকায় আচম্বিত 'ধরাম' করে নিচে পড়ে । ব্যথায় কুকিয়ে ওঠে,
“আহহহ... পেঁচিইইই!”
আশা যেন গভীর ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠেছে, এমন ভান করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,
“ওও সরি সরি অহীন! আমার ঘুমের ঘোরে অনেক নড়াচড়া করার অভ্যাস। এই জন্যই তো বলছিলাম সোফায় ঘুমাতে।”
অহীন সোজা হতে গিয়ে বুঝতে পারে পিঠে ভালোই চোট লেগেছে। দাঁতে দাঁত চেপে ধমকে বলল,
“শালী! ইচ্ছে করে করেছিস না?”
“না না অহীন, আমি কি এমনটা করতে পারি? তুমি বরং কষ্ট করে সোফায় গিয়েই ঘুমিয়ে পড়ো না!”
“আমাকে ব্যথা দেওয়া? আমি যখন ব্যথা দেব তখন তুই নড়তেও পারবি না। কোমর ভেঙে ফেলব, আহহহ।”
“দেখা যাবে। এখন কানের কাছে কুত্তার মতো ঘেউঘেউ না করে ঘুমাও গিয়ে।”
ব্যথায় অহীন কোমর চেপে ধরে। বিছানায় হাত রেখে ওঠার চেষ্টা করেও পারল না সে। আশার মনে এবার একটু হচ্ছে ইস বেশি করে ফেলেছে বেচারার সাথে, হাত বাড়িয়ে দেয় অহীনের দিকে। কিন্তু বিছানা থেকে উঠে বসার কষ্টটুকুও করার ইচ্ছে নেই, শুয়ে থেকেই হাতটা বাড়িয়েছে। অহীন আশার হাতে ভর দিয়ে আস্তে করে উঠে আসে, এবং উঠেই এক ঝটকায় আশার গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে!
মুহূর্তের মধ্যে আশার এলোমেলো হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি করে নেয় অহীন নিজের শক্ত হাতে। একটা বালিশ টেনে নিয়ে হালকা হেসে আশার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কিন্তু কামড়াতেও পারি। আর আমার কামড় খেলেই এক ডজন বাচ্চা হবে। দেব একটা কামড়?”
আশা তার ঊরু দিয়ে আঘাত করতে যায় অহীনকে, তবে অহীন কম কিসে? সে পায়ের খাঁজে তার পা আটকে নেয় শক্ত করে। অহীন আরও ঝুঁকে আসে আশার কানের কাছে, তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ানোর চেষ্টা করে বলল,
“এটা আমাদের বর্ডার। আর ঝামেলা করলে এখন যা করতে ইচ্ছে করছে, সব করে ফেলব। তখন কিন্তু কেঁদে কুল পাবি না।”
কথাটা বলেই অহীন আশাকে ছেড়ে দিয়ে পাশে শুয়ে পড়ে। আশা খেয়াল করে মাঝখানে একটা বালিশ টেনে দিয়ে সীমানা তৈরি করা হয়েছে। অহীনের হুমকিটা বোধহয় কাজ দিয়েছে, আশা আর কোনো টু শব্দ না করে চুপচাপ উল্টো দিকে পাশ ফিরে শোয়, কে জানে রেগে গেলে অহীন থাপ্পড়ও দিতে পারে তাকে।
______
আকাশ আর তাশাকে বিদায় দিয়ে অন্তিক ধপ করে বসে পড়ে সোফায়। সারা দিনের খাটুনি আর ক্লান্তির পর শরীরটা আর চলছে না। চোখ মেলে দেখল, তার ‘বেয়াদব’ বউটা এখনো কাজ করে যাচ্ছে। অন্তিক একটু বিরক্তি মিশিয়ে ডাকে,
“এই পেঁচি, এদিক আয়।”
কুহু না তাকিয়েই উত্তর করে তাকে,
“তুমি শুয়ে পড়ো গিয়ে, আমি এগুলো গুছিয়েই আসছি।”
“আরে সকালে বুয়া আসবে তো, এসে করবে।”
কুহু এবার অন্তিকের দিকে ফিরে তাকিয়ে একটু হাসে,
“সব বুয়ার ওপর ছাড়া যায় না, হানি। আপনি যান, আমি আসছি।”
কুহুর কথাটা শুনে অন্তিকের ধৈর্য যেন শেষ হয়েছে। সোফা ছেড়ে উঠে কুহুকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আলতো করে। কুহুর ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল,
“আদর চাই তোমার, সুইটহার্ট?”
কুহু কনুই দিয়ে অন্তিকের পেটে একটা গুঁতো দিয়ে ধমক দেয়,
“তোমাকে একটু সম্মান দিলেই মাথায় ভূত চাপে! বয়স হয়েছে, এখন একটু লজ্জা করতে শেখো।”
অন্তিক সরলো তো না-ই, বরং কুহুর শাড়ির ভাঁজ দিয়ে ওর উন্মুক্ত পেটে হাত গলিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে। নেশালো গলায় বলল,
“বয়স হয়েছে তো কী? ভালোবাসা কি কমিয়ে দেব? তোকে পেয়েছিই বা কয়দিন? এখন আর দূরে থাকতে ভালো লাগে না।”
কুহু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমাদের জীবনের ওই ৮ বছরের বিচ্ছেদটাকে তুমি বড্ড বড় করে দেখো। বাকি অনেকটা সময় তো তোমার সাথেই আছি আমি।”
“ওই ৮ বছরই তো বউকে কাছে পাওয়ার, ভালোবাসার, আদর করার সময় ছিল। তা তো পুষবে না, তাই বাকি জীবনটা সব লুটে নেব।"
অন্তিক এবার কুহুকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি করে দাঁড় করায়, চোখে চোখ রাখে। দেখল কুহুর চোখে ক্লান্তি আর একরাশ চিন্তা। সে কুহুর চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আমরা কি ওদের জন্য কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলাম রে?”
কুহু একটু আনমনা হয়ে উত্তর দেয়,
“জানি না। তবে অহীন যদি আশার সাথে কোনো অন্যায় করে, আমি ওকে ছেড়ে দেব না।”
“খবরদার! আমার ছেলেকে কিছু বলবি না। ও আমাদের মায়া কম পেয়েছে, এখন যদি নিজের বউয়ের কাছে দাবি করে তবে সেটা ওর অধিকার।”
কুহু এবার একটু রুক্ষ গলায় বলে,
“তোমরা পুরুষরা কোনোদিনও বউয়ের হও না, শুধু পরিবার আর সন্তান বোঝো। আমি চাই না অহীন শুধু পরিবারের কথা ভেবে নিজের আর আশার জীবন নষ্ট করুক। ওরা চাইলে এখনো আলাদা হতে পারে। পরে যদি ওদের মাঝে টানাপোড়েন শুরু হয়?”
“তুই ঠিক কী চাস?”
“আমি চাই অহীন যদি আশাকে সত্যিই ভালোবাসে, তবেই যেন ও ওকে বেঁধে রাখে। আর যদি শুধু পরিবারের চাপে হয়, তবে দয়া করে কেউ জোর কোরো না। আজকের এই আয়োজনগুলো একদম ঠিক হয়নি।”
“অহীন আশাকে ভালোবাসে এটা বুঝতে তুই এত দেরি করছিস কেন পেঁচি?”
কুহু এবার ঝাড়া দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল,
“তুমিও আমায় ভালোবাসতে, কিন্তু কম কষ্ট দিয়েছিলে? আমি তোমায় ভালোবাসি বলেই সব সহ্য করেছি, আশা তো বাসে না। অহীন কতদিন আয়াশের নাম ওর মুখে সহ্য করবে? কেন মিছে জোর করছ?”
অন্তিক এবার ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে সজোরে ধমক দিয়ে উঠল,
“আকাশ চায় এটা! আশা আমাদের মেয়ে, ওকে বোঝালে ও বুঝবে। আমরা তো একসাথে আছি, ওরাও থাকবে। অহীনের খুশির আগে তুই এত কিছু দেখিস কেন?”
হঠাৎ এই উচ্চস্বরের ধমকে কুহু কেঁপে ওঠে একটু। ওর চোখের পাপড়ি ভিজে টলটল করে উঠেছে জল। ধরা গলায় বলল,
“সব সময় তুমি এমনটাই করো, শুধু নিজের দিকটা আগে রাখো। এতগুলো বছরেও তুমি পাল্টাওনি।”
অন্তিক আরও খেপে গিয়ে বলল,
“কী করব? তোর এই যুক্তিহীন কথা শুনে কি ওদের আলাদা হতে বলব? কেন বুঝছিস না অহীন আশাকেই চায়!”
“হ্যাঁ, আমার কথা তো তোমার কাছে সব সময় যুক্তিহীনই মনে হয়। একদিন বলবে তোমার আর তোমার ছেলের জীবন থেকে আমি চলে গেলেই ভালো। আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই তোমাদের, তাই না?”
কথাটা বলেই নিজের কাজে আবার নিয়োজিত হয় সে। পুরো রোমান্টিক পরিবেশটা মুহূর্তেই বিষাদে ভরে গেল সামান্য বিষয়ে। কুহু হিঁচকি তুলে কাঁদছে। অন্তিক কিছুক্ষণ গুম হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের রাগ সামলে নিয়ে কুহুর কাছে যায়। কাঁধ ছুঁতেই কুহু ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দেয় তাকে,
“সরো আমার থেকে! আমি তো অপ্রয়োজনীয় আর যুক্তিহীন।”
অন্তিক এবার আর কথা বাড়ালো না। কুহুর হাতের প্লেটটা টেবিলে রেখে এক ঝটকায় কুহুকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। গভীর স্বরে বলল,
“আজ ধাক্কা দিলে কাল এমন আরও চারটা ছেলে দিবি তুই আমাকে। তোকে অপ্রয়োজনীয় ভাবার সাহস কি আমার আছে?”
কুহু প্রথমে না বুঝলেও মুহূর্তে থতমত খেয়ে ওঠে, পরক্ষণেই অন্তিকের বুকে কিল মেরে ধমকে বলে ওঠে,
“লুচ্চা কুত্তা একটা! ছাড়ো আমাকে।”
অন্তিক কুহুকে নিজের সাথে আরও লেপ্টে নিয়ে বেডরুমের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“বউ বাসর পাচ্ছে খুব, চলো দেখি আজ আমার ধাক্কার জোর কেমন। কাজ সকালে বুয়াই করবে।”
চলবে....