ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৩১তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

পর্বঃ৩১

শীতল ঠান্ডা বাতাসের পর এখন অনেক রোদ দেখা যাচ্ছে আকাশে, তুষারপাত বন্ধ হয়ে গিয়েছে কয়েক দিন হলো। আশাকে হাসপাতাল থেকে আনা হয়েছে তিন দিন প্রায় কেটে গিয়েছে। নাহ, তবুও অহীনের কোনো খোঁজ নেই। একটি বার সৃজনকে কল দিয়ে বলেছিল কোনো এক বন্ধুর বাড়িতে আছে। তখনো আশার একটুও খোঁজ সে করেনি। সৃজনের বাসায় অহীনের কক্ষের জানালার ধারে চুপটি করে বসে আছে আশা, বাইরে দু-একজন লোকের হাঁটাচলাগুলো দেখছে, মুখাবয়ব চুপসে মলিন। অন্তিহা রোজই আসে দেখা করতে, সঙ্গে আসে আয়াশ, তবে বাড়িতে লোকটা আজকাল আসে না। কাছে থেকে পুতুল বলে ডেকে ডেকে বিরক্ত করে না। বাইরে চোখ রেখেই আছে, অমনি পরিচিত মার্সিডিজটি এসে থামে সামনে। ওখান থেকে প্রথমেই নেমে আসে অন্তিহা, অপর পাশ দিয়ে নেমে আসে আয়াশ। লোকটা মলিন মুখে হাসি দিয়ে ওর দিকে তাকায়, গাড়িতে হেলান দিয়ে অন্তিহাকে কিছু একটা বলে আশার দিকে তাকায়। হাতের ইশারায় হাই বলে হাতগুলো আড়াআড়ি করে বুকে গুঁজে নিল। ওকে দেখে কেমন বিরক্ত হলো আশা, আলতো করে জানালার পর্দা নামিয়ে দরজার দিকে তাকায়, অন্তিহা আসবে। তবে অপর প্রান্তে আশার অবহেলাটাও মৃদু হাসির সাথে মাখিয়ে নিল আয়াশ। একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে সে। অন্তিহা কক্ষে প্রবেশ করে। হাতে খাবারের প্লেট তার, আশার ঠিক কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, মুখটা শুকিয়ে ছোট হয়ে গিয়েছে কেমন, এতগুলো দিন হলো তবুও গলায়-ঘাড়ের দাগগুলো নীল হয়ে আছে। হয়ত আরো কয়েক সপ্তাহ সময় নিয়ে মুছবে। সে ওর পাশে বসতেই আশা নরম গলায় অন্য দিকে তাকিয়ে বলে,

“যদি একা না আসতে পারিস দয়া করে আসিস না, তাও যাকে তাকে আনিস না অন্তু।”

​আশার কথায় মলিন হয়ে হাসে অন্তিহা, খাবারের লোকমা তুলে ধরে ওর মুখে,

“খেয়ে কথা বলি আমরা আশু?”

​আশা উত্তর দিল না। কেন যেন মস্তিষ্ক বারবার অহীনের সেই অমানবিক নির্যাতনের কথা ভুলতেই পারছে না। প্রথমে বিষয়টা তার ভালো লাগলেও এখন লাগছে না ভালো। কেননা মানুষটা তার খোঁজ পর্যন্ত নিচ্ছে না একটি বার। অন্তিহা ওর অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আশু, আমি আনি না ওনাকে, ইউনিভার্সিটির সবার সামনে থেকে জোর করে নিয়ে আসে আমাকে রোজ।”

​আশা তবুও উত্তর করল না। জানালার একটু ফাঁক দিয়ে আয়াশকে দেখা যাচ্ছে, সেই গাড়ি থেকে ছোট স্যানিটাইজারের শিশিটা থেকে স্প্রে করছে বারবার নিজের হাত। আশা শুধু অল্প গলায় বলল,

“আমি এদের দুজনের থেকে মুক্তি চাই। একজন হালালের দলিল পেয়ে যা নয় তাই করে হঠাৎ ভেনিস। আর অপরজন ভালোবাসার নাম করে কাছে আসত, না বলার পরেও মানসিক টর্চার করেই চলেছে।”

