#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ২৯
সময়ের স্রোত দ্রুত আগায়, সন্ধ্যা নামলেই হালকা স্নোফলের দেখা মেলে বাহিরে। সকাল প্রায় ১০টা, পুরো রাতের বরফগুলো রোদের তীক্ষ্ণ ঝলকানিতে গলে গলে পড়ছে। সকাল সকাল উঠেই আশা ড্রয়িং রুমের সোফায় অহীনের একগাদা কাপড় দেখে সেগুলো কাচতে গিয়েছে। অন্তিহা গোসল করছে আর নিজের টুকিটাকি কাজ। সৃজন সেই কবে থেকে তাদেরকে বাড়িতে ডাকছে, সময়ের জন্য যাওয়া হয় কই? তাই তো আজকে যাবে তারা। এতগুলো দিন আশা অহীনকে নিজের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয়নি। কেনই বা দেবে? ক্লেরা বাড়িতে এসে প্রিন্সের নামের যা বয়ান দিয়ে যায়, এতেই মন ভরে যায় অর্ধেক। আর বাকি অর্ধেক মন তো বিষাদ মাখা আয়াশ ও তার মাঝে পিষে। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে অহীন। রুম থেকে সম্পূর্ণ রেডি হয়ে আশা বের হয়ে এসেছে। দেখল বেঘোরে ঘুমাচ্ছে এই খারাপ ছেলেটা। চোখ-মুখ উল্টে গিয়ে অহীনের পিঠে পা দিয়ে কয়েকবার ধাক্কা দিল সে। না, নড়ছে না একটুও। কাঁথা সরিয়ে দেওয়ার সাহস তার নেই। যা খবিশ এই ছেলে, না জানি কেমন অবস্থায় শুয়ে আছে! একটু মায়া হলো মনে ঝুঁকে গিয়ে উন্মুক্ত পিঠে হাত রেখে আস্তে করে ডাকে,
“অহীন ওঠো, যাবে না?”
কক্ষে কানে ফোন নিয়ে বসে আছে অন্তিহা। ঠোঁটে একটু হতাশা হলেও কণ্ঠে মিষ্টি হাসি, নরম গলায় সে বলে,
“আম্মু, আমার মনে হয় ওনাদের প্রাইভেসি দরকার। আর আমি হোস্টেলে থাকতে চাই প্লিজ।”
কুহু ওকে বোঝানোর জন্য বলল,
“তুমি ওখানে নতুন, হোস্টেলে থাকতে পারবে না।”
“আমার অনেক কয়টা ফ্রেন্ড হয়েছে, মানিয়ে নিতে পারব। এখানে ওদের জন্য পড়তে পারি না। তার ওপর আশা খিটখিটে একটু, ভাইয়াও কেমন যেন!”
“ওরা ঝগড়া করে?”
“হুম করে, বাট আশা সব বিষয়ে সিরিয়াস হয়ে থাকে। আমার মনে হয় ভাইয়ার সাথে একা থাকলে হয়ত বুঝবে ভাইয়া কি চায়। আমি আজ সৃজন মামার বাসায় থাকব আর…”
“আর?”
“দুই দিন পর হোস্টেল শিফট করব, আমি সব কথা বলে রেখেছি।”
অন্তিহার কথায় স্পষ্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। হয়ত সত্যি মেয়েটার পড়ার ক্ষতি হচ্ছে। হওয়ার কথা। একটা রুম মাত্র। কুহু অবশেষে রাজি হলো। এতে যেন স্বস্তি পেল মেয়েটা। এবার একটু এই কুকুর-বেড়ালের ঝামেলা মুক্ত হবে সে। কলটা রেখেই বের হয়ে দেখে অহীনকে জোরজবরদস্তি করে রেডি করাচ্ছে আশা। বেশ খানিকটা সময় বাদে একই সাথে বের হয় তারা তিনজন। যাওয়ার সময় ক্লেরার বাসাটা লক দেখে স্বস্তি পেল অহীন। নয়ত বের হওয়ার সময় রোজ প্যাঁচ লাগায় মেয়েটা। এর জন্য বউটার কাছে যেতে পারে না।
______
বিয়ের পর সৃজনের বাসায় খুব কমই আসা হয় অহীনের। আর এখানে আশার প্রথমই আসা হয়েছে। তাই তো জেইনের সমাদরের খামতি নেই কোথাও। তবে মিষ্টি হাসি আশার ঠোঁটে হলেও কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে বসে আছে অহীন ঠিক আশার ওড়না ধরে। চোখের কোণায় বসে থাকা ক্লেরার দিকে। ভুলেই গিয়েছিল সৃজনের বোনেরই তো মেয়ে এটা। জেইন আশার খাবার প্লেট এগিয়ে দিয়ে অহীনের দিকে তাকিয়ে দেখে ওড়নার কোনাটা আঙুলে পেঁচাচ্ছে। সে বলল,
“কী ব্যাপার? তোমার পাপি তো ঠিকই বলেছিল বউয়ের আঁচল ধরে থাকো!”
হতভম্ব আশা লজ্জায় টান দিয়ে ওড়না কেড়ে নিল তার থেকে। মেকি হাসে অহীন, ক্লেরার দিকে তাকিয়ে জেইনের দিকে তাকায় বলল হিসহিস করে,
“মাম্মাম, ওকে কাল আনলে হতো না?”
