#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ২৮
ক্লেরা নামের মেয়েটা যেন এক মহান আপদের মতো হাজির হয়েছে অহীনের জীবনে এবার। আগে বন্ধুর মতো মিশলেও আজকাল যা করে মেয়েটা, ধেত! রাস্তা দিয়ে আশা ও অন্তিহা হাঁটছে, একজনের বাহু পেঁচিয়ে অপর জন। যেন কত আপন দুজন মানুষ। দুজনের হাতে এতগুলো ব্যাগ। রাস্তার মাঝেই আশার ফোনে কল আসে, সে অন্তিহার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে কলটা রিসিভ করল। অহীন কল দিয়েছে।
“হুম বলো।”
“কোথায় আছিস?”
আশা বেশ ভারী গলায় উত্তর করল তাকে,
“অন্তুুর সাথে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে এসেছিলাম। এখন বাড়ি ফিরছি।”
“সাবধানে যাস কেমন?”
আশা বিরক্তির ‘চ’ উচ্চারণ করে কলটা কেটে দিল। অন্তিহার হাত ধরেই হাঁটছে সে। মনে পড়ে হঠাৎ, ঘরের প্রয়োজনীয় একটি জিনিস নেওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছে। আর দোকান এখান থেকে প্রায় অনেক পেছনে। সে অন্তিহাকে বলল। শুনে অন্তিহা হতাশ হয়ে সুন্দর একটা পরামর্শ দেয় তাকে,
“শোন আমরা চাইলে ভাইয়ার ওখানে যেতে পারি, এখান থেকে কাছেই। আর সে আমাদের ট্যাক্সিও করে দেবে একটা।”
আশা নাখোশ হলো তার কথায়,
“থাক রাতে দেখা যাবে এখন চল বাসায়।”
অন্তিহা ফের জোর দিয়ে বলল,
“প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে রাখা ভালো, হঠাৎ প্রয়োজন হলে কি ক্লেরার কাছে যাবি?”
“কখনো না, চল নিয়েই আসি।”
এবার গন্তব্য হলো সৃজনের শপের দিকে। হেলেদুলে হেঁটে দুজন হাসতে হাসতে অনেক পথ আজ আসল। কিছু দূরেই দোকানটা দেখা যায়। ডিসকাউন্টের বড় ২০% এর বোর্ড লাগানো দেখা যাচ্ছে। হাতে বড় একটা বাক্স নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে অহীন। আশার আজ একটু মায়া হলো তার জন্য। হওয়ার কথা, তার জন্যই অহীন এতটা খাটছে আজ। মুখে এক পাহাড় প্রফুল্লতা নিয়ে এগিয়ে যায় তারা। ভেতরে প্রবেশ করার আগেই দেখা হয় সৃজনের সাথে, একটু চিন্তিত সে। অন্তিহাকে দেখে স্বস্তি নিয়ে বলল,
“বাহ! আমার ছোট শপটায় আজ দুটো চাঁদ দেখা যাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ এই বছরের পুরো লসগুলো আজ পুষে যাবে।”
দুজনই হালকা হেসে দেয় তার কথায়। আশা ভেতরে যেতেই অন্তিহাকে থামিয়ে দিল সৃজন এবং বিনয়ী হয়ে বলল,
“অন্তু শোনো।”
অন্তিহার সাথে আশাও থামে। সৃজন হেসে বলল,
“জেসি নাকি বড্ড কান্নাকাটি করছে, জানো তো মেয়েটা অনেক জ্বালায় আমাদের।”
“কী হয়েছে মামা সেটা বলুন আমায়?”
সৃজন বলল,
“ওর পড়ায় সমস্যা, আর বাড়িতে রেখেছি জোর করে তাই কান্নাকাটি করছে। তুমি ওর সিনিয়র, যদি বাসায় যেতে ভালো হতো।”
অন্তিহা ইতস্তত বোধের সাথে জবাব দেয়,
“মামা তাহলে আশু একা বাড়ি কেমন করে ফিরবে?”
“অহীন আছে তো, নিয়ে যাবে। তোমাকে ট্যাক্সি করে দেই?”