​অন্তিহা বলল,

“পরশু ফ্লাইট তোর, টিকিট পাওয়া কঠিন ছিল খুব, মামা তবুও ম্যানেজ করেছে। আমি যেতে পারব না, আমার এক্সাম সামনে।”

​আশা মাথা দোলায় দুই দিকে, সম্মতির সাথে আবারো আড়ালে একবার আয়াশের দিকে তাকায়, লোকটা এখনো স্যানিটাইজারে হাত ঘষছে। ভাবতেই অবাক লাগে, এই লোক নাকি সেদিন তাকে কোলে করে নিজের গাড়িতে তুলেছিল। অন্তিহা ফের ওর দিকে লোকমা তুলে দেয়। মাথা দুলিয়ে আশা ‘না’ বলতেই দুই ফোঁটা চোখের পানি কার্নিশ গলিয়ে টপটপ করে পড়ল। এরই মাঝে কক্ষে অপরিচিত একটি মুখের মানুষ প্রবেশ করে। হ্যাঁ, চেনে সে কিন্তু কথা বলা হয়নি কখনো। কত সুন্দর স্মার্ট মহিলাটি, ওর দিকে তাকিয়ে এগিয়ে আসছে এবার এসে ঠিক পাশে একটি চেয়ার টেনে বসল সে। অন্তিহা হাসি দিয়ে বলল,

“কেয়া আন্টি আপনি?”

​কেয়া হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আলতো করে, অতঃপর আশার মাথায় হাত বুলিয়ে উত্তর করে,

“অহীনের বউটা দেখতে আসলাম।”

​কেয়াকে দেখে যেন মুহূর্তে সেই দিনের কথা মনে পড়ে গেল আশার। কী জঘন্য ছিল অহীন আর ক্লেরার সেই অন্তরঙ্গ দৃশ্যটা। এতগুলো দিন মাথা থেকে সরে গেলেও আজ সবকিছু কেমন নাড়া দিয়ে মস্তিষ্ক ওলটপালট করে দিচ্ছে। সে চোখ সরিয়ে নেয় কেয়ার থেকে। অন্তু ওর ভাবমূর্তি দেখে একটু বিনয়ী হয়ে কেয়াকে বলল,

“আন্টি, অনেক কিছু হয়েছে তো, ট্রমার ভুগছে। আমি ছাড়া কারো সাথে কথা বলে না।”

​কেয়ার মুখটা নরম হয়, কোথাও একটু কষ্ট হচ্ছে। জেইনের থেকে শুনেছে সবটাই। সে অন্তিহাকে বলল,

“সমস্যা নেই, ও শুনুক, আমি কথা বলে চলে যাব।”

​কেয়া তাদের ঠিক পাশে বসে জানালার পর্দাটা টেনে খুলতে খুলতে বলতে থাকে,

“দিনের বেলা পর্দা কেন বন্ধ করে রেখেছ?”

​পর্দা সরাতেই আশার সাথে আবারও আয়াশের চোখাচোখি হয়। আশা অস্বস্তির সাথে সেখান থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে বসল। অন্তিহা পর্দা টেনে দেয় আবার। কেয়া কিছু একটা আন্দাজ করেও কিছু না বলে আবার আশার ঠিক সামনে গিয়ে বসে। তার উপস্থিতি ক্লেরার আভাস দিচ্ছে বারবার, যা আশার একদম পছন্দ হচ্ছে না। তবুও বাড়িটা তো ওনার ভাইয়েরই, তাই চুপ করে আছে। কেয়া নরম গলায় বলল,

“আমার ছেলে নেই, আর না সৃজন ভাইয়ার। অহীন সেই ছোট থেকে আমাদের মাঝে বড় হয়েছে। অহীন অনেক কেয়ারিং, ভাইয়ার মতোই। অন্তিক ভাইয়ার মতো দেখতে হলেও একদম ব্যবহার ভিন্ন ওর।”

​কেয়ার কথায় আশা তবুও তাকাল না তার দিকে। এতটা প্রশংসা যে মানুষটাকে নিয়ে করছে, সেই তো তার সাথে এতটা খারাপ কাজ করল? এই ভালো মানুষটাকে তার চেনা হয়েছে ভালো করে, যে সবার সামনে ভদ্রলোক কিন্তু আড়ালে গেলে ধরা যায় ওর ফ্যান্টাসি নামক নিষ্ঠুরতার কথা। কেয়া আশার দিকে তাকিয়ে ফের বলল,

“একই কলেজে ক্লেরা-অহীন পড়াশোনা করেছে, ওই সুবাদে বলতাম ক্লেরার যেন খেয়াল রাখে। কিন্তু কথায় আছে না, পুরুষ মানুষের যত্নেই নারীরা গলে যায়। ওমনি অহীন হয়তো আমার জন্য ওকে যত্ন করত বোনের মতো। বাড়িতেও আসতে দিত কারণ ও ভাই, প্রয়োজনে তো বোন আসবেই। তবে ক্লেরা ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। জেসির ওপরেও জেলাস থাকত সারাক্ষণ। আমিও ভাবিনি এমন কিছু করবে মেয়েটা। কিন্তু অহীনকে খারাপ ভেবো না তুমি, ও একদম এমন না। ক্লেরার জব ট্রান্সফার করা হয়েছে, সামনের সপ্তাহে আমাদের কাছে চলে যাবে। তুমি দেশে যেও না।”

​আশার ঠোঁটে একটু তাচ্ছিল্যের হাসি ফোটে। অহীন ও ক্লেরার দৃশ্যগুলো চোখে ভাসছে, অন্য দিকে তাকিয়ে আছে, উত্তর একটাও করছে না। অবশেষে কেয়া মেয়েটা বেচারি হতাশ হলো খুব। খানিকটা সময়ের জন্য অহীনের চিন্তা হলো। এমন ছেলেটার সাথে এত জেদি মেয়ে যায়? যাক, এতে তার কী? সে আর কথা বলল না। কথা তার সাথে বলা হয় যে পাল্টা জবাব দেয়, কোনো নিশ্চুপ পাথরের সাথে নয়।

_____

​বিকেলের আবছা আলোয় গাড়িটি রাস্তায় এগিয়ে যাচ্ছে, ঠান্ডায় কঁকড়ে আছে অন্তিহার শরীর। আড়চোখে একবার আয়াশের দিকে তাকাল সে; লোকটা বড্ড নির্দয়, নিজেকে গায়ে গরম কাপড় জড়িয়ে রেখেছে, তাকে একটু জিজ্ঞেসও করছে না। চুপ করে বসে আছে সে। ওমনি সময় আয়াশের সামনে ইনফোটেইনমেন্ট স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘অ্যানার্কি’ দিয়ে সেভ করা একটি নাম। অমনি আয়াশের গম্ভীর, ঠান্ডায় নীল হয়ে যাওয়া ওষ্ঠে কিঞ্চিৎ হাসির দেখা মিলল। অন্তিহা আড়চোখে একবার তাকায় তার দিকে। আয়াশ হেসে বাইরে তাকিয়ে কপাল চুলকে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একই ধারায় বকবক করতে থাকে জেসি,

“আপনি তো নিয়ে গেলেন অন্তুকে, মেয়েটা এখনো আসল না! উফ ড্যাড বলল চলে এসেছে, তাহলে এত ল্যাট কেন হচ্ছে?”

​থামে জেসি। আয়াশ কিছু বলার আগেই সন্দিহান হয়ে মেয়েটা আবার বলে ওঠে,

"ওয়েট, আপনারা আবার প্রেম করেন না তো? যদিও You both are a perfect match... একদম ওই Sphinx-টার মতো গম্ভীর!”

​বলেই খিলখিল করে নিজেই হাসতে শুরু করল। একটা মানুষ ঠিক কতটা বেয়াকুব হলে নিজেই বলে নিজেই হাসতে পারে বুঝে পায় না আয়াশ। জেসি বলার জন্য আবার মুখ খুলবে বুঝতে পেরে আয়াশ বলে,

“শেষ বলা? আমরা ১০ মিনিটের মধ্যে আসছি।”

​জেসির কোনো কথা আর সে শুনল না, কলটা কেটে দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দাঁতগুলো প্রসারিত করে হেসে দেয়। অন্তিহা গভীর চোখে পর্যবেক্ষণ করছে তাকে। আশার পর হয়তো জেসির সাথেই লোকটা হাসল এমন করে। অন্তিহা অন্য দিকে তাকাতেই আয়াশ ওকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,

“অন্তু, এটা কী? তোমাদের ফ্যামিলিতে সব পাগল, তাই না? একে আমি যতই বোঝাই আমার এক্সপেরিয়েন্স থেকে হাজারটা থিওরি দিয়েও চুপ করাতে পারি না! এই অ্যানার্কি কি সবার সাথে এমন?”