সে ওর কানের কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বলল,
“হতো, কিন্তু ও জেনেছে তোমরা আসবে তাই জেদ করেছিল।”
জেইন সোজা হতেই আবার সে আশার ওড়না ধরে নেয়। অবাক হয় আশা, এই ছেলেটাই তাকে পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল কিছু মাস আগে, আর এখন এত ভক্তি? হজম হচ্ছে না একদম। জেসি এসে আশার হাত ধরে টেনে নিয়ে নরম গলায় বলল,
“চলো তোমাকে দেখাই তোমার স্বামীর রুমটা।”
জেসির এত নরম বিনয়ী আচরণ আশা করেনি কখনো। তার হাত ধরে উঠে যেতেই অহীনও পিছু নেয় তাদের। তবে দরজা পর্যন্ত এসে ভেতরে প্রবেশ করতে দিল না জেসি তাকে, ‘খট’ করে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। সামান্য অপমানে অহীন চেঁচিয়ে ওঠে,
“জেসি কী হচ্ছে? আমার রুম এটা।”
“সো হোয়াট? আশা তোমার বউ, তার অধিকার আছে তোমার জিনিস দেখার, স্পর্শ করার।”
“নাউজুবিল্লাহ! এসব পার্সোনালি করব, তুমি বের হও। আমি দেখাই সাথে স্পর্শও করাব।”
আর কোনো কথা আসল না ভেতর থেকে। হতাশার সাথে গিয়ে সৃজনের কক্ষে প্রবেশ করে সে। সৃজন নেই, দোকানে আছে, কিছুক্ষণ পর আসবে। বিছানায় গা এলিয়ে দিল আলতো করে।
অহীনের এলোমেলো রুমটায় আশা প্রবেশ করেই নাক ছিটকায় একটু। পরিষ্কার হলেও একটা গন্ধ আছে এখানে। অন্তিহা বিছানায় বসে। জেসি জানালাটা খুলে দিয়ে দীর্ঘশ্বাসের সাথে নিজ থেকেই বলল,
“হাহা, অহীন এমনই, মাঝেমধ্যে এসে রুমটা নোংরা করে যায়। কথা আসি আমি,,আমার ড্যাড অহীনকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করেছে এখানে। যথেষ্ট পরিমাণ প্রাইভেসি, স্বাধীনতা, শাসন করেছে আমার মতোই বরং আমার চেয়ে বেশি ওকেই ভালোবাসে মনে হয়। হয়ত ভাববে কুহেলিকা আন্টির জন্য এমন। কিন্তু না, ড্যাড এমনি ওকে মায়া করে। জিজ্ঞেস করলে বলে তিনি নাকি ভুলতে পারে না, ছোট ছোট হাত গুলো কিভাবে তার আঙুল ধরেছিল। সে জীবনে প্রথম অহীনকে কোলে নিয়েছিল কি না। আমাকে অহীন কখনো চায়নি তেমন করে। যত্ন করেছে খুব। প্রিটেন্ড করেছে ভালোবাসে। কিন্তু মনে ছিলাম না কখনো তার। সেটা আমি কিছুদিন আগেই বুঝতে পারলাম। ভেবো না তুমি আমাদের নিয়ে, আমি আমার ড্যাডের মতো নিজের লাইফ শেষ করে মুভ অন করব না তা নয়, আমি মুভ অন করে নিয়েছি। এমন কারো সাথে থাকতে চাই না আমি। আমি এমন কারো সাথে থাকতে চাই যার জীবনে আমি প্রথম হব, এবং যার ভালোবাসা কোন খোলসে লুকানো থাকবে না।”
ওর কাছে গিয়ে হাতগুলো ধরে হাসি দিয়ে আশা বলল,
“এসব ভাবি না আমি। অনুভূতি বলে-কয়ে আসে না। আমাকে এক্সপ্লেইন করতে হবে না। আমি জানি সহজে ভোলা যায় না মনের মানুষটাকে, তোমরা হয়ত একে অপরের প্রতি দূর্বল তবুও সময় নাও। আমার সমস্যা নেই।”
“তুমি ভুল বুঝছ, আমি দূর্বল না, আমার মনে অহীন ন….”
বলার আগেই দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়। অন্তিহা গিয়ে দরজা খুলে দিল। জেইন হাসিমুখে রুমে প্রবেশ করে আশার দিকে এগিয়ে যায়। একটা ছোট বাক্স এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এটা নাও। আমরা তো জানতাম না অহীনের বউ হবে তুমি, তাই আগে থেকে দামি কিছুই দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ থেকে এসেই এটা বানালাম, কেমন হয়েছে বলো?”
প্রথমে একটু ইতস্তত বোধের মধ্যে পড়লেও অন্তিহার চোখের ইশারায় নিল বাক্সটা। নীল বাক্সটা খুলে নিজ থেকেই হাসল আশা। ঘড়িটা অসম্ভব সুন্দর। পাশের দুটো লাল রঙের পাথর বলে দিচ্ছে এটা বেশ দামি আর ডিজাইন বলছে অনেক শখের। জেইনের দিকে তাকিয়ে আশা বলল,
“এগুলোর প্রয়োজন ছিল না মাম্মাম।”
“কী বলো? তুমি আমাদের ছেলের একমাত্র বউ, এটা তো সামান্য। আমার তো ছেলে নেই অহীনই ছেলে। তুমি দুটো শাশুড়ি পাবে। আর জেসি ওকে নিয়ে মনখারাপ করো না। আমরা বুঝিয়ে দিয়েছি, অহীনের বোনের মতই থাকবে।”
অন্তিহাকেও দিল একটা বাক্স, ওটায় দুটো কানের টপস। বেশ দারুণ এটাও। প্রথমবার আদর করে দিয়েছে ভেবে নিল দুজনই। আশা দীর্ঘশ্বাসের সাথে হাতে ঘড়িটা পরে নেয় হাসিমুখে। অহীনকে দেখানো প্রয়োজন যতই হোক তার সুবাদেই পেয়েছে এত সুন্দর অমূল্য উপহারটা। হেসে সবার সামনে থেকে বের হয়। সৃজনের কক্ষের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় সে। হালকা হাতে ধাক্কা দিতেই হাসিমুখটা গম্ভীর হয়ে ওঠে মুহূর্তে। ক্লেরার সাথে বসে সাধ্যের আলাপ করছে অহীন। হাসি দেখে মনে হচ্ছে যেন ভালোবাসায় মাখামাখি অবস্থা। দীর্ঘ হতাশার শ্বাস নিয়ে সে সেখান থেকে চলে আসল। সৃজন এসেছে, আশা গিয়ে হাসিমুখে সালাম করে তাকে। সোফায় বসেই আড্ডা জমে তাদের।
___
কক্ষে ক্লেরা অহীনের ঠিক সামনে বসে ঠোঁটে হাসি রেখে একটু এগিয়ে যায়, হিসহিস করে বলে,
“লিসেন প্রিন্স, সে হয়ত তোমাকে পছন্দই করে না, বুঝলে? নয়ত এত দিন হয়ে যায় তবুও এমন মুখটা পেঁচার মতো করে রাখে কেন তোমাকে দেখলে?”
অহীন উঠে দাঁড়ায়, মুখে রুষ্টতা প্রকাশ করে বলল,
“ক্লেরা, ও এমনই সব সময়। নতুন নয়। আর পছন্দ করে না এটাও আমি জানি, তার মানে এই নয় যে আমি পছন্দ করানোর চেষ্টা করব না।”
“আর কত এভাবে চেষ্টা করবে? রোজ সকালে গেলেই যখন দেখি তুমি ড্রয়িং রুমে একা ঘুমাচ্ছ, তখন খুব খারাপ লাগে। তোমরা কি আদেও সুখে আছো? শোনো, যাকে তুমি ভালোবাসো তার চেয়ে যে তোমাকে ভালোবাসে, তাকে বেছে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
ক্লেরার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নেয় সে। ঠোঁটের কোণে আলতো হতাশা মিশ্রিত হাসি ফোটে তার,
“আমার বাসায় যাও আশু দরজা খোলে ভালো কথা, তবে আমাদের পার্সোনাল বিষয়গুলোর দিকে নজর রাখা এক প্রকার বেহায়াপনা। আর তুমি কি জানো বেহায়াপনা কাকে বলে?”
তার দিকে ক্লেরা তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। সে বাংলায় এতটাও কাঁচা নয় যে বুঝতে পারবে না এটার মানে তীব্র অপমান। ক্লেরা কিছু বলার আগেই অহীন ফের বলল,
“জানো তো ভালোবাসা বুদ্ধি দিয়ে হয় না, আবেগ দিয়ে হয়। আমি যাকে ভালোবাসি সে আমাকে ভালো রাখতে পারুক বা না পারুক, আমি জানি আমি পারব তাকে ভালো রাখতে। যার ভালোর জন্য আমি তাকে ছেড়ে দিতেও ভাবিনি একটিবার, তাকে পাওয়ার পর তাকে ভালো রাখার জন্য কী কী করতে পারি ভেবেছ?”
“শুধু নিজেই করে যাবে? সম্পর্কে দুই পক্ষের এফোর্ট প্রয়োজন। সেখানে তার পাশেও স্থান হয় না তোমার।”
“তার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসে আমি। পাশেও একদিন চলে যাব। তোমার ভাবতে হবে না, ওকে? কারো জীবনে দখলদারি করা ঠিক নয়।"
আর বাক্য ব্যয় করল না, রুম থেকে বের হয় সে। রুমে বসে আছে আশা, অন্তিহা। অন্তিহা যে সৃজনের প্রতি একটু আচরণটা অমলিন করত, আজ সে নরম আচরণ করছে। অহীন গিয়ে আশার পাশে বসতেই আশা গিয়ে সৃজনের অপর পাশে বসে। এতে মনটা ছোট হয় তার, তবুও কিছু বলল না। সৃজনের কোলে আলতো করে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে হাতে আঙুলফল নিয়ে খাচ্ছে। এরই মাঝে অন্তিহা বলে,
“ভাইয়া আমি আম্মুর সাথে কথা বলে নিয়েছি। ২ দিনের মধ্যে হোস্টেল শিফট করব।”
হতবিহ্বল হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে আশা,
“কীহ? মানে কী? আমি একা একা কেমন করে থাকব?”
“তোরা তো জানিস পড়া নিয়ে আমি হেঁয়ালি একদম পছন্দ করি না। আর সিঙ্গেল রুম আমার পড়ায় বড্ড সমস্যা হয়। তুই একা তো হবি না, ভাইয়া আছে।”
অহীন সৃজনের কোল থেকেই ওপরের দিকে চোখ উল্টে আশাকে দেখে নেয়। তার মানে একা পাবে এখন রোজ রাতে! মনে মনে আনন্দ হচ্ছে। চকলেটের মতো কোনো এক মিষ্টি গোল্লাগুলো ভেতরে মনে হচ্ছে মেল্ট হয়ে যাচ্ছে। তার দিকে আশা তাকাতেই চোখ ফেরায় সে। আশা বলতেই যাবে কিছু অমনি সৃজন বলল,
“ঠিক বলেছ। ওরা হয়ত বাসায় প্রচণ্ড চেঁচামেচি করে। তুমি আমার এখানে থাকতে পারো।”
অন্তিহা বলল,
“মামা আসলে আমি যেখানে থাকব আমার রুমমেট জেসিই, তাই সমস্যা হবে না।”
“ঠিক আছে, তবে আজ থেকে যাও?”
“ওকে।”
তার একবাক্যেই সম্মতিটা আশার মনটা ভেঙে চুরমার করে দিল। অহীনের প্রতি তো রাগ ছিলই, এখন ওর বোনটাও কেমন নিমকহারামি করল! টলটল চোখে তাকিয়ে আছে সে। অন্তিহাও কেমন পাল্টে যাচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। এখন কেমন তাকে ছাড়া থাকতে চায়।
_____
বাড়িতে এসে আধা ঘণ্টা কান্নাই করেছে আশা। তার কান্নার তোড় এত বেশি ছিল যে সে কিছু খাচ্ছে না পর্যন্ত। অহীনকে রুমেও ঢুকতে দেয়নি। একই তো ক্ষোভ ক্লেরার সাথে এত ফ্যাচফ্যাচ করে হাসার জন্য। আকাশে বিকেল গড়িয়েছে। অন্তিহা হোস্টেলে শিফট হয়েছে গত দিনই মাত্র। মনমরা হয়ে বিকেলে নিজের জন্য হালকা নাস্তা বানাচ্ছে আশা। অহীনের কাজের চাপ প্রচুর, রাত হয় ফিরতে। সৃজন তার ক্ষেত্রে যতই স্ট্রিক্ট হয়েছে, যেন বলতে পারবে একটা টাকাও পরিশ্রমের। রান্নায় মন দেওয়া অবস্থায় দরজায় কলিং বেল বাজে। আশা হাতের খুন্তি রেখে গিয়ে দরজা খুলে দিল। মিনি স্কার্টে দাঁড়িয়ে আছে ক্লেরা। পা ও শরীরের ভঙ্গি দেখে বিরক্তিতে চোখ উল্টায় সে। তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ক্লেরা। ড্রয়িং রুমে এখনো ছোট মেট্রেসটা বিছানো। অহীনের কাপড় দুটো পড়ে আছে একটি কোণায়। এবারও বুঝল অহীন এখনো এখানেই থাকে। একই সাথে বাহির থেকে গাড়ির হর্নের জোরে জোরে শব্দ আসছে কানে। প্রথমে ক্লেরা ও হর্নের শব্দটা এড়িয়ে গেলেও আর পারল না। জানালা দিয়ে বাহিরে উঁকি দেয় সে। সামনে বিশাল গাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে একনাগাড়ে হর্ন বাজানো মানুষটাকে দেখে বিস্ময়ের সাত আসমানে পাড়ি জমায় তার ছোট ছোট বিড়ালের মতো চোখগুলো। আয়াশ থামছে না একটি বারের জন্য ও। ক্লেরাকে রেখেই ছুটে নিচে নামতে হলো বাধ্য হয়ে তার। বিশাল গাড়িটির সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ। তাকে নামতে দেখে গাড়ি থেকে একটা গিফট বক্স বের করে। আশা নেমেই প্রথমে ভ্রু কুঁচকে নেয়। বলার আগেই দূর থেকে একটি অ্যাপার্টমেন্টের জানালা থেকে মহিলা কণ্ঠ আসে,
“যতসব পাগল-ছাগলের জন্য বাচ্চা ঘুম পাড়িয়েও শান্তি নেই।”
আয়াশ ভড়কে উত্তর দিতেই নেমে আশা তাকে থামিয়ে বেশ রাগ নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কী সমস্যা? যখন-তখন এসে পাগলামো করেন কেন? বন্ধুত্বের লিমিট ভুলে যাচ্ছেন বোধহয়।”
একেই ঢং করতে থাকা সতীন তুল্য ক্লেরা, আয়াশ ও আজকাল কম জ্বালায় না তাকে। বন্ধু বন্ধু বলে রোজ চলে আসে। তার এমন আচরণে আয়াশের হাসিমুখটা কঠিন হলো। সে বক্সটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“রিলাক্স, আইসক্রিম এনেছিলাম তোমার জন্য। আর কী হয়েছে তোমার?”
“যে বোঝে না তাকে বোঝানো যায়, কিন্তু আপনি তো বুঝদার অবুঝ আপনাকে কী করব আমি?”
“নিজের করে নাও?”
তার কথায় আশা দুই দিকে মাথা নাড়ায়। হতাশার সাথে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে ওঠে,
“আমি সত্যি কষ্ট দিতে চাইনি আপনাকে, তাই বন্ধুর মতো আচরণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে একটা ছেলে আর একটা মেয়ের মধ্যে রিলেশনশিপ থাকার পর দ্বিতীয়বার বন্ধু হয়ে থাকা যায় না।”
আয়াশ এগিয়ে যায় আশার কাছে। হাত ধরে ছলছল চোখে বলে,
“ভালোবাসো তুমি আমায় বন্ধু প্রেম সব আমি তোমার। তাই না? তাহলে কেন এমন করছ?”
হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় স্থিরভাবে দাঁত পিষে বলে,
“দেখুন আয়াশ, আমি বুঝি অনুভূতি ছেলেখেলা নয়। আমি আপনার অনুভূতির সম্মান করি কিন্তু এই মুহূর্তে আমি বিবাহিত, বোঝার চেষ্টা করুন। একদিন দুইদিন তারপর কোনো এক সময় অহীনের কাছেও এটা দৃষ্টিকটু লাগবে। ভালো থাকতে দিন আমায়, এক পা এগোতে দিন ওই মানুষটার দিকে যে আমার জন্য দুই পা এগিয়ে এসেছে।”
“বেশির চেয়ে বেশি কী হবে? মনকষাকষি, তারপর ছেড়ে দেবে তোমায়? আমি হয়ত এটাই দোয়া করি। নাকি ভালোবাস অহীনকে?”
