ফন্ট সাইজ:
থিম:
দূরত্বের প্রণয় ২

৩৫তম পর্ব

লেখক: স্বর্ণালী ইসলাম

#দূরত্বের_প্রণয়_২

#স্বর্ণালী_ইসলাম

#কপি_নিষিদ্ধ

পর্বঃ৩৫

মাগরিবের আজান হচ্ছে চারপাশে, আকাশে অন্ধকার নেমে আসছে, সূর্যটা আজ লাল হয়ে আছে। নামাজটা সবেমাত্র পড়ে উঠল কুহু, রুম থেকে বের হয়ে দেখে আশা রান্নাঘরে কাজ করছে কোনো একটা। এগিয়ে যায়, চুলোয় দুধ বসানো নাড়ছে চামচ দিয়ে আলতো করে। বাসার কলিং বেল বাজে কুহু গিয়ে দরজা খুলে দেয়, আকাশ চিন্তিত হয়ে প্রবেশ করলেও অন্তিক প্রবেশ করছে না ক্ষোভ হয়তো মেটেনি তার। কুহু ভাব নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,

“ছেলেকে দেখে নিয়ে দয়া করে বিদায় হোন আসুন।”

​বাসায় ঢোকার অনুমতি পেয়ে কোনো প্রকার এদিক-ওদিক না তাকিয়ে অহীনের কক্ষে চলে যায় তারা দু'জন। নিবিড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে অহীন, মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে কিছুদিন ধরেই। অন্তিক ওর পাশে গিয়ে বসে কুহুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

“তোর মনে হয় না এখন বেশি হচ্ছে এসব? রোজ রোজ এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকে দরজা কেন খুলিস না?”

​একই রকম জেদ নিয়ে নড়ল না কুহু, অন্তিক সেদিন তাকে খোটা দিয়েছে বাড়ি গিফট করার। হতাশার সঙ্গে অন্তিক অহীনের মাথায় হাত বুলায়, কিছু সময় পর আশা সবার জন্য বাটিতে করে সেমাই নিয়ে আসে, সঙ্গে অহীনের জন্য একটি বাটি। আকাশ ওর দিকে তাকায় সে জানে না কী হয়েছে তাদের মাঝে তাই একটু ক্রুর গলায় বলে,

“ঝামেলা সব সংসারে হয় আশু, তোর বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত ছিল ওর ওপর।”

​আশা কিছুই বলল না, বেশ অনেকটা সময় কাটতেই অহীন ছোট করে হামির সঙ্গে চোখ মেলে তাকায়, পাশেই সবাইকে দেখে ক্ষীণ গলায় হাসে,

“সবাই এখানে কেন? আমার এসব তো স্বাভাবিক।”

​কুহু গম্ভীর গলায় বলে,

“সকালে ছাদ থেকে নামানো হয়েছে তোমাকে, এখন চোখ মেলে তাকানো স্বাভাবিক?”

​“নইলে বাড়িতে আসতে দিতে?”

​কুহু এগিয়ে যায়, যতই রাগ দেখাক ছেলেতো, মায়ের মন কি এমন অবস্থায় স্থির থাকে? অন্তিককে সরিয়ে দিয়ে পাশে গিয়ে বসে, কপালে ক্রুরতার ভাঁজ ফেলে বলে,

“আমি কথা রেখেছি, আশু না বললে তখনো বাসায় জায়গা দিতাম না তোমাকে। পরের বার সাবধান হয়ে যেও নয়তো আমি সত্যি আশুকে বিয়ে দিয়ে দেব অন্য কোথাও।”

​অহীন হাসি দিয়ে কুহুর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সে জানে তার মা একটু মেজাজি কিন্তু তাকে খুব ভালোবাসে। কুহু তাকে নিজ হাতে খাওয়াতে নিলে খেল না সে। আশার দিকে তাকিয়ে আছে, আশা তখনো একটু অন্যমনস্ক হয়তো অহীনের মতো মনঃক্ষুণ্ণতা কমেনি একটুও। ঠোঁটগুলো কাঁপছে তার। রুমটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল, হয়তো সবাই বুঝতে পারছে আশা অহীনকে কথা বলার সময় দেওয়া উচিত। আশা নীরবে কক্ষ ছাড়তে নিলে অহীন পেছন থেকে ডেকে বলে,

“সবাই চলে যাওয়ার পর একজন মানুষের খুব অভাব বোধ হয়, সেটা তুই। ১০টা মিনিট একটু বস আমার পাশে।”

​মলিন মুখে ওষ্ঠদ্বয় দাঁতের ফাঁকে কামড়ে ধরে, ধীর পদক্ষেপে এসে অহীনের থেকে একটু দূরে বিছানায় বসে। অহীন মৃদু হাসে, অসুস্থতা যদি তার পেঁচির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিয়ে যায় তাহলে হয়তো সংকোচহীন সে হাজার বার দোয়া করত অসুস্থ হওয়ার। বিছানা থেকে নামতেই আশা উঠে দাঁড়ায়, অহীনকে বলে,

“আমি যাব না তুমি উত্তেজিত হবে না।”

​অহীন আস্তে করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আসে, আশার কাছে আসে। বয়সে এত বড় মেয়েটা সামনে দাঁড়ালে মনে হয় পিদ্দিম, আয়াশ ঠিক বলে এটা একটা পুতুল। বক্ষের মাঝে সুপ্ত মনটা কেমন বারবার কম্পিত হচ্ছে। আশার বাহুতে ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়। নিষ্পলক তাকেই দেখছে আশা, অসুস্থ মানুষটাকে কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছে তার নেই নয়তো ছুঁতে দিত না, ভালো করে সরিও বলেনি যে এই হারামিটা। সরিটা চাইছে সে মনে মনে কিন্তু অহীন হয়তো আন্দাজ করে নিল সবটা। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আশার সামনে, দুটো হাত মুঠোয় পুরে নেয় সে, চোখগুলো ভেজা।

“আমি একটু কথা বলার সুযোগই খুঁজেছি, যদি দিয়ে দিতে হয়তো এতটা দূরত্ব থাকত না। আমি কি নিজেকে তুলে ধরার অধিকারটুকু তোমার থেকে পাই না?”