​অন্তিহা ওর দিকে কেমন সন্দিহান হয়ে তাকায়। আয়াশ এত কথা বলল? তাও অপ্রয়োজনীয় কথা যেগুলো না বললেও হতো? সে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করে তাকে,

“ডু ইউ লাইক হার?”

​অন্তিহার কথাটা কোনো তামাশার চেয়ে কম লাগল না আয়াশের কাছে। সেও হেসে দিয়ে বলে ওঠে,

“সিরিয়াসলি অন্তিহা? আমার টাইপের না। শি ইজ সো ক্রিঞ্জ। ১০ মিনিট পরপর কল দিয়ে আমাকে বিরক্ত করে, সেদিন ড্রেসের ওপর আইসক্রিম ফেলে দিয়েছিল। হাউ কুড আই লাইক হার? আমি শুধু পুতুলকে চাই।”

​অন্তিহা চোখ সরিয়ে রাস্তায় তাকায়। আয়াশ ফের বলল,

“তবে কিউট আছে, বাচ্চামো করে।”

​“কিউট আবার ক্রিঞ্জ?”

​আয়াশ অল্প হাসে। গাড়িটি আগাচ্ছে, অন্তিহা বলল,

“আশার সাথে আপনার না গেলেও হয় জানেন তো, মেয়েটা রেগে যাবে আপনাকে দেখলে।”

​“সে অসুস্থ, এভাবে এত দূর একা যাওয়া ঠিক হবে না। আর এমনিতেও আমি ওকে একা ছাড়তে পারব না।”

_____

​পেরোল দুটো দিন। আশার জন্য সকালের ফ্লাইট বুক করা হয়েছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই আশাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে এসেছে সৃজন। আয়াশের যাওয়ার বিষয়টা আশার কাছে একদমই অজানা। সৃজনের বাড়ির সামনেই আয়াশ অন্তিহার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রয়োজনীয় কিছু হয়তো বলছে, তার ফ্লাইটের জন্য এখনই চলে যেতে হবে। আশা হয়তো এয়ারপোর্টের ভেতরে চলে গেছে ইতিমধ্যেই। আয়াশ গাড়ির দরজাটা টান দিয়ে খুলতেই সামনে এসে একটি বাইক থামে। একদম এলোমেলো শার্ট, ময়লা হয়ে থাকা প্যান্ট। বাইকটা হয়তো কোনোক্রমে সাইড করে ছুটে অন্তিহার ঠিক সামনে এসে থামে অহীন,

“আশু চলে গিয়েছে?”

​অন্তিহা হতবিহ্বল হয়ে উত্তর করে,

“অনেক আগেই গিয়েছে।”

​“শিট, এত জেদ! আমাকে আগে বলবি তো স্টুপিড।”

​অন্তিহাকে রেখে কোনোক্রমে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে বাসায় প্রবেশ করে অহীন। ওর এমন হন্তদন্ত অবস্থা দেখে তাকিয়ে আছে বাকিরা। সে নিজের রুমে গিয়েই জেইনকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“প্যাকিং করেছ?”

​“হ্যাঁ, আমার রুমে দেখো তোমার লাগেজ।”

​“জানি না কী হবে, সব টিকিট আগে থেকে বুকড।”

​পরের জামাটা তাড়াহুড়ো করে ছাড়িয়ে গায়ে একটা ভালো শার্ট পরে নিল সে। লাগেজ হাতে তুলে জেইন ও সৃজনকে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিয়ে নিল। সৃজন পেছন থেকে বলে,

“সাবধানে যেও, আর ইমার্জেন্সি টিকিট না পেলে ফিরে এসো, কালকে বা পরশু যেতে পারবে।”

​তাদের ও উত্তর দিল না, শুধু হাতের ইশারায় বিদায় দিয়ে দৌড়ে নিচে নামল সে। নিচে তখনো আয়াশ দাঁড়িয়ে আছে; তার তো চলে যাওয়ার কথা ছিল, তবে গেল না কেন? ফোন কানে ধরেই আছে অহীন বেচারা ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছে। অন্তিহা ওর এতটা অস্থিরতা দেখে এগিয়ে আসে, একটু কাছে গিয়ে ফিসফিস করে গম্ভীর গলায় বলল,

“আয়াশ যাচ্ছে ওর গাড়িতে যেতে পারেন চাইলে আপনি।”

​অহীন তাকাল না তার দিকে একবারও। ট্যাক্সি আসার হদিশ নেই কোথাও। অন্তিহা হয়তো একটু গলল মানুষটার দিকে, বলল,

“আয়াশ বাংলাদেশ যাবে, আশাকে বড্ড ভালোবাসে। আপনি তো টিকিট পাবেন না, আর যে সময় আছে তাতে অসম্ভব। আয়াশকে বলে কয়েক যাওয়া থেকে থামাতে পারলে একটা সিট পেতে পারেন।”

​অহীন তাচ্ছিল্য করে বলল,

“আর ও আমার জন্য আশার সাথে যাওয়া ক্যানসেল করবে কেন?”

​“কারণ আয়াশ আশাকে ভালোবাসে। এতগুলো দিন আশা আপনার অপেক্ষা করেছে, আয়াশ নিশ্চয়ই চাইবে আপনাকে সামনে পেয়ে আশা শান্তি পাক।”

​এতগুলো কথার মাঝেই যেন সে প্রশান্তি খুঁজে নিল নিজের। সে অন্তিহার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে,

“আমার অপেক্ষা করেছে?”

​অন্তিহার ভালো লাগছে না এসব বলতে, তবুও আশা যাওয়ার সময় কত আপসেট ছিল ভেবেই হয়তো বলছে। অহীনকে জবাব দিল না আর। এতে অহীন ওর সামনে এসে নরম গলায় বলল,

“তাহলে কথা বল, কোনোভাবে টিকিট পেলেই হলো আমার।”

​“আমি কেন বলব? আপনি বলুন।”

​“অন্তু?!”

​নাহ, অন্তিহা আর কথা বলল না একটাও। আয়াশের দিকে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে শুরু করে। সিঁড়ি দিয়ে সৃজন নামছে। সময়ও খুব কম হাতে। অহীন আশার সাথেই যেতে চায় যেমন করেই হোক। অতঃপর নিজের ইগোকে সাইডে রেখে আয়াশের কাছে এসে দায় গম্ভীর গলায় বলে,

“হেই?”

​“হোয়াট?”

​তার ‘হেই’-এর উত্তর এর চেয়ে সুন্দরভাবে পাওয়ার আশা করা যায় না আয়াশের কাছ থেকে। অহীন তো ফেঁসেছে একটা জঞ্জালে। নিজের ভুল নিজেকেই শুধরাতে হবে। গলা খাঁকারি দিয়ে ভারি গলায় বলল,

“টিকিট ক্যানসেল করে দে।”

​আয়াশ ঠোঁট উল্টায় ভাব নিয়ে, একটু তাচ্ছিল্য করে বলে,

“এটা রিকোয়েস্ট? নাকি হুমকি?”

​অহীন এবার ওর দিকে তাকায় আর একটু বিরক্তি নিয়ে বলে,

“লিসেন, আমার পেঁচি তোকে দেখলে বিরক্ত হবে। তার চেয়ে ভালো তুই যাস না। আমি যাই? সো টিকিট ক্যানসেল করে তুই সুপারিশ করে দিলে আমার ওটা পেতে সুবিধা হবে।”

​“আর আমি কেন পুতুলকে আবার নিজের দিকে ফেরানোর সুযোগ হারাতে যাব?”

​অহীন ফোঁস করে শ্বাস নেয়। এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখল ট্যাক্সি চলে এসেছে। সৃজন ওর লাগেজ রেখে দিচ্ছে ট্যাক্সিতে। অহীন একটু অহংকারের সাথেই বলল,

“আমি যদি এখন ওকে ছেড়েও দেই ও তোর হবে না। কারণ ইতোমধ্যে আশু কেবল আমার হয়ে গিয়েছে।”

​আয়াশ তীক্ষ্ণ চোখে অহীনের দিকে তাকায়, ঠোঁট টিপে হেসে বলে,

“ওকে দেন সে ‘প্লিজ’।”

​“হ্যাভ ইউ লস্ট ইয়োর মাইন্ড? আমি প্লিজ বলব? তোকে?”

​আয়াশ চোখের সাহায্যে ভাবহীন ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল- হ্যাঁ, বলতে হবে। সাথে হাতের ঘড়িটায় সময় দেখিয়ে দিল। টাইম নষ্ট হচ্ছে। কিছু সময় পর টিকিট বাতিল করলেও বুক করা যাবে না। অহীন নিজের কপালেই নিজে হাত দেয়। বউটার জন্য আজ কত কী-ই না করতে হচ্ছে! এবার তিন দিন হাসপাতালে থেকেছে, এর পরের বার এক মাস রাখব তখন দেখব কই পালায় এই মেয়ে। ভাবনা শেষ করেই অস্ফুটে ভারি গলায় বলে,

“প্লিজ।”

​“এটা কেমন প্লিজ? মনে হচ্ছে কেউ ছুরি ধরে বলাচ্ছে। আমি একদম অনেস্ট একটা প্লিজ চাই। যেটা প্লিইইজ-এর মতোই শোনাবে।”

​অহীন এবার না চাইতেও নিজের দুটো হাত আয়াশের সামনে জোড় করে, চোখ বন্ধ করে মাথা নুইয়ে মিনতি করে বলল,

“প্লিইইইজ স্যানিটাইজার।”

​আয়াশের ঠোঁটের কোণে একটু ফিচলে হাসি দেখা গেল। অহীন নুইয়ে থাকা অবস্থায় সে বলল,

“ওকে ডান।”

​অহীন মাথা তুলে একগাল হেসে বলল,

“সত্যি?”

​“ইয়েস, বাট অন ওয়ান কন্ডিশন।”

​ফোঁস করে শ্বাস দিয়ে অহীন হতাশ গলায় বলে,

“ইয়া ইয়া, বল কী করতে হবে, করিয়ে নে। তোরই দিন।”

​“ফ্লাইটের আরও ৩ ঘণ্টা বাকি, যেতে সময় লাগবে আমাদের ১ ঘণ্টা। যদি আমার আগে যেতে পারিস এয়ারপোর্ট তবেই আমি তোর হয়ে কথা বলব। আর না হলে আমিই চলে যাব।”

​অহীন কিঞ্চিৎ হাসে। বাইকে করে গেলে এই গাড়ি ছাড়িয়ে যাওয়া কোনো বিষয় না। সে হেসে গিয়ে নিজের বাইকে বসে মাথায় হেলমেট দিয়ে সৃজনকে বলল ট্যাক্সি করে যাতে লাগেজ নিয়ে আসে তার। আয়াশ গিয়ে নিজের গাড়িতে ওঠে। হেলমেটের সামনের গ্লাসটা নিচে নামিয়ে দিয়ে হাতের ইশারায় আয়াশকে ওকে। আয়াশ এতে অদ্ভুতভাবে হাসে একটু। হঠাৎ একই সাথে একটা দমকা হাওয়ার সাথে ওরা দুজন চলে গেল সামনের দিকে। পেছনে ধুলোগুলো বাতাসের সাথে চারপাশ ছড়িয়ে পড়েছে। ওপর থেকে জেইন তাকিয়ে আছে। সৃজন গিয়ে বসে ট্যাক্সিতে। অন্তিহা ফোঁস করে শ্বাস নিল। এরা ভালো হবার নয়, এমন পরিস্থিতিতেও নিজেদের ঝামেলাগুলোকে মোক্ষম রেখে আগাচ্ছে। কিন্তু অহীনকে জানালো কে আশা আজ চলে যাবে? সৃজনের ট্যাক্সিটা চলে যেতেই অন্তিহা জেইনকে বিদায় দিয়ে নিজেও সেখান থেকে চলে যায়।

=_____

​দীর্ঘ ঘণ্টা পর বাতাসের মতো অহীনের বাইকটা এসে এয়ারপোর্টের সামনে থামে। তার ঠিক ৩০ সেকেন্ড ব্যবধানে আয়াশ এসে থামে। নাহ, আয়াশ সহজভাবে নেয়নি অহীনকে। চ্যালেঞ্জটা টক্করেই হয়েছে। অহীন পকেট হাতড়ে ফোনটা বের করে দূরে গাড়িতে বসে হাঁপাতে থাকা আয়াশকে টাইম দেখিয়ে চেঁচিয়ে বলে,

“হেই আই অ্যাম উইন। সময় কম, প্লিজ যা করার তাড়াতাড়ি কর। তারপর আচ্ছা মতো হাঁপাতে পারবি।”

​আয়াশ সত্যি সময় ব্যয় করল না একটুও। গাড়ি থেকে নেমে এয়ারপোর্টের ভেতরে যেতে যেতে বলে,

“আমি তোকে ইচ্ছে করে জেতালাম কেবল পুতুলের জন্য।”

​“আচ্ছা তাই? ফ্রান্স ব্যাক করার পর আবার হবে, তখন দেখব তোর ইঞ্জিন কেমন চলে।”

​“ডোন্ট ইউ ডেয়ার ফাক উইথ মি। কারণ আমি সব পারি।”

​অহীন ফোঁস করে হেসে দিয়ে পরক্ষণেই বলে ওঠে,

“বাসর করে দেখাস তবেই মানব স্যানিটাইজার সব পারে।”

​তাদের হালকা তর্কের সাথেই গিয়ে প্রবেশ করে ভেতরে। অহীনের বুকটা ধুকপুক করছে অজানা শঙ্কায়। আয়াশ তো মেনে নিল কিন্তু এদিকে যদি না যেতে পারে? ভয় হচ্ছে বাড়িতে গিয়ে আশা সব বললে তার কপালে দুর্দশা আছে। ভাবতেই শরীর কেঁপে ওঠে- আকাশ তার বারোটা বাজাবে। আশা কি এসব কথা বলবে বাসায়? যদি বলে মেয়েটা যা জেদি? ছিহ। না না আশু এতটাও লজ্জাহীন নয়।

______

​প্লেনের ভেতরে লম্বা লম্বা সিটগুলো দেখে দেখে হাঁটছে অহীন। শেষ মুহূর্তে টিকিট পাওয়া ভাগ্যের ওপর বাহবা না দিয়ে উপায় কই? শরীর ঘামে জর্জরিত তার, ভাবা যায় এই গরমেও ঘাম চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। ফার্স্ট ক্লাসের সিট বুক করেছিল আয়াশ, তাই খরচাও বেশি লেগেছে অহীনের। সে নিজের টিকিটের দিকে না তাকিয়ে খুঁজে চলেছে আশাকে। হাতের উল্টো পিঠে কপালের ঘামগুলো মুছে নিল। হাত সরাতেই কাঙ্ক্ষিত নারীটির ওপর চোখ যায় তার। ক্লান্তি মুছে একচিলতে হাসে। কেমন ঘুমিয়ে আছে একদম নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতো। এতটুকু কাণ্ডজ্ঞান নেই মেয়েটার, এমন সময় কেউ এমন ভাবে ঘুমায়? সে এগিয়ে যায় ওই দিকটায়। আশার পাশেই মডার্ন একটি মেয়ে বসেছিল। অহীন নিজের কাঁধের ব্যাগটি থেকে কিছু একটা বের করে মেয়েটির দিকে হালকা ঝুঁকে অতি মিষ্টি স্বরে বলল,

“হেই বিউটিফুল, ইউ লুক গর্জিয়াস।”

​হঠাৎ মুখের সামনে অপরিচিত কাউকে দেখলে তো একটু অবাক সব মেয়েরাই হয়। মেয়েটি তার দিকে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

“থ্যাংক ইউ, বাট হু আর ইউ?”

​অহীন হাত বাড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে দিল। মেয়েটি হালকা লজ্জার সাথে হেসে মাথা দোলায়, মানে কী আছে হাতে? অহীন হাত উল্টে মেয়েটিকে ছোট একটা চকলেট এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলে,

"একচুয়ালি, শি ইজ মাই ওয়াইফ। আই হ্যাভ আ ফার্স্ট-ক্লাস সিট। উড ইউ মাইন্ড এক্সচেঞ্জিং ইট উইথ মি সো আই ক্যান সিট উইথ হার?”

​মেয়েটি পাশে তাকায়, আশা ঘুমে বিভোর। আবার অহীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

“আর ইউ সিওর?”

​“ইয়া, প্লিজ।”

​হাসল মেয়েটা। কে না চায় সফরটা আরামদায়ক হোক একটু? তার ওপর একটা ছেলে এত মিষ্টি করে অনুরোধ করলে কি ফেলা যায়? রাজি হয়ে গেল। অহীনের হাতে চকলেটটা নিয়ে সিট থেকে নেমে হাসির সাথে বলল,

“ইউ ডিজার্ভ হার, বাই।”

​মেয়েটি চলে যেতেই ধপ করে আশার ঠিক পাশে বসল সে। সঙ্গে সঙ্গে একটু নড়েচড়ে ওঠে আশা। জানালার পাশে থাকায় মাথাটাও সেখানেই রেখেছে। অহীন এমন করে বসার পরেও মেয়েটা উঠল না, তাই বেশ বিরক্তির সাথেই হিসহিসিয়ে অহীন বলল,

“এমনি এমনি পেঁচি বলি না, দিনের বেলা এমন মরার মতো ঘুমিয়ে আছে। পাশে আমি না হয় অন্য কেউ হলেও বুঝত না।”

​সে নিজের সমস্ত কিছু ঠিকঠাক করে সুন্দর মতো বসে আশার দিকে তাকায়। ঘাড়টা বেঁকে আছে, পরে ব্যথা হতে পারে একটু। সে উঁচু হয়ে আশার ঘাড় আস্তে করে তুলে নিজের কাঁধে এনে রাখে। একজন প্লেন অ্যাটেনডেন্ট কাছে এসে আশাকে ডাকতে চাইলে অহীন তাকে চুপ করিয়ে দিল ঠোঁটে তর্জনী দেখিয়ে। মেয়েটি হেসে কিছু একটা বলে চলে যায়। আশার এলোমেলো চুলগুলো অহীনের নাকে এসে লাগছে বারবার। সেদিনের পর মেয়েটাকে আজ প্রথম এত কাছে পেয়ে কেমন অদ্ভুত মাতাল মাতাল লাগছে নিজেকে। এই মুহূর্তে আফসোস হচ্ছে কেন আসল না ভেবে। হয়তো এত দিনে রাগ ভাঙিয়ে আরও আদর কতই করতে পারত। শুকনো ঠোঁট জিব দিয়ে ভিজিয়ে নাকটা আশার চুলে গুঁজে রাখে। আশার হঠাৎ একটু নড়ে হাতটা অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অহীনের উরুর ওপরে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে হালকা কম্পনের সাথে থমকে গেল বেচারার পুরো শরীর। হাতটা দিয়ে আশার হাত আলতো করে মুঠোয় নিয়ে আবারো চুলে নাক ডুবিয়ে গেয়ে ওঠে নেশাতুর গলায়,

Aaraam de tu mujhe,

barson ka hun main thaka

Palkon pe raatein liye,

tere waste main jaga

​Mere har dard ki gehrai ko

mehsoos karta hai tu

Teri aankhon se gham

tera mujhe maaloom hone laga

​Tu mila to Khuda ka sahaara mill gaya

Tu mila to Khuda ka sahaara mill gaya

​হাতটাকে স্থির রাখার অনেক প্রয়াস করেও পারছে না সে। এটা একটা পাবলিক প্লেস, হয়তো ভুলেই গিয়েছে। হাতটা বাড়িয়ে ছুঁতে যাবে অমনি দুটো সিট সামনে থেকে হালকা শব্দ আসে। থতমত খেয়ে হাত সরিয়ে সামনে তাকায় সে। একজন লোকের কোলে একটা ছোট বাচ্চা, লোকটি তাকে ‘হিশশ’ বলছে। মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিয়ে আশার হাতটা সরিয়ে দিল উরু থেকে। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে বারবার, আশার থেকে দূরে থাকতে হবে ভেবে নিজের মনোযোগ অন্য দিকে করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। আশার ঠিক কানের কাছে একটু ঝুঁকে অহীন গালে আলতো করে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নেয়। হয়তো আজ আশা শুনবে না বলেই বলা হচ্ছে কথাটা। এবার গভীর গলায় বলে,

“ভালোবাসি পেঁচি খুব, প্লিজ ডোন্ট লিভ মি অ্যালোন। তোর সব জেদ গুলো মেনে নেব, তবুও ভাবিস না তুই ছাড়া দ্বিতীয় নারীকে জীবনে স্থান দেব।"

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন