#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
কপি করা নিষিদ্ধ
পর্বঃ২৭
সকালের হালকা শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে কক্ষজুড়ে, খাবারের ঘ্রাণে মম করছে পুরো অ্যাপার্টমেন্ট। ঘুমের মাঝেই অহীনের পেটের ভেতর কেমন গুমগুম শব্দ করে উঠছে। সাদা কমফোর্টারটা সরিয়ে উঠে বসে সে পাশে আশাকে চেয়েছিল, তবে নেই। পেটের খিদে নিয়ে থাকতে পারল না। ঘুমু ঘুমু চোখেই নামে বিছানা থেকে। আধো আধো চোখে রুমের দিকে তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে কোটর থেকে বের হতে চায়! এটা কি তারই বাসা? ফ্লোর একদম চকচক করছে। এলোমেলো কাপড়গুলোও নেই। রুমের সাথে অ্যাটাচড বারান্দার দিকে তাকায় বিশাল কাঁচের ওপাশে অহীনের কাপড়গুলো মেলে দেওয়া। হালকা রোদে শুকোচ্ছে। রুম থেকে বের হয়ে দেখল ড্রয়িং রুমটাও সম্পূর্ণ পরিষ্কার।
এগিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে। একটা শর্ট টপসের সাথে লং স্কার্ট পরে আপন মনে কাজ করছে আশা। মাথায় প্লাস্টিকের কাঁটা দিয়ে এলোমেলো চুলগুলো বেঁধে রেখেছে, ‘বউ বউ’ অনুভব হচ্ছে আজ। বারবার সামনে চলে আসা চুলগুলো হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে হাতে ময়লা বাসনগুলো। অহীনের মনে হচ্ছে, আশার ঘাড়ের ছোট চুলগুলো সরিয়ে ওখানটায় চুমু খাওয়াই তার সবচেয়ে বড় কর্তব্য স্বামী হিসেবে। নিজেকে দমিয়ে এগিয়ে যায় সে। দুই হাতে এলোমেলো চুলগুলো মুঠিতে পুরে নেয় আলগোছে। হঠাৎ শীতল স্পর্শে ঘাবড়ে পেছন ফিরে তাকায় আশা। তাকে আবার সামনের দিকে করে দিয়ে চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে নেশালো গলায় বলতে থাকে,
“বলেছিলাম তো কাজের খালা আসবে। কেন এসব করে মোহিত করছিস আমায়? তুই না চলে যেতে চাস?”
“চিপকে থেকো না, সরো।”
অহীন আস্তে করে ঝুঁকে আসে গলার কাছে চোখে আশাকে পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা খেলা করছে, হাতের তর্জনী দিয়ে ঘার হতে গলায় নেমে আসছে আস্তে আস্তে,,
“এলোমেলো হচ্ছি আমি, নিয়ন্ত্রণ হারালে সামলাতে পারবি? খুব করে বেসামাল হতে ইচ্ছে করছে আমার বউ। একটু হই?"
ঠোঁটটা ছোঁয়াতেই যাবে ঘাড়ে, অমনি আশা ওকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তার দিকে ফিরে তাকায়। হাতে ঝঙ্কার পড়ে থাকা একটা ধোয়া ছুরি তার দিকে তাক করে রাগে গর্জে ওঠে,
“চুপ, একদম চুপ থাকবি কুত্তা! তুই, তোর বোন আর তোর কাজের খালা সবগুলো একসাথে মিলে আমাকে দিয়ে এত কাজ করিয়েছিস!”
রোমান্টিক মুহূর্তটা নিমিষেই হারিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল পুরো বাসাজুড়ে। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে অহীন হাত বাড়িয়ে আশাকে থামিয়ে বলল,
“আশু কি হয়েছে? রেগে যাচ্ছিস কেন সোনা? মেরে দিবি নাকি? খুন করা হারাম, সোজা জাহান্নামে যাবি। আর যদি স্বামীর খুন হয়, তাহলে ভেবে দেখ কী হবে তোর।”
“তোকে মেরে ফুটন্ত তেলে ভেজে নিজেও প্রয়োজনে ঝাঁপ দেব কুত্তা! তোর বোন সকাল সকাল জেসির সাথে কোথায় যেন গেল। তোর কাজের খালা এসে কিচেনের এই অবস্থা দেখে হাজার কথা শোনালো শালী নোয়াখাইলনী।”
অহীন এগিয়ে যায় ওর দিকে, এখনো হাতের ছুরিটা ধরে আছে তার দিকেই তাক করে। সে বলল,
“সরি সরি, আমি অন্তুকে বলে দেব, খালাকেও কল দিয়ে শাসিয়ে দেব জান। এবার ক্ষমা দে।”
“দরকার নেই। ওই মহিলাকে আর আনবি না। কী যেন বালছাল বলে গেল, কিছু বুঝলাম তো না, উল্টো অপমানিত ফিল হচ্ছে।”
“আরে জান, কী বলেছে বলবি তো? কেন ঝগড়া হলো?”
আশা আরও এগিয়ে গিয়ে ছুরিটা ওর গলার কাছে ধরে রাগে চেঁচিয়ে ভেঙিয়ে ভেঙিয়ে বলল,
“আপনে তো দেহি এক্কেরে বুরবইক আর চউক্ষু-খাউয়া একগা! এই হাউশাউ আর বাইজ্জা ব্যাডার লগে থাকতে আইছেন, নিজের আক্কল-জ্ঞান কি হগলে খাইলাইছে নি? আমনের লাহান হাগল মাইয়া এই ঘরো আইছে বলিয়াই তো আজগা এই দশা, দুইগা তো এক্কেবারে হিয়াইল্লা জোড়া মিলছে! এসব কেমন কথা? হিয়াইল্লা জোড়া? তুই কুত্তা শেয়ালের বংশ হবি, আমি না, আমাকে কেন বলল?”
আশার মুখের ভাঙা ভাঙা অঙ্গভঙ্গি দেখে ছেলেটা না হেসে পারল না। ভয়কে দূরে রেখে দাঁত বের করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল এবার। তার হাসির শব্দে আশার রাগ যেন আরও চড়াও হলো মাথায়। ছুরি নিয়ে তেড়ে যায় তার দিকে, ভয়ে অহীন ছুটে রুমের একদিকে, তবে আশার কথায় হাসি থামছে না কোনোভাবেই।
“কুত্তা দাঁড়া তুই, তোর দাঁতগুলো তুলে নেব আজ আমি।”
“পেঁচি দেখ এমন করিস না, আমাকে ডাকতে পারতি, সাহায্য করতাম। এখন আমার অসহায় প্রাণের পেছনে কেন লেগেছিস?”
“অহীন তোমাকে ডেকেছি আমি....”
বলতে বলতে ম্যাট্রেসের সাথে পায়ে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পেছনের দিকে পড়তে নেয় আশা। ঠিক সময়ে এসে অহীন জড়িয়ে ধরে তার কোমর। ঘটনা আচম্বিতে তার হাতের চাকুটা অহীনের ঠিক পাঁজরে তীব্রভাবে আঁচড় কেটে যায়। কিঞ্চিৎ ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠলেও আশাকে ছাড়ল না সে। উল্টো একই সাথে ধাপ করে ম্যাট্রেসের ওপর পড়ে তারা। চিরচির করে রক্ত পড়ছে পাঁজরের কাছ থেকে। অহীন গভীর ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করে,
“না করেছিলাম এমন করতে। ঠিক আছিস এখন?”
তার বুকে একটি হাত চেপে ধরে আশা বুকটা হঠাৎ কেমন ধুকপুক করছে। চোখ স্থির অহীনের ঠোঁটের দিকে—কেমন অদ্ভুত শুকনো। নরম গলায় শুধায়,
“বিয়ের আগে তো এমন ছিলে না, এত যত্ন?”
“তখন তো আমার ছিলি না তুই। এখন আমার আর নিজের জিনিসের যত্ন নেওয়ার জন্য কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে?”
আশা মাথা নুইয়ে নেয়। একটু ঘাড় বাঁকিয়ে অহীনের বুকে ঢলে দিয়ে বলে,
“মানে? কে তোমার জিনিস? আমি তোমার নই একদম।”
“তাই?”
অহীন ছলছল চোখে আশার দিকে তাকায়; চোখে ভালোবাসা নেই আশার, অহীনকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাকুলতা। অহীন তাতে একটুও গুরুত্ব দিল না। আশার নরম কোনো রকম প্রলেপহীন ঠোঁটের দিকে আগায়। ঠোঁট প্রায় ছুঁই ছুঁই, অমনি আশা দুই হাতে অহীনের মুখ চেপে ধরে ভড়কানো গলায় রাগ দেখিয়ে বলে,
“ওয়াক ছিঃ! ব্রাশ করোনি তুমি, গন্ধ লাগছে। যাও।”
অহীন শরীর ঝটকা দিয়ে উঠে বসে, কপালে হাত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে। কী বলবে এই মেয়েকে! মুড স্পয়েল করার জন্য তো একশতে হাজার দেওয়া যাবে একে। অহীন সরতেই তড়িঘড়ি করে উঠে আশা দৌড়ে রান্নাঘরে চলে যায়। বেসিনের ময়লা প্লেটগুলোতে হাত ডুবিয়ে শুকনো ঢোক গেলে। হঠাৎ অহীনের পাল্টানোটা কেমন মনকে বিভ্রান্ত করছে। অহীনকে এভাবে চায় না সে। কত হাজারো স্মৃতি একসাথে কাজিন, বড়ভাই, বন্ধুর মতো। হঠাৎ এসব মনকে বোঝানো কঠিন খুব। রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখে অহীন নেই। হয়তো ফ্রেশ হতে গিয়েছে।
_°
ফ্রান্স শহরের হাজারো শোরগোলের মাঝে অন্তিহা যেন নিজের স্বপ্নের এক ধাপ এগিয়েছে। বিশাল ফটকের ওপর বড় বড় করে লিখা ‘ইউনিভার্সিটি প্যারিস সিটি’—তাকিয়ে আছে সে ছলছল চোখে। জেসি বাহুতে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে,
“আর ইউ ক্রাইং? তোমার পরিবারে তুমি প্রথম নও এখানে,তোমার মম ভাই এখানে এসেছে। তাই কান্নার কিছু নেই।”
অন্তিহার গায়ে ধাক্কা পড়তেই আঁতকে ওঠে। পলক ঝাপটাতেই একটি চোখের কার্নিশে পানির বিন্দুগুলো চকচক করে ওঠে। অন্তিহা একটি আঙুলের সাহায্যে সেটা মুছে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে,
“সবাই আমার মতো শখ স্বপ্ন নিয়ে আসেনি। আমি এসেছি নিজের পরিচয় তৈরি করতে, নিজেকে যোগ্য তৈরি করতে। তাই আমার কান্না আসছে।”
“ভেতরে যাবে? কিছুদিন তো ছুটি। চলো তোমাকে দেখাই।”
“হুম।”
সকাল সকাল জেসির সাথে বের হয়েছে সে ঘুরতে। রোদ দেখা যাচ্ছে না আকাশে, হালকা ঠান্ডা পড়ছে। ভারী কোট গায়ে জড়িয়ে রাখা ছিল তাদের। ওটা খুলে হাতে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে, চারপাশ দেখছে মন দিয়ে। সামনেই কিছু মেয়েদের কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। জেসি ওদিকে তাকিয়ে একটু গাল বাঁকিয়ে অন্তিহাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি আর আয়াশ একরকম। কালকে এসেই আজ ইউনিভার্সিটি দেখার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছ। আর ওদিকে আয়াশকে দেখো, এসেই মেয়েগুলোকে লেকচার দেয়া শুরু করেছে।”
অন্তিহা গভীর চোখে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“এটাকে বলে হার্ড ওয়ার্ক।”
জেসি আয়াশের দিকে যেতে নিলে অন্তিহা তার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। সে জেসির হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। অহেতুক আয়াশের সাথে কী বলবে? সেই তো আশাকে নিয়ে কথা বলবে লোকটা। তবে কিছুদূর যেতে পারল না তারা। পেছন থেকে কাঙ্ক্ষিত লোকটার অনাকাঙ্ক্ষিত ডাক কানে আসে,
“অন্তি?”
ডাকটা কর্ণপাত হতেই অন্তিহা থেমে পেছন ফিরে তাকায়। গায়ে সাদা রঙের কোট, মাথায় টুপি, মুখে মাস্ক পরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে আয়াশ। হাতের কালো গ্লাভসগুলো হয়তো নতুন, বেশ সুন্দর লাগছে। মেয়েগুলো পেছনে খাতায় কিছু একটা নোট করছে। বুঝল না সে এখন তো ক্লাসের সময় না, তাহলে এই অসময় বাইরে এমন কী শেখায় মেয়েগুলোকে সে? ঠিক কাছে এসে আয়াশ গভীর গলায় জিজ্ঞেস করে তাকে সরাসরি,
“তুমি এখানে?”
অন্তিহা উত্তর করার আগেই জেসি বলে ওঠে,
“কিছুদিন পর তো একা একা আসতে হবে, তাই চেনাতে নিয়ে আসলাম। কিন্তু আপনি কেন এই সময় এখানে?”
জেসির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে সে। গত দিনের কথা মনে পড়তেই গা গুলিয়ে আসছে। সে তার কথার জবাব দিল অন্তিহাকেই,
“তুমি পুতুলের সাথে ফ্যাশনে ডিগ্রি নিচ্ছ না?”
অন্তিহা একটু অবাক হলো। এতগুলো দিনের পরিচয়, বন্ধুর মতো মেলামেশা কিন্তু আয়াশ এটাও জানে না সে কী বিষয়ে পড়াশোনা করে! জেসি বলতে গেলেও অন্তিহার হয়তো বিষয়টা গায়ে ঠেকল। সে জেসিকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“এত বছরে এটাও জানেন না? যাক, জানা হয়ে যাবে আমার ক্লাস শুরু হলে।”
“এখনো বলতে পারো।”
“আগে যখন বলিনি আজও নাই বা বললাম। জেনে যাবেন ক্লাস শুরু হলে। এখন যাই, বাই।”
অন্তিহা আগাতে নিলে আয়াশ ফের পিছু ডাকে তাকে। চোখে কিছু জানার কৌতূহল ও আকুতি। সে অধর ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি বের হয়েছ, পুতুলকে কেন আনলে না?”
তার প্রশ্নের দিকে কিছু সময় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল অন্তিহা। অতঃপর উত্তর দিল,
“ভাইয়ার কাছে না বলে আনা ঠিক হতো না তাই। আর ওরও আসার ইচ্ছে ছিল না।”
“তুমিও তো বোঝাতে পারো অহীন আর আশাকে। তুমি জানো তো পুতুলের ফিলিংস আমার জন্য। ফিলিংস ছাড়া থাকা যায়?”
অন্তিহা গভীর গলায় অল্প স্বরে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
“আয়াশ, আশা আমার কাজিন আর অহীন আমার আপন ভাই। হয়তো আমি গম্ভীর আর ওনার খাপছাড়া কথা পছন্দ করি না, তাই বলে এই নয় ভাইয়ার খুশি চোখে দেখি না। আর রইল আশার কথা? আশা নিজেও আগাচ্ছে ভাইয়ার দিকে, আপনি তো দেখলেন তখন দুজনের মাঝে ভাবটুকু, আমি কেনো তাঁদের মাঝে তৃতীয় পক্ষ হবো? আর আশু অবুঝ না।”
“আশা কি অহীনের কথা ছাড়া কিছু করে না?”
“ওর থেকে জেনে নেবেন আয়াশ। আমি এই ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। আশা করি আর পিছু ডাকবেন না!”
অন্তিহা জেসিকে সেখানে রেখেই সামনের দিকে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে। তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে আয়াশ গভীর চোখে। ঠান্ডা বাতাস বারবার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদের। তার স্তব্ধতার দিকে তাকিয়ে সাদা কোটটিতে হাত দিয়ে পরপর কয়েকবার টেনে জেসি বলে,
“স্যার, ও আপনারই মতো সাইকোলজি নিয়ে পড়ছে। আশ্চর্যের বিষয় জানেন না আপনি? এত পুরনো...”
জেসির আবার স্পর্শ পেয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে যায় সে। কোটের দিকে ভ্রুকুটি করে জেসিকে ধমকে সতর্ক করে বলে,
“লিসেন মেয়ে, নেক্সট টাইম আমার গায়ে হাত দিলে আই সোয়্যার টিসি নিয়ে দেব। তোমার মতো মেয়ে সায়েন্স নিয়ে পড়ে কীভাবে? স্টুপিড!”
কথাটা বলেই গায়ের সাদা কোটটা খুলে ফেলে। ওকে রেখেই সেখান থেকে চলে যায়। জেসি তাকিয়ে আছে অবাক চোখে তার দিকে। কী দেমাগ বাব্বা! চারপাশে মেয়ে নিয়ে বসে থাকে তখন ফোবিয়া কই থাকে? তাদের দেখলেই নাটক যতসব। অন্তিহা ইতিমধ্যে দূরে চলে গিয়েছে। জেসি ছুটে তার দিকে যায় দৌড়ে দৌড়ে।
“অন্তু, স্টপ।”
____
সন্ধ্যা নেমেছে আকাশে, কনকনে শীত ছড়িয়েছে চারপাশে। কয়েকটা দিন কেটেছে তাদের ফ্রান্সে। আশার স্বভাবে পরিবর্তন ঘটেছে অনেকটা। হাতে গরম গরম ভাজা খাবার নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে অহীন। পুরো ঘর নীরব একদম। ড্রয়িং রুমে শুধু মিটিমিটি আলো জ্বলছে। হাসিমুখে টিভি দেখছে আশা আর অন্তিহা। সে প্রবেশ করেই লাইটগুলো সব জ্বালিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চোখে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে দুজন,
“আহহহহ, বন্ধ করো এটা!”
তাদের চেঁচানো শব্দে কানের পোকাগুলো হয়তো নড়ে গেল অহীনের। কান বন্ধ করে চোখগুলো পিটপিট করে খোলে সে। টিভির দিকে তাকিয়ে দেখল চাইনিজ ড্রামায় ডুবে আছে দুজন। সে গিয়ে সেটা বন্ধ করে দিয়ে আশার দিকে খাবারের প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“নে এগুলো প্লেটে করে নিয়ে আয়।”
আশা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কী এটাতে?”
“এদিকের খুব ভালো দোকানের ফ্রাইড চিকেন। আজকে আর রান্না নেই, তোদের ভালো না?”
আশার মুখটা মিইয়ে গেল তার কথায়। মাথা ঝাড়া দিয়ে বলল,
“হুম ভালো, কিন্তু আমি তো খেয়ে নিয়েছি। এসব খাওয়ার জন্য একটুও জায়গা নেই আমার ছোট পেটে।”
আশা আবার টিভিটা অন করে হেলান দিয়ে বসল সোফায়। আশার হেয়ালি দেখে অন্তিহা একটু হেসে নিজেই গিয়ে সব প্লেটে করে সাজিয়ে নিয়ে আসে। অহীন মুখ-হাত ধুয়ে এসে তাদের পাশে বসে। আশা খাবে না তাই উঠে যেতে নিলে অহীন তার হাত ধরে,
“যাস না আশু, বস আমাদের সাথে।”
আশা হামি তোলে বড় করে,
“উহু, খিদে নেই।”
অন্তিহা বলল,
“আশু না খেলেও বসতে তো পারিস, ভাইয়া বলছে এত করে।”
আশা অহীনের দিকে তাকিয়ে স্বল্প হেসে বসে তার পাশে। ঠোঁটে আলতো হাসির রেখা সবার, তবে কথা নেই কারো মুখে। অন্তিহা তো চুপচাপ থাকে, অহীন আর আশাই কথা বলে বেশি, তবে আজ সব নীরব একদম। এরই মাঝে আশা জিজ্ঞেস করে,
“অহীন তুমি কিছু কাজ করো না?”
“হুম করি, ওই পাপির শপ দেখাশোনা।”
“বেতন দেয়?”
অহীন একটু থামে। কখনো তাদের মধ্যে আলাদাভাবে টাকা নিয়ে কথা হয়নি। সৃজনের ছেলে নেই সেই হিসেবে অহীনই তো সামলায় সব দিক। যখন যা প্রয়োজন নিজের মতোই খরচ করার স্বাধীনতাও তার আছে। সে ক্ষীণ গলায় বলল,
“বেতন প্রয়োজন হয় না, আমার প্রয়োজন মতো খরচ করি।”
আশা কিছু সময় ভ্রু নাচিয়ে চুপ থাকে। অন্তিহা একটু বেকুব বনে আছে আশা তো এত কিছু ভাবে না, হঠাৎ কী হলো? অতঃপর আশা গম্ভীর গলায় ফের বলল,
“তোমার মনে হয় না এসব পাপির ঘাড়ে চেপে থাকা?”
তার কথায় অহীনের চোয়াল শক্ত হয়। ভ্রু কুঁচকে ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কী বলতে চাস?”
অন্তিহা ভেবেই নিয়েছে এখন দুজনের মাঝে একটা ছোটখাটো যুদ্ধ হয়ে যাবে। অন্তিহা সৃজনকে অতটা পছন্দ না করলেও অহীনের সাথে এসব বলবে না কখনো। আশা অহীনের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“বলতে চাই যে পাপির কাছে তুমি চাকরি করো না কোনো, নিজের মতো চলো। অন্য কোথাও এমন ছাড় পাবে না বলেই কি কিছু করো না? নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করো তাও এত অল্প সময় শপে দিয়ে। এতে পাপির লস হয় না? একটা এমপ্লয়ি তুমি নিজের মতো খরচ কেন করবে? নাকি কোথাও চাকরি পাচ্ছ না? পাপির হেল্প নিয়ে তোমার অন্তত একটা চাকরি করা প্রয়োজন এখন তুমি বিবাহিত।”
হাতের খাবারের টুকরোটা রেখে সোজা হয়ে অহীন আশার দিকে তাকায়। চোখের ভাবমূর্তি বোঝা মুশকিল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি রেখে উত্তর দেয়,
“ঠিক আছে, কাল থেকে নরমাল এমপ্লয়ির মতো কাজ করব। এবং মান্থলি বেতন নেব। কোনো এক্সট্রা টাকা নেব না।”
অন্তিহা অবাক হয়ে বলে,
“আর ইউ সিওর?”
“ইয়াহ, সিওর।”
আশা চুপ হয়ে গেল আস্তে করে। অন্যদিকে তাকিয়ে বসে আছে। বাইরে একদম ঠান্ডা হিম করা বাতাস বইছে, কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে। আশার দিকে তাকিয়ে অহীন একটা খাবারের টুকরো এগিয়ে দিয়ে বলল,
“একটু খা আমাদের সাথে?”
আশা মাথা দুলিয়ে না করে,
“পেট ভর্তি।”
আশার গম্ভীর মুখটা দেখে অভ্যস্ত নয় অহীন এমন। কেমন যেন মনঃক্ষুণ্ণ লাগছে। সে উঠে দুষ্টুমি করে হাসি দিয়ে আশার চিবুক তুলে মুখের সামনে ধরে হাসির সাথেই বলে,
“পেঁচি খা, নয়তো তোকে খেয়ে ফেলব এখন।”
আশা অহীনের বুক ঠেলে বিরক্তি নিয়ে বলছে,
“অহীন আমি ওভার খেতে পারি না তুমি জানো। জোর করো না প্লিজ, অন্যদিন খাব।”
অন্তিহা বলল,
“খেয়ে নে আশু, একটু খেলে কিছু হবে না।”
“না খাব না আমি।”
অহীন আশার আরও একটু কাছে গিয়ে এবার চোয়ালে চাপ দেয়। এসব নিত্যদিনের মজা তাদের। আশা ওকে সরিয়ে দিচ্ছে মেয়েটা বড্ড জেদি, খাবে না তো খাবে না বললই। অহীনও কম যায় কিসে, একটু হলেও মুখে দিয়ে ছাড়বে।
“নাটকবাজ মেয়ে, এতে বিষ তো মেশাইনি যে মরে যাবি। খেতেই হবে।”
অহীনের অতিমাত্রায় ধস্তাধস্তি আশাকে বেশ বিরক্ত করছে। ধাক্কায়ও সরছে না সে, উল্টো আরও চেপে ধরছে আশার সাথে নিজের হাত, সম্পূর্ণ অধিকারের সাথে। খাবারের হাতটা আশার ঠোঁট স্পর্শ করতেই আশার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। সে অহীনের হাতে ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল খাবারটা। সোফার সাদা কভারটা লালচে হয়ে গেছে। আশা চেঁচিয়ে ওঠে অহীনের ওপর,
“বললাম তো খাব না! ফোর্স করার সাহস হয় কী করে?”
ছলছল চোখে অহীন স্তব্ধ হয়ে গেল, সাথে অন্তিহা। অহীন সরে আসতেই সে আশার গায়ে হাত দিয়ে বলে,
“আশু নতুন নয় যে ভাইয়া তোর সাথে এমন করে, এত রেগে যাচ্ছিস কেন?”
সে অহীনের দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বলে,
“আগের মতো নয় আমাদের সম্পর্ক। একটু সুন্দর করে কথা বলি মানে এই নয় যে আমি সম্পর্ক মেনে নিয়েছি বা আমাকে এমন করে সব কিছুতে ফোর্স করার অধিকার দিয়েছি।”
কথাটা বলে এক মুহূর্ত বসল না সে। উঠে চলে গেল রুমের দিকে। রাগে ফুঁসছে দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে। অহীন তাকিয়ে আছে পেছন থেকে গভীর চোখে তার দিকে। ছলছল কাতর দৃষ্টিতে দেখছে। অন্তিহা অহীনের কাতর মুখটার দিকে দেখে বলল,
“অনেকদিন হয়েছে তো এসেছে, আর বাসায়ই থাকে হয়তো তাই মন ভালো না। আপনি খান।”
তার ধেয়ান ভাঙে তখন। সে পানি নিয়ে মুখে-হাত টিস্যু দিয়ে মুছে হালকা হেসে উত্তর দিল,
“হুম বুঝতে পেরেছি। তুই শেষ করে এসব কিচেনে রাখিস। আর ওর জন্য ফ্রিজে রেখে দিস, সকালে খাবে।”
“আচ্ছা। আপনি আর খাবেন না? ভাত খাবেন, দেব?”
“না।”
অহীন দীর্ঘ হতাশার শ্বাস ফেলে উঠে যায়। অন্ধকার কক্ষে ড্রিম লাইট জ্বলছে, ওপাশ মুখ করে শুয়ে আছে আশা। সে কথা না বলেই আঁধারে কাপড় নিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করে। সব সময়ের মতোই পরিপক্ব সবকিছু। অহীন প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে গোসল দিয়ে বের হয়ে আসে। আশা একইভাবে শুয়ে আছে। পরনের টাওয়াল ছেড়ে ট্রাউজার পরে গিয়ে আশার পেছনে শুয়ে পড়ে অহীন। হালকা নড়াচড়ার জন্য অনুভব করে আশা ঘুমায়নি এখনো। শুকনো ঢোক গিলে সে আস্তে করে তার কাছে যায়। কাঁধে হাত রাখতেই আশা একটু কেঁপে ওঠে, ফলে বুঝতে পারে আশা এখনো ঘুমায়নি। অহীন তার কোমর গলিয়ে দেয় আশার উদরে, আরও একটু কাছে গিয়ে বুকের সাথে টেনে নেয় আশার পিঠ। ঘাড়ে নাক ঘষে আদর করে বলে,
“সরি, ফোর্স করা উচিত হয়নি আমার তোকে।”
ওপাশ থেকে ফিরে অহীনকে নিজের থেকে একটু আলগা করে দেয়।
“আচ্ছা।”
অহীন তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয় টেনে। অতঃপর গালে ছোট করে চুমু দিয়ে আবার বলে,
“আচ্ছা আবার সরি, ঘুরতে নিয়ে যাব তোকে কাল।”
__
প্যারিসের ঝলমলে রাস্তা সন্ধ্যার পর আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। পথের ঠান্ডা বাতাস গায়ের সাথে স্পর্শ করে যাচ্ছে। জিন্সের সাথে লেদারের মোটা জ্যাকেট পরে আছে আশা ও অন্তিহা। বরাবরই অন্তিহা চুপচাপ। অহীন তাদের পেছনে হাঁটছে; চোখ আশার খোলা চুলগুলোর দিকে। গায়ের কালো ডেনিম জ্যাকেটের পকেটে গুঁজে রেখেছে হাত। কখনো কি ভেবেছে ভালোবাসার এই স্থানে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে আসবে কোনো একদিন? অহীনের পকেটে থাকা ফোনটা বাজে। একটি মুহূর্তের জন্য চোখ সরিয়ে কল রিসিভ করে সে,
“হুম পাপি বলো।”
সৃজনের কণ্ঠ বিচলিত ও রুক্ষ শোনায়,
“তুমি নাকি চাকরি করতে চাও?”
অহীন আশার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ হাসে,
“হুম করতে চাই, বউয়ের আদেশ পাপি।”
সৃজন ঠোঁট টিপে হেসে দেয়, তবে তার পছন্দ হলো না ওদের বাচ্চামো সিদ্ধান্ত। সে বলল,
“বুঝলাম আশা ছোট, সে বোঝে না অহীন। তাই বলে তুমি? জেসি আমার একটা মাত্র মেয়ে, ছেলে তো তুমিই। তুমি অন্য কোথাও চাকরি করলে আমার কী হবে?”
অহীন হেসে উত্তর করে,
“আমি কি বলেছি অন্য কোথাও যাব? তোমার কাছেই আছি পাপি। কিন্তু আমাকে সব কর্মচারীদের মতো ট্রিট করো আর মাসিক একটা বেতন দিও তোমার ‘জ্যাক’-এর মতো। তার বাইরে আগের মতো হাত খুলে উড়াবো না।”
“এত কম টাকায় চলবে দুজনের? জ্যাক-এর স্যালারি তো তুমি জানোই কত।”
“আচ্ছা একটু বাড়িয়ে দিও। কিন্তু ওর প্রথম চাওয়াই তো এটা। ও চায় স্বামীর টাকায় চলতে।”
“ঠিক আছে বেশি সময় বাইরে থেকো না। খেয়ে নিও কিছু। সুগার ফল করো না আবার।”
কলটা কেটে সামনের দিকে তাকায় সে। অন্তিহা ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। আশা নেই। অহীন ভ্রু কুঁচকে ওদিকটায় গিয়ে জিজ্ঞেস করে তাকে,
“আশু কই?”
অন্তিহা নিজের ঠিক ডান দিকে একটি কফি শপের পাশে ইশারা করে। একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ। আশা মাথা নুইয়ে নরম অথচ গম্ভীর হয়ে আছে তার সামনে। অহীন অন্তুকে বলল,
“কখন এসেছে আয়াশ এখানে আর জানল কেমন করে আমরা এখানে?”
“এই তো সবে এসেই আশাকে টেনে নিয়ে গেল ওদিকটায়। যাবেন?”
“কথা বলুক।”
শান্ত গলায় কথাটা বলে অন্যদিকে ফিরে অহীন। এত অল্পতে ঝামেলা করলে হবে না। হতেও তো পারে আশা এমনি ওকে বোঝাতে গিয়েছে।
আয়াশের ঠোঁটে একটু তাচ্ছিল্যের হাসি। আশাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্ক্যান করছে। ভাবতেই কেমন লাগছে এই ছোট পুতুলের মতো মেয়েটা অন্যের অধীনে। আশার চোখ নত থাকলেও ঠোঁটে বিরক্তি ও গাম্ভীর্য। সে এবার বলল নিজেই আগে,
“আয়াশ, কিছু বলার না থাকলে প্লিজ আমি যাই। অহীন দেখলে মন খারাপ করবে।”
তার হাত ধরে টান দিয়ে গাড়ির সাথে চেপে ধরে আয়াশ। দাঁতে দাঁত পিসে ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,
“ইউ নো, আমি ৭টা বছর নিজেকে প্রিপেয়ার করেছি তোমার জন্য। এই মুহূর্তে তোমার হাত ধরে আছি আমি। আমার মন খারাপ হচ্ছে না শুধু, বুকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমাকে বলো, তাহলে আমার চিন্তা কেন তুমি করছ না? অহীনের চিন্তা করছ?”
আশা ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় নিজের থেকে এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল,
“কারণ অহীন আমার ফ্রেন্ড, আমার কাজিন অ্যান্ড লাস্টলি মাই হাসবেন্ড। হোয়াট আর ইউ টু মি?”
আয়াশ এগিয়ে যায় আশার মুখোমুখি, চোখে রাগের উল্কা ঝরছে। আশার চিবুক তুলে নিজের দিকে ধরে বলে,
“আই অ্যাম দ্য লাভ অফ ইওর লাইফ।”
আশার চোখগুলো হঠাৎ কেঁপে উঠল। একটু পিছিয়ে গিয়ে ঢোক গিলে নেয় সে। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি। আপনি মুভ অন করুন। আপনার নাম আছে, চেহারা আছে, গুণ আছে, টাকা সব আছে। মেয়ের কমতি কোথাও হবে না। আপনি যেটার ভয় পান, ওসিডি, তা নিয়েও হাজার মেয়ে আপনার হতে চায়। অহেতুক আমার পেছনে সময় কেন নষ্ট করছেন? কাউকে বেছে নিন। আমি ভালো আছি অহীনের সাথে। হি ইজ আ পারফেক্ট হাসবেন্ড।”
“ওকে ডান, আইসক্রিম খাবে?”
আয়াশের হঠাৎ সম্মতি অবাক করল আশাকে। সন্দিহান চোখে তাকিয়ে দেখে, লোকটার ঠোঁটে হাসি, হাত স্যানিটাইজ করছে তাকে ধরার পর। এত অল্পতে স্বীকারোক্তিটা দুশ্চিন্তায় ফেলছে আশাকে। আর সেদিন প্লেনের কাহিনিগুলো দেখার পর হঠাৎ এত ভালো? সে উত্তর দিল,
“না খাব না, অহীন হয়তো রেগে আছে।”
তিরতির করে কাঁপতে থাকা ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে তার আয়াশ। অতঃপর এই ঠান্ডার মাঝেও একটা দোকান থেকে আইসক্রিম কিনে দিচ্ছে তাকে। হাতে গ্লাভস পরে আশার দিকে আইসক্রিম এগিয়ে দিয়ে, মুখোমুখি ঝুঁকে গভীর গলায় বলল,
“ফ্রেন্ডস?”
আশা তখনও ভূত দেখার মতো তাকিয়ে আছে। আয়াশ ওর সন্দেহ বুঝতে পেরে দাঁত বের করে শব্দ করে হাসে, তারপর ব্যাকুল গলায় বলল,
“তোমাকে আমি আর বিরক্ত করব না। কিন্তু দূর থেকেও তোমাকে আর অন্তুকে হারাতে চাই না। তোমাকে হারিয়ে ফেলা মানে অন্তুও হারিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে তোমরা ছাড়া আমি কারো সাথে কথা বলি না। তাই এখন সম্পর্ক পাল্টাবে আমাদের। আমি অহীনের স্থান আর অহীন....।”
বলল না বাকি কথাটুকু। আশার হাতে আইসক্রিমটা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আশা মুচকি হেসে প্রস্থান করতে নিলেই হঠাৎ অহীন তার সামনে চলে আসে। আঁতকে ওঠে আশা। অহীন কথা বলল না, আশার হাতের দিকে তাকায়। মাথায় চুলের ভাঁজে হাত গুলিয়ে হাসির সাথে বলে,
“যাওয়া যাক?”
“হুম।”
আয়াশের সাথে কোনো রকম কথা না বলে অহীন আশার হাত ধরে সেখান থেকে চলে আসে। আয়াশ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আশা কতটা বাধ্য অহীনের এটাই লক্ষ্য করছে আয়াশ। সেদিন থেকে অহীনের হাত ধরে ধরে ঘুরছে। অহীনের একটি ডাকই যেন যথেষ্ট ছিল ওর জন্য। আয়াশ ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে গাড়িতে বসে স্টার্ট দেয়।
বেশ অনেক দূর যেতেই আশা অহীনের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। অন্তিহার হাতে আইসক্রিম দিয়ে সোজা হাঁটছে। এটা হয়তো অহীনের রাগ ওঠাল। সে এগিয়ে গিয়ে আশার বাহুতে ধরে টান দিয়ে নিজের দিকে ফেরায়। ক্রুদ্ধ গলায় বলে,
“এত সমস্যা হচ্ছে? এত দূরত্ব আমাদের মধ্যে? এসব কিছুর মাঝে ওর থেকে দূরে থাকলে কি আমাদের রিলেশনশিপে একটু পজিটিভ প্রভাব পড়ত না?”
আশা বিরক্তি নিয়ে ভ্রু ও মুখ কুঁচকে বলে,
“আমি যাইনি অহীন, আমাকে নেওয়া হয়েছে। আর সম্পর্ক? দূরত্বের কারণ আয়াশ না, আমি তোমাকে ভালোবাসি না দূরত্বের কারণ এটা। আর আমার মর্জির মালিক আমি নিজে। কথা বলতেই পারি যে কারো সাথে, এতে এমন কী? প্লিজ ডোন্ট অ্যাক্ট লাইক মাই গার্ডিয়ান!”
আশার কথার তীক্ষ্ণতা গিয়ে অহীনের গায়ে তিরের মতো বিঁধল। সে আশার হাতটা মুহূর্তে ছেড়ে দেয়। অন্তিহার দিকে তাকিয়ে হাঁটা শুরু করে। এসব এখন বিরক্ত লাগে। একদিকে আয়াশের অতিষ্ঠতা, অন্যদিকে আবার এর অধিকার আর অতিরিক্ত পজেসিভনেস। অন্তিহা ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইয়ার সাথে এমন করিস কেন আশু? তার গার্ডিয়ান হওয়ার অ্যাক্ট করতে হবে না, সে তোর গার্ডিয়ানই, হাসবেন্ড হয় তোর। বি ম্যাচিউর তুই, বাচ্চা না।”
অন্তিহার ফোনে কল আসে ঠিক সেই মুহূর্তে। সে কলটা রিসিভ করে একটু পিছিয়ে যায়। এবারও অহীন আবার এগিয়ে এল তার কাছে। হালকা ঠান্ডায় আশা নিজের দুই হাত আড়াআড়ি করে রেখেছে। অহীন তাকে বলল,
“গরম কিছু খাবি? ভালো লাগবে।”
আড়চোখে তার দিকে একপলক তাকায় আশা। অহীন পাল্টে যাচ্ছে। এত পাল্টাচ্ছে কেন? সে মাথা দুলিয়ে সম্মতি দেয় তাকে।
____
রাত গভীর হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসেছে তারা সবাই। ট্যাক্সির বিল পরিশোধ করে একই সাথে তিনজন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। দরজার সামনে এসে হাত দিয়ে দেখল অন্তিহা ওটা ভেতর থেকে লক করা। ভয় ও আতঙ্কিত হয়ে তাকায় অহীনের দিকে।
“ভেতর থেকে লক করা, কে হতে পারে?”
অহীন একটু বিচলিত হয়। এগিয়ে গিয়ে কলিং বেল চাপে। সেকেন্ড খানেক সময় নিয়ে দরজা খুলে যায়। দরজার ওপাশের মানুষটিকে দেখে চোখ তার কোটরে। দুই চোখের মাঝে হাত দিয়ে মাথা নুইয়ে আশার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
“এসেছে রিনা খানের মেয়ে।”
তারপর হেসে কিছু বলার আগেই আশা তাকে হাত দিয়ে সাইড করে তাকায় সামনে। শর্ট জিন্স, উরু উন্মুক্ত সম্পূর্ণ। গায়ে টিশার্ট, তাও আবার অহীনের। মেয়েটি শ্যামলা, মেকআপ করায় বেশ অসাধারণ স্মার্ট লাগছে। অহীন বলার আগেই মেয়েটি বলল,
“এত লেট করলে কেন প্রিন্স? আর এটা তোমার বোন। ওটা কে?”
আশা অহীনের দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু তুলে ইশারায় বাহ বাহ দিল। প্রিন্স? বাহ। দুই হাতে তালিও দিল একটু। অহীন বলল মেয়েটিকে মেকি হেসে,
“ক্লেরা কেমন আছ? আর হঠাৎ বাড়িতে আসলে যে?”
“কাম অন প্রিন্স, আই অ্যাম ইওর নেইবার। তোমার বাসায় নতুন আসি না আমি।”
ক্লেরার কথায় আশা আবার অহীনের দিকে তাকায়। অন্তিহা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। অহীন বলল,
“হ্যাঁ তা ঠিক, তোমার অ্যাপার্টমেন্ট তো পাশেই। বাট আমার এখানে কী করছ?”
আশা ক্লেরাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে নিলে মেয়েটা তার হাত ধরে আটকায়। অহীনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুমি তো বাসায় তেমন কাজ করো না জানি আমি, তাই একটু ক্লিনিং আর কুকিং করতে এসেছিলাম। এতদিন পর ভাবলাম তুমি, আমি আর অন্তু রাইট?”
অন্তিহার দিকে আঙুল তুলে প্রশ্নটা করল সে। মাথা দুলিয়ে নামের সঠিকতা বুঝতেই আবার বলল,
“হুম অন্তু, একসাথে ডিনার করব। বাট এটা কে?”
তার হাত থেকে নিজেকে আশা ছাড়িয়ে সোজা হয়ে মেকি হাসে। অতঃপর হাত ঝেড়ে বলল,
“আই অ্যাম দ্য কুইন অফ দিস প্রিন্স। আমার বাড়িতে এসে আমার পরিচয় চাওয়াটা কেমন শোনায়, তাই না?”
ক্লেরা অহীনের দিকে তাকায়। অহীন গলা খাঁকারি দিয়ে হিসহিস করে বলল,
“এটাই এটাই আমার পেঁচি, এখন আমার বউ।”
ক্লেরা হতবিহ্বল হয়ে পিছিয়ে যায় কয়েক পা। সে ড্যাবড্যাব করে আশা ও অহীনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে জেসি? আর কথা তো ছিল জেসি নয়তো আমি। তুমি পেঁচিকে কেন বিয়ে করবে?”
আশা ভেতরে প্রবেশ করে। টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখা, দুর্দান্ত গন্ধ ছড়িয়েছে পুরো কক্ষজুড়ে। সে কথা না বলেই রুমে চলে গেল। অহীন দরজার কাছে ঝোলানো একটা কাপড় দিয়ে ক্লেরার কোমর আড়াল করে দিয়ে বলল,
“যেভাবেই হোক বইন, আমার পেঁচি বড্ড বদমেজাজি। আমাকে বলা উচিত ছিল তোমার তুমি আসবে। একটু তো সুযোগ পেতাম মেয়েটাকে ধরার, তাও গেল আমার গোল্লায়।”
সে অহীনের দিকে তাকিয়ে কোমরের কাপড়টা সরিয়ে দিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে,
“মানে কী? আমি আগেও আসতাম, গল্প করতাম, তোমার বাসায় আড্ডা দিতাম। তখন...”
“তখন আমার বউ ছিল না। আর আমি কবে বললাম জেসি নয়তো তুমি? একটা কথায় ভালো মারা খাওয়ালে তুমি আমায়। ফুপি জানে এসেছ?”
“না।”
“আমরা খাবার খেয়ে এসেছি। তুমি খাবার নিয়ে বাসায় গিয়ে খেয়ে নিও কেমন?”
“তাড়িয়ে দিচ্ছ?”
অহীন একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
“প্লিজ ক্লেরা, ইট'স নট ফানি। ওর সাথে আমার ঠিক নেই কিছু। ভুল বুঝবে আমাকে।”
মন ছোট করে সে অহীনের দিকে তাকায়। অন্তিহার দিকেও তাকাল অল্প করে। অতঃপর মাথা ঝাঁকিয়ে বের হয়। পাশেই 344 নম্বর অ্যাপার্টমেন্টটাই তার। অন্তিহা বাসায় প্রবেশ করে সোজা বাথরুমে প্রবেশ করে। অহীন সোজা নিজের রুমে আলো জ্বলছে, আশা নেই। হয়তো বাথরুমে আছে। ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে হতাশার সাথে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
বেশ খানিকটা সময় পর আশা বের হয়ে আসে। অহীনের সামনে এসে বলে,
“সরো এখান থেকে।”
অহীন উঠে বসে আশার হাত ধরে,
“আশু সত্যি বলছি কেয়া ফুপির মেয়ে। আমাকে বলত খেয়াল রাখতে, ছোট বোনের নজরে দেখি। বিছানা থেকে নামাস না, ঘুমাতে পারি না আমি।”
“আমি উঠতে বলেছি তোমাকে।”
“আশু তুই জেলাস হোস না, তোর সাথে যায় নাকি ওদের? তুই বেস্ট।”
অহীনের দিকে তাকিয়ে আশা জোর গলায় বলে ওঠে,
“জেলাস? তুমি বাল ফালাও গিয়ে, আমি কেন জেলাস হব? তোমার নিচে আমার ইয়ে আছে ওটা নেওয়ার জন্য উঠতে বলছি। জাওরা!”
অহীন থতমত খেয়ে সরে যায় ওখান থেকে। বসে ছিল একটা ছোট কাপড়ের ওপর। এক হাত দিয়ে তুলে আশার দিকে ভ্রু কুঁচকে অবাক স্বরে বলে,
“এত ছোট যে চোখেই পড়ে না।”
আশা ওর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রাগ দেখায়। অহীন থতমত খেয়ে ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি ওগুলোর কথা বলি নি তো, সেই মাইন্ডে একদম বলি নি। আমি তোর এটার কথা বলেছি। খুব ছোট তাই ভুলে বসে পড়েছি।”
ওর হাত থেকে ছো মেরে নিয়ে নেয় আশা নিজের কাপড়টা। কে জানত এত তাড়াতাড়ি ক্লেরার সাথে কথা শেষ হবে এর! একটু ক্রুদ্ধ গলায় কিছু বলতে চেয়েও বলল না। সোজা বাথরুমে চলে গেল আবার। অহীন ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে নিজের হাতের দিকে আবার তাকায়। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বেশ হতাশ হয়ে বলল,
“বয়স তো কম না, তাহলে কেন এত ফ্ল্যাট? আরও আগে বিয়ে করলে অহীন তোর আজ এত হতাশ হতে হতো না।”
ধপ করে পিঠ বিছানায় ফেলে চেঁচিয়ে উঠল এবার সে,
“এজন্যই বলে লোকে... সময় থাকতে চাষ করো, নয়তো পরে আফসোস করে মরো। কে জানত জমি আর ফসল দুটোই আমার ঘরে আসবে। আহহহহ আফসোস!”
ভেতর থেকে শ্যাম্পুর একটা বোতল বাতাসের গতিতে এসে তার গায়ে পড়ে। অহীন আচমকা ক্যাচ করে নিল সেটা। আশা চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“কুত্তা, তুই আজ ড্রয়িং রুমে থাকবি!”
“আপন বউ হলে এই কথা বলতে পারতি? আমি এখানেই থাকব চাচাতো বউজান।”
“উষ্টা খাবি জাওরা।”
চলবে...