#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ২৬
আঁধার রাত। নীরব কক্ষে ঘুমিয়ে আছে আশা। অহীন ফেরেনি, এতে তার যেন কিছু যায় আসে না। অহীনের দিকটা একদম পরিপক্কভাবে গোছানো, যেন এসেই শুয়ে পড়তে পারে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই স্পষ্ট নয় অন্ধকার কক্ষটিতে।
_____
শিকদার বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পরপর কয়েকবার কলিং বেল চাপতেই দরজা খট করে খুলে যায়। স্বল্প হাসিমাখা মুখে দাঁড়িয়ে আছে অহীন, সামনে অন্তিহা। রাতটা পার করেই সকালে আবার ফিরতে হবে তার। অহীনকে এত রাতে দেখে একটু বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“এত রাতে আপনি?”
অহীন ওর দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর গলায় বলল,
“নিজের বাড়িতে আসতে তোকে বলতে হবে? ছোট বাবা আর ছোট মা কোথায়?”
অহীনের বাঁকা উত্তরটা পছন্দ হলো না অন্তিহার। চোখ ঘুরিয়ে ফোস করে শ্বাস নিয়ে উত্তর করে,
“একটু আগে ছাদে চা দিয়ে এসেছিলাম, এখনো হয়ত ওখানেই আছে।”
“আমাকেও এক কাপ চা দিস কেমন?”
“সকালে উঠতে হবে, আপনি ছোট আম্মুকে বলুন।”
কথাটা বলেই সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে চলে গেল সে। মন ভালো নয়, পরিবার ছেড়ে চলে যাবে অহীনের বাঁকা কথা অসহ্য লাগছে। অন্তিহা চলে যাচ্ছে দেখে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে অহীন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যায়। ছাদের দরজাটা হাট করে খোলা, আকাশ-তাশা হয়ত আছে এখনো। ছাদে পা রাখতেই হালকা বাতাসের সাথে ভেসে আসে মিষ্টি কণ্ঠ। অহীন মুচকি হাসে, আকাশ কতটা কিউট, এখনো তাশাকে গান শোনায় ছাদে বসে এত রাতে। ছাদের লোহার দরজায় দুই আঙুলে টকটক করতেই পেছন ফিরে তাকায় দুজন। তাশার মুখে হাসি থাকলেও গম্ভীর আকাশের মুখ, চোখ ঘুরিয়ে ভারি গলায় বলল,
“কেন এসেছ? বউয়ের আঁচলের নিচে গিয়ে লুকাও । বেয়াদব।”
অহীন স্বল্প হেসে এগিয়ে যায়। একটা দোলনায় বসে আছে তারা। অহীন তাশাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে নরম গলায় আবদার করে,
“চা বানিয়ে দাও আমার জন্য।”
মুচকি হেসে অহীনের গালে আদুরে আহ্লাদে থপথপ করে ইশারায় ঠোঁট গোল করে চুমু দিয়ে বলল তাশা,
“এত রাতে কেন এসেছ? সকালেই তো আমরা যেতাম।”
তাশার কথার উত্তর অহীন দেওয়ার আগেই আকাশ দিল,
“দুই বেয়াদব এক হলে যা হয় বোঝো না কেন তাশু? ঝগড়া করেছে নিশ্চিত।”
তাশা ঝাড়ি দেয় তাকে,
“কাল চলে যাবে ওরা, এমন করছেন কেন? কে জানে কবে আবার ফিরবে আমাদের কাছে।”
অহীন সুযোগে আরও আহ্লাদ করে বলে,
“দেখ না ছোট মা, ছোট বাবা দেখতেই পারে না আমাকে।”
আকাশ ওপাশ ফিরে মেকি হাসে তাচ্ছিল্য করে। তাশা উঠে নামে নিচের দিকে, উদ্দেশ্য অহীনের জন্য গরম গরম চা। তাশা যেতেই ছাদটা আরও ঠান্ডা হয়ে এল। নাকে মিষ্টি গোলাপ ও গাঁদা ফুলের গন্ধ লাগছে। আকাশটা একদম পরিষ্কার, অসংখ্য তারার মাঝে চাঁদটা দেখা যাচ্ছে। আকাশের দিকে অহীন তাকায়, বেশ এখনো রেগে আছে। অহীন ক্ষীণ স্বরে হেসে বলে,
“খুব তো ঢং দেখাচ্ছ অ্যাঁ! তোমার মেয়ের হয়ে সাফাই গাইলাম বলে এখন গাল ফুলিয়ে বসে আছ? নাটক। মনে মনে তো ঠিকই লাড্ডু ফুটছে। দিল মে কুছ কুছ হো রাহা হ্যায়? আমার ওপর গর্বে বুকটা নিশ্চয়ই একদম ৫৬ ইঞ্চি হয়ে যাচ্ছে?”
আকাশ চোখ ফিরিয়ে ভারি গলায় বলল,
“তুমি চুপ থাকো। সবার সামনে কীভাবে বললে আমার থেকে শিখেছ এসব?”
“ঠিকই তো বলেছি। আমরা যদি বউ ভক্ত না হই, তবে আর পুরুষ হলাম কই? তোমার শিক্ষায় জোর আছে শ্বশুর আব্বা। সব পুরুষের বউয়ের আঁচল ধরে থাকা উচিত। তবেই তো দিন-রাত ভালোবাসা-বাসি হবে।”
অহীনের মাথায় সপাটে একটা থাপ্পড় দিয়ে আকাশ বলল,
“চুপ করো, আমি আশার বাবা।”
অহীন হেসে দিয়ে আকাশের গায়ের ওপর ঢলে পড়ে। দুই হাতে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে আহ্লাদ করে বলে,
“শ্বশুর মশাই, এবার রাগ ঝাড়ুন না প্লিজ। নয়ত কালকে যাওয়ার সময় মনটা বড্ড নিশপিশ করবে।”
“বুঝলাম বউ ভক্ত আমি করেছি, কিন্তু এমন তেল দেওয়া কার থেকে শিখেছ?”
“পাপির থেকে। জানো মাম্মাম যখন উল্টোপাল্টা রেসিপি পাপির ওপর ট্রাই করে, পাপি এত প্রশংসা করে! অন্তত আমরা নতুন কিছু দেখলেই পালাই।”
“তার মানে তেল দিচ্ছ?”
অহীন জিভ দিয়ে দাঁত কাটে। আকাশ মেকি হাসে, মনে মনে অহীনের ন্যাকামোগুলো ভালো লাগলেও প্রকাশ করছে না একটুও। সবে ছেলে তো তাদেরই, ঠিক বুঝেছে। অহীন আকাশের একটি হাত ধরে নরম গলায় বলল,
“ছোট বাবা, বাড়িভর্তি লোকের সামনে আশুকে থাপ্পড় দিয়েছ তুমি, এটা শাসন করা বোঝায় না। শাসন আমরা আড়ালেও করতে পারি নরম গলায় বুঝিয়ে। সবার সামনে ওকে আঘাত করার মানে তো দাঁড়ায় আমরা ওকে বিশ্বাসই করি না। সবাই ভেবেই নেবে আশু আয়াশকে ডেকেছে, আশুর চরিত্রে সমস্যা। কিন্তু আদৌ কি তেমন? আমরা অবিশ্বাস করি তাকে?”
অহীনের দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় আকাশ। ঠোঁটে একগুচ্ছ বিশ্বাস রেখে শুধায়,
“তোমার হাতে আমার সুখ তুলে দিয়ে ভুল করিনি তো আমি অহীন? ভালো রাখবে আশাকে?”
অহীন আকাশের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে নিজের মুঠোয় রাখে। ভেজা গলায় বলল,
“কোনো একটা চাওয়া ছিল আমার, খুব চেয়েছি খোদার কাছে। হাল ছেড়েছি চাওয়াটা না পাওয়ার আফসোসে। কিন্তু দেখো, মোনাজাত কখনো বিফলে যায় না। এত মিনতি করে পাওয়া জিনিসটাকে কি কষ্ট দেওয়া যায়?”
“আশা যদি না বোঝে? আদরে বড় হয়েছে, ঠিক-ভুলের ধারণা নেই। বয়স ও হাতে পায়ে বড় হয়েছে শুধু। তুমি বুঝিয়ে তাকে। তোমার বউয়ের বাবা হওয়ার পর তোমার কাছে একটু স্বার্থপর হচ্ছি আমি। পারলে ওর সমস্ত ভুলগুলো অদেখা করে দিও। আমিও সব বাবার মতোই চাই, এমন ভাবেই আমার মেয়ের ওপর অন্যায় করা বা আমার মেয়েকে অপমান করা প্রতিটা ব্যক্তির সামনে তার স্বামী আসুক। সে যদি আমি নিজেও হই তবুও তুমি আশার হাত ধরে থাকো। দূরে চলে যাবে তাই কথা গুলিয়ে ফেলছি। আমি আশাকে তোমার হাতে দিয়ে একটু দ্বিধায় ভুগছি, তুমি আশার জন্য সঠিক প্রমাণ হয়ে আমাকে দ্বিধামুক্ত করে দাও।”
“আমি অনেক ভালোবাসব আশাকে, খুব যত্ন নেব। কিন্তু...”
অহীন বলতে বলতে থামল। আকাশ ওর দিকে প্রশ্নাতুর চোখে তাকায়। অহীনের কথা আটকে আছে গলায়। অতঃপর ফোস করে শ্বাস নিয়ে কথা এড়িয়ে মেকি হেসে বলল,
“চিন্তা কোরো না, যতই রাতজাগা পেঁচি বলি না কেন তোমার মেয়েকে, আসলে তো সে রাতজাগা বাদুড়ের আপডেট ভার্সন ভ্যাম্পায়ার। রক্ত চুষে নেবে আমার ওকে কষ্ট দিলে।”
আকাশ কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়, তবে পারল না। তাশার আগমন হলো তৎক্ষণাৎ। হাসিমুখে এসে ওদের সামনে বসে,
“কী নিয়ে কথা হচ্ছে?”
“ওনার মেয়েকে নিয়ে চিন্তা করছেন। বলো তো ছোট মা, এই পেঁচিকে কষ্ট দেওয়ার সাধ্য আছে আমার?”
তাশা অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকায়। পরমুহূর্তে অহীনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“না, আমার অহীনকে আমি অনেক বিশ্বাস করি। আপনার মেয়েই বেয়াদব একটা।”
আকাশ তাশার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“মানে কী? তাশু, তুমি আমার নাকি এই ফাজিলের?”
______
বাতাসের গুমগুম শব্দের সাথে সাথে বিশাল বিমানগুলো আকাশে উড়ে যাচ্ছে কিছুক্ষণ পরপর। সবার থেকে বিদায় নিয়ে তারা এয়ারপোর্টে এসেছে। তবে বিপত্তি এখানেও একটাই, সেটা আয়াশ। বিয়ের ঝামেলায় যেটা অহীন করেনি সেটা হলো সিট বুকিং চেঞ্জ। আশার সিট ছিল আয়াশের পাশে। অহীন আশার দিকে গভীর চোখে তাকায়। অনুভূতিহীন আশা কিছু বলছে না, আর না কিছু করছে। অহীনের পিছু হাঁটছে প্লেনে। আয়াশের যেন এতে কোনো ভাবনা নেই, সে কানে হেডফোন গুঁজে চোখ বুজে আছে। দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সে। অহীন আশার মাথায় গাট্টি মেরে ধমকায়,
“আপাতত আমার সিটে বস, দেখছি আমি। নাকি আয়াশের সাথে...?”
“না না সেটা কখন বললাম? তোমার সাথে আছি আমি। আয়াশ ঝামেলা করবে জানোই তো, রেগে আছে।”
“কার জন্য ভাবিস এত? আমার নাকি আয়াশের?”
আশা চুপ করে গেল। দুই পাশে সারিসারি সিটে মানুষগুলো বসে আছে। সিট খালি নেই কোনো। একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট কারো সাথে কথা বলছেন। অহীন ওই দিকটায় যায় এবং তাকে বলল,
“এক্সকিউজ মি।”
মহিলাটি স্বভাবসুলভভাবেই বিনয়ী হয়ে উত্তর করেন,
“ইয়েস স্যার?”
অহীন আয়াশের পাশের সিটটার দিকে ইশারা করে তাকে নরম গলায় বলল,
“আসলে আমি আমার ওয়াইফের ওই সিটটা এক্সচেঞ্জ করতে চাই। তার পাশের সিটের মানুষটির সাথে একটু প্রবলেম হয়েছে, পার্সোনাল।”
“স্যার, তিনি যদি আপনাদের পরিচিত হয়, কথা বলে দেখতে পারেন। নিজেদের মধ্যে...”
“ওনার সাথেই প্রবলেম একটু পার্সোনাল। আর শি ইজ মাই ওয়াইফ, আশা করি বুঝতে পারছেন বিষয়টা।”
মহিলাটি আশার দিকে একটু তাকায়। সাদামাটা একটা টপস পরে আছে, গলায় স্কার্ফ প্যাঁচানো। তিনি একটু হেসে আয়াশের দিকে এগিয়ে যান। ওখানটায় দাঁড়িয়ে থেকে কিছু সময় কথা বললেন আয়াশের সাথে। আয়াশ ফের কানে হেডফোন গুঁজে চোখ বুজল। মহিলাটি কাছে এসে জানালেন যার সিট সেই যেন বসে। তার ফোবিয়া আছে, যার তার সাথে বসতে পারে না। আয়াশের দিকে তাকায় অহীন। ছেলেটা বড্ড পাগল আশার জন্য, কিন্তু সে কম কিসে? নিজেই গিয়ে আয়াশের কানের হেডফোন খুলে টান দিয়ে আয়াশের ওপর ছুড়ে মারতেই আয়াশ সেটা নিজের ওপর থেকে ফেলে দেয়। হিসহিস করে বলে ওঠে,
“হোয়াট? তোর হাতে ময়লা অহীন। মাথা খারাপ নাকি?”
অহীন ওর দিকে ঝুঁকে রাগী গলায় দাঁত পিষে বলল,
“তোর সাথে কথা বলার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু... বাদ দে, সিট চেঞ্জ করতে প্রবলেম কী?”
আয়াশ পকেট থেকে ইয়ারফোন বের করে ওটার ভাঁজ খুলতে খুলতে বলে নির্বিকার গলায়,
“প্রবলেম জানিস তোরাও। সবার সাথে মিশতে পারি না আমি। আমি বরাবরই এসব সমস্যার জন্য দুটো সিট বুক করি। আশুর সাথে প্রবলেম হয় না আমার তাই ওর জন্য ছিলো একটা। ওকে বসতে বল। নয়ত প্লিজ ডোন্ট ডিস্টার্ব।”
আয়াশ কানে ইয়ারফোনঁজতে নিলে অহীন আবার হাত বাড়ায়। আয়াশ ওকে থামিয়ে দিয়ে চোখ গরম করে বলল,
“এটা সিঙ্গেল পিসই আছে। টাচ করবি না, হাত ধুয়ে আয়।”
আশা পেছন থেকে একটু বলল,
“আয়াশ প্লিজ।”
আয়াশ আশার গলা শুনে ফোস করে শ্বাস ফেলে। ওর দিকে তাকায়, অহীনের বাহু পেঁচিয়ে ধরে আছে। আয়াশের চোখ অনুসরণ করে আশা হাতটা ছাড়ল তার। অতঃপর বলল,
“তোমার সিটে কাকে বসাবে? অহীনকে?”
“নো, পাপি বসবে।”
অহীনের কথায় সন্তোষ হলো না একটুও সে। তাদের উদ্দেশ্য করে বলে,
“নো।”
আশা ঝুঁকে আয়াশের দিকে, নরম গলায় আবার বলল,
“অহীন আমাকে নেবেই না এমন করলে। প্লিজ এমন করবেন না।”
“ওকে, বাট আঙ্কেল যেন না বসে। অন্য কাউকে।”
আশা গালগুলো প্রসারিত করে হাসে। সবগুলো দাঁত দেখা যাচ্ছে। আশার হাসি দেখে চোখ ফিরিয়ে আয়াশও অগোচরে একটু হাসল। অতঃপর বলল,
“জেসিকে ভালো লাগে আমার, তাকে পাঠিয়ে দিও।”
সঙ্গে সঙ্গে আশার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল বাতাসের সাথে। আয়াশ মৃদু হাসির সাথে চোখ বুজে আছে, অহীন থ হয়ে আছে। কিছু একটা ভেবে দুষ্টু হাসে সে। অতঃপর আশার কোমর ধরে টান দিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে গভীর গলায় সম্মতি প্রকাশ করে,
“ওকে ডান, জেসি বসবে।”
তার থেকে কোনো উত্তর পেল না আর দুজন, চোখ বুঝে নিয়েছে, আশাকে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে অহীন। তার কানে কানে জিজ্ঞেস করে,
“জেলাস হচ্ছিস পেঁচি তুই? মুখটা কেন বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছিস?”
ওর বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে আশা ক্রুর চোখে তাকিয়ে বলে,
“কুত্তা! সরাসরি বললেই হয় জেসির জন্য তুই জেলাস। যতই হোক তোর পেয়ারি যে।”
কিছু সময় পর আয়াশের পাশে হাসিমুখেই জেসি আসে। পরনে টপস-জিন্স। আয়াশের পাশে ধপ করে বসে হাতের ইশারায় একবার হাই বললেও আয়াশ অদেখা করল তাকে সম্পূর্ণ। ভ্রু কুঁচকে ভেঙচি কেটে জেসি বিড়বিড় করে বলে,
“এই জন্যই সবাই বলে রুড।”
____
জমি থেকে কয়েকশ ফুট ওপরে ভাসছে প্লেন। জানালা দিয়ে বাদলের খেলা দেখা যাচ্ছে সুন্দর। সেদিকে খেয়াল নেই কারো, শুধু আশা তাকিয়ে আছে। আশার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে অহীন। অন্তিহা একটি বইয়ের পাতায় চোখ স্থির রেখেছে। সব কিছুর মাঝে বিরক্তিতে পিষছে আয়াশ। জেসির নড়াচড়া ও বারবার সিট থেকে উঠে ছুটাছুটি করা এসব বেশ ইরিটেটিং। কোথা থেকে এসে জেসি তার পাশে আবার বসে নিজেই বলতে থাকে,
“ওই দিকটায় গেলাম, মানুষ এত কথা বলে কেমন করে? একটা বয়স্ক আন্টি।”
আয়াশ তার একটি কথাও শুনছে না, কানে যে ইয়ারফোন গোঁজা তার। জেসি তার সাথেই তো কথা বলছে। লোকটা কেমন অদ্ভুত, কথাই বলে না। তবে একটু গম্ভীর ছেলে ভালো লাগে। তাইয়ান কেমন যেন। বিরক্ত হয়ে আয়াশের হাতের উল্টো পিঠে হাত ছুঁইয়ে ডাকে,
“স্যার?”
হাতে দুর্ভাগ্যবশত গ্লাভস ছিল না। অযাচিত স্পর্শে চোখ মেলে তাকায় আয়াশ। মুহূর্তে পাশ থেকে কাঙ্ক্ষিত ছোট বোতলটা দিয়ে হাত পরিষ্কার করে ইয়ারফোন খুলে ধমকে ওঠে,
“স্টুপিড! সমস্যা কী?”
“আমি কখন থেকে কথা বলছি আপনার সাথে আর আপনি গান শুনছেন?”
“আমার কান, আমি কারো কথা শুনব নাকি গান আমার মর্জি। হাউ ডেয়ার ইউ টু টাচ মি?”
জেসি মেকি হেসে উত্তর করে,
“আপনার মেজাজ খারাপ, তাই না? হওয়ারই কথা। কত বড় নাটকবাজ ফ্যামিলিতে আমরা যাচ্ছিলাম ভাবা যায়? মানে যাচ্ছেতাই। আমার সাথে অহীন এটা করল বুঝলাম আমাদের ফিলিংস নেই, কিন্তু আশা? আপনারা তো দুজন একে অপরকে ভালোবাসেন, তাই না? ওদের পরিবারের একেকজন সাইকো।”
“শাট আপ!”
আয়াশ স্বল্প স্বরে হুমকি দিয়ে আবার কানে ইয়ারফোন দিতে যাবে ওমনি জেসি ইয়ারফোনসহ আয়াশের হাতে ধরে টেনে নিজের কানের কাছে এনে বিড়বিড় করে বলে,
“আমিও শুনি কী এমন শুনছেন।”
মুহূর্তে আয়াশের শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। ঝাড়া দিয়ে ইয়ারফোন ফেলে হাত নিজের কাছে নিয়ে আসে। তড়িঘড়ি করে ইয়ারফোনটা ওর গায়ে ছুড়ে দিয়ে, হাত স্যানিটাইজ করতে করতে চেঁচিয়ে ওঠে,
“ইডিয়ট! টিসির জন্য প্রস্তুত হও।”
টিসির কথা শুনে ঘাবড়ায় জেসি। চোখে-মুখে আতঙ্ক ফোটে তার। কী এমন করল যে সোজা টিসিতে চলে গেল লোকটা! আশেপাশের যাত্রীগুলো তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। আয়াশের হাতের মালিশ দেখে মনে হচ্ছে হাত ঘষে ক্ষয় করতে পারলে প্রাণে বাঁচে। জেসি এগিয়ে গিয়ে আয়াশের উরুতে ও বাহুতে হাত দিয়ে কাতর দোষী স্বরে রিকোয়েস্ট করছে,
“স্যার সরি। প্রফেশনাল লাইফ ও পার্সোনাল লাইফ তো আলাদা রাখতে হয়, তাই না? ড্যাড আমাকে মাথায় তুলে আছাড় দেবে একটা।”
পুরো শরীর পাথরের মতো জমে গেল আয়াশের। এই মেয়ে এত গায়ে-পড়া কেন? মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে তাকে, হয়ত এখনই কোনো বিরাট বড় সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে মরে যাবে। কাঁপছে শরীর, আচরণে চেঁচিয়ে ওঠে ভয় ও রাগে,
“স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মি স্টুপিড লেডি!”
তার হঠাৎ গর্জনে পেছন থেকে উঁকি দেয় অন্তিহা। আশা উঠতে চাইলে অহীনের হাতের বাঁধনে থেমে যায়। অন্তিহা উঠে আসে সামনের দিকে। আয়াশের গালে জেসি হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করছে,
“আর ইউ ওকে স্যার? নড়ছেন না কেন?”
জেসির এমন কাজে অন্তিহা এগিয়ে আসে। বেশ ক্রুরতা প্রকাশ করে জেসির দিকে তাকায়। অতঃপর তাকে ডিঙিয়ে আয়াশের দিকে ঝুঁকে যায় সে। চোখ বুজে গুলিয়ে যাওয়া পেটটাকে ধরে আছে আয়াশ। এতগুলো বছরে এই প্রথম কোনো বেয়াদব তাকে এমনভাবে বিরক্ত করল। অন্তিহা হাত ধরতেই আয়াশ চোখ মেলে তাকায়। সে নরম গলায় আয়াশকে আস্থা দেয়,
“হ্যাই, আমি হাইজিন মেইনটেইন করে চলি।”
আয়াশ অন্তিহার হাতটা ধরে জেসিকে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে আসে। তারা দুজন। অন্তিহা জেসিকে শুধুই চোখ রাঙাল, একটু বলবেই বা কী? মেয়েটা এক নাম্বার বলদ। আয়াশের লাল হয়ে যাওয়া ধবধবে সাদা মুখটা দেখে নিয়ে যাচ্ছে। বমি পাচ্ছে খুব। একটা মানুষ নিজের অপরিষ্কার হাত তার শরীর ও গাল ছুঁয়েছে—ভাবতেই গা গুলিয়ে আসছে বারবার।
তার কাতর লালচে মুখটার দিকে তাকিয়ে আশা উঠতে চাইলে এবারও পারল না। অহীন টেনে নেয় নিজের কাছে। তার কানে যেন এসব যাচ্ছে না। আশা বসে অহীনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকায়। অপ্রকাশিতভাবে আশার গলায় মুখ গুঁজে গুঙিয়ে ওঠে, ফলে বোঝা যায় সত্যি ঘুমে বিভোর অহীন। আশা তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। অন্তু তাকে ইশারায় শান্ত থাকতে বলে চলে গেল। আশা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। অহীনের একটি হাত আশার হাত ধরে আছে শক্ত করে, আর অপর হাত উদর জড়িয়ে আছে। কাঁধে মাথা রেখে নাক ও ঠোঁট ছুঁয়ে আছে তার গলা। পা গুলো কচলাচ্ছে অস্থিরতায়। পাবলিক প্লেস না হলে হয়ত অহীন তার শরীর চিরে পারলে ভেতরে ঢুকে যেত, এতটাই শক্ত করে ধরে আছে। নিজেকে ছাড়িয়ে কোনোভাবেই ওঠা সম্ভব নয়।
---
ওয়াশরুমের ভেতরে গড়গড় করে বমি করে দেয় আয়াশ। মাথায় হাত বোলাচ্ছে অন্তিহা তার। শেষ করে হাঁসফাঁস করে শ্বাস নিচ্ছে সে। তার দিকে পানি এগিয়ে দিতেই আয়াশ রুক্ষ গলায় বলে ওঠে,
“অহীনের রুচি এতটা খারাপ কেমন করে হতে পারে? একটা মেয়ে এত গায়ে-পড়া হবে কেন? আমার ড্রেস পর্যন্ত ময়লা...”
অন্তিহা উত্তর করার আগেই আয়াশ আবারও বমি করে দেয়। গড়গড় করে বমি করে দেয়। অন্তিহা আবারও তার মাথায় হাত দিয়ে বলতে থাকে নরম গলায়,
“আপনিই তো বেশি নাটক করেছেন আজ। ভাইয়া এমনি এমনি জেসিকে আসতে দেবে? জেসির নিশ্চয়ই ফ্লাইটে কথা বলার স্বভাব।”
আয়াশ বেশ অনেক সময় পর শান্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। বাহির থেকে স্বল্প স্বরে পরিচিত কণ্ঠ আসছে কানে,
“অহীন, এটা এত ছোট কেন? ছিঃ!”
“বেয়াকুব পেঁচি! এর চেয়ে বড় চাস? তা হয় না। আমরা কোটিপতি নাকি? যা আছে কাজ চালা।”
“সম্ভব না, এত ছোট! আমার ফার্স্ট টাইম অহীন। আর এতে কোটিপতি আর গরিবের কী সম্পর্ক? একটু বড় করা যায় না?"
এবার আসে ঠাস করে দরজায় ধাক্কার শব্দ। আয়াশ অন্তিহার দিকে তাকায় বড় বড় চোখ করে। অহীন ধমকে ওঠে,
“তোর প্রথম বারের চক্করে আমার পড়ে যাবে এখন। খুলবি নাকি থাপ্পড় খাবি?”
আশা পাল্টা ধমক দেয়,
“না, বাসায় গিয়েই করব। দেখেই কেমন লাগছে এটা ছিঃ।”
“বসবি আর উঠবি, এতে এত নাটক করছিস কেন? সর, আমাকে করতে দে।”
অন্তিহা মিটিমিটি হাসছে। বাহিরে না জানি ওরা কী করছে! ভেবে বেরও হচ্ছে না দুজন। আয়াশের চোখে রাগ স্পষ্ট। অহীন কী পরিমাণ নির্লজ্জ ভেবেই রক্ত গরম হচ্ছে। মাথায় আসে ওরা হয়ত এখন উল্টোপাল্টা কিছু করছে। কত অশ্লীল! মনে পড়তেই গা গুলিয়ে আসে, মুখ উল্টে ফের গড়গড় করে বমি করে দেয় সে। পেট সম্পূর্ণ খালি হওয়াতে এবার শুধু কষ্ট হচ্ছে তার। আশার রাগ আরও চড়াও হলো। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“বসার জন্যও তো বড় প্রয়োজন। আমি কী পুরুষ যে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ সারব? তার চেয়ে বরং বাসায় গিয়ে আরামে করব।”
অমনি খট করে দরজায় টোকা পড়ে। দুজনের কথা বলা থামে পরক্ষণেই। পাশের ওয়াশরুমের দরজার ভেতর থেকে খটখট শব্দ করে অন্তিহা রাগে চোয়াল শক্ত করে কটমটিয়ে বলে,
“তোরা কী শুরু করলি ইয়ার?”
অহীন অন্তিহার গলা শুনে রুক্ষ মেজাজে বলে,
“তোর বান্ধবীকে বোঝা। ও পারলেও আমি কন্ট্রোল করতে পারব না। ভাই, টয়লেটে যাওয়া নিয়ে এত নাটক কীভাবে করে এই মেয়ে?"
আশার বাহু ধরে ঝটকা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে অহীন বাথরুমে প্রবেশ করে দরজা লক করে দেয়। ওমনি অন্তিহা দরজা খুলে আশার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
“তোরা টয়লেটে যাওয়া নিয়ে এত সময় এত নাটক করছিলি?”
আশা বিরক্তি নিয়ে বলে,
“তা নয় কী? এত বড় প্লেন, এত ছোট টয়লেট কেন হবে?”
“ঠিক ঠিক ঠিক! তুই তো কোনো প্রেসিডেন্টের বউ যে তোকে টয়লেট করার জন্য এখানে একটা পার্ক বানিয়ে দেয়া হবে। যাহ শয়তান!”
শেষে ধমকটা বেশ জোরেসোরেই দিল অন্তিহা। ফলে দাঁত বের করে হাসে সে। অহীন বের হয়ে আসে টয়লেট থেকে। হাত ভেজা আশার স্কার্ফে মুছতে মুছতে বলল,
“এত ঢং করে বড় বড় করিস কেন? বাড়িতে চল তোকে বড়টায় বসাবো।”
নিজের স্কার্ফে অহীনের ময়লা হাত পরিষ্কার করতে দেখেই আশা ভরকে তার বুকে ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলে,
“খচ্চর! টিস্যু কই তোমার? বেসিক জ্ঞানগুলো নেই তোমার। ছিঃ!”
ভেতর থেকে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আয়াশ বের হয়ে আসে। অহীনের দিকে তাকিয়ে বেশ ক্রুর গলায় বলে,
“জেসি এত বকবক করে তবুও আমি মানি ওর আজকে একটা কথা ঠিক বলেছে তোমাদের পরিবার সাইকো। ইডিয়ট!”
আয়াশ সেখান থেকে চলে গেল। অন্তিহা কিছু টিস্যু অহীনের দিকে এগিয়ে দিয়ে মাথা দুই দিকে দোলায় এদের কিছু হবে না। পারফেক্ট ফাজিল কাপল। অন্তিহা চলে যেতেই আশা অহীনের বুকে আবার কিল দিয়ে ন্যাকামি কান্না জুড়ে দেয়,
“কুত্তা একটা! আমার স্কার্ফ নষ্ট করে দিলে তুমি।”
আশার হাত থামিয়ে অহীন বলল,
“প্লেনে এমনই হয় আশু। প্রথমে সমস্যা হবে পরে অভ্যাস হয়ে যাবে। ম্যানেজ করে নে সোনা। আর ফ্লাইট ল্যান্ড করতেও ২ ঘণ্টা, ওখান থেকে বাসায় যেতে আরও ২ ঘণ্টা; থাকতে পারবি না। এয়ারপোর্টের টয়লেটগুলো নোংরা হয় খুব।”
আশা কিছু সময় ভাবে। উঁকি দিয়ে দেখে ভেতরটা, তারপর হতাশ হয়ে সম্মতি জানায় অহীনকে। আশা ফ্রেশ হয়ে আসতেই দুজন নিজেদের স্থানে যায়। অন্তিহার জায়গায় জেসি বসে আছে। সামনের দিকে তাকায়। এবার সব শান্ত। অন্তিহার হাতে বই, আয়াশের হাতেও বই। দুজনের মুখ বন্ধ, কোনো রকম কথা কেউ বলছে না।
____
দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে ট্যাক্সি থেকে নামে অন্তিহা, আশা ও অহীন। একটা বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়ায় তারা। পরিবেশ একদম শান্ত চারপাশের। আশার হাতের লাগেজটা এক হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“তিন তলায়, ৩৪৫ নাম্বার অ্যাপার্টমেন্ট।”
অহীনকে পেছনে রেখেই দুজন ওপরে উঠতে থাকে। হালকা শীত পড়েছে এই দিকটায়, বছরের শেষের দিকে। আর কিছুদিন বাদে স্নোফল হবে। গাছের পাতাগুলো ঝরে গিয়েছে ইতিমধ্যে। কাঠের সিঁড়িগুলো দিয়ে ওঠার সময় কয়েকজন লোকের সাথেই দেখা হলো তাদের। কেমন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। দরজার ওপরে 345 নাম্বারটা দেখে আশা লক খোলে। দরজাটা ধাক্কা দিতেই বিচ্ছিরি একটা গন্ধ এসে গরম বাতাসের সাথে নাকে লাগে। অজান্তেই গা গুলিয়ে আসছে দুজনের। নাকে হাত দিয়ে পিছিয়ে আসে। পেছনে তাকায়, অহীন লোকগুলোর সাথে কথা বলছে কিছু। আশা ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করে। বড় একটা ড্রয়িংরুম। একটা সোফা, সামনে বিশাল টিভি। একটা টয়লেট, একটা রান্নার ঘর। সোফার ওপরে অগোছালো কাপড়গুলো পড়ে আছে। জুতোগুলো একটা এদিক তো অন্যটা দেখা যাচ্ছে না। আধখাওয়া চিপসের কাগজ, গ্লাসে নষ্ট হয়ে উল্টে পড়ে থাকা জুস। দুজন একে-অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করে ভেবলার মতো হাসে। অহীন তাদের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে অনুভব করে নিজেদের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে পেছন ফিরে তাকায় দুজন। আড়াআড়িভাবে হাত বুকের সাথে চেপে ধরে গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
“তুমি মানুষ নাকি গরু?”
অহীন মাথা চুলকে হেসে আশার হাত ধরে বলে,
“তাড়াহুড়ো করে চলে গিয়েছিলাম। আর আমি কি জানতাম বিয়ে করে বউ নিয়ে আসব?”
আশা ওর থেকে ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রাগী গলায় বলল,
“পাপিকে কল দাও। ওনার বাসায় যাব। এমন পরিবেশ আমাদের সাথে যায় না। এতটা নোংরা একটা মানুষ কেমন করে হতে পারে অহীন?”
অহীন অন্তিহার দিকে তাকায়। মেয়েটা রাগে ফুঁসছে খুব। সে আশার কোমর জড়িয়ে ধরে নরম গলায় বলল,
“আশু, আজকে ম্যানেজ করে নে তোরা। কাল থেকে কাজের লোক আসবে। আর বেডরুম অমন না একদম।”
নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় আশা আস্তে করে। একটু দূরে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে, আড়চোখে অন্তিহার দিকে তাকিয়ে আবার বলল হিসহিস করে,
“দূরে থেকেও বলা যায়। সেই বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে এত চিপকে আছ কেন?”
অন্তিহা ওদের ঢং সহ্য করতে পারল না আর। চোখ উল্টে গিয়ে বড় বড় জানালার থাইগুলো খুলে দেয় যেন ঠান্ডা বাতাস আসলে একটু হলেও দুর্গন্ধ কমে যায়। আশার কথায় মন ছোট করে অহীন। নিজেই গিয়ে বেডরুমে প্রবেশ করে লাগেজটা ছুড়ে মারে। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে ওখানে এলোমেলো কাপড়গুলো। হাত দিয়ে ঝটকায় সব কাপড় নিচে ফেলে দিল সে। ধপ করে শুয়ে ক্লান্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,
“ড্রয়িংরুমে অন্তুর জন্য একটা সিঙ্গেল বেডশিট রাখা আছে, ও জানে কোথায়। তুইও আরাম করে নে একটু।”
পুরো ফ্লাইট ঘুমানোর পরেও অহীন ঘুমে বিভোর হচ্ছে। উঁকি দিয়ে দেখে আশা। অন্তিহা নিজের মতো অল্প জায়গা পরিষ্কার করে নিয়েছে। বেশি ভাবল না আর। লাগেজ থেকে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। প্রবেশ করেই চোখ কোটর থেকে বের হওয়ার উপক্রম! মেঝেতে রীতিমতো শেওলা পড়েছে। সে অহীনের দিকে তাকায় তার জীবন এমন হওয়ার কথা একদম ছিল না। দুজনের স্বভাবগুলো আকাশ-কুসুম তফাত। এমন নোংরা দেখে অভ্যস্ত নয় সে। ফোস করে শ্বাস নিয়ে প্রবেশ করে।
ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে বাথরুমটা মনমতো চকচক করে গোসল করে বের হয় সে। অহীন উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে। তার চোখেও ক্লান্তি। উঁকি দিয়ে দেখে আশা, অন্তিহা ড্রয়িংরুমের চিত্রই পাল্টে দিয়েছে। এখন ঘুমাচ্ছে আরামে। নিজেও গিয়ে অহীনের পাশে আস্তে করে শুয়ে পড়ে। সোজা হয়ে ভেজা চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে দিয়ে চোখ বুজে নেয়। চোখে ঘুম ঝেঁকে আসতেই অনুভব করে তার শরীরে গভীর স্পর্শ কারো। মানুষটা কে জানে সে, বাধা দিল না তাই। স্পর্শ গভীর হচ্ছে। অহীনের হাত তার উদর গলিয়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছে আর নাক করে নিয়েছে ঘাড়ে নিজের স্থান। একজনের শরীর থেকে মিষ্টি সাবানের গন্ধ ও অপরজনের শরীরে পুরুষালি ঘামের ভ্যাবসা গন্ধ মিশে যাচ্ছে একে-অপরের সাথে। অহীন হয়ত চাচ্ছে আরও গভীর ভাবে এই গন্ধ অনুভব করতে, কিন্তু আশা তো অনুমতি দেবে না তাকে। আপাতত যা পেয়েছে তাতেই কি খুশি থাকা শ্রেয়? হুম, শ্রেয়।
চলবে......