আয়াশের প্রশ্নে থ হয়ে গেল তার মুখ। কঠিন সত্য হারিয়ে ঠোঁটে একটু হাসে আশা। সে অতঃপর বুক ফুলিয়ে নিজের অনুভূতির স্বীকারোক্তি দিল,
“ দয়া করে অহীনের সাথে বিচ্ছেদ অভিশাপ দেবেন না। না, আমি বাসি না অহীনকে ভালো। কিন্তু আমি ছাড়তেও চাই না অহীনকে। সে এমন একজন মানুষ যে পাল্টে যাচ্ছে আমার জন্য। যাকে আমি এখন বুঝতে পারি না, বুঝতে চাই। আয়াশ, ভালোবাসি না আমি অহীনকে তবুও আমার কাছে আসলে ‘না’ করতে পারি না। ভালোবাসি না আমি অহীনকে তবুও হাসি দিয়ে কথা বললে উত্তর না দিয়ে পারি না। যেই ছেলেটার সাথে আমি ঝগড়া করে কাটালাম পুরোটা জীবন তাকে ভালোবাসি না, আর না কখনো বাসতে চাই। যার কারণে এড়িয়ে চলি তবুও এড়াতে পারি না। ও অন্য রকম একদম।"
আশার চোখগুলো ভেজা। এমন নয় সে অহীনের যত্নগুলো এতটাও অদেখা করে। কিন্তু সত্যিই তো যাকে কখনো স্বামীর স্থানে ভাবেনি সে হঠাৎ এতটা গুরুত্বপূর্ণ হলে তো ভাবতে হয়, তাই না? আয়াশ বলল,
“তার মানে ভালোবাসছ একটু করে?”
আশা ভেজা ঢোক গিলে নিয়ে বলল,
“আপনার মনে আছে? আমি আর অহীন সারাক্ষণ তর্ক করতাম? কিন্তু এখন! আমার কথা গুলিয়ে যায় অহীন সামনে আসলে। মনে হয় এমন একজনকে ছাড়ার কথা কি কল্পনায়ও কখনো আসে? বিশ্বাস করুন একটুও ভালোবাসি না আমি তাকে। তবুও আমি ছাড়তে পারব না।”
কাতর নরম কণ্ঠটা ছুরির চেয়ে ধারালো লাগছে। কান্নাগুলো আশার অশ্রু রুমে বিষের চেয়ে কম লাগছে না আজ। আয়াশ এক পলক কিছু সময় তাকিয়ে থেকে হঠাৎ হ্যাঁচকা টানে নিজের বুকে এনে ফেলে আশাকে। পরিস্থিতি সামলানোর আগেই আয়াশ প্রশ্ন করে তাকে,
“আমাকে ভালোবাসো তো?”
এটা হয়ত আয়াশের প্রথম এমন গভীর স্পর্শ আশাকে দেওয়া, যেটা না আশা কখনো ভেবেছে হবে। আর না দূরে দাঁড়িয়ে তাঁদের তখন থেকে দেখতে থাকা অহীন! চোখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তার। দূর থেকে কথা বলা পর্যন্ত ঠিক ছিল, তবে জড়িয়ে ধরাটা নিতে পারছে না। সে শুধু রক্তচক্ষুগুলো বুজে সিঁড়ি দিয়ে সোজা উঠে যায় নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে। হঠাৎই আশা আয়াশকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় এবং প্রচণ্ড রাগের সাথে সজোরে থাপ্পড় দিল তার গালে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“সাহস দিয়েছি মানে এই নয় আমাকে টাচ করবেন! শুধু অহীনের অধিকার আমার ওপর ততদিন যতদিন তার নামে কবুল বরাদ্দ। ”
“ভালোবাসো তুমি আমায়, অহীনকে না।”
দাঁতে দাঁত পিষে আয়াশও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করে তাকে গালে হাত দিয়ে রক্তিম চোখে তাকিয়ে আছে। আশা বলল,
“হ্যাঁ, আমি এখন অহীনকে ভালোবাসি না তাই বলছি ভালোবাসি না। কিন্তু যেদিন বাসব সেদিনও ঠিকই বলব ভালোবাসি আমি। তবে আজকে আমি আপনাকে ঘৃণা করি।”
বুকের ঠিক মাঝে কেউ যেন ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করে কয়েক টুকরো করে দিল একবারে। আয়াশ পিছিয়ে গিয়ে ব্যথাতুর গলায় বলে,
“দ্বিতীয়বার পারবে ভালোবাসতে? অন্যজনকে বুক কাপেনি কথাটা বলতে?”
তার প্রশ্নে কিঞ্চিৎ হাসে আশা, অতঃপর বলে,
“ একটুও কাপেনি, কারন আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসতে চাই। অনেকেই পারে আমিও পারব। অন্তত ভালোবাসার চেষ্টা করব। আপনিও ট্রাই করুন। কেননা আমি ফিরব না আপনার কাছে। আজকে এই বেয়াদবির পর আপনাকে দেখতেও চাই না।"
“আজ আমাকে তুমি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছ?”
উত্তর দিল না আশা তাকে। চোখের ইশারায় মাথা দুলিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে দিল হ্যাঁ সে করছে এবং সরাসরি আয়াশকে নিজের জীবন থেকে বের করছে সে। পেছন ফিরে সিঁড়িতে পা রেখে ওঠে সে। তার উত্তরটা যেন একজনের মস্তিষ্কের পোকাগুলো নাড়িয়ে দিয়েছে সেই খেয়াল কি আছে? আয়াশ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারাল। একটি কোণায় কাঠের লম্বা একটা লাঠি নিয়ে নিজের গাড়ির ওপর আঘাত করে। নিমিষেই ঝনঝন করে কাঁচের টুকরোগুলো চারপাশে ছিটকে পড়ে। সিঁড়িতে পা থামে আশার। কিছু মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে পেছন না তাকিয়ে সোজা অ্যাপার্টমেন্টের দরজার সামনে চলে গেল সে। পেছন থেকে চিৎকারের শব্দ,
"ফাক ইউ চিটার! তুমি বলেছিলে আমাকে বিট্রে করবে না, কিন্তু তুমি সেটাই করলে। ইউ বিট্রেড মি, স্টুপিড লেডি!”
না, তবুও থামল না আশা। এই মুহূর্তে তাকে থামাতে যাওয়ার মানে শক্ত হয়ে বলা প্রতিটি কথা ফিরিয়ে নিয়ে সব মিথ্যা প্রমাণ করা আর সে আয়াশকে চায় এটা বোঝানো। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে দরজা ধাক্কা দিয়ে প্রবেশ করে সে। ভেতরে ক্লেরাকে না দেখে রুমের দিকে যায় দরজার ভেড়ান। ধাক্কা দেয় সে, তবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সেটাই চোখে পড়ে যা তার দেখা একদমই উচিত হয়নি। ক্লেরার টপসের ওপরের প্রায় তিনটা বোতাম খোলা, সোফায় আধশোয়া হয়ে আছে। অহীনেরও শার্টের নিচের মাত্র দুটো বোতাম লক বাকি বুক সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। ঝুঁকে আছে প্রায় অর্ধনগ্ন মেয়েটির ওপর। আশার তৎক্ষণাৎ চোখগুলো জলে ভরে ওঠে। রাগে গা ঘিনঘিন করছে। দরজার শব্দে অহীন ক্লেরার চোয়াল ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার চোখেও রাগ স্পষ্ট। তবে আশার চোখের রাগের দিকে তাকাতেই মিশে গেল কুঁচকানো কপালটা। একটু ভয় সংকোচ নিয়ে এগোতেই তাকে পাশ কাটিয়ে আশা ফ্লোরে আস্তে আস্তে পা ফেলে ক্লেরার দিকে আগায়। নিচে আয়াশের সাথে রাগ ও এখানে এসব দেখে যেনো মাথা আউলে গেল তার। অহীন তাকে বলতে চায় কিছু..
“আশু ভুল বুঝিস না!”
ব্যস এতটুকুই হয়ত মুখ দিয়ে আওড়ানোর সময় পেল সে। আশা ঝুঁকে এক থাবায় মুঠোয় নেয় ক্লেরার ছোট ছোট ঘাড় অব্দি চুলগুলো, সাথে রাগী গলায় দাঁত পিষে বলে,
“মাগি, তোকে বাড়িতে ঢুকতে দেই মানে এই না কুকুরের মতো যেখানে-সেখানে তুই মুখ দিবি। জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব বেশ্যা।”
ক্লেরাও কম যায় কই? মাথার ব্যথায় আকুতি ভরা চোখে অহীনের দিকে তাকায়। অহীন আগাবে কী? তার মুখ তো বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেই কখন! তবুও আগাতে নিলে আশার রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে যায়। আশা ক্লেরাকে চুলে ধরেই অপর হাতে সপাটে এক চড় দিয়ে সোফায় ফেলে দেয়। আবার চেঁচিয়ে ওঠে,
“জানিস আমাদের ওখানে এসব মেয়েদের কী বলে, যারা অন্যের স্বামীর গায়ে পড়া স্বভাবের হয়? নটি, স্লাট, বেশ্যা বলে! প্রস্টিটিউটও তোর থেকে বেশি পবিত্র, খান** বাচ্চি।”
ক্লেরা ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় এবং আশার দিকে তেড়ে উঠে বলে,
“ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট। তুই পারিস না তাই আমি এসেছি। নিচে তুইও তো প্রেমিকের বুকেই ছিলি তাই না? তোকেও কি তবে প্রসটিটিউট বলা যায়?”
আশা ফের থাপ্পড় দিল ওর গালে,
“তোর জবান ছিলে রাস্তার কুকুরকে খাওয়াব, আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকে এসব বলার স্পর্ধা দেখাস?”
অতঃপর হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে দরজার বাহিরে ধাক্কা দিয়ে বের করে। ধাক্কাটা জোরেই ছিল, এতটা যে ক্লেরা ছিটকে রেলিংসের সাথে হঠাৎ ধাক্কা খায়। আশা তার দিকে আঙুল তাক করে বলে,
“নেক্সট টাইম যদি আমার অ্যাপার্টমেন্টের আশেপাশে দেখি, তোর ওই সুন্দর শরীরের কিমা করে জুস বানিয়ে আমার ঘরের কুত্তাকে খাওয়াব বেশ্যা।”
মুখের ওপর ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিল আশা তার। হাঁসফাঁস করছে রাগে। অহীন তখনো খোলা বুকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আশা তাকে অদেখা করে এগিয়ে যায় রুমের দিকে। তার পিছু পিছু অহীন অনুশোচিত গলায় বারবার বলছে,
“আশু শোন আমার কথা, ওকে এমন করে বলার প্রয়োজন ছিল না। আর হলো ওর এসব করা, আমরা না হয় অ্যাপার্টমেন্ট পাল্টে নেব। কিন্তু ভুল…”
বলে শেষ করতে পারল না অহীন। নরম হাতের শক্ত ক্ষোভ মিশ্রিত থাপ্পড় আছড়ে পড়ল তার গালে। চেঁচিয়ে ওঠে,
“দূরে থাকো আমার থেকে, একদম একদম ছোঁবে না আমায়। ওকে আমি কিছু বলিনি এখনো। বললে ওর মতো ছিনাল আমার মুখের ওপর কথা বলার সাহস পেত না।”
থাপ্পড়ে একদিকে নুইয়ে গেল অহীন। কিঞ্চিৎ রাগ হলেও চোখ বুজে সবটা রাগ গিলে আবার সোজা হয়ে আশাকে বলতে চায় ব্যাকুল হয়ে,
“আশু ছোঁব না বাট আমার কথা..”
আবার একইভাবে আশা তার অপর গালে থাপ্পড় দিল সজোরে,
“কিছু শুনতে চাই না ওই নোংরা মুখ থেকে আমি।”
অপর দিকে আবার নুইয়ে গেল। হাত মুষ্টি করে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলতে চায় আবার কিছু। তবে ঠোঁট ফাঁক করার আগেই আশার হাত ফের ওর গায়ে ওঠার জন্য ফণা তোলে। অহীন কথা থামিয়ে খপ করে ওর হাতটা ধরে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
“চুপ চুপ চুপ! আমার বাপ আজ পর্যন্ত আমার গায়ে হাত তোলেনি। তোকে কিছু বলছি না মানে বারবার একই কাজ করবি না।”
রাগে দাঁতে দাঁত পিষে উত্তর দিল আশা,
“তোমার বাপ জানে না তার ছেলে প্রসটিটিউট নিয়ে ঘুমায়। আমি তো থাপ্পড় দিয়েছি সে জুতো দিত গালে।”
সব ঠিক হলেও এসব কথা কি একটা পুরুষের জন্য কম অপমানের? যেখানে সে নিজে এত কিছু দেখার পরেও চোখ বুজে এই মেয়েকে বিশ্বাস করে, কিন্তু এই মেয়ে তাকে গুরুত্বই দেয় না। অপমানের তীরটা ঠিক জায়গাতেই লেগেছে। সে আশার চোয়াল খামচে ধরে,
“আর না, আর একটা কথা বললে মাটিতে গেঁড়ে ফেলব তোকে আমি।”
তাচ্ছিল্য করে হাসে আশা। অহীনের হাতটা চোয়াল থেকে সরিয়ে ভাঙা গলায় বলে,
“চরিত্রে সমস্যা আছে তোমার, ক্লেরার সাথে এসব করতে বাধল না?”
অহীনের হাত একটু হালকা হয়ে আসে। তবে পর মুহূর্তে আয়াশের সাথে আশার জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটা চোখে ভাসে। সে দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
“তুই কাছে না আসলে তো বাধবে না এটা স্বাভাবিক। কেন আমাকে আমার অধিকার বুঝিয়ে দিচ্ছিস না?”
অহীনের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হুঙ্কার ছাড়ে আশা,
“লজ্জা হচ্ছে না তোমার তাই না? দৈহিক চাহিদার জন্য এত নোংরা হবে?”
আশার গলার স্বর বাড়তেই অহীনের মস্তিষ্কের পোকাগুলো নড়ে উঠল। রক্তগরম, মাথার রগগুলো ফুলে ফেটে যাওয়ার মতো। এগিয়ে গিয়ে আশার গলায় জোরে চেপে ধরে দেয়ালের সাথে। গর্জে ওঠে তার গলাও এবার,
“হ্যাঁ হলাম নোংরা, তাহলে আজ আমার অধিকার বুঝিয়ে দে। আমাকে এসব নোংরা পথ থেকে ফেরানো তো তোর দায়িত্ব ফিরিয়ে আন আমায়।”
আশার গলায় চাপ রেখেই অন্য হাতে চুলগুলো মুঠোয় নিয়ে নিজের মুখের নিকট নিয়ে আসে। আশার কষ্টে দম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখগুলো লাল হয়ে গালগুলোও রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। অহীন বলল,
“এত দূর বুঝিস এটাও নিশ্চয়ই বুঝিস কেন ক্লেরার এত কাছে ছিলাম? কারণ তুই তোর কাছে আসতে দিস না আমায়। তোর কাছে যাওয়ার অধিকার আমার নেই স্বামী হয়ে। নিজ থেকে একটিবার জড়িয়ে পর্যন্ত ধরিসনি তুই আমায়। একটা বার আমি এসব নিয়ে কোনো রকম অভিযোগ তুলিনি, আর অভিযোগ না তোলার প্রতিফল এটা যে তোর মনে হচ্ছে তুই কাছে আসতে দিস না বলে আমি পরকীয়া করছি। কিন্তু আজ আমি চাই তোকে। অভিযোগ করছি আমার অধিকার না দেওয়ার। ফেরা আমাকে পরনারীর সংস্পর্শ থেকে।”
দম প্রায় চলে যাবে আশার। চোখগুলো উল্টে আছে। গলায় চাপ হালকা হতেই একটু সুযোগ পায় শ্বাস নেওয়ার। সে আবারও জেদ প্রকাশ করে বলে,
“মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে তোমার। অভদ্রতা তোমার চরিত্রকে নোংরা করে দিয়েছে। ঘৃণা হচ্ছে আমার। মানুষ তো এমন নোংরামি ঢেকে রাখে, তোমার লজ্জা কতটা তলানিতে নামলে তুমি স্বীকার করছ এসব? ছাড় আমায়।”
তার কথায় তাচ্ছিল্যে হাসে অহীন। গলায় আবার চাপ দেয়। ধীরে ধীরে রাগের জন্য তাচ্ছিল্যটা পৈশাচিক হাসিতে পরিণত হচ্ছে। এবার ভয় হচ্ছে আশার। কলিজা কাঁপছে ওই ফর্সা মুখের ভয়ংকর হাসিটা দেখে। তাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে অহীন পৈশাচিক হাসিতে বলতে থাকে,
“আজ এই মুহূর্তে আমি আমার অধিকার চাই। চরিত্রে তো নোংরা লেগেই গেল, আর একটু না হয় আমি নিজেই লাগালাম। তোরও অধিকার আছে দেখার আমি কতটা নোংরা চরিত্রহীন পুরুষ!”
গলা সম্পূর্ণ মুক্ত হতেই আশা গলায় হাত দিয়ে কাশতে লাগে। ছোট একটা পাখিকে গলায় হালকা চেপে ধরে আবার আকাশে মুক্ত করে দিলে যেমন চাতকের মতো ছটফট করবে তেমনটাই আশা করছে এখন। তবে অহীনের কথা কর্ণে যেতেই গলা থেকে হাত সরিয়ে বিছানায় পিছিয়ে যায়,
“কী... কী করতে চাও?”
বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে হঠাৎ। নড়ে ওঠে বিছানার কুশনগুলো। আশা কেঁপে ওঠে। অহীন বলল,
“অধিকার চাই।”
পিছিয়ে যাচ্ছে আশা। ঘৃণা হচ্ছে অহীনের ওপর তাহলে কেমন করে নিজেকে সমর্পণ করবে তার কাছে? সে বিছানায় পিছিয়ে যেতে যেতে বলে,
“কোনো চরিত্রহীন সঙ্গীর চেয়ে নিঃসঙ্গ থাকা ভালো। দূরে থাকো আমার থেকে।”
আশার পা ধরে নিজের দিকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিয়ে আসে। কোমরে পেঁচানো শক্ত বেল্ট খুলতে থাকে। আশা পা দিয়ে লাথি দিচ্ছে তাকে। তবুও পারছে না অহীনের সাথে। বেল্ট দিয়ে আশার হাত বিছানার সাথে বেঁধে দেয়। ঝুঁকে আশার গালে শক্ত হাতে চাপ দিয়ে মেজাজ চড়াও করে হিসহিস করে বলল,
“আজ তাহলে এই চরিত্রহীন মানুষটার কাছেই নিজের চরিত্র বিসর্জন দিবি।”
“আমার সম্মতি ছাড়া করতে পারো না আমার সাথে এমন তুমি!”
“চরিত্রহীন পুরুষগুলো সব পারে। জানিস না?”
[এখানের কিছু সিন প্রাইভেট গ্রুপে দেয়া হয়েছে...
লিংক দেয়া হলো....
https://www.facebook.com/share/p/1Lc4Fz5FAE/ ]
রাতের মধ্যপ্রহর চলছে, ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে ঘুরছে রাত ২টার কাঁটায়। বিছানায় নিথর আশা বুক পর্যন্ত কম্ফোর্টার দিয়ে ঢেকে রেখেছে। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখের পলক পড়ছে না একটিবারও। শুধু কার্নিশ দিয়ে পানিগুলো ছলছল করে পড়ছে, কান্নায় শব্দ নেই। হয়ত গলা দিয়ে স্বর আজ বের হচ্ছে না। বিছানা এলোমেলো হয়ে আছে, চারপাশে পড়ে আছে কাপড়গুলো। একটু আগের কথা মনে পড়তেই শব্দ করে কান্না চলে আসে তার কণ্ঠ থেকে। তবে অবাক করে কানে আসছে না এই কান্নার শব্দ! আসলে কানে সমস্যা আশার নাকি কণ্ঠই থেমে গিয়েছে? চিৎকার করে এত কান্না করছে তবুও কেন নিজেকে নিজে শুনতে পারছে না? বিছানায় একটি কোণায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে অহীন, থরথর করে কাঁপছে সে নিজেও। হাতের আঙুল মুখে দিয়ে দাঁতে নখ কামড়াচ্ছে সে। নিজের রাগের ওপর নিজেরই কেমন ঘৃণা হচ্ছে।
আশার সাথে এটা কী করল, ভাবতেই মাথা ভারি হয়ে যাচ্ছে। সব ভাবনা বাদ দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পাশে থাকা কাঁচের গ্লাসটা ক্ষোভের সাথে ফেলে দিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করে। কাঁচের ঝনঝন শব্দে কেঁপে ওঠে কম্ফোর্টে আবৃত আশার ছোট দেহটা। বাথরুমে দরজা বন্ধ করার ঠাস শব্দে আবার কাঁপে তার শরীর। আয়নার সামনে গিয়ে বেসিন থেকে অনবরত মুখে পানি দিচ্ছে রক্তচক্ষু আয়নায় দেখামাত্র নিজেই আঁতকে উঠল অহীন। কী ভয়ংকর এই চোখজোড়া আজ! নিজেরই তো ভয় হচ্ছে, তাহলে আশা কেমন করে সামনে নিল তাকে? না, সামলাতে পারল কই? সামলাতে পারলে তো এমন অচেতনের মতো পড়ে থাকত না নিশ্চয়ই, বকে এতক্ষণে সব ভুলিয়ে দিত তাকে। রাগ, এতটা রাগ! আকাশকে কথা দিয়েছিল আশাকে কষ্ট না দেওয়ার, কথার খেলাপ করল কেমন করে? এবারও রাগ হচ্ছে নিজের ওপর, কী করল বুঝতে পারছে না। রাগে বেসিনের ওপরে থাকা প্রতিটি জিনিস ঝাড়া দিয়ে ফেলে দেয়,
“আশুউউউউ।”
অহীনের প্রচণ্ড চিৎকারে আশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ওদিকে বাথরুম থেকে কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ আর অহীনের গর্জনে চারপাশ যেন আরও ভয়ংকর লাগছে। মনে হচ্ছে সে আজ সবকিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। আশার কান্নায় পুরো ঘরটা যেন হাহাকার করছে। একই সাথে দুটো মানুষের আফসোস, নরকের চেয়ে কম লাগছে না ঘরটা। তাদের সম্পর্ক বৈধ হলেও, আজকের রাতটা কেন যেন পূর্ণতা পেয়েছে মনে হচ্ছে না। বরং শেষ পর্যন্ত একরাশ আফসোস নিয়ে রাতটা তাদের জীবনের একটা আফসোসের সাথে লেখা ডায়েরির পাতায় রয়ে গিয়েছে।
চলবে...