#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৩২
"পেঁচি শোন জান আমার কথা, তুই কখনো আমাকে বলার সুযোগ দিস না কেন?”
না, সামনে থেকে উত্তর অহীন পেল না। মলিন মুখে কাতর গলায় ডেকেই যাচ্ছে আশাকে। মেয়েটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এত দিন হয়ে গেল সুস্থ হলো না মেয়েটা, ভাবতেই নিজের ওপর রাগ হয় অহীনের। এতটা রুড সে কবে হলো যে মেয়েটার গমন অবস্থা হয়েছে ছিহ। রাস্তার মোড়ে এসে থেমেই ফোনটা কানে গুঁজে আশা, অহীন ঠিক ওর পাশে এসে দাঁড়ায়, টেনে নেয় বড় লাগেজটা।
“হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে? আমি সাহায্য করি আয়?”
আশা তার কথা অশোনা করে লাগেজটা টেনে নিল নিজের হাতে, একটু দূরে সরে দাঁড়ায় এবার। একটি ট্যাক্সি এসে সামনে থামতেই আশা ওটাতে বসে। অহীন বসতে নিলে ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে,
"আপা, আপনি কি চেনেন এই লোকরে? আপনারা কি দুজন?"
"না চাচা, সেই এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে স্টলক করছে।"
অহীন চমকে গিয়ে তাকে বলে,
"আস্তাগফিরুল্লাহ! পেঁচি, আমাকে স্টকার বানিয়ে দিলি?"
"কে ভাই আপনি? আর চাচা দেখছেন, পেঁচি বলছে, এটা তাদের কোনো কোড হবে হয়তো, নিজের দলের লোক ডাকছে, কানে হয়তো ইয়ারফোন আছে।"
ড্রাইভার একটু রেগে গেলেন, ওনার মনেই হচ্ছে এরা ওনাকে বিরক্ত করছেন ইচ্ছাকৃতভাবে। তিনি এবার বেশ ক্রূর গলায় বললেন,
"দেখো মা, নামো গাড়ি থেকে, তোমাকে আমি নেব না। তোমাদের ঝামেলা নেমে মেটাও।"
তৎক্ষণাৎ আশা ন্যাকা কান্না জুড়ল হি হি করে,
"আআআ চাচা এমনটা করবেন না প্লিজ, দেখুন একে দেখেই মনে হয় কোনো গাঁজাখোর হবে। আজ এর সাথে আমাকে রেখে যাবেন, কাল যখন খবরে বড় বড় করে হেডলাইনে লেখা থাকবে একটি অসহায় মেয়েকে একটি গাঁজাখোর ছেলে এয়ারপোর্ট থেকে জোর করে তুলে নিয়েএএএএএএএ......"
থামল আশা, হো হো করে কান্না করছে। চোখের পানি দেখা না গেলেও কান্নার শব্দে মনে হচ্ছে হয়তো মেয়েটার কেউ মরেছে। অহীন থ মেরে তাকিয়ে আছে, কতটা নাটকবাজ এই মেয়ে ভাবতেই ভয় হচ্ছে। আশা উঁচু হয়ে ড্রাইভারের সিটে হাত রেখে অদ্ভুত ব্যথার ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
"পারবেন চাচা? পারবেন তখন আপনি আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে? মনে হবে না আপনি একটা অসহায় মেয়েকে একটা স্টকারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন? আর সেই স্টকার মেয়েটিকে নিয়ে ছিঃ ছিঃ ছিঃ!"
ড্রাইভার সব বুঝলেও কৌতূহল হলো জানার একটা কথা, নিজেকে দমিয়ে না রেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন,
"স্টকার কী?"