​প্রথম অহীনের মুখ থেকে নিজেকে তুমি সম্বোধন শুনে কেমন যেন রক্তগুলো হিম হয়ে যাচ্ছে, নিজেকে বিশ্বাস করা কঠিন হচ্ছে। অহীন ওষ্ঠ ভিজিয়ে বলে,

“আমি জানি না কোনো পুরুষ একটি নারীর জন্য কখনো কাঁদে কি না, কিন্তু আমি জানি আমি কাঁদি বারবার তোমার জন্য। এই জন্য নয় যে তুমি আমাকে কাছে টানো না বা আমাদের মাঝে অনেক বেশি দূরত্ব, আমি কাঁদি এই ভেবে যে এই দূরত্ব আমাদের বিচ্ছেদের কারণ না হয়ে যায় কখনো।”

​হাত দুটো ছেড়ে উরুতে আনে সে,

“আম্মু বলল তোমাকে নিয়ে নেবে, সেই ভয়ে ঘুমও হয়নি। আমি তো ছাড়তে পারব না, কেউ কি ইচ্ছে করে নিজের সুখ ছেড়ে দেয়?”

​এবার আশা অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করে,

“আমাকে নিজের সুখ বলছ?”

​চোখ তুলে চোখের সাথে মেলায় অহীন, রক্তিম চোখজোড়া টলটল করছে, কথার সত্যতা নিশ্চিত হলো এতেই। অজান্তেই আশার চোখও অশ্রু বিসর্জন দেয়। অহীন ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে,

“আজকে বললাম আর বলব না কখনো, মনে রাখিস কিন্তু।”

​অহীন ধীরে ধীরে নেমে আসে ওর পায়ের কাছে, ক্ষতগুলো নেই আগের মতো, না থাকায় হয়তো ভালো হয়েছে নয়তো সে কথা বলার শক্তি হারাত এখন। দুটো পায়ে আলতো করে চুমু দিয়ে কেঁদে ওঠে,

“সরি, আমি তোমার সাথে অন্যায় করেছি, প্রতিটা ক্ষত হয়তো মুছে যাচ্ছে। মনে আঘাত দিয়েছিলাম মুছবে না, সুযোগ দাও আমি মুছে দেব।”

​পায়ের ওপর কপাল ঠেকিয়ে রেখেছে অহীন, হতবুদ্ধির মতো শুধু তাকিয়ে আছে আশা। এটা কি সেই অহীন যার ইগো আকাশছোঁয়া, ছোট একটা ভুলের জন্য কয়েক ঘণ্টা পানিতে ডুবিয়ে রেখেছিল তাকে? হাতটা অনিচ্ছুকভাবে অহীনের চুলের ভাঁজে চলে যায়, এতে আরও কাতর হয়ে পড়ে ছেলেটা।

“আই প্রমিস ইয়ার আমি ভালোবাসতেও জানি, ঠিক যতটা আমার আশু চায় তার চেয়ে বেশি। শুধু তার ভালোবাসার দাবিটা আমার কাছে হোক। সরি সরি মাফ করে দাও।”

​আশা এই পর্যায়ে পা-টা টান দিয়ে সরিয়ে আনে তার কাছ থেকে, ফলে কান্না ও আহাজারি থেমে যায় অহীনের। ব্যথাতুর চোখে তাকিয়ে আছে আশার উত্তরের আশায়। ভ্রুজোড়া কুঁচকে নিজের বিরক্তি ফুটিয়ে ধরে সে অহীনের সামনে, চোখগুলো তারও ছলছল করছে। অন্যদিকে মুখ করে একটু তাচ্ছিল্য করে বলে,

“সেদিন আমাকে আয়াশ কোলে করে নিয়ে গিয়েছিল, তুমি আমাকে তারপর পুরো দুটো সপ্তাহ একবারও দেখতে আসোনি। মানলাম সেই রাতে তুমি রাগ করে ভুল করেছ। পরের দিনগুলো? তখন কি রাগ কমেনি তোমার?”

​মাথা নুইয়ে নেয় অহীন, শীতল করা বাতাসের একটা গুনগুন শব্দ আসছে, মাথার ওপরে হাজারো চিন্তার ঝাঁক জেঁকে ধরে আছে। বক্ষদেশে ব্যথা কীভাবে বোঝাবে সে? যে কীভাবে আসত মেয়েটার সামনে? এমন কিছুর পর চোখে চোখ রেখে সাহস করে কথা বলার মানে যে সত্যি তার মধ্যে লজ্জা নেই, বা একটা বাস্তব ধর্ষকের মতোই হতো, যে রাতভর উল্লাস করে নির্লজ্জের মতো সেই নারীটির সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। নরম ও ক্রন্দনরত গলায় বলে,

“কীভাবে আসতাম? তোমার শরীরের দিকে তাকানোর সাহস ছিল না, আমার পাগুলো কাঁপছিল যখন ভাবছিলাম আমি এমন করেছি। মনে হচ্ছিল তখন তোর সামনে আসলে তুই আমাকে ঘৃণা করবি। আমি জানি আমি অন্যায় করেছি। কিন্তু আমি এটাও জানি আমি আবার করে ফেলব। সরি।”

​“তার মানে তুমি স্বীকার করছ তুমি আবারও করবে?”

​অহীন মাথা নুইয়েই রাখল, আশা কান্না করছে, এ কার পাল্লায় খোদা তাকে ফেলল? এতে মাফও চাইতে পারে না। কেউ কি মাফ চাওয়ার সময় বলে আমি আবার ভুল করব। অহীন এবার নিচু গলায় বলে,

“আশু তুই আমার ওয়াইফ, তোর জানা উচিত আমি স্যাডিস্টিক। আগে না বলার জন্য মাফ চেয়ে নিচ্ছি।

আমি হয়তো রাগের কারণে প্রথমবার অতিরিক্ত করে ফেলেছি কিন্তু দ্বিতীয়বার তুই হালকা অসুস্থ হবি না তার কোনো সিউরিটি দিতে পারব না।”

​কান্না থেমে যায় আশার, টলটলে চোখে তাকিয়ে আছে সে অহীনের দিকে, কত অদ্ভুত লাগছে নিজেকে। এসব কী ঘৃণ্য লাগছে তার কাছে, পেটের ভেতরে নাড়িভুঁড়িগুলো গুলিয়ে আসছে। সে দূরে সরে যায় অহীনের থেকে, তৎক্ষণাৎ অহীন সোজা হয়ে ওর সামনে চলে যায়,

“সরি, আমি প্রথম দিন বুঝতে পেরেছিলাম। তাই তোর কাছে যাওয়ার সাহস হয়নি। রাগ ভাঙিয়ে তো আবার কষ্ট দিতাম। কিন্তু বিশ্বাস কর আমার মন মানছিলই না তোকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টা। আমি কখনো ভাবিনি তোর প্রতি এতটা আসক্ত হয়ে যাব আমি। আমি ওয়ে-লেস।”

​অহীনের প্রশস্ত বুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় আশা তাকে নিচে, ফ্লোরে গিয়ে ছিটকে পড়ে গর্জে ওঠে আশা,

“তোমার মধ্যে সমস্যা আমি এতে কী করতে পারি? তোমার জন্য নিজেকে আঘাত করব? আর এসব বলে আমাকে কী বোঝাতে চাচ্ছ? তোমার সাইকোলজিস্ট দেখানো প্রয়োজন, যাতে আমার লাইফটা ইজি হয়।”

​“ওকে শান্ত হ একটু।”

​বলেই আস্তে করে উঠে এসে ওর পাশে বসে আবার। হাত বাড়িয়ে মাথায় রাখতেই আশা বাচ্চাদের মতো কেঁদে ওঠে, অহীনের টিশার্টের কলার ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকে,

“আমি এসব চাই না, আমার কষ্ট হয়, তুমি অনেক খারাপ। আমি ফুম্মির সাথে থাকব। আমার পক্ষে এসব সহ্য করা অসম্ভব। প্লিজ আমার সাথে এটা করো না আর। কেউ স্বেচ্ছায় নিজের গায়ে আঘাত নিতে চায় না। স্বাভাবিক না হতে পারলে এসো না আমার কাছে। অহীন সাধারণ জীবন চাই আমি। এমন হিংস্র না।”

​আশাকে টেনে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে, বুঝতে পারছে মেয়েটা ভয় পাচ্ছে তাকে। সরাসরি বলাটা উচিত হয়নি এখন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সে তাকে কথা দেয়,

“আম্মুর সঙ্গে থাকতে হবে না, আমি আর এমন করব না সত্যি বলছি। দু’জন আলাদা রুমে থাকব। নিজেকে শুধরাতে না পারলে তোর কাছে আসব না ওকে?”

​অনেকটা সময় কান্না করে সরে যায় আশা তার কাছ থেকে। রমণীর ফোলা ফোলা চোখগুলো কতটা মোহনীয়তা ছড়াচ্ছে তা হয়তো জানে না সে নিজে। অহীনের ভালো লাগছে অনেকগুলো দিন পর বুকটা শান্ত হলো বোধহয় তার। আস্তে করে আবারও আশার পায়ের কাছে আসন করে বসে, সে পাগুলো নিজের দিকে টেনে আনে। পায়ের নীল দাগগুলো মুছে যাচ্ছে আস্তে আস্তে করে। তবুও হালকা আভা রয়ে গিয়েছে। অহীন সেখানে আলতো করে চুমু খায়, ওর দিকে তাকিয়ে বলে,

“মন থেকে মাফ করেছিস আশু?”

​আশা প্রশ্নের উত্তরের পরিবর্তে পা তুলে দিল অহীনের বুকের বাঁ পাশে, চাপ দিয়ে কঠিন গলায় বলে,

“আমি তোমার কোনো কাজ করব না।”

​আশার কথায় হতবিহ্বল হলো অহীন, কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য চুপ থেকে বুঝতে চায় কী হলো? মাথায় ঢুকতেই হালকা হেসে বলে,

“আমি তো কাজ পারি না, তুই না করলে কে করবে?”

​“আমি জানি না, সকালে নিজের নাস্তা নিজে বানিয়ে নিও, আমার পক্ষে সম্ভব না। আর তোমার কাপড় কাচার কাজ আমি কোনো ভাবেই করব না। বিশেষ করে তোমার ওসব অশ্লীল কাপড়গুলো যেখানে সেখানে পড় যে।”

​আশার কথায় ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হাসে সে, অবুঝের মতো জিজ্ঞেস করে,

“কোন অশ্লীল কাপড়? আর যেখানে সেখানে কোনখানে পড়ি?”

​আশা ওর হাবভাব বুঝে গলা খাঁকারি দেয়, অতঃপর ইতস্ততভাবে বলে,

“নাটক করবে না আমি তোমার আন্ডারওয়্যারের কথা বলছি।”

​“ওহহহহহ আচ্ছা শোন এটা নিয়ে একটা ডিল করা যাক?”

​আশা নিজের পা-টা তার বুক থেকে সরিয়ে নিতে চাইলে অহীন সরাতে দিল না, বরং হাত দিয়ে বুকের মাঝে আরও একটু চেপে ধরল। আশা জিজ্ঞেস করে,

“এটা নিয়ে কেমন ডিল?”

​অহীন হাসে ঠোঁট কামড়ে, আগের মতোই দুষ্টুমি মেখে আছে মুখে। আশার পায়ের তালুতে হাত বুলিয়ে দিয়ে হিসহিস করে বলে,

“তুই আমার যেখানে সেখানের কাপড় কেচে দিস। আর আমি তোর যেখানে সেখানের কাপড় কাচব। কেমন?”

​থতমত খেয়ে অহীনের হাতসহ বুকে ধাক্কা দেয় সে পা দিয়ে, তবুও ছাড়ল না অহীন। অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে আশা,

“অশ্লীল কুত্তা।”

​হয়তো এতটুকু সম্বোধন আশা এতগুলো দিন পর করেছে কিন্তু অহীনের মনে দাগ কাটল তা। ইস তার পেঁচিটা কতগুলো দিন পর তাকে বকল একটু!

​“পা ছাড়ো পরে বলবে বুকে পা রাখি।”

​“তুই চাইলে বুকে না কাঁধেও তুলতে পারিস একটুও মাইন্ড করব না।”

​“ছিঃ।”

​দু’জনেই হালকা করে হেসে দেয়। অহীন ওর পা ছেড়ে উঠে বসে, পাশেই সেমাইয়ের বাটিটা হাতে নিয়ে দেখে নেয়,

“তুই রান্না করেছিস?”

​হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে আশা। অহীন আয়েশে খায় ওটা সময় নিয়ে। আশা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সে জানে না আদৌ কি সেই রাতের কথা ভোলা সম্ভব কি না। কিন্তু এভাবে তো আর সম্পর্ক ফেলে রাখা যায় না তাই নয় কি? বাটিটা খালি হলে সে ওটা নিয়ে রুম ছাড়তে চাইলে অহীন তার হাত ধরে আটকে দেয়, ছোট করে আবদার করে,

“বলেছি গভীরভাবে ছোঁব না, একটু বুকে মাথা তো রাখতে পারব, এখন যাস না।”

​অনুভূতিহীন আশা যেন কোনো অশরীরী। অনুভূতি নেই তার মাঝে। নিজেও জানে না কেন অহীনের কথা এখন শুনছে। ঘৃণা হচ্ছে মায়াও হচ্ছে। হয়তো মায়া বেশি হচ্ছে কারণ সে নিজেও ভুল করেছিল। সে মসৃণ গলায় বলে,

“আমার একটু কাজ আছে, তুমি আরাম করো আমি দেখি ফুম্মি কী করছে।”

​আর কথা না বলেই চলে গেল সে, রইল অহীন ও তার মধ্যের দ্বন্দ্বগুলো। সে এখনো ভাবছে আশা মন থেকে তাকে মাফ করেছে তো? নাকি এমনি সহানুভূতি প্রদর্শন করে চলে গেল? যাই করুক এবার তো কাছেই থাকবে, ইনিয়ে-বিনিয়ে যেভাবেই হোক আগের মতো হতে হবে।

_______

​“ছেলেকে দেখার জন্য বাড়িতে আসার অনুমতি দিয়েছিলাম, তুমি রুমে কেন ঢুকলে?”

​রাগে গজগজ করতে করতে বলল কথাটা কুহু। সামনেই অন্তিকও মুখভঙ্গি কঠোর করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কুহুকে ছিঁড়ে খাবে এখনই। তার গায়ের কালো শার্টের কলারের অংশটা ভেজা, ঘামে লেপ্টে আছে। কুহুর দিকে কয়েক পা এগিয়ে যায়, রাগান্বিত আদলখানা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে নিল। না রাগ কমছে বলে মনে হয় না। আচানক হেঁচকা টানে নিজের দিকে করে নেয় বউটিকে, দেয়ালের সাথে পিঠের সংঘর্ষ হতেই ব্যথায় ‘আহহ’ বলে ককিয়ে ওঠে কুহু, পরক্ষণেই প্রতিবাদ করে ধাক্কা দেয়,

“সরো আমার কাছ থেকে, তুমি তো সেদিন বললে দেখে নেবে খেলা নাকি হবে, এই বুঝি চিপকা-চিপকির কথা বলেছিলে?”

​থতমত চেহারায় সরে যায় অন্তিক। তার কথাটা কি তাহলে শুনেছিল তার পেঁচি? এটা কি কান নাকি ডিশ অ্যান্টেনা? দেয়ালের ওপাশ থেকেও সব ক্যাচ করে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে হুট করে কোমরে চেপে ধরে তার, নরম উদর শাড়ির ফাঁক গলিয়ে ছোঁয়াটা পুরনো স্বভাব তার। তাই তো চায় সারাক্ষণ বউটা পাতলা শাড়িতে থাকুক যাকে ছুঁয়ে দেওয়ার ইচ্ছেটা তৎক্ষণাৎ পূর্ণ করা যায়। কুহুর ঘাড়ে নাক নিয়ে সুবাস টেনে নেয়। কতটা মিস করেছে এই বেলিফুলের মতো গন্ধটা এই কয়েকটা দিন! সে যে পেঁচিকে একটা রাতের জন্য রাহাত নীলের কাছেও যেতে চাইলে হাজার বাহানা দিয়ে আটকে নেয় নিজের কাছে। নিজ বক্ষ মাঝে দুই হাতে আগলে না নিলে ঘুম হয় না আর বাঁচবেই বা কয়দিন বউকে আদর না করে তো মরেও শান্তি নেই। সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে রাত কাটছে তার। অধরের কোমল ছোঁয়া দিয়ে সে বলে,

“অহীনটা বড় হয়েছে ওকে কেন মারলি জান? ওর মতো একটা ফকফকে বগের বাচ্চার গায়ে হাত তুললে কি সহ্য হওয়ার কথা?”

​অমনি খেপে যায় কুহু তবে দূরে সরাল না স্বামীকে,

“ভুল করলেও কিছু বলব না? তুমি জাওরা ওটা জাওরার ঘরের জাওরা, বউকে শান্তি দেওয়া তোমাদের রক্তে নেই।”

​কুহুর রাগের বশে বলা প্রতিটা কথা মধুর, তবে যবে থেকে সে বুঝতে পেরেছিল এই নারী ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ। সে মসৃণ হেসে কুহুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়, একটি হাতে চিবুক তুলে সম্পূর্ণ আদল দেখে। ঠোঁটে নরম পরশ রেখে বলে,

“সরি জান, সেই বিয়ের পর থেকে করে আসা সব ভুলের জন্য মাফ চাই। বাচ্চা ছেলেটা পুরো রাত কেঁদেছে।”

​মুখ ফেরায় কুহু,

“আমার জন্য কেঁদেছে? কারণ আমি মেরেছি?”

​“না আশুর জন্য।”

​“তাহলে তুমি আমাকে কেন মারলে?”

​“সরি।”

​গালগুলো বাঁকিয়ে নেয় কুহু, কতই না ঢং করছে আজ অন্তিক। কিন্তু সেদিন এসেই গায়ে হাত তুলল, এই বয়সে এসেও গায়ে হাত তোলার স্বভাব গেল না তাহলে সে কেন ছাড় দেবে? কুহু তাকে সরিয়ে দিতে নিলে আরও জাপটে ধরে কোমর। শক্ত হাতের গভীর স্পর্শ, অন্তিকের শরীরের পরিবর্তন লক্ষ্য করছে কুহু, এখন না ছাড়ালে নিশ্চিত উল্টা পাল্টা লজ্জাজনক কাজ করবে, ছেলে মেয়ে গুলোও ঘুমায় নি এখনো। তাই তো ছুটার জন্য ছটফট করছে। সে রেগে আছে খুব, তাই ধরা দেওয়া যাবে না। কিন্তু বেহায়া নির্লজ্জ লোকটা কি মানে? অন্তিক হিসহিস করে বলে,

“আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছ না কেন? তুমি কি চাচ্ছ কোলে উঠতে?”

​তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে কুহু,

“তোমার মতো বুইড়া খাটাস আমাকে কোলে নেবে? বয়সটাও দেখো, এক ঠ্যাং কবরে, দুটোই নিয়ে যাবে এবার।”

​“আর যদি পারি?”

​“পারবে না।”

​“পারলে পুরো রাত আমার, তোর মুখ থেকে উহ্ টি যেন না শুনি।”

​হাড় হিম করে শীতল হয়ে যায় কুহু, শুকনো ঢোক গেলে। পুরো রাত তার মানে পুরো রাত এই দানবের মতো কুত্তা লোকটার ভার নিয়ে ঘুমাতে হবে। এর বেশি আর কিই বা করবে? অন্তিকের দিকে তাকায়, লোকটা হাসছে তাকে কথায় ফাঁসিয়ে। আচানক টান দিয়ে পাঁজা কোলে তুলে নেয় সে প্রেয়সীকে। শাড়ির ঝুলন্ত আঁচলটা হাতের সঙ্গে পেঁচিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরেছে কুহু। এত সময়ের রাগ ও ক্ষোভ মিটেছে, মেটারই কথা বয়স তো কম নয়, এখন আর কত রেগে থাকবে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে। বিছানায় ফেলে কুহুর হাতজোড়া এক হাতে আটকে উপরের দিকে তুলে ধরে,

“এবার?”

​“বুড়ো হয়েছ কিছুদিন পর দাদু হবা, এসব বেহায়াপনা ছাড়ো।”

​ভড়কায় অন্তিক, কুহুর চোয়ালে চাপ দিয়ে ঝুঁকে যায় তার দিকে, ঠোঁট কামড়ে হেসে উত্তর দেয়,

“বয়স হয়েছে আমার সেটা সময়ের দোষ, আমার শরীর এখনো যুবক, ট্রাই করে দেখ মেশিনও একদম হাই স্পিডে চলবে। ”

​ধাক্কা দিয়ে নিজেদের স্থান পরিবর্তন করে কুহু, এবার সে উপরে অন্তিক নিচে। পেটের ওপর বসে খোলা চুলগুলো বাঁধে কুহু, এতে পুরুষটির নিষিদ্ধ চাওয়াগুলো জাগ্রত হচ্ছে। গলায় স্বর্ণের চেইনটা চিকচিক করে তার সামনে। নিজ থেকে কুহু সাড়া খুব কম দেয়। তাই তো অপেক্ষায় আছে পরবর্তী পদক্ষেপের। তার ভাবনা ভুল প্রমাণ করে কুহু হাত দিয়ে চাপ প্রয়োগ করতেই চোখ-মুখ কুঁচকে নেয় অন্তিক। প্রাণপাখিটা এই পাখি মনে হয় নিয়ে নিবে। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় নিজের ওপর থেকে কুহুকে। উঠে বসে বালিশ নিয়ে নিজের কোমর সহ নিচের অংশ ঢেকে হিসহিস করে ব্যথাতুর গলায় বলে,

“শালী, তোর উত্তেজনা নেই বলে কি আমার নেই? আমার যৌবন খেয়েছিস, আমার এই বয়সটাও গিলবি?”

​“তোর উত্তেজনায় আগুন লাগুক কুত্তা, আমার গায়ে হাত তুলে আসছে প্রেম করতে বুইড়া খাটাশ।”

​বিছানা থেকে উঠে যায় কুহু, শাড়ির আঁচল দুলিয়ে দুলিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে কোমর দুলছে এলোমেলো ভাবে, কে বলবে এর বয়স হয়েছে এত জেদ? সেই তার ছোট পেঁচিটা। ব্যথায় খেয়াল ফেলে ককিয়ে ওঠে,

“এটা চিটিং পেঁচি, কথা ছিল কোলে নিলে সব করতে দিবি।”

​“আর আমি কবে তোমার সব কথা শুনলাম?”

_____

​বিকেলের আমেজ, উইকেন্ডের ছুটির দিন আজ। নিজেদের কালচারটা আজ সাইড করেছে অন্তিহা, একদম ওয়েস্টার্ন পরেছে। যদিও ইচ্ছে ছিল না জেসির কারসাজি এসব। গাঢ় লাল একটা সাটিনের গাউন তার গায়ে, হালকা ঝকঝকে কাজ লম্বা হাতায়। যেহেতু অভ্যস্ত নয় তাই একটা স্কার্ফ পরেছে গায়ে। গায়ের সাথে চেপে ধরে আছে জামাটা তাকে যেন জানটা নেওয়ার পর শান্ত হবে। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে অন্তিহা আর জেসি। জেসি গায়ে বরাবরের মতোই শর্ট ড্রেস, মানে বাবা-মায়ের কিছু কিছু কথা সে স্বাধীন ভাবেই চলতে চায়। অন্তিহা বারবার টেনে টেনে নিজের পোশাকটা একটু ঢিল করার বৃথা চেষ্টা করছে, আর বিরক্তি ও রাগ নিয়ে বলছে,

“জেসি আমরা কি এখন এখান থেকে যাব?”

​“ওয়েট, আমার ফ্রেন্ড গাড়ি পাঠাবে, ওই তো চলে এসেছে।”

​কালো রঙের একটি মার্সিডিজ এসে থামে তাদের সামনে। গাড়ির গ্লাসটা নামাতেই তীক্ষ্ণ দুটো চোখ সোজা অন্তিহার দিকে যায়। চেনে অন্তিহা একে, তার সাথেই পড়ে তবে কথা হয়নি কখনো। জেসি দাঁত বের করে খিলখিল করে হেসে গিয়ে বসে তার পাশের সিটে। পেছনের দরজা খুলতেই অন্তিহার মুড গেল নষ্ট হয়ে। গাড়িতে বত্রিশ পাটি বের করে হাসি দিয়ে আছে সাফওয়ান। একটিবার জেসির মুখের দিকে কঠিন চোখে তাকায় অন্তিহা। জেসি হি হি করে হেসে মিনতি করে বলে,

“আমি জানতাম না উনি আসবেন।”

​ড্রাইভিং সিটে বসা মেয়েটি বলে,

“আমার ফ্রেন্ড সাফওয়ান, অন্তু কোনো সমস্যা?”

​মেয়েটার কথায় বিনয়ী ভাব, এত মিষ্টি করে বলার পর কোন বেয়াদবই হবে যে স্বীকার করবে নিজের সমস্যা। সে জেসির সঙ্গে সিট বদল করতে চায়, কিন্তু জেসির প্ল্যান বোধহয় তা বলে না। সে নড়ল না। অন্তিহা গিয়ে বসে সাফওয়ানের পাশে। এই মুহূর্তটা হয়তো অনেক মোহময়, প্রথম এতটা গর্জিয়াস সাজে প্রেয়সীর আদলখানা দেখল সাফওয়ান। চোখ যেন সরছেই না, অন্তু যা মেয়ে তার দৃষ্টি দেখলে নির্লজ্জ বলে থাপ্পড় না দিয়ে দেয়। সেই সংশয় থেকেই চোখ ফেরায়। গাড়ি এসে একটা বিলাসবহুল বাড়ির সামনে থামে। একটি পাশে লাইটিং করা, কোনো বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া মেয়ের বার্থডে পার্টি বোঝা সহজ, আর বিগড়ে যাওয়া মেয়েটি তাদের গাড়িটি চালাচ্ছিল এত সময়। গাড়ি থেকে নামতেই অন্তিহার চোখ যায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর রঙের গাড়িটির দিকে, তার মানে আয়াশও এসেছে এখানে। ফোঁস করে নিজের ওপরেই নিজে হাসে। পেছন থেকে সাফওয়ান নেমে আসে একদম ফরমাল ড্রেসআপ তার, ভার্সিটিতে দুষ্ট একটা ছেলে মনে হলেও এখন যেন কঠিন চিত্তের পুরুষ সে। ছোট ছোট চোখগুলো তীক্ষ্ণ চোয়ালে ঠোঁটে বাঁকা হাসি। অন্তিহার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বাহু দিয়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে কমপ্লিমেন্ট ছুড়ে,

“ইউ লুক টু মাচ হট।”

​অন্তিহা ওর থেকে দূরত্ব তৈরি করে বিড়বিড় করে,

“ব্লাডি বিচ।”

​জেসির বাহুর নিচ দিয়ে হাত রেখে সে প্রবেশ করে বাড়িটির ভেতর। হালকা টিমটিমে আলো ঝলমল করছে চারপাশ। খোলা আকাশের নিচে দূরে চোখ যায় কিছু টিচার্সদের সাথে কথা বলছে আয়াশ, মুখে কালো মাস্ক হাতে গ্লাভস। একটি ওয়েট্রেস এসে ওয়াইনের গ্লাস বাড়িয়ে দিলে সে মাথা দুলিয়ে না বলে দিল। যদি এত দেমাগ হবে তাহলে এসেছে কেন এখানে? চোখ নামিয়ে নিল সে। কারো হাতে ওয়াইনের লাল গ্লাস তো কেউ আনন্দে কথা বলছে। সামনেই হঠাৎ আলো কমে গেল।

​হাতের পাতায় কারো হালকা টান অনুভব করে সামনে তাকায় অন্তিহা। একজোড়া নয়ন তার দিকে তাকিয়ে আছে, যার কোমল স্পর্শ নিয়ে যাচ্ছে অজানায়। সাফওয়ান আস্তে করে টানতেই কেমন একটা যেন মনে হলো তার বশে চলে গিয়েছে অন্তিহা। শরীর ঘুরিয়ে গিয়ে বুকে ঠেকে সাফওয়ানের। ছেলেটার একটি হাত ওর হাতে অপর হাত কোমরে, পায়ের সাথে পা মিলছে দুজনের। হালকা কোমল সুরে স্পিকারগুলোতে বাংলা গান বাজছে,,

​হালকা হাওয়ার মতন চাইছি এসো এখন

করছে তোমায় দেখে,

অল্প বেইমানি মন

বাঁধব তোমার সাথে, আমি আমার জীবন

​অন্তিহার হাতটা ঘুরিয়ে এবার কোমর থেকে চুলের ফাঁকে নিয়ে আসে তার হাত। চোখ বন্ধ করে নেয় অন্তিহা, লজ্জা নাকি রাগ বোঝা যাচ্ছে না। নিঃশ্বাসগুলো এতটাই ঘন যে সাফওয়ান নিজের বুকে অনুভব করছে তা। সে হিসহিস করে কানের কাছে গিয়ে বলে,

“আমি বাধ্য করব আপনাকে ভালোবাসতে।”

​গরম নিঃশ্বাসটা কর্ণ স্পর্শ করতেই অন্তিহার ছোট শরীরটা কাঁপল একটু। সে জানে অনুভূতি নেই এই লোকের প্রতি তবুও কেমন ভয় হচ্ছে। সে চোখ আধখোলা রেখে হিসহিস করে বলে,

“আমার মন জানে না দ্বিতীয় ব্যক্তিকে ভালোবাসার নিয়ম। নিজের সময় নষ্ট করবেন।”

​“নিয়ম শিখে যাবেন, যখন আপনার শ্বাস আপনার শব্দ আপনার সুর আপনার কম্পন সব আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ​Every second, you will thirst for my love."

​এই পর্যায়ে অন্তিহা তার বুকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরতে চায়, নিতে পারছে না এসব কথা। ভালোবাসা বোঝার বয়সে সে ভালোবেসেছে, এত সহজে কেউ পারবে না ভোলাতে। সাফওয়ান তাকে চেপে ধরে নিজের সঙ্গে, বুক ক্রমাগত দুজনের ওঠানামা করছে। ভেতরের দ্রিমদ্রিম শব্দ গান ভেদ করেই তারা পাচ্ছে। অন্তিহা এবার শক্তি দিয়ে ধাক্কা দেয় তাকে এবং কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। সাফওয়ান তাকিয়ে আছে তার প্রিয় নারীটির দিকে। অন্তিহা চোখ মেলাতে পারছে না এই লোকের সাথে। পেছনে ফিরতেই একটি শক্ত পেশিবহুল পুরুষের শক্ত বুকে ধাক্কা খায়, পড়ে যেতে নিলে বন্দি হয় সেই শক্ত হাত দুটোর ভাঁজে। চোখ মেলে হাতের মালিককে দেখে ঢোক গিলে। থম মেরে তাকিয়ে আছে আয়াশ তার অধরের দিকে। এতটা সুন্দর একটি ড্রেস তবুও মুখে মেকআপের প্রলেপ নেই। ঠিক যেমন আশাকে সে থাকতে বলত ন্যাচারাল। অন্তিহাকে সাজতে দেখেছে সে খুব কম কিন্তু আজ এ কেমন রূপ? একদম মন জুড়িয়ে নেওয়া সৌন্দর্য। ঢোক গিলে নেয়। হার মানতে চায় না সে এই রূপের কাছে। সে জেতাতে চায় পুতুলের প্রতি ভালোবাসাকে। এখন অনুভূতিগুলোকে উড়তে দিলে মিথ্যা হয়ে যাবে পুতুলের প্রতি এত বছরের ভালোবাসা।

​চাইলে আস্কারা পাক, বেঁচে থাকার কারণ

আজকে হাতছাড়া যাক,

হুম ব্যস্ততার আর বারণ

লিখব তোমার হাতে, আমি আমার মরণ

​“ছাড়ুন।”

​ভাবনা ভেদ করে কথাটা বলাতে হকচকিয়ে ছেড়ে দিল আয়াশ তাকে। দ্রিম করে পড়ে অন্তিহা, ব্যথায় ককিয়ে ওঠে ‘আহহ্’। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে নিল আয়াশ। চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসছে শুধু একটি রমণী আর তার বিষাক্ত পাতলা দেহটা টানছে তাকে। আয়াশ ঝুঁকে সাহায্য করতে চায় গভীর গলায় বলে,

“সরি।”

​তার হাত ধরার আগেই চারপাশ থেকে ছেঁকে ধরে সবাই অন্তিহাকে। সবার জানার কৌতূহল অন্তু ব্যথা পায়নি তো? সাফওয়ানের চোখে চিন্তা খুব, সে রমণীর হাত ধরে টান দেয় নিজের দিকে। অন্তিহা হকচকিয়ে ওর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। আয়াশের দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে জেসির গায়ে ভর দিয়ে উঠে চলে যায় সেখান থেকে। আয়াশ তাকিয়ে আছে নিষ্প্রভ হয়ে। হঠাৎ কী মনে হতেই নিজের পকেট খুঁজতে থাকে। সব গুলো পকেট খুঁজে প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে মিনি বোতল বের করে তা থেকে এক ঢোক পানি খেয়ে নেয়। এটা মাঝেমধ্যে খুব প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রাখা, কখনো ব্যবহার করতে হয়নি। আজই প্রথম। বাইরে খায় না সে তাই এটা।

______

​রাত গভীর, বিছানায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছে অহীন। আলোগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, সবে খাবার খেয়ে রুমে এসেছে। কিন্তু আশা আসছে না কে জানে মেয়েটার কী হলো আবার। ড্রয়িংরুমের লাইটটা অফ তাহলে আশা কোথায়? অহীন বিছানা থেকে নেমে বের হয় রুম থেকে। সব আলো নেভানো। সে হাতের কাছেই ড্রয়িংরুমের লাইট জ্বালিয়ে দেয়। সামনের বিছানো ম্যাট্রেসের ওপর হঠাৎ হকচকিয়ে গায়ে ওড়না জড়িয়ে উঠে বসে আশা। ঘুম-ঘুম গলায় জিজ্ঞেস করে,

“কিছু লাগবে নাকি?”

​অহীন অবাক নেত্রে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। এত করে সরি বলার পরেও রাগ ভাঙল না মেয়েটার? বুকের ভেতর একটি পাথর গড়িয়ে পড়ছে নিচে বারবার আর ব্যথা অসহ্য লাগছে তার। সে আশার কাছে যায় এতে মেয়েটা আরেকটু জড়োসড়ো হয়ে নিজেকে ঢেকে নেয়। বুঝতে পেরে ওর কাছে গিয়ে বসে অহীন নরম গলায় বলে,

“ভয় পাস আমাকে?”

​না সূচক মাথা নাড়ায় আশা। কিন্তু ওর ভাবমূর্তি তো ভিন্ন কথা বলছে। অহীন হাত বাড়িয়ে দিলে আরও একটু পিছিয়ে যায়। অহীন এবার একটু জেদ করেই ওর কাছে গিয়ে বসে আর কৃত্রিম রাগ নিয়ে বলে,

“তাহলে দূরে যাচ্ছিস কেন? আমি কি পাগল যে বারবার একই ভুল করব?”

​কম্পিত স্বরে বলে আশা,

“দূরে যাচ্ছি না, ঘুম পাচ্ছে। কিছু প্রয়োজন তোমার?”

​হালকা ঘামছে আশা। ললাট বেয়ে চিবুক পর্যন্ত একটি ঘামবিন্দু এসে ঝুলতেই অহীন হাত বাড়িয়ে মুছে দেয় ওটা। আশার দিকে ঝুঁকে নরম গলায় বলে,

“তুই এখানে থাকলে প্রয়োজন ফুরবে না আশু। রুমে চল আমি ডিভানে থাকব কেমন?”

​“আমি এখানে ঠিক আছি তুমি যাও।”

​দীর্ঘশ্বাস নেয় অহীন। আফসোস হচ্ছে, ঠিক কতটা হিংস্র হলে মেয়েটা তার সাথে একই রুমে যেতেও ভয় পাচ্ছে। আর পাওয়ারই কথা এতগুলো দিন হলো সম্পূর্ণ সুস্থ হচ্ছে না। গালে হাত দিয়ে স্লাইড করে দেয়। চুল দুই হাতে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বলে,

“আমি একদিন খুব কষ্ট দিয়েছি? বাকি দিনগুলোতে তোকে আদর করিনি বুঝি? রোজ আমার বুকে টেনে নিইনি? কত ছোট ছোট চুমুতে কি ভরিয়ে রাখিনি? তবে কেন শুধু আমার দেওয়া কষ্টগুলোই দেখছিস, চাচাতো বউ বলেই তো? আপন বউ হলে কি কখনো এমন করতে পারতি? তাই বলে কি সত্যিই আমার থেকে এত দূরে চলে যাবি?”

​আশা ছলছল চোখে তাকায় তার দিকে। কীভাবে বোঝাবে সে তাকে, তার এই সামান্য ধরাও অসহ্য লাগছে তার। সে উত্তর করে,

“আপন বউ হলে তো তুমিও এত কষ্ট দিতে না আমায়। তুমি দাদুর চাপে পড়ে বিয়ে করেছিলে আমায়, হয়তো তাই কষ্ট দেওয়ার সময় ভাবোনি।”

​ঝটকায় বক্ষমাঝে টেনে নেয় অহীন তার পেঁচিকে। ইস কী সব কথা বলে এই মেয়ে! চাপে পড়ে বিয়ে করেছে? এটার জন্য কতই না দোয়া করেছে ওই খোদার কাছে! খোদার দেওয়া উপহারকে কেউ এমন করে বলে? চুপটি করে আছে রমণী অপ্রিয় মানুষটির বুকে। চোখ বা ঠোঁট স্থির, নড়ছে না কিঞ্চিৎ ও। অহীন ওর কপালে চুমু দিয়ে বলে,

“তুই যেটাকে চাপে পড়ে বলছিস? তুই জানিসও না ওটা আমার কত বছরের সাধনা। আর আপন বউ? সেটা তোকে কখনো বানাব না আমি, তুই কেবল চাচাতো বউ হওয়ারই যোগ্য, তবে কষ্টও অনুমতি ব্যতীত দেব না।”

​আশা চুপ করেই আছে। অহীন ওর মাথায়, চুলে, কপালে সরাসরি একটা ভেজা চুমু খায়।

“আমরা শুরু থেকে শুরু করব, ধীরে ধীরে। আমি এখানে থাকছি আজ। তুই রুমে থাক। কাল আমি রুমে থাকব তুই এখানে। যা।”

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন