#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ২৪
বিকেলের আমেজ জমেছে, গায়ে কুহুর শাড়িটা এখনো জড়িয়ে রেখেছে আশা ঘুম যেন কোনোভাবেই কাটছে না চোখ থেকে। বিছানায় শুয়ে আছে সে। সোফায় বসে ল্যাপটপে গেম খেলছে অহীন, কানে হেডফোন লাগিয়ে। মাথার অজস্র যন্ত্রণায় এপাশ-ওপাশ করছে আশা। পাশে পড়ে থাকা ফোনটা বেজেই চলেছে সেই কখন থেকে। শক্তি নেই তার উঠে রিসিভ করার, আর সোফায় বসা লোকটাও শুনতে পাচ্ছে না। অবশেষে অতিষ্ঠ হয়ে আশা একটু উঠে ফোনটা তুলে নেয়। কলটা দেখেই চিনেছে এটা আয়াশ।
“আসছ না কেন?”
আশা পাল্টা উত্তর করতেই যাবে, অমনি ওর হাত থেকে ফোনটা ছো মেরে নিয়ে নেয় অহীন। গলা খাঁকারি দিয়ে কানে নিয়ে বলল,
“ও অসুস্থ, ঘুম প্রয়োজন। এখন বাসা থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিচ্ছি না আমি।”
“তোর অনুমতির দাষ? অহীন, তুই তো বলেছিস ডিভোর্স দিবি, তো এত অধিকার কেন?”
অহীন একটু হাসে, আশার দিকে তাকায়। আশা তাকে প্রতিবাদ করল না। ফোনটা নেওয়ার পরেও চুপ করে শুয়ে আছে চোখ বুজে। ড্রাগস কি বেশি হয়ে গেল ওর জন্য? আয়াশকে বলল,
“আমি কোনো মিনিস্টার বা পীর-মোল্লা যে জুবান রাখতে হবে? রাতে যা পেলাম, তারপর আশুকে ছাড়া সম্ভব নয়।”
“হাউ ডেয়ার ইউ! ফাকিং পিগ, টাচ করেছিস ওকে তুই? শি লাভস মি, সো ডিভোর্স হবে।”
“এত কিছু জেনে লাভ নেই আমার। ভালোবাসা প্রয়োজন নেই, কারণ শি ইজ মাই ওয়াইফ। পুরোটাই আমার আশু। আর টাচ? করবই উফ, কী যে শান্তি পেলাম!”
“আশুর কাছে ফোনটা দে।”
“আশু ঘুমাবে, ফোন দেওয়া যাবে না এখন।”
আয়াশ একটু নিজেকে শান্ত করে নরম গলায় বলল,
“প্লিজ।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অহীন বলল,
“সত্যি তাকাতে পারছে না। ঘুম প্রয়োজন।”
কলটা কেটে দিতেই হাত থেকে ফোনটা আছাড় মারে আয়াশ হাসপাতালের খোলা করিডোরের দেওয়ালে লেগে মুহূর্তে কয়েক টুকরো হলো সেটা। অহীন কেন আশুর কল রিসিভ করল, ভাবতেই গা গুলিয়ে আসছে বারবার। লিজা এসে ওর বাহুতে হাত রাখতেই চেঁচিয়ে ওঠে,
“ডোন্ট টাচ! তোমাদের জন্য এসব হচ্ছে আমার সাথে।”
লিজা কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে আবার সোজা হয়ে বলল,
“আয়াশ শান্ত হও, এমন পাগলামি করো না।”
আয়াশ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে লিজার কাছে গিয়ে বলল,
“পাগলামি? মম, তোমার কেমন লাগবে যদি ড্যাড অন্য একটা বিয়ে করে নেয়?”
“তিনি আমার হাসবেন্ড।”
“পুতুলকে আমি ভালোবাসি।”
থামে দুজন। হাসপাতালের করিডোরে লোক জড়ো হয়েছে তাদের তর্ক দেখতে। এসব যেন লোকের চোখে তামাশা। আয়াশ প্রস্থান করে সেখান থেকে নিজের গাড়ির দিকে। আশপাশে তাকিয়ে লিজা বলতেই যাবে কিছু, আয়াশ থেমে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে,
“বাই দ্য ওয়ে, আমার জীবনে ঝড় তুলে তোমার শাশুড়ি কোথায় পালিয়েছে? দেখতে তো আসল না একটিবার।”
লিজা এগিয়ে যায়, আয়াশের কালো জ্যাকেটের বাহুতে শক্ত করে ধরে শাসিয়ে বলল,
“দাদু হয় তোমার, পালন করেছে তোমাকে, বেয়াদব!”
লিজার কাছ থেকে নিজের হাত ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে পিছিয়ে যায় আয়াশ। একটু তাচ্ছিল্য করে বলল,
“পালন? মম, আমার ফোবিয়া ওনার জন্য হয়েছে। ছোট থেকে তোমরা আমার দায়িত্ব নাওনি। জন্ম দেওয়ার পর কুকুর-বেড়ালও বাচ্চা সবল হওয়া পর্যন্ত মা নিজের বুকে রাখে। তোমরা তাও রাখোনি আমাকে। ওনার কাছে রেখেছ। প্রতি পদে আমাকে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ শিখিয়েছে। একটা ফ্রেন্ড তৈরি করলে বলত এটা হবে, সেটা হবে, অসুস্থ হয়ে যাব মিশতে দিত না। বন্ধু নেই আমার একটাও। অন্তু-আশাও থাকত না যদি না অন্তিক চাচ্চুর সাথে তোমাদের সম্পর্ক ভালো হতো। বাহির থেকে বন্ধু বাসায় নিয়ে খেলতে চাইলে দেখতাম পুরো বাড়ি স্যানিটাইজ করত। কারো হাত ধরলে আমাকে জোর করে গোসল করাত। এখন কেউ নেই আমার, কারণ আমিও ভেদাভেদ করি লোকের। চাইলেও কারো কাছে যেতে পারি না। সব ঠিক ছিল মম, সব ভুলে গিয়েছি, ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি আমি কারন আশু ছিলো আমার কাছে। কষ্ট গুলো আবেগ গুলো প্রকাশ করার জন্য। কিন্তু উনি পুতুলকে আলাদা করে দেওয়ার মতো কাজ কেন করলেন?”
"পাগল হয়ে যাচ্ছ আশার জন্য তুমি।"
আয়াশের চোখ জোড়া এবার টলমল করছে, নিচের ঠোঁট কামড়ে কষ্ট গিলে নেয় সে। চোখের পলক ঝাপটাতেই গাল গড়িয়ে পড়ে দু-ফোঁটা পানি। এগিয়ে গিয়ে লিজার সামনে দাঁড়িয়ে করুণ গলায় বলল,
“আমি তো আর আসতাম না ওনার কাছে আশুকে নিয়ে ফ্রান্সে সেটল হয়ে যেতাম। তাহলে আশুকে নিয়ে ওনার প্রবলেম কী ছিল? চোখ বুজে যাকে নিজের বলে দাবি করতাম, তাকে এখন পাওয়ার জন্য কম্পিটিশন করতে হচ্ছে। যে আমার ছিলো তাকে এখন অন্যের কাছ থেকে চাইতে হচ্ছে। আমি প্রতিক্ষণ ভাবতে বাধ্য হচ্ছি যে, আমি কোন দিক দিয়ে অহীনের থেকে অযোগ্য যে তাকে পেলাম না। শেষে একটাই উত্তর পাই ওসিডি।”
লিজা হাত বাড়িয়ে ওর গাল ধরতে চায়, আয়াশ দিল না ধরতে।
“তোমার মায়া কখনো পাইনি আমি ছোটবেলায়। এখন নিতে পারি না তোমার ছোঁয়া। আমার ইচ্ছে করে তোমাকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু মস্তিষ্ক আমার সঙ্গ দেয় না। যাকে ছোঁয়ার জন্য মস্তিষ্ককে এত বছর প্রস্তুত করেছি, এখন সেও নেই। ভেতরটা পুড়ে যায় আমার চেয়ে বেশি অধিকার আশুর ওপর এখন অন্য কারো। আমাদের পরশু ফ্লাইট। আমি আর দাদুর কাছে কখনো আসব না। উনি অনেক বড় ক্ষতি করেছেন আমার, কখনো মাফ করব না ওনাকে।”
-----
আয়াশের কলটা কেটে অহীন ফোনটা ছুড়ে মারে বিছানার একটি কোণায়। আশার দিকে এক পলক তাকায় মেয়েটা ছটফট করছে প্রচুর। অহীন তেমন গুরুত্ব দিল না। সোফায় আবার বসার জন্য ঝুঁকতেই আশা উঁচু হয়ে গরগর করে বমি করে দেয় মেঝেতে। ঝুঁকে যাওয়া কোমরটা সোফায় আর ঠেকল কই? ছুটে আসে অহীন তার কাছে। সব উপেক্ষা করে একটি হাতে আগলে ধরে আশার মাথা, অপর হাতে বুক। তড়িঘড়ি করে প্রশ্ন করে,
“কী হয়েছে আশু?”
কথা বলছে না বেচারি, অনবরত বমি করেই চলেছে। কী করবে মাথা কাজ করছে না অহীনের। হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মাথা ও গলার কাছে, যেন একটু কষ্ট কমে যায় আশার। অনেকটা সময় যেতেই শান্ত হয় আশা। অহীন ধরে পানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে শুইয়ে দেয়। আবারও জিজ্ঞেস করে,
“কী হয়েছে আশু? পেট খারাপ? মাথা ঘুরছে?”
আশা দুই দিকে মাথা দুলিয়ে স্বল্প স্বরে জবাব দেয়,
“জানি না। ঘুম পাচ্ছে কিন্তু ঘুমাতে পারছি না। পুরো শরীর গুলিয়ে আসছে।”
ঠোঁট টিপে ভাবনায় মগ্ন হয় অহীন। ঘুমের ওষুধের ডোজ বেশি দিয়ে ফেলেছে হয়তো একই সাথে তিনটা। সে উঠে নামতে চায়, তবে সামনের অবস্থা খারাপ, গা গোলানো। মায়ের কাছে বললে মার খাবে নিশ্চিত। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে অহীন নিজেই নিজেকে বিড়বিড় করে বোঝায়,
“ভালোবাসছিস আর এসব ঘৃণা হলে চলবে? আশুর সবকিছুর থেকে অনিহা কাটিয়ে উঠতে হবে। যতই হোক, ভবিষ্যতে ওই শরীরের ওপরই নিজের দাবি ফলাতে হবে। প্রতিটি জিনিসে। আরও কত কী ধরতে হবে!”
ভাবতে ভাবতে নিজেই নিজের ঠোঁট কামড়ে হাসে। এমন পরিস্থিতিতে এসব ভেবে নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলো কিছুটা। অতঃপর আবার নিচে তাকায় হতাশ হয়ে। ওয়াশরুমে ছুটে যায় বালতি ও মপ নিয়ে আসে। পিটপিট করে তাকিয়ে দেখছে আশা। অহীন একটু নাক সিঁটকাচ্ছে, তবুও করছে। নিজের কাজ শেষ করে ভালো করে হাত পরিষ্কার করে আসে। আশার সাথে কথা না বলেই রুম থেকে বের হয়ে যায়। আশার একটু খারাপ লাগল হয়তো এমন কাজে। অহীন হয়তো বেশ রেগে আছে এত কিছুর জন্য আড়ষ্ট হয়ে চোখ বুজে পাশ ফেরে। বেশ খানিকটা সময় পর অহীন আবার আসে রুমে। সন্ধ্যা নামছে। হাতে একটা গ্লাস, বিছানার পাশে রেখে অহীন সবগুলো জানালা বন্ধ করে আবারও। আশার কাছে আসে। চোখ বুজে আছে ক্লান্তিতে। হাত বাড়িয়ে ডাকতেই আশা চোখ মেলে তাকায়। তাকে আলতো করে ধরে আধশোয়া করে দেয় অহীন। অতঃপর পাশে থাকা গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এটা খেয়ে নে, ভালো লাগবে।”
গ্লাসের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কী আছে এটাতে?”
“লেবুর পানি।”
গ্লাসটা অহীনের হাত থেকে নিতে চাইলেও দিল না সে। আলতো করে নিজের হাতেই খাইয়ে দিল আশাকে। অতিরিক্ত টক হওয়াতে নাক-মুখ কুঁচকে নেয় আশা। গ্লাসটা সরিয়ে দিতেই মুখে ঠেসে দিয়ে ধমকে ওঠে,
“তোর বমি পুরো রাত সাফ করতে পারব না, চুপচাপ খা বাল!”