আশার কান্নার মাঝেই তৎক্ষণাৎ ড্রাইভার এই কথাটি বললেন, যা শুনে অহীন ড্রাইভারের দিকে ঝুঁকে আশার দিকে তাকিয়ে মুখে হাত দিয়ে হো হো শব্দ করে হেসে দিল। কাকে এত সময় ধরে বোঝাচ্ছে, মেয়েটার কান্না কি তবে বিফলে গেল? আশা ফোঁস করে শ্বাস নেয়। অতঃপর এবার নরম গলায় বলে,
“চাচা দয়া করে চলুন, যেহেতু গাড়ি আমি বুকিং করেছি আমি একাই যাব, আমি ওনাকে চিনি না।”
ড্রাইভার গাড়িটা স্টার্ট করে। শব্দ হতেই অহীন জানালা দিয়ে আর একটু ঝুঁকে আশার মুখ পানে, এতে সে দূরে চলে গেল খানিকটা। অহীন নরম গলায় বলে,
“জান তোর জন্য এতটুকু সময়ে আমি কত কষ্টে টিকিট কেটে আসলাম, এটার কোন মূল্য নেই তাই না?”
আশা তাকে উত্তর দিল না একটুও। এবার বিরক্ত হয়ে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“চাচা আমি অসুস্থ প্লিজ চলুন, এবার সামনে আসলে প্রয়োজনে পিষে ফেলুন আই ডোন্ট কেয়ার।”
আশার দিকে অবাক করুণ চোখে তাকায় সে। কতটা সহজে বলে দিল আশা! অহীন চোখে এক আকাশ সমান জেদ দেখিয়ে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ায় দুই হাত মেলে আর চেঁচিয়ে বলে,
“আমি তো তোর কেউ না, নগণ্য একটা স্টকার। তাহলে মায়া দেখাস না, যা পিষে দিয়ে যা এই দেহ, যেটা দিয়ে তোকে আঘাত করেছিলাম আমি।”
ড্রাইভার গাড়িটা হঠাৎ ব্রেক চাপলেন, ফলে ক্ষিপ্ত হলো আশার মুখটা আরও। অহীনের দিকে তাকায় রুদ্ধ নয়নে। অহীন ফের বলে,
“আর কীভাবে করলে তোর অভিমান ভাঙবে আমাকে বোঝা, নাকি জেদ-ই সব সময় করবি?”
ড্রাইভার বিরক্ত হলেন। আশার চাওয়া না চাওয়াতে তিনি তো আর পিষতে যাবেন না এই ছেলেকে, একে তো এই রাতের বেলা তার ওপর এসব যেন নিতে পারছেন না তিনি। বললেন,
“দেখো মা, বুঝতে পারছি তোমাদের সমস্যা, কিন্তু আমার বাড়িতে যেতে হবে।”
“৫ মিনিট চাচা।”
আশা গাড়ি থেকে তৎক্ষণাৎ নেমে আসে। এয়ারপোর্টে এত রাতেও যেন মানুষের কোলাহল কমছে না। সে ঠিক অহীনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
“কী সমস্যা?”
অহীন এগিয়ে আসে তার দিকে, হয়ত নিজের ভুলগুলোকে প্রকাশ করে অনুতপ্ত হতে চায়। কাঁধে হাত রেখে একটু কাছে টেনে নিল আশাকে অতঃপর কাতর গলায় বলল,
“আশু এতটা পাষণ্ড হোস না, আমি ক্লান্ত, তোকে একা ছাড়তে পারব না এই অবস্থায় এত রাতে।”
পরক্ষণেই অহীনের প্রশস্ত বুকে দুই হাতে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে আশা,
“পুরো একটা রাত আমার ওপর জানোয়ারের মতো আচরণ করে পরের দিন একা রেখে চলে যাওয়ার সময় এই ভাবনাটা মাথায় আসেনি তোমার? সাহস হয় কেমন করে আমার পথ আটকানোর?”
অহীন জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে আশার কাছে আসে, ধরা গলায় বলে,
“রেগে ছিলাম তাই বুঝতে পারিনি, একটু বেশি হয়ে গেছে সত্যি বুঝতে পারিনি রাগে এত বড় ভুল করব আমি।”
তাচ্ছিল্য হাসে আশা, ঘৃণার সাথে বলে,
“একটু বেশি? এখনো শুধু ভুল-ই মনে হচ্ছে সব কিছু? অহীন ভুল মানুষ করে, তখন তুমি মানুষ ছিলে না। আমার সাথে যে আচরণ তুমি করেছ ওমন আচরণ হয়ত রাস্তায় কোনো মেয়েকে রেপ করার সময় র্যাপিস্টও মেয়েটার সঙ্গে করে না।”
থেমে যায় তার কথা, রাগ ও ঘৃণায় গিজগিজ করতে করতে নিজের গায়ে জড়ানো ওড়নাটা গলার কাছ থেকে সরিয়ে দেয়। ফলে কালো হয়ে থাকা দাঁতের চিহ্নগুলো দেখা যায় স্পষ্টভাবে। চোখ জোরা কাঁপছে অহীনের এতটুকুতেই নিজেকে বড্ড অনুতপ্ত ফিল হচ্ছে। আশা এগিয়ে গিয়ে দেখায় সে গুলো,
“দুটো সপ্তাহ, তার চেয়েও বেশি সময় কেটেছে ওই অন্ধকার রাতে, এখনো ক্ষতগুলো ভরেনি আমার এগুলো একটু বেশি? আরও আছে।”
বলেই জামার হাতা গুটিয়ে দেখায় হাতে নখের আঁচড়ের দাগ চোখ বন্ধ করে নেয় অহীন, সাহস কি আছে মেয়েটার চোখে তাকানোর? আশা বলল,
“এখানে কুকুরের মতো আঁচড়েছ আমাকে, তখন কী মনে হয়েছিল তোমার সত্যি বলো তো? আমাকে মানুষ মনে হয়নি তাই না? আমার হাঁটতেও কষ্ট হয়, হাঁটতে পারি না খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটি এখনো।”
বলেই ঝুঁকে পরনের লুজ প্লাজো ওপরে তুলতে নিলে অহীন ওর সাথে বসেই থামিয়ে দেয়। চোখে ইশারায় নিজেকে অনুতপ্ত বোঝাতে চায় সে। তবে আশা হাতটা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিয়ে সে ভাঙা গলায় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলে,
“পায়ে বেঁধে দিয়েছিলে, সেখানে কেটে পুরো রাত আমার ওড়না রক্তে ভিজেছে, খোঁজ করেছিলে? আমি তোমার মতো নই। তুমি অর্ধনগ্ন ছিলে একটা মেয়ের সাথে। আমি বলাতে আত্মসম্মানে লেগেছে তাই এটা করেছ নিজেকে পবিত্র প্রমাণ করতে? হাহ, যে পুরুষ নিজের বিয়ের হালাল একটা দলিলের সাহসে স্ত্রীর সাথে এতটা অমানবিক হতে পারে, তাকে আমি এখনো বিশ্বাস করি না আর কখনো করব না। উল্টো আমার মনে হচ্ছে তুমি আরো এমন করেছ, আমি প্রথম নই তোমার জীবনে। আরও অনেকে ছিল। ”
একটু থেমে কান্না করে নাক-মুখ দুই হাতে মুছে নিয়ে সে ফুঁপিয়ে বলতে থাকে,
“বিয়ে তো করে রেখেছ, আমাকে কিনে নিয়েছ। তোমাকে তো ছাড়ব না এটাও বুঝেই নিয়েছ। আরও অনেক করতে পারবে এমন অমানবিক অত্যাচার। কয়েকটা দিন পরিবারের কাছে থাকব। দয়া করে আমাকে শান্তি দাও। আমি চাই না আমার আব্বু যে তোমাকে এত বিশ্বাস করে তার বিশ্বাসটা হঠাৎ কাঁচের টুকরোর মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাক। তোমার ওই পাপি আর মাম্মাম, তাদের কাছে থেকেও দম বন্ধ লাগছিল আমার, চলে এসেছি তাই। একা থাকতে চাই, কেন আসলে তুমি? আমি সুইসাইড করলে আমার আব্বু মরে যাবে, নয়তো এখন বেঁচেও থাকতাম না। তোমার স্পর্শকে এতটা ঘৃণা করি আমি।”
অতঃপর তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
“আমার সাথে একদম ফাজলামো করবে না তুমি। সম্পর্ক পাল্টে গিয়েছে আমাদের, আমি তোমার কাজিন নই বা আগের মতো বন্ধুও নই আর না কখনো হতে চাই।”
