#দূরত্বের_প্রণয়_২
#স্বর্ণালী_ইসলাম
পর্বঃ৩৩
দুপুর গড়িয়েছে সেই কখন গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে আশা, অনেক দিন পর প্রশান্তির একটা সুখ নিদ্রা নিচ্ছে সে। মা-চাচির হাতের রান্না আর বাবা-চাচার আদর খেয়ে ঘুম যে এত সুন্দর হয় তা আগে জানা ছিল না। জানালার পর্দাগুলো বাতাসে দুলছে। পায়ে হালকা ঠান্ডা হাতের ভেজা স্পর্শ লাগছে তার বারবার। চোখে ঘুমচ্ছন্ন রমণী বারবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। চোখের পলক জোড়া একটু একটু করে মেলে তাকাতেই পাশের কাছে হঠাৎ তাশাকে দেখে আৎকে উঠে পা ঢেকে দেয় চাদর দিয়ে। গভীর ঘুম ভাঙাতে হাঁপাচ্ছে সে। তাশা এতে অস্বস্তির সাথে জিজ্ঞেস করে,
“কি হলো?”
আশা কপালে হাত দিয়ে উৎসুক হয়ে হঠাৎ হেসে দিয়ে তাশার বুকে ঢলে পড়ে, ভেজা আর কান্নাশিক্ত গলায় বলে ওঠে,
“হঠাৎ ঘুম ভেঙে তোমাকে দেখলাম তো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। স্বপ্নের মত লেগেছে।”
মেয়েকে বুক পাঁজরে জড়িয়ে নিয়ে তাশা মমতায় হাত বুলায় মাথায়,
“তোর তো এখন কুহুকেই আপন মনে হয়, আমাকে মনে পড়ে?”
আশা উঁচু হয়ে পরপর কয়েকটা চুমু খায় তাশার ললাটে, তাশাও ওকে কয়েকটা চুমু দিয়ে শুধায়,
“পায়ে কি হয়েছে? নীল হয়ে আছে কেন?”
আশা পা গুলো একটু গুটিয়ে নেয়। মুখের হাসিটা একটুও সরতে দিল না নিজের, তাশাকে জড়িয়ে ধরে অভিমানী গলায় বলে,
“তুমি তো জানো ওই জাওরাটার সাথে থাকলে লত ঝগড়া হয় আমাদের। ওই একটু দুষ্টুমির সময় লেগেছে।”
“ছেলেটাকে তাহলে খুব জ্বালানো হয় ওখানে?”
আশা বাঁকা চোখে তাকায় তাশার পানে। এটা কার মা? তার নাকি অহীনের? নিশ্চিত ফুম্মি আর তার মা মিলে ছোট বেলায় অদল বদল করেছিল। ভাবনার মাঝেই রুমে আকাশ প্রবেশ করে, আশাকে আর পায় কে? গায়ের চাদর টান দিয়ে ফেলে ছুটে নামে বিছানা থেকে তবে ইচ্ছে অনুযায়ী দৌড় দিতে পারল না। পা ভেঙে আসছে কেমন। আস্তেই গিয়ে জড়িয়ে ধরে বাবাকে।
“কেমন আছে আমার মা?”
“উমমম ভালো আছি তুমি?”
“তোমাদের দেখে ভালো হয়ে গিয়েছি।”
আকাশকে পাশ কাটিয়ে আবির্ভাব হয় বিষাদময় মুখটা, অহীন নতমস্তকে এসে তাদের পাশে দাঁড়ায়। রাতের পর কেমন অস্বস্তি লাগছে আশাকে কিছু বলতে। আশা নিজেও আগবাড়িয়ে কিছু বলতে চায় না। চোখে অভিমানের ছাপ নেই তার, আছে কেবল ঘৃণা। চোখের দিকে তাকানোও লজ্জার মনে হচ্ছে তার। মুহূর্তকাল সবাই কথা বলে রুম ছাড়তেই অহীন দৃঢ়তার সাথে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
আশা আস্তে আস্তে বাথরুমে প্রবেশ করে। নিজের বিশাল বিছানায় শরীরটা রাখতেই কেমন ক্লান্তিগুলো মিলে যাচ্ছে বাতাসের সাথে। চোখ বুজল সে আবেশে। বাথরুমের দরজা খোলার খট শব্দে অহীন পাশ ফিরে তাকায়, ধীরে ধীরে আশা ওর দিকে না তাকিয়েই রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। অমনি বিছানা থেকে ত্বরিৎ বেগে নেমে এসে তার পথ আটকে ধরে আবার অহীন। শুকনো ঢোক গিলে পায়ের পাতা কচলে আমতা আমতা করে বলে সে,
“আশু আমি মন থেকে সরি ফিল করছি।”
“আচ্ছা।”
ছেলেটার এত করুণ গলাটা কি তার মন গলাতে পারল না? পাশ কাটিয়ে বের হতে নিলে অহীনও হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে আবার নিজের কাছে,
“লক্ষ্মী জান আমার, আমি মানছি আমি ভুল করেছি, কিন্তু তুই আমার বউ, একটু দুষ্টু কাজ নাহয় তোর ইচ্ছে, অনিচ্ছায় মিশে গিয়েছে, প্লিজ সরি দিয়ে দে?”
অহীনের নিঃশ্বাস তার গালে আছড়ে পড়ছে বারবার, এসব তো একদম বিরক্তি ছাড়া কিছুই লাগছে না। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আশা বেশ বিরক্তি নিয়ে বলে,
“বললাম তো আচ্ছা, গায়ে হাত দিচ্ছ কেন? দূর থেকে কথা বলা যায় না? আর ইচ্ছে অনিচ্ছা? ফোর্স বলো, বিয়ে না হলে রে/প বলতাম। এখনো সেটা রেপই তো।”
আশার এমন করে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়াটা যেন ভেতরে কেউ ছুরির আঘাত করল। সে একটু দূরে সরে ফের বলে,
“এমন ভাবে বলিস না, ভুল তো নিজের বউয়ের সঙ্গেই করেছি তাই না? আচ্ছা ঠিক আছে দূর থেকেই বলছি কিন্তু আমার কথা শুনবি পুরোটা।”
আশা বিরক্তি নিয়ে চোখ উল্টে অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,
“ হাহ বউ, বউ মানে বোঝ? নিজেকে তোমার সামনে স্ল* মনে হয়। যাই হোক! তাড়াতাড়ি বলো।”
আশার শেষের কথাটা গায়ে কাঁটার মত বিঁধলেও হজম করল সে। আশা নয় তা, আশা তার দলিলকৃত স্ত্রী। ভুল করলেও এত নোংরা নাম তাকে সাজে না। অহীন জিভ দিয়ে ওষ্ঠ ভিজিয়ে একটু আগায়। আশা একটু পিছিয়ে গেল, অহীন ওর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“আমি মানছি আমার ভুল হয়েছে, কিন্তু তোরও ভুল ছিল সমান ভাবে। আমি হয়ত ফ্রান্সে বড় হয়েছি কিন্তু শাসন বিডিতে বাবা-মায়ের আর ওখানে পাপি-মাম্মামের সমান ভাবেই পেয়েছি। জেসির সাথে বিয়ে ঠিক হওয়া সত্ত্বেও ওকে কখনো ওসব ভেবে টাচ আমি করিনি। তুই কি করে পারিস একটা গায়ে পড়া মেয়ের সাথে এত নোংরা অপবাদ দিতে আমাকে?”
একটু থামে,
“প্রচুর রেগেছিলাম, আর আর… আমি বুঝতে পেরেছি আমার…।”
আশা ওর দিকে তাকায়, কথাটা বলতে আটকে যাওয়ার কারণটা ঠিক বুঝল সে। বোঝারই কথা, যে তো ভুগেছে একটা রাত পুরো। তবুও কথা বলল না, অহীন নিজে থেকেই বলে,
“ওসব পরে বোঝাব, এখন শুধু বলতে চাই, ওই তুই ভুল দেখেছিলি, তুই আয়াশের সাথে নিচে ছিলি রাগ নিয়ে বাসায় গিয়ে শার্ট খুলতেই কোথা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কে জানে? ওমনি তুই এলি। তোকে তো আমি সব সময় ওয়ার্ন করতাম ক্লেরাকে বাসায় না আনার জন্য। তবুও আনতি, মেয়েটাকে জেসিও পছন্দ করত না।”
“শেষ বলা? এবার যেতে দাও, সবাই অপেক্ষা করছে।”
অহীন এবারও কিঞ্চিৎ বিরক্ত ও রাগ হলো, আশাকে দেওয়া কথাটা রাখল না, উল্টো ধাক্কা দিয়ে দেয়ালে চেপে ধরে অত্যন্ত হিংস্র গলায় হিসহিস করে বলে,
“করবি তো মাফ তুই আমরা দুজন জানি, এটাও জানিস আমি কেন এমন করেছি আর ভবিষ্যতেও করব। তবুও কেন আমাকে জ্বালাচ্ছিস?”
অহীনের হাতগুলো তিরতির করে কাঁপছে, বুকটা আশার ওঠানামা করছে বারবার। সে অহীনের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর প্রয়াস করে দাঁত খিঁচিয়ে বলে,
“কি জানার বা বোঝার কথা বলছ তুমি? আমার গায়ে টাচ করার আগে অনুমতি নিয়েছিলে? তুমি একটা সাইকো যে বুঝে শুনে ভুল করো। আগে সম্মতিতে কাছে আসা আর অসম্মতিতে কাছে আসার তফাৎ করতে শেখ। তোমার এইসমস্ত কিছু মেনে নিতাম যদি আমার বিন্দুমাত্র সম্মতি তুমি চাইতে। আমি ভুল করলেও আমার শরীরের ওপর তোমাকে অধিকার আমি দিইনি।”
“মানিসনি? আমার কেন মনে হচ্ছে সব বুঝেও অবুঝের মত জেদ করছিস? নয়ত তুই এখানে কেন আসতি? নিজের বাড়ি কেন গেলি না?”
গর্জন দিয়ে ওঠে অহীন, প্রচুর পাগল হচ্ছে সে এই মেয়ের জন্য। যত চাইছে সব ঠিক করতে সব কেমন বিগড়ে যাচ্ছে। আশা ওকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য শরীর বারবার এপাশ ওপাশ মোচড়াচ্ছে।
“কারণ রাতেই বলেছিলাম, আমার আব্বু তোমাকে বিশ্বাস করে, হঠাৎ ওনার কাছে গেলে উনি হয়ত আমাকে আবার পাঠিয়ে দিত তোমার কাছে। কিন্তু আমি দূরত্ব চাই, এখানে আমি চাইলেই পাব সেটা, ফুম্মি বা বড় বাবা আমাকে ফোর্স করবে না তোমার কাছে থাকতে।”
অহীন হঠাৎ ছেড়ে দিল তাকে, নতমস্তক হয়ে বলে,
“আই অ্যাম সরি, আর কখনো তোর অসম্মতিতে তোকে টাচ করব না।”
“আর সম্মতি! তুমি কখনো পাবে না।”
দরজা খুলতেই আশা প্রথমত থ হয়ে গেল কুহুকে দেখে। হাত আড়াআড়ি ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে, আশাকে দেখতেই স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
“খেতে আয় তোরা? কত গুলো ডাক দিয়েছি কালা হয়ে গিয়েছিস নাকি?”
আশা কৃত্রিম মেকি হেসে, মাথায় বড় করে ঘোমটা টেনে নেয়, মুখে হাসি রেখে কক্ষ থেকে বের হয়। অহীন তখনো দাঁড়িয়ে আছে দেখে কুহু ভড়কানো গলায় ধমকে বলে,
“ নিজেকে কি এবারের জামাই ভাবছিস? দাওয়াত করে নিতে হবে?”
“কাজিন বিয়ে করলে এই এক লস, ইজ্জত পাওয়া যায় না।”
বিড়বিড় করে বলতে বলতে চলে গেল সে। ডাইনিং টেবিলে সবাই বসেছে, তারা আলাদা বাড়িতে থাকলেও একে অপরের সাথে মিল ঠিক আগের মতই মিষ্টি। আসা-যাওয়া লেগেই থাকে। তাশা আর আকাশের মাঝে বসিয়েছে আশাকে। অহীন অন্তিকের পাশে একটি চেয়ার টেনে আস্তে করে বসে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কুহু খাবার দিচ্ছে সবার প্লেটে, অহীন অমনি বলে,
“আমাকে কম দিও, ছোট আম্মুর হাতের মাংস আর খিচুড়ি খেয়ে পেট ওভারলোড হয়ে আছে।”
সবাই হেসে দেয়, কিন্তু আশার ঠোঁটে কোনো রূপ হাসির ছোঁয়া নেই। আশা চুপচাপ খাচ্ছে, তাকে সাদরের যেন শেষ নেই কুহু, তাশা আর আকাশের। দূর থেকে বসে অন্তিক খেয়াল করছে তা নয় সে অহীনের মাথায় আচানক থাপ্পড় দিয়ে বলে,
“বেয়াদব তোমার সাথে আমাদের মেয়ে দেব না, খাওয়াও না বউকে? কি জন্য নিয়েছ?”
অহীন মাথা ঘষে ঘষে অন্তিকের দিকে তাকায়,
“ও কি বাচ্চা ওকে খাওয়াব আমি? দেবে না কেন? বউ আমার এসেছে দেব না বলতে!” ভেঙিয়ে বলল কথাটা। “থ্রেট দাও কাকে?”
তখনই কুহু ওকে শাসিয়ে বলে,
“তুমি যদি ওকে যত্ন না করো, ভালো না বাসো কেন দেব?”
মাথা নুইয়ে বিড়বিড় করে,
“ম্যাডামের রাগই ভাঙে না, আদর ভালোবাসা বিলাসিতা।”
অহীনের কথা কারো কানেই তো গেল না, অন্তিক হয়ত একটু শুনেছে। আসার পর থেকে অহীন ও আশার মধ্যে কথা নেই আর না আছে আগের মত তর্ক, এতে সবারই একটু অদ্ভুত লাগছে। ওরা তো কয়েক মিনিট তর্ক না করে মারামারি না করে থাকে না। আজ এমন লাগছে কেন এদের? আশার খাওয়া শেষ হতেই উঠে চলে যায় সেখান থেকে। তাকিয়ে আছে অহীন, আগে কখনো এত অস্থির লেগেছে বলে মনে পড়ছে না। বউ রাগ করলে বুঝি এমন লাগে, তখন যেন বউটাকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছেগুলো তীব্র থেকে তীব্র হয়ে ওঠে। তার হাবভাব দেখে অন্তিক ওর প্লেটে পানি দিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে হকচকিয়ে ওঠে অহীন, অন্তিকের দিকে হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে রাগ দেখাতেই অন্তিক গভীর গলায় হিসহিস করে বলে,
“কি বাবা বউ রাগ করেছে? আর তুমি রাগ ভাঙাচ্ছ নাকি?”
অন্তিকের কথায় গলা খাঁকারি দেয় সে জোরেশোরে, গলা খাদে নামিয়ে আস্তে আস্তে বলে,
“যতই হোক বউ আমার, আমাদের বংশ জেদি মেয়েদের দখলে, রাগ না ভাঙিয়ে উপায় কই?”
ফিক করে হেসে দেয় অন্তিক, অহীনের ঠোঁটে লেগে থাকা কিঞ্চিৎ বিরক্তি আর অস্থিরতা বেশ ভালোই লাগছে। কতটা ব্যাকুল আশার জন্য হয়ত প্রকাশ করতে না পারায় এতটা মনমালিন্য দু’জনের। ইচ্ছে হচ্ছে একটু দুষ্টু বুদ্ধি দিতে, যেই ভাবা তাই করা,
“তোমার স্থানে আমি হলে কখনো ভাঙাতাম না, কেননা আমি জানি তোমার মা আমাকে কত ভালোবাসে, নিজেই ক্ষমা করে দিত। তোমার বউ তোমাকে ভালোবাসে না?”
শেষের কথায় যে তাকে পিঞ্চ করেছে এটা ঠিক বুঝল অহীন। দাঁত বের করে বত্রিশ পাটি বের করে অন্তিকের টেবিলের ওপর রাখা শক্ত হাতের ওপর ঠাস করে হাত রেখে ওটায় চাপ দিয়ে বলে,
“থাক বাবা তোমাকে অনুসরণ করতে চাই না আমি, আমি বরং রাগ ভাঙাই।”
ওর হাতের নিচ থেকে নিজের হাতটা টান দিয়ে বের করে, এবার ওপরে নিজের হাত, অহীনের হাত নিচে রেখে চাপ দিয়ে ধরে বলে,
“শোন আমার কথা, বউরা এমনই হয়, তুমিও রাগ করে থাকো একটু, তারপর দেখবে নিজেই রাগ ভেঙে রাজি হয়ে যাবে।”
অহীন তাচ্ছিল্য করে উপহাসের সুরে হেসে দিয়ে হিসহিস করে বলে,
“ঠিক ঠিক এই জন্য তোমার অর্ধেক যৌবন কেটেছে বউ হীনা, আর এখনো নিজেকে স্টিল ভার্জিন দাবি করতে হয়, ছি ছি শেম আব্বু। ট্রাস্ট মি আব্বু আমি আর দাবি করতে চাইনা আমি ভার্জিন। আই অ্যাম আ ম্যান, ভার্জিন থাকলে পুরুষত্ব দেখাব কিভাবে? এমন জীবন চাই না।”
“কিছু দিনের দূরত্ব ভালোবাসা কমিয়ে দেয় না, এই দেখো এত দূরে থেকেও কত ভালোবাসে তোমার মা আমাকে।”
অহীন উঠে দাঁড়ায়, অতঃপর অন্তিকের দিকে ঝুঁকে কানের কাছে গলা নামিয়ে নিচু স্বরে হিসহিস করে বলে,
“ওই কিছু দিনের দূরত্ব আমি চাই না, আমি ভালোবাসতে চাই কাছ থেকে খুব কাছে থেকে। একদম নেক্সট প্রজন্ম নিয়ে আসার মতো ভালোবাসা। দাদা হতে চাও না? বলদ ওল্ড ম্যান।”
অতঃপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করতে থাকে,
“নিজেও পায়নি আমাকেও পেতে দেবে না, বউ কেন দূরে থাকবে আজব।”
কথাটা শেষ করে কেমন মুখে অন্য রকম হতাশা ছড়াল তার, যেন এসমস্ত কিছুই হাসি, দুষ্টুমি ছল, পরিবারের সাথে সব ঠিক রাখার ক্ষানিকটা বাহানা। তবুও কোথাও আশা আছে যার রাগগুলো ভেতরে খুঁড়ে খাচ্ছে।
___=_
সকাল সকাল ভ্যাপসা গরমে পাতলা ফুল স্লিভ টি-শার্ট ও জিন্স পরে কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে মাথা নিচু করে একটি বইয়ের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে অন্তিহা। ইউনিভার্সিটির করিডোরগুলো বেশ লম্বা লম্বা, ওখানটায় একটি স্থানে গিয়ে বসে সে। বসার বেশ কিছু সময় বাদেই পাশে এসে একটি ছেলে বসে, সেদিকে তার খেয়াল নেই, চুপচাপ পড়ছে সে। ছেলেটা অদ্ভুত ভাবে বারবার নড়াচড়া করছে আর হাঁসফাঁস করছে প্রচুর। এতে সে বিরক্ত হয়ে উঠে একটু দূরে গিয়ে বসে। ছেলেটিও তার সাথেই গিয়ে বসে আবারো হাঁসফাঁস করছে। অন্তিহা এবার বই বন্ধ করে চোখ তুলে তাকায়, বাঙালি ছেলেটা, ঠোঁটের পাশে একটা তিল ঠিক অন্তিকেরও এই স্থানে এমন একটা তিল আছে। লম্বা লম্বা পাপড়িগুলো চোখের পলক ফেলতেই কেমন মায়ায় মিশিয়ে নেওয়ার মত লাগছে। অন্তিহা কি মায়ায় পড়ল? কখনো না, সে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে,
“কিছু বলবেন?”
ছেলেটার চোয়ালে একটু হাসি ফোটে, সে মাথা দুলিয়ে উৎফুল্ল হয়ে বলে,
“জি, আপনি তো দেখছি খুব ভালো স্টুডেন্ট, আমার নোটসগুলোতে একটু সমস্যা হচ্ছে বুঝিয়ে দেবেন?”
অন্তিহার প্রশ্নের বিপরীতে একই সাথে এতগুলো কথা, রিকোয়েস্ট ছিল নাকি আদেশ বুঝল না। তবুও বাঙালি নিজ দেশের একজন মানুষ ভেবেই হয়ত হাসি সমেত বলল,
“হুম ভালো না অতটা যতটা বাড়িয়ে বললেন, তবে আমি যতটুকু বুঝি চেষ্টা করতে পারি। দেখান।”
ছেলেটা সময় ব্যয় না করে ব্যাগ থেকে নোটস বের করে খুলে ধরে তার সামনে। অন্তিহা বরাবরই কম কথা বলে। নোটসগুলোতে হাত দিয়ে দিয়ে বুঝাচ্ছে সে ছেলেটিকে। ছেলেটি মন দিয়ে রেখেছে তার কণ্ঠে কিন্তু চোখ অন্তিহার মুখের দিকে। কি সুন্দর মেয়েটা, তুষারের মত ফর্সা, গরমের জন্য গালগুলো লাল হয়ে আছে, তবুও হালকা মেকআপের প্রলেপ লাগিয়েই রেখেছে। গরমে কপাল বেয়ে একটু একটু ঘাম ঝরছে অন্তিহার, ছেলেটি বুঝতে পেরে ব্যাগ থেকে একটা পাল্টা খাতা বের করে বাতাস দিতে শুরু করে তাকে। এই গরমে শীতল বাতাস মুখশ্রী স্পর্শ করতেই ফের তাকায় অন্তিহা। এবার কপালের দিকে তাকিয়ে ছেলেটা ঢোক গিলে, ছোট ছোট চুলগুলো দুলছে বাতাসে। অন্তিহা চোখ গরম করে তাকে জিজ্ঞেস করে,
“সত্যি বলুন কি চাই?”
“আপনাকে।”
“হু?”
ছেলেটির নিচু কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলা কথাটা অস্পষ্ট ছিল তার কাছে, তাই তো পরক্ষণেই “হু” বলে ফের জানার উৎসাহ প্রকাশ করল সে। তবে এবার উত্তরটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছেলেটি আওড়ায়,
“বললাম তো শিখতে এসেছি।”
বাতাসটা বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে অন্তিহাকে আর প্রতিবার পলক ফেলতে হচ্ছে অনিচ্ছুক ভাবে। কিঞ্চিৎ মুখ কুঁচকে হাত দিয়ে ছেলেটার হাত থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করে নিজের মধ্যের গাম্ভীর্য ধরে রেখেই,
“নাম কি?”
হাত থামতেই চোখাচোখি হয় দু’জনের। গভীর সমুদ্রের মতো একজোড়া চোখ ছেলেটির, নিষ্পলক চোখে তারই দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়,
“সাফওয়ান।”
“কিসে পড়েন?”
“এই আপনার জুনিয়র।”
“দেখে মনে হয় না।”
সাফওয়ান হালকা শব্দ করে হেসে ওঠে, তারপর সোজা হয়ে বসে অন্তিহার সামনে, হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“আমি সাফওয়ান, খাঁটি বাঙালি। যেহেতু শিখতে এসেছি জুনিয়রই বলুন, আর এভাবেই মনে করতে থাকুন।”
অন্তিহা একটু হাসে তবে সেটা অপ্রকাশিত। গম্ভীর গলায় বলে,
“জিরাফের মত লম্বা, হাতির মতো বিশাল, খরগোশের মত চঞ্চল, বাঁদরের মতো বুদ্ধি, এসেই সাপের মতো কিছু সময় মোচড়ালেন। মনে তো হয় না আপনি মানুষ—পুরো একটা অ্যামাজন জঙ্গল।”
সাফওয়ান ওর দিকে ঝুঁকে হাসি দিয়ে বলে,
“অন্তু জঙ্গল বিশাল হলেও তার পাহারাদার নেই, আপনি হবেন?”
“এত বড় জঙ্গলে একটি পাহারাদার তো চুনোপুঁটি, নিশ্চয়ই আপনি আরো কাউকে রেখেছেন। আমি না কারো সাথে কাজ বলুন মানুষ বলুন ভাগ করতে পারি না। হয় নিয়ে নেব নয় দিয়ে দেব।”
“ তাহলে আমাকে নিয়ে নিন একা রাজত্ব করবেন।"
ভ্রু কুঁচকে তাকায় অন্তিহা তার দিকে, কিছু বলার আগেই আবার বলে সাফওয়ান,,
" আরে মিস গাম্ভীর্য শুনুন আমার কথা…।”
“এক্সকিউজ মি…?”
তার কথাটা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে অন্তিহার খুব পরিচিত একটা গলা। বিরক্তির ‘চ’ বলে অন্তিহা পেছনে তাকায়। পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়াশ, চোখ সাফওয়ানের দিকে থেমে গিয়েছে। অদ্ভুত ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সে। অতঃপর হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,
“অন্তু তোমার ক্লাস আছে এখন, এখানে কি করছ?”
“ওই ওনাকে…।”
“যাও।”
অন্তিহাকে কথাটা পূর্ণ করতে না দিয়েই আদেশ করে আয়াশ। এতে শক্ত হয় মেয়েটির চোয়াল, সে বেশ রুষ্ট গলায় বলে,
“ আমি আজ ক্লাস করব না।”
ভ্রু কুঁচকে নেয় আয়াশ তার কথায়, সাফওয়ান মাথা নিচু করে মুচকি হাসে এতে। আয়াশ অন্তিহার দিকে এগিয়ে যায়, লম্বা শরীরটা ওর সামনে দাঁড়াতেই বিশালদেহী ছায়াটা আড়াল করে আছে তাকে,
“আমার কথা শুনবে না?”
“হু আর ইউ? যে আপনার কথা শুনতে হবে?”
আয়াশ তাচ্ছিল্যের সাথে হাসে, গলা নামিয়ে বলে,
“আমি সবার সামনে টেনে নিয়ে যাওয়ার আগে যাও এখান থেকে।”
আয়াশের সামনের অংশে বুকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য উঠতেই আয়াশ পিছিয়ে যায়, ফলে অন্তিহা ফিচলে হাসে,
“ ধরতে পারলে তো নেবেন।”
“আমি ধরতে পারব আমার জাবেন?”
তার কথার প্রেক্ষিতে সাফওয়ান কথাটা হাস্যস্বরে বলল। অন্তিহা গম্ভীর গলায় বলে,
“আমার কোনো পুরুষের প্রয়োজন নেই, আমি একাই চলতে পারি। দু’জন আমার থেকে দূরে থাকুন…।”
বলতে বলতে আয়াশের পেছন থেকে গায়ের ওপর হঠাৎ ‘আহহহহ’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে কোথা থেকে জেসি। তার যেন মানুষটার মুখ দেখার আগেই শরীরটা গুলিয়ে উঠেছে কেমন। তৎক্ষণাৎ সরে যায় আর জেসি গিয়ে ঠিক অন্তিহার ওপর পড়ে। আয়াশ রাগে গর্জে ওঠে,
“ওয়াট দ্য ফাক ইডিয়ট, যেখানে সেখানে গায়ে পড়া ছাড়া কাজ নেই?”
জেসি অন্তিহার ওপর থেকে চুলগুলো ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে আয়াশের দিকে তাকায়। ফলে আয়াশ চোখ বুজে আর একটু পিছিয়ে গিয়েছে। রাগে ফুঁসছে ছেলেটা, চোয়ালে তীক্ষ্ণ টান দেখা যাচ্ছে, হয়ত এখনই রাক্ষসের মত এদের দুজনকে গিলে খাবে। জেসি সোজা হয়ে তার সামনে দাঁড়ায়। সে তো তাইয়ানের মতো ছেলের থেকেও খাটো, তাহলে আয়াশের মত একটা সুঠাম পুরুষের কাছে সামান্যই পিপড়ে বললে ভুল হবে না। ঘাড় উঁচু করে চোখ ছোট ছোট করে তীক্ষ্ণ গলায় বলে জেসি,
“শুনুন, আমি আপনার গায়ে পড়ি না, আমি যেখানে পড়ি সেখানে আপনার গা থাকে। এটা আপনার ভুল, আমার একদম না।”
আয়াশের মুখের বিচলিত অবনয়নটা অন্তিহাকেও বিভ্রান্ত করছে খুব। জেসি অগোচরে চোখ রাঙায়, কেন বারবার লোকটার গায়ে পড়ে? সে কি জানে না আয়াশ এসব নিতে পারে না একদম। অন্তিহা হাতের থাকা নোটসটা সাফওয়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলে,
“আশা করি আপনার আর সমস্যা হবে না আর আমার প্রয়োজন হবে না।”
সাফওয়ান বলল,
“হতেও পারে।”
আয়াশ রাগে গিজগিজ করে বলে,
“তোমার কিছু জানার হলে নির্দ্বিধায় আমার নিকট আসতে পারো। ওর কাছে আর যেতে হবে না।”
সাফওয়ান চোখে বিরক্তি ও তিক্ততা ছড়িয়ে আয়াশের দিকে তাকায়। এতদিন হলো আয়াশকে সে চেনে কিন্তু আজ মনে হচ্ছে পরম শত্রু এটা। স্যার বলেই কি হার মেনে নেবে? অন্তিহাকে হাতের ইশারায় বিদায় দিয়ে চলে যায় সে। জেসি বলতে চায় কিছু অন্তিহাকে,
“বাহ সিনিয়ররাও তোমার কাছে আসে নোটস বোঝার জন্য!”
“শাট আপ।”
অন্তিহা চলে যেতে নিলে পিছু ডাকে আয়াশ তাকে। পেছন ফিরে তাকায় অন্তিহা। তার দিকে সেই ধূসর চোখ জোড়া তাকিয়ে আছে, গ্লাভস পরিহিত হাতগুলো নড়ছে। আয়াশ জিজ্ঞেস করে,
“আসলে পুতুলের সাথে এতগুলো দিন হয়েছে কথা হয়নি, কথা বলিয়ে দেবে?”
অন্তিহা বলার আগেই জেসি বিরক্তি নিয়ে বলে,
“আপনি নির্বোধ? বোঝেন না ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছে কিছু দিন পর মামা হয়ে যাবেন। ওর খোঁজ নেওয়া থামান এবার।”
আয়াশ তাকে চোখ রাঙায়। অন্তিহা তাকে থামিয়ে বলে,
“আমি বুঝতে পারছি আপনি ওদের সুযোগ দিয়েছেন সুন্দর করে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। আবার নিজেও পারছেন না আশুকে ছাড়তে। কিন্তু বুঝতে হবে আপনার, ওদের সম্পর্কটা এখন পাতলা সুতোয় ঝুলে আছে একটু নড়লেই ছিঁড়ে যাবে। আপনি ওর যত্ন করলে ওর অহীনের প্রতি মায়া তৈরি হবে না। আশু ভালো আছে আমি নাহয় আপনাকে জানিয়ে দেব?”
আয়াশ খানিকটা নরম হয়, মাথাটা নুইয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে ফের একই কথা বলে,
“আমি জাস্ট জিজ্ঞেস করব কেমন আছে। কয়েকটা দিন হয়ে গিয়েছে কথা বলিনি তো। অ্যাজ ফ্রেন্ড বাড়তি একটা কথাও বলব না।”
“বলতে হবে না।”
অন্তিহা হয়ত নিজেও জানে না লোকটার এত অসহায় মুখ দেখেও কেন কথা বলিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না। সে জেসির দিকে তাকায়, মেয়েটা ভার্জিন আসে শুধু ঘুরতে, পড়াশোনায় মন একদম নেই। এখনো কার সাথে মেসেজিং করছে আর মুচকি হাসছে। ফের আয়াশের দিকে তাকায়, একটু সন্দেহ হয়, আদৌও কি এই মেয়েটার ভালোবাসার মূল্য আয়াশ দেবে কখনো? আর ভেবে লাভ নেই, আশার জন্য ভাবতেই গা শিরশির করে। এদের নিয়ে ভাবলে নির্ঘাত মৃত্যু। হঠাৎ ফোনটা বাজে তার, এ যেন কোনো রিংটোন নয়, এই দুই সাইকোর থেকে মুক্তির পথ।
“এক্সকিউজ মি।”
কথাটা বলেই কোনো মতে সরে আসে সেখান থেকে। এবার স্থির হলো মনের ভেতরটা। জানা নেই বারবার না চাইতেও আয়াশের কাছে কেন নিজেকে দুর্বল লাগে। কই সাফওয়ানের কাছে তো এমন হলো না, ছেলেটা ফ্লার্টিবাজ। প্রদীপের বেলায় মায়া হয় কিন্তু অস্থিরতা কাজ করে না কখনই। পেছন ফিরে একবার সে, আয়াশের সাথে কত হেসে হেসে কথা বলছে জেসি, আর আয়াশ বিরক্ত হলেও সহ্য করছে মেয়েটার জ্বালাতন। ফোনটা কানে চেপে ধরে হঠাৎ কুহুর ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় কিছু কথা শুনে অন্তিহা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলে,
“ওদের বিষয় আমি কেমন করে জানব আম্মু?”
“তুমি ওখানেই থাকো, আশা অসুস্থ কেন? আমি যতদূর জানি আশার কথামতে দুষ্টুমি করাতে শরীরে ক্ষত হয়েছে কিন্তু ওর চালচলন আর শরীরের এত ঘন গভীর ক্ষত তা বলে না। আমাকে তোমরা ঘোল খাওয়াচ্ছ?”
“আমাকেও আশু তাই বলেছে আমি জানি না কি কি হয়েছে।”
অন্তিহার কণ্ঠ একটু কাঁপছে, কারণ সে বলতে চায় সবটা। সে চায় অহীনকে তারা কিছু বলুক, কিন্তু আশা চায় না তাই চুপ করে থাকতে হচ্ছে আর কণ্ঠে কাঁপন তৈরি হচ্ছে। কুহু এবার ক্রুর গলায় বলে,
“ঠিক আছে বলতে হবে না তোমাকে, আমি জেইন বা সৃজনের থেকে জেনে নেব। তখন আফসোস করো না।”
অন্তিহা এবার চুপ রইল কিছুক্ষণ, কুহু কাটল না কলটা, সে জানে অন্তিহা সময় নিয়ে বলবে। আর হলোও তাই মাথা নুইয়ে, সে সব বলল। তার প্রেক্ষিতে কুহু শুধু কলটা কাটল নীরবে। বলার মত কিছু নেই তার। থামতে হচ্ছে কারণ নিজের ছেলে অহীন? না, নিজের ওপর লজ্জা হচ্ছে সে হয়ত নিজের কাছে রাখলে এমন কিছুই হত না। আজ আশা অন্যের বউ হলে কি এসব মানা যেত? চোয়াল ঝুলে গিয়েছে তার। অন্তিহা হাঁসফাঁস করছে হাতগুলো কাঁপছে, কিন্তু আশার সাথেও অন্যায় হয়েছে অহীনকে কি ছেড়ে দেবে নাকি?
_____
রাত প্রায় ১০ টা, অন্তিক অফিস থেকে চলে এসেছে, তবুও কোনো এক প্রয়োজনে সে বাইরে। সেদিনের পর কুহু অহীনকে অতটা বাড়িতেও আসার কথা বলেনি। আর না অহীন এসেছে। ও আসলে আশার আচরণ অদ্ভুত রকম ভাবে পাল্টে যায়, কেমন চুপচাপ হয়ে থাকে। আশা সবে মাত্র রুমে গিয়েছে ঘুমাতে, দরজাটা কুহু খোলা রেখেছে অন্তিকের জন্য। সে কাজ করছে টুকটাক রান্নাঘরের। হঠাৎ আভাস পায় কারো উপস্থিতির, কাজ ফেলে বের হয়ে আসে। দরজায় জুতো খুলছে অহীন, কুহুকে দেখে মুচকি হাসে। কুর্তা খুলে সেগুলো জায়গায় রাখে ঠিক ভদ্র ছেলের মত। এর বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ মেনে নেওয়াটা কতটা কষ্টের বোঝানো দায়। অহীন আস্তে করে জিজ্ঞেস করে তাকে,
“পেঁচি ঘুমিয়েছে?”
“অসুস্থ, ওভার ডোজের মেডিসিন নেয় তাই তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হয়। এত রাতে এখানে আসলে আজ?”
অহীন তার কথায় একটু ভাবান্তর হয়ে, কপালে ভাঁজ পড়ে। সে জানায়,
“থাকব এখানে আজ।”
কথাটা বলে নিজের রুমের দিকে যেতে নিলে কুহু পিছু ডাকে,
“আমার রুমে আসো কথা আছে তোমার সাথে। অনেক দিন হলো বলতে চাচ্ছি তোমাকে তো নাগালেই পাই না।”
“আশুকে দেখে আসছি।”
“আশুকে দেখার জন্য খেয়াল রাখার জন্য আমরা আছি, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিও না ওর। আমার সাথে আসো।”
মুহূর্তকাল সময় নিয়ে রুমে চলে গেল। অহীনও মায়ের কথা ফেলল না, পেছনে যায়। রুমে প্রবেশ করতেই দরজা বন্ধ করে দেয় কুহু, ঘরের বাতাস ভারি হচ্ছে, গাম্ভীর্য যেন প্রতিটি দেয়ালে মিশে যাচ্ছে। কুহু তাকে বসতে বলল না একটিবার ও কথাও ঘোরাল না, সরাসরিই প্রশ্ন করল,
“আশার হাত পা দেখে মনে হয় দীর্ঘ সময় খুব শক্ত ভাবে বেঁধে রেখেছিলে। কেন?”
হঠাৎ তার পা গুলো কম্পিত হয়, প্রশ্নে ভয় পাচ্ছে সে? না, মায়ের সাথে লজ্জা পাচ্ছে এসব বলতে। যতই হোক মা হয়। আর এসব তো ব্যক্তিগত কথা। ওর মিইয়ে যাওয়া নত মাথার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হুংকার দিয়ে ধমকে ওঠে কুহু,
“বলছ না কেন?”
অহীন আর যেমনই হোক কুহু বা জেইনের ওপর গলা তুলে কথা বলার মতো ছেলে তো নয়। তার পা গুলো একটু কেঁপে ওঠে, সে মাথা নুইয়ে রেখে আস্তে করে বলে,
“একটু মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছিল।”
“কি হয়েছিল?”
অহীন এবার একনাগাড়ে বলতে থাকে,
“হয়ত কিছু জেনেই জিজ্ঞেস করছ, তবে আমার মুখ থেকে কেন শুনতে চাও? আমি কি এতটাই বেয়াদব যে তোমার সাথে বলতেই আমার কণ্ঠ কাঁপবে না?”
সঙ্গে সঙ্গে গাল বরাবর ঠাস করে একটা থাপ্পড় পড়ে তার। অহীন চোখ বুজে নেয়। নরম হাতের থাপ্পড় হয়ত তাই তাকে হিলাতে পারল না। পরক্ষণেই চেঁচিয়ে ওঠে কুহু,
“যেই ছেলে নিজ স্ত্রীর অনুমতির সম্মান করে না তার আবার মায়ের সাথে বলতে লজ্জা কিসের?”
চোখ বুজে নিজেকে দমিয়ে নিয়ে বলে ফেলল নিজের সাফাই,
“থাপ্পড় দিয়েছিল আমাকে তাই রাগ কন্ট্রোল করতে পারিনি আম্মু।”
এবার বুঝল অহীন তার মা কেন এত রেগেছে। চোখ তুলে তাকায় সে, ক্রোধে ফেটে যাচ্ছে কুহুর শরীর। চোয়ালটা এতটাই শক্ত হয়ে আছে যে দ্বিতীয় থাপ্পড়টা এবার তাকে হেলিয়ে দেবে নিশ্চিত। মুখ খোলে,
“আম্মু আমি…।”
আবার একটা থাপ্পড় পড়ল গালে। চোখ বুজে সয়ে নিল বেচারা। আবার সোজা হয়ে বলতে চায়,
“আ..।”
এবার দুটো থাপ্পড় একই সাথে তার গালে পড়েছে। ঠিক যেন সেই দিন এমন হয়েছিল আশা আর তার সঙ্গে। শুনছিল না আশা তাই তো অহীন এতটা রেগেছে। কুহু আবার একটা থাপ্পড় দিল, এটা তীব্র ছিল। খসখসে থাপ্পড় এবার লাল হয়ে ফেটে একটু রক্তের ফোঁটার দেখা মিলেছে। অহীন কুহুর পরের বার হাত ওঠার আগেই ব্যাকুল হয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে,
“আম্মু প্লিজ।”
এবার তার বুকের ওপর নিজের একটি আঙুল রেখে পেছনের দিকে ধাক্কা দিয়ে দাঁত পিষে পিষে বলে কুহু,
“বউ থাপ্পড় দিয়েছে বলে এতটা অমানবিক আচরণ করেছ। আমিও তো থাপ্পড় দিলাম, একটা নয় পরপর ৫টা আমাকে কেন কিছু বলছ না? আরে অন্তত একটা থাপ্পড়ই পাল্টা দাও আমাকে কি হলো?”
বলে আবার থাপ্পড় দেয় ওর বুকে। কুহুর এবার চোখ গুলো ঘোলা হচ্ছে। অহীনের মুখে ওই থাপ্পড়ের জন্য যে ক্ষতটা হয়েছে তা সহ্য হচ্ছে না কণ্ঠ থেকে তবুও রাগ কমতে নিল না, আজ প্রশ্রয় দিলে আবার করবে। বুকে এলোপাথাড়ি থাপ্পড় দিয়ে দিয়ে বলছে,
“এমন শিক্ষার জন্য তোমাকে আমি তোমার পাপির কাছে দিয়েছিলাম? একটা মেয়ে হাজার ভুল করলেও তার সাথে এতটা অমানবিক হতে পারলে? কি ভেবেছ নিজেকে? আমাদের সামনে স্বাভাবিক থাকার ঢং করলে আমরা বুঝব না? আমি মা তোমাদের, তোমাকে জন্ম দিয়েছি। আশুকে বুকে রেখেছি। ওর হাঁটার ধরন, ওর নিশ্চুপ থেকে ছোট কথার উত্তর সব আমাকে বার্তা দেয় আমার মেয়ে ঠিক নেই। আর কারণ আমার গর্ভের সন্তান।”
কুহুর যে নিজেকে বড্ড লজ্জিত অনুভব হচ্ছে, চোখের কার্নিশ গলিয়ে পানিগুলো পড়ছে টপটপ করে। নিজের সন্তান যেখানে এমন কাজ করে তার কি ঠিক থাকার কথা? অহীন অবশেষে ওর হাতগুলো দুই হাতে থামানোর চেষ্টা করে আর বোঝাতে চায়,
“আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলেছিল সত্যি আমি সেদিন অনেক রেগে গিয়েছিলাম।”
পরক্ষণেই অহীনের গালে নরম হাতের শক্ত থাপ্পড় আবার পড়ে। এবার মাংস ছিঁড়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলো। কুহু তৎক্ষণাৎ গর্জে বলে ওঠে,
“রে/পি/স্ট! তুমি হয়ত জানো না এটাকে ম্যারিটাল রে/প বলা হয়। তোমাকে আমি রেপিস্ট বললাম তবুও রাগ হচ্ছে না?”
অহীন স্তব্ধ, সে কি বলবে গলায় শব্দ দলা পাকিয়ে গিয়েছে। মায়ের কাছে এতটা অপমানজনক কথা সত্যি অসহ্য। আর বলার মতো সাহস তার নেই। মনে হচ্ছে কেউ মাথায় বিশাল পাথর রেখেছে। ফের বলে কুহু চেঁচিয়ে,
“তার চেয়ে অপমানজনক কথা বলছি, রে/পি/স্ট তুমি।”
গর্জে ওঠে অহীন,
“তুমি মা আমার, তোমার ওপর কেমন করে আঘাত আমি করব?”
“ আশারও ঠিক আমার সমান অধিকার থাকা উচিত, কারণ সে তোমারই অংশ। তোমার যদি মনে হয় ও ভুল করছে তোমার সহ্য হচ্ছে না, ডিভোর্স দিয়ে দিও।”
সঙ্গে সঙ্গে কুহু ছুটে গিয়ে আলমারি থেকে একটা পাতলা খাম বের করে এসে অহীনের মুখের ওপর ছুড়ে মারে,
“যাওয়ার আগে ডিভোর্স এর জন্য তো এপ্লাই করেছিলে, তাহলে ছেড়ে দাও ওকে সহ্য না হলে।”
এত দিন হয়ত কেউ এমন করে বলেনি বলে আশার রাগটা ভাঙানোর চেষ্টাই মনে হয়েছে চলবে। আশাও কি এটা ভাবছে? অহীন ছাড়তে চায় না নিজের পেঁচিকে। তার বাবা যেমন সারাজীবন নিজের পেঁচিকে আঁকড়ে বেঁচে আছে, সেও বাঁচতে চায় ওমন করে। এখন মনে হচ্ছে কতটা অন্যায় সে করেছে। কুহু ওর থেকে পিছিয়ে যায়, তাচ্ছিল্য করে বলে,
“তুমি আমার ছেলে আশুর হাজব্যান্ড। স্বাভাবিক ভাবে আমি তোমার পক্ষেই থাকতাম। কিন্তু আশা তোমার স্ত্রী না হলেও আমার মেয়ে। তোমার সাথে ওর বিয়ে না হয়ে যদি তৃতীয় কারো সঙ্গে হত, আর সেই মানুষটা আশুর সাথে এটা করত? ছাড়তাম কেউ তাকে? তুমি ছাড়তে? খুব যত্ন করে বড় করার পর একটা মা বোঝে নিজের সন্তানের গায়ে একটু আঁচড় লাগলে কতটা রক্তক্ষরণ মায়ের বুকে হয়। তাশা-আকাশ তোমাকে বড্ড ভালোবাসে, তারা যদি জানে তখন তাঁদের দিকে তাকাতে পারবে তুমি?”
“আমি তো মানছি ভুল করেছি, ওকে বারবার সরি বলছি।”
“তোমার ব্যবহার তা বলে না। বাসায় ঢুকেই আশুর সাথে দেখা করে আসি, বললে তুমি। ভেবেছ ও দেখা করতে চায় কি না? তুমি আর আসবে না যতদিন আশা তোমায় মাফ না করবে।”
“কাছে না আসলে কিভাবে ওকে রাজি করাব?”
“সেটা তোমার ব্যাপার। কাছে গিয়েই তো সম্পর্কে দেয়াল তৈরি করেছ, দূরে থেকে এবার দেয়াল ভাঙ।”
অহীনের চোখ ছলছল করে ওঠে। কাছেই আসতে না পারলে, কথা না বলতে পারলে কিভাবে রাগ ভাঙাবে সে? সে বলতে চায় নিজের সাফাই আবার থেমে যায় কুহুর আদেশের কাছে,
“একটা কথা মাথায় রেখো তোমার সামান্য ভুল আর আশাকে সারাজীবনের জন্য হারাবে। আমি ওকে অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার সময় ভাবব না।”
এবার স্বল্প মাথা নুইয়ে বিড়বিড় করল, তবে কুহুকে শুনিয়ে নিচু গলায়,
“আশা আমার। যখন একবার আমার হয়েছে ছাড়ব না, আর মাফ চেয়ে নেব। তবুও আমার থেকে নিয়ে নিও না।”
“বের হও আমার বাসা থেকে।”
অহীন ঠোঁট কামড়ে ব্যথাতুর চোখে ছলছল করে তাকায় মায়ের দিকে। না, শক্ত চোয়াল নরম হয়নি একটুও। চোখ ভেজা হলেও রাগে লাল হয়ে আছে। অহীন নড়ছে না দেখে কুহুই ওর হাত ধরে টান দিয়ে বের করে আনে দরজা অবধি। বাইরের অন্ধকার করিডোরে রেখে তীক্ষ্ণ গলায় বলে,
“হয় আশাকে ছেড়ে দিয়ে তারপর আসবে। নয়ত আশা যেদিন ডাকবে সেদিন আসবে।”
“ওর সাথে কথা বলার…।”
শেষ করতে দিল না কুহু, মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। তার যে কষ্ট কম হচ্ছে তা নয়। কিন্তু ওর বুঝতে হবে, আশা তার ভরসায় নয়, আশা শুধু বাড়ির বউ নয়। সেটা ছাড়াও আশার এ বাড়িতে একটা স্থান আছে যা খুবই শক্ত। সে চাইলেই পার পাবে না আশার ওপর জুলুম করে। কুহু ফোঁস করে শ্বাস নেয়। বুকটা চিনচিন করে ব্যথা করছে। কুহু সোজা এবার আশার রুমে যায়। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে একটা ছোট পুতুলের মত। আয়াশ ঠিক বলে-ও একটা পুতুল যাতে দাগ মানায় না, সাজিয়ে রাখার মতো সুন্দর এটা। কুহু যায় কাছে, আলতো করে পায়ের কাছের কাপড়টা সরিয়ে দেয়। ক্ষতগুলো এখন একটু মুছে যাচ্ছে। কাছে গিয়ে মাথার কাছে বসে হাতটা দেয়, ওখানেও বেল্টের বাঁধার স্থানগুলো কালচে হয়ে আছে। ভাবতেই কেমন ঘৃণা হয় অহীন এসব করেছে।
------
শহরে গভীর রাত দিনের মতই লাগে, তবুও তাতে অন্য রকম মায়া মিশে থাকে। বিশাল বড় বড় দালানের ফাঁক দিয়ে একটা চাঁদ উঁকি দিয়ে থাকে। তবে বৃষ্টি হলে ভিন্ন বিষয়। বিশাল ল্যাম্পপোস্টগুলো অশরীরীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে কেমন। মনটা বড্ড নিশপিশ করছে আশাকে আজ দেখার জন্য। মায়ের জন্য দেখা হলো না। সে কি ছুঁয়ে দিত? একটু তো কাছ থেকে দেখেই ঘুমিয়ে পড়ত। চোখ গুলো রক্তিম হয়ে আছে। পুরুষ মানুষের কাঁদতে হয় না, কিন্তু আজ কান্না আসছে। শুধুই কি আজ? আকাশের দিকে তাকায় সে। কার্নিশে লেগে থাকা জলবিন্দু টুকু গড়িয়ে পড়ার আগেই কাঁধে কারো হাত পড়ে,
“অহীন এত রাতে বাইরে কি করছ? চলো বাসায়।”
আচমকা অন্তিকের কণ্ঠ শুনে হকচকিয়ে চোখগুলো মুছে নেয় সে। তার চোখের দিকে তাকাতেই অন্তিকের উজ্জ্বল মুখটা ফ্যাকাশে হয়। সে কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে,
“কি হয়েছে?”
“কই কি হয়েছে? বাড়ি যাচ্ছিলাম।”
অহীন মৃদুস্বরে মেকি হেসে বলল কথাটা। অন্তিক তার কাছে গিয়ে চুল টেনে নিজের ঠিক চোখাচোখি করে আবার বলে...
“আশুর সাথে আবার ঝামেলা হয়েছে?”
মাথা নাড়ে অহীন, মানে না হয়নি।
“তাহলে আম্মু বকেছে, সেই জন্য মন খারাপ।”
আবারও মাথা নাড়ে অহীন। অন্তিক ওর হাত ধরে হালকা হেসে বলে,
“চলো চা খেয়ে আসি, সাথে একটু সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াব দুজন?”
“আমি সিগারেট খাই না।”
“মিথ্যাবাদী তুমি খাও।”
“হঠাৎ হঠাৎ, তোমার মত না।”
অন্তিক হাসে। অহীনের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অতঃপর বাইকে বসে অহীনকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“চলো এবার পেছনে বসো, শক্ত করে ধরবে কিন্তু যেন পড়ে না যাও।”
মলিন মুখটায় একটু ফিক করে হাসি ফোটে। অহীন বসতে বসতে বলে,
“আমি বাচ্চা নাকি?”
“আমার কাছে তো বাচ্চাই আমার ছোট অহীন, যাকে আমি দু বছর বয়সে দেখেছিলাম। আর তার মা আমাকে তার মামা দাবি করেছিল।”
অহীন সত্যি জড়িয়ে ধরল তাকে পেছন থেকে। ঘামে চিটচিটে গন্ধ আছে অন্তিকের শার্টে, সেটাও ভালো লাগছে। পিঠে কপাল ঠেকিয়ে বলে,
“আম্মু তোমার অপেক্ষা করছে।”
“মেসেজ করে দেব।”
বাতাসের সাথে এগিয়ে যায় বাইকটা। তারা দুজন নিশ্চুপ হয়ে আছে। অনেকটা সময় পর এসে থামে তাঁদের পরিচিত নদীর পাড়ে যেখানে মাঝেমধ্যে সবাই বসে থাকে। একটি কাঠের টুল রাখা আছে সেখানে বসল না তারা। দুজন গিয়ে ঘাটে বসে চেঁচিয়ে দু কাপ চায়ের অর্ডার দিল অন্তিক। অতঃপর অহীনের গালে হাত বুলিয়ে কাটা স্থানে হালকা চাপ দেয়। অহীন যেন অনুভব করল না ব্যথাটা। অন্তিক জিজ্ঞেস করে,
“কিভাবে হলো? মা মেরেছে?”
মাথা দোলায় অহীন, মানে হ্যাঁ। সঙ্গে সঙ্গে অন্তিক ভড়কায় তবে প্রকাশ করল না আর বলল,
“কেন?”
অহীন ওর দিকে তাকায় ছলছল নয়নে। কেন মেরেছে?
“শুনলে তুমিও মারবে।”
অন্তিক আর জিজ্ঞেস করল না কিছু। আকাশের দিকে তাকিয়ে অভিযোগ করে অন্তিককে,
“আশুর যখন ১৮ বছর হয়েছিল ওর জন্য তোমরা আয়াশকে কেন বেছে নিয়েছিলে? ও নাহয় অবুঝ ছিল তোমরা কেন আমার চোখ আর মন বুঝলে না?”
অন্তিক মলিন হাসে,
“তুমিও ছোট ছিলে।”
অহীন পানির নরম ধ্বনিতে মন দিয়ে বলতে থাকে,
“যেদিন ওকে আয়াশ বিয়ের জন্য বলেছিল একগুচ্ছ গোলাপ দিয়ে আমার মন বারবার বলছিল ওটা প্রত্যাখ্যান করুক আশা, কিন্তু ও খুব হাসির সাথে গ্রহন করেছে। খুব কষ্ট হয়েছলে আমার এখানটায়।" বুকে হাত দিয়ে ঘষে ঘষে কথাটা বলল অহীন। "প্রথমবার আমি অনুভব করেছিলাম ঈর্ষা। অন্তত আমি তখনো ভাবতাম ও শুধুই আমার দুষ্টুমি করার সঙ্গী।”
তার কথায় অন্তিক মাথা দুলায়। সে বোঝায় সে শুনছে। অহীন কখনো আশাকে নিয়ে বলেনি, প্রথমবার বলছে। তাও গভীরের কথাগুলো। ছেলেটার চোখগুলো দিয়ে পানি পড়ছে, বলছে,
“আমি পুরো রাত ঘুমাইনি। অতিষ্ঠ হয়ে নামাজ পড়ে খুব কেঁদেছি। মোনাজাত শেষে সেদিন আমি অনুভব করেছিলাম আমি ওকে ভালোবাসি, খুব। আর এই ভালোবাসা আমাকে কাঁদাবে পুরো জীবন। আর হ্যাঁ আমি কেঁদেছি ও অনেক। কেউ জানে না, ওই মেয়েটার জন্য কত রাত আমি অশ্রু ঝরিয়েছি। নিজেকে শক্ত দেখাতে জেসিকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলাম। আমি বাকি জীবন কাদতে চাই না। ওর সাথে ভালো থাকতে চাই।"
অহীন থামে, কান্না গিলে নেয়,
“ও বোঝে না, আমি ওকে ভালোবাসি ঠিক কতটা। ও ভাবে আমি ওকে ছুঁতে চাই। ও জানে না ওকে না ছুঁয়ে আমি এক জীবন পার করতে পারব, কিন্তু ওকে দ্বিতীয় বার ত্যাগ করতে পারব না।”
অন্তিক এবার অল্প স্বরে বলে,
“তোমার তো ওকে পাওয়ারই কথা ছিল না, তবুও এত কষ্ট?"
অহীন হাসে বুকটা ব্যথায় ভেঙে যাচ্ছে, তবুও ঠোঁটে একটা ফিচলে হাসি দেখা মেলে,
“ প্রথমেই না পাওয়ার ব্যথা আর পেয়ে আবার হারানোর ব্যথা কি এক হলো নাকি?”
“এত ভালোবাসলে কষ্ট কেন দাও? আশু তো আমাদের মেয়ে। ওকে কষ্ট দিলে নিশ্চয়ই শাস্তি পেতে হবে।”
“শাস্তিটা যেন ওকে ছেড়ে দেওয়া না হয়, আমি মরে যাব।”
চলবে......