আশার চোখের দিকে তাকায় অন্তিহা। তার যাওয়ার ইচ্ছে আছে, কাউকে পড়ালে নিজের পড়ার চর্চা হয় ভালো। আশা বুঝতে পেরে বলল,
“তাহলে যা তুই, আমি অহীনের সাথেই ফিরব। অনেক দিন হয়েছে ওর সাথে ভালো করে কথা বলি না আমি।”
তার সম্মতি পেয়ে হাসে অন্তিহা। এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আশাকে আলতো করে,
“লাভ ইউ বোঝার জন্য জান। পড়ার চর্চা হয়ে যাবে আমার। ভাইয়াকে বলিস তাড়াতাড়ি তোকে নিয়ে ফিরতে।”
সৃজনের সাথে অন্তিহা চলে গেল। আশা ঘুরে কাঁচের গ্লাসের সামনে দাঁড়ায়। ফোস করে ঠোঁট গোল করে ভেতরে প্রবেশ করে সে। আশপাশে তাকায় সে ভালো করে। সামনেই ক্যাশ কাউন্টারের সামনে থেকে স্বল্প হাসির শব্দ আসছে ভেসে। ভেতরে প্রবেশ করতেই হাসি মুখটা মিলিয়ে গেল তার। ক্লেরা এখানে কী করছে ভাবতেই রাগ হচ্ছে খুব। তার ওপর অহীনের গায়ে হাত দিয়ে দিয়ে হাসছে বারবার, অহীনও কিছু বলছে না তাকে। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে। অহীন আশাকে দেখে যেন বাঘ দেখার মতো ভয় পেয়ে দাঁড়াল। এতে যে কারো মনে হবে প্রেম করছে তারা। আশার ঠোঁটে আবার হাসি ফুটল, সে হেসে বলল,
“আমার একটু প্রয়োজনীয় জিনিস লাগত তাই আসলাম।”
অহীন সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে চলে আসে ছুটে। ক্লেরা আশাকে দেখছে নিচে-ওপরে। আশার যে একটু কোথায় পুড়ছে বোঝার চেষ্টা করছে। অহীন তার হাতের সব গুলো ব্যাগ নিয়ে নেয় এবং অত্যন্ত চিন্তিত ভঙ্গিতে ধমকে বলে,
“পেঁচি, এত কিছু একা একা তুই মল থেকে নিয়ে এসেছিস? আমাকে বলতে পারতি, রাতে নিয়ে যেতাম। নিশ্চয়ই হাত ব্যথা করছে?”
আশা ক্লেরার দিকে অহংকারের সাথে তাকায়। হালকা হেসে ভ্রু কুঁচকে হঠাৎ হাত ঘষে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,
“অন্তু এসেছিল, কিন্তু হাতটা ব্যথা হচ্ছে। তুমি এগুলো নিয়ে যেও বাসায়।”
ব্যাগগুলো সাইডে রেখে আশার হাত ধরে অহীন। তালুটা লাল হয়ে গিয়েছে। একটি চেয়ার টেনে সে তাকে বসিয়ে দিয়ে ফ্রিজার থেকে বরফ নিয়ে আসে। পায়ের কাছে বসে অত্যন্ত যত্নের সাথে হাতে লাগিয়ে দিয়ে শাসাচ্ছে আশাকে অহীন,
“আমাকে কাজ দেখাতে হবে না তোর। এটা বাংলাদেশ না যে বউ কাজ না করলে লোকে পাঁচ কথা বলবে। এখানে আমি ছাড়া বলার কেউ নেই, তাই শান্ত থাকবি বুঝলি? কিছু লাগলে আমাকে বলবি। তোর করতে হবে না এসব কাজ। আমি আছি কি করতে?”
হঠাৎ আশার মুখের ভাব পরিবর্তন করে নেয়। অহীনের হাত ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। দোকানে কয়েকজন কাস্টমারের সামনেই চেঁচিয়ে ওঠে তার ওপর,
“বাড়িতে লেট করে ফেরার কারণ ভাবতাম কাজের অতিরিক্ত চাপ। আজ বুঝলাম কী এমন কাজ এখানে তোমার অহীন। এসব নাটক দেখাতে হবে না। আমার হাতে কিছু হয়নি। ওটা তো একজনকে বোঝাললাম তোমার কাছে আমি ঠিক কী! বউ হওয়ার আগেই হীরার মূল্যে ছিলাম। বউ হয়ে কতটা অমূল্য হয়েছি।”
নাহ, আশা একটা কথাও ব্যয় করল না আর। দোকান থেকে কাঁচের দরজাটা ঠেলে বের হয়ে গেল সে। পরনের অ্যাপ্রনটা কোনোমতে টেনেটুনে খুলে ক্লেরার দিকে একটিবারও না তাকিয়ে সোজা বেরিয়ে যায় সে দোকান থেকে। সৃজন ফিরছিল, তার থেকেও বিদায় নেয় সে। বড় বড় পা ফেলে হাঁটছে আশা। চিনচিনে শীতে শরীর একটু একটু কাঁপছে কেমন। অহীন কল দেয় ট্যাক্সির জন্য। এভাবে কিছু সময় পার হতেই ট্যাক্সি হাজির হয় সামনে। আশাকে গিয়ে ছুটে ধরে নেয় অহীন। হাতে হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের কাছে এনে বলল,
“আশু, ও আমার বন্ধুর মতো শুধু। দোকান থেকে কী যেন একটা নিতে এসেছে।”
ওর থেকে নিজেকে ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেয় সে, অতঃপর বলল,
“আমি কিছু বলিনি তোমায়। আগেও বলেছি, যা ইচ্ছে হয় করো।”
সামনে এগিয়ে যায় সে। অহীন গিয়ে ট্যাক্সিতে হাতের ব্যাগগুলো রাখে। আশার সামনে আয়াশের গাড়িটা এসে থামে। স্থির হলো আশার পা। অহীন ওখানে, এখানে আয়াশ। আয়াশ পেছনে তাকিয়ে অহীনকে দেখে নেয় একটু। অতঃপর ডেকে বলে আশাকে,
“আবার ঝামেলা?”
আশা এগিয়ে যায় তাকেও পিছু রেখে,
“কোনো কিছু না, এমনি।”
আয়াশ কী ছাড়ার ছেলে? ধীরে ধীরে গাড়িসহ পিছু নিচ্ছে তার। সে ফের ডাকে,
“এত দূরের পথ পুতুল, গাড়িতে ওঠো।”
আশা থেমে একবার পেছনে তাকায়। অহীন নেই, ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে আছে। ওখান থেকে মুখটা বের করতেই আশার সাথে চোখাচোখি হয় তার। তাকে তাকাতে দেখেই আশার রাগ যেন আরও তীব্র হলো। দিকবিদিক না দেখেই আয়াশের গাড়ির দরজা খুলে প্রবেশ করে সে। সে প্রবেশ করতেই পাশে বসা ছেলেটা মুচকি হাসে, এগিয়ে দেয় স্যানিটাইজার। পায়ের দিকে নজর দিয়েও চোখ সরাল জুতোর ময়লায়। ইটস ওকে, বাড়িতে গিয়ে গাড়ি ওয়াশ করে নিলেই হবে। তবুও পুতুলকে কিছু বলা যাবে না। গাড়িটি নিজ গতিতে এগোচ্ছে। এতে অহীনের মনঃক্ষুণ্ণ হলো বড্ড। ব্যথাতুর চোখে মলিন হেসে নিজেকেই নিজে বোঝায়,
“ইট’স ওকে, আশা রেগে আছে তাই গিয়েছে।”
আশা যে কতটা জেদি এটা অজানা নয় তার। ট্যাক্সিতে বসে সে ভাবল, মেয়েটার রাগ ভাঙাতে হবে। মনে ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে গেলেও এই মুহূর্তে আশার রাগ ভাঙানোটা প্রয়োজন বেশি। পরে না হয় শোধ সমেত উসুল করা হবে।
___
গাড়িতে বসে তো পড়ল আশা জেদ দেখিয়ে, তবে আয়াশের পাশে বসে অপ্রস্তুত অনুভব হচ্ছে। বাইরের লম্বা লম্বা গাছগুলো পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে তারা, এটাই দেখছে মন দিয়ে। আয়াশ প্রথমে নীরবতা ভেঙে বলল,
“ফ্রান্সে আসার পর আমার গাড়িতে প্রথম উঠলে তুমি। রোজ পাশে বসার কথা ছিল।”
আশা তার কথায় আড়চোখে একটু তাকায়। এসব কথাই এড়িয়ে চলতে চেয়েছে সে। আশা তার প্রশ্নটা এড়িয়ে বলল,
“এদিকে কোথায় যাচ্ছিলেন?”
“তোমার কাছেই।”
আয়াশের কথায় ফট করে চোখাচোখি হয় তাদের। অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে সে কিছু বলার আগেই আয়াশ হাসি দিয়ে বলল,
“মিস করছিলাম তোমাকে। ভাবলাম দেখা করা যাক। ভালো করিনি?”
একটা লোক এমন করে বলছে, তাকে মুখের ওপর কিছু বলা কেমন দেখায়! তাই সে নরম হয়ে হেসে বলল,
“হুম ভালো করেছেন। ফ্রেন্ডের বাসায় যাওয়াই যায়।”
দুজনই চুপ হয়ে গেল। বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দগুলো কানে লাগছে তাদের। আয়াশ নিজের গ্লাভস পরা হাতটার দিকে তাকায়। কোনো এক সময় এভাবেই বসে একটি গ্লাভসে দুজন হাত রেখে গাড়ি চালাত। সে বারবার তাকাচ্ছে আশার দিকে। গাড়িটা এসে অ্যাপার্টমেন্টের সামনে থামতেই আশা নেমে যায় এবং ধন্যবাদ দেয়,
“থ্যাঙ্ক ইউ। বাসায় আসুন?”
তার আহ্বানে ফিক করে হেসে দেয় আয়াশ,
“অহীনের বাসায় গেলে আমি শিওর অসুস্থ হয়ে যাব। তুমি অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছ? নাকি অহীন তোমার সাথে অ্যাডজাস্ট করেছে?”
গাড়ির জানালায় ঝুঁকে হাত রেখে আশা বলল,
“একটু আমি নিজের মতো করে গুছিয়েছি। একটু সে এলোমেলো করা থেকে বিরত থাকে। এই তো দুজন মিলেই অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছি।”
“হুম দুজনের সমান এফোর্ট প্রয়োজন হয়। যদি আমাকে দিতে একটু।”
কথার মোড় পাল্টাবে বুঝতে পেরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চলে যেতে নিলে আয়াশ পিছু ডাকে,
“পুতুল..”
থেমে পেছন ফিরে তাকায় সে। সেই ছোট থেকে এই নামটায় ডাকে তাকে আয়াশ। শুনতে কেমন বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়। তবুও নিজেকে অহীনের দিকে রাখার চেষ্টায় মগ্ন হয়ে আছে তার মন-মস্তিষ্ক।
“হুম?”
ব্যাক সিট থেকে ঝুঁকে একটা কটন ক্যান্ডি বের করে আশার দিকে এগিয়ে দেয়। ছোট মেঘের গোলাপি পুতুলের মতো কটন ক্যান্ডিটা। একটা নাক ও চোখও দেওয়া আছে। কত কিউট লাগছে। আয়াশ বলল,
“আসার সময় দেখলাম পথে বিক্রি করছে। মনে হলো এটা তোমার মতো কিউট। তাই পুতুলের জন্য মিষ্টি পুতুল।”
মন খারাপটা কেমন ঠান্ডা বাতাসের সাথে মিশে গেল শুকনো পাতাগুলোর সাথে। পেছনে অহীনের গাড়িটাও থেমেছে। কটন ক্যান্ডিটা নিজের হাতে নিয়ে হাসি দিয়ে বলল,
“রাস্তায় মানুষের সাথে কথা কে বলতে বলেছে এই ঠান্ডায়?”
“পুতুলটা আমায় ডাকছিল। ভাবলাম বাসায় গিয়ে তো এমনিতেও শাওয়ার নেব আমি, একটু ধরলে কিছু হবে না।”
“আচ্ছা বাই।”
“আমি আবার জ্বালাতে আসব।”
“আসতে হবে না। অহীন রাগ করবে।”
“ভয় পাও অহীনকে?”
“স্বামীকে ভয় পেতে হয়।”
__
অহীন গাড়ি থেকে নেমে আশাকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখে। প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে ওর পিছু ছুটে যায়। না, আয়াশের প্রতি তেমন খেয়াল তার নেই। সিঁড়ি দিয়ে আশার পিছু পিছু ডাকছে,
“পেঁচি, ওই স্যানিটাইজারের সাথে কেন আসলি তুই বেয়াদব? তোর জন্য আমি ট্যাক্সি নিলাম, দাম আছে কি আমার?”
আশাও কম কী! চেঁচাচ্ছে করিডোর জুড়ে,
“তুই ক্লেরার থেকে দাম কুড়া কুত্তা। এ জীবনে তোকে আমি দাম দেব না।”
“তোর হিংসে হয় তাই না?”
“বাল ফালা কুত্তা, তোকে নিয়ে হিংসে যেদিন হবে সেদিন নাক কেটে ফেলব।”
ওদের তর্কগুলো স্পষ্ট না হলেও চেঁচামেচির শব্দ নিচে গাড়ি পর্যন্ত ঠিক আসছে। যেন কোনো পুরোনো বিবাহিত দম্পতি ঝগড়া করছে। আয়াশের ঠোঁটের কোণে কিঞ্চিৎ হাসি রেখে গাড়ি স্টার্ট দেয় আবার।
____
বাসায় এসে নিজের রুমে চলে যায় আশা, পেছনে পেছনে অহীন। বিছানায় কটন ক্যান্ডিটা রেখে বাথরুমে যায় সে। অহীন সেখানেই বসে আস্তে করে। কটন ক্যান্ডিটা হাতে নিয়ে চোখ বুলায় সেটায়,
“হাহ.. আমি হলে প্যাঁচা বা সাপ দিতাম। এত কিউট এই পেঁচি কবে হলো? ছ্যাহ।”
আশা বাথরুম থেকে এসে অহীনের হাত থেকে ওটা কেড়ে নিয়ে ধমকে ওঠে,
“ধরবে না আমার জিনিস বাল।”
কথাটা বলেই সোজা গিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে। কিচেনেও নিয়ে গেল নিজের সাথে ওটা। কে জানে কেন এমন করছে আশা? ওর পিছু পিছু ঘুরছে ছেলেটা। কাজে সাহায্য করছে হাতে হাতে, তবুও আশার মুখ দিয়ে কথা বের করতে পারছে না।
“শোন না আশু, ওই মেয়েটাই এমন। ওর মামার দোকান ওটা, যখন-তখন আসে। আমি কী করব? কাজ ছেড়ে দেব?”
“যা মন চায় করো। এখন আমাকে আমার কাজ করতে দাও।”
আশুর হাতের ওপর হাত রেখে অহীন থামিয়ে দেয় তাকে। আশা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তার মুখের দিকে। অহীন কাতর গলায় বলল,
“আশু, ছেড়ে দেব ওখানকার কাজটা?”
তার কাতর মুখটার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইল আশা। অহীন কতটা পাল্টেছে ভাবছে, হিসেব মেলাতে পারছে না এই ছেলেটার ব্যবহারের সাথে সবটা। সে নিজের ভেতরের নরম হয়ে যাওয়া সত্তাটাকে আড়াল করে গম্ভীর গলায় বলল,
“কাজ না করলে খাব কী? আব্বুর থেকে চাইতে বুঝি আমার লজ্জা হবে না? তুমি যা মন চায় করো। রাতে কী খাবে?”
আশার অভিমান ভেঙেছে বুঝতে পেরে সে হাত ধরে টেনে কিচেন কাউন্টারের কোমরে ধরে তুলে বসিয়ে দেয় তাকে। এবার নিজের রাগ দেখানোর পালা। আশার কোমরে ধরে টেনে, ঠোঁটে হালকা চাপ দিয়ে, ঠোঁট কামড়ে হিসহিস করে বলল,
“আয়াশের সাথে আসলি কোন সাহসে?”
অহীনের হঠাৎ পাল্টি খাওয়া আশাকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করল খুব। চোখ বুজে নিল সে। অহীন আরও একটু কাছে গিয়ে বলল,
“খাবি এখন এটা?”
অহীনের বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে কটন ক্যান্ডিটা হাতে নিয়ে কাগজ খুলে মুখে পুরে নিয়ে বলল জেদ দেখিয়ে,
“খাবো, একশবার খাবো। তুমি আমাকে দুই পয়সার মূল্য দাও না। তাই বলে যে দেয় তাকে হেলাফেলা করব?”
“ঠিক, কারো দেওয়া জিনিস ফেলতে হয় না।”
আশার দিকে তাকিয়ে আশার হাতের মেঘের মতো নরম চিনির মিষ্টিটা এক থাবায় নষ্ট করে দিল অহীন। তার হঠাৎ এমন কাণ্ডে ভড়কে গিয়ে আশা চেঁচিয়ে বলার আগেই মুষ্টিবদ্ধ চিনির দলাগুলো গুঁজে দিল আশার মুখের ভেতর। চোখ বড় বড় করে তাকায় তার দিকে সে। শুধু এতেই থামল না ছেলেটা। মুখ থেকে চিবুক গলিয়ে নিচের দিকে গলায়ও লেপ্টে দিল আঠালো হাতটা।
“নে এবার খা কেমন? একটুও নষ্ট হয়নি।”
অহীনের বুকের কাছের কলার ধরে টান দিয়ে রক্তিম চোখে বলল আশা,
“কত বড় খারাপ তুমি? নিজে তো এনে দিলে না, এটাও নষ্ট করে দিলে। এবার তুই খা কুত্তা।”
আশা বাকিটুকু নিয়ে অহীনের মুখে থাপ্পড় দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই ওর হাত থামিয়ে দিল অহীন। পেছনে দেয়ালের সাথে হাতটা চেপে ধরে। গোলাপি রঙের কটন ক্যান্ডিগুলো লেপ্টে আছে আশার ঠোঁট ও গাল-গলা জুড়ে। সে আরও ঝুঁকে যায় তার দিকে, নিজেকে অহেতুক বৃথা সময় নষ্ট করতে দিল না। অধরের মাঝে ছেঁকে পড়ে তার নিজ খরখরে অধরগুলো। তীব্র থেকে তীব্রভাবে আশাকে চেপে ধরে আছে সে। তার হঠাৎ পদক্ষেপে স্তব্ধ হলো বেচারি আশার জেদি সতেজ মস্তিষ্ক। হাতগুলো বুকের কাছে গিয়ে জড়ো হয়ে আছে। তবে অহীন থামছে না। দীর্ঘ কয়েক বছর ভালোবাসার পর সে ভাবেনি এমন সময়ও জীবনে আসবে তার। আশাকে এত কাছে, এত গভীরভাবে পেয়ে নিজেকে পরিপূর্ণ লাগছে। এত মিষ্টতা ছিল এই ছোট চিনির পুতুলটাতে কে জানত? ধীরে ধীরে ঠোঁট ছেড়ে সরে এসে আশার নরম লালচে ওষ্ঠের দিকে তাকায়, যা কাঁপছে খুব ধীরে তিরতির করে। শক হয়ে আছে মেয়েটা। অহীন এই সুযোগটাও ছাড়তে চাইল না। পুনরায় চুম্বনের জন্য এগোতেই আশা হঠাৎ তার বুকে ধাক্কা দেয়। নিজ ঠোঁটে হাত দিয়ে বোধগম্য হয় তার। বিস্ময় ও লজ্জাগুলোকে অহীনের থেকে আড়াল করে কাঁপা কিন্তু ভড়কানো গলায় বলল,
“আমার পারমিশন ছাড়া আমার সাথে এটা করার সাহস কে দিয়েছে তোমাকে বেয়াদব?”
আশার কম্পিত অধরের দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে থেকে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে সে। প্রথম ছিল এসব তার। নিজের জেদ সেও খোয়াল না, একটু ভাবহীনতা দেখিয়ে বলল,
“আজব! তুই আমার বউ, আমার অধিকার আছে খাওয়ার তোরটা। আমি না হয় একটু…।”
আশার ঠোঁটে একটি আঙুল স্লাইড করে নেশালো গলায় বলল,
“অন্যভাবে খেলাম।”
অহীনের হাতটা সরিয়ে দিয়ে ভড়কানো গলায় ধমকে ওঠে আশা,
“এ-এক থাপ্পড় দেব। ফালতু ছেলে এসব কেমন ধরনের খাওয়া? বেহায়া..”
হাতটায় হালকা চোট পেল সে পাশে থাকা চুলার স্বল্প হিটে। কিঞ্চিৎ ‘উহ’ করে ওঠে তবে পাল্টা বলে আশাকে,
“আমার কী দোষ? আমার বয়স দেখেছিস? বয়সটাই এসব করার। সুযোগ পেলে ছাড়ব নাকি তোকে? করবই তো। এমন ভাবেই খাব।”
অহীনের এমন অবস্থাতেও হেয়ালি আর লজ্জাহীন কথা! হাতটা একটু লাল হয়ে গিয়েছে। সেদিকটায় খেয়াল না দিয়ে বড় বড় পা ফেলে শব্দ করে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে যায় আশা। সেদিকটায় তাকিয়ে নিজের ঠোঁটে তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চেপে ধরে ঘোর লাগা গলায় বিড়বিড় করে সে,
“কটন ক্যান্ডি এত মজা কবে থেকে হলো? আই নিড মোর।”
[ এখানের কিছু সিন গ্রুপে দেয়া হবে, জয়েন হয়ে পড়ে নেবেন। লিংক নিচে দেয়া হলো। জয়েন হয়ে থাকবেন, গ্রুপ প্রাইভেট করা হবে ২-৩ এর মধ্যে]
ছাড়া পেতেই কোনো প্রকার এদিক-সেদিক না তাকিয়ে সোফা থেকে উঠে দৌড়ে রুমে প্রবেশ করে। যাওয়ার সময় সুইচ বোর্ডে চাপ দিয়ে ফ্যান চালু করে দিল। দরজা বন্ধ করে হাঁসফাঁস করে বড় বড় করে শ্বাস নেয়। বুক ধুকপুক করছে, কী ছিল এসব? ঠোঁটে হাত দিয়ে শুকনো ঢোক গেলে। লজ্জা ও রাগে গালগুলো লাল হয়ে গিয়েছে। দরজার আড়াল থেকে একটু উঁকি দেয়, অহীন আসছে না তো আবার দেখার জন্য। আগের মতোই বসে আছে অহীন। চুলগুলো ঘামে ভেজা যেন সবে গোসল করে আসল। ভেজা চুল থেকে ঘাম ঝেড়ে বুকের বাম পাশটায় হাত ঘষে জোরে জোরে, অতঃপর শব্দ করে আশাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গেয়ে চলে,
“আমার মন মানে না…
যৌবন জ্বালা সহে না…
বউ আসে না গো কাছে….
কে আমায় ভালোবাসে….”
এতটুকু বলেই সোফায় কয়েকবার শরীর ঝাড়া দিয়ে কপাল ঠুকল নরম কুশনে। তার এমন অদ্ভুত কাজে দরজার আড়ালে বড্ড হাসি পেল, সাথে একটু মায়া। দরজা ভিড়িয়ে দেয় সে। আচ্ছা অহীন যদি জানে আশা শুধু বাঁচার জন্য মিথ্যা বলেছে! তাহলে কি রাগ করবে? দরজা থেকে আশা সরে যেতেই স্বাভাবিক হয়ে বসে অহীন। নিজের দিকে একটিবার তাকিয়ে কষ্ট ও হতাশার সাথে ঠোঁট কামড়ে ড্রয়িংরুমের বাথরুমে প্রবেশ করে।
অনেকটা সময় পর বের হয়ে আসে। কোমরে জড়ানো তোয়ালে নিয়েই রুমে প্রবেশ করে। স্বভাবগতভাবেই একটি কোণায় জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে আছে আশা। কাবার্ড থেকে ট্রাউজার বের করে পড়ে চুলগুলো মুছে আশার পাশে শুয়ে পড়ে আস্তে করে।
____
রাত গভীর হয়েছে, ঘরের আলো নেভানো। মাথার নিচে শক্ত কিছু অনুভব করে মিটমিট করে চোখ মেলে তাকায় আশা। চারপাশে তাকিয়ে অন্ধকারে কিছু দেখল না। হাত দিয়ে হাতড়ে বুঝতে পারল কোনো এক পুরুষের বুকে বেঘোরে ঘুমিয়ে ছিল এত রাত পর্যন্ত। পুরুষটা কে বুঝতেই থতমত খেয়ে উঠে বসে। তার তো হুটহাট কারো গায়ে চড়ার অভ্যাস নেই, তবে কেন আজ এমনটা হলো? বালিশের কাছে ফোনের স্ক্রিনটা অন করতেই অহীনের মুখটা দেখতে পায়। পাশেই হাত ছড়িয়ে বুক পেতে রেখেছে আশার জন্য। সে কিছু সময় ভেবে এদিক-সেদিক তাকায়। শরীর কাঁপছে ঘুমে, বেশি ভাবল না। আবারও অহীনের বুকে আস্তে করে শুয়ে পড়ে। বুকের ওপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে নেয় সে। গভীর ঘুমে আবারও তলিয়ে যায়। হাত দিয়ে আরও একটু নিজের বুকে টেনে নেয় আশাকে। অহীনের ঠোঁটেও তৃপ্তির হাসি দেখা যায়…
চলবে....