মাথায় অজস্র যন্ত্রণা আশার থেকে তর্ক করার শক্তিটুকুও কেড়ে নিয়েছে। বেচারির শরীরটা অবশ হয়ে হেলে যাচ্ছে পেছনে। লেবুর জলটুকু খেয়ে গা এলিয়ে দেয় নরম বালিশে। হাতের গ্লাসটা রেখে অহীন ওর পাশে শুতে যাবে, অমনি দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়। অহীন ঘাবড়ানো ভাব নিয়ে হাঁসফাঁস করে বুকে ফুঁ দেয়। কুহু হলে আজ থাপ্পড় খাবে কয়েকটা। উঠে দরজা খুলে ভয়ার্ত চেহারাটা লুকিয়ে মেকি হেসে ফিসফিস করে,
“একেই বলে যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়।”
গম্ভীর মুখে অহীনকে সোজা পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে কুহু। আষ্টেপৃষ্টে একটা গা-গোলানো গন্ধ লাগছে একটু নাকে। নাক কুঁচকাতেই অহীন স্প্রে না করার আফসোস করে নিজের মাথা ঠুকে। আশার মলিন নিথর শরীরটার কাছে গিয়ে বসে মাথায় হাত দিয়ে অহীনের দিকে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করে,
“বমি করেছে?”
নত মস্তকে মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ-সূচক ইশারা করে অহীন। কুহু পাশে শরবতের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আশার দিকে তাকায়। ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে অহীনের কাছে যায়, ভারি রুদ্ধ স্বরে বলল,
“আশা কখনো স্লিপিং পিল নেয়নি। আর তুমি স্নোজের মতো হাই ডোজ দিয়েছ মেয়েটাকে! আল্লাহ না করুক কিছু হয়ে গেলে কী করতে?”
“বুঝতে পারিনি এমন কিছু হবে।”
“তুমি একটা মেয়ের ঘুমের সুযোগ কেমন করে নিতে পারো? তোমাকে এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে? যতই তোমার বিয়ে করা বউ হোক, একটা মেয়েকে বিয়ের পরেও জোর করে বা সুযোগ নিয়ে ছোঁয়াকে ম্যারিটাল রেপ বলা হয়, জানো না?”
অহীন জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে অনুশোচিত গলায় বলল,
“আমি এমন কিছু করিনি, শুধু জরিয়ে...।”
বলে শেষ করতে দিল না কুহু, আগেই বলে ওঠে,
“শুধু? শুধু কী? আশু এখন অসুস্থ, এটা শুধু? কয়টা পিল খাইয়েছিলে?”
“১টা।”
“এক থাপ্পড় দেব, এসব উদ্ভট কাজ ভুলে যাবে। তোমার জন্য নিজেকে কতটা বাজে মনে হচ্ছে তুমি জানো? তোমার দোষ ঢাকছি আমি, যেটা করা অন্যায়।”
“আর হবে না।”
কুহু ফোঁস করে শ্বাস নেয়, হাঁসফাঁস করে আশার দিকে তাকায় মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। অহীনের সাথে কী রাগ করবে, বুঝে উঠতে পারছে না। অতঃপর এগিয়ে গিয়ে অহীনের হাত ধরে সুন্দর করে নরম গলায় বোঝায়,
“বিয়েটা তোমাদের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হয়েছে, মাত্র কয়েকটা সপ্তাহ গেল। আমি জানি তুমি আশাকে অনেক ভালোবাসো, কিন্তু আশা তো তোমাকে বাসে না। তোমার উচিত এসব ট্রিকস না খেলে ওর যত্ন নিয়ে ওর ভালোবাসা আদায় করা। যেন কোনো একদিন নিজেই তোমাকে কাছে টানে। সেদিন তুমিও মন খুলে ওকে ভালোবাসতে পারবে।”
অহীন ধীর গলায় বলল,
“আশুকে নিজের করে পাওয়ার পর একটু বুকে টেনে নিয়েছিলাম। দেখতে চেয়েছিলাম না-পাওয়া আর আজকের এই পাওয়ার পূর্ণতার মধ্যে তফাৎ কতটুকু। বুঝলাম অনেক বেশি শান্তি এই ছোঁয়ায়।”
একটু থেমে কুহু অহীনের গালে হাত দিয়ে আবার বলল,
“স্নোজ খাইয়ে তাকে অচেতন করে কী লাভ হলো? বড়জোর তার অবশ শরীরটা একটু ধরার শান্তি পেয়েছ, কিন্তু তার মন কি ছুঁতে পেরেছ? মন আগে ছুঁয়ে দেখ, সেই তৃপ্তির কাছে এই চাতুরি কিছুই না।”
মাথা দুলিয়ে সম্মতি দেয় অহীন। একটু তো আশার জন্য মায়া হচ্ছে তার, এতগুলো ওষুধ দেওয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছে মেয়েটা। কুহু ওর সম্মতিতে একটু সন্তুষ্ট হয় এবং হেসে বলে,
“পরশু তোমরা তো চলে যাবে। কালকে তোমার আব্বু ছোট করে আয়োজন করতে চায় বাইরের কেউ না, বাড়ির লোকগুলোই। আশু যেন সুস্থ থাকে, নয়তো একটা থাপ্পড় বিফলে যাবে না, সব তোমার গালে পড়বে। সাথে বাবার থাপ্পড় ফ্রি। অ্যান্ড আশুকেও আমি দেব না তোমার সাথে।”
কুহু মেকি ক্রুর হেসে প্রস্থান করে। কুহু যেতেই ফোঁস করে হাঁফ ছেড়ে যেন বাঁচল সে। দরজা বন্ধ করে আশার নিকট গিয়ে টুপ করে শুয়ে পড়ে। আগের মতো ঘুমিয়ে আছে। কত বড় মিথ্যাটাই না বলল! তিনটা ট্যাবলেট দিয়ে একটা বলেছে। কুহুর কথায় চিন্তা হচ্ছে খুব। আগ বাড়িয়ে আশার মাথার নিচে একটি হাত দিয়ে বুকে টেনে নেয় আলতো করে। এলোমেলো চুলে বিলি কেটে হালকা হাতে চাপ দেয়, যেন মাথার ব্যথাটা কমে আসে। আশা একটু আরাম পায় এতে। অপর হাতে আশার পৃষ্ঠদেশ বুলিয়ে চলেছে অহীন। কত শান্তি এতটুকুতে! যখন সত্যি আশার সম্মতিতে ছোঁবে, তখন হয়তো সত্যি আরও বেশি প্রশান্তি হবে মনে।
____
বিশাল আকাশটা একটা থালার মতো হাজারো মুক্তা নিয়ে ছড়িয়ে আছে। তারাগুলো ঝিলমিল করছে অসম্ভব রকম সৌন্দর্য। আকাশী রঙের সিল্কের একটি পাতলা জর্জেট শাড়ি পরে আছে আশা। ছাদে ছোট করে আয়োজন করা হয়েছে। যেহেতু তারা চলে যাবে কাল, বড় করে জাঁকজমকে ক্লান্তি বাড়ানোটা উচিত নয়। বিকেল হয়েছে সবে মাত্র, মেহমানের আনাগোনা বাড়ছে বাড়িতে। কুহুর কক্ষে বসে আছে আশা, অন্তিহা আপন মনে সাজাচ্ছে তাকে। ড্রেসিং টেবিলে পড়ে থাকা ফোনটা কখন থেকে ভাইব্রেট হচ্ছে, সেখানে খেয়াল নেই কারো। নুজাইফার হাতে একটা পাতলা শাড়ি, দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে করতে অন্তিহাকে বলছে,
“অন্তু, দেখ তো এই শাড়িটার সাথে ম্যাচিং কোনো ব্লাউজ হয় কি না। এটাই পরতে চাচ্ছিলাম।”
পাতলা শাড়িটা হাতে উল্টেপাল্টে দেখে নেয় অন্তিহা। পর মুহূর্তে আশাকে বলল,
“সেদিন তোর কাপড়ের সাথে সেম রঙের একটা ব্লাউজ দিয়েছিলাম আমি। তোর লাগেজে থাকবে হয়তো।”
আশা ক্ষীণ হেসে বলল,
“হয়তো। দেখ গিয়ে, খাটের নিচে লাগেজটা আছে।”
অন্তিহা মাথা দুলিয়ে রুম থেকে বের হতে হাঁটে। দরজার সামনে যেতেই একটা লম্বা চওড়া পুরুষের বুকের সাথে ধাক্কা খেয়েই রাগে ভড়কে ওঠে এবং কপালে হাত দিয়ে ঘষে বলল,
“উফ! চোখ কই থাকে ভাই?”
অন্তিহা চোখ তুলে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে নেয়। সব সময়ের মতোই মুখে মৃদু হাসির সাথে কেমন অদ্ভুত ভয়ার্ত চোখে অন্তিহার দিকে তাকিয়ে আছে প্রদীপ। প্রদীপ নিজের থেকে ছোট অন্তিহার দিকে ঝুঁকে ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছ?”
মুখে বরাবরের মতোই গাম্ভীর্য নিয়ে উত্তর দেয় অন্তিহা,
“যদি ভালো না থাকতাম, আপনার সাথে ধাক্কা খাওয়ার পর সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকতাম না।”
প্রদীপ ক্ষীণ হেসে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, অতঃপর কাতর গলায় বলল,
“তুমি এত স্বার্থপর কেন অন্তু?”
“স্বার্থপর লোকের স্বার্থ বোঝার পর দূরত্ব তৈরি করতে হয়। আপনিও করুন। পথ না আটকিয়ে ভেতরে গিয়ে বসুন। পরে কথা বলছি, কাজ আছে বহুত।”
“দূরত্ব তো হয়ে যাবে কাল হাজার মাইলের।”
মলিন হয় দুজনের মুখ। অন্তিহা প্রদীপের দিকে তাকিয়ে মাথা নুইয়ে চলে গেল। ওর যাওয়ার দিকে নিষ্পলক হয়ে তাকিয়ে দেখছে প্রদীপ। চোখগুলো আজ ভিজে আসছে কাল চলে যাবে অন্তিহা। মাঝেমধ্যে আশার সাথে দেখা করার ছুতোতে মেয়েটার সাথে কথা বলতে এসে হয়তো আর গম্ভীর ভাবটা দেখা হবে না। আশার কাছে গিয়ে বসে এবার সে। আশা বলল,
“বাকিরা এসেছে?”
“না কেউ আসেনি। আমিও আসতাম না তবে...”
“অন্তুর জন্য এসেছিস তাই তো?”
শীতল হাসে প্রদীপ। সময়ের কাঁটা গড়িয়ে চলেছে, অন্তিহা ফিরছে না এখনো। নুজাইফা বিরক্ত অনেক, রুদ্ধ স্বরে বলে,
“আশু, আমি তৈরি হব তো দেখ তো মেয়েটা কত সময় নিচ্ছে ফিরতে।”
বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় আশা। শাড়ির পাড় শক্ত করে ধরে এগিয়ে বলল,
“হয়তো খুঁজে পাচ্ছে না, আমি দেখছি। অপেক্ষা কর, পাঁচ মিনিট লাগবে।”
কক্ষ থেকে বের হয়ে দেখে ঘরে তেমন লোকজন নেই সবাই হয়তো ছাদে চলে গিয়েছে। আশপাশে অন্তিহাকেও দেখল না আশা। বিরক্তিতে শ্বাস ফেলে নিজেই রুমের দিকে যায়। দরজাটা হালকা ভেজানো ধাক্কা দিয়ে প্রবেশ করতেই অপ্রত্যাশিতভাবে চোখে পড়ে অহীনের ভেজা অর্ধনগ্ন দেহটা। অহীন আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। আশা কিঞ্চিৎও বিচলিত হলো না, উল্টো ধমকে ওঠে,
“নির্লজ্জ কোথাকার! বাড়ি ভর্তি লোক আর দরজা খুলেই...।”
বলতে বলতে অহীন আঁতকে উঠে পেছন ফিরে তাকায়। দুই হাতে নিজের কোমরে পেঁচানো সাদা তোয়ালেটা ভালো করে আঁকড়ে ধরতে চায় তবে দুর্ভাগ্য বেচারার, তড়িঘড়িতে তোয়ালের পেঁচ খুলে এক সাইড হেলে পড়ে। ঘটনা আকস্মিক। আশা থতমত খেয়ে পেছন ফেরে, অস্ফুটস্বরে বিড়বিড় করে ওঠে,
“লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”
সামনে দরজা খোলা দেখে হাত বাড়িয়ে সজোরে ঠাস করে বন্ধ করে দিল সে। পেছন থেকে তোয়ালে কোনোক্রমে ওপরে তুলে চেঁচিয়ে ওঠে অহীন, তবে লজ্জায় নুইয়ে যাওয়ার মতো করে,
“আহহহহহ! পেঁচি বজ্জাত মহিলা, নক করার ম্যানার নেই?”
লজ্জায় ঠোঁটগুলো দাঁতে চেপে ধরে আছে আশা। বলার মতো কী-ই বা আছে! তবে বুঝতে দেওয়া যাবে না সে লজ্জা পেয়েছে, তাই তো কটাক্ষসুলভ আচরণ করে বলল,
“এমন ভান করছ যেন প্রথম দেখলাম?”
“মানে? আগেও দেখেছিস? কখন? কোথায়? কীভাবে?”
অহীনের বিস্মিত প্রশ্নে আশা একটু হাসে। জব্দ করার সুযোগ তো ভালোই পেয়েছে। আস্তে করে পেছন ফিরে তাকায়, ঠোঁটে দুষ্টু হাসি, ভ্রু নাচিয়ে অহীনের দিকে তাকায়। ততক্ষণে অহীন পাঞ্জাবির সাথে ট্রাউজার পরে নিয়েছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় আশা তার কাছে, ঠোঁটে পরিচিত দুষ্টু হাসি। অহীনের একদম কাছে গিয়ে ভেজা গালে একটি আঙুল স্পর্শ করিয়ে নিচের দিকে নামছে। খুব স্থির ও ক্ষীণ স্বরে ফিসফিস করে বলে সে,
“তোমার খাতনার সময় আমি তো তখন সব বুঝি, মনেও আছে সব। একটা হুজুর ছিল, তার হাতে ছিল কাঁচি তারপর...।”
গলার কাছে আশার হাত খপ করে ধরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে অহীন থতমত গলায় থামিয়ে দেয়,
“চুপ বেয়াদব মেয়ে! এক থাপ্পড় দেব, সব ভুলে যাবি। তখন তুই কত ছোট ছিলি। বানোয়াট কথা বলবি না পেঁচি।”
বিছানায় বসে হো হো করে শব্দ তুলে হেসে ওঠে আশা। আশার হাতের বড় বড় নখগুলো কেমন চকচক করছে। অনেক টাকা দিয়ে হয়তো স্টোন বসিয়েছে। হালকা পিঙ্ক রঙের লিপস্টিকটা ভারি মানিয়েছে তাকে। আশার এমন হাসিতে বেশ লজ্জা পাচ্ছে অহীন। ভেজা তোয়ালেটা সদ্য সজ্জিত মুখে ছুড়ে দিয়ে বলল,
“ডাইনির মতো হি হি হি করবি না বেয়াদব। দেখেছিস তাতে কী? সম্মতিতে বিয়ে হলে নিজেই দেখাতাম।”
“ওয়াক থু! ইয়া খোদা, হয় একে তুলে নাও, নয়তো একে মাটির নিচে ঢুকিয়ে দাও। বেহায়া বেলেহাজ পুরুষ!”
বলেই তোয়ালেটা ফ্লোরে ছুড়ে মারে। অতঃপর হাসতে হাসতে নিজের লাগেজ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে চলে যায় সে। অহীন সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে নিজেও বের হয় কক্ষ থেকে।
_____
রাত নেমেছে। পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলো হয়তো রাতেই সুন্দর বেশি। স্টেজ সাজানো হয়েছে ছোট করে। অস্থিরতা লুকিয়ে বসে আছে আশা। অহীনের দেখা নেই কোথাও কে জানে কোথায় কোথায় ঘোরে ছেলেটা! অন্তিহা মেহমানদের সাথে কথা বলছে, পেছনে পেছনে প্রদীপ, চলে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যেন পারলে চোখের সামনে বন্দি করে রাখত এই নারীটিকে। বেশ খানিকটা সময় পর চোখ যায় স্টেজের একটি কোণায় কয়েকটা ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা অহীনের দিকে। আঙুলের ভাঁজে সিগারেটের শেষ অংশটুকু জ্বলছে। শেষ টানটা দিয়েই ফেলে পায়ে পেষালো তড়িঘড়ি করে। আশা চোখ ঘোরাতেই দেখল আকাশ ও কুহু কিছু নিয়ে হাসতে হাসতে আসছে অহীনের দিকে। সাধের সিগারেটটি ফেলে দেওয়ার কারণটা পেল এবার। কিঞ্চিৎ হেসে মাথা ফেরাতেই স্টেজে ছুটে উঠে আসে নুজাইফা। আশার ফোনটা এগিয়ে দিয়ে মিনমিন করে বলল,
“আয়াশ ভাইয়া কল দিয়েছে।”
আয়াশের নামটা যেন এই মুহূর্তে মস্তিষ্ককে অচল করার টোটকার মতো। এক পলক অহীনের দিকে তাকিয়ে ফোনটা কানে ধরে বলল,
“বলুন।”
“ইগনোর করছ কেন? গতকাল আসলে না, আজকে পুরো দিন কল ধরলে না। আমি কি রিজন জানতে পারি?”
শুকনো ঢোক গেলে আশা। আশপাশে মেহমান ভরপুর। সে নতমস্তকে নিচু স্বরে বলল,
“আয়াশ, বলেছিলাম বাসায় মেহমান। আর কালকে তো এমনিতেও দেখা হচ্ছেই। এত ডেস্পারেট হওয়ার মতো কিছু নয়।”
আয়াশ একটু রুক্ষতার সাথে শ্বাস ফেলে এবং ক্রুদ্ধ হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কেন ডেস্পারেট হচ্ছি তুমি বলো। পুতুল, তুমি ম্যারিড প্রতি মুহূর্তে ভয় হয় আমার।”
আশা বসা থেকে উঠে একটু সাইডে যায়। স্টেজ থেকে নিরবচ্ছিন্ন স্থানে গিয়ে রুদ্ধ গলায় বলল,
“হুম ম্যারিড, এই জন্যই ইগনোর করছি। কষ্ট পাবেন তাই সরাসরি কল দিতে না করতে পারছি না। ভয় কিসের জন্য পাচ্ছেন? আমাকে হারানোর? হারিয়ে ফেলেছেন আয়াশ, প্লিজ বুঝুন বিয়ে কোনো খেলা নয়।”
“হোয়াট ডু ইউ মিন বিয়ে খেলা নয়? আমি বলেছিলাম বিয়ে করতে? কেন করলে বিয়ে অন্য একজনকে?”
“আমাকে প্রেশারাইজ করছেন?”
“তোমার থেকে ইগনোর পাওয়ার অভ্যাস আমার নেই। সব সময়ের মতো তোমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি আমি। এন্ড আমিই থাকব।”
কথাটা শেষ করেই কলটা কেটে দিল আয়াশ। কপালে হাত দিয়ে ফোনটা কান থেকে নামায় আশা। কষ্ট হচ্ছে খুব এতটা রুক্ষ আচরণ আয়াশের সাথে সে কেমন করে করল, ভাবতেই ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে আসছে। পেছন থেকে কাঁধে শীতল হাতের স্পর্শ পড়তেই ঘাবড়ে পেছনে তাকায় আশা। অতি পরিচিত মুখটা দেখে স্বস্তির শ্বাস নিয়ে আছড়ে পড়ে অন্তিহার গায়ের ওপর। লাল চোখ জোড়া টইটম্বুর হয়ে আছে, ধরা গলায় কান্না করেই চলেছে। পিঠে আদুরে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে অন্তিহা তাকে।
“পরিস্থিতি মানুষকে পরিবর্তন করে দেয় আশু। আয়াশ দীর্ঘদিন তোর জন্য প্রহর গুনেছে। ভালোবাসার মানুষটাকে অন্যের পাশে দেখা যে বড় কঠিন।”
আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে আশা তাকে।
“এতটা ক্রুর আমি হলাম কেমন করে অন্তু?”
“ক্রুরতা এমন হয় না। আয়াশকে তুই এখনো প্রথম প্রায়োরিটিতেই রেখেছিস। কিন্তু তোর আর ভাইয়ার সম্পর্কের দেওয়াল আয়াশের সামনে মরীচিকা হয়ে আছে।”
অন্তিহাকে ছেড়ে দূরে দাঁড়াতেই একই সাথে অহীন ও প্রদীপ উপস্থিত হয় ওদের সামনে। অহীন তখনের ঘটনার দরুন একটু সংকোচ বোধ করলেও আশা সব ভুলেছে সেই কখন। প্রদীপের দিকে তাকাতেই এবারও সবসময়ের মতো বুঝল অন্তু লোকটার খিদে পেয়েছে। আলাদা খাবার না দেওয়া পর্যন্ত তো কিছু খাবে না। আশা আর অহীনকে রেখে হাতের ইশারায় প্রদীপকে নিয়ে চলে যায় অন্তিহা। দাঁড়িয়ে হাঁসফাঁস করছে অহীন। যতই হোক, তাদের মধ্যে সম্পর্ক এতটাও জোরালো না যে এমন পরিস্থিতিতে পড়ার পর সব স্বাভাবিক থাকবে। আশা হাঁসফাঁস করছে আয়াশের বিষয়টুকু নিয়ে। অতঃপর দ্বিধা-সংকোচ গিলে আশা প্রথমে বলল,
“অহীন, আয়াশ কল দিয়েছিল।”
আয়াশের প্রসঙ্গটা হুট করেই আশা বলাতে একটু ভড়কায় সে। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
“তো?”
“কিছু না, এমনি বললাম।”
“হুম চল। মন খারাপ করিস না। কালকে চলে যাব আমরা,বাসায় কাউকে টেনশন না দেই কেমন?”
অহীনের কথায় মাথা দুলিয়ে সম্মতি প্রকাশ করে আশা। স্টেজের দিকে এগোতেই ওদেরকে ঘিরে নেয় নুজাইফা সহ বাকিরা।
চলবে....