আশা গিয়ে গাড়িতে বসে। অহীন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। গাড়ির হর্ন বাজতেই হুঁশ ফেরে, সরে যায় পথ থেকে। সাইডে সরে যেতেই গাড়িটা কেমন মুহূর্তে চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল। আর সে তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে। সত্যি তাকে রেখে চলে গিয়েছে আশা। হঠাৎ হাতের উল্টোপিঠে দুই ফোঁটা বৃষ্টির পানি এসে টপটপ করে পড়ে তার। আকাশটা আধার করে নিয়েছে মেঘগুলো। অসময়ের বৃষ্টিটা একদম আচানকই হয়। সে ছুটে একটি ছাউনিতে দাঁড়ায়। অন্ধকার রাতটা বিষণ্ণতায় ছেয়ে গিয়েছে কেমন। পকেট থেকে ফোনটা বের করে কারো নাম্বারে কল দিয়ে বলল,
“গাড়ি পাঠা এয়ারপোর্ট।”
সময় লাগল না গাড়িটা আসতে। একটি সাদা গাড়িতে হাসি দিয়ে উঠে বসল, তবুও মনের কোনো এক কোণে একটু তো তিক্ততা কাজ করছে তার।
----
চারদিকে ফজরের আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আকাশ হালকা পরিষ্কার হচ্ছে। বৃষ্টিভেজা রাস্তাগুলোতে ছাদের পাইপগুলো দিয়ে এখনো টপটপ করে পানি পড়ছে। ছোট ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুমে সবেই নামাজ সেরে নামাজের পাটিটা ভাঁজ করে রাখছে কুহু। কানে বারবার একই ডাক বিধছে,
“এই মহিলা, পেঁচি এত সময় লাগে কেন তোর? সকালে আমি অফিস যাব তো নাকি?”
বিরক্তির ‘চ’ বলে ভ্রু কুঁচকে নেয় কুহু, শরীরটা রিরি করে ওই লোকের নাটক দেখলে। সে পাল্টা জবাব দেয়,
“তাহলে ঘুমাও তুমি, তোমাকে কে বলেছে আমার অপেক্ষা করতে? গরু একটা।”
অমনি ঢুলুঢুলু পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে অন্তিক, চোখে রাজ্যের ঘুম। কুহু যেন থমকে গেল ঘুমন্ত নেশাময় মুখটা দেখে। গালগুলো কেমন চিকচিক করছে, চুলগুলো একদম এলোমেলো। লোকটার বয়স বাড়ে নাকি কমে বুঝতে পারছে না। সে একদম তার কাছে এসে পুরনো দিনের ন্যায় কোমর দুই হাতে পেঁচিয়ে ধরে কাঁধে কপাল ঠেকিয়ে দেয়। কুহুর শরীরের অর্গানিক গন্ধ শুঁকে ঘুমু গলায় বলে,
“একা একা ভয় হয় আমার, যদি কিছু হয়ে যায় তোর কী হবে, তাই তোকে রাখি সাথে।”
অন্তিককে নিজের থেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চেয়েও পারল না সে। কিসের রোজ রোজ এমন চিপকা চিপকি, ভালো লাগে না। সে রুষ্ট গলায় বলে,
“পুরুষ মানুষ হয়ে জিন-ভূতের এত ভয়? নাটক করছ নাকি? আমি বাঁচাব তোমায়?”
“তুমি তো ভূতেরও নানি ডাইনি, তুমি সাথে থাকলে কোন ভূতের সাধ্যি আছে আমাকে ছোঁয়?”
একইভাবে জড়িয়ে রেখেছে সে কুহুকে, এতে মেয়েটা একটু ভড়কিয়ে বলে ওঠে,
“কুত্তা তবে রে দেখাচ্ছি দাঁড়া।”
বলেই অন্তিকের পিঠে থাপ্পড় দিতেই যাবে অমনি দরজায় কলিং বেল বাজে। অন্তিক তার কোমরের চাপ আরও শক্ত করে শরীরের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দিয়ে আতঙ্কিত সুরে বলে,
“ভূত।”
কুহু ঠিকই বুঝতে পারছে সকাল সকাল ওর সাথে ঝাপটাঝাপটি করার জন্য এসব নাটক করছে অন্তিক। সে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“কেউ এসেছে, নাটক পরে কর।”
অন্তিক ছাড়ল না, আবারও একইভাবে জড়িয়ে ধরে বলে,
“না না ছাড়ব না আমি। এত সকালে কখনো কেউ আসে না, আজ হঠাৎ কে আসবে? তোকে ছাড়লে আমি কীভাবে থাকব?”
ফিক করে হাসে কুহু, অন্তিককে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
“ভাই তুমি থামো, তোমার এসব ঢং আমি বুঝি। কে এসেছে দেখতে দাও, হয়ত কোনো বিশেষ প্রয়োজনে এসেছে।”
“যদি সত্যি শাঁকচুন্নি হয় বাহিরে?”
“তোমাকে বিয়ে করিয়ে দেব তার সাথে।”
“তাহলে ঠিক আছে। নাটকের নাম হবে, ডাইনি ও শাঁকচুন্নি যখন এক বাসর ঘরে। উফফ বেস্ট ফিলিং এভার। তাড়াতাড়ি খোল দরজা তারপর তিনজন মিলে…।”
অন্তিক বারবার শরীর ঝাঁকি দিয়ে নিজের উত্তেজনা বোঝাচ্ছে তাকে। কুহু চোখ গরম করে তাকায় তার দিকে। ফলে ঠোঁটে তর্জনী রেখে চুপ হয়ে যায় অন্তিক। কুহু মাথা দুলিয়ে দরজা খুলে দেয়। সামনে কেউ নেই, পরক্ষণেই নিচের দিকে তাকাতেই ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে,
“আহহহহহ।”
লম্বা চুলগুলো উল্টে দিয়ে বসে আছে একটা অবয়ব। অন্তিক তড়িৎ বেগে কাছে আসতেই কুহু জড়িয়ে ধরল তাকে। চুলগুলো পেছনে ঠেলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই অন্তিক হো হো করে হেসে দেয়,
“শিট পেঁচি, এটা ভূত না এটা আমাদের অহীনের পেঁচি।”
হাসফাস করে কুহু দূরে সরে আসে তার থেকে। একটু রাগ নিয়েই বলে,
“সব তোমার দোষ।”
“আমি কী করলাম?”
কুহু পাত্তা দিল না তাকে। আশার দিকে তাকায়। কতগুলো দিন পর মেয়েটার মুখ দেখছে, চোখগুলো যেন জুড়িয়ে এল। এগিয়ে দুটো হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিয়ে কপালে পরপর কয়েকটা চুমু দিয়ে শুধায়,
“এমন হঠাৎ করে আসে কেউ?”
আশা স্বল্প হেসে জবাব দেয়,
“কেন খুশি হওনি তোমরা?”
অন্তিক এগিয়ে গিয়ে কুহুর থেকে ছাড়িয়ে নিজের বুকে টেনে কপালে চুমু দিয়ে আহ্লাদ করে বলে,
“কেন হব না মা? মায়ের মুখ দেখে কোনো সন্তান খুশি না হয়ে পারে?”
“তাহলে এত জেরা না করে ভেতরে চলো আমি খুব ক্লান্ত।”
আশাকে নিয়ে ভেতরে যাওয়ার সময়টা কুহু কয়েকবার দরজার দিকে দেখল। মায়ের মন ঠিক অহীন আর অন্তুকে দেখার জন্য ছটফট করছে। তাঁদের দেখা না পেয়ে জিজ্ঞেস করে,
“অন্তু আর অহীন কোথায়?”
“অন্তুকে তো জানোই পড়া ছাড়া কিছু বোঝে না, আর অহীন আসছে হয়ত পথে আছে।”
“একসাথে আসিস নি?”
আশা নিশ্চুপ হয়ে গেল মুহূর্তে। মাথা নিচু করে চোখ ঝাপটে কিছু বলার আগেই অন্তিক ওর মলিন মুঝে যাওয়া মুখটা দেখে কুহুকে বলল,
“উফফ থাম এবার, কালকে জেনে নেব সব, এখন ওকে খাবার দে। ক্লান্ত লাগছে বেচারিকে। শুকিয়ে গিয়েছে আমার মা-টা।”
কুহু তবুও না থেমেই জিজ্ঞেস করে,
“একটু পর ভোর হবে, এয়ারপোর্ট থেকে একা একা এসেছিস তুই, অহীন নেই কেন কী হয়েছে বলবি তো?”
আশার যেন একদম ভালো লাগছে না এসব। হঠাৎ চোখগুলো ভিজে গিয়েছে, ধরা গলায় বলে,
“অহীনের সাথে না আসলে রাখবে না বুঝি আমাকে?”
পরক্ষণেই হতবুদ্ধির মতো তাকায় কুহু তার দিকে। তার তো কথার মানে এটা ছিল না একদম। অন্তিক ফের জড়িয়ে ধরে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। এতেই ফুঁপিয়ে ওঠে আশা। তাকে সান্ত্বনা দিতে বলে,
“পাগলি মেয়ে, তুই অহীনের বউ না হলেও আমাদের আপন। তোকে ভালোবাসার জন্য ওই বেকুবটাকে প্রয়োজন হবে নাকি?”
কুহু এগিয়ে গিয়ে ওকে টেনে নিল নিজের কাছে। চোখের পানি মুছে দিয়ে খোলা চুলগুলো পেছনে করে দিল,
“পাগল আমি তো সহজ জিজ্ঞেস করেছি, যে অহীনের কেন লেট হচ্ছে? তোকে রাখব না কেন? অহীনের সাথে বিয়ে না হলে আসতি না? তখন আদর করতাম না?”
আশা এতগুলো দিন পর আপন মানুষের আহ্লাদ পেয়ে গলে গেল মুহূর্তে। মাথা দুলিয়ে কুহুর বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে। এরই মাঝে কুহু একটু লক্ষ করল আশার গলার কাছটায়। মুখে একটু লজ্জা মিশ্রিত হাসি ফুটল তার, হয়ত ওদের মধ্যে সুন্দর একটা সংসারের সূচনা হচ্ছে, যার জন্য একটু ঝামেলা হয়েছে। রুমে নিয়ে বসিয়ে দেয় তাকে। তার সাথে বসে অন্তিক গল্প করছে। কুহু গিয়েছে খাবারের ব্যবস্থা করতে। অন্তিক ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে আসে। মেয়েটার ফ্রেশ হতে হবে। সে কুহুর কাছে যায়। ফ্রিজ করা মাংস গরম করছে। সে তার পাশে গিয়ে কিচেন কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গভীর চিন্তিত গলায় বলে,
“কী মনে হয় কী হয়েছে?”
“তোমার আজর তোমার ছেলেতে ধরেছে।”
মুখটা ভোঁতা করে নিল অন্তিক, মেয়েটা তাকে সহ্যই করতে পারে না। সে কঠিন চোখে তাকাতেই কুহু বলে ওঠে,
“কী ভাই? আমি কী করে জানব? স্বামী-স্ত্রীর বিষয়, হয়ত হয়েছে টুকিটাকি নিয়ে সমস্যা। এগুলো কি এখন আমি জিজ্ঞেস করব ওদের?”
“অল্প থেকেই বাড়ে, জিজ্ঞেস কর। ছোট বিষয় হলে নিশ্চয়ই এমন হঠাৎ আসত না। আর বড় কিছু হলে মিটমাট করে দে।”
“আচ্ছা সময় দাও কিছুটা। সবে তো আসল থাকুক কিছুদিন, তারপর দেখি কী হয়। তোমার জাওরা ছেলে আসুক।”
_____
হোস্টেলের একটা সিঙ্গেল বেডে সটান হয়ে শুয়ে আছে অন্তিহা। পাশেই আর একটা বেডে শুয়ে ফোন দেখছে জেসি। মেয়েটা পুরো রাত ফোন দেখে। অন্তিহা চোখ বুজে কিছু ভাবছে হয়ত, হঠাৎ হতাশার সাথে বলে ওঠে,
“জেসি ভাইয়ার বিয়েটা তোমার সাথে হলে তুমি খুশি হতে?”
জেসির হাত থামে। মুহূর্তকাল কিছু ভেবে জবাব দেয়,
“আগে ভাবতাম খুশি হব, এখন ভাবি না।”
“কেন?”
“আমি একজনকে ভালোবাসি।”
তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে তাকায় অন্তিহা। আয়াশের মুখটা ভেসে ওঠে চোখে। অন্তিহা কি তাহলে আয়াশকে ভালোবেসে ফেলেছে? পাশ ফিরে উবু হয়ে ফোনে উঁকি দেয়। অন্ধকার রুমটায় একটা আলোই জ্বলছে জেসির ফোনে, সেখানে ‘স্যানিটাইজার’ দিয়ে সেভ করা একটি আইডিতে চ্যাট করছে। তার চিনতে ভুল কখনো হবে না আয়াশের প্রোফাইলটা। তাদের মেসেজগুলো খুব নিখুঁত খুনসুটিপূর্ণ। জেসি আড়াল করল না অন্তিহার থেকে। আয়াশ কথা বলছে এত রাত পর্যন্ত, দেখতে বেশ ভালোই লাগল অন্তিহার। অবশেষে মুভ অন করল লোকটা। জেসি মেসেজে লিখল,
“কল দেই আপনাকে?”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই আসে,
“না।”
“ঘুমিয়েছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কথা বলছেন কেমন করে ঘুমিয়ে পড়লে?”
“কথা যেহেতু বলছি আমি ঘুমাইনি, এতটুকু আক্কেল নেই তোমার বেকুব।”
“রুড।”
“মেসেজ করবে না স্টুপিড।”
মুখ ভেংচি দিয়ে ফোনটা রেখে কমফোর্টার দিয়ে পুরো মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ে জেসি। অন্তিহা হালকা হেসে দিয়ে ওকে থাপ্পড় দিয়ে বলে ওঠে,
“ট্রাস্ট মি, ওর সাথে কথা বলার চেয়ে গাছের সাথে বলা ভালো মনে হবে।”
জেসি কমফোর্টার থেকে মুখ বের করে অন্তিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি খুব ভালো জানো তার সম্পর্কে। তুমি কি ফল ইন করে আছ?”
মেকি হেসে মলিন মুখে সরে আসে অন্তিহা। কমফোর্টার দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে গম্ভীর গলায় বলে,
“ঘুমাও, কালকে ক্লাস আছে।”
জেসি অবাক হয়ে অন্যদিকে ঘুরে আয়াশের নাম্বারে কল দিল। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি তার। কলটা দিতেই সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিল ওপাশ থেকে আয়াশ। কিঞ্চিৎ সময়ের ব্যবধানে মেসেজ পাঠায়,
“স্টুপিড আর বিরক্ত করলে কালকে টিসির ব্যবস্থা করব তোমার। ঘুমাও।”
জেসি বেশি না বকে এবার ফোনটা রেখে দিল। সত্যি বিশ্বাস নেই এই লোকের, টিসি দিলে বাবা খবর নেবে। সে অন্তিহার দিকে ফিরে তাকায়, মেয়েটা ঘুমিয়ে গিয়েছে উত্তরও দিল না। ইসস দুটো গম্ভীর মানুষ তার সাথেই পড়েছে ধেত।
_____
সকাল প্রায় ৬টা। অহীন শিকদার বাড়ির কলিং বেল চাপছে বারবার। কেউ দরজা খুলছে না। অন্তিহা থাকলে হয়ত এত সময়ে ছুটে আসত, সব দিক খেয়াল থাকে মেয়েটার। বেশ অনেকটা সময় পর দরজা খুলে দেয় অতি প্রিয় আকাশ। অহীন ঢং করে আহ্লাদ দেখিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আকাশের বুকে,
“ওও শ্বশুর আব্বা, কেমন আছ?”
আকাশ অবাক বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে বলে ওঠে,
“হোয়াট আ সারপ্রাইজ মাই বয়!”
“হুম তোমার মেয়ে কই তা বলো।”
কথাটা শুনেই আকাশ থতমত খেয়ে যায়। অহীনকে সরিয়ে দিয়ে তৎক্ষণাৎ বলে,
“আশু কোথায় মানে? আনোনি?”
“ও তো রাগ করে এয়ারপোর্ট থেকে একাই চলে এসেছে। বাসায় আসেনি?”
অমনি আকাশকে ভেতর থেকে তাশা ডেকে বলল,
“আকাশ, আশা এসেছে ওই বাসায় কুহু কল দিয়ে বলল।”
“অহীন এসেছে এখানে, ওকে বলে এখানে আসো তুমি তাশু।”
অহীন হতাশ হলো আশা নেই শুনে, তবে একটু ভালোও লাগছে, গিয়েছে তো তারই বাড়িতে যতই হোক। সে ব্যাগ ও লাগেজ ধাক্কা দিয়ে এক কোনায় ফেলে রেখে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলে,
“গেলাম আমি ঘুমাব, ওই বাসায় যাব না এখন।”
“তোমার শাশুড়ির সাথে কথা বলে যাও?”
“শাশুড়ির হাতের কষা মাংস খাব দুপুরে, সাথে ভুনাখিচুড়ি হলে আমি একটুও রাগ করব না।”
নাহ, ছেলেটা তাকে তেমন গুরুত্বই দিল না। সিঁড়ি দিয়ে সোজা উঠে চলে গেল নিজের রুমের দিকে। একটা গেঞ্জি ও প্লাজো পরে দুলতে দুলতে তাশা রুম থেকে বের হয়ে আসে। আকাশ হেসে বলল তাকে,
“এভাবে কেন এসেছ? অহীন আছে তো।”
তাশা সিঁড়িতে তাকিয়ে বলল,
“চলেই তো গেল।”
আকাশ চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে। আশা জিজ্ঞেস করে,
“আশু আর ও আলাদা কেন?”
“জানি না। বেলা হোক মেয়েটাকে দেখতে যাব, অনেক দিন হলো দেখি না।”
“আপনার মেয়ে আমাদেরকে ভালোবাসলে তো এখানেই আসত। কেমন চলে গেল ওবাড়িতে।”
আকাশ চোখ রাঙায় তাকে,
“চুপ করো তাশু, আশু ঠিক করেছে।”
“হুম আর ওর স্বামী এখানে কেন এসেছে? আমি জানি মেয়েটা ছেলেটা খুব জ্বালায় সেই জন্য ছেলেটা এখানে এসেছে।”
হেসে দিল আকাশ হো হো করে। এটা মনে হয় একমাত্র মা যে মেয়ের পক্ষে কথা না বলে মেয়ের জামাইয়ের পক্ষে বলে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় তার কাছে। তাশা সব সময়ের মতোই ছোট একদম, শরীরের গড়ন একটা বাচ্চার মতো এখনো। ওই যে কিছু মানুষ হয় না সিমসাম পাতলা গড়নের কখনো পাল্টায় না ঠিক ওমন। আকাশ নেশাভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমাকে দেখাতে এভাবে এসেছ? যাতে আমি এই বয়সে নেশার ওভারডোজ নিয়ে মরে যাই?”
তাশা ওর নেশালো চাহনি দেখে এগিয়ে যায়। বুকে হাত রেখে গালে আঙুল বুলিয়ে অস্ফুট স্বরে গায়,
“Aise Na Mujhe Tum Dekho
Seene Se Laga Loonga
Tumko Main Chura Loonga Tumse
Dil Mein Chhupa Loonga”
বড় করে শ্বাস টেনে নেয় আকাশ। সকাল সকাল এসব যেন সহ্যের বাইরে লাগছে। দুই হাতে টান দিয়ে কোমরটা নিজের কোলে তুলে নেয় সে। চুলের ভাঁজে মুখ রেখে গভীর গলায় বলে,
“সকাল সকাল এতটা উত্তেজনা না ছড়াতেও পারতে বউজান।”
রুমের দিকে হাঁটছে সে। তাশা গলা জড়িয়ে রেখেছে তার শক্ত করে। পাতলা হওয়ার বুঝি এই ফায়দা, যখন তখন গলায় ঝুলে পড়া যায়। সে আকাশের কানের কাছে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে হিসহিস করে বলল,
“কেন, ভালো লাগছে না?”
“আরও ভালো লাগা চাই।”
চলবে...