#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৩০
দুপুরের কড়া রোদ জানালার থাইগুলো ভেদ করে এসে ড্রয়িং রুমের মেট্রেসের ওপর শুয়ে থাকা অহীনের উন্মুক্ত পিঠে পড়ছে। পিঠে জ্বালা করতেই কিঞ্চিৎ আর্তনাদ করে ওঠে সে। উঠে বসে কপালে হাত দিয়ে দূরে দেয়ালে বড় ইলেকট্রনিক ঘড়িটার দিকে তাকায়। লাল আলোয় ফুটে আছে ১:২৪ মিনিট। এত সময় ঘুমিয়েছে সে উফ বিরক্তির বিষয়, আজ আশাটাও তাকে ধমকে দোকানে যাওয়ার কোনো তাগাদাই দিল না। আর রান্নারও শব্দ নেই কোনো। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে উঠে রুমের দিকে আগায়, ওখানেই কাপড় আছে তার। আশার দিকে তাকাল না একটিবারও সোজা বাথরুমে প্রবেশ করে। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে বের হয়ে আসে।
তখনো একইভাবে পড়ে আছে আশা নড়াচড়াও নেই মেয়েটার। ভ্রু কুঁচকে আসে তার, তার মাথায় একটা বারের জন্য আসছে কি আশার সাথে কী কী করেছে? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে নিজের কাজ নিজের মতো করেই করছে সে। তবে মনটা কেমন করছে মেয়েটা গতকাল বিকেল থেকে না খাওয়া, আর এত বেলা অবধিও ঘুমায় না যে। ফোঁস করে শ্বাস নিয়ে এবার আস্তে করে চোখটা ঘুরিয়ে ডাকে সে,
“আশু..”
সে হয়ত কিছু বলতেই চেয়েছে, কিন্তু চোখটা বিছানায় পড়তেই কথা থেমে গেল এক নিমিষেই, শুকনো ঢোক গিলে আনমনেই, আশার গায়ের হলুদ কমফোর্টারের এক কোণায় সামান্য রক্তের লাল ধাব্বা, সে কাঁপা গলায় আবার ডাকে,
“আশু ফ্রেশ হতে হয় তো, রাগ পরে করিস।”
তার মন তখনও ভাবছে আশা জেদ করে আছে, মেয়েটা বড্ড জেদি সে জানে। তার রাগ যে কাজে দেবে না এই মুহূর্তে, তাই এগিয়ে যায় আশার দিকটায়। আশার মুখটার কাছে গিয়ে গভীর চোখে দেখে নেয় প্রথমে, ঘুমে বিভোর হয়ে আছে আশা, চেতনা আছে কি নেই কে জানে। অহীন হাত বাড়িয়ে ছুঁতেই আঁতকে ওঠে, শরীর পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। রক্তের কথা মনে পড়তেই কিছু না ভেবে গায়ের ওপর থেকে কমফোর্টারটা এক টানে সরিয়ে দিল। বিছানার দিকে তাকিয়ে বিছানার অবস্থা দেখে আপনাআপনিই মুখে হাত দেয় সে। চোখ বুজে চোখ লুকায় নিজের কাছেই নিজের।
রাতে আশার অজুহাতের সত্যতা বুঝতে পেরেও রাগে সে এটা করেছে। তবে ভাবার সময় নেই। এগিয়ে গিয়ে আশার শরীরটা ঢেকে দেয় আলতো করে ঘাড় গলা, এমনকি হাতগুলোও ছাড় পায়নি তার অমানবিক নিষ্ঠুরতার কাছে। আশাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরতে নিলেই হঠাৎ থরথর করে কেঁপে ওঠে মেয়েটা, আর্তনাদের সাথে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
“আর না প্লিজ।”
কথাটা কর্ণপাত হতেই বুকে যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে জোরে আঘাত করল তার, আশাকে ছেড়ে দিল নিজের থেকে। বুঝল আশা তার স্পর্শ উপলব্ধি করে ভয় পাচ্ছে একটু। পাওয়ারই কথা রাগ কখনো ভালো কিছু তো নিয়ে আসে না। আশার কাছে আবার যায় এবার ধীরে ধীরে। কখনো কি কোনো মেয়ের যত্ন নেওয়ার মতো কাজ সে করেছে? তাও এই পরিস্থিতিতে? তারপর বারবার আশা ভয়ে ককিয়ে উঠছে। নিজের কাজে ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে আসে, ব্যর্থ হয়ে ফোনটা খুঁজে বের করে অন্তিহার নাম্বারে কল দিল।
____
দুপুর হয়ে আছে ব্রেক টাইমে ক্লাসের একটি কোণায় বসে নিজের বইয়ের দিকে চোখ রেখে আছে অন্তিহা, বাইরের শীতল আবহাওয়াটা এখন হালকা গরম অনুভব হচ্ছে। পাশে থাকা ফোনটা বাজতেই সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করল সে, বলার আগেই অহীন বলে ব্যাকুল চিন্তিত গলায়,
“অন্তু বাড়িতে আয়।”
অন্তিহা তার ব্যাকুল ও চিন্তিত গলা শুনে নিজেও খানিকটা বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করে,
“আমার তো ক্লাস বাকি! কেন?”
“একটা ক্লাস না করলে কিছু হবে না বাড়িতে আয় প্লিজ।”
“কী হয়েছে বলবেন তো আমাকে।”
বোনের সাথে কি এসব বলা যায়? কিন্তু আশার অবস্থা দেখে তো উপায়ও পাচ্ছে না, আর না নিজে বুঝতে পারছে এতটা ব্লিডিং-এর কারণ। মনের মধ্যে ইতস্ততি রেখেই বলল সে,
“আশুর সম্ভবত মেয়েলি প্রবলেমগুলো হয় না ওসব হয়েছে। আর ও একটু সিক, কেয়ার প্রয়োজন কারো, আমি এসব বুঝি না।”
অহীনের কথায় সুস্থির শ্বাস নেয় অন্তিহা, সে ভেবেছিল কী না কী এতটুকুর জন্য বাড়িতে যেতে বলছে? এসব তো নরমাল বিষয়,
“এসব নরমাল, শোয়া থেকে উঠতে না পারলে ধরে ধরে ওয়াশরুমে আপনি নিয়ে যান ও নিজেই..”
শেষ করার আগেই ধমকে ওঠে অহীন,
“বেশি বুঝিস আমার থেকে? এতদিন ডেকেছি? আজ সমস্যা মনে হচ্ছে বলেই ডাকছি। বাসায় আয় ফাস্ট।”
এতটা সময় বিষয়টা স্বাভাবিক লাগলেও এই মুহূর্তে সব কেমন যেন মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। অহীনের কণ্ঠে চিন্তা ও রাগের মিশ্রণটা তাকেও এবার চিন্তায় ফেলে দিল। কল কেটে ব্যাগ নিয়ে ক্লাসরুম থেকে সোজা বের হয়ে যায় সে। ফোনে ক্যাব বুক করার সময় খেয়াল করে ক্যাব আসতে কমপক্ষে ৩০ মিনিট সময় লাগবে। আর মেট্রোও প্রায় অনেকটা দূর। ফোনে কাউকে কল দিতে দিতে আগাচ্ছে সে হঠাৎ কপালটা কারো বুকে ধাক্কা লাগে তার। শক্ত বুকে ধাক্কা লাগতেই কপাল ঘেঁষে পিছিয়ে যায়, সামনে থেকে বিরক্তির সাথে বিচলিত গলায় ভারি স্বর ভেসে আসে,
“হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
অন্তিহা চোখ তুলে তাকায়, বেশ বিরক্তি মাখা ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে। পেছনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেসি, মূলত জেসির জন্যই বিরক্ত হয়ে মুখ লাল হয়ে আছে আয়াশের। যবে থেকে অন্তিহা এসেছে তারপর থেকে আয়াশকে কী মনে করে কে জানে? সারাক্ষণ কানের সামনে ভনভন করে মাথা খায় তার ওপর ক্লাসে এটা ওটার ভুল তো আছেই। অন্তিহা ওদিকগুলোতে খেয়াল করল না তার মাথায় তো কেবল আশাকে নিয়ে ভাবনা, সে বলল,
“বাড়ি যাচ্ছি আমি, জেসি তুমি আজ একাই হোস্টেল ফিরো কেমন।”
জেসি ওর গলায় এতটা চিন্তার রেশ দেখে জিজ্ঞেস করে,
“কী হয়েছে? হঠাৎ ক্লাস রেখে বাড়িতে যাবে কেন?”
আয়াশের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তার হুঁশ নেই যে সে তার সাথে, সে আনমনা হয়ে পাশ কাটাতে কাটাতে বলতে থাকে,
“জানি না, আশু হয়ত অসুস্থ ভাইয়া কল দিয়েছে।”
সে কথাটুকু বলেই নিজের গতি বাড়িয়ে দিল, প্রেয়সীর অসুস্থতার কথা শোনার পর কি কোনো পুরুষ ঠিক থাকে? যতই তাকে জীবন থেকে সরে যেতে বলা হোক না কেন! বেহায়া মন তো সব সময় তাকেই চাইবে যাকে সব সময় চেয়ে এসেছে। আয়াশ ছুটল অন্তিহার সাথে। জেসি পেছন থেকে একটা বই নিয়ে তাকে ডাকে,
“স্যার এটা তো বলে দিয়ে যান।”
কে শোনে তার কথা আয়াশ অন্তিহার সাথে হাঁটতে শুরু করে, মনে প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে, অল্পতেই অন্তিহা এতটা চিন্তিত হওয়ার নয়। আর গতদিন তো আশাকে দেখল সে রেগে ছিল আজ হঠাৎ কী হলো? সে অন্তিহার সাথে পায়ের তাল মিলিয়ে বলে,
“আমার সাথে চলো গাড়িতে, তাড়াতাড়ি হবে।”
“প্রয়োজন নেই আপনার ক্লাস আছে, আমি মেট্রো করে চলে যাব।”
তার কথায় আয়াশকে কেমন একটা অবজ্ঞা ছিল। কিছুদিন ধরেই অন্তিহার এই রূপটা সে দেখছে, হয়ত আশার সাথে সম্পর্ক নেই বলে সেও কথা বলতে চায় না। কিন্তু তারা কি কেবল আশার জন্যই এতদিন কথা বলত? পরপর কয়েকবার বলার পরেও অন্তিহা রাজি হলো না তার সাথে যেতে। কিন্তু আয়াশ তো যাবেই, আশা যত যাই করুক মেয়েটাকে ছেড়ে দেওয়া সহজ নয়। কেন না সে জানে আশা মুখে হাজার কথা বললেও ভালোবাসি না কথাটা একটিবারও বলেনি। যতদিন না বলবে ছাড়বে না সে। অন্তিহার দিকে রক্তিম চোখে তাকিয়ে সে শেষ বারের মতোই বলল,
“অন্তু, আই ওয়ার্ন ইউ! লাস্ট বার বলছি, জলদি গাড়িতে ওঠো!”
অন্তিহা থেমে কঠিন গলায় বলে,
“দেখুন আমি গেলেই হবে, এসবে আপনার কোনো কাজ নেই। আর ভাইয়া আপনাকে দেখলে সমস্যা হতে পারে বোঝাআআআআ ছাড়ুন।”
অন্তিহা কথাটা বলে শেষ করতে পারল কই? তার হাতের কবজি ধরে কোনো ক্রমে টেনেহিঁচড়ে গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে আয়াশ। ইউনিভার্সিটি খোলা মাঠে মানুষগুলো হতবিহ্বলের মতো তাকিয়ে আছে, আয়াশের হাতে তো গ্লাভসগুলোও আজ নেই। গাড়িতে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে বসাতেই কয়েকজন স্টুডেন্ট একই সাথে শব্দ করে ওঠে,
“ওওওওওওও।”
অন্তিহা পরক্ষণেই আতঙ্কে ওঠে, জুতো গুলো সিটের ওপর উঠেছে তার, ঠাস করে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিল। কালো গ্লাসের ভেতর থেকে সে বাকিদের হাসাহাসি করতে দেখে বড্ড লজ্জা পেল। কোনো লেকচারারের সাথে এমন পরিস্থিতি হাস্যকর নয়ত কী? আয়াশ সামনের সিটে গিয়ে বসতেই ছলছল চোখে ওর দিকে তাকায় অন্তিহা, আয়নায় তার দিকে এক পলক তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল আয়াশ এবার। ইউনিভার্সিটির গেট পার হয়ে রাস্তায় উঠল গাড়িটা রাগে ফুঁসছে অন্তিহা, ঝামেলা করাটা অহেতুক ভেবেই চুপ করে আছে।
___
শান্ত গুমট পরিবেশ কক্ষ জুড়ে, শীতল বাতাসটাও শরীর ঠান্ডা করতে ব্যর্থ অহীনের, হাতটা কাঁপছে তার, ব্লিডিং থামছেই না মেয়েটার কিছুক্ষণ আগে যতটুকু চেতনা ছিল সেটাও এখন নেই, নখ কামড়াচ্ছে সে নিজের। অন্তিহা বলল এসব স্বাভাবিকই হয়। কিন্তু তাই বলে এমন? উঠে একটিবার আশার অচেতন মুখটার দিকে এগিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় কপালে হাত দিয়ে আঁতকে ওঠে,
“শিট শিইজ বার্নিং আপ। অন্তুটা আসছে না কেন।”
গাড়িটি অহীনের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামতেই অন্তিহা গাড়ি থেকে তড়িঘড়ি করে নেমে যায়। তার পেছনে আয়াশ, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় অন্তিহা তাকে থামিয়ে দিল,
“আয়াশ আসবেন না, মেয়েটা অসুস্থ আপনার আর ভাইয়ার জন্য ওর সমস্যা হতে পারে।”
আয়াশ একটু কাতর গলায় বলল,
“বাট আই কান্ট! আমি জানতে চাই ওর কী হয়েছে, দেখতে চাই।”
অন্তিহা ওর দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে আস্থা নিয়ে বলল,
“আপনি অপেক্ষা করুন, আমি বলব আপনাকে, আশা এখন আপনার থেকে দূরে থাকতে চায়। ওর কথা একটু রাখার চেষ্টা করুন প্লিজ।”
“দেখতে চাই।”
শুকনো ঢোক গেলে অন্তিহা, লোকটা কতটা ভালোবাসে আশাকে অবাক লাগে দেখলে, কিন্তু অবুঝ প্রেমিক একপাক্ষিক প্রেমকে টানতে চায়। একদিন এই প্রেমই না তাকে মুখ থুবড়ে ফেলে দেয়। অন্তিহা উত্তর দিল না চোখের ইশারায় ওপরে যেতে নিষেধ করে নিজেই যায়। দরজায় কলিং বেল চাপার সেকেন্ড সময় নিয়ে অহীন দরজা খুলে দেয় তাকে, অন্তিহা বরাবরই গম্ভীর থাকে এখনো তার অন্যথা হলো না। সোজা আশার কক্ষে যেতে যেতে গম্ভীর চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কী হয়েছে আশুর?”
রুমে প্রবেশ করে সে একাই অহীন আসল না পেছনে, যতই হোক এসব বিষয়ে অন্তিহা তার বোন বলাটা কতটা লজ্জার। সামনে গেলে চোখ তোলাও মাটির নিচে চলে যাওয়ার মতোই। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, অন্তিহা আশার পাশে বসে, আশার হলুদের মতো চকচকে মুখটা সাদা হয়ে আছে, কখনো তেমন লিপস্টিক ব্যবহার না করাতে ঠোঁটগুলো তার প্রাকৃতিকভাবেই গোলাপের পাপড়ির মতো ফুটে থাকে আজ ঠোঁট জোড়াও সাদা রক্তশূন্য লাগছে। অন্তিহা ওর গায়ের কমফোর্টারটা একটু উঁচু করে ডাকতে চায়,
“আশ…”
তবে কথা সেখানেই গলায় আটকে গেল, গায়ে একটা জামা পড়িয়ে রাখা, হয়ত অহীনই পড়িয়েছে, কিন্তু ঘাড় গলাগুলো তো আবৃত করা যায় না তাতে! একটু জায়গা পর এক দলা রক্ত জমে আছে, অহীনের গত রাতের রাগগুলো যেন এসবের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। অন্তিহা আতঙ্কে কমফোর্টারটা এবার জোরে টান দেয়, অহীন ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজে নিল লজ্জায়, পুরো শরীরই তো রক্তশূন্য ভেতরটা কেমন কিঞ্চিৎ ভয়ে ছ্যাঁত করে উঠল প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর এমন অবস্থা দেখে। সে নিজের কিউরিওসিটি থেকে জামাটাও উল্টে দেখল ভালো করে, এবার রাগে শরীর রি রি করে ওঠে তার, সে অহীনের দিকে তাকিয়ে বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে বলে ওঠে,
“আপনি মানুষ?”
অহীন ওকে বলতে চায়,
“অন্তু।”
গর্জে ওঠে অন্তিহা,
“কী মনে করেন নিজেকে? বিয়ে হয়েছে বলেই যা ইচ্ছে করবেন? আপনাদের জন্য আমি হোস্টেলে গিয়ে থাকি যাতে সম্পর্ক গোছাতে পারেন, এই বুঝি সুযোগে এতটা নিচে নেমেছন? ভাবেন কী নিজেকে? বাড়ির সবাই আপনার পক্ষে থেকে আশাকে সংসার করতে বলেছে, তার মানে যাই করুন না কেন আশা তো আপনাকে ছাড়তে পারবে না, সেটাই ভাবেন তাই না? তাই এসব করেছেন?”
অহীন তাকে উত্তর দিল না কোনো, শুধু আস্তে করে বলল,
“এসব পরে বলিস ওকে তোল।”
অন্তিহা বিছানায় তাকায়, রক্তশূন্যতার কারণটা বুঝতে পেরে ফের বলে,
“আপনি এই অবস্থায় ওকে, কী বলব? বলার ভাষা কোথায় রেখেছেন। হারাম হালালের তো পরোয়া করতেন একটু। আপনি নামাজ পড়েন আমল করেন। আমাদের মতো তো আপনি না তাহলে এটা কীভাবে মানব?”
অন্তিহা অহীনের মুখের ওপর গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল, অতঃপর বেশ অনেকটা সময় নিয়ে আশাকে ঠিকঠাক করে দরজা খুলে দেয়। বের হয়ে ক্রন্দন গলায় ফুঁপিয়ে কেঁদে বলে,
“হাসপাতাল যেতে হবে ব্লিডিং থামছে না।”
অহীন মাথা দুলিয়ে আশার দিকে আগাতে নিলেই, অহীনের বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে অন্তিহা,
“দূরে থাকুন আপনি। ছোঁবেন না একদম।”
অহীন পিছিয়ে যায় কয়েক পা, অন্তিহা আর যেমনই হোক এমন আচরণ করেনি তার সাথে কখনো। আজ যেন সবকিছু উল্টোপাল্টা হচ্ছে। সে বলল,
“ওকে হসপিটাল পর্যন্ত..”
“প্রয়োজন নেই আপনাকে, আপনারও বোঝা দরকার আশার হাজারো অপশন আছে আপনি ছাড়া।”
রুম থেকে বের হয়ে সোজা বাইরে করিডোরের কাছে যায়, আয়াশ তখন দাঁড়িয়ে আছে সেখানটায়, অপেক্ষায় আছে আশার সম্পর্কে কোনো তথ্য অন্তিহা নিয়ে আসবে। করিডোর থেকে ভেজা কান্না গলায় ডাক আসে তার কানে,
“আয়াশ একটু ওপরে আসুন।”
অন্তিহার কান্না গলাটা পেতেই ওপরে তাকায় ভেজা চোখগুলো, ভেঙে দিল তাকেও, বুকের ভেতর অজস্র তোলপাড় ও ভয় নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে পা বাড়ায় সে। অন্তিহা ভেতরে প্রবেশ করে যায় কিন্তু আয়াশ? সে দরজার ভেতরে একটা পা ফেলতেই শরীর লোমকূপ পর্যন্ত গুলিয়ে আসে। ড্রয়িং রুমের অবস্থা খারাপ, গত কাল এত ঝামেলার পর আশার তো এসব ঠিক করার মতো অবস্থা নেই। তবুও ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ভেতরে যায়। আশার কক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই অন্তিহা বলল,
“আসলে আমি জানি আপনি সিক কিন্তু আমাকে সাহায্য করুন, শুধু আশুর একটা হাত ধরবেন হসপিটাল নিতে হবে ইমার্জেন্সি।”
“কী হয়েছে ওর?”
অহীন বলল,
“অন্তু আমি দিয়ে আসছি গাড়ি অবধি জেদ করিস না।”
অন্তিহা আবার তেতে ওঠে,
“আপনার অমানুষের মতো ছোঁয়া প্রয়োজন নেই।”
আয়াশ সময় ব্যয় করল না একটুও এগিয়ে যায় আশার কাছে, তার চোখে একটু আগের রক্তেমাখা বিছানাটা না দেখলেও আশার শরীরে ক্ষতগুলো ঠিকই দেখল। ভেতরটা চিনচিন ব্যথায় একটু পিছিয়ে যায় তার পা। চোখগুলো রক্তিম হয়ে গেছে। এগিয়ে গিয়ে রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখে হাত দিয়ে প্রশ্ন করে,
“অহীন করেছে?”
“আর কে আছে?”
“বাস্টার্ড।”
রাগে হিতাহিত বোধ হারিয়ে সে ছুটে ঝাঁপিয়ে পড়ে অহীনের গায়ের ওপর। রাগে রক্তগুলো টগবগিয়ে উঠছে। দেয়ালের সাথে ধাক্কা দিয়ে সমস্ত শক্তির সাথে এলোপাথাড়ি মুখে ঘুসি দিয়েই যাচ্ছে। এই মুহূর্তে হাইজিনের দিকে বিন্দু মাত্রও খেয়াল তার নেই। ভালোবাসার মেয়েটার শরীর দেখেই শরীরের রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে। অন্তিহা ছুটে গিয়ে তাকে টেনে থামায় কোনো মতে আর বলে,
“ঝামেলা করছেন কেন? আশাকে আগে হাসপাতাল নিতে হবে। আমি ধরছি আপনি সাহায্য করুন আমাকে।”
অন্তিহাকে ঝাড়া দিয়ে আশার কাছে চলে যায় আয়াশ, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা বিন্দু বিন্দু রক্তগুলো হাতের উল্টো পিঠের সাহায্যে মুছে অহীন, তাচ্ছিল্য হচ্ছে নিজের ওপর নিজের বউকে ছুঁয়ে ওর কাছেও নত হতে হচ্ছে বলে। অন্তিহা আশাকে ধরতে নিলে, আয়াশ তাকে সরিয়ে দিয়ে ঝুঁকে অচেতন শরীরটা কোলে তুলে নেয়, অহীনের দিকে রক্তিম চোখে তাকিয়ে বলার আগেই, অন্তিহা বলে,
“আপনার সমস্যা হচ্ছে হয়ত, আমাকে একটু সাহায্য করলেই হবে। ওর শরীর ক্লিন…”
“ইটস ওকে, পুতুলকে নিয়ে আমার কখনই সমস্যা হয় না। কজ আই লাভ হার।”
অহীনকে পাশ কাটিয়ে আয়াশ সিঁড়ি দিয়ে সোজা নিচে নেমে যায় পেছনে অন্তিহা। চোখে একরাশ চিন্তা তার, মেয়েটার সাথে কী হবে ভাবতেই কেমন অস্থির লাগছে। অহীন সিঁড়ির কাছে এসে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে, কেন যেন ইচ্ছে হচ্ছে না যাওয়ার। একদমই না, আশাকে কতটা যত্নের সাথে আয়াশ গাড়িতে শুইয়ে দিল, যে কখনো নিজের গাড়িতে কাউকে হাত দিতে দেয় না। যার গায়ে কেউ স্পর্শ করলে বমি করে দেয়। সে একটা অপবিত্র মেয়েকে কোলে করে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ? কারণ সে তাকে ভালোবাসে। এটা জানার পরেও যে আজ তার প্রেয়সীর শরীরের প্রতিটা ভাঁজ অন্য পুরুষের মাপা শেষ তবুও ভালোবাসে! অহীন কি আদৌ আয়াশের মতো ভালোবাসে? নিজের ভাবনায় নিজেই বেকুব বনে গেল সে।
___
দুপুর গড়িয়ে রাত হাসপাতালের করিডোরে হেলান দিয়ে বসে আছে অন্তিহা, আয়াশ দাঁড়িয়ে আছে পকেটে হাত রেখে, আশার জ্ঞান ফিরেছে তবে এখন ঘুমাচ্ছে। এই সুযোগে আয়াশ বাসা থেকে হয়ে এসেছে। বেশি সময় শরীরটা টেকানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি এত অস্বচ্ছতার সাথে। অন্তিহা তখন রাগে অহীনকে এতটা তীক্ষ্ণ ও রুক্ষ কথা শোনালেও এখন একটু অনুশোচনা হচ্ছে। কারণ সে তখন একপাক্ষিক কথা বলেছে না বুঝেই। কিন্তু অহীন? সে তো এতটা সময় একটিবার দেখতে আসল না নিজের বউটাকে, অন্তত তার জন্যই এত কিছু হলো। অন্তিহা উঠে এবার ক্যাবিনের ভেতরে প্রবেশ করে, সিলিং-এর দিকে চুপ মুখে তাকিয়ে আছে। অন্তিহা ধীর পায়ে তার পাশে গিয়ে বসল, মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“শরীর খারাপ লাগছে?”
তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে দৃঢ় গলায়,
“অহীনকে দেখলাম না একবারও। আসেনি না?”
অন্তিহা ভ্রু কুঁচকে তাকে বলল,
“উহু, আয়াশ আছে।”
আশা তার দিকে তাকায়, ভ্রু কুঁচকে বেশ বিরক্ত হয়ে তাকে বলে,
“ওকে কেন এসব বলতে গিয়েছিস বাল? তোর ভাইয়ের সাথে কি এমনিই ঝামেলার অভাব আবার আয়াশকে নিয়ে এসেছিস?”
“ঢং করবি না একদম, নিজেকে দেখেছিস? ডাক্তার ভেবেছে রেপ হয়েছে। সৃজন মামা আর আয়াশ না থাকলে পুলিশ কেস হতো নিশ্চিত, ভাইয়া এমন কেন করল সেটা বল।”
“কারণ তোর ভাই একটা রাক্ষস মানুষখেকো কুত্তা, ওর সাধ্যিতে থাকলে আমাকে খেয়ে নিত। বেয়াদব।”
দুজনই চুপ করে কিছু সময়ের জন্য, আশা একটু ইতস্তত হয়ে বলল,
“পাপিকে এসব বলেছিস কেন? লজ্জার বিষয় তো এখন ওনার সামনে মুখে ১২ হাত ঘোমটা টেনে থাকতে হবে আমার।”
“হুম ১৪ হাত ঘোমটা দিয়ে থাকিস এত লজ্জা পেলে, পারলে ভাইয়ার লুঙ্গির নিচে বসে থাকিস, আমাকে বলার দরকার নেই। সৃজন মামাকে না বললে কেস হতো, আর আমি যা রেগে ছিলাম ভাইয়ার নামে ঠিক কেস করে দিতাম।”
তার কথায় আশা না হেসে পারল কই? হোহো করে হাসতে পারলে হয়ত ভালো হতো। কিন্তু অসুস্থ শরীর সঙ্গ দিল না, তাই চুপ করে গেল আবার, কিছু সময় পর ক্যাবিনে আয়াশ প্রবেশ করে, তাকে দেখে আশা চোখ লুকানোর অযথা চেষ্টা করল কিন্তু আয়াশ ধীর পায়ে আশার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে বলবে না এসব জায়গায়, ঝুঁকে একটু, গালে থাপ্পড়ের দাগটা নীল হয়ে আছে এখনো অনেকটা, সে নুইয়ে যায় কাতর ব্যাকুল গলায় বলে,
“পুতুল, তোমায় কেন পুতুল ডাকি জানো?”
আশা ভেজা চোখে জানালার ওপারে তাকিয়ে রইল। আয়াশ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ন হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“কারণ তুমি ঠিক পুতুলের মতোই কোমল। পুতুলের গায়ে কোনো দাগ থাকতে নেই, তাকে তো শুধু পরম মমতায় আগলে রাখতে হয়। তোমার এই সুন্দর মুখের ক্ষতটা বড্ড বেমানান লাগে আমার কাছে। পুতুল তো কেবল ভালোবেসে যত্ন করার জন্য হয়, ব্যথার দাগ সহ্য করার জন্য নয়।”
আশা ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,
“এতটা সাহায্য করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”
আয়াশ ওর কথার মাঝেই আলতো স্বরে যোগ করল, “সবকিছু সয়ে যেতে হবে না তোমাকে পুতুল, আমি তোমায় ভালোবা...”
“চাই না আমি আপনার ভালোবাসা! আমি অহীনের সাথে ভালো থাকতে চাই।”
আয়াশকে কথা শেষ করতে না দিয়েই তীব্র স্বরে বলে উঠে আশা। বুকভরা অস্বস্তি নিয়ে সে আবার বলল,
“আপনি কি বুঝতে পারছেন না? আমার বৈবাহিক জীবনে এমনিতেই টানাপোড়েন চলছে, আপনার এই কথাগুলো আমাকে চরম বিভ্রান্তিতে ফেলছে। আমাকে ভালো থাকতে দিন।”
ঠিক তখনই দরজায় ‘খট’ করে শব্দ হয়। এক বুক আশা নিয়ে দরজার দিকে তাকাল সে, হয়তো অহীন এসেছে! কিন্তু অহীন নয়, ঘরে একজন নার্সকে প্রবেশ করতে দেখে মুহূর্তেই আশার উজ্জ্বল মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আশার এই আকুলতা আয়াশের নজর এড়াল না। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,
“কী অদ্ভুত, তাই না? তুমি চাতক পাখির মতো অহীনের অপেক্ষা করছ, আর আমি অপেক্ষা করছি তোমার। এই ‘অপেক্ষা’ খেলাটার নাম না হয় ‘পুতুল খেলা’ই থাক। একদিন হয়তো তোমার এই দীর্ঘ প্রহর ফুরোবে, আর সেদিন শুরু হবে আমার সময়। সেভাবেই হোক না! তবুও এই পুতুলটাকে আমার চাই-ই চাই।”
হালকা হাসির সাথেই আয়াশ ক্যাবিন থেকে বের হয়ে যায়, আশার চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, এটা আদৌ কি আয়াশের জন্য নাকি অহীনের জন্য? আশা অন্তিহাকে বলল,
“পাপিকে বলে দিস এসব কথা যেন কেউ বাড়িতে না বলে।”
__
হাসপাতালেই পুরোটা দিন কাটাতে হলো আশাকে। সৃজন, জেইন, আয়াশ আর অন্তিহা প্রায় সারাক্ষণই ওর কাছেই বসে ছিল। জেইন ঠিক যেমন অহীনকে আগলে বড় করেছেন, আশাকেও ঠিক তেমনি যত্ন করছেন যেন একমাত্র আদুরে ছেলের বউ । কিন্তু ক্লান্ত আর অসুস্থ আশা সেই যে একবার আয়াশ আর অন্তিহার সাথে কথা বলল, তারপর থেকে আর একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের করেনি। জেইন খাবারের প্লেট নিয়ে ওর সামনে বসে আছে অনেকক্ষণ ধরে, কিন্তু মেয়েটার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
জেইন পরম মমতায় বলল,
“খেয়ে নাও আশা। অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে শরীর থেকে, না খেলে তো আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে মা।”
আশা শুধু মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। জেইন খাবারের প্লেটটা পাশে রেখে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
“কী হলো আমাদের আশার? মনে এত কিসের হতাশা? আমার সাথে কথা বলবে না? অভিমান কি বরের ওপর, নাকি আমাদের ওপর?”
আশা তবুও নিরুত্তর। মনটা বড্ড মরা লাগছে ওর। একটা মানুষ কতটা নির্দয় হলে তাকে একটিবার দেখতেও আসে না? অথচ ওর এই অসুস্থতার কারণ তো স্বয়ং অহীনই। জেইন আবার বলল,
“আশা, পরপর দুই ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে তোমাকে। শরীর খুব দুর্বল, একটু খেয়ে নাও। তবেই তো সকালে বাসায় ফিরতে পারবে।”
‘বাসা’ শব্দটা শুনেই আশা জেইনের দিকে ফিরে তাকায়, ভাঙা গলায় বলল,
“মাম্মাম, আমি অহীনের কাছে যেতে চাই না।”
ঠিক তখনই কেবিনে প্রবেশ করতে করতে সৃজন গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমার কী মনে হয় আমরা তোমাকে ওর কাছে ফেরত পাঠাব? তুমি আমাদের বাসায় থাকবে। ওই অসভ্য ছেলেটা এখন কোথায় আছে, তার হদিসও জানি না আমরা।”
সৃজনের কথায় আশার মনে কিঞ্চিৎ চোট লাগল। খোঁজ জানে না মানে অহীন কি একবারও কল করেনি? সে সংশয় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ও কি একটা ফোনও দেয়নি?”
“দিয়েছে।”
আশা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“মিথ্যা বলছেন, পাপি? অহীনের দোষ আড়াল করার জন্য মিথ্যে বলছেন?”
সৃজন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আসলেই তো অহীন একটা কলও করেনি আশার খোঁজ নিতে, উল্টো ফোন বন্ধ করে রেখেছে। ছেলেটাকে নিয়ে নতুন করে বলার মতো আর কোনো ভাষা নেই তার কাছে। সৃজনের এই নীরবতাই আশাকে উত্তর দিয়ে দিল। জেইন পাশেই ছিল, আশা হঠাৎ তাঁর কোলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলতে লাগল,
“মাম্মাম, আমি বাড়ি ফিরে যাব। আমি আর এখানে থাকব না। ফুন্নি আর আম্মুর কাছে চলে যেতে চাই। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
আশার এমন আর্তনাদে দুজনেই কিছুটা ঘাবড়ায়। জেইন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমিও তো তোমার আম্মুর মতোই, তবে আমাকে ছেড়ে কেন যেতে চাইছ?”
আশা সোজা হয়ে বসে চোখের জল মুছে নেয় দুই হাতে। মনের কষ্টটুকু গিলে ফেলে শক্ত গলায় বলল,
“যে মানুষটা আমাকে একবার দেখতে আসার প্রয়োজন মনে করল না, তার আশেপাশে থাকার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আপনার কাছে থাকলেও তো লাভ নেই মাম্মাম। দুদিন পর সে আবার এসে একই আচরণ করবে না, তার গ্যারান্টি কী? আমি দেখতে চাই, সে আমার খোঁজ না করে কতদিন থাকতে পারে। প্লিজ মাম্মাম।”
সৃজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আশু, দেশে ফিরতে চাইলে তো হুট করে যাওয়া যায় না। অনেক আইনি প্রক্রিয়া আছে।”
আশা তড়িৎ উত্তর দিল,
“ঠিক আছে। কিন্তু ততদিন অহীন নিজ থেকে খোঁজ না করলে আমার কোনো খবর ওকে দেবেন না। আর এটাও বলবেন না যে আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি।”
চলবে...