ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

২৫তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ২৫

রাত প্রায় গভীর হচ্ছে, মেহমান কমে এসেছে। হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে অন্তিহা সিঁড়ি দিয়ে নামছে, মেয়েটা ছোট বটে তবে দায়িত্বগুলো বেশ সুন্দর করে সামলে নেয় বাড়ির। বাসার ভেতরে প্রবেশ করতেই নীল কাতর মুখে এগিয়ে আসে ওর দিকে। হাতের একটা প্লেট নিয়ে ব্যাকুলতাচ্ছন্ন স্বরে বলল,

“অন্তু কাল চলে যাবি তোরা, আরাম কর গিয়ে একটু লক্ষ্মীটি।”

​“মাম্মাম তুমি খাবার খেয়েছ? মামা কোথায়? যাও গিয়ে খাবার খাও।”

​ফোস করে হতাশার শ্বাস নেয় নীল। অন্তিহা তাকে এড়িয়ে ভেতরে কুহুর কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে। কয়েকটা মেয়ে বসে আছে ওখানে নুজাইফা সহ কয়েকটা মেয়ে, আর তাদের মাঝে অন্তিহার বসিয়ে রেখে যাওয়া পুরুষটি প্রদীপ। মুচকি হেসে নুজাইফাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“নাজু তোরা পাশের রুমে গিয়ে আড্ডা দে, উনি খাবার খাবে।”

​নুজাইফা প্রদীপের দিকে তাকাল একটু। এই তো অকেশন ছাড়া দেখা যায় না, যতটুকু দেখা যায় অন্তিহার সাথে লেজের মতো চিপকে থাকে। সে সবাইকে নিয়ে উঠতে নিলে প্রদীপ বলল নরম গলায়,

“সমস্যা নেই বসো তোমরা। অন্তু আমরা বারান্দায় বসি, লাইট আছে তো?”

​“আমার তো কাজ আছে আর ওখানে বসে খেতে পারবেন?”

​নির্বাক ছেলেটা অন্তিহা সোজা ভাষায় উত্তর দিল তাকে, হয়ত এই প্রথম। জিভ দিয়ে ওষ্ঠ ভিজিয়ে বলল,

“তুমি কাজ সেরে আসো তাড়াতাড়ি, আমি বরং তুমি আসা অবধি খাবার শেষ করে নেই?”

​প্রদীপ খাবারের প্লেটে হাত রেখে একটা লোকমা মুখে তুলে নেয়। অন্তিহা বারান্দায় গিয়ে হালকা লাল লাইটটা জ্বালিয়ে দিল। চেয়ার পাতা আছে ওখানে, কুহু অন্তিক বসে থাকে। বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে প্রদীপকে ডাকে অন্তিহা,

“আসুন।”

​হালকা লাল হয়ে থাকা চোখের রক্তিম রগগুলো দৃশ্যমান প্রদীপের। কষ্ট করে একটি লোকমা গিলেছে বোঝা যাচ্ছে। অন্তিহার দিকে তাকিয়ে পাশে থাকা গ্লাস নিয়ে প্লেটেই হাত ধোয়, সাথে সাথে অমনি অন্তিহা ধমকে ওঠে,

“উফ করলেন কী এটা? এতগুলো খাবার নষ্ট করলেন! বলি খাবার নষ্ট করা বুঝি আপনাদের ওদিকে পাপ ধরা হয় না? কত কষ্ট করে আনলাম আপনার জন্য। সব সময় এসে আমাকে এতটা প্যারা কেন দেন বুঝি না আমি।”

​বলতে বলতে প্রদীপ ওর সামনে চলে এসেছে। অন্তিহা একটি চেয়ারে বকতে বকতে বসল, ধীরে এবার প্রদীপ তার পাশেই বসেছে। অন্তিহার বকাগুলো আজ বড্ড এলোমেলো, সব সময়ের মতো মেচিউরিটি নেই। প্রদীপ দৃঢ় গলায় ক্ষীণ হেসে বলল,

“তুমি চলে গেলে তো আর আসাও হবে না, দূরে গিয়ে ভালো থেকো কেউ প্যারা দেবে না।”

​“কেন আসবেন না? আমি না থাকলেও আসবেন, আমার আম্মু আব্বু আপনাকে পছন্দ করে খুব, তাদের দেখে যাবেন আমার হয়ে।”

​স্বল্প স্বরে হাসে দু'জন। বারান্দা থেকে দূরে আকাশ দেখা যাচ্ছে, একটা গোল চাঁদ আকাশে। হালকা বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে দুজনের শরীর। ক্লান্ত চুলগুলো উড়ছে হাওয়ায়। প্রদীপ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,

“একটা প্রশ্ন করি আজ? সত্যি সত্যি উত্তর দেবে?”

​“হুম বলুন।”

​“অন্তু, যদি তোমার ধর্মীয় বিধান আমাদের এই সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিত, তাহলে কি তুমি আমার হতে?”

​শান্ত হয়ে কিঞ্চিৎ ঠোঁট ফাঁক করে হাসে অন্তিহা, চোখে ভাসে প্রতিটা সময় যখন সে চুপ থেকেছে। প্রতিটা সময় যখন নিজের অনুভূতিগুলোকে লুকিয়ে আশার অনুভূতিগুলোকে আকর্ষিত করেছে। সব কিছুর মাঝে প্রদীপ কত সুন্দর সব সময় তাকে বুঝেছে। হয়ত প্রদীপ একমাত্র ব্যক্তি যে জানে অন্তিহার ছোট হৃদপিণ্ডটা কার জন্য ধুকপুক করে। সে নরম গলায় উত্তর দিল,

“হুম হয়ে যেতাম। কারণ আমি অনুভব করেছি আপনার মতো করে আমাকে কেউ বোঝে না।”

​অন্তিহার ছোট উত্তরটা প্রদীপের মুখ দিয়ে ফোস করে একটা দীর্ঘদিনের জমানো শ্বাসটা যেন মুক্ত করল। সরাসরি সে ওর মুখের দিকে তাকায়, সাদা মুখটা অন্তিহার লাল হয়ে আছে। সামান্যতম কারণে সে নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে হারাবে মাথায় যেন কথাটা সুচের মতো গেঁথে যাচ্ছে, সে মলিন স্বরে থেমে থেমে বলল,

“অন্তু, আমরা কি পারি না যার যার ধর্ম পালন করে, কেবল একটু ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে?”

​“আমার কপালটাই খারাপ প্রদীপ, কেউ আমাকে বোঝে না আর যে বোঝে তার সাথে আমার জীবনের সমীকরণ স্বয়ং আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন।”

​হাত বাড়িয়ে অন্তিহার হাতটা ধরল প্রদীপ। চোখের পাতাগুলো ভিজে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে, সেটুকু মুছে বলল,

“আচ্ছা শোন, আমার কিছু জমানো টাকা আছে। আর কিছু হলে বছর খানেক পর ফ্রান্স যেতে পারব। ততদিনে তুমি বিয়ে করে নিও না, কেমন? আমি আর একবার তোমার পিছু ঘুরতে চাই। তোমার গম্ভীর মুখে কটাক্ষপূর্ণ কথা শুনতে চাই। অন্তু…”

​বলতে বলতে চেয়ার থেকে নেমে অন্তিহার পায়ের কাছে ধপ করে বসে পড়ে সে। ফুঁপিয়ে ওঠে। অন্তিহার হাত দুটো চোখের সাথে চেপে ধরে ভাঙা অস্ফুট স্বরে গুঙিয়ে গুঙিয়ে বলতে থাকে,

“আমি কখনো চাইনি তোমাকে ভালোবাসতে। তুমি রুড একটা মেয়ে। কেন তোমাকে ভালোবাসব আমি? কখনো চাইনি তবুও কেন বাসলাম এতটা ভালো। কেন তুমি আমার ধর্মের হলে না। কেন আমি তোমার ধর্মের হলাম না। তোমার বাসায় আসলে তোমার রুক্ষতার সাথে আমার স্বল্প যত্ন আমাকে খুশি করে অন্তি, আমি ভালোবাসি তোমায়। স্বেচ্ছায় না। ইচ্ছে করে ভালোবাসিনি আমি, হয়ে গেছে। অনেক ভালোবাসি তোমাকে।”

​এক পলক তাকিয়ে আছে অন্তিহা, তারও অনুভূতি মিলে যাচ্ছে। সেও ইচ্ছে করে ভালোবাসেনি। হয়ে গেছে। কখন হলো? একটি হাত প্রদীপের মাথার এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলের ভাঁজে বুলিয়ে দেয় সে। প্রদীপ থামছে না, কান্না করেই চলেছে। অন্তিহার হাতটা শক্ত করে ধরে চোখে চোখ রাখে। ভেজা রক্তিম চোখ তার ছলছল করছে। প্রদীপ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে পাগলের মতো আর্তনাদ করে,

“অন্তিহা একটিবার ভাব না ? তুমি তোমার মতো থাকবে আমি আমার মতো। একটু ভালোবাসা থাকবে আমাদের। আমার তরফ থেকে কখনো তোমার নামাজ-রোজা, ইবাদত, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস কিছু নিয়ে বাধা দেব না। আমাদের সন্তান হলে তাদের প্রতিও আমি ধর্ম নিয়ে বিবাদ করব না। তাদের না হয় মুসলিম করে দিও তুমি। আমার পরিবারের কেউ কখনো এসব নিয়ে বলবে না তোমাকে। আমি শুধু তোমার সাথে থাকতে চাই। তোমার আঁচল ধরে হাঁটতে চাই। দিন শেষে তোমার বকা শুনে দীর্ঘশ্বাসের সাথে হাসতে চাই। যদি তুমি বলো তোমাকে ছোঁব না কখনো আমি। শুধু তোমাকে আমি দেখতে চাই কাছ থেকে। আজ যখন তুমি চলে যাবে ভাবছি, খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। খুব এখানটায়...”

​অন্তিহার হাত নিজের পাঁজরের কাছে চেপে ধরে দেখানো প্রদীপ, মেয়েটার চোখের জল দ্বারা কেমন বাঁধ ভেঙে বয়ে যাচ্ছে। অপর হাত দিয়ে প্রদীপের মাথায় বুলাচ্ছে, বড্ড মায়া হচ্ছে লোকটার জন্য। হবে নাই বা কেন? গরুর মাংস খাবে না বলে খিদে পেটে বিড়াল ছানার মতো তার পিছু পিছু ঘুরত। সুযোগে কিছু সময় কাটাত।

“আপনি আমাকে ভালোবাসেন আমি বুঝি, আপনার ভালোবাসাকে সম্মান করি, কেন না জানি না পাওয়ার কষ্ট কেমন। কিন্তু খোদার বিধান পাল্টানো সম্ভব নয়।"

​কান্না হঠাৎ থেমে যায় প্রদীপের। চোখ তুলে তাকায় একে অপরের চোখ মেলে। তখনও দু'জন কান্না করছে। অন্তু তো প্রদীপকে ভালোবাসে না, তবে কেন এত কান্না করছে আজ? মায়া বলেও তো একটা বাঁধন আছে। প্রদীপ আবার ও অন্তিহার উরুতে মুখ গুঁজেই হো হো করে কেঁদে দিল। রাগ-কষ্ট মিশে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে ভেতরটা। অন্তু থামাচ্ছে না তাকে। কে জানে ফের কবে লোকটা তার সামনে আসবে, এত এত ভালোবাসার ঝুড়ি খুলে বসবে?

________

​অনুষ্ঠান প্রায় শেষের দিকে, গানবাজনা কমে এসেছে। অহীনকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আকাশ অন্তিক কথা বলছে দূরে দাঁড়িয়ে। উসকোখুসকো চুলগুলো একদিকে কোনোক্রমে গুছিয়ে, এলোমেলো শাড়িটা হাতে ধরে স্টেজ থেকে নামতে যায়। সচরাচর শাড়ির প্রতি আকর্ষণ তার একদমই কম থাকায় সামলাতে বেগ পোহাতে হচ্ছে খুব। সামনে এগিয়ে যেতেই শাড়ির সাথে হোঁচট খেয়ে সামনের দিকে আচম্বিতভাবে পড়ে যেতে নেয় আশা। হালকা শব্দ মুখ দিয়ে বের হওয়ার আগেই শক্ত একটি হাত উদর জুড়ে ধরে সামলে নেয় তাকে। আতঙ্কে হাঁসফাঁস করে শ্বাস নিয়ে সোজা হয় আশা, তবে সামনের লোকটির চোখের দিকে তাকাতেই দ্বিতীয় দফা আঁতকে ওঠে সে। ভাবেনি আয়াশ আসবে, অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,

“আয়াশ আপনি?”

​“অহীনকে আশা করেছিলে?”

​আশা তার থেকে একটু দূরে যায়। স্টেজ থেকে নেমে সিঁড়ির দিকে আগাতেই পেছন থেকে টান দেয় আয়াশ। ক্রুর চোখে তাকিয়ে গভীর গলায় বলে,

“কোথায় যাচ্ছ?”

​আশা ঘুরে আয়াশের দিকে তাকায়। হাত ছাড়ানোর জন্য একটু মোচড় দিয়ে মৃদু হেসে কাঁপা গলায় বলল,

“বাসায় যাচ্ছি। আপনি ব-বসুন গিয়ে আব্বু বড় আব্বুর সাথে কথা বলুন। ক্লান্ত আমি, চে-চেঞ্জ করব।”

​আশাকে আড়মোড়া করে হেঁচকা টান দেয় আয়াশ, অমনি ব্যথায় কিঞ্চিৎ কুঁকড়ে ওঠে আশা। শব্দে উপস্থিত সবাই তাদের দিকে তাকায়। চোখ বুজে থেমে যায় আশা, এত লোকের সামনে শব্দ করাটা ঠিক হয়নি। আশা এবার দৃঢ় গলায় বলল,

“লাগছে আমার।”

​“আমারও লাগে যখন ইগনোর করে এখানে রিসেপশন পার্টি করো অন্য পুরুষের পাশে।”

​রাগ ও ক্ষোভের সাথে এগিয়ে আসে আকাশ। আয়াশের গায়ে লেদারের কালো জ্যাকেটের কলারটা ঝেড়ে হাত চেপে ধরে অত্যন্ত রাগের সাথে বলল,

“লিসেন, তোমাকে আমরা বড্ড মায়া করি। তার মানে এই নয় বাড়িভর্তি লোকের সামনে আমাদের মেয়েকে ছুঁয়ে অপমান করবে। ভালো হয় বুঝে নাও, আশুর বিয়ে হয়ে গিয়েছে অহীনের সাথে। কেনো বোঝনা বাবা?”

​আকাশের হাতের ওপর নিজের কালো গ্লাভস পরা হাতটা রেখে ঝাড়া দিয়ে নামিয়ে দেয়। অতঃপর দৃঢ় গলায় কটাক্ষ সুলভ আচরণ করে বলল,

“চাচ্চু বুঝতেই তো পারছি না যেখানে আশু আমাকে চায় আমি আশুকে চাই, আপনারা কেন অহীনকে মাঝে টেনে সব এলোমেলো করছেন?”

​নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেয় আয়াশ। আকাশ ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

“উই অল নো দ্যাট, কিন্তু পরিস্থিতি তা বোঝে না। পরিস্থিতি পরিবেশ আশাকে অহীনের দাবি করে।”

​“হাতে ধরে আশুর লাইফটা নষ্ট করছেন। অহীনের সাথে আশুর কোনো ফিউচার নেই। ভালো থাকবে না আশু। আমি যদি ওদের লাইফ থেকে সরেও যাই তবুও ভালো থাকবে না।”

​“তোমার সাথে ভালো থাকবে বলছ? তোমার নিজের জীবনের ঝুঁকি তোমার দাদুর কাছে, সেখানে আশু তো বাইরের একজন। যেই মহিলা স্টেটসের ভেদাভেদ করে নিজের নাতির ওপর প্রাণঘাতী হামলা করতে পারে, সেখানে আমার মেয়ের নিরাপত্তা কোথায়?”

​আয়াশ থমকাল। মগজ টগবগ করছে আকাশের কথায়। নিজের দাদুর প্রতি প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তবে প্রকাশ করল না। পাল্টা বলল,

“চাচ্চু..”

​“আশা চায় না তোমাকে, সে অহীনকে মেনে নিয়েছে। নয়ত এত কিছুর পর অনুষ্ঠানে সেজে বসত না নিশ্চয়ই, বোঝো তুমি।”

​আশা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল ভেজা চোখে। কয়েক পা পিছিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। সিঁড়িতে পা রাখতেই যাবে অমনি আবারও আশার হাতে টান পড়ে। আকাশের থেকে দূরে আশার হাত ধরে জিভ দিয়ে চোয়াল ঠেলে আয়াশ বলল,

“ওকে মেনে নেব, আপনার মেয়ে যদি নিজের মুখে একটিবার বলে আমাকে সে এখন ভালোবাসে না।”

​আয়াশের বেহুদা কথায় অবাকের শীর্ষে পৌঁছায় আশা। আয়াশ তাকে কাছে টেনে আনে এক ঝটকায়। ঝুঁকে হিসহিস করে বলল,

“বলো ভালোবাসো না আমাকে। সেদিন বলেছিলে বিট্রে করবে না মিথ্যা ছিল সেটা। চলে যাব আমি।”

​আকাশ চোখ গরম করে তাকায় আশার দিকে। আশা হাত মুচড়ে বিরক্তির সাথে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,

“আপনি একটা বেয়াদব।”

​“অলওয়েজ। শুধু তোমার সামনে কখনো করিনি। কারণ আই লাভ ইউ সো মাচ। ডোন্ট ওয়ারি তোমাকে পেয়ে গেলে আবার আগের মতো ভালোবাসব বেয়াদবি করব না।”

​আকাশ রাগে চোয়াল শক্ত করে আছে। এতগুলো মানুষ তাকিয়ে আছে তাদের দিকে, কানাঘুষা করছে। আকাশ বলল,

“আয়াশ ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট।”

​“আশা একবার মিথ্যা হলেও বলে দিক আমার প্রতি কিছু অনুভব করে না চলে যাব আমি। চাচ্চু জানেন তো আমি কথার বড় পাক্কা।”

​অতঃপর আশার দিকে তাকিয়ে বলল,

“পরশু বলেছিলে বিট্রে করবে না। আজকে বলো সেটা মিথ্যা ছিল। মিথ্যা হলেও একবার বলো ভালোবাসো না তুমি আমায়। চলে যাব তোমার জীবন থেকে।"

​বাম হাতের কবজিতে আয়াশের শক্ত থাবা থেকে নিজেকে ছাড়াতে ব্যর্থ আশা। হাত মুচড়াচ্ছে সে অনবরত, চোখগুলো টলটলে হয়ে আছে অপমানে। বাড়ির লোকগুলো তাকিয়ে আছে তাদেরই দিকে। আশা অস্ফুট স্বরে বলল,

"আয়াশ, আপনি সবার সামনে আমাকে ছোট করছেন।"

​আয়াশ তাচ্ছিল্য করে হাসে। হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরে ফিসফিস করে ফের একই কথা শুধাল,

"একটা মিথ্যা বলতে এত দ্বিধা? বলে দাও, চলে যাব।"

​"সবাই দেখছে, প্লিজ ছাড়ুন!"

​আশা চোখ-মুখ কুঁচকে টলমল চোখে তাকিয়ে আছে আয়াশের দিকে। এরই মাঝে ডান হাতে টান অনুভব করে সে পেছন ফেরে। রাগে রক্তিম হয়ে আছে অহীনের চোখ জোড়া। দাঁতে দাঁত পিষে অহীন টান দিতেই আশা তার দিকে একটু এগিয়ে আসে তবে আয়াশের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারল না সে। স্টেজের ঠিক একটু দূরে রাগে হিমশিম খাচ্ছে আকাশ।

​অহীন আয়াশের হাতের দিকে তাকিয়ে আশাকে উদ্দেশ্য করে গভীর ক্রুদ্ধ স্বরে বলল,

"কারও কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না, বাসায় চল।"

​আয়াশের দমে রাখা রাগ যেন সপ্তম আকাশে উঠেছে। অহীনের ওকে স্পর্শ করাটা অসহ্য লাগছে। সব সময় কাজিন ভেবে এড়িয়ে গেলেও আজকের ছোঁয়াটা বড্ড বিঁধছে তার গায়ে। আশাকে নিজের দিকে টেনে সজোরে অহীনের মুখে আঘাত হানে আয়াশ,

“ড্যাম ইট! ডোন্ট ইউ ডেয়ার টাচ হার, ইউ স্টুপিড পিগ!”

​আবারো আঘাত করতেই যাবে, আশা অহীনের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে আয়াশের বুকে জোরে ধাক্কা দেয়। এতে নিজেকে ছাড়াতে না পারলেও অহীনের গায়ে আঘাতটা লাগল না। আশা চেঁচিয়ে উঠল আয়াশের ওপর,

“সরুন! আপনার সাহস হয় কী করে অহীনের গায়ে হাত তোলার? কখন থেকে দেখছি বেয়াদবি করছেন তো করছেন। মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে আপনার।”

​আয়াশ আরও শক্ত করে ধরে হাত,

“বললাম না তোমার জন্য ভদ্র হয়েছিলাম এতদিন। এখন তোমার জন্য বেয়াদবও হয়ে যাব।”

​বাসায় মেহমান এখনো আছে কিছু, তাদের তামাশা দেখছে। অহীনের রাগ হলেও এত লোকের সামনে নিশ্চয়ই মারামারি করবে না। সে আশার হাত শক্ত করে আবার ধরে রাগ নিয়ে বলল,

“আশু আর কথা নয় রুমে চল।”

​“হুম যাও আমাকে ভালোবাসো না বলো, নয়ত আমার সাথে চলো, ডিভোর্স নিয়ে দেব, আমার সাথে বিয়ে সব কিছু আমি সামলে নেব।”

​আশা ছলছল চোখে আয়াশের দিকে তাকায়, অবিশ্বাস্য লাগছে খুব। অহীনের শক্ত রাগী মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু নরম হয়েছে অহীনের হাতটা যেন আশার প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়। অহীনের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হাসে আশা, অতঃপর অহীনের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। অবাক চোখে তাকায় অহীন আশার দিকে। একদম আশা করেনি যে আশু তার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবে সবার সামনে। দুই পা পিছিয়ে ছলছল নয়নে তাকায় সে। আশার এমন কাজে আয়াশের হাতটাও নরম হয়ে আছে, ফলে আশা সহজেই তার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে। আয়াশের সামনে গিয়ে একটি আঙুল দিয়ে বুকে ধাক্কা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কটাক্ষ করে বলল,

“আমি চাইলেই অহীনের মান রাখার জন্য সবার সামনে বলতে পারব আপনাকে ভালোবাসি না। কিন্তু বলে দিলে এখানে সহ্য হবে?”

বুকের বা পাশে ধাক্কিয়ে ইশারায় বলল কথাটা সে, ​একটু থেমে বলল,

“আমাকে বাধ্য করবেন না আপনাকে ঘৃণা করতে!”

​কথাটা বলেই পিছিয়ে আসে। নাক-মুখ কুঁচকে রাগ নিয়ে পিছিয়ে যায়। আয়াশ তাকিয়ে আছে আশার চোখের দিকে। আজ যেন প্রতিটা মানুষের ভেতরের রূপগুলো প্রকাশ পাচ্ছে। আশা এর আগে কখনো তার সাথে এমন আচরণ করেনি। আশা পিছিয়ে আসে দুই কদম, অহীনের কাছে গিয়ে তার একটি হাত এগিয়ে দিয়ে অন্য হাত দিয়ে ধরিয়ে দিল শক্ত করে। মিইয়ে যাওয়া কাতর মলিন মুখটায় একচিলতে হাসির দেখা মিলল অহীনের। আশা নতস্বরে তাকে বলল,,

“উনি আর আটকাবেন না আমাদের, চলো।”

​বাকরুদ্ধের মতো অহীন মাথা দুলিয়ে আশার হাতের কবজি ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে একবার পেছনে আয়াশের দিকে তাকায়। রাগে ফুঁসছে তবে চোখ শান্ত। অহীন তার দিকে তাকিয়ে হাতের সাহায্যে উড়ন্ত চুমু দিয়ে ইশারায় ধন্যবাদ জানিয়ে দেয়। পরমুহূর্তে আশার দিকে তাকিয়ে নিজের নীল হয়ে থাকা চোয়াল দেখিয়ে আহ্লাদ করে,

“এখানে একটু মলম লাগিয়ে দিস কেমন?”

​হাঁটতে হাঁটতে হাত বুলিয়ে দেয় আশা ওখানটায়, অনুশোচনা প্রকাশ করে,

“সরি ইয়ার, রুমে গিয়ে লাগিয়ে দেব।”

​“একটু জড়িয়ে ধরে আদর করে দিস বউ, কেমন?”

​বড় বড় করে তাকিয়ে চোখ রাঙায় আশা তাকে। মুহূর্তে চুপ হলো সে। আয়াশ তাকিয়ে আছে পেছন থেকে। রাগ হচ্ছে খুব তবে কিছু একটা ভেবে কিঞ্চিৎ হাসে। আকাশ এগিয়ে কিছু বলার আগেই আয়াশ নিজের বুকের কাছে হাত দিয়ে ঘষে বলে ওঠে,

“ঠিক আপনার মেয়ে আমাকে কখনো ঠকাবে না, দেখলেন নিশ্চয়ই আমাকে শান্ত করার ট্রিকস খেলল। ভাবিনি কখনো ছোট পুতুলের এই রূপ দেখব। বাট এটা একদম ড্যাম কিলিং। গোসল করতে হবে আসসালামু আলাইকুম চাচু, আর দেখা হবে না কালকে আমাদের ফ্লাইট।”

_____

​ফুলের সুবাস এখনো কমেনি কক্ষে, দরজাটা ভিড়িয়ে রাখা। এলোমেলো হয়ে আছে সব কাপড়গুলো, লাগেজ পড়ে আছে বিছানার একটি কোনায়। সকালে উঠেই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। সমস্যা অগোছালো জিনিসগুলোকে চোখে দেখেও কিছু বলল না আশা। বিছানায় চুপ করে বসে আছে অহীন। সামনেই অয়েন্টমেন্ট নিয়ে লাগিয়ে দিচ্ছে অহীনের ঠোঁটের কাছে। একটা শব্দ অহীন করছে না, গ্রহণ করছে আশার যত্নগুলো। তবে চোখ তার স্থির নেই। এত কাছে আশার সজ্ঞানে কাঁপতে থাকা ঠোঁট আকর্ষণ করছে, ফলে নিজের গলা শুকিয়ে কাঠ। শাড়ির আঁচল নেমে আছে নিচের দিকে। আশার ওসব খেয়াল নেই, সে জানে অহীনের নজর খারাপ না কখনোই। কিন্তু সে হয়ত ভুলেছে এতদিন হারাম ছিল এখন হালাল, আর হালালের প্রতি আকর্ষণ কার না জাগে? বিছানার চাদর খামচে ধরে আছে অহীন। নিজেকে শান্ত রাখার এই অবলম্বনটুকুই আছে। অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দূরে সরে ফোস করে শ্বাস নিয়ে বলল আশা,

“আবারও সরি, খুব লেগেছে তাই না?”

​আশার প্রশ্নে হকচকিয়ে চোখ ফেরায় এবং একটু অভিমান করে,

“হুম।”

​“আমাকে কিছু বলবে না?”

​আশার কথাটা ছিল একটু নিচুস্বর। অহীনের কাছে স্বীকার করছে নিজের ভুলটা। বুঝল অহীন। দাঁড়িয়ে আশার দিকে তাকিয়ে ফোস করে শ্বাস নিয়ে কিছু বলতেই যাবে অমনি আশার বাহুতে শক্ত হাতের টান পড়ে পরক্ষণেই চোয়ালে ঠাস করে এক থাপ্পড়। ঘটনা আচম্বিত। আশা পিছিয়ে পেছনে হেলে যেতেই অহীন নিজের দিকে টেনে চেঁচিয়ে ওঠে,

“ছোট আব্বু কী করছ?”

​আকাশ রাগে গর্জে ওঠে আশার ওপর,

“তোমার আত্মসম্মান বলতে নেই? তুমি আয়াশকে বলছ বিট্রে করবে না। তার মানে কী অহীনকে করবে?”

​বাবার হাতে থাপ্পড় খাওয়ার পর কি কান্না করা প্রয়োজন নয় আশার? কিন্তু কান্নাগুলো কেমন দলা পাকিয়ে গেল। অহীনের পাঞ্জাবি খামচে ধরে কাঁপছে আর ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে সে আকাশের রাগী চোখের দিকে। প্রথম আকাশ তার গায়ে হাত তুলেছে। অন্তিক পেছন থেকে তাকে টেনে ধরে। অহীন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে কটমট করে বলল,

“আব্বু প্লিজ চাচুকে নিয়ে যাও এখন।”

​“আকাশ ওকে মারছিস কেন? বুঝতে হবে বাচ্চা মেয়ে আশা। আর আয়াশকে তো ও ডাকেনি তাই না?”

​অন্তিককে নিজের থেকে ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে আকাশ,

“বাচ্চা? বছর ঘুরলে ২৬ হবে ওকে বাচ্চা দেখছিস তোরা? একটা ছেলেকে বলছে চিট করবে না কখনো। বাচ্চাদের কাজ এসব?”

​আশা অহীনকে ছেড়ে শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা গলায় বলতে চায়..

“আব্বু আমি বুঝতে…”

​বলার আগেই আকাশ আবার হাত তুলতে নেয় তার গালে। কথা থেকে চোখ বুজে নেয় আশা, তবে থাপ্পড়টা গালে পড়ল না। অহীন টেনে আবার নিজের কাছে নিয়ে আসে আশাকে, গর্জে ওঠে রাগে,

“গায়ে হাত তুলছেন কেন আপনি বারবার? আমার সমস্যা হচ্ছে না এসবে। এখানে আপনি কেন এমন করছেন?”

​অহীন বরাবরই তাদের সাথে বন্ধু সুলভ আচরণ করে, কখনো বেয়াদবি করে না। কিন্তু আকাশের ওপর গর্জনটা আকাশকে আরও রাগিয়ে দিল।

“সমস্যা? ওর গায়ে হাত তুলব না? এমন শিক্ষা তো আমরা দেইনি ওকে। আমার মেয়ে এমনটা করে কোন সাহসে?”

​“না, তুলবেন না আপনি ওর গায়ে হাত। কিসের শিক্ষার কথা বলছেন? পাগল হয়ে গিয়েছেন আপনি। বংশের হায় লেগেছে, সম্মানের কথা ভেবে মেয়েকে ভুল বুঝছেন।”

​চেঁচিয়ে ওঠে আকাশ,

“এখন তুমি আমাকে শেখাবে আমার মেয়েকে শাসন করা?”

​পাল্টা চেঁচিয়ে ওঠে অহীন,

“আমার বাড়িতে আমার ওয়াইফ আশা। ওকে শাসন করার জন্য আমি আছি। আমি যেখানে কিছু বলছি না আপনাকে সাহস কে দিয়েছে আমার ওয়াইফের গায়ে হাত তোলার?”

​অন্তিক অবাক হলো বটে। সে একটু রুক্ষ গলায় বলল,

“অহীন চাচ্চু হয় তোমার।”

​“তো? চাচ্চু বলে আমার ওয়াইফের গায়ে হাত তুলবে?”

​“এখন আশার জন্য তুমি আমার সাথে বেয়াদবি করবে? ওকে বাঁচাতে?”

​আকাশের দাঁত পেষানো কথায় অহীন বুক ফুলিয়ে বলে ওঠে পরক্ষণেই,

“আপনার থেকেই শিখেছি বউয়ের পক্ষে কথা বলা, এখন আপনি পল্টি খান কেন? ভুলে গেছেন প্রথম থেকে ছোট মায়ের পক্ষে থাকেন আপনি।"

​অহীন তাকে এমনভাবে রূপক হিসেবে ব্যবহার করবে বুঝতে পারেনি আকাশ। চুপসে গেল সে। রাগ বর্জন করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল কিছু সময়। রাগে ঠোঁট কামড়ে গজগজ করতে করতে বের হয় আকাশ। আকাশের পেছনে অন্তিক অহীনকে যাওয়ার সময় বলতে বলতে যায়,

“তোমার মুখটা আমার মতো না হলে আজ তোমার আম্মুর সাথে ফাটাফাটি হয়ে যেত।”

____

​আকাশ অন্তিক বের হতেই অহীন গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আসে। আশা তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। কাছে এসে মাথায় হাত রাখতেই জড়িয়ে ধরে শক্ত করে আশা তাকে। এবার কেঁদে দিল শব্দ করে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে অহীন তার। আদর করে দুটো চুমুও দিল। আশার মাথা উপরে তুলে চোখজোড়া মুছে দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দেয়। অতঃপর বলল,

“থাক, আব্বু হয় আমাদের। বকবে মারবে আবার আদর করবে। কষ্ট পাস না কেমন? আমি আছি তো আর কেউ মারবে না।”

​“তুমি এত পাল্টে যাচ্ছ কেন? আগে তো কখনো আমার পক্ষে থাকতে না।”

​“আমি সব সময় তোর পক্ষেই, বরং কেউ তোর বিপক্ষে ছিল না কখনো।”

​আশা অন্যদিকে তাকিয়ে আবারও অহীনকে জড়িয়ে ধরল আলতো করে। বুকে মাথা রেখে ফোসফাস করে নাক টানছে। অহীন ওকে ছাড়ছে না একদম, তার ছাড়ার ইচ্ছে নেই।

------

​বিশাল করিডোর দিয়ে হাঁটছে আর একের পর একটা কাঁচের জিনিস ফেলছে আয়াশ। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে কাঁচের ঝনঝন শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। পেছনে তাকাচ্ছে না একটিবারও। এসব দেখলে মাথা ঘুরে যাবে তার সে জানে। তবে কাঁচের ঝনঝন শব্দে বেরিয়ে আসে তিতাশ ও লিজা। তিতাশ ওর এমন কাণ্ডে হকচকিয়ে এগিয়ে আসে। একটা ফুলদানি ফেলতেই যাবে তিতাশ গিয়ে হাত বাড়িয়ে আটকে দেয় তাকে,

“হোয়াট দ্যা হেল আয়াশ? কী হচ্ছেটা কী?”

​আয়াশ ওর সামনে থেকে সরে গিয়ে দেয়ালে থাকা বিশাল বড় শোপিসটা টান দিয়ে ফেলে দেয়। সাথে সাথে মাটির টুকরোগুলো ঝনঝন করে ভেঙে ছড়িয়ে যায় ড্রয়িং রুম। হুংকার দিয়ে ওঠে,

“আমার জিজ্ঞেস করা উচিত কী হচ্ছে আমার লাইফের সাথে।”

​একটি কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন তার দাদু—বৃদ্ধা মহিলাটি। ওনাকে দেখে যেন রাগ আরও চড়াও হলো আয়াশের মাথায়। সে বড় বড় পা ফেলে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে। দরজার সামনে এসে কেউ ভেতরে গেল না। এই কক্ষে কারো যাওয়ার অনুমতি নেই। রুম থেকে ড্রয়ার খোলার খটখট শব্দ হচ্ছে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বের হয়ে আসে আয়াশ, হাতে লোডেড গান। দরজায় দাঁড়িয়ে সরাসরি নিজের দাদির দিকে তাক করে। উপস্থিত তিনজন আতঙ্কিত হয়ে যায় মুহূর্তে। তার চোখ শান্ত। ক্রন্দিতা লিজা ব্যাকুল গলায় থামার আদেশ দেয় তাকে,

“আয়াশ এসব কোথায় পেলে? নামাও! লেগে যাবে।”

​“আমারও লেগেছে মম। পাঁজর চিরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, এত যন্ত্রণা আগে কখনো হয়নি বুকে।”

​মহিলার ভয়ার্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে শীতল হুমকি দেয় আয়াশ,

“বিউটি লেডি, ভয় হচ্ছে? চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না? এখনো আমাকে বিশ্বাস হচ্ছে যে ট্রিগার চাপ দেব না বা এটা লোড করা গান নয়?”

​কথাটা বলেই নিজের থেকে কয়েক হাত দূরে একটা শোপিসের ওপর গুলি করে। সাথে সাথে ঠাস করে শব্দ হয়ে কয়েকটা টুকরো ছড়িয়ে যায় পুরো ড্রয়িং রুম। আবারও মহিলার দিকে গুলি লোড করে তাক করে। তিতাস ভারি গলায় রাগ নিক্ষেপ করে বলল,

“আয়াশ ইটস টু মাচ।”

​“টু মাচ তো আমার সাথে হচ্ছে ড্যাড। তোমরা যেমন বিশ্বাস করতে পারছ না আমার এই রূপ, আমিও বিশ্বাস করতে পারছি না আজকে আশার ওই রূপ। যেই মেয়ে আমাকে দেখলে লজ্জায় নুইয়ে যায়, সে আমাকে ঘৃণা করার হুমকি দেয়। যেই মেয়ে নিজেকে এত বছর আমার মনের মতো তৈরি করেছে যাতে আমার প্রবলেম না হয়, সেই মেয়ে আমার জন্য নিজের যত্নে তৈরি করা মোমের হাত দিয়ে অন্য পুরুষের গাল বুলাতে দেখলাম। ইমাজিন আমার সব অন্যকেউ ভোগ পাচ্ছে।”

​আয়াশের দাদু দূর থেকে অদ্ভুতভাবে চেঁচিয়ে ওঠেন। তিনি তাকে বড় করেছেন, জানেন আয়াশ মজা করছে না যে কোনো সময় ট্রিগার চেপে দেবে। আয়াশ রাগে কাঁপছে। নিজের দোষ আড়াল করে আশাকে নিচু করার জন্য চেঁচিয়ে বলে ওঠেন,

“বিয়ে হয়ে গিয়েছে ওই মেয়ের। শুধু আশার হাত না, হয়ত অহীনও হাজার বার ছুঁয়েছে তাকে, তবুও কী চাও তার থেকে?”

​গুলির ট্রিগারে চাপ দেওয়া ছিল ওনার দিকেই তাক করা। আশাকে নিয়ে নিম্নস্থ কথাটি সহ্য হলো না আয়াশের। হাতের গুলির ট্রিগারে চাপ দিতেই ঠাস ঠাস করে শব্দ বেরিয়ে আসে। পুরো ঘরের বাতাস মুহূর্তে ঘোলা হয়ে গেল। গুলির থেকেও জোরালো ছিল আয়াশের হুংকার,

“অহীন ছুঁয়েছে, আমি তো ছুঁইনি। পৃথিবীর হাজার জন আমার পুতুলকে স্পর্শ করলেও কিছু যায় আসে না।”

​থরথর করে কাঁপছে লিজা তিতাসের বুকে মুখ লুকিয়ে। ছেলের এমন রুদ্ররূপ এই প্রথম দেখছে, সহ্য হচ্ছে না। তিতাস ঘাবড়ে নিজের মায়ের দিকে তাকায়। কানে হাত দিয়ে ভয়ে সিটিয়ে গিয়েছেন মহিলা। দুই আঙুলের দূরত্বে দেয়ালে পরপর তিনটে ফুটো হয়েছে। মহিলাটি হয়ত ভেবেছে সত্যি বুক ভেদ করবে গুলি আজ। পিটপিট করে তাকায় আয়াশের দিকে। ফোসফাস করে শ্বাস নিচ্ছে সে। গুলিটা ড্রয়িং রুমে ছুড়ে মেরে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল এবার,

“যতক্ষণ আমার হাত তার পবিত্রতা স্পর্শ না করছে, ততক্ষণ সে আমার কাছে স্নিগ্ধ ফুলের মতোই সতেজ। অন্যের ছোঁয়ায় ফুল কখনো বাসি হয়? যদি না মালীর মনে অবিশ্বাস থাকে?”

​সামনে থাকা চেয়ারে পা দিয়ে জোরে আঘাত করে হুমকির স্বরে বলে,

“আপনি আমার সামনে আর আসবেন না, নয়ত পরের বার গুলি দেয়ালে লাগবে না।”

​হতাশার ক্লান্ত শ্বাস ফেলে রুমে প্রবেশ করে আয়াশ। সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল। লিজা শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“ওসব না করলে আজ স্বাভাবিক সব কিছু। আপনার একটুও অনুশোচনা হচ্ছে না তাই না? ছিঃ!”

​“অনুশোচনা কেন হবে? মেয়ের পরিবার ভালো হলে আয়াশের খোঁজ না করে অন্য কোথাও বিয়ে দিত?”

​“ওরা আপনাদের মতো আল্ট্রা মডার্ন বড়লোক পরিবারের না। সমাজকে খুব মানে। হঠাৎ বিয়ে বাড়িতে বর না আসলে একটা মেয়ের ওপরে কী যায় জানেন?”

​“আমি জানি না এসব। আমি ওসব পরিবারে যাইনি কখনো এর আগে।”

​“যাবেন কেমন করে? আপনার পরিবার তো তার চেয়েও নিম্নবিত্ত। একেই বলে বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা পরালেই বাঁদর নিজেকে রানি মনে করে।”

​একটুও মায়া দেখালো না ওরা। নিজেদের রুমে চলে গেল। বড় বড় পা ফেলে রুমে চলে যায়। তিতাস হতাশ হয়ে নিজেও চলে গেল নিজ কক্ষের দিকে।

______

​আয়াশের বিশাল বড় রুম। প্রতিটা শোপিস একদম নিখুঁতভাবে সেট করা কোনায় কোনায়। যে কারো চোখে একবারে মোহ তৈরি করার মতো শান্ত পরিবেশ রুমে। বিছানায় বিছানো বেডশিটটায় একটা ভাঁজ নেই, বালিশগুলোতেও ভাঁজ নেই। দেয়ালে আশা ও তার কাপল ছবি ঝুলানো। পরনের জ্যাকেট খুলতে খুলতে সোজা বাথরুমে প্রবেশ করে সে। একদম শুকনো বাথরুম যেন ব্যবহারের পর আবার শুকানো হয়েছে। একটি বাকেটে পরনের সমস্ত কাপড় রেখে তোয়ালে পেঁচায় কোমরে। কয়েকটা বোতল থেকে এটা-ওটা বাথটাবের পানির সাথে মিশিয়ে নেয়। অবশেষে আস্তে করে বসে। পুরোটা দিন এত লোকের সাথে মিশে এত সময়ে একটু শান্তি পাচ্ছে শরীরে। নিজেই নিজের শরীরের প্রতি ঘৃণা হচ্ছিল এত সময়। বাথরুমের ছাদের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে নেয় সে। চোখে বারবার অহীন আর আশা ভাসছে। অহীনের আহ্লাদ আর আশার তাকে আদর করে হাত বুলানো। তখনও রাগে মাথার অজস্র পোকাগুলো কিলবিল করে ওঠে রাগে। পাশে থাকা একটি বোতল ছুড়ে মারে বাথরুমের আয়নার দিকে, টুকরো হয়ে যায় আয়নারা। বাথটাবে লাথি দিয়ে নিজেই হালকা পায়ে ব্যথা অনুভব করে চোখ বুজে নেয়,

Laaya Kaha Mujhko, Ye Mohh Tera,

Raatein Na Abb Meri, Na Mera Sabera...

Jaan Lega Meri, Ye Ishq Mera…

​Ishq Mein Nigahoon Ko,

Milti Hai Baarishein

​Phir Bhi Kyu Kar Rha,

Dil Teri Khwahishein...

​Dil Meri Na Sunne, Dil Ki Main Na Sunu,

Dil Meri Na Suune, Dil Ka Main Kya Karoon…

--------

​নীরবতা ছেয়ে আছে পুরো কক্ষ জুড়ে। হালকা শীতল গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে মাধুর্যের মতো। সটান হয়ে শুয়ে আছে আশা। পাশেই আধশোয়া হয়ে অহীন দেখছে তাকে। তার ভারি শ্বাসের সাথে বুক ক্রমাগত ওঠানামা করছে। একদৃষ্টে সেখানে তাকিয়ে আছে অহীন। শুকনো মরুভূমির ন্যায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। না, আশা এলোমেলো নয় একটুও তবুও এলোমেলো করতে ইচ্ছে হচ্ছে। মেয়েমানুষ এমন করে কেন থাকবে? হাত-পা নেড়ে গায়ের ওপর তো এই মেয়ে উঠতে পারে না, একদম চুপটি করে শুয়ে আছে। কিছু সময় আগে আশা কত আদর করে তাকে মলম লাগিয়ে দিল ভেবে মনের কোনো এক কোণে ভালোলাগাগুলো হামাগুড়ি দিচ্ছে। কিন্তু সবার সামনে অহীনের হাত ধরে চলা আর আয়াশকে ভালোবাসে না কথাটা না বলাটাও কষ্ট দিচ্ছে। আশা আয়াশের সাথে অমন করে না বললে হয়ত আকাশ আরও রেগে যেত, আয়াশের গায়ে হাত তুলত, এই জন্যই আশা অহীনের পক্ষ নিয়েছে হয়ত।

​ঘুমন্ত মুখে হাত বুলিয়ে দেয়। কষ্ট হচ্ছে। অহীন তো মেনে নিয়েছে বিয়েটা, ভালোবাসে, মেয়েটা কি বুঝবে? বুঝতে হবে না, ছাড়বে না সে তাকে,,

​ও.. পারব না আমি ছাড়তে তোকে

কোনো মতে আর হারতে তোকে,

সরে যেতে আর আমি পারব না।

​তোর বায়না সব, রেখে দেব সাজিয়ে

তুই চাইলে বল, হয়ে আছি রাজি রে,

পালাতে আমি পারব না..

​ঝুঁকে আশার ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতে চেয়েও পারল না। ফোনটা বেজে ওঠে পাশে থাকা। বিরক্তির ‘চ’ বলে অহীন সরে যায়। কত সাহস করে এগিয়েছিল ওই ঠোঁটগুলোর দিকে। রোজ তার বাসরে বাগড়া দিতে কেউ না কেউ কল দেয়। একদিন ফোন আছাড় দিয়ে ভাঙবে ভেবে নিয়েছে। ফোনটা কানে তুলে একটু নরম অভিমানী স্বরে নিজেই আগে বলল যেন রাগ বাতাসে মিলিয়েছে তার,

“পাপি দ্যাটস নট গুড। তোমরা আসোনি আজ, কত বোরিং ফিল হয়েছে আমার জানো?”

​সৃজন মৃদু হেসে বলল,

“ও রিয়ালি! থাপ্পড় তাহলে তোমার গালে একটা পড়লে ফিলিংসটা জোস হতো তাই না?”

​“তোমাকে কে বলল এসব?”

​“তোমার বাবা বলেছে তুমি নাকি বউ ভক্তি করো?”

​“ওই চাচ্চু মারছিল আশুকে। ফরগেট ইট, আসোনি কেন তা বলো।”

​সৃজন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতাশ হয়ে বলল,

“তোমার ওকে নিয়ে অনুভূতি নেই জেনেও বিয়ের কথা তোলা আমাদের উচিত হয়নি। সেদিন এসব হাসপাতাল থেকে শুনে এসে তোমার ওপর রেগে আছে। গেলে উল্টোপাল্টা কিছু করত নিশ্চিত, তাই।”

​“তুমি বুঝতে সব?”

​“না বোঝার কিছু নেই। জেসিকে যত্ন করতে তুমি, যত্ন করা আর ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য থাকে। আমিও করেছি কোনো এক সময় জেইনকে।”

​অহীন কথা কাটাতে চায় এবার। হেঁটে হেঁটে বলল,

“তাহলে তো জেসি ম্যাডামের রাগ ভাঙাতে হবে। ওকে গিফট দেব তবে একটা।”

​ওপাশ থেকে সৃজনের কথা আসে কিছু। অহীন বেশ অনেকটা সময় কথা বলার পর বিদায় নেয় আস্তে করে,

“পাপি বের হচ্ছি, রাখি।”

​অহীন কলটা রেখে কাভার্ড থেকে টিশার্ট বের করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। ফোনটা নিয়ে বের হতে যাবে পেছন থেকে আশা ডাকে,

“কোথায় যাচ্ছ?”

​হতবিহ্বল হয়ে পেছন ফেরে সে। এই মেয়ে কি এত সময় তার সব কথা শুনেছে? সে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করে,

“ঘুমাসনি?”

​“দুদিন টানা ঘুমিয়ে ঘুম আসছে না এখন। কোথায় যাচ্ছ তা বলো।”

​অহীন এগিয়ে গিয়ে আশার কপালে চুমু দেয়। মেয়েটা মুহূর্তে চুপ করে যায়, কাঁথার ভেতরে অর্ধেক মুখ লুকিয়ে নেয়। অহীন বলল,

“ঘুমিয়ে পড়, সকালে উঠতে হবে। কাজ আছে আমার কিছু, তাড়াতাড়ি চলে আসব।”

​লজ্জায় কাঁথার ভেতরেই জড়োসড়ো হয়ে রইল আশা। অহীন বের হতেই গাল বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলে,

“বললেই হয় জেসির অভিমান ভাঙাতে যাচ্ছে। ঢং! আবার আহ্লাদ করে চুমুও দেয়। গাছেরও খাবে, জমিরও কুড়োবে।